[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

কহতব্য

 

বাংলাদেশের প্রথম (অস্থায়ী) জাতীয় সরকার এবং তার অমীমাংসীত রাজনৈতিক কর্মপ্রবাহের নামই- বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি!


 

১৯৭১ সাল, ২৫শে মার্চ’র কালোরাত থেকে পাকিস্তানী শাষকগোষ্ঠী এদেশে ভয়াল গণহত্য শুরু করে আর তা প্রতিরোধে স্বাধীনতার ঘোষণায় পাকিস্তানী শাষকগোষ্ঠীকে আগ্রাসী দেশ হিসেবে নির্দিষ্ট করায়- বাংলাদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

 

স্বশস্ত্র গণযুদ্ধের সাথে কূটনৈতিক যুদ্ধের মেল-বন্ধন তথা রাজনৈতিক দিক থেকে নিজেদের জাতিগত অস্তিত্ব-অবস্থানকে সংহত ও বিশ্ব দরবারে জাতীয় আত্ম-পরিচয় প্রকাশ বা জানান দেয়াটাও জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ স্বাধীন ভূখন্ড তথা সার্বভৌম রাষ্ট্রের অনিবার্য শর্ত ‘একটি সরকার’।

 

১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল, স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বদলীয় ‘অস্থায়ী জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়। মুখ্যতঃ ৬ দফা আন্দোলন থেকে ৭০ এর নির্বাচন হয়ে ৭ই মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ক্রমশ জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের মূর্তরূপ বা জাতীয় অথেনটিকতায় উঠে আসেন; তাই তৎসময়ে পাকিস্তান কারাগারে আটক থাকা সত্ত্বেও তাঁকেই স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী জাতীয় সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

 

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন, পলাশীর আম্রকাননে- বাংলার শাসন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেশীয় ষড়যন্ত্র আর বিদেশী চতুরতার মাধ্যমে হাতছাড়া হয়েছিল; প্রায় ২১৪ বছর পর ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল তেমনই এক আম্রকাননে বাংলার শাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয়- স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার।

 

ইতিহাসের পরম্পরায় অশ্রু-ক্রোধ-ভালোবাসায় বঙ্গ হৃদয় এদিন কেঁদেছিল। আর কাঁদতে কাঁদতেই যেন ইতিহাসের চাকা দোর্দণ্ড প্রতাপে জয়ের দিকে টেনে ধরেছিল।

 

স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী জাতীয় সরকার ‘আন্তর্জাতিক’ ও ‘জাতীয় ক্ষেত্রে’ মুক্তিযুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিয়ে দ্রুত পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে থাকে।

 

অবশেষে ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা, প্রায় নয় মাসের এই রক্তাক্ত যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষের তাজা প্রাণ আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হারিয়ে- পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে- সবুজ ঘেরা সূর্যস্পর্শিত রক্ত স্মারক-এর স্পর্ধিত পতাকা হাতে বাংলা ঘোষণা করে নিজের সদম্ভ অস্তিত্ব।

 

আর ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর হয়ে ওঠে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের রক্ত স্তম্ভে অঙ্কিত মহান বিজয় দিবস।

 

সাধারণতঃ জাতীয় বিজয় অর্জনের পর প্রয়োজন হয় বস্তুগত ও মননগত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ যে লক্ষ্য বা ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিত হয়, তা সফল হওয়ার পর প্রয়োজন হয় সে অনুযায়ী জনসমষ্টিকে সংহত করা। প্রচলিত রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ধারণা দিয়ে বললে বস্তুগত স্থিতিশীলতা বলতে বোঝায়- যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, যা প্রধানতঃ আর্থিক দিককে নির্দিষ্ট করে এবং মননগত স্থিতিশীলতা বলতে বোঝায়- নতুন পরিস্থিতির সাথে জাতিকে খাপ খাওয়ানো বা জাতীয় মননকে সঙ্গতিপূর্ণ করা, যা সংস্কৃতিগত দিক; আর দুটো দিক মিলিয়েই সাধারণত সংক্ষেপে ‘দেশজ বা জাতীয় রাজনৈতিক’ আশুকর্তব্য হিসেবে নির্দিষ্ট করা যায়। সেক্ষেত্রে যে ফ্রন্ট বা সরকার মারফত এই সংগ্রাম চলে ও সাফল্য বা বিজয় অর্জন করে, সাধারণত উক্ত ফ্রন্ট বা সরকারেরই দায়িত্ব থাকে অর্জিত সে সাফল্যকে অর্থপূর্ণ বা দৃঢ়বদ্ধতায় বস্তুগত ও মননগত উভয় দিক থেকে সুসংহত করা কারণ তা একই সংগ্রামের অংশ। ঐতিহাসিকভাবে জতীয় সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা এসেছিল বলে তাকে সংহত করার ঐতিহাসিক দায়িত্বও তাঁর কাঁধেই বর্তায়।

