[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

ফিরে দেখা বার বছর

 

 

 

 

 

 

 

 

ফিরে দেখা- ১২ বছর

 

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট প্রতিষ্ঠার দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদযাপন সায়াহ্নে ‘ফিরে দেখা ১২ বছর’-এ সবাইকে হৃদ্স্পন্দিত শুভ্র অভিনন্দন ।

 

অহিংস পথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেয়ার লক্ষ্যে ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত’ ঘোষণায় ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’ ২৪শে নভেম্বর ২০০০ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠার দ্বাদশ বর্ষ পেরিয়ে এসেছে । সহস্রাব্দের যুগসন্ধিতে উচ্চারিত উক্ত ঘোষণায় নির্দিষ্ট তিনটি পর্যায়ের মধ্যে, প্রথম পর্যায়- সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-এর পথ ধরে ২৪শে নভেম্বর, ২০১২ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছে পূর্বঘোষিত দ্বিতীয় পর্যায়- রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন । সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষিত ছিল ‘সংগঠন গড়ে তোলা’ । দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় তথা জাতীয় জীবনে ‘সংহতি গড়ে তোলা’

 

প্রতিষ্ঠার যুগপূর্তিতে বিগত ১২ বছরের মহান সংগ্রামী পথচলার অভিজ্ঞান ও তার পরিণতি অর্থেই বর্তমান সংগঠন । প্রতিষ্ঠার পূর্বেও যেমন ছিল প্রাক-প্রতিষ্ঠা বা প্রস্তুতি পর্ব এবং প্রতিষ্ঠার প্রথম পথচলায় যেমন থাকে প্রস্তুতি পর্বের অভিজ্ঞান, তেমনি সাংগঠনিক দ্বিতীয় পর্যায়ের পথচলাতেও থাকবে প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতা । অতএব, সংগঠন পরিকাঠামো তথা গঠনতন্ত্রের ভূমিকায় উল্লিখিত দিশা অনুসারে স্পষ্টতঃই ২৪শে নভেম্বর, ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেও ছিল প্রাক-প্রতিষ্ঠা পর্ব বা প্রাক-প্রস্তুতি পর্ব ।

 

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই পথচলা?

 

১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২রা নভেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাস (DUS), স্বল্প আয়তনের ত্রিভুজ প্রাঙ্গণে বিকেলের পড়ন্ত আলো; শান বাঁধানো বেঞ্চির ধার ঘেঁষে পাঁচ/সাত জন বন্ধু, বড়দা (এ আর শিকদার- আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্ রাজু শিকদার)’র ব্যক্তিগত জীবন প্রাসঙ্গিক আলাপচারিতায় উঠে এসেছিল নৈর্ব্যক্তিক কিছু সত্য । বিশেষতঃ নেশা, হিংসা সহ তৎসময়ের যাবতীয় ‍দিক্ ভ্রান্তির চিহ্নগুলো যেভাবে ফেটে বেরুচ্ছিল-জাতীয় জীবনে জেঁকে বসা ক্রম-অবক্ষয়ের প্রত্যক্ষ শিকার তরুণ প্রজন্ম, বিশেষতঃ ছাত্র-তারুণ্যের মধ্যে এবং তা গতানুগতিক-প্রাত্যহিক প্রসঙ্গ হলেও সেটা যখন বড়দা’র মুখে নিজেদের জীবনের মধ্যে উক্ত বিষয়গুলো যতো প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত হয়ে উঠছিল; তাতে তাঁর একান্ত উপলব্ধিগুলো, শুধু তাঁর না থেকে সবার বুকের মধ্যে অনাগত দেশ, কাল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জীবনটা অস্তিত্বহীনতায় কেঁপে উঠেছিল । আমরা কেমন আছি? নিজেদেরকে প্রথমবারের মতো জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেমন থাকতে চাই- সে প্রশ্নটাও তখনি যেন প্রথম শোনা এবং সব উত্তরের সাথে দেশ কোথায় যাচ্ছে, তা জড়িয়ে যাচ্ছিল । সবচেয়ে গতানুগতিক, সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক-পুরনো আর প্রাত্যহিক হলেও সেদিন মনে হয়েছিল এই কথাগুলো জীবনে প্রথম শোনা-প্রথম জানা, নতুন করে প্রথম দেখা। বিশেষতঃ সবার সাথে, দেশের সাথে আমাদের থাকাটা শেষ পর্যন্ত যে সত্যকে তুলে এনেছিল, তারই পরিণতি হিসেবে বেরিয়ে এসেছিল ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’ গঠনের প্রাথমিক প্রস্তাবনা। শুরু হয়েছিল স্পর্ধিত পথচলা- যেখানেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশী মানুষের স্পন্দন- সেখানেই ‘মুক্তিজোট’ এবং যেখানেই দেশ ও দেশাত্মবোধের দুর্বিনীত আকর্ষণ-সেখানেই ‘সংগঠন’। সর্বোপরি যেখানেই মাটি ও মানুষের মুক্তি-আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত ‘তারুণ্য’, সেখানেই আমরা পৌঁছে যাবো- সঙ্ঘবদ্ধতা আর সংগ্রামের আহ্বান নিয়ে।

 

স্বল্প-আয়তনের ত্রিভুজ প্রাঙ্গণে উত্থাপিত সেই প্রাথমিক প্রস্তাবনার অঙ্কুরোদ্গমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমশঃ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইডেন কলেজ, ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, রাজবাড়ী সরকারি কলেজ, বগুড়া

সরকারি আযিযুল হক কলেজ, ময়মনসিংহ সরকারি আনন্দমোহন কলেজ, শেরপুর সরকারি কলেজ সহ অপরাপর বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে প্রাক-প্রতিষ্ঠা বা প্রস্তুতি পর্ব চলতে থাকে ।

 

এই আলোচনার পূর্বে, সংগঠন-কাঠামো প্রসঙ্গে (১২+৩=) ১৫ বছর পর কিছু আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে । কারণ, ২০০১ থেকে অদ্যাবধি পাঁচটি ‘জাতীয় সাংগঠনিক রিপোর্ট’ সহ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সাংগঠনিক পের্পাস্ মারফত মতাদর্শিক বিশ্লেষণের সাথে পরিচয় থাকলেও মতাদর্শিক দিশা এবং ‘সংগঠন-কাঠামো’-এর পারস্পরিক সম্পর্ক সহ প্রেক্ষিত ও বিকাশ প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়নি । কেবল প্রায়োগিকতায় গিয়ে যে অভিজ্ঞানগুলো, তা-ই বিভিন্ন পের্পাস্-এ প্রকাশ পেয়েছে । অর্থাৎ ঘোষিত ‘যতোটুকু বিকাশ, ততোটুকু প্রকাশ’-এর নীতি অনুসারে সংগঠন বিস্তারে নিতান্তই প্রয়োজন ভিত্তিক আলোচনাই মূলতঃ প্রকাশ পেয়েছে । কারণ- ১৫ বছর পূর্বে অনেক কিছুই নিরেট তাত্ত্বিক চেহারায় জটিল হয়ে ওঠার ভয় ছিল, যা সংগঠন বিস্তারের বদলে সংগঠনের মধ্যে এক ধরণের মেদবহুল বাগাড়ম্বরপূর্ণ অলসতার পথ খুলে দিতে পারতো । কিন্তু আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতা সহ দীর্ঘ অনুশীলনের পথ ধরে সেটা ধরতে ও বুঝতে অনেক সহজ হবে ।

 

মুক্তিজোট কী? -এ সম্পর্কে বহু কথাকে এককথায় প্রকাশ করলে হবে- ‘মুক্তিজোট’ সুনির্দিষ্ট মতাদর্শিক দিশার ‘প্রায়োগিক’ ফল । অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’ একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক সংগঠন এবং যার সংগঠন-কাঠামো স্বতন্ত্র ।

 

উল্লেখ থাকে যে, ভাবাদর্শিক দিশা বা মতাদর্শ একটা বিষয় এবং কাঠামো আরেকটা বিষয় । উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অচ্ছেদ্য হলেও একই সাথে পার্থক্যও রয়েছে । সে প্রসঙ্গে কিছুটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ।

 

 

‘সংগঠন-কাঠামো’- এর পারস্পরিক সম্পর্ক সহ প্রেক্ষিত ও বিকাশ প্রাসঙ্গিক কিছু কথাঃ

 

বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে সংগঠন-কাঠামোর আলোচনা মূলতঃ কেন্দ্রীভূত সংগঠন-কাঠামো তথা সারগতভাবে কর্তৃত্বতাড়িত সংকট ও প্রতিবাদ থেকেই উদ্ভূত । রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতিবাদ হিসেবেই রাষ্ট্রচিন্তায় একসময় নৈরাষ্ট্রবাদ বা নৈরাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটেছিল । সমাজ-রাষ্ট্র তথা যে-কোনো প্রতিষ্ঠানবদ্ধতার প্রশ্নে পৃথিবীতে কম-বেশি সংগঠন-কাঠামো আলোচিত হলেও রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অনিবার্যতার দাবি নিয়ে প্রথম উঠে আসে- সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ সমাজতান্ত্রিক বলয়ের ভাঙন পরবর্তী সময়ে । কারণ, বৈশ্বিক ট্যাঁসাটেঁসি বা ঠান্ডা যুদ্ধ (Cold war) কিংবা শক্তির ভারসাম্য ইত্যাদি বহুবিধ শব্দের আড়ালে বিশ্বশান্তির বিপরীতে- অস্ত্র ব্যবসায়, আধুনিক সেনা ও সমরাস্ত্রে মূলতঃ রাষ্ট্রীয় শক্তিকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং আদর্শগত দিক থেকেও চরম নির্লজ্জ হয়ে পড়া বিশেষতঃ জাতিসংঘে অগণতান্ত্রিক ভেটো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, যা বর্তমান বিশ্বের বহুলসমর্থিত তথাকথিত গণতান্ত্রিক ভাবধারার সাথে তো যায়-ই না, এমন-কি জাতিসমূহের ঐক্য বা সমন্বয়ের যে লক্ষ্য থেকে জাতিসংঘ গঠিত, ঠিক তার বিপরীত ভাবার্থকে প্রকাশ করে । তবুও তথাকথিত শক্তির ভারসাম্যতার জুজু দ্বারা তা গড়ে ওঠা ও টিকে থাকলেও, সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া ভাঙন পরবর্তীতে পূর্বের অবস্থা চলতে থাকায় প্রমাণ করে, সংকট ও সমাধানে পূর্বোক্ত যুক্তিগুলো ছিল এক ধরণের জুজু বা বানোয়াট ভয়।

 

কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর অচল-অপ্রকৃতস্থতা বা সংকট ও তার অসংলগ্নতাগুলো কেবল কোনো একক রাষ্ট্রের নয় বরং তা বৈশ্বিক, তাই তার সমাধানের সাথেও অনিবার্যভাবে বিশ্ব জড়িয়ে আছে । এবং সে সমাধানটা পৃথিবীর কাছে সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষিত হলেও এখন পর্যন্ত তা অজানা, অনির্দিষ্ট বা উত্তরহীন এক প্রশ্ন হয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে ।

 

এমনি একটা তথ্যসূত্র পাই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গরবাচেভের লেখায়, যিনি বিশ্বকাঁপানো সংকটের স্মারক হিসেবে বহুল পরিচিত । সংকটের সাক্ষী হিসেবে তাঁর একটি বয়ান ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে ৮ই জুলাই, ২০০৮ (আই.এইচ.টিতে প্রকাশিত ইংরেজির ভাষান্তর) সালে প্রকাশিত “আমার দেখামতে...আজও আমি একই ধরণের, এমন-কি আরও বড় ধরণের সমস্যা দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ভূমিকাটা পাল্টে গেছে...মনে হচ্ছে যেন

 

ঠান্ডা যুদ্ধ এখনও চলছে...ঐতিহাসিকভাবে কেবল সাম্রাজ্যই নিজেকে নিরাপদ রাখায় মাত্রাতিরিক্ত সাজসজ্জা নিত...সমাধানের জন্য আমাদের আরও গভীরে তাকাতে হবে । ‘আনুভূমিক’ বিস্তার আরও খারাপ পরিণতি পাবে, যদি না ‘উলম্ব’ সমস্যাগুলোর সমাধান করি”।

 

এক্ষেত্রে অখন্ড বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক রূপকল্প কিংবা অখন্ড বৈশ্বিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব না দেখা গেলেও, রাষ্ট্র-জাতি নির্বিশেষ অখন্ড বিশ্বের কোনো সংকট প্রসঙ্গে ‘অনুভূমি’‘উলম্ব’ তথা কাঠামোগত চিত্রকল্পের পরস্পর সম্পর্কিত ‘দুই ইডিয়ম (Idiom)’ বা প্রত্যয় ঠিকই বেরিয়ে আসছে । বলা ভালো, অখন্ড বিশ্ববোধ, এমন-কি ‘বিশ্ব নাগরিক’-এর ভাবগত প্রত্যয় (রাষ্ট্র না থাকলে ‘নাগরিক’ হওয়া যায় কীভাবে?) ইতোমধ্যে বহুল ব্যবহৃত । অর্থাৎ বৈশ্বিক অখ- বোধ বা ‘বিশ্বনাগরিক’ তথা বৈশ্বিক রাষ্ট্রকল্পের ভাবনা কেবল পুরনো হয়ে গেছে তা-ই নয়, বরং ইতোমধ্যে তা সংকট সমাধানের অনিবার্য দাবি হয়ে উঠছে।

 

বিষয়টাকে সহজ করার জন্য একটি সাধারণ দৃষ্টান্তে গাণিতিক ঐকিক নিয়মের আশ্রয় নেয়া যাক, ‘একশ জন লোকের খাদ্য পরিবেশন করতে যদি দশ জন খাজিনদার লাগে, তাহলে এক হাজার লোকের জন্য কতোজন খাজিনদার প্রয়োজন? কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সকল জনপদের তথা ষোল কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব অর্থে যদি তিনশ’ জন (নির্বাচিত) সংসদ সদস্য থাকেন, তবে সমগ্র বিশ্বের সকল জনপদের প্রায় সাতশ’ কোটি মানুষের জন্য কতোজন জনপ্রতিনিধি লাগবে?’ বলাবাহুল্য, এই ঐকিক নিয়মের সহজ সুরাহাই বড় কঠিন আর অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছে । যদিও প্রতিটি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের নিয়ে বর্তমান জাতিসংঘ চলছে এবং অখন্ড বিশ্ববোধের কাঠামোগত বাস্তবায়নের উপমায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আঞ্চলিক মিলমিশকেই সম্ভাব্য অখন্ডতার দৃষ্টান্তে টানা হচ্ছে । এক্ষেত্রে মতাদর্শভিত্তিক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তথা সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত আদল না থাকায় কেবল রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে ওঠার কারণে টানাপোড়েন যেমন তার বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত হয়ে পড়েছে, তেমনি যথার্থ কার্যকর বা অখন্ডতা বলতে যা বোঝায়, তা মুখ্যত অধরাই থেকে গেছে। মোটকথা- জাতি-জনপদ তথা মানবীয় সমাহারপুঞ্জের সংবদ্ধ রাখার দৃষ্টান্তে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ার পর, সবেধন নীলমনির দৃষ্টান্তে থাকা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান হাল দেখে স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান হয় যে, অদ্যাবধি পৃথিবীর ইতিহাসে না-দেখা অখন্ড বিশ্ববোধের কাঠামোগত রূপরেখা কেমন হতে পারে- সে প্রশ্ন অমীমাংসিতই রয়ে গেছে ।

 

অমীমাংসিত এই সংকটের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি পাই, কফি আনানের ‘পরিবর্তন অথবা ধ্বংস’ নামক একটি লেখায়, “আমরা এখন নিশ্চিত জানি- কোনো দেশ, তা যতোই ধনী, শক্তিশালী হোক না কেন- বিশ্বায়নের শক্তিকে কারও একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় । এ-সময়েই আমরা বুঝেছি, এ-প্রক্রিয়ার ঝুঁকি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উপযোগী নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও আমাদের হাতে নেই । ...নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই । আমাদের এখন একসঙ্গে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই... তার জন্য চাই বিপ্লবী, কার্যকর ও বৈশ্বিক মতৈক্য । ...আর্থিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রমাণ করছে, বর্তমান ব্যবস্থায় শান্তি ও সমৃদ্ধি কোনোটাই আসবে না । বর্তমান কাঠামোগুলো এর জন্য অনুপযুক্ত । এগুলি দিয়ে আগামীকালের তো দূরের কথা, আজকের সমস্যাই কাটানো সম্ভব নয় ।” (৪ঠা ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ খ্রিঃ, দৈনিক প্রথম আলো । মূল প্রবন্ধ ‘Time of Crisis and Opportunity, posted on 27 January, 2009, Gulf News) ।

 

ফলে, সমকালীন দুনিয়ার সংকট সমাধানে মতাদর্শগত দিকের সাথে অচ্ছেদ্য হয়ে পড়েছে আজ কাঠামোগত দিকের সমাধান বা দিশা এবং সেক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সদিচ্ছা বা স্বার্থগত তথা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত ইচ্ছানির্ভরতা দিয়ে যে চলবে না, সেটা নিশ্চিত । আর তাই সংকট সমাধানে কাঙ্ক্ষিত সে ভাবাদর্শকে গ্রহণযোগ্যতার নিক্তিতে হতে হবে নৈর্ব্যক্তিক অর্থাৎ অনিবার্যভাবেই বিজ্ঞাননিষ্ঠ । ফলে, যথার্থতা নিয়ে বর্তমান দুনিয়ার জন্য আজ আর কোনো ভাবাদর্শ নেই- তাই কাঠামোগত দিশার বিষয়টা অবান্তর।

 

সর্বাগ্রে মনে রাখতে হবে, যখন কোনো সংগঠন সমাজ বদলের কিংবা নতুন বা পাল্টা ধারার ডাক দেয়, তখনই সমাজতাত্ত্বিক-রাষ্ট্রতাত্ত্বিক একটা প্রশ্ন এসেই পড়ে, ‘আপনারা বদল চাচ্ছেন- ভালো কথা, কিন্তু সমাজবদলের জন্য

 