 

কিন্তু রাজনীতি যদি জনগণ ও নীতি এবং নৈর্ব্যক্তিক কাঠামোগত পথে যথার্থই রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনার পথে না হেঁটে ব্যক্তিইচ্ছা বা  যেমন যেমন বোঝা, তেমন তেমন করা’ হয়, তবে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিটা দেশ-মানুষ ও জাতীয় স্বার্থ অনুবর্তী না হয়ে বিপরীত অর্থে এগিয়ে যায়। ক্রমান্বয়ে, রাজনীতি দেশ ও মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের পথ না হয়ে স্বার্থসর্বস্বতায় দেশ ও মানুষকে জিম্মি করার অপরাজনীতি হয়ে ওঠে।

 

প্রথম ‘জাতীয় সরকার’ কর্তৃক সদ্য স্বাধীন দেশে ‘জাতীয় সংহতি’ স্থাপনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার পূর্বেই তা ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন মারফত বহুদল-বহুমতের প্রবর্তন করে, সেই দলীয় সরকার দিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গড়ে তোলা বা বিচি দিয়ে তরমুজ বহনের হাস্যকর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতার অলিন্দে বসেই পুনরায় কেবল ‘ঘোষণা’ দিয়েই একটি জাতীয় সরকার তথা জাতীয় দল গঠন করার যে লেজেগোবরে হওয়ার ইতিহাস- সেটাই শুরু হয়েছিল ‘৭২-এর ১১ই জানুয়ারি।

 

‘৭২-এর ১১ই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিসমিল্লায় গলদ ঘটেছিল, তা ৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারিতে শোধরানো যায়নি রবং ভুলের মাশুল অর্থে প্রতিক্রিয়াশীলদের পুঁজি হিসেবে বাকশাল- এর মতো বাড়তি রাজনৈতিক গ্যাটিসের প্রয়োজন হয়েছে এবং সেই গ্যাটিসের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি তথা ক্ষমতার অলিন্দ থেকে রাজনীতির নামে তথাকথিত রাজনীতি বা অপরাজনীতির উদ্ভব হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন থেকেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে কেবল ঘোষণা দিয়েই পুরো শাসনব্যবস্থাকেই বদলে ফেলার যে সংস্কৃতি কিংবা দেশ সম্পর্কে নিজেরা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বষোষিত জাতির কর্ণধার হয়ে বসার যে নির্লজ্জ ঘোষণাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রবর্তন, তা এখান থেকেই শুরু। মেজর ডালিমের সেই খুনে ঘোষণার পথ ধরে প্রেসিডেন্ট মোশতাক, এর কাউন্টারে মেজর খালেদ মোশাররফ, তৎপরবর্তীতে কর্নেল তাহের অতঃপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং উক্ত পদাঙ্ক অনুসরণে ক্রমান্বয়ে দেশ-মানুষ-আদর্শ তথা রাজনীতি হারিয়ে ‘জাতীয় রাজনীতি’র নামে নিরেট ক্ষমতাসর্বস্ব রাজনীতি প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট লেঃ জেঃ হুসেইন মুহাম্ম এরশাদের ক্ষমতায়ন!

 

একটি রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে দেশের প্রশ্নে ক্রমান্বয়ে জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টে পরিণত হওয়ার বদলে ক্ষমতার অলিন্দে বসে আগে দল হয়েছে; তারপর বিভিন্ন লোভ-লালসা-ভয় তথা লিপ্সার পথ ধরে তাকে রাজনীতিকরণ বা জনগণসংশ্লিষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ দল গঠনে জনগণ নয়- ক্ষমতা, আর জনসম্পৃক্ততায় সংগ্রাম নয়- লোভ-লালসা। জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে জনগণের দল ও নেতা বা নেতৃত্ব তথা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা অথোরিটি হওয়ার সেই ‘যথার্থ রাজনীতি’র মূল শর্তটাই লুপ্ত হয়ে কেবল সিদ্ধান্ত নিয়ে জানালেই হলো- জনগণ সেখানে শ্রোতা এবং শ্রোতা থেকে দর্শক, অতঃপর ক্রমান্বয়ে জিম্মি। অর্থাৎ রাজনীতি জনগণকে মুক্তি না দিয়ে বরং মানুষকে আজ জিম্মি করে ফেলেছে। আর রাজনীতির এই বিপরীত বিষয়কেই রাজনীতি বলা হচ্ছে- অপরাজনীতিই এখন রাজনীতি হয়ে পড়েছে। একবার ক্ষমতায় গেলে জনগণ নয়, উল্টো জনগণ ও জনগণকে ঘিরে নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রতি আস্থা হারানো থেকে ক্ষমতায় টিকে থাকার যতো রকম হীন কারসাজী আছে- তার সব অপচেষ্টা চালায়। জনগণের জন্য রাজনীতি না হয়ে বরং ক্ষমতার জন্যেই রাজনীতি। ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা- সবক্ষেত্রে যেন ‘ক্ষমতা’ই শেষ কথা, ‘দেশ ও জনগণ’ কেবল কথার কথা।

 

অথচ বাংলার প্রথম অস্থায়ী জাতীয় সরকার বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি দক্ষ ও সফল জাতীয় সরকারের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল।

 

উল্লেখ থাকে যে, বিদেশের বিরুদ্ধে দুই প্রকার যুদ্ধ হয়-সশস্ত্র যুদ্ধ ও কূটনৈতিক যুদ্ধ। নিজ ভূখণ্ড বা জাতীয় সীমানায় চলে বিদেশী শাসন বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ আর সেই যুদ্ধকে জয়ের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন হয় কূটনৈতিক যুদ্ধে বিজয়। তৎসময়ে বহু দেশই তার স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত থাকলেও কূটনৈতিক যুদ্ধে হেরে যাওয়ার কারণে বিজয় লাভে ব্যর্থ হয়। যেমন, প্যালেস্টাইন দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে গেলেও এখনও দেশটির সরকার কূটনৈতিক যুদ্ধে পেরে না ওঠার কারণে নিজ ভূখণ্ডকে শত্রু মুক্ত করতে পারেনি।

 

এক্ষেত্রে বিশ্বের ইতিহাসে দু’টি দেশ প্রায় প্রবাদপ্রতীম হয়ে আছে। একটি ভিয়েতনাম, আপন ভূখণ্ড বা জাতীয় সীমানায় যে দেশটি সশস্ত্র যুদ্ধে মার্কিন পরাশক্তিকে পরাস্ত করেছিল। আর ১৯৭১- এ বাংলাদেশ, কূটনৈতিক যুদ্ধে চীন-মার্কিন পরাশক্তিকে পরাভূত করেছিল। আমরা ভিয়েতনামের কথা জানলেও নিজ দেশটির সেই প্রবাদপ্রতীম বিজয়কে জানি না। যদিও বর্তমান পৃথিবীতে সশস্ত্র যুদ্ধ বা সামরিক লড়াইয়ের চেয়ে ক্রমেই কূটনৈতিক (বৌদ্ধিক) যুদ্ধ বা পারস্পারিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অথচ বিশ্বের কূটনৈতিক ইতিহাসে আজও বিরল উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশই প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। স্বাধীনতার পূর্বে ভিয়েতনামকে প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করলেও, স্বাধীনতার পর কেউ যদি বলে ‘বাংলা হবে ভিয়েতনাম’, তবে বুঝতে হবে সে নিজের সাফল্যকে মূল্যায়ন করতে পারেনি; কারণ অগ্রসরমান কূটনৈতিক বিশ্বে বাংলাই বিস্ময়। অর্জিত সাফল্যের অবমূল্যায়ন সর্বদা অযোগ্যতাকে চিহ্নিত করে, সাফল্যকে রক্ষা করার পরিবর্তে তাকে অর্থহীন করে তোলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে ভিয়েতনামের স্বপ্নবিলাসীদের ভূমিকা এ সত্যকে মনে করিয়ে দেয়।

 

জাতীয় সরকারের প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে তাজউদ্দিন আহমেদ নিপুণ দক্ষতা ও ক্ষীপ্রতায় এই সরকারকে যেভাবে সমন্বিত ও একাট্টা করে জাতীয় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ, বিশেষতঃ বৈশ্বিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কমরেড মনি সিং, সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থানকে যেভাবে দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছিলেন- তা ছিল যুগান্তকারী। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো দেয়াতে পাকিস্তান-মার্কিন-চীন বারবার মুখ ধুবড়ে পড়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মার্কিনের যুদ্ধযাত্রায় প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ ঘোষণা ছিল তৎসময়ে বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণার সমার্থক।

 

স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী জাতীয় সরকার ‘আন্তর্জাতিক’ তথা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ককে বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে যথাযথ ব্যবহার করে বা যেভাবে খেলিয়ে নিতে পেরেছিল- চীন-মার্কিন তথা বিদেশী চাতুর্য, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী আর দেশীয় য়ড়যন্ত্রকে পরাভূত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছিল- তা দিয়েই মূলতঃ সফল ও দক্ষ জাতীয় সরকার হিসেবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

 