একটা আদর্শ চাই, আপনার আদর্শটা কী?’ বলাবাহুল্য, এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে অন্তত সমাজতত্ত্ব-রাষ্ট্রতত্ত্বের বিন্দুমাত্র জ্ঞান-গম্যি থাকা মানুষদের কাছে কথাটা বাজে কথার ফুলের চাষ বা হাস্যকর হয়ে ওঠে কিংবা অন্য অর্থ বহন করে ।

 

কারণ, সুনির্দিষ্ট আদর্শ বা মতাদর্শ ছাড়াও আন্দোলন-সংগ্রাম হয় এবং প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামই সেরকমই । অবশ্য সেই আন্দোলন-সংগ্রাম গুলোকে দফা বা দাবিভিত্তিক আন্দোলন বলা যায়, বিক্ষোভ বলা যায়, সরকারবদলের সংগ্রাম বলা যায় । কিন্তু তাকে সমাজবদলের সংগ্রাম বলা যায় না । যেমনঃ আরব-আমেরিকা থেকে প্রায় কম-বেশি সারা বিশ্বেই- তরুণদের হাত ধরে দেশে দেশে প্রতিবাদে মানুষেরা ফুঁসে উঠছে এবং এতে অনেক ওলট-পালট কান্ড ঘটেছে, কিন্তু মূলগত অর্থে এটা কোনো বদল আনতে পারেনি বা পারে না কিংবা সমাজবদলের সংগ্রামও একে বলা যায় না । সদিচ্ছাতাড়িত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-বিক্ষুব্ধতা আর প্রকৃত বদল বা সমাজবদলের সংগ্রাম এক নয়।

 

তবুও সব প্রতিবাদই কোনো না কোনো বার্তাকে প্রকাশ করে । এদিক থেকে অখন্ড বিশ্ব বোধ প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথে আজ কতোটা বাস্তব হয়ে উঠছে, এই আন্দোলন সেটাই প্রকাশ করেছে । অর্থাৎ মতাদর্শ ভিত্তিক না হয়েও (ইতোপূর্বে কেবল কমিউনিজম বা অপরাপর মতাদর্শভিত্তিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেই সাধারণত আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটেছে) যে-কোনো প্রকার ছোটখাটো জাতীয় ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনও আজ আর জাতীয় সীমারেখা মানছে না । বিপরীতক্রমে, মানচিত্রবদ্ধ জাতীয় ভাবাদর্শ ভিত্তিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো কতোটা অসহায়-অথর্ব অর্থাৎ প্রচলিত অর্থেই সংহতকরণের হাতিয়ার বা যন্ত্র হিসেবেই যে রাষ্ট্র বা তার কার্যকারিতা স্বীকৃত-সংজ্ঞায়িত, সেক্ষেত্রে তা কতোটা বিকল বা সেকেলে হয়ে পড়েছে- বর্তমান পৃথিবীর কাছে সেটাই নতুন বার্তা এবং ‘অখন্ড বিশ্ববোধে’র বিজ্ঞাননিষ্ঠ কোনো মতাদর্শ ছাড়া এই বিক্ষোভ বা সংকটের সমাধান নেই, সেটাও আরও স্পষ্ট হচ্ছে- যখন কোনো এক দেশ থেকে শুরু হওয়া ছোট-খাটো বিষয়েই বিক্ষুব্ধ মানুষের ফুঁসে ওঠা দ্রোহ একই সময়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে এবং ইতোমধ্যে আর্থিক মন্দায় পৃথিবীতে যে দৃষ্টান্ত পরিগ্রহ হয়েছে, তদুপরি এই আন্দোলনের বৈশ্বিক চেহারায় হাজির হওয়াটা প্রমাণ করছে ক্রমশঃ এই ঘটনা আরও দ্রুত লয়ে বারবার ঘটতে থাকবে- যথারীতি বৈশ্বিক নৈরাজ্য ও বিপর্যয়ের চেহারা নিয়ে । এটাই স্বাভাবিক, কারণ মানবসমাজের ইতিহাসে দীর্ঘক্ষণ প্রতিবাদহীন মানুষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি । জীবিতদের জীবনের প্রয়োজনে এগিয়ে যেতেই হয় ।

 

বিশ্বের এই মতাদর্শিক সংকট সমাধানে এগিয়ে আসা যে-কোনো বিজ্ঞাননিষ্ঠ ভাবাদর্শকে তাই ‘অখন্ড বিশ্বের’ কাঠামো তথা সর্বাগ্রে জাতি-রাষ্ট্র-জনপদ ইত্যাদি (যে নামে বা অভিধায়ই থাক না কেন) যে-কোনো প্রকার ‘মানবীয় সমাহারপুঞ্জ’কে ‘সংবদ্ধ’ রাখার কাঠামোগত দিকের সমাধান করতে হবে ।

 

উল্লিখিত বৈশ্বিক প্রেক্ষিত ও বাস্তবতাগুলো পৃথিবীতে এত স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠার প্রায়- ১৫ বছর পূর্বে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের জন্ম ।

 

শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, “ভাবাদর্শিক দিশা বা মতাদর্শ একটা বিষয় এবং কাঠামো আরেকটা বিষয় । উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অচ্ছেদ্য হলেও একই সাথে পার্থক্যও রয়েছে ।”

 

মতাদর্শ ও কাঠামোর পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্টতার নিমিত্তে এ প্রাসঙ্গিক অতীত দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, সমাজ স্বাভাবিক ধারায় বিবর্তিত বা পরিবর্তিত হলেও মানুষের হাত ধরে তা পরিবর্তিত হতে পারে- এই ধারণা মার্কসীয় ভাবাদর্শিক পথ ধরেই লেনিনীয় দিশায় পৃথিবীতে প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ জায়গা জুড়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে তা প্রতিষ্ঠিত হয় ।

 

যদিও মতাদর্শভিত্তিক গড়ে তোলা সেই সমাজব্যবস্থা ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে- সেদিক থেকে তা এখন অতীত হলেও আজকের পৃথিবীতে আদর্শ ভিত্তিক কোনো মানবীয় সমাজ বিনির্মাণ প্রাসঙ্গিকতায় তা একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, আরও স্পষ্ট করে বললে- ল্যাব বা পরীক্ষাগারে রাখা নিরীক্ষণ বা পোস্টমর্টেমের জন্য একমাত্র ‘ডেডবডি’ । বিশেষতঃ, হাজার হাজার বছর সমাজ বিবর্তনের ধারায়-বর্তমান পৃথিবীতে মানবীয় কৃৎকৌশলে সৃষ্ট অপেক্ষাকৃত অগ্রগামী সমাজ বিনির্মাণ প্রাসঙ্গিকতায় ওটাই মানুষের সচেতন প্রচেষ্টার স্পষ্ট আদলপ্রাপ্ত প্রথম আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্র তথা পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত

 

সমাজ-রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত । আর এ-কারণেই সমাজতান্ত্রিক সমাজের পক্ষ-বিপক্ষ, পছন্দ-অপছন্দ নির্বিশেষ প্রত্যেক সমাজ গবেষকের কাছেই প্রথম প্রকল্প অনুবৎ মনুষ্যসৃষ্ট মানবসমাজ হিসেবে যেমন তা প্রাসঙ্গিক, তেমনি তা টিকে না থাকলেও বৌদ্ধিক বা ভাবাদর্শিক ক্ষেত্রে দুনিয়ার মানুষকে বহুভাবে এগিয়ে দেয়ার উর্বর ক্ষেত্র ।

 

যেমন, অখন্ড বিশ্ববোধ বহু পুরনো হলেও ভাবাদর্শিক দিক থেকে সমাজতান্ত্রিক ডাক ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ ও তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- যা হতে অখন্ড বিশ্ববোধ ও তার প্রতিষ্ঠার প্রথম বস্তুগত ভিত্তি মানুষের হাতে এসে পড়ে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় সমগ্র পৃথিবীর ‘কমন শত্রু’ ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক প্রাধান্যে বিজয় লাভ, যা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষের হাফ ছেড়ে বেঁচে ওঠার মধ্য দিয়ে- মনন ও চিন্তায় বৈশ্বিক নাগরিক বোধের স্বাভাবিক উন্মেষ বা প্রত্যয়গত পরিণতি লাভ করে । সোভিয়েতের পতনের সাথে সাথে বিশ্বনাগরিক-বোধের পতন না ঘটে বরং প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথ ধরে দিনকে দিন তা এগিয়ে গেছে এবং বর্তমানে তা অনিবার্য হয়ে উঠছে । যদিও তা যেমন সমাজতান্ত্রিক বা মার্কসীয় ধারা থেকে উৎসারিত নয়, তেমনি সে বোধের এ-অগ্রগায়ন মার্কসীয় পথে ফেরাকেও প্রকাশ করে না । তবুও সেই ফ্যাসিজম-বিরোধী যুদ্ধজয়ই মূলতঃ বৈশ্বিক মননে ভাবাদর্শিক পথ ধরে সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে স্থায়ী ভিত দেয় অর্থাৎ ভাবাদর্শিক দিশায় বা দার্শনিক লক্ষ্যনিষ্ঠতায় তথা মানবীয় কৃৎকৌশলে সৃষ্ট প্রথম সমাজ, তা পরবর্তীতে টিকে থাক আর না থাক, তা যে গড়ে তোলা যায়- সেটা প্রমাণনিষ্ঠতা পায় অর্থাৎ বিজ্ঞাননিষ্ঠ হয়ে ওঠে । সর্বোপরি, যে বিষয়টা বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও সকল মানুষকে আন্দোলিত করে, তা হলো- ইতিহাসে উক্ত সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে গড়ে তোলা যে রাষ্ট্রিক রূপ বা উক্ত সমাজ সংহতকরণের হাতিয়ার হিসেবে যে রাষ্ট্রিক কাঠামো, তার শক্তিমত্ততা ও যথার্থতার প্রমাণ ।

 

কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এটি ছিল কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো- যা প্রথম মহামতি ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের হাত ধরে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার’ তাত্ত্বিক অভিধায় তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন-কাঠামো হিসেবে প্রায়োগিক রূপ লাভ করে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের সংগঠন-কাঠামোই পরবর্তীতে অধিকতর সংহত রূপ নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর চেহারায় আসীন হয় ।

 

এক্ষেত্রে যেটা জরুরি বিষয়, কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় কাঠামো মোটেই নতুন নয় বরং রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রতত্ত্ব বলতে এ-যাবত যা পৃথিবীতে প্রচলিত আছে, তা মূলতঃ কাঠামোগত দিক থেকে কেন্দ্রীভূত বৈশিষ্ট্যেরই বাহক । এদিক থেকে সংগঠন হিসেবে রাষ্ট্রের যে সব আলোচনা, তাতে শুরু থেকে অদ্যাবধি স্তরগত ভিন্নতা বা বিকাশের পর্যায়গত পার্থক্য থাকলেও মূলগতভাবে একই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের বাহক বা কেন্দ্রীভূত সংগঠন-কাঠামোর প্রকাশক । ফলে, পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় বিবর্তনের ইতিহাসে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের যে পরিচয়, তা পুরনো হলেও লেনিনের হাত ধরেই প্রথম সচেতন বা তত্ত্বগত দিক থেকে স্ব-পরিচয় বা সংজ্ঞায় পৃথিবীতে বিধৃত হয়েছিল । ঠিক যেমন আমরা প্রত্যেক দিন ব্যাগ হাতে বাজার করি, পণ্যসামগ্রী কিনি- এর পূর্বেও বহু মানুষ কিনেছে, কিন্তু কার্ল মার্কসের হাতেই প্রথম তা কীভাবে পণ্য হয়েছে- তার উৎপাদন সহ যাবতীয় বৈশিষ্ট্যে ‘পণ্য’ প্রথম স্ব-পরিচয় বা সংজ্ঞায় বিধৃত এবং যুগপৎ সমাজ-রাষ্ট্র সহ ইত্যকার সম্পর্ক ও সম্পর্কিত বিষয়াদি তাঁর ভাবনায় অন্য মাত্রায় ধরা পড়ে । লেনিনের হাতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার সংগঠন নীতির তাত্ত্বিক বিনির্মাণ তথা কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর পরিচয় উদ্ঘাটনের ব্যাপারটাও মূলতঃ তেমনই। যুগপৎ যা মার্কসবাদকেও পূর্ণাঙ্গতা দেয় । কারণ, লেনিনের পূর্বে এমন-কি কার্ল মার্কস্ থেকেও তেমনভাবে কোনো কাঠামোগত দিকের বিষয়াদি পাওয়া যায় না । অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গতা বা কাঠামোগত দিকের জন্য মার্কসবাদকে লেনিন পর্যন্ত প্রতীক্ষা করতে হয়েছে ।

 

চিন্তার ক্ষেত্রে মার্কস্ যেমন হেগেলের সার্থক ছাত্র ছিলেন, তেমনি এক্ষেত্রে লেনিন মার্কসের যোগ্য উত্তরাধিকারী । কারণ, সমাজতন্ত্রের ভাবনা মার্কসের পূর্ব থেকে চলে আসলেও মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন দ্বারা তা বাস্তবনিষ্ঠ হয়ে ওঠে । আর এক্ষেত্রেও যে দ্বন্দ্বত্ব সেটা মার্কসের পূর্বে সবিশেষ পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার ধারায় হেগেলের অসাধারণ পান্ডিত্যের মধ্যেই দার্শনিক স্পষ্টতা লাভ করে । কিন্তু হেগেলের অনেক ছাত্রের মধ্যে একমাত্র মার্কসের হাত ধরে তা বিজ্ঞাননিষ্ঠতা লাভ করে এবং দর্শন দিয়ে যে মানবীয় সমাজ ও তার পৃথিবী বদলানো যায়, আর দর্শনের মূল কাজ যে সেটা- এই সিদ্ধান্তের যুগান্তকারী ঘোষণা মেলে ।

 

দর্শন প্রসঙ্গে মার্কসের এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব তথা দার্শনিক ধারায় মার্কস্ ও লেনিনের সম্পর্ক বুঝতে প্রাসঙ্গিক বিষয়টাকে আর একটু ঝালিয়ে নেয়া দরকার । একটি প্রশ্নের অবতারণা দিয়েই তা বোঝানো যাক।

 

বর্তমান পৃথিবীতে বাবা ও মায়ের সাথে সন্তানের যে সম্পর্ক, তা যদি মানুষ মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হয়ে পড়ে- তবে বর্তমান মানবসমাজের অবস্থাটা কী হবে? নিঃসন্দেহে মুহূর্তেই জন্তু-জানোয়ার তুল্যতায় নেমে যাবে । ফলে, ethics-morality তথা নীতি বা আদর্শ ছাড়া মানবীয় সমাজ এক মুহূর্তও টেকে না বা চলতে পারে না, এটা সবাই বোঝে । এমন-কি আজকের সমাজে কোনো সন্তান তার বাবার পরিচয় দিতে পারছে, মা-বাবার সম্ভ্রম সন্তানের মর্যাদার সাথে জড়ানো, পারস্পরিক সম্পর্কের এ-অবস্থাতে আসতেও মানবসমাজের সহস্র বছর সময় লেগেছে । ফলে, ethics-morality প্রসঙ্গে স্বাভাবিক কান্ডজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই দর্শন অনুশীলন ও উপযোগিতা চলে আসলেও সমাজ বা পৃথিবী-বদলেও যে দর্শনই প্রধান ভূমিকায় থাকে- এটা স্পষ্ট করে মার্কসীয় ভাবনায়ই প্রথম প্রকাশ পায় । দার্শনিক ক্ষেত্রে এটাও বলার জন্যে পৃথিবীকে প্রতীক্ষা করতে হয়েছে কার্ল মার্কস্ পর্যন্ত । তদ্রুপ, এ-ভাবনাটা অধিকতর অগ্রগামী ভাবনা বা দাবি হিসেবেই থেকে যেত, যদি না লেনিনের জন্ম হতো । ঠিক যেমন সমাজতন্ত্রের ধারণাটা মার্কসের পূর্বে অধিকতর চিত্তাকর্ষক ভাবনা বা দাবি হিসেবেই চর্চিত হচ্ছিল । মার্কসের ভাবনায় যা প্রকাশ পায়, লেনিনের হাত ধরেই তা প্রতিষ্ঠা পায় বা বাস্তব হয়ে ওঠে ।

 

আর এই বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার শর্তগত দিক থেকে লেনিনকে শুধু তাত্ত্বিক নয়, প্রায়োগিক ক্ষেত্রেও অনেক বিষয়ের পথিকৃৎ-এর ভূমিকায় নিয়ে আসে । কাঠামোগত মৌলিক কর্ম সহ সামগ্রিক দিক থেকেই প্রাচ্য-পাশ্চাত্য তথা বিগত বৈশ্বিক সমাজ ও রাষ্ট্রতত্ত্বের দার্শনিক ইতিহাসে মহামতি লেনিনই তত্ত্ব ও প্রয়োগে প্রথম একজন পূর্ণাঙ্গ দার্শনিকের দৃষ্টান্তে উঠে আসেন । বিশেষতঃ আজ যেমন বিমান-রকেট যোগে মানুষের আকাশে ওড়ার, চাঁদে যাওয়ার ব্যাপারটা স্বাভাবিক সত্য হিসেবে স্বীকৃত; তেমনি মানুষ সমাজ বদলায় কিংবা দর্শন দিয়ে সমাজ বদলানো যায়, সমাজ ও রাষ্ট্র প্রসঙ্গে এই দাবির যথার্থতা প্রমাণে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ছিলেন তদ্রুপ এক সফল পরিণতি ।

 