প্রথম জাতীয় সরকার ভেঙ্গে দেয়ার সে ভূল শোধরানোর চেষ্টায় সফল হওয়ার শর্তে জাতীয় অথেনটিকতায় কেবল বঙ্গবন্ধুই ছিলেন এবং সে উদ্যোগে ‘৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারি জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টের ঘোষণায় জাতীয় ঐক্য বা সংহতি প্রতিষ্ঠার ডাকও তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা প্রতিষ্ঠা বা ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌছানোর পূর্বেই ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই শর্ত অপূরিতই থেকে যায়। কিন্তু তা পূরণের সক্ষমতায় আর কেউ না থাকলেও ঘোষণা দিয়ে জাতীয় দল বা সরকার গঠনের রাজনৈতিক নকলনবিশতা জাতীয় রাজনীতিতে ঠিকই উঠে আসে।

 

জাতীয় সরকার গঠনে জাতীয় ফ্রন্ট বা দল অর্থে যে পথ-পদ্ধতিতে বাকশাল গঠিত হয়েছিল, সেই পথ-পদ্ধতির অনুসরণে একাধিক জাতীয় দল গঠিত হয়েছে এবং বাড়তি আরও কিছু যুক্ত হয়েছে যা কেবল বাকশালের নকল নয় বরং ক্রম-অবনয়নে আরও নিম্নমানের সংস্করণ। যদিও তা নৈরাজ্য বিরোধী জাতীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াতেই এসেছে।

 

১৯৭৫-এর জাতীয় সরকার পতন হলে- দেশ পাল্টাপাল্টি সামরিক ক্যু-এ অস্থিতিশীল নৈরাজ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধারাবাহিক এই নৈরাজ্যের মধ্যেই সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন।

 

অর্থাৎ বাকশাল গঠনের পথ-পদ্ধতির পুনরাবৃত্তির সাথে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাড়তি যা যুক্ত করলেন তা হলো ক্ষমতাসীন থেকেই একাধিক নতুন দল বা সরকারের ভাঙ্গা-গড়া, অদল-বদল ঘটলেও সরকার প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান সর্বদাই ক্ষমতায় বহাল থেকেছেন। ‘জনগণের গণতন্ত্র’-এর  কথা বললেও এর কোন সুস্পষ্ট রূপরেখা দেয়া হয়নি, বরং রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থার প্রতিই অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়- ‘জনগণ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি একাধারে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার নিশ্চিত রক্ষাকবচ।’ তাই জনগণ হয়ে ক্ষমতার পরিবর্তে ক্ষমতার জন্যে জনগণ- তাঁর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এই বিপরীত বা বৈপরীত্যপূর্ণ প্রবণতা যুক্ত হয়। অর্থাৎ রাজনীতিতে ‘শুরু’ থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন থাকার কারণে ক্ষমতাই ‘প্রধান’ হয়ে উঠে আর জনগণ অনুবর্তী শর্তে- ‘অপ্রধান’ হয়ে যায়।

 

১৯৮১ সালে সামরিক ক্যু-এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৮১ সালের ১৫ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

 

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ, জাতীয় অস্থিতিশীলতা বা নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ‘জাতীয় স্থিতিশীলতা’ বা সংহতি প্রতিষ্ঠার ‘ঘোষণা’ দিয়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

 

জিয়াউর রহমান জাতীয় ফ্রন্ট থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি থেকেই সেই জাতীয় ফ্রন্ট ভেঙ্গে দেন এবং তারপর  নতুন দল গঠন করেন- যা পরবর্তি নির্বাচনে জয় লাভ করলে যথারীতি তিনি দলীয় প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি থেকে যান। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আরও একধাপ এগিয়ে তাঁর গড়া জাতীয় ফ্রন্টকে সরাসরি ‘জাতীয় পার্টি’ নাম দিয়ে একটি দলে রূপান্তরীত করেন যা পরবর্তি নির্বাচনে জয় লাভ করলে যথারীতি তিনিও দলীয় প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি হন।

 

অর্থাৎ জাতীয় ফ্রন্ট দিয়ে নির্বাচন করে আবার তা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন দল গঠন করে নির্বাচিত হওয়ার পরিবর্তে জাতীয় ফ্রন্টকেই সরাসরি একটি দলে রূপান্তরিত করে নির্বাচিত হয়েছেন।

 