এদিক থেকে হাতে-কলমে লেনিনের মাধ্যমেই মার্কসবাদ পূর্ণাঙ্গতা পায় । আর তাই লেনিনকে একই সাথে যেমন বৈশ্বিক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক দিক থেকে বা কলমী যুদ্ধে জিততে যেমন-সাম্রাজ্যবাদী স্তরে পৃথিবীর নতুন চেহারাকে (Imperialism, the Higest Stage of Capitalism সহ অপরাপর লেখা মারফত) চিহ্নিতকরণ তথা মার্কসের দেখা পৃথিবীর সাথে অপেক্ষাকৃত অগ্রগামী পৃথিবীর নতুন বৈশিষ্ট্যগত পরিচয় প্রদান করতে হয়েছে, তেমনি মোকাবেলা করতে হয়েছে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন বহু বছরের পুরনো শিকড়-বাকড়ে শক্তিশালী জার স.টকে এবং তা করতে কেরনস্কি সরকার সহ ছোট-বড়, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, ভেতর-বাহিরের তথা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ও পার্টির শত্রু-মিত্র স্তর নির্দিষ্টকরণে ‘রণনীতি-রণকৌশল’-এর মতো অনেক বিষয়াদিকে স্পষ্ট করতে হয়েছে । ফলে সর্বাগ্রে ঐক্যবদ্ধ শক্তি (পার্টি-সংগঠন) তথা যথার্থ সংঘবদ্ধতা গড়ে তোলার শর্তগত দিক থেকেই কাঠামো প্রাসঙ্গিক ভাবনা লেনিনের ক্ষেত্রে অনিবার্য হয়েই দেখা দিয়েছিল ।

 

[মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ অনুসারে- বস্তু থেকেই যেহেতু চেতনা, তাই বস্তুর ক্ষেত্রে যে নিয়ম ক্রিয়াশীল, চেতনাসম্পন্ন মানবীয় সমাজের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য । বস্তুগত ক্ষেত্রে যা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, মানবসমাজের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত ও ব্যাখ্যায় ক্রিয়াশীল উক্ত অভিধা বা উপাদান আর্থিক দিক থেকে শোষক-শোষিতে প্রতিফলিত হয়ে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হিসেবে খ্যাত । বস্তুজগতের যাবতীয় পরিবর্তনের মধ্যে সর্বত্র তিনটি মূল নিয়ম ক্রিয়াশীল থাকে । যথাঃ ক. ‘‘From quantitative change to qualitative change” (পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন), খ. “Unity of opposites” (বিপরীতের মধ্যে ঐক্য) ও গ. “Negation of negation” (নেতির নেতিকরণঃ বিকাশের পথে অবলুপ্তি, অবলুপ্তির পথে বিকাশ) ।

লেনিন সংগঠন-কাঠামো হিসেবে উক্ত মার্কসীয় নিয়মত্রয়ের মধ্যে দ্বিতীয় তথা “ইউনিটি অব অপোজিট্‌স”-এর আলোকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতিকে নির্দেশায়িত করেন । যদিও এর অর্থ এই নয় যে, অপর দুটি নিয়ম এক্ষেত্রে বলবৎ নেই । বরং সবক্ষেত্রেই তিনটি নিয়ম বলবৎ থাকে । এখানেও অপর দুটি নিয়মের সাথে প্রধানত আলোচ্য নিয়মটি প্রণিধানযোগ্য।]

 

মুখ্যত সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার নতুন স্তর নির্দিষ্টকরণের দিশার কারণেই লেনিনীয় চিন্তা লেনিনবাদ অভিধায় ভূষিত তথা মৌলিক চিন্তা বা ‘ইজম’ হিসেবে স্বীকৃতি । কিন্তু সংগঠন-কাঠামো প্রাসঙ্গিক লেনিনীয় বিকাশ মৌলিক চিন্তার অর্থে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার স্তর নির্ণয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল । বিশেষতঃ পার্টি-সংগঠনের মূলনীতি সহ তাত্ত্বিক পূর্ণাঙ্গতায় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার সংগঠন নীতি পক্ষান্তরে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের দ্বার উন্মোচন করেছিল । ইতোপূর্বের শাসন প্রয়োজন থেকে ঠেকে ঠেকে বিকাশপ্রাপ্ত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোটি লেনিনের গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতার সংগঠন নীতির পথ ধরেই প্রথম পরিস্ফুট হয়ে ওঠে এবং ঠেকে ঠেকে নয় বরং তা সচেতন প্রক্রিয়ায় বা অনুশীলনের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হয় । সেটিই ছিল মানবের সচেতন প্রয়াস সৃষ্ট তৎসময়ের সর্বাধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যার সক্ষমতা প্রমাণিত ।

 

অদ্যাবধি পৃথিবীতে, এমন-কি প্রচলিত মার্কসবাদীদের আলোচনায়ও, উল্লিখিত সিদ্ধান্তটি চোখে পড়েনি বিধায় সাধারণ অভ্যাসবশত তাঁরা সহ অনেকেই এ-প্রসঙ্গে বিতর্ক জুড়ে দিতে পারে । তাই প্রাসঙ্গিক সিদ্ধান্তের প্রমাণে বলা যায়, রাশিয়ান জার সম্রাট যেখানে পার্শ্ববর্তী প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্য মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও যার দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো, সেখানে মাত্র ২০/২৫ বছর পর তৎপৃথিবীর প্রধান শক্তিধর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সহ অপরাপর শক্তিকেন্দ্রগুলোকে বগলদাবা করে এগিয়ে আসা জার্মান শক্তিকে পর্যুদস্ত ও রুখে দেয়ার মধ্যেই উক্ত সংগঠন-কাঠামোর অনুশীলন তথা প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর ভূমিকাকে স্পষ্ট করে । অর্থাৎ এই অমিত শক্তির পিছনে যে আদর্শগত শক্তি ক্রিয়াশীল ছিল, উক্ত আদর্শের পূর্ণাঙ্গতায় বিশেষতঃ ‘যুদ্ধ প্রসঙ্গে’ কাঠামোগত দিকটা আলাদা গুরুত্বে প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে । আর সমাজতন্ত্র বা Socialism যেহেতু ধনতন্ত্র থেকে- সাম্য বা Communism-এর উত্তরণের মধ্যবর্তী কাল বা Communism-এর প্রাক পর্ব হিসেবে সৃষ্ট, পক্ষান্তরে যা মানবীয় কৃৎকৌশলে ধনতন্ত্রেরই বিকশিত একটি স্তর হিসেবে নির্দিষ্ট বা সংজ্ঞায়িত হয়েছে বিধায় তৎবর্ণিত পৃথিবীর ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহে, বিবর্তনের পধ ধরে প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত থাকা যে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা না দেখে বরং একে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রেরই মানবসৃষ্ট নতুন সংস্করণ, তথা উত্তরিত বা আধুনিক রূপ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত বা সংজ্ঞায়িত হয় । অর্থাৎ এক্ষেত্রে পার্থক্য বলতে অপরাপর ক্ষেত্রে বিবর্তনের পথ ধরে তথা ঠেকে ঠেকে উক্ত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় চেহারায় এসে দাঁড়িয়েছিল আর সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে উক্ত অবস্থা থেকে সচেতন বা অনুশীলনগত পথ ধরে সৃষ্ট- অপেক্ষাকৃত অগ্রগামী বা আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের চেহারা পেয়েছিল । সর্বক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় পরিণতিতে এসে এক কেন্দ্র বা কর্তৃত্ব অনুবর্তী আমলাতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ও উপাদানকে বহন করেছে । অর্থাৎ বিবর্তনের পথ ধরে বিভিন্ন হেরফের সত্ত্বেও অদ্যাবধি পৃথিবী রাষ্ট্র বলতে যে প্রতিষ্ঠানকে জেনে এসেছে, সেই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোরই আদি উপাদান বা পরিচায়ক সহ বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এখনও এটা ব্যাপক মানুষের অনুবর্তিতায় চালিত না হয়ে উল্টো একজন বা মুষ্টিমেয়র শাসন সুবিধার অনুবর্তিতায়- ব্যাপক মানুষকে নিয়ন্ত্রিত বা চালিত করার পুরনো অর্থকেই প্রতিফলিত করছে- যা ব্যাপকের শাসন বা গণতন্ত্রের নামে চললেও মূলতঃ তার বিপরীতমুখিনতায় প্রতিষ্ঠিত । যেভাবেই হোক সামন্ততান্ত্রিক যুগের সেই রাজা না থাকলেও শাসনের দন্ডে সেই ‘এক’জন বা একটি গোষ্ঠী রয়ে গেছে এবং শাসনযন্ত্রও সেই ‘এক’ কেন্দ্রিক কর্তৃত্বেরই অনুবর্তী । রাজা বা প্যায়দা সেই একজনকে লাগছেই- জন্ম অথবা নির্বাচন সূত্রে যেভাবেই হোক, শাসন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যে আমরা ‘প্রজা’ বা দর্শকের কাতারেই আছি । একজন শাসকের পরিবর্তে ‘আরেকজন’ শাসক নির্বাচনের অধিকারকে কিংবা একজন বা একটি গোষ্ঠীর শাসনকে এখনও ব্যাপকের শাসন বা শাসনকার্যে অংশভুক্তি হিসেবে দেখানোটা তথা গণতন্ত্রের ধারণায় গিঁটমারা এই বিষয়টা প্রযুক্তিগত পথ ধরে আধুনিক দুনিয়াতে এখন নেহাতই মিথ্যাচার বা দুনিয়ার সর্বোচ্চ ইউটোপিয়া অর্থে শুভঙ্করের ফাঁকি হয়ে পড়েছে । লিও টলস্টয়ের ‘ন্যাকিড কিং’ এর বিস্ময়কর বাস্তবতা ।

 

মোটকথা, বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো বা শাসনব্যবস্থা শুরুতেও যেমন একজনের বা একটি গোষ্ঠীর অনুবর্তিতায় ছিল- দাস, সামন্ত, ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি প্রচলিত অভিধা পেরিয়ে এলেও শাসনগত বৈশিষ্ট্যে তেমনি অর্থাৎ কেন্দ্রীভূত আদলেই রয়ে গেছে ।

 

এক্ষেত্রে প্রশ্ন- গলদটা তাহলে কোথায় হলো?

 

‘যন্ত্র নিয়ত বিকাশশীল’ কথাটি কার্ল মার্কস্ বললেও তাঁর ঝোঁক গেছে বিত্তকেন্দ্রিক শ্রেণী বিভাজিত সমাজের দিকে । যদিও যন্ত্রগত (যন্ত্রগাণিক) উন্নয়ন তথা শিল্প বিপ্লবের পথ ধরেই সৃষ্ট উদীয়মান শ্রমিক শ্রেণী তবুও বিকাশশীল যন্ত্র থেকে মার্কসের চোখ সরে গেছে শ্রমিক আর মালিকের দুই পরস্পরবিরোধী সংঘাতের দিকে । এমন-কি মানবসমাজের ইতিহাসকেও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন শ্রেণী সংগ্রাম দিয়ে এবং বলেছেন ‘শ্রেণী সংগ্রামই ইতিহাসের চালিকা শক্তি’ । মার্কসীয় এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক, শোষক আর শোষিতের পরস্পরবিরোধী শ্রেণীদ্বন্দ্বের পথ ধরেই মানবসমাজ পরিবর্তিত হয়ে আজকের পর্যায়ে এসেছে  ।

 

কিন্তু মুক্তিজোটের মতাদর্শিক দিশা অনুসারে- শ্রেণীদ্বন্দ্ব নয়, বরং নিয়ত বিকাশশীল যে যন্ত্র তার অভিঘাতেই সমাজ বদলায় । অর্থাৎ যন্ত্রগাণিক উন্নয়নের পথ ধরে মানবীয় সমাজ-সভ্যতা পরিবর্তিত হয়ে আজকের পর্যায়ে এসেছে । আর এই যন্ত্রগাণিক উন্নয়ন মানবীয়- বৌদ্ধিক বা সাংস্কৃতিক অর্জন, যা কোনো মানচিত্রিক সীমানা মানেনি । তথাপিও সভ্যতার অর্থে এই মানবীয় অর্জন তথা যন্ত্রগাণিক উত্তরণ যেখানে যেমন যেমনভাবে পৌঁছেছে বা এর প্রভাব কিংবা অভিঘাত যে ভূখন্ডে যেমন যেমনভাবে পড়েছে অথবা মানবীয় জীবন-যাপনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, তাকে সংহত করার অর্থেই উক্ত নির্দিষ্ট ভূখন্ডে নতুন আইন-কানুন, বিধি-ব্যবস্থা তথা রাষ্ট্রীয় ভূমিকা স্ব স্ব বাস্তবতায় পরিবর্তমান থেকেছে । ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও ভূমিকা আর পরিবর্তমান বৈশিষ্ট্য ‘ব্যবস্থাপনা’ (Mamagement-সদৃশ)-কেই প্রকাশ করে ।

 

এদিক থেকে সমাজ-সভ্যতা নিয়ত পরিবর্তনশীলতার কারণ যেহেতু যন্ত্রের ‘উত্তরোত্তর উন্নয়ন’ এবং বিবিধ ভূখন্ডে তারই অভিঘাতকে সংহত করার অর্থেই যেহেতু রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় ভূমিকা, আর তা-ই সমাজ পরিবর্তনের কারণ হিসেবে মার্কস্ বর্ণিত- ‘শোষক আর শোষিতের দ্বন্দ্বই ইতিহাসের চালিকা শক্তি’ তথা মানবসমাজের ইতিহাস- ‘শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’ কথাটা যেমন থাকে না, তেমনি রাষ্ট্র-রাজনীতির ক্ষেত্রে লেনিনের ‘ইকোনোমিকস সুপারসিডস পলিটিক্স’-এর কথাটাও আর টেকে না । ঠিক যেমন Imperialism, the Higest Stage of Capitalism-এ বর্ণিত সিদ্ধান্তটি (পুঁজিবাদ, তার সর্বোচ্চ স্তর বা পচে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে) যথার্থতা হারিয়েছে । কিন্তু লেনিনের গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতার সংগঠন নীতি তথা কেন্দ্রীভূত সংগঠন বা রাষ্ট্রকাঠামোর যে পরিচয় পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল, তা কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামো প্রাসঙ্গিক আলোচনায় প্রথম ও মৌলিক চিন্তাকর্ম হিসেবে রাষ্ট্রতাত্ত্বিক জ্ঞানজগতের চিরন্তন সম্পদ হয়ে থাকছে ।

 

যা-ই হোক, মানবসমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে সিদ্ধান্তে বলা যায়- মানবীয় জীবন আর যাপনের শর্তে প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক প্রকৃতিকে অনুবর্তী বা জয় করার শর্তে অবিরাম প্রযুক্তিগত উত্তরণ এবং নতুন অভ্যস্ততা, পুনশ্চঃ ‘পৃথিবীর মানুষের নতুন নতুন প্রয়োজন, নতুন নতুন উদ্ভাবন ও নতুন অভ্যস্ততা’- আর এভাবেই প্রয়োজনভিত্তিক নিত্যি-নতুন উদ্ভাবন-উত্তরণ ও অভ্যস্ততার পথ ধরে মানচিত্রিক সীমানা ডিঙানো, ব্যবসা অথবা যুদ্ধ মারফত মানবীয় পরস্পরিকতা তথা সমাজ-আয়তনের বৃদ্ধি বা এগিয়ে যাওয়া- এযাবৎ কাল এটাই মানবসমাজের ইতিহাস । আর এরই মাঝে রাষ্ট্র বলতে মূলতঃ বিভিন্ন ভূখন্ডে উক্ত প্রযুক্তিগত উত্তরণের অভিঘাত-সংহতকরণ তথা ‘নতুন প্রয়োজন- নতুন অভ্যস্ততা’ থেকে উদ্ভূত মানবীয় জীবন-যাপন ও পারস্পরিকতাকে যথাস্থ বা মানিয়ে নেয়ার শর্তে অস্তিত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান মাত্র অর্থাৎ উক্ত নির্দিষ্ট কোনো ভূখন্ডে পরিবার সহ অপরাপর প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন হিসেবে রাষ্ট্রের ভূমিকা বহমান এবং অদ্যাবধি তা বৃহৎ-এর উপর ক্ষুদ্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৈশিষ্ট্যেই কলা-কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েই এগিয়েছে । এক্ষেত্রে পরিবর্তমান বলতে এর কলা-কৌশলকেই বোঝায়, বৈশিষ্ট্যকে নয় । অর্থাৎ বৃহৎ বা ব্যাপকের উপর ক্ষুদ্রের বা একের নিয়ন্ত্রণগত বৈশিষ্ট্যটা বিদ্যমান আছে ।

 

সুতরাং মার্কস্ বর্ণিত শোষক ও শোষিত বা অপরাপর শ্রেণী এক্ষেত্রে সমাজ পরিবর্তনের কারণ নয়, বরং উক্ত যন্ত্রগাণিক অভিঘাতের বাহক বা প্রকাশক মাত্র এবং বিগত পৃথিবীর এই রক্তাক্ত সংঘাত মানবীয় উদ্ভাবন বা সাংস্কৃতিক অর্জনের অপ্রতুলতা হেতু সংঘটিত । ফলে এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত সংগ্রাম হলেও তা অনেকটা মানবশিশুর মানবীয় পূর্ণাঙ্গ বিকাশ বা বড় হয়ে ওঠার পথে হামাগুড়ি অবস্থার সাথে তুল্য বা শিশুতোষ বিশৃঙ্খলার প্রকাশক । অর্থাৎ অপরাপর পশুশাবকের সাথে মানবশিশুর ক্রিয়া-কর্মের যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় বা শিশুর ক্ষেত্রে মানবীয় সাংস্কৃতিক যে অপ্রতুলতা দেখা যায়, এক্ষেত্রেও মানবসমাজের এগিয়ে যাওয়ার বা বৃহৎ হওয়ার পথে তেমন অবস্থা দৃষ্ট হয় ।

 