এক্ষেত্রে হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের সময় বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে পূর্বতন গণবিচ্ছিন্ন প্রবণতার সাথে যা বাড়তি যুক্ত হয়- ‘নির্বাচিত’ তথা জন-সংশ্লিষ্টতার প্রাতিষ্ঠানিকতা দ্বারা নিরুপিত সরকারকে সামরিক শক্তিবলে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে জনগণ হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের প্রাতিষ্ঠানিক দিকটাও ধ্বসে পড়ে। অর্থাৎ কেবল ‘শুরু’টাই পূর্বের ন্যায় জন-বিচ্ছিন্ন ক্ষমতার অলিন্দ থেকে নয় কিংবা মধ্যবর্তি প্রক্রিয়ায় জন-বিচ্ছিন্ন ঘোষণা কেন্দ্রীক রাজনীতিও নয় বরং পূর্বোক্ত দু’টি জন-বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক প্রবণতার সাথে বল প্রয়োগে বা ‘ক্ষমতা’ দ্বারা জনগণ বা জন-সংশ্লিষ্টতা বাতিল করার প্রাতিষ্ঠানিকতায়- রাজনীতি জনগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে বা জনগণ সংশ্লিষ্টতাকে মাড়িয়ে ‘নিরেট ক্ষমতা’র সমার্থক বা ‘ক্ষমতা সর্বস্ব’ হয়ে পড়ে।

 

সেই সাথে ক্ষমতাসীন থেকে একটি রাজনৈতিক দল গঠন এবং ক্ষমতাসীন অবস্থাতেই নির্বাচন মারফত উক্ত দলের জয়লাভের সাথে সেই দলেরই রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন কেন্দ্রীক অনাস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। দেশের বর্তমান রাজনীতিতে যে কোন সংকট সমাধানে তার প্রতিষ্ঠানিক দিকটাকে না খুজে কেবল সরকারে যাওয়া আসা ক্ষমতায় থাকা না থাকা তথা ক্ষমতা সর্বস্ব রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত। এমনকি নির্বাচন প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরিবর্তে তা কেবল সরকার অদল বদলের সাথে যুক্ত করে দেখাটাও এই ক্ষমতা সর্বস্ব রাজনৈতিক প্রবণতারই প্রকাশ।

 

সর্বপরি জাতীয় ফ্রন্ট হিসেবে উত্তরিত আওয়ামী লীগ সহ ঘোষিত জাতীয় ফ্রন্ট হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, জাতীয় পার্টি, এমনকি বাকশালও পরবর্তী দলীয় বা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বহাল থেকে যাওয়াতেই বোঝা যায় কি ধরণের ‘সংহতি’ তথা বস্তুগত ও মননগত স্থিতিশীলতায় দেশ এগিয়েছে! বিদেশ নির্ভর জাতীয় বাজেট সহ আর্থিক দিক বাদ দিলেও মননগত বা দেশজ বোধে, স্বাধীনতার এত বছর পরও এক ভাষার একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও যেখানে এগারো পদের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার মধ্য দিয়ে আজও জাতীয় নাগরিক বোধ গড়ে তোলার ‘কমন’ একটি শর্ত পূরন করতে পারেনি তাদের হাতদিয়ে জাতীয় সংহতি অনেক দুরের কথা। ব্যক্তিতত্ত্ব আর রাষ্ট্রতত্ত্বের পার্থক্য এদেশে ঘুঁচে যাওয়ার পথ ধরেই ক্ষমতা সর্বস্ব রাজনৈতিক যুপকাষ্ঠে দেশের মানুষ আজ দুটো পক্ষে বিভক্ত হয়ে গেছে। যেখানে নীতি আর যুক্তি তথা রাজনীতি নয় কেবল অন্ধ বিরোধিতাই ক্রমশঃ প্রধান হয়ে উঠেছে।

 

বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই মূলতঃ রাজনৈতিক মহানায়ক-এ রূপান্তরিত হয়েছিলেন, তাই নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের বেড়াজাল থেকে ইতিকর্তব্য সম্পাদনে এত দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারেননি। জাতীয় রাজনীতির অভিভাবকত্বে ‘জাতীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’য় একনায়কের ভূমিকা তো দূরের কথা, মহানায়কোচিত কাঠিন্যকেও আমলে নিতে পারেননি; তাঁর রাজনৈতিক মনস্কতায় নিজের অথেনটিকতা সহ জাতীয় বাস্তবতাও অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির অনিবার্য শর্ত যে দলীয় রাজনীতি, তিনি তার উর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তিনি ব্যক্তি অথবা কোনো দলের রাজনৈতিক নেতা আর ছিলেন না তেমনি- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ.এইচ. এম. কামরুজ্জামান মোটেই কোনো দলীয় নেতা ছিলেন না। তাই, দলীয় পদ-পদবী বা মন্ত্রিত্বে না থাকলেও জাতীয় রাজনীতির প্রতিভূ বলেই জাতীয় শত্রুরা তাঁদের ঠিকই বেছে নিয়েছিল। সরকার প্রধান হয়েও নিজের বাসভবন ছেড়ে গণভবন বা রাষ্ট্রীয় বাসভবনে না ওঠাকে অনেকে ঔদার্য হিসেবে দেখাতে চান- কিন্তু ইনস্টিটিউশনাল অথেনটিকতায় সেট গূণ নয় বরং দুর্বলতা। ব্যক্তি পর্যায়ে যা উদারতা, অনেক সময় সেটাই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়। এজন্যেই রাষ্ট্রতত্ত্ব ও ব্যক্তিতত্ত্বের তফাত আছে- কাঠামোগত বা ইনস্টিটিউশনাল অথেনটিকতায় যা খুশি তা-ই করাকে নয় বরং নৈর্ব্যক্তিকতাই সেখানে কাম্য থাকে।