 এক্ষেত্রে মার্কস্ বর্ণিত শ্রমকে সভ্যতার বিধাতা হিসেবে নির্দিষ্ট করলেও- উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত মোতাবেক, তাহলে শ্রম লাঘবেই এসেছে উদ্ভাবন-আবিষ্কার তথা যন্ত্রের অবিরাম উৎকর্ষ, যা মানুষের বৌদ্ধিক অর্জন বা সাংস্কৃতিক দিক আর সাংস্কৃতিক দিক প্রধান হওয়া মাত্রই মার্কস্ বর্ণিত ‘বেস (আর্থিক দিক বা সম্পর্ক) বদলালে সুপারস্ট্রাকচার (সংস্কৃতি বা মননগত দিক) বদলায়’ তথা ‘বেস প্রধান, সুপারস্ট্রাকচার অপ্রধান বা অনুবর্তী’র বিষয়টা আর ঠিক থাকে না এবং এর ভিত্তিতে প্রচলিত সংজ্ঞায় রাজনৈতিক আন্দোলন মানেই অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া ভিত্তিক আন্দোলন কিংবা আর্থিক বিষয়াদি থেকেই (শ্রমিকের আর্থিক দর কষাকষি সহ যে-কোনো পেশাগত সুবিধা প্রাপ্তির দাবিই প্রধান) রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রারম্ভিকতার ব্যাপারটিও আর থাকছে না । অর্থাৎ সংস্কৃতিগত দিকের প্রাধান্যে পেশা নয়, মানুষ ও মানবীয় বৌদ্ধিক উত্তরণ বা উৎকর্ষতাই মানবীয় সমাজ বিবর্তনের ব্যাখ্যায় প্রধান দিক হিসেবে নির্দিষ্ট হয়- যা মার্কস্বাদের অসামঞ্জস্যতাকে প্রকাশ করে । ‘বেস বদলালে যেমন সুপারস্ট্রাকচার বদলায়, তেমনি সুপারস্ট্রাকচারও বেসকে প্রভাবিত করে’- মার্কসীয় চিন্তানায়ক মাও সে তুং-এর এই উদ্ধৃতি থেকেই বোঝা যায়- মার্কস্, লেনিন পরবর্তী অপেক্ষাকৃত ক্রম-অগ্রবর্তী পৃথিবীর পরিবর্তিত বাস্তবতায় ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে এই সাংস্কৃতিক প্রাধান্যের বিষয়টা তাঁর চোখে পড়েছিল বা ভাবিয়েছিল ।

 

[কিছুটা প্রসঙ্গান্তর ঘটলেও এক্ষেত্রে যোসেফ স্ট্যালিন সম্বন্ধে একটা কথা বলা দরকার । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোসেফ স্ট্যালিনের মহান ভূমিকাকে আড়াল করার জন্যে- সমাজতন্ত্র বিরোধী সহ সাম্রাজ্যবাদীদের ডেরায় নিয়মিত মাসোহারায় পোষ্য এক ধরণের মসিজীবিরা ‘দানব’ সহ আরও অনেক আখ্যায় বিতর্কিত করে । বিশেষতঃ আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ভেতর-বাহির শত্রুর ষড়যন্ত্র নস্যাতে শাসক হিসেবে স্টালিনের ভূমিকার কেবল কঠিনতম দিকগুলোকেই তুলে ধরে বিরোধীরা এসব একপেশে বিতর্কের অবতারণা করে । সাথে সাথে ট্রটস্কিপন্থীরাও বহুবিধ হৃদয়গ্রাহী তত্ত্ব কপচিয়ে স্ট্যালিনকে বিতর্কিত ও আক্রমণ করে । বিশেষতঃ দেশে দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ণতা প্রদান তথা সমাজতান্ত্রিক শক্তির রাষ্ট্রিক ক্ষমতায় আসীন করে দেয়াটাকে ট্রটস্কিপন্থীরা ভুল আখ্যা দেয় । কিন্তু ‘বেস বদলালে সুপারস্ট্রাকচার বদলায়’- মার্কসীয় এ-সিদ্ধান্তের আলোকে স্ট্যালিনের ভূমিকা তাত্ত্বিকভাবে যথার্থতা ও সঠিকতা পায় । উল্টো যাঁরা এই ভূমিকাকে সমালোচনা করে, তাঁরাই মার্কস্বাদ থেকে নিজেদের বিচ্যুতিকে প্রকাশ করে । এমন-কি লেনিনকেও এঁরা প্রথম দিকে-‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ নীতির সুযোগ নিয়ে ‘পার্টি গণতন্ত্রে’র নামে ভেতর থেকে তাত্ত্বিকভাবে আক্রমণ বা ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছিল, তখন যোসেফ স্ট্যালিন- ‘ফাউন্ডেশন অব লেনিনিজম’ ও ‘প্রবলেম অব লেনিনিজম’ নামক দুটো গ্রন্থ দিয়ে এঁদেরকে তাত্ত্বিকভাবে রুখে দিয়েছিলেন, অথচ এই ট্রটস্কিপন্থীরাই স্ট্যালিনকে নয়, নিজেদেরকে খাঁটি মার্কস্বাদী হিসেবে দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে মার্কস্বাদী নয়- বরং সমাজতন্ত্র বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদী ভাড়াটেদের সাথেই এঁদের কথা বেশি মেলে এবং তারা চোরে চোরে মাসতুতো ভাই-এর সম্পর্কটাকেই এযাবৎ কাল প্রকাশ করেছে । এক্ষেত্রে ট্রটস্কিপন্থীরা কী সঠিক সে আলোচনায় যায়নি- কেবল যোসেফ স্ট্যালিনের ভূমিকা তথা একজন শাসকেই আটকে ছিল এবং সেটাও তাত্ত্বিক বা মতাদর্শিক সংগ্রামের সাথে তাঁর পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্বকে যথাযথভাবে না বুঝে ।]

 

সমাজ-রাষ্ট্র, দর্শনের বর্তমান বৈশ্বিক ধারায়, যুক্তি-বিজ্ঞান মূলতঃ মানুষের হাসি-কান্না ও বোধ বা বৌদ্ধিক বিষয়াদি বাইরে রেখে এগিয়েছে এবং মানুষ এলেও যন্ত্রের অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে । ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ ডাকে আর্থিক নিক্তি তথা পেশাগত দিকটাই প্রধান- অপরাপর দিক তার অনুবর্তী অর্থাৎ জীবন ও জীবিকার মাঝে নিশ্চিত পার্থক্য আছে আর সে পার্থক্য টানলে জীবনের বিকল্প নেই, কিন্তু জীবিকা বা পেশার বিকল্প আছে । খুব স্বাভাবিকভাবেই জীবন ও পেশার অব্যবহিতের ক্রম অনুসারে জীবন আগে এবং সেটাই মূল আর জীবিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার ক্রম নিঃসন্দেহে জীবনের পরে । মানবীয় জীবন ও জীবিকার এই পার্থক্যগত অস্পষ্টতা সহ পুঁজি সৃষ্টিতে যন্ত্রের সাথে যুগপৎ মানুষের ভূমিকাকে স্থাপন করে বিকাশমান শ্রেণী হিসেবেই কেবল তার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাটা কিংবা মানবীয় সমাজের ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক কোনো শ্রেণীর প্রাধান্যে- পুরো সমাজ বা সামগ্রিকতাকে তার অনুবর্তীতে রাখা অর্থাৎ বেস (আর্থিক দিক বা সম্পর্ক) প্রধান ও সুপারস্ট্রাকচার (সংস্কৃতি বা মননগত দিক) অপ্রধান বা অনুবর্তী- উক্ত অর্থবাদী ঝোঁকের ভ্রান্ত দৃষ্টান্ত, যা শুধু মার্কস্বাদী দৃষ্টান্ত নয় বরং পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় উদ্ভূত হয়ে তা এখন সমাজ, রাষ্ট্র প্রাসঙ্গিক বৈশ্বিক চিন্তার এক সাধারণ প্রবণতা হয়ে পড়েছে ।

 

ফলে- মানবসমাজের ইতিহাসে দাস, ভূমিদাস কিংবা বহুচর্চিত শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র বলতেও কার্যত তেমন কোনো শ্রেণীভিত্তিক শাসন তথা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও এমন-কি শাসনব্যবস্থাগত বৈশিষ্ট্যে কলাকৌশলগত ভিন্নতা ছাড়া মূলগত ক্ষেত্রে একই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকলেও মানবসমাজকে দাস, সামন্ত, ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি সমাজব্যবস্থাগত অভিধায় মানতেই অভ্যস্ত এবং রাষ্ট্র-কাঠামোগত ব্যাখ্যায় কথিত দাস সমাজের চেয়ে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রাষ্ট্র কাঠামোকে এবং কথিত সামন্ততান্ত্রিক সমাজের চেয়ে বর্তমানের ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র-কাঠামোকে অধিক সংহত হওয়ার রূপকেই মূলতঃ এরা কেন্দ্রীভূত তথা পরিবর্তমান নতুন অবস্থা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে । অর্থাৎ সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রাষ্ট্রে অভিজাত নাইট, ব্যারন, ডিউক ইত্যাদি রাষ্ট্র চালনার অংশীদারিত্ব ক্রমহ্রাস পেয়ে বর্তমানের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ ইত্যাদির মতো ক্রম সংক্ষেপণ ও পারস্পরিক ক্ষমতার সংস্থাপনমূলক ‘একক’ শাসনব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট করে ।

 

কিন্তু মুক্তিজোটের মতাদর্শ অনুসারে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র-কাঠামো বলতে কেবল উল্লিখিত কলা-কৌশলগত দিককেই বোঝায় না বরং তার সাথে বৃহৎ বা ব্যাপক অংশকে ক্ষুদ্রের কর্তৃত্ব অনুবর্তিতায় চালনা করার যে শাসনব্যবস্থা অর্থাৎ ক্ষুদ্র দ্বারা বৃহৎকে শাসন করার (কর্তৃত্বাধীন) বৈশিষ্ট্যকেই নির্দিষ্ট করে- যা বৈশিষ্ট্যগতভাবেই ‘কর্তৃত্ব’ বাচকতার প্রকাশক অর্থাৎ ‘সমন্বয়’-এর বিপরীতার্থক ।

 

মানবসমাজের আলোচনা মানুষ দিয়েই শুরু অর্থাৎ মানুষই মানবসমাজের ‘একক’ । এক্ষেত্রে আরও নির্দিষ্ট করে ‘একজন ব্যক্তি মানুষ’ই মানবসমাজের একক । কিন্তু তা হলেও একজন দিয়ে যেমন কোনো সংগঠন হয় না, তেমনি একজন দিয়ে সমাজ তথা সমাজভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান হয় না- এটিই হলো প্রতিষ্ঠানগত গুরুত্বের দিক । অর্থাৎ সমাজ, রাষ্ট্র, সংগঠন তথা কোনো প্রতিষ্ঠান অর্থগতভাবেই একাধিক মানুষের সমষ্টিবাচকতাকে প্রকাশ করে এবং এই একাধিক মানুষকে কীভাবে সামষ্টিকতায় একাত্ম রাখা বা সঙ্ঘবদ্ধকরণের প্রক্রিয়াটাই তার আদর্শগত দিক এবং উক্ত প্রক্রিয়া বা আদর্শের প্রায়োগিক রূপটাই কাঠামোগত প্রাসঙ্গিকতার সাথে যুক্ত, যুগপৎ তা তার প্রাতিষ্ঠনিক পরিচয়গত দিক হিসেবে নির্দিষ্ট । এভাবে মানুষ একক হয়ে- ‘মানুষের সমাজ’ এবং সেই মানুষই উক্ত সমাজভুক্ত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যেমন নাগরিক পরিচয়ে পরিচিত, তেমনি অপরাপর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তৎক্ষেত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বহন করে মাত্র । এক্ষেত্রে সমাজ সর্বাপেক্ষা বৃহৎ আয়তন এবং রাষ্ট্র সহ অপরাপর প্রতিষ্ঠান তার অনুবর্তী বিধায় বৃহতের বৈশিষ্ট্যগত অবস্থান বা কাঠামোগত দিক যেভাবে পরিবর্তিত হয়, তদানুসারে অপরাপর প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে তা-ই প্রযুক্ত হয় তথা পরিবর্তিত বা প্রকাশ পেতে থাকে । অর্থাৎ সমাজস্থিত সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানিক (রাষ্ট্র সহ অপরাপর প্রতিষ্ঠানগত) কাঠামোগত দিকটা মূলতঃ উক্ত প্রাতিষ্ঠানিকতার সাথে বা তার উপর নির্ভরশীল নয় বরং সমাজ কাঠামো তথা সমাজ অনুবর্তী বা সমাজ সংশ্লিষ্টতায় তার উপর নির্ভরশীল । তাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র-কাঠামো সহ যে-কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিকাশ-উদ্ভব বা বৈশিষ্ট্যগত রূপ প্রাসঙ্গিকতা তৎসমাজ স্তর সংশ্লিষ্ট ।

 

সুতরাং পূর্বোক্ত সিদ্ধান্ত “পৃথিবীর মানুষের নতুন নতুন প্রয়োজন, নতুন নতুন উদ্ভাবন ও নতুন অভ্যস্ততা- আর এভাবেই প্রয়োজনভিত্তিক নিত্যি-নতুন উদ্ভাবন-উত্তরণ ও অভ্যস্ততার পথ ধরে মানচিত্রিক সীমানা ডিঙানো, ব্যবসা অথবা যুদ্ধ মারফত মানবীয় পরস্পরিকতা তথা সমাজ-আয়তনের বৃদ্ধি বা এগিয়ে যাওয়া- এ-যাবৎ কাল এটাই সমাজের ইতিহাস” অনুসারে শোষক-শোষিত ভিত্তিক কিংবা অন্য কোনো নিক্তিতে মানবসমাজকে বিভক্ত করার জায়গা নেই, বরং তা অখন্ড এবং সেক্ষেত্রেও মানবসমাজের আলোচনা মানুষ দিয়েই শুরু বিধায় তার অগ্রগায়ন বা বিবর্তনের ধারাকে নির্দিষ্ট করতে হলে মানুষের সাংস্কৃতিক অন্বয় তথা মানবীয় উত্তরণ দিয়েই নির্দিষ্ট করতে হবে । নিঃসন্দেহে সাংস্কৃতিক এই উত্তরণকে সভ্যতা হিসেবেই চিহ্নিত করা হয় । ফলে, মানবসমাজ নয়- বরং ভাগ করলে মানবসভ্যতাকে বিভক্ত করা যায় এবং সে দিক থেকে উত্তরণগত এই বৈশিষ্ট্যে সভ্যতা দুই ভাগে বিভক্ত - কায়িক শ্রমনির্ভর সমাজ-সভ্যতা ও বৌদ্ধিক শ্রমনির্ভর সমাজ-সভ্যতা । সভ্যতার এই ভাগ ছাড়া, হাজার হাজার বছর ব্যাপী চলে আসা সমাজ বিবর্তনের ধারাকে মৌলিক অর্থে কোনো ভাগ করা যায় না ।

 

কারণ, চাই আর না চাই- ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই অক্টোবর আমেরিকা নামক ভূখন্ড আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানুষ ভূখন্ডগত দিক থেকে ‘এক পৃথিবী’ আবিষ্কার সম্পূর্ণ করেছিল । মানবসমাজের বিবর্তন বয়স সাপেক্ষে বলতে গেলে সেদিন মাত্র পৃথিবীর ভূখন্ডগত আবিষ্কার সম্পন্ন হয়েছে । আর তা সম্পন্ন করার মধ্য দিয়েই সামগ্রিক পৃথিবীর বা অখ- বিশ্বের ভূমিজ পূর্ণতা লাভ করেছে । অর্থাৎ মানবসমাজ দীর্ঘ পথ ধরে বহু ভারসাম্যহীন বৈপরীত্যের বিশৃঙ্খল শৈশব কাটাতে কাটাতে আজকের এমন পর্যায় এসেছে ।

 

যে কারণে মুক্তিজোটের মতাদর্শিক দিশায়, সমাজকে নয় বরং মূলগত অর্থে সভ্যতাকে নির্দিষ্টকরণে বলা হয়েছে- সমাজ-সভ্যতাকে দুই ভাগে ভাগ করে বিগত সমাজ-সভ্যতাকে আমরা প্রকৃতিগত সীমায় বা কায়িক শ্রমনির্ভর জৈবিক সমাজ-সভ্যতা হিসেবে নির্দিষ্ট করছি এবং সমাগত বর্তমান সমাজ-সভ্যতাকে বৌদ্ধিক সমাজ-সভ্যতা হিসেবে নির্দিষ্ট করছি । সমাজবদলের সংগ্রামে ‘হিংসা’ বিজ্ঞাননিষ্ঠতার শর্তেই আজ বিগত সমাজের জৈবিক বা পাশবিক স্তর হিসেবে চিহ্নিত, যা সমাজ বিবর্তনের ধারায় অতীত মানবীয় সংস্কৃতির অসহায়ত্বগত দিক । ফলে, আজকের বাস্তবতায় যে পথ আর যা-কিছু হিংসা বা রক্তপাতের অনিবার্যতাকে প্রকাশ করে- তা-ই কুপথ; সে ধর্ম বা বিজ্ঞান যে বেশ ধরেই আসুক- তা অতীতের কায়িক শ্রমনির্ভর জৈবিক সমাজ-সভ্যতার বাস্তবতা নিঃসৃত । যা আজকের বাস্তবতায় কুমন্ত্রণা-কুপথ হতে বাধ্য । সুসভ্যত নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতায় বৌদ্ধিকতাই একমাত্র মত এবং অহিংস-ই একমাত্র বিজ্ঞাননিষ্ঠ পথ । স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিজোটের ঘোষিত ‘মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যে মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ডাক, ‘অহিংস’ যার পথ’- তার সাথেও সম্পূরক বিজ্ঞানের বা প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথ ধরে আসা আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতার । অর্থাৎ ইতোপূর্বেকার কথিত ‘অহিংসা’ তথা গৌতম বুদ্ধ, গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং প্রমুখের শুভবোধগত কোনো প্রত্যাশা বা প্রত্যয়মূলক ধারণার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই ।

 

সুতরাং সমাজব্যবস্থাকে আদিম, দাস, সামন্ত, ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি অভিধায় চিহ্নিত করা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষতঃ মানবসমাজের দীর্ঘ পথচলাকে বোঝা ও মনে রাখা বা পাঠ উপযোগিতার জন্য সহজ করলেও, বর্তমান পৃথিবীর প্রচলিত সমাজবিজ্ঞানে থাকা মানবীয় সমাজব্যবস্থাকে যে অর্থে চিহ্নিত বা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা ‘ভুল’ । অর্থবাদী মানদন্ডকে প্রধান করায় মানবসমাজ প্রসঙ্গে এমন সমাজতাত্ত্বিক বা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ভ্রান্তি এসেছে ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং সমাজ বিশ্লেষণ সহ সমাজব্যবস্থার সংজ্ঞা নিয়ে যখন ভ্রান্তি তখন সেটা শুনে পৃথিবী চমকে উঠতে পারে, প্রচলিত সমাজতাত্ত্বিক দন্ডমুন্ডের কর্তারা উঠে পড়ে লাগতে পারেন নিজেদের দীর্ঘ বৌদ্ধিক অর্জন ও পান্ডিত্যের অহমিকা রক্ষায় এত বড় ভ্রান্তিকে সঠিক বলে চালিয়ে নিতে কিংবা আমাদেরকে ভুল আখ্যায় প্রতিপক্ষতায় ঠেলে দিতে পারেন । কিন্তু আমরা জানি- বাদ-প্রতিবাদ যেটাই হোক; শেষ পর্যন্ত, যা সঠিক তা-ই টিকে যাবে, যা সত্য তা প্রতিষ্ঠা পাবে ।