 

জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের মূর্তরূপ বা অথোরিটি হিসেবে রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের ঐতিহাসিক দায়িত্বে ‘জাতীয় সরকার’-ই বঙ্গবন্ধুর জন্যে ছিল একমাত্র যথোচিত রাজনীতি। কারণ- ‘এক দেশ, একজাতি, এক নেতা’ হয়ে ওঠার শর্তেই অপরাপর রাজনৈতিক দলকে তাঁর সাথে না নিয়ে উল্টো নির্বাচনী প্রতিযোগিতার আহ্বান তথা নিজে রাজনীতিতে বহাল থেকেই বহুদলীয় গণতন্ত্র বা সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন এক ধরণের হাস্যকর বিষয় হয়ে ওঠে। যাঁর বিরল জনপ্রিয়তার সামনে পাকিস্তানী জান্তা মুখ থুবড়ে পড়েছে, সাড়ে সাত কোটি মানুষ একটি মানুষে একীভূত হয়েছে, দেশের স্বাধীনতা এসেছে আর স্বাধীন হওয়ার পরপরই অপরাপর দল ও দলীয় নেতাদের সাপেক্ষে সেই দেশের মানুষই তাঁকে একজন দলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে আর তিনিও যথারীতি বহুদলীয় বা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে কোনো একটি দলের দলীয় প্রধান হিসেবে সরকার গঠন করেছেন! ভাইয়ের সাথে ভগ্নিপতির মর্যাদা ও অভিভাবকত্ব এক কাতারে বিচার্য হলেও-পিতা ও ভগ্নিপতিকে এদেশের মানুষ যে এত দ্রুত এক কাতারে ফেলেনি, তা পরবর্তী নির্বাচনে মাত্র ৯জন বিরোধী দলীয় সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং সংসদীয় শাসনব্্যবস্থার কার্যকাতিাতেই স্পষ্ট হয়েছে।

 

অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যেমন নিজেকে ও নিজের পরিবারকে জাতীয় রাজনৈতিক চোখে চিনতে পারেননি, তেমনি জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের জাতীয় ফ্রন্ট হয়ে ওঠাকেও চিহ্নিত করতে পারেননি; এমন-কি জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক গুরুত্বকে অনুধাবন করতে পারেননি বলেই তাঁদের দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও অরক্ষিত করে ফেলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু না চিনলেও জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গ আর সে প্রাসঙ্গিকতায় জাতীয় শত্রুরা সেটা ভালোই চিনতো। তাই তাঁর সাথে সাথে রাসেলকে যেমন ছাড়েনি, তেমনি ঠান্ডা মাথায় ক্রমান্বয়ে অপরাপর নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছিল- কারণ, প্রসঙ্গটা কেবল নিছক হত্যাকা- ছিল না বরং তা ছিল জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে।

 

আওয়ামী লীগ জাতীয় রাজনৈতিক ধারার বাহক তথা বিকাশগত দিক থেকে জাতীয় ফ্রন্ট-এর রূপ পরিগ্রহ করলেও তা যেমন দলটির কাছে বিবেচ্য হয়ে ওঠেনি, উল্টো ৭৩-এর নির্বাচন মারফত তাকে দলীয় অবস্থায় নামিয়ে দেয়ার মধ্যে দিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্ধিতায় বা বিপরীতে একাধিক দল ও মতের প্রতিষ্ঠা দিয়ে বসে। জাতীয় রাজনীতির মূলধারা সময়ের পূর্বেই একাধিক দল ও মতে ভিন্ন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যেমন নিজেকে নিছক একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ট্রিট করেছে, তেমনি এর বিপরীতে যাঁরা ছিল তাঁরাও আওয়ামী লীগকে একটি দল হিসেবেই ট্রিট করে নিজেদের দলীয় রাজনীতিকে উক্ত দল বিরোধী রাজনীতি হিসেবেই দেখেছে । অর্থাৎ দলীয় অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগ ও তার বিরোধী অপরাপর দলসমূহ উভয়ই জাতীয় রাজনৈতিক ধারাটাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।