 

বর্তমান দুনিয়ার সমাজতাত্ত্বিক-রাষ্ট্রতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্থবাদী ঝোঁক বা প্রাধান্যে চালিত এবং সমাজতত্ত্ব-রাষ্ট্রতত্ত্ব বলতে যাবতীয় পঠন-পাঠনে স্বাভাবিকভাবে সেটাই প্রতিফলিত ।

 

আজকের দুনিয়া কিংবা অখন্ড বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতা বা উত্তরণ প্রধানত পাশ্চাত্য চিন্তার পথ ধরে ঘটার কারণেই পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশই মূলতঃ বৈশ্বিক রাষ্ট্রচিন্তা বিকাশের ইতিহাস হয়ে পড়েছে । ফলে, পৃথিবীর মতাদর্শিক সংকট সমাধানে সেই ইতিহাসই আজ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে । সেদিক থেকে বস্তুগত উন্নয়ন ও উত্তরণের পথ ধরে তা পৃথিবীকে আজকের পর্যায়ে এগিয়ে দিলেও সমাজ ও রাষ্ট্রদর্শন প্রসঙ্গে পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় ‘রাষ্ট্রীয় দর্শন’-এর অস্তিত্ব যতো প্রাচীন, ‘সমাজদর্শন’-এর অস্তিত্ব ততো প্রাচীন নয় । এমন-কি সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্তও তারা সমাজকে রাষ্ট্রের অধীন ভেবেছে । অর্থাৎ রাষ্ট্রই যে সমাজের অধীন, এ সত্যটা বুঝেছে সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে । তাই, বৈশ্বিক সমাজ ভাবনায় এর বয়স নিতান্তই চারশো বছর । এদিক থেকে, সমাজতাত্ত্বিক বিষয়ে সে সময়টুকু নিতান্তই কম এবং রাষ্ট্রতত্ত্বের ব্যাপারে পুরনো হলেও সমাজের সাথে তার সম্পর্ক উল্টো করে ভেবেই এগিয়েছে দীর্ঘদিন । জীবন ও জীবিকার আগ-পাছের মধ্যে এটাই হলো উল্টো-পাল্টার প্রধান দিক এবং আজকের মতাদর্শিক সংকট সমাধানে যেখানে সমাজটাকে বোঝাই প্রধান দিক হয়ে পড়েছে, বিশেষতঃ পূর্বোক্ত ‘সমাজস্থিত সংগঠন বা প্রাতিষ্ঠানিক (রাষ্ট্র সহ অপরাপর প্রতিষ্ঠানগত) কাঠামোগত দিকটা মূলতঃ উক্ত প্রাতিষ্ঠানিকতার সাথে বা তার উপর নির্ভরশীল নয় বরং সমাজ কাঠামো তথা সমাজ অনুবর্তী বা সমাজ সংশ্লিষ্টতায় তার উপর নির্ভরশীল’ সেখানে সত্যি পৃথিবীর প্রচলিত সমাজদর্শন, রাষ্ট্রদর্শন আজ অসহায় হয়ে পড়েছে ।

 

এক্ষেত্রে সমাজ, রাষ্ট্র তথা যে-কোনো প্রকার সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান মানেই যেহেতু কোনো না কোনো প্রকার সামষ্টিকতা বা সঙ্ঘবদ্ধতার প্রকাশক বা সমার্থক এবং ‘মানুষ’ই তার একক বিধায় কেবল তাঁরই যৌথ বা সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই তাঁর সমাজ, রাষ্ট্র তথা প্রতিষ্ঠানবদ্ধ হওয়ার যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায় । অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্রের, সমাজ বা সংঘের আলোচনা মানেই সারগতভাবেই সামষ্টিক মানুষের আলোচনা, তাই সমাজ বা রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও বিকাশে- মানুষের সামগ্রিক জীবন প্রসঙ্গে ‘সামষ্টিক মানুষ’ হয়ে ওঠার আলোচনাকেই নির্দেশ করে ।

 

জীবপ্রকৃতিতে সকল জীবের অভিযোজন প্রক্রিয়ায় যে সাধারণ জৈবিক বৈশিষ্ট্য তথা জৈবিক স্তর বিদ্যমান থাকে, তা হলোঃ ১. খাদ্যগ্রহণ ২. আত্মরক্ষা ও ৩. বংশবৃদ্ধি । প্রকৃতিতে কোনো জীব টিকে আছে মানে এই তিনটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য তথা জৈবিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে, যদি একটিরও অনুপস্থিতি বা একটিরও ব্যত্যয় ঘটে, তবে প্রকৃতিতে উক্ত জীব লুপ্ত হয়ে যেতে বাধ্য ।

 

জীবমাত্রই অভিযোজন তথা জীবনধারণে- খাদ্যগ্রহণ ও আত্মরক্ষা (নিরাপত্তা), যা সাধারণত ‘জীবন রক্ষা’র (বেঁচে থাকা অর্থে) একটি শর্ত থেকেই উদ্ভূত বা একান্তই আত্মগত শর্ত । কিন্তু বংশবৃদ্ধি, যা প্রতিটি জীবের ক্ষেত্রেই উপস্থিত- সেখানেই প্রথম একটির (লিঙ্গান্তরে) সাথে ‘দ্বিতীয়’ আত্মজৈবনিক উপস্থিতি অপরিহার্য । অর্থাৎ জীবমাত্রই আত্মরক্ষা ও খাদ্যগ্রহণ প্রতিটি জীব একা একা সম্পন্ন করতে পারলেও- প্রজন্ম ধারা রক্ষা বা বংশবৃদ্ধিতে পরস্পর বিপরীত লিঙ্গের আরেকটি তথা দ্বিতীয় জীবের অস্তিত্ব অনিবার্য এবং যার পরিণতি বা পথ ধরে পরবর্তী প্রজন্ম । মোট তিনটি জীবের উপস্থিতি বা অস্তিত্ব প্রকাশ অনিবার্য । এই অর্থে এটা সম-জীবের প্রথম যৌথ বৈশিষ্ট্য অথচ তা একান্তই জৈবিক এবং প্রতিটি জীবের ক্ষেত্রে যা সাধারণ জৈবিক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ জীবমাত্রই এক্ষেত্রে যৌথ হওয়ার শর্ত প্রকৃতিগত বা অনিবার্য- প্রত্যক্ষ দুই’এর উপস্থিতি তথা পরোক্ষে তৃতীয় (পরবর্তী প্রজন্ম) ।

 

এক্ষেত্রে জীবমাত্রই যৌথ হওয়ার যে জৈবিক শর্ত বিদ্যমান, তা অভিযোজনের তিনটি জৈবিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে শুধু বংশবৃদ্ধির সাথে অনিবার্য বা প্রকৃতিগত শর্তে সম্পর্কিত । কারণ, অপর দুটি জৈবিক শর্ত- খাদ্য ও আত্মরক্ষা তথা আত্মগত নিরাপত্তার স্বার্থে দুই বা ততোধিক তথা যৌথ বা সংঘবদ্ধতা ঘটলেও আত্মগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে উল্টোটাও হতে পারে অর্থাৎ আত্মগত শর্তের অনুকূল হলে যেমন যৌথ বা সংঘবদ্ধতার শর্ত বিদ্যমান থাকে, প্রতিকূল হলে যৌথ বা সংঘবদ্ধতার শর্ত অনুপস্থিত থাকে অর্থাৎ প্রকৃতিগত বা জৈবিক তথা অনিবার্য নয়, কিন্তু বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই যৌথ হওয়ার শর্তটা অনিবার্য । অর্থাৎ অভিযোজনের তিনটি জৈবিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একমাত্র বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্রেই যৌথ হওয়ার শর্ত প্রকৃতিগত তথা জৈবিক বা অনিবার্য ।

 

কিন্তু যৌথের শর্ত বংশবৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য থেকে উদ্ভূত হলেও- ‘দুই’ এর সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার শর্তে অভিযোজনের বাকি দুই জৈবিক বৈশিষ্ট্য তথা আত্মগত শর্তই ক্রিয়াশীল হয় অর্থাৎ দুই-এর অধিক সংঘবদ্ধতার শর্তে ‘খাদ্য ও নিরাপত্তা’ এর শর্ত ক্রিয়াশীল হয় । এই অর্থে সমাজ বা সংঘবদ্ধতা বৃদ্ধি ও হ্রাস তথা বিকাশের সাথে খাদ্য ও নিরাপত্তার জৈবিক শর্তটাই ক্রিয়াশীল থাকে । সেক্ষেত্রে জৈবিক যৌথ প্রকৃতিগত শর্তেই প্রথম সংঘবদ্ধতা হয়, তবে তার পরিণতিগত দিক তথা তৃতীয় আত্মজৈবনিক উপস্থিতির স্থায়িত্ব উল্লিখিত অপর দুই জৈবিক শর্ত- ‘খাদ্য ও নিরাপত্তা’র সাথে সম্পর্কিত । অর্থাৎ সংঘবদ্ধতার স্থায়িত্ব তথা হ্রাস-বৃদ্ধির শর্তে ক্রিয়াশীল এই প্রজন্মগত দিকটি বা উক্ত প্রকৃতিগত জৈবিক যৌথের পরিণতগত দিক । সংঘবদ্ধতা অর্থে সমাজ এবং বৃদ্ধি অর্থে বিকাশ তথা ‘হ্রাস-বৃদ্ধি’র প্রশ্নটা বিকাশ সম্পৃক্ততায় সংস্কৃতিগত দিকের প্রকাশক ।

 

এক্ষেত্রে ‘জৈবিক’ যৌথ ও তার পরিণতিগত দিক মানেই সমাজ বা সামাজিক সংবদ্ধতার দিক নয় বরং তখন পর্যন্ত তা জৈবিক বা প্রকৃতিগত । এদিক থেকে প্রজন্ম বা পরিণতিগত দিকটার ‘স্থায়িত্ব’ বা ‘constancy’ দিয়েই সমাজ বা সামাজিক সংঘবদ্ধতার দিকটি নির্দিষ্ট । কারণ জৈবিক অপর দুই শর্ত- ‘খাদ্য ও নিরাপত্তা’র প্রশ্নে ‘পরস্পরের নির্ভরশীলতা’ বা নিশ্চয়তার শর্ত থেকে তা উদ্ভূত, যা জৈবিকতা থেকে ‘বোঝা-পড়া’ তথা পারস্পরিক সংঘবদ্ধতার নতুন স্তরকে চিহ্নিত করে । অর্থাৎ নিঃসন্দেহে সংস্কৃতিও এই ‘costant-যাপন’ সম্পৃক্ততার শর্তেই শর্তযুক্ত বা গড়ে ওঠে তথা নিয়ত বহমান ।

 

অর্থাৎ তিন থেকে ততোধিকের অনিবার্য গতিপূর্ণ যে ‘সামষ্টিকতা’, ‘constant-যাপন’ সম্পৃক্ততার শর্তে তাকেই সমাজ বলে- যা খাদ্য ও নিরাপত্তার শর্ত থেকে উদ্ভূত হয়ে সামগ্রিক জীবনকে নিয়ে নিয়ত বহমান । আর যেহেতু তিন বা ততোধিকের অস্তিত্ব মানেই- তিন বা ততোধিকের সামষ্টিক হয়ে ওঠা বা সমন্বিত বা সংহত হওয়ার শর্ত অনিবার্য, সেহেতু এই সমন্বয় বা সংহত থাকার শর্ত থেকেই নীতি-নৈতিকতা বা ethics- morality’র জন্ম তথা মানব সংস্কৃতির আদি আঁতুড়ঘর । যদিও সেটাকে আজকের নীতি-নৈতিকতা বা ethics- morality’র সাথে তুলনা করা বোকামি । কারণ, জৈবিক শর্ত থেকে উদ্ভূত হওয়ায় তা প্রধানত জৈবিক বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত বা আত্মজৈবনিক প্রকৃতি হিসেবে নির্দিষ্ট করা যায় । যা অনেক পশুর মধ্যে থাকলেও থাকতে পারে । কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিশেষ গঠনশৈলী তথা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে বোধের পরম্পরা ও পারস্পরিকতা রক্ষিত হওয়ায় ‘constant-যাপন’ সম্পৃক্ততার শর্তেই বিকাশপ্রাপ্ত আজকের মানবীয় নীতি-নৈতিকতা বা ethics- morality । তবুও জীব অর্থে মানুষের জৈবিক অস্তিত্বের কারণেই আদি ‘আঁতুড়ঘর’ এর পূর্বোক্ত সিদ্ধান্তটা থেকেই যায় ।

 

এই অর্থে সামষ্টিক হওয়ার শর্ত তথা সমন্বিত বা সংহত থাকা অর্থাৎ পূর্বোল্লিখিত ‘বোঝা-পড়া’র বিষয়টা নিতান্তই ‘সাংস্কৃতিক দিক’ হিসেবে নির্দিষ্ট হয়, যাকে আজকের প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞায় ফেললে, বিশেষতঃ প্রচলিত আর্থিক পরিভাষায় তা একটি ‘management-সদৃশ’ প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য বহন করে । একজনের জন্য management-এর প্রয়োজন নেই- একাধিকের সমন্বিত হওয়ার প্রক্রিয়া বা সামষ্টিকতার সাথেই management-এর উদ্ভব ও অস্তিত্ব বা সংজ্ঞা জড়িত । রাজনীতির পরিভাষায় উক্ত সমন্বিত থাকা ও সংহত রাখার বৈশিষ্ট্যকে রাষ্ট্র হিসেবে নির্দিষ্ট করা যায় । কারণ এটাই রাষ্ট্রের আদি ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য । যে কারণে আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয় প্রসঙ্গে মার্কসীয় মনীষায়ও বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি- “আধুনিক রাষ্ট্রের শাসকমন্ডলী হলো সমগ্র বুর্জোয়াশ্রেণীর সাধারণ কাজকর্ম ব্যাপস্থাপনার একটি কমিটি মাত্র (কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত অধ্যায়)।” অর্থাৎ সমাজবদ্ধ মানুষের সমন্বিত থাকা ও সংহতকরণের শর্তে রাষ্ট্রের উদ্ভব বা অস্তিত্ব এবং এই সামষ্টিক কলেবর বা আয়তনের সাথে এই সমন্বয়গত সংহতকরণের বিকাশ বা বৈশিষ্ট্য সম্পৃক্ত । অর্থাৎ সমাজ অনুবর্তিতায় রাষ্ট্রের রূপান্তর । ফলে উৎপত্তি থেকে বিকাশ-বৈশিষ্ট্য পর্যন্ত যা সমাজ সম্পৃক্ত হয়ে অস্তিত্বশীল, তা কেবল অনস্তিত্বশীল বা লুপ্ত হতে পারে- সমাজ অনস্তিত্বশীলতার পথ ধরে ।

 

এক্ষেত্রে মার্কস্ বর্ণিত শ্রেণী বৈষম্য লুপ্ত বা শ্রেণীহীন হওয়ার সাথে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব লুপ্ত হওয়ার তত্ত্ব একেবারেই খাটে না । মার্কস তাঁর সমাজদর্শনে রাষ্ট্রকে ‘শাসকের হাতিয়ার’ বা শোষণের যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন । এক্ষেত্রে যা কহতব্য তা হলো, মানবসমাজের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক অভিযোজনই (মনুষ্য বৈশিষ্ট্যে) শক্তিশালী বা প্রধান হিসেবে প্রমাণিত বিধায়, প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথ ধরে বিদ্যমান কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র- যা আজকের বাস্তবতায় জনসমাজ বিরোধী দেউলিয়া চরিত্র লাভ করলেও তা কেবল রাষ্ট্রের একটি রূপ মাত্র! কিন্তু সেটা দেখে তার বিরোধিতায় খোদ রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা মানে আগাছা পরিষ্কারের নামে মূল গাছটাকেই কেটে ফেলা । যা কেবল অবৈজ্ঞানিক বা অবাস্তব নয়, চিন্তাগত দিক থেকে ভয়ানক ভুলও বটে ।

         

মার্কসের ‘সাম্যবাদী সমাজ’, যে অর্থে যতোখানি সমাজ, সে অর্থে সেখানে ততোখানি রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিদ্যমান, তা কথিত আদিম সাম্যবাদী সমাজই হোক আর ভবিষ্যৎ সাম্যবাদী সমাজ হোক-সমাজ বা সামষ্টিকতা আছে মানেই অনুবর্তিতায় রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিদ্যমান । এক্ষেত্রে কথিত আদিম সাম্যবাদী সমাজের ক্ষেত্রেও যেমন তিন বা ততোধিক মানুষের অস্তিত্ব তথা গুহা বা গোষ্ঠী, যেভাবেই তাদের জীবনযাপনের চালচিত্র চিত্রিত হোক না কেন- সমষ্টিগত শর্তে সমন্বিত বা সংহতকরণে অর্থাৎ বিধি-বণ্টনে রাষ্ট্রের তদবাস্তবতার রূপ অস্তিত্বশীল ছিল, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রশ্নেও সামষ্টিক অর্থে সমাজ অস্তিত্বশীল মানে তদবাস্তব রূপে রাষ্ট্র বা সংগঠন-কাঠামো অস্তিত্বশীল থাকবে- রূপটা যেমনই হোক ।

 

এটা শুধু মার্কস্বাদের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং প্রচলিত চিন্তাধারার সাধারণ প্রবণতা । যা বহু আগেই প্রবণতা বা ঝোঁক না থেকে পাশ্চাত্য চিন্তাধারার পথ ধরে ক্রমশঃ আজ বৈশ্বিক চিন্তাধারার মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে । অথচ অর্থবাদী এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব সহ ethics-morality’, বিয়ে-থা, বউ-বাচ্চা, ধর্ম, সাহিত্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি- এককথায় তাবৎ দুনিয়ার ঠিকুজি করে ফেললেও সেই অর্থনীতিও যে পূর্ণাঙ্গতা পায়নি বা অপ্রকৃতস্থ থেকে গেছে তা বোঝা যায়- পৃথিবীতে প্রচলিত management-কে অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখা থেকে, অথচ বিপরীতটাই সত্যি । অর্থাৎ management-এরই অংশ বা অনুবর্তী অর্থনীতি, ঠিক যেমন সমাজের অংশ বা অনুবর্তী রাষ্ট্র । ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়লে যা হয়, শেষ পর্যন্ত আর্থিক মন্দা থেকে জীবনের সব ক্ষেত্রে তা-ই হচ্ছে ।

 

চোখের সামনে কোনো সীমা না মেনেই আই.এম.এফ-বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে, তবুও তাতে সমাধান না হয়ে আর্থিক মন্দার সমাধানে সব দেশের নেতাদের এক মঞ্চে আসতে হলো কেন? এর কারণ, রাষ্ট্র হলো প্রাতিষ্ঠানিক সব ক্ষেত্রের মতো আর্থিক ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতি তার অংশ বলেই তার সংকট সমাধানে- রাষ্ট্র তথা রাজনীতিই অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে । আর যেহেতু সংকটটা বৈশ্বিক এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে কোনো একক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নেই, সেহেতু সব লেঠেল সর্দারদের তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিতে এক মঞ্চে আসতে হয়েছে ।

 

বানের জলে চারপাশ ভেসে গেলে সাপ-ব্যাঙ-নেউলকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ভুলে একসাথে দিনাতিপাত করতে দেখা যায় । তেমনি আর্থিক মন্দার সময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ভুলে মানচিত্রিক সীমানা ছাপিয়ে এক মঞ্চে উঠে আসা বা শলা-পরামর্শ সভার হিড়িক দেখে বোঝার উপায় ছিল না- কে কোন দেশের নেতা ।

 

সমাজটা বৈশ্বিক সমাজ হওয়াতে তার অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানে বা সংহতকরণে কোনো একক রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক তথা কাঠামোবদ্ধ রূপ অনিবার্য, সেটা না থাকাতে এই ত্রাহি ত্রাহি ঐক্যের রাজনৈতিক উদ্যোগ । যেহেতু তাঁরা রাজনৈতিক নেতা, তাই তাঁরা যা করছেন তাতে নিঃসন্দেহে রাজনীতিক সীমানাকেই প্রকাশ করে, অর্থাৎ রাজনীতির অংশ অর্থনীতি- এই স্বাভাবিকত্বটুকুই এক্ষেত্রে প্রমাণিত হচ্ছে, অথচ তাঁরা কি এটা বুঝছেন না? নাকি জেনে-বুঝে না বোঝার ভান করছেন! ‘ভান’ হতে পারে কারণ অখন্ড বিশ্বের বাস্তবায়ন লেঠেল সর্দারদের সংরক্ষিত সীমানার অস্তিত্বটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে এবং সীমানাকেন্দ্রিক সংঘর্ষ বা হিংসা লুপ্ত হওয়ার শর্তে লাঠিয়াল বাহিনী বা লাঠি-অস্ত্রর ব্যবসাও অতীত হয়ে যেতে পারে, যার সাথে সাথে বর্তমানের জাতীয়তাবাদ বা গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলো ‘লা-জওয়াব’ হয়ে উঠবে ।

         

কিন্তু কফি আনানের (পূর্বোক্ত) উদ্ধৃতিতে বোঝা যায়- বিশ্বসমাজ সংহতকরণে যে একক রাজনৈতিক কাঠামোগত রূপ, তা পৃথিবীর অজানা । কারণ- ইতোপূর্বে তাদের বর্ণিত দাস, সামন্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর যে আদল- তা ‘একজন’-এর অনুবর্তী হয়ে কাঠামোবদ্ধ রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ‘বিশ্বসমাজ’ অনুবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোবদ্ধ রূপটা সম্পূর্ণ এর বিপরীত শর্ত নিয়ে উঠে এসেছে । সেই সাথে, রাষ্ট্রকাঠামো বলতে পৃথিবীর কাছে ‘একজন’-এর অনুবর্তিতায় গড়ে ওঠা রাষ্ট্রকাঠামোর বাইরে আর কোনো রাজনৈতিক কাঠামোবদ্ধ রূপ জানা নেই ।

 

অর্থাৎ স্পষ্টতঃ বিশ্ব এখন যেভাবে সমাজ তথা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ভাবাদর্শগত সংকটে পড়েছে, তা ইতোপূর্বের যে-কোনো সময়ের চেয়ে তীব্র এবং তা সমাধান তো দূরের কথা, তার সীমানা দেখার চোখটাও অর্থবাদী ঠুলিতে ঢাকা পড়েছে ।

 

প্রচলিত রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ধারা বা বৈশ্বিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কবে থেকে এই ভ্রান্তির পথে চলতে শুরু করেছে, এর একটা সহজ উত্তর দেয়া যায় । লাঠিয়াল সর্দার ও লেঠেল সীমানার মধ্যেই যেদিন থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে বোঝা শুরু হয়েছে, সমাজের সীমানার বদলে লেঠেল কর্তৃক নির্দিষ্ট কোনো ভূমিজ সীমানার মধ্যে সেই লেঠেল সর্দার ও লেঠেল বাহিনীর প্রতাপভিত্তিক কর্মকান্ডকে তথা কেবল কর্তৃত্ব ভিত্তিক লাভ-লোকসানকেই প্রাধান্যে এনে রাষ্ট্রিক আলোচনা অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে- তখন থেকেই এই অদৃশ্য ফাঁদের দেয়াল তাঁদের চিন্তাকে ভুল পথে ভ্রান্তির খাদে ঠেলে দিয়েছে ।

 

রাষ্ট্র বলতে কর্তৃত্ববাচকতার অর্থই যে এক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে, তার প্রকৃষ্ট একটি দৃষ্টান্ত হলো নৈরাষ্ট্রবাদ । রাষ্ট্রতাত্ত্বিক আলোচনায় নৈরাষ্ট্রবাদ কর্তৃত্ববাদী বিরোধিতা বা লুপ্ত অর্থে রাষ্ট্রের লুপ্ত হওয়াকে বুঝিয়েছে । যাঁরা কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতায় নেমে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বসেছেন!

 

অর্থাৎ সংহতকরণের শর্তে যখন লাঠিয়াল বাহিনী বা সর্দারের উদ্ভব ঘটেছে, মার্কস্ যাকে শ্রেণীদ্বন্দ্বের উৎস হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন এবং উদ্ভব অব্যবহিত সর্দার ও সর্দারবাহিনীর কর্মকান্ড দৃশ্যকল্পে প্রধান হয়ে রাজা-গজা, পাইক-পেয়াদা, গোমস্তা-সেরেস্তাদার, উজির-নাজির, নায়েব ইত্যাদি মূলতঃ লেঠেল-সর্দার ও লেঠেল বাহিনীর ‘কর্তৃত্ব’ বা চক্কর-ই রাজা ও রাজভৃত্যের অভিধায় ভূষিত হয়ে রাষ্ট্রতাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে । সে অর্থে প্রাগৈতিহাসিকতা বাদ দিলে রাষ্ট্রতাত্ত্বিক আলোচনার ইতিহাস শুরুই হয়েছে ‘কর্তৃত্ববাচকতা’র আবহ থেকে । ফলে প্রতিষ্ঠানগত মূল অর্থ বা স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য তথা ‘সমন্বয়’গত বিষয়াদি অদ্যাবধি অপ্রধান বা চোখ এড়িয়ে গেছে ।

         

কারণ প্রকৃতিগতভাবে মানুষ কেবল চেহারার দিক দিয়েই নয়- বোধগত দিক থেকেও একে অপরের থেকে ভিন্ন এবং মতামতের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকভাবেই মতভিন্নতার বিষয়টা আছে । কিন্তু ‘constant-যাপন’ সম্পৃক্ততায় সামষ্টিক হওয়া বা সংহত থাকার শর্তে ‘বোঝা-পড়া’ মারফত সমন্বিত বা ‘এক’ হওয়ার অর্থকেই প্রকাশ করে, অর্থাৎ মানবীয় সংঘবদ্ধতায় ‘একমত’ বা ঐক্যমতের বিষয়টা অনিবার্য হয়ে ওঠে । প্রকৃতিগতভাবে ভিন্নমতের বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও (পূর্বোক্ত জৈবিক প্রয়োজন ‘খাদ্য ও নিরাপত্তা’ থেকে উদ্ভূত) ‘অস্তিত্ব’ টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে- সামষ্টিক হওয়ার শর্তে ‘একমত’ বা ঐকমত্যের অনিবার্যতা ‘প্রধান’ হয়ে পড়ে । আর নিঃসন্দেহে সামাজিক সংঘবদ্ধতায় উক্ত ‘এক’ বা একমত কিংবা ঐকমত্য তথা সমন্বয়ের মাধ্যম বা সংহতের মূর্তায়নে ‘এক’জনই নির্দিষ্ট হয় । ‘constant-যাপন’ সম্পৃক্ততায়- প্রত্যক্ষ সীমানা বা কাছাকাছি ‘বোঝা-পড়া’র ক্ষেত্রে সমন্বয়ের বিষয়টা স্পষ্ট হলেও, অপ্রত্যক্ষ বা দূরবর্তিতায় যদি যোগাযোগ মাধ্যম অপ্রতুল থাকে, তবে জানা-বোঝার বিষয়টা গৌণ হয়ে পড়ে, অর্থাৎ সংঘবদ্ধতা সীমানা বৃদ্ধির সাথে সাথে অপ্রত্যক্ষতা বা দূরবর্তিতাও বৃদ্ধি পায় এবং যোগাযোগ মাধ্যমের অপ্রতুল সমাজ বাস্তবতায় পূর্বোক্ত ‘সমন্বয়’-এর শর্তে উদ্ভূত ঐকমত্যের ‘এক’জন কেবল নির্দেশ দানকারী এবং ব্যাপকের কাছে তা প্রশ্ন বা মতামতহীন অবশ্যপালনীয় হয়ে দাঁড়ায় । অর্থাৎ সংহতির শর্তে ‘সমন্বয়’-এর বৈশিষ্ট্য থেকে উদ্ভূত ঐকমত্যের সেই ‘এক’জন এখানে ‘নির্দেশ দানকারী’ বা ‘কর্তৃত্ব’বাচকতার প্রতিভূ হয়ে পড়েছে এবং উক্ত ‘জারীকৃত নির্দেশ’ বাস্তবায়ন বা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ক্রমশঃ জন্ম উজির-নাজির, অমাত্য তথা আজকের আমলাতন্ত্র-যা মূলতঃ অপ্রত্যক্ষতা বা দূরবর্তিতার শর্ত থেকে উদ্ভূত তথা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বৈশিষ্ট্যে বিকশিত । অর্থাৎ সংহতির শর্তে ‘সমন্বয়’-এর বৈশিষ্ট্য গৌণ হয়ে সর্বক্ষেত্রে ‘কর্তৃত্ব’বাচকতা প্রধান হয়ে গেছে ।

 

সমাজ বা সংঘবদ্ধতার সীমানা বৃদ্ধির এই ইতিহাস হাজার হাজার বছর পেরিয়ে আজকের পর্যায়ে এসেছে । সেদিক থেকে বলতে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্রশাস্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে সেদিন মাত্র ।

 

এই প্রশ্নে পৃথিবীর খুব পুরনো ইতিহাস না জানলেও চলে, কারণ ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই অক্টোবর অর্থাৎ প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই মূলতঃ পৃথিবীর ভূমিজ পূর্ণতা এসেছে । সেদিক থেকে কাছের ইতিহাস বলতে দুনিয়া কাঁপানো ইংরেজ কিংবা ব্রিটিশ রাজত্বের দৃষ্টান্ত টেনেই বলা যায়- এই রাজত্ব যার উত্তরাধিকার, তা লেঠেল সর্দারের পরবর্তী সংস্করণ টিউটোনিক ট্রাইব অর্থাৎ চোরের সাহসী সংস্করণ যেমন ডাকাত, তেমন টিউটোনিক ট্রাইব বলতে অ্যাঙ্গল্স্, স্যাক্সন, জুটস্ তথা তিনটি জার্মান ডাকাত গোষ্ঠীর পথ ধরেই আজকের ইংরেজ জাতি ।

 

‘ভদ্রতা’ যেমন ন্যাংটোর কাছে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে বিবেচিত, তেমনি ‘আতিথেয়তা’ ডাকাতের কাছে সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত; কিন্তু উক্ত রাষ্ট্রতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আতিথেয়তা উন্নত সংস্কৃতির পরিচায়ক না হয়ে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে চিহ্নিত এবং তস্কর বা ডাকাত সংস্কৃতি প্রচলিত ইতিহাসে বীরত্ব হিসেবে পূজ্য । এ উপমহাদেশের ‘কালিকট- ভাস্কো দা গামা’র অধ্যায় সেটাই বলে । ফলে ইতিহাসকে আমাদের চোখের সামনে দেখতে লেঠেল সর্দার ও লাঠিয়াল অভিধা বরং অনেক বেশি উল্লিখিত রাষ্ট্রতাত্ত্বিকতার কাছাকাছি । তাই বোঝার স্বার্থে লেঠেল প্রসঙ্গ এসে পড়েছে ।

 

পৃথিবীতে টিকে থাকা অদ্যাবধি সবচেয়ে পুরনো ও বৃহৎ সমাজ এবং ভূমিজ মাপে তা ‘উপমহাদেশ’ হিসেবে খ্যাত- সেটা এই উপমহাদেশ এবং এর জনসমাজ । এর বয়স প্রায় পাঁচ হাজার বছর । ব্রিটিশ চোখ দিয়েই প্রধানত পৃথিবী ভারত উপমহাদেশ তথা ভারতবর্ষের জনসমাজকে চেনে এবং যথারীতি বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ ধরে এখানেও অনেকের চোখে এই জনসমাজ ‘অচলায়তন’ হিসেবে পরিচিত । খুব স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে প্রাচীনত্বই মুখ্য বিধায় এখানে তা যতো স্পষ্ট হওয়া সম্ভব- বোধ করি পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভব নয় । কারণ প্রায় একই বৈশিষ্ট্য নিয়ে অস্তিত্বপূর্ণ থেকে যাওয়া কিংবা এখন পর্যন্ত টিকে আছে এমন বৃহৎ আয়তনের পুরনো সমাজ বা ব্যাপক জনসমাজের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই বললেই চলে ।

         

সেক্ষেত্রে পৃথিবীর অপরাপর ভূখন্ডের মতো রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে এ-উপমহাদেশের ইতিহাসেও পূর্বোক্ত ‘লেঠেল’ প্রাসঙ্গিক আলোচনায় অন্যতম একটি রাজত্বের দৃষ্টান্তে ‘মোঘল সাম্রাজ্য’ সুবিদিত । এই সাম্রাজ্য মূলতঃ সম্রাট আকবরের সময়ই স্থিতিশীলতা লাভ করেছিল এবং এটা সমাজ অনুবর্তী তথা সমাজের সাথে আপোস করার কারণেই সম্ভব হয়েছিল । এর বিপরীত হলেই অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে । শুধু মোঘল সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে নয়, এ-উপমহাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্র বরাবরই স্থায়িত্ব বা এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা বিপরীতক্রমে অস্তিত্ব সংকটের ক্ষেত্রে প্রধানত সমাজের সাথে আপোস বা অনুবর্তিতার বিষয়টিই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে । এক্ষেত্রে আপোস বা অনুবর্তী বলতে- ‘সমাজকে না ঘাটানো’র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত । পাশাপাশি সমাজগতভাবে একই বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও সেই সমাজ-আয়তনের মধ্যে একই সময়ে বহু স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং একাধিক রাষ্ট্রের উদ্ভব ও লুপ্ত হওয়া কিংবা অনেক সময় প্রায় উপমহাদেশ জুড়ে একটি মাত্র বৃহৎ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সমাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো হেরফের না হওয়া প্রমাণ করে- জনসমাজ রাষ্ট্রের চেয়ে বৃহৎ এবং এক সমাজ অভ্যন্তরে বহু রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা উত্থান-পতন ঘটলেও কিংবা একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের শাসন কার্যাদি চললেও সমাজ তার আপন ধারায় বহমান থাকায় আক্ষরিক অর্থেই প্রমাণ হয়- সমাজ বৃহৎ আয়তনে বহমান এবং রাষ্ট্রসমূহ তার অনুবর্তিতায় পরিবর্তমান ।

 

এক্ষেত্রে উল্লিখিত সমাজ অনুবর্তী প্রাসঙ্গিকতায়- ‘সমাজকে না ঘাটানো’ এর অর্থপূর্ণতা মূলতঃ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাচক সংহতকরণ নয়, বরং সমন্বয়গত সংহতকরণকেই প্রকাশ করে । আর এই সমন্বয়গত সংহতকরণে রাষ্ট্রীয় অবস্থান সম্ভবপর হয়েছে, কারণ কর্তৃত্ববাচক প্রাধান্যে সমাজগত অবকাঠামোতে জনপদ তথা গ্রামগুলি স্বয়ম্ভর বৈশিষ্ট্য- আর্থিক সহ বিচার-নিরাপত্তা তথা সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থায় স্বকীয় কর্তৃত্বপূর্ণতায় সম্পূর্ণ ছিল, এমন-কি রেলপথ স্থাপন তথা প্রযুক্তিগত অভিঘাত সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত এখানে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে প্রত্যক্ষ কোনো রাষ্ট্রীয় স্মারকপূর্ণ মুদ্রার প্রচলন বা প্রভাবও অপ্রধান ছিল । অর্থাৎ কর্তৃত্ব বা শক্তির ভরকেন্দ্রে সাধারণভাবে গ্রামীণ অবকাঠামোই প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং পরম্পরা ও পারস্পরিকতার পথ ধরে বৃহৎ সমাজ-আয়তনে নিজ নিজ স্বতন্ত্র-স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই অখন্ড সমাজরূপে বিদ্যমান থেকেছে ।

 

স্থানীয় সমাজ-সংগঠনের স্বনির্ভর এই শক্তির কথা অনেকেই বলেছেন, এমন-কি ইতিহাসও একেই সমর্থন দেয় । কিন্তু প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুসারে, যার উৎস পাশ্চাত্য- যেখানে সংহতি ও নিরাপত্তার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকা অপ্রধান করে দেখা কিংবা রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা ছাড়া একটি ব্যাপক জনসমাজের সংহত বা স্থিতিশীল থাকার বিষয়টা চিন্তা করা কেবল অসম্ভবই নয়, এমন-কি রাষ্ট্রহীন ব্যাপক জনসমাজের সংহতি বা অস্তিত্ব কল্পনা করাও সেখানে কঠিন । যেমনঃ এরিস্টটল মানুষের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক বা সীমানা নির্ধারণে রাষ্ট্র বা রাজনীতিহীন মানুষকে ‘দেবতা’ বা ‘জংলী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন । ফলে ইতিহাসগতভাবে পুরনো অথচ ব্যাপক জনসমাজের স্থিতিশীল ও সংহত অবস্থার ব্যাখ্যা না থাকায়- বিস্ময় সহ অচলায়তন, মিস্টেরিয়াস বা দৈব-অতিপ্রাকৃত ইত্যাদি বিষয়াদিতে জট পাকিয়ে আছে । বিশেষতঃ আধুনিক সময়েও নতুন করে দেখা-বোঝার কোনো উদ্যোগ না থাকাতেই বোঝা যায়, অদ্যাবধি প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি কতোটা অপরিণত!

 

এক্ষেত্রে মাত্র চারশ বছর নয়, প্রায় চার/পাঁচ হাজার বছর যাবত আজকের পৃথিবীর জন্যে সমাজ-রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক তথা অখন্ড বিশ্বের সমাজ-আয়তনে ‘রাষ্ট্র ও সমাজ’ এর পারস্পরিক সম্পর্ক তথা প্রাসঙ্গিক সিদ্ধান্ত ‘সমাজস্থিত সংগঠন বা প্রাতিষ্ঠানিক (রাষ্ট্র সহ অপরাপর প্রতিষ্ঠানগত) কাঠামোগত দিকটা মূলতঃ উক্ত প্রাতিষ্ঠানিকতার সাথে বা তার উপর নির্ভরশীল নয় বরং সমাজ কাঠামো তথা সমাজ অনুবর্তী বা সমাজ সংশ্লিষ্টতায় তার উপর নির্ভরশীল’ এবং সমাজ-পরিবর্তমানতা নির্ভরশীল যন্ত্রগত উন্নয়নের উপর, এই সিদ্ধান্ত ও আলোচনার ঐতিহাসিক উপাদান সমেত সেই পুরনো সমাজটার অস্তিত্ব এখনও রয়ে গেছে । এমন-কি আজকের বৈশ্বিক অখন্ড সমাজ-আয়তনে বিভিন্ন জনপদগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও এককেন্দ্রের সাথে তার ভূমিকার যে প্রত্যাশিত রূপকল্প, তার কিছু উপাদানও এখানে মজুদ আছে ।

 

যদিও বিগত বিশ-ত্রিশ বছর যাবৎ ইতোপূর্বের যে-কোনো সময়ের চেয়ে তা অনেক বেশি দ্রুত গতিতে ভাঙছে ।

 

কারণ, পূর্বেই বলেছি সমাজ বা রাষ্ট্র মানেই সামষ্টিকতার আলোচনা । যে শক্তিবলে দশ জন চাঁদাবাজ দশ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম বাজারে গিয়ে চাঁদাবাজি করতে পারে, সেই শক্তিবলে পাঁচশ লেঠেল দিয়ে একজন লেঠেল সর্দার পঞ্চাশ হাজার মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে । বিশেষ উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ ও সেই লক্ষ্যেই সজ্জিত হওয়ার কারণেই তারা তা পারে, কিন্তু হাট-বাজারে উপস্থিত মানুষ বা কোনো অঞ্চলের পঞ্চাশ হাজার মানুষের মধ্যে তা থাকে না । এভাবে লেঠেল সর্দার ও তার লেঠেল বাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এলাকা-ই রাজা ও রাজ্যের সীমানা এবং পঞ্চাশ হাজার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার শর্তেই লেঠেল বাহিনীসমেত পূর্বোল্লিখিত উজির-নাজির, নায়েব-সেরেস্তাদার তথা আজকের সেনা বা আমলাতন্ত্র । অর্থাৎ দূরবর্তী ও ব্যাপককে নিয়ন্ত্রণেই উক্ত কাঠামোগত কলা-কৌশল । কারণ, পঞ্চাশ হাজার মানুষ বিশাল আয়তন জুড়ে থাকলেও যোগাযোগ মারফত পরস্পর সম্মিলিত অবস্থায় থাকে না । ফলে, মোট পাঁচশ জন হলেও পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে মুখোমুখি হতে হয় বড়জোর একশ জনের । অর্থাৎ পঞ্চাশ হাজার যোগাযোগহীনতায় বড়জোর একশ জনই থেকে গেছে । এভাবেই পাঁচশ জনের পিছনে পড়ে গেছে একশ অর্থে পঞ্চাশ হাজার, যথারীতি রাষ্ট্রতত্ত্বেও সমাজ পিছনে পড়ে গেছে । সমাজ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সীমা বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্রমশঃ লেঠেল সংরক্ষিত ভূমিজ সীমাই প্রাসঙ্গিক প্রাধান্যে উঠে এসেছে এবং সর্দারকে ঘিরে ঐক্যের এই যে শক্তিকেন্দ্র- তাকে ঘিরেই রাজধানী বা রাজদন্ড । অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই এককেন্দ্রিক ক্ষুদ্রের অধিভুক্ত বা অনুবর্তীতে বৃহৎ বা ব্যাপককে আনয়নমূলক ব্যবস্থা তথা ক্ষুদ্রের একক কর্তৃত্বাধীনে ব্যাপক অংশকে অন্তর্ভুক্তিকরণের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাই বিদ্যমান থেকেছে তথা কেন্দ্রীভূত বৈশিষ্ট্যই প্রাধান্যে থেকেছে ।

 

[যে কারণে রাজা-গজা তাড়িয়ে দিলেও কিংবা লেঠেল সর্দার না থাকলেও নির্বাচনের মাধ্যমে আজকে সেই ‘একজনকেই’ নির্দিষ্ট করতে হচ্ছে । অর্থাৎ রাম না থাকলেও রামের খড়ম তার চাই-ই । আর এটাই আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মাহাত্ম্য । গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শ এখনও ইউটোপিয়া । সমাজ, মানুষের সীমানায় তার আধুনিক কাঠামোগত রূপ অনুপস্থিত । আদর্শগত সংকটে বিপর্যস্ত মানবসমাজে গণতান্ত্রিক ভাব-বিহ্বলতায় অতিকথন এক ধরণের মলম হিসেবে কাজ করছে, পাশ্চাত্য ভাষায় যাকে ‘ডগমাটিজম’ বলা যায়, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই বলেই যেখানে যেমন খুশি সেখানে তেমন তেমন প্রয়োগ করা যাচ্ছে । ইরাকে মার্কিনি গণতন্ত্রের এক চেহারা, ইসলামী গণতন্ত্র এক চেহারা, রাশিয়ায় চলছে এক গণতন্ত্র, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যতোক্ষণ গুঁতো না দিয়েছে ততোক্ষণ পর্যন্ত এটাও কারও কারও মতে গণতন্ত্রের ‘নিকষিত হেম’ ছিল । কিন্তু যে গণতন্ত্রে এত মাহাত্ম্য, সেই গণতন্ত্রের চেহারা সুনির্দিষ্ট না বলে যেখানে সেখানে লাগানো যাচ্ছে । ঠিক যেমন ‘ঘোড়ার ডিম’ বিফল অর্থে দেদারসে প্রয়োগ হয় ।]

 

কিন্তু প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথ ধরে বিশ্বসমাজ বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাপক জনসমাজ-অনুবর্তিতায় প্রত্যক্ষ বা পারস্পরিকতাপূর্ণ, যা কাঠামোগত দিক থেকে ‘সামষ্টিকতার’ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করছে । অর্থাৎ যন্ত্রের অভিঘাত ভূমিজ সীমানা মানে না বলেই যেমন ফরাসী বিপ্লব বা রেনেসাঁ অর্থাৎ যুগান্তকারী গণবিক্ষোভ বা গণজাগরণগুলি লাগোয়া দেশগুলিতে প্রায় একই সময়ে ঘটতে দেখা গেছে, তেমনি অতীতে লাগোয়ো দেশগুলির ক্ষেত্রে যা সত্যি, এখন সারা বিশ্বের ক্ষেত্রে তা সত্যি । গ্রামের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে একজন মানুষের সাথে কথা বলা বা যোগাযোগ করতে যে সময় লাগতো, এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যোগাযোগ করতে তার চেয়ে কম সময় লাগে । ফরাসী বিপ্লবের বিস্তারে যতো সময় লেগেছিল- অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরব গণবিক্ষোভ, পৃথিবীতে তা ছড়াতে অতো সময় লাগেনি । অর্থাৎ আরব-আমেরিকা হয়ে বিস্তৃত এই বিক্ষোভের মাধ্যমে বিশ্বসমাজ সর্দার সংরক্ষিত ভূমিজ সীমানার ভ্রান্তি ছাপিয়ে প্রথম নিজের পূর্ণাঙ্গ চেহারাটাই প্রকাশ করে দিয়েছে । এখন আর পূর্বোক্ত ‘একশ জন’ নয়, বরং ‘পঞ্চাশ হাজার’, মোট চেহারায়- “পঞ্চাশ হাজার” হয়েই দেখা (সাধারণভাবে ভিডিও কনফারেন্স সহ রেডিও, টিভি, মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদি মারফত) দিচ্ছে । মোটকথা, পূর্বোল্লিখিত সংঘবদ্ধতার সীমানা বৃদ্ধির সাথে সাথে যোগাযোগ মাধ্যমের অপ্রতুলতা হেতু যে পশ্চাত সমাজ বাস্তবতা থেকে তথা সংহতির শর্তে- ‘অপ্রত্যক্ষতা’ বা ‘দূরবর্তিতা’র শর্ত থেকে উদ্ভূত হয়ে আজকের আমলাতন্ত্র তথা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা- যা শুধু ‘জারীকৃত নির্দেশ’ বাস্তবায়নে জন্ম বা প্রতিষ্ঠিত, তা বাস্তবতা হারিয়েছে ।

 

এক্ষেত্রে কেবল বাস্তবতা হারিয়ে অতীত-অকার্যকর হয়ে গেছে বললে ভুল হবে, বরং বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় চরম নৈরাজ্য-বিপর্যয়ের আকর হয়ে বসে আছে । যেমন, দেশে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ডুবে যাওয়া কোনো অঞ্চলের বিপর্যয়- গৃহহীন ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের প্রত্যাশা সহ অসহায় অবস্থা সারাদেশ মিডিয়া মারফত প্রত্যক্ষ করলো এবং সেই প্রত্যাশা শুধু ঐ অঞ্চলভুক্ত মানুষের দাবি না হয়ে সারাদেশের মানুষের দাবি হয়ে উঠলো । এক্ষেত্রে ঐ ক্ষুধার্ত মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য গুদামে মজুদ আছে, এমন-কি সরকার বা কর্তৃপক্ষও সে দাবি পূরণে যথাযথ উদ্যোগী হলো । কিন্তু আইন বা নিয়ম-নীতি, পথ-পদ্ধতি মানতে গেলে অবশ্যই তাকে প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক পথ ধরেই যেতে হবে । কারণ জনগণের চাওয়া পূরণে এটিই নিয়মসিদ্ধ পথ, বাকি সব নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে করতে হয় । অথচ সে নিয়মসিদ্ধ আমলাতান্ত্রিক পথে গেলে ১৮ মাসেও খাদ্য পৌঁছাবে কি না সন্দেহ । অতএব নিয়ম ভেঙে বা ব্যত্যয় ঘটিয়েই সে খাদ্য পাঠাতে হচ্ছে । শুধু খাদ্যের ব্যাপারেই নয়, ‘জুতা সেলাই থেকে চন্ডী পাঠ’, ‘ভোটার কার্ড থেকে রাস্তা-ঘাট’ সর্বত্রই অহরহ ঘটছে । এক্ষেত্রে ‘জরুরি অবস্থা’র দোহাইয়ে নিয়মভাঙাকে নিয়মসিদ্ধ করে নেওয়ার রেওয়াজ পৃথিবীতে উঠে এসেছে এবং বিগত ৬০/৭০ বছরে এত বেশি প্রয়োগ হচ্ছে যে, এটাই বিকল্পহীন প্রধান বা স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে পড়েছে! অথচ এটা না করলে কেবল ঐ অঞ্চল নয়, বরং সারাদেশে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য । কারণ প্রয়োজনটা বন্যাকবলিত উক্ত অঞ্চলের ‘একশ জন’-এর হলেও দাবিটা মিডিয়া মারফত ইতোমধ্যে ‘পঞ্চাশ হাজার’-এর হয়ে পড়ে । অর্থাৎ সরকারের সদিচ্ছা ছিল, খাদ্য গুদামে খাদ্য ছিল, শুধু প্রচলিত সেকেলে বিধি-বিধান বা আমলাতান্ত্রিক পথে গেলেই দ্রোহ-বিপর্যয়-মৃত্যু আর না গেলেই নিয়ম ভাঙা! কিন্তু যেভাবেই হোক নিয়ম রাখা বা নিয়ম ভাঙা উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতিই উঠে আসতে বাধ্য হচ্ছে । এ-কারণে শুরুতেই বলে এসেছি- চলমান আরব-আমেরিকান বিদ্রোহের মতো গণবিক্ষোভের ঢেউ পৃথিবীতে বার বার, ঘন ঘন ঘটতে থাকবে । কারণ বৈশ্বিক জনসমাজ এখন তার সামষ্টিকতার শর্ত নিয়ে মানুষের মুঠোয় মুঠোয় ফিরছে- ক্রমশঃ বিশ্বসমাজ (মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মারফত) একটি গৃহের ‘সামষ্টিকতা’য় উঠে আসছে ।

 

[স্মর্তব্য থাকে যে ‘বিশেষ বা জরুরি’ অবস্থা থাকতেই পারে এবং সে কারণে বন্যা পরিস্থিতির উদাহরণে বিশেষ উদ্যোগও বিধিসম্মত হতেই পারে, এটা এক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয় নয় । প্রাসঙ্গিক আলোচনায় মূলত বোঝানো হয়েছে- পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বিগত ৬০/৭০ বছর যাবৎ, বিশেষত উন্নত দেশগুলোতে, ‘জুতা সেলাই থেকে চন্ডী পাঠ’ সবক্ষেত্রেই ‘বিশেষ অবস্থা’র বিধি-ব্যবস্থা গ্রহণ ও ‘বার বার’ প্রয়োগ প্রমাণ করে, সংহতির শর্তে থাকা প্রচলিত রাষ্ট্র বা সংগঠন-কাঠামো যে অকার্যকর হয়ে উঠেছে এবং ব্যাপক মানুষের কাছে তা স্বাভাবিক- এমন-কি স্বস্তিদায়ক হওয়াতে বোঝা যায়, এ-অকার্যকারিতা মানুষের কাছেও প্রমাণিত পীড়াদায়ক ।]

 

এক্ষেত্রে ‘সামষ্টিকতার’ বৈশিষ্ট্য বলতে বর্তমান বাস্তবতায়- সাংগঠনিক কাঠামোগত স্বাভাবিক সংহতকরণের সাথে সাথে যুগপৎ ‘সমন্বিত’ থাকার শর্তকেও প্রকাশ করছে । ফলে ক্ষুদ্র বা একজনের ‘কর্তৃত্ব’ অনুবর্তিতায় গড়ে ওঠা যে রাষ্ট্রকাঠামো (বিদ্যমান কেন্দ্রীভূত সংগঠন-কাঠামো)- বর্তমান প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথ ধরে তার ‘বিপরীত অর্থ’কে প্রকাশ করছে । আর তাই সমকালীন পৃথিবী ও তার সমাজ বাস্তবতায় যথার্থ কোনো সংগঠন-কাঠামোর ক্ষেত্রে ‘সমন্বিত’ ও ‘সংহতকরণ’-এর যুগপৎ বৈশিষ্ট্য থাকা অনিবার্য । উক্ত যুগপৎ বৈশিষ্ট্যসমূহকে একক অর্থবোধনে প্রকাশ করতেই মতাদর্শিক দিশায় ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ অভিধা বা ‘প্রত্যয়’ গৃহীত । অর্থাৎ মুক্তিজোট সুনির্দিষ্ট মতাদর্শিক দিশায় ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ (Decentralised centralisation)-এর সংগঠন-কাঠামোকে গ্রহণ করেছে- যা একই সাথে বর্তমান পৃথিবীর সংগঠন-কাঠামো হিসেবে ঘোষিত ।

 