 

অথচ ৭৩-এর নির্বাচন মারফত বিরোধী মত ও দলের প্রতিষ্ঠা দিয়েও দলীয় সরকার হিসেবে পরমত সহিষ্ণুতা বা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে লালন করার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য রোধ তথা ‘জাতীয় সংহতি’র শর্তে বাধ্য হয়েছে বিরোধী মতকে দমন করতে, যা দলীয় বা বহু দলীয়  রাজনীতি তথা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে একেবারেই বেমানান, অর্থাৎ দলীয় পর্যায়ে নেমেও আর দলীয় থাকতে পারেনি। কাজ-কর্মে ‘দলীয় সরকার’ ও ‘জাতীয় সরকার’ কিংবা দলীয় সংস্কৃতি আর জাতীয় রাজনীতি কোনো ভেদাভেদই রাখতে পারেনি। তেমনি তার বিপরীতে অপরাপর দলসমূহ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন একটি দল হিসেবে বিরোধীতা করতে গিয়ে এমন অনেক রাজনৈতিক অভিধা উঠে আসে যা স্বাধীনতা পূর্ববর্তি সময়ে পাকিস্তানী রাজনীতি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিকে ধরাশায়ী করতে ব্যবহার করতো। যেহেতু জাতীয় রাজনীতির পরিণতি অর্থে আওয়ামী লীগই জাতীয় ফ্রন্ট হিসেবে গড়ে উঠেছিল বা জাতীয় রাজনীতির ধারক-বাহক হয়ে উঠেছিল, তাই দল হিসেবে আওয়ামী বিরোধীতায় পাকিস্তানী রাজনীতির রেখে যাওয়া অভিধাগুলোই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী বিরোধীতায় পুনরায় উঠে আসে। এভাবে জাতীয় রাজনীতি দলীয় রাজনীতিতে আওয়ামী ও আওয়ামী বিরোধী দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে যায় এবং উভয়ই জাতীয় রাজনৈতিক ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

 

এভাবে আওয়ামী লীগ জাতীয় রাজনৈতিক ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে ‘না-দলীয়’ ‘না-জাতীয়’ অর্থাৎ দল হিসেবে একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধীত্বের বৈশিষ্ট্য লাভ করে। জাতীয় রাজনীতির যা অর্জন- স্বাধীনতার ইতিহাস, ঐতিহ্য সবই তাঁদের দলীয় অর্জন হিসেবে আওয়ামী লীগ দেখাতে চায়। বিপরীতক্রমে, আওয়ামী বিরোধী ধারা জাতীয় রাজনীতি তথা মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার পথ ধরে আওয়ামী দলীয় বিরোধীতায় নামে এবং শেষ পর্যন্ত তা বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে চলে যায়। সেসময়ে এই সত্যটা  না বুঝলেও বর্তমানে তাঁদের এই সত্যটা নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হবে না কারণ আওয়ামী বিরোধী ধারায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা দলীয় রাজনীতির পথ ধরে আজ নিজের শ্রেষ্ঠ অর্জন অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে কুন্ঠাবোধ করেন। পাকিস্তানীদের কাছে যেমন মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়টা গৌরব বা শ্রদ্ধার নয় তেমনি নিজের জাতীয় সীমানায় দলীয় পথ ধরে নিজেদের জাতীয় রাজনৈতিক অর্জনটাও আর গৌরবের হয়না। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে যাঁরা জীবন বাজি রেখেছিল দলীয় রাজনীতির পথ ধরে আজ তাঁরাই এটাকে এড়িয়ে চলেন- এমনকি উত্তর প্রজন্ম একে জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের মৃত্যুঞ্জয়ি ধ্বণি হিসেবে না জেনে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবে চিনছে!

 

উল্লেখ্য, জাতীয় ফ্রন্ট তথা জাতীয় সরকার বা জাতীয় দল হিসেবে ঘোষিত কোনো দল গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়া মাত্রই লুপ্ত ঘোষিত হয়। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন সেই দলের বিপরীতে গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী কোন দল বিরোধিতায় যায়, তখন তা জাতীয় বিরোধিতার অর্থে প্রতিফলিত হতে থাকে। অর্থাৎ জাতীয় শত্রুদের ‘কর্ম ও কণ্ঠে’র সাথে এই বিরোধিতার পথ ধরে ক্রমশঃ তাদের পার্থক্য ঘুচে যেতে থাকে- সমগ্র জাতি বিভ্রান্ত ও বিভক্ত হয়ে পড়ে, প্রতিক্রিয়াশীলরা বেঁচে যায়, অস্তিত্বের সংকট কেটে যায়। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতি অনুসারে যে দলটি বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়, প্রতিক্রিয়াকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য তাকে দায়ী করা যায় না বরং যে দলটি জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টে উত্তরিত হয়েও দলীয় রাজনীতিতে থেকে যায়, দায়টি তার কাঁধেই বর্তায়। তুলাদণ্ডের দুই পাল্লায় যা-ই থাকুক, তা সমান মানকেই প্রতিফলিত করে। জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্ট হয়ে ওঠা একটি দল পুনরায় দলীয় রাজনীতিতে ‘দল’ হিসেবে টিকে থাকলে- জাতীয় রাজনৈতিক নিক্তিতে তা প্রতিক্রিয়ারই সমার্থক হয়ে ওঠে।