উক্ত প্রত্যয়কে স্পষ্টীকরণে বলা যায় “ ...বিজ্ঞাননিষ্ঠতার পথেই আমরা বলছি, জনসমাজের স্বার্থে (কাঙ্ক্ষিত) রাষ্ট্রের যে রূপ, তা ইতোমধ্যে বিকেন্দ্রীভূত চরিত্রের দিকে ধাবমান এবং সমাজ বাস্তবতার প্রয়োজনেই তা এক অনিবার্য পরিণতি বা সত্য এবং বিকেন্দ্রীভূত, যার অর্থ বলতে আমরা বোঝাচ্ছি- ব্যাপক জনসমাজ ও তার স্বতঃস্ফূর্ততাই এর শক্তির ভরকেন্দ্র হিসেবে স্থাপিত হবে; সেই সাথে বিচ্ছিন্ন কোনো কিছুই সমাজ সংঘবদ্ধতার সংজ্ঞার সাথে অবৈজ্ঞানিক বিধায় তা কেন্দ্রীকরণ (সমন্বয়) মুক্ত হতে পারে না । লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ‘কেন্দ্রীকরণ’ কিন্তু ‘কেন্দ্রীভূত’ নয় । অর্থাৎ সমাজ বাস্তবতায় বর্তমানের রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের ন্যায় নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির ভরকেন্দ্র এখানে ‘কেন্দ্র’-এর মধ্যে নয় বরং তা ‘বিকেন্দ্র’-এর মধ্যে অর্থাৎ ‘বিকেন্দ্রীভূত’ (কাঠামো), যার ভরকেন্দ্র জনসমাজের মধ্যে এবং তাকে সমন্বয়ের রূপ ও বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সমষ্টির (জনসমাজ) অর্থপূর্ণতায় বিচ্ছিন্নতাবিরোধী (বহুকেন্দ্র বা স্তরের মধ্যে ঐক্যতা বা পারম্পর্য ও পারস্পরিকতার সমন্বয়ী) ভূমিকায় সে ‘কেন্দ্রীকরণ’-এর চরিত্র ধারণ করে বা রূপান্তরিত হয় । সংক্ষেপে এভাবেই ‘বিকেন্দ্রীভূত’ ও ‘কেন্দ্রীকরণ’ মিলিয়েই আমরা ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’-এর প্রত্যয়কে নির্দিষ্ট করেছি” (‘জাতীয় সাংগঠনিক দ্বিতীয় রিপোর্ট-২০০১ খ্রিঃ, পৃষ্ঠা-৭; জাতীয় সাংগঠনিক তৃতীয় রিপোর্ট-২০০৩ খ্রিঃ, পৃষ্ঠা-৬; জাতীয় সাংগঠনিক চতুর্থ রিপোর্ট-২০০৪ খ্রিঃ, পৃষ্ঠা-৮) ।

 

সেদিক থেকে প্রচলিত অভিধা ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর সাথে মতাদর্শিক দিশায় নির্দিষ্ট ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ যথেষ্ট পার্থক্য বহন করছে । রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতিবাদ হিসেবেই রাষ্ট্রচিন্তায় একসময় নৈরাষ্ট্রবাদ বা নৈরাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটেছিল তা বাস্তবসম্মত হোক আর না হোক, তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট ছিল । কিন্তু এখন যাঁরা কথায় কথায় ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ শব্দটা হর-হামেশাই ব্যবহার করছেন, কী বুঝে, কী বকছেন, কি চাইছেন সেটা বোঝাই দায় । তাই এর সাথে প্রচলিত বিকেন্দ্রীকরণ শব্দের মিল খোঁজা অবান্তর ।

 

“এক্ষেত্রে আমাদের “বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ” (কাঠামো)-এর Concept-এর সাথে অপরাপর...সদিচ্ছাতাড়িত প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষায় শব্দগত সাদৃশ্য থাকতেই পারে, সেটা...সংকটের অংশ...প্রাসঙ্গিকতায় বিচ্ছিন্ন (সদিচ্ছাতাড়িত কল্পনা বা ধারণা ঐক্যের ভিত নয় বরং বিজ্ঞানই ঐক্যের ভিত) অথবা আংশিক সত্যের প্রতিফলন মাত্র । কিন্তু সংকট সমাধানে আমরা কল্পনা বা সদিচ্ছা থেকে-‘অংশ’ নয় বরং সংকট সমাধানে বাস্তব সত্য হিসেবে বৈজ্ঞানিক দিশায় ‘সমগ্র’ নিয়েই পথ হাঁটি এবং এখানেই আমরা স্বতন্ত্র ।

 

বলাবাহুল্য, স্থান-কালের নিরিখে তথা একই প্রেক্ষিতে একই সময়ে একটাই সত্য প্রতিফলিত হয়- যার মধ্যে সমগ্র সত্য অস্তিত্ববান । বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মতাদর্শিক সংকট সমাধানে একটাই মতাদর্শ সঠিক হতে পারে, সেটা কোনটা- তার মীমাংসা দেবে আগামীর পৃথিবী” (জাতীয় সাংগঠনিক চতুর্থ রিপোর্ট-২০০৪ খ্রিঃ, পৃষ্ঠা-৮ ) ।

 

পুনশ্চঃ পূর্বোল্লিখিত ঐকিক নিয়মে ফিরে আসি- ‘একশ জন লোকের খাদ্য পরিবেশন করতে যদি দশ জন খাজিনদার লাগে, তাহলে এক হাজার লোকের জন্য কতোজন খাজিনদার প্রয়োজন? কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সকল জনপদের তথা ষোল কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব অর্থে যদি তিনশ’ জন (নির্বাচিত) সংসদ সদস্য থাকেন, তবে সমগ্র বিশ্বের সকল জনপদের প্রায় সাতশ’ কোটি মানুষের জন্য কতোজন জনপ্রতিনিধি লাগবে?’

 

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’-এর প্রায়োগিক দিশায়, যখন সংগঠকদের সংখ্যা ২০০ জন ছিল, তখনও তার নেতৃত্বে সমন্বিত অর্থে ছিল মাত্র ১০ জন এবং উক্ত ১০ সমন্বিত অর্থে ১ প্রকাশ করে । অর্থাৎ ২০০ জনের জন্য যেমন ১০+১ জনই যথেষ্ট, তেমনি আজ অসংখ্য সংগঠকের জন্যেও সর্বোচ্চ নেতৃত্ব (কার্যকরী) সংখ্যা ১০+১ জনই । এমন-কি সমগ্র পৃথিবীর সাতশ কোটি মানুষের নেতৃত্বেও সেই ১০+১ জনই যথেষ্ট অর্থাৎ আমাদের সংগঠন-কাঠামো অনুসারে ‘২০০ জনের জন্যে যদি ১০+১ জন থাকে’, তবে ছয়শ কোটির জন্যেও সেই ১০+১ জনই থাকে!

 

সেই সাথে কাঠামোগত দুই ইডিয়ম ‘অনুভূমি’ ও ‘উলম্ব’ বিষয়টি যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রেও পারিভাষিক চিহ্নিতকরণের অর্থে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে সদ্য আলোচনায় বা গরবাচেভদের লেখায় উল্লিখিত হচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সংগঠন-কাঠামো অনুশীলনে তা (১৯৯৭-২০০৮) ১০ বছরের পুরনো হয়ে গেছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কয়েক বছর যাবৎ তার সাধারণ প্রায়োগিকতার নিয়মিত রিপোর্ট আকারে প্রকাশ হয়ে হচ্ছিল (জাতীয় সাংগঠনিক তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ রিপোর্ট-২০০৩ খ্রিঃ, ২০০৪ খ্রিঃ, ২০০৫ খ্রিঃ, ২০০৬ খ্রিঃ ইত্যাদি) ।

 

সর্বোপরি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান-এর লেখা ‘ধ্বংস অথবা পরিবর্তন’-এ উচ্চারিত ‘...এখন দরকার আমাদের মানসিকতার বুনিয়াদি পরিবর্তন । আর্থিক সংকটের সমাধানকে কেবল বাজারব্যবস্থার মধ্যে খুঁজলে হবে না । তাকাতে হবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নত দেশগুলোর চৌহদ্দির বাইরে...’ । বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট কফি আনানের উপলব্ধিগত উক্ত উচ্চারণের বহু আগেই মানসিকতার বুনিয়াদি বদলে মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ঘোষণায় পথ হেঁটেছে প্রায় ১৫ বছর আর তা কেবল উপলব্ধিগত বিবেকী বোধ থেকে নয় বরং বিজ্ঞাননিষ্ঠতার পথ ধরেই এবং প্রচলিতের চৌহদ্দিগত ভ্রান্তির ঘুলঘুলি বা দৃষ্টিভঙ্গিকে ছাপিয়েই । দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদযাপনে সমন্বয়ের বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত সেই ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ সংগঠন-কাঠামোর যথার্থতা ও স্বতন্ত্রতা সহ বিগত অনুশীলনকেই প্রামাণিক প্রকাশের আলোয় নিয়ে এসেছে  ।

 

কাঠামোগত তত্ত্বীয় দিশাঃ “একজন ব্যক্তিকে বিগত ও অনাগত অসংখ্য ব্যক্তির মূর্তায়ন ধরে কাঠামোগত সূচনায় তা নৈর্ব্যক্তিক মধ্যম অবস্থান (মধ্যমা-সমন্বয়ক অর্থে) এর বিন্দুরূপ ‘একক’ হিসেবে গৃহীত এবং ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ সংগঠন-কাঠামোর প্রথম অংকুরোদ্গমন সমরূপে ৩ মিলে সংগঠন-কাঠামো তথা সংঘবদ্ধতার কোষ গঠিত; যাকে আমরা অন্তর্বীজ ফ্রন্টে বোধগম্যতার স্বার্থে ‘অঙ্কুর সভ্যত্রয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছি । এরপর ৩ কে কাঠামো ক্রিয়ার কোষ এবং ১০-এর ইউনিট কাঠামোকে সংগঠন-কাঠামোর একক ধরে ১০-এর ধাপে ধাপে ক্রমোত্তরিত (কাঠামোগত সাধারণ রূপ ১০+১০+১= ২১ হিসেবে) ধারায় সংগঠন-কাঠামো এগোতে থাকে । ৩ (তিন) কাঠামো ক্রিয়ার কোষ হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির রূপ প্রকাশ পায় ৫ ও ৭ এবং ১০-এ । ১০-এর ‘ইউনিট কাঠামো’ সংগঠন-কাঠামোর একক বিধায় কাঠামোগত মানে উক্ত একক ‘১’-এর অর্থে (অথোরিটি) মূর্তায়িত, যার মান ‘শূন্য’ অর্থাৎ কাঠামোগত একক হিসেবে ইউনিট বলতে বোঝায় (১০ জন+১)=১১ । এক্ষেত্রে ১০ বলতে দশ জন হলেও ১ মূলত উক্ত ১০ জনের সমন্বয়কের অর্থে- Whole বা সমগ্র ‘ইউনিট’-এর প্রকাশক । অর্থাৎ ১০ জনের মতামত উক্ত ‘১’ মারফত প্রকাশ পায়, বিধায় তিনিই সর্বোচ্চ অর্থাৎ ‘ব্যক্তি মত রহিত’ অর্থেই তিনি সমন্বিত (Whole) মতের প্রকাশক মাত্র ।

 

 

সাংগঠনিক বিস্তারের ক্রমপুঞ্জি

 

শুরুতে ফেরা যাক ।

 

সাংগঠনিক বিস্তারের প্রথম দিকে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ, রাজবাড়ী সরকারী কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ, ঝিনাইদহ কে.সি কলেজ, যশোর এম.এম কলেজ, চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদা কলেজ সহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কর্মকান্ড- যা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজেন্দ্র কলেজ মারফত সমন্বিত হচ্ছিল এবং সারা বাংলাদেশের অপরাপর শিক্ষাঙ্গন তথা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ শেরপুর সরকারী কলেজ, জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, ময়মনসিংহ সরকারি আনন্দমোহন কলেজ, নরসিংদী সরকারি কলেজ, বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া (নাসিরনগর কলেজ)- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে সমন্বিত হচ্ছিল । অপর দিকে, বহির্বিশ্বে যে সকল শিক্ষায়তনে সাংগঠনিক কর্মকান্ড বিস্তার লাভ করেছিল- তা সমন্বিত হচ্ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মারফত । অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও রাজেন্দ্র কলেজ শাখা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, মূলতঃ এই চারটি শিক্ষাঙ্গন থেকেই অপরাপর শিক্ষাঙ্গনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল । ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে সাংগঠনিক কর্মকান্ড চলা বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন প্রতিনিধি নিয়ে স্বল্প পরিসরে বেশ কয়েকটি যৌথসভা শেষে তিনটি প্রতিনিধি সভা অর্থাৎ ১. শেরপুর টাউন, ঢাকলহাটি ২. ঢাকা, মিরপুর এবং ৩. ফরিদপুর শহর, আলীপুরে সভা সম্পন্ন করে; সর্বশেষ পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২রা এপ্রিল, ১৯৯৮ সালে ঝিনাইদহ জেলা শহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজেন্দ্র কলেজ সহ অপরাপর শিক্ষাঙ্গন প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয় । উক্ত সভায় সংগঠনকে অখন্ড রূপদানের লক্ষ্যে দ্রুত সাংগঠনিক বিস্তার তথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার শপথ ও চেষ্টাকে বেগবান করার কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয় । পাশাপাশি যাঁর যাঁর মতো করে সংগঠন অনুশীলনের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহ সংগঠন-কাঠামোর আলোচনাও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ।

 

সাংগঠনিক বিস্তার ও কর্মকৌশল সহ সংগঠন-কাঠামো প্রসঙ্গে বড়দা’র আলোচনার প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত কর্মপরিকল্পনা ও প্রস্তাব গৃহীত হয় ।

 

১. শিক্ষাঙ্গনে নিত্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা সহ সেশনজটের কারণে ৩/৪ বছর যাবৎ ছাত্রদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অস্থিতিশীলতার কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের (১৯৯৫-১৯৯৮ সালের জাতীয় দৈনিকগুলোর পাতা উল্টালেই দেখতে পাবেন তৎসময়ের শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ও ভারতে উচ্চশিক্ষার বিজ্ঞাপনে সয়লাব অবস্থা) শিক্ষাঙ্গনগুলোতে প্রবেশ করছে এবং তারা প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, বিশেষতঃ যে শ্রেণীর পরিবারগুলো শিক্ষা-দীক্ষার সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ ইতিহাসের দিক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে শ্রেণীটি প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং সাধারণত যে সমস্ত পরিবার থেকে নেতৃত্ব উঠে আসে, সেই সমস্ত পরিবারের সন্তানরাই উচ্চ শিক্ষার্থে সেখানে যাচ্ছে । সেদিক থেকে সাংগঠনিক দ্রুত বিস্তার তথা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া ও নেতৃত্ব গড়ে তোলা সহ সাংগঠনিক কর্মকা- সমন্বিত হওয়ার অনুকূল বাস্তবতার কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তথা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের (হাই কমান্ড) দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিবর্তে সর্বসম্মতিক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপর দায়িত্ব অর্পণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ।

 

২. ২০০০ সাল নাগাদ সবগুলো শাখা মিলে একটি জাতীয় সমাবেশ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । সংগঠন-কাঠামো স্বতন্ত্র বিধায় তা তৎক্ষণাৎ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব নাকচ হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রস্তাব উঠে আসে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকেই সংগঠন-কাঠামোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণের ল্যাব হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয় । তবে সেক্ষেত্রেও অপরাপর শাখার সমন্বয় ও সাদৃশ্যগত শর্ত থেকে সেখানে প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠন করার পরই কেবল উক্ত কাঠামোগত পরীক্ষা বা প্রয়োগের অনুমোদন গৃহীত হয় । অর্থাৎ জাতীয় সমাবেশ অনুষ্ঠানের পূর্ব পর্যন্ত চলমান আহ্বায়ক কমিটিকেই অনুমোদনসহ নতুন শাখাগুলোতেও আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ।

 

৩. জাতীয়-আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই ‘একই নাম’-এ সাংগঠনিক কর্মকান্ড চালিত হওয়ার পূর্ব সিদ্ধান্ত অর্থাৎ ২০০০-এর জাতীয় সমাবেশের পূর্ব পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’ নামটি উহ্য (অমিট) রেখে তৎপরিবর্তে ‘বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’ নামেই সাংগঠনিক কর্মকান্ড চালানোর সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকে । বিশেষতঃ, সাংগঠনিক বিস্তারের কৌশলগত দিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিবর্তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় স্থানান্তরিত হওয়ার নতুন প্রেক্ষিত সহ সমগ্র দুনিয়ায় যেখানেই বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা রয়েছে- সেখানেই সংগঠনের ডাক পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বের দিক থেকেও উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজেন্দ্র কলেজে সহ অপরাপর শিক্ষাঙ্গনের প্রতিনিধিরা ঐকমত্যে পৌঁছান ।

 

৪. সংগঠনের জাতীয়-আন্তর্জাতিক শাখা সম্পৃক্ত সকল সভ্যের উপস্থিতিকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয় এবং অনুপস্থিত মাত্রই বহিষ্কৃত হিসেবে ধরা হবে । সেই সাথে জাতীয় সমাবেশের পরবর্তীতে সাংগঠনিক অখন্ডতার শর্তে তথা যার যার সংগঠন অনুশীলনের প্রবণতা থেকে উপদলীয় কোন্দলের জন্ম যাতে না হয়, তার জন্যে শুধু জাতীয় ক্ষেত্রে সংগঠন অনুশীলন করা যাবে । অর্থাৎ বহির্দেশীয় সাংগঠনিক অনুশীলন বা সাংগঠনিক শাখা বিলুপ্ত করা হবে । সেক্ষেত্রে কেউ সাংগঠনিক আদর্শ প্রতিষ্ঠাকেই নিজ জীবনের লক্ষ্য (যেহেতু সামগ্রিক জীবন নিয়েই আদর্শিক সংগ্রাম) হিসেবে গ্রহণ করলে তাঁকে দেশেই অবস্থান করতে হবে ।

 

পাশাপাশি যাঁর যাঁর মতো করে সংগঠন অনুশীলনের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উঠে আসে এবং তদানুসারে ৩০শে এপ্রিল, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আবু লায়েস মুন্নাকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় ।

 

বিগত এক যুগের সংগঠন বিস্তারকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে সাংগঠনিক কর্মকান্ড ছড়িয়ে দিলেও প্রধানত সমন্বয়গত ভূমিকা সহ মতাদর্শ ও কাঠামোর পারস্পরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োগের প্রত্যক্ষ বীজতলা হিসেবে যে সমস্ত শিক্ষাঙ্গনকে গ্রহণ করা হয়েছিল সেই সব শাখাগুলোকে নিম্নোক্ত ক্রমবিন্যাসে প্রকাশ করা যায়-

 

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাঃ প্রাক-প্রতিষ্ঠার প্রথম ভাগ- ২রা নভেম্বর, ১৯৯৭ খ্রিঃ থেকে ২রা এপ্রিল, ১৯৯৮ খ্রিঃ পর্যন্ত ।