 

এভাবে দলীয় রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির পার্থক্য না বুঝলে কিংবা রাজনীতিকে যথার্থ রাজনীতি হিসেবে না দেখলে শেষ পর্যন্ত তা আত্মঘাতি হয়ে ওঠে- ঐতিহাসিক দল হলেও মুলতঃ ইতিহাস বিকৃতির বাহক হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রসঙ্গটাও আজ এরকমই একটি প্রসঙ্গ। এভাবে যেকোনো রাজনৈতিক কর্মই তাৎক্ষণিকভাবে নিজেরা না বুঝলেও সেটা ইতিহাসে ধরা থাকে আর উত্তর প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ঠিকই পোঁছে দেয় ‘কোনটা দেশের ছিল আর কোনটা দেশজ নয় কিংবা কোনটা রাজনীতি আর কোনটা রাজনীতি নয়’!

 

তথ্য সূত্রঃ

মার্চ ফর বাংলাদেশ, প্রকাশ সাল- ১৯শে নভেম্ব ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ। 



ক্রমিক
শিরোনাম
তারিখ
১০
জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা ২০১৯-০৮-২৩
ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই ২০১৯-০৮-২৩
জাতীয় শোক দিবস- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ২০১৯-০৮-১৫
স্বাধীনতার ইতিহাস একটি দেশের ইতিহাস- কেবল একটি দল বা পক্ষের ইতিহাস হতে পারে না ; সেটা হলে গণতন্ত্র স্থগিত হয়ে পড়ে। সুতরাং ফাল্গুনের অগ্নিভ উচ্চারণে ছিলো- অ আ ক খ আর ২৬শে মার্চ অগ্নিঝরা ঘোষণায় আজ- March FOR BANGLADESH! নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব দল নিয়ে (বর্তমানে নিবন্ধিত দল ৪০টি) জাতীয় পরিষদ গঠন করতে হবে এবং উক্ত ৪০ দল নিয়ে গঠিত জাতীয় পরিষদকেই অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকারের (তত্ত্বাবধানগত ভূমিকায় Suo Motu Government ) ঘোষণা দিতে হবে। ২০১৯-০৬-১৭
মহান মে দিবস উপলক্ষে মুক্তিজোট- এর পক্ষ থেকে সবাইকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা। ২০১৯-০৫-০১
প্রথম অস্থায়ী জাতীয় সরকার ও তার কর্মপ্রবাহের পরিণতি-ই আজকের সার্বভৌম বাংলাদেশ ২০১৯-০৪-১৭
স্বাধীনতার ইতিহাস একটি দেশের ইতিহাস- কেবল একটি দল বা পক্ষের ইতিহাস হতে পারে না ; সেটা হলে গণতন্ত্র স্থগিত হয়ে পড়ে। সুতরাং ফাল্গুনের অগ্নিভ উচ্চারণে ছিলো- অ আ ক খ আর ২৬শে মার্চ অগ্নিঝরা ঘোষণায় আজ- March FOR BANGLADESH! নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব দল নিয়ে (বর্তমানে নিবন্ধিত দল ৪০টি) জাতীয় পরিষদ গঠন করতে হবে এবং উক্ত ৪০ দল নিয়ে গঠিত জাতীয় পরিষদকেই অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকারের (তত্ত্বাবধানগত ভূমিকায় Suo Motu Government ) ঘোষণা দিতে হবে। ২০১৯-০৩-২৬
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনঃ জাতীয় শিশু দিবস। ধর্মের জন্যে আছে ঐশী গ্রন্থ- বেদ, বাইবেল, আল-কোরান; দেশ ও রাজনীতির জন্যেও তেমনি গুরুত্বে আজ ইতিহাস! অতএব ইতিহাস কথা কও. . . . . . ২০১৯-০৩-১৭
৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্ব স্বীকৃতির পথ ধরে এখন বৈশ্বিক! ২০১৯-০৩-০৭
বিচার বিভাগের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে ২০১৯-০২-২১

previous12345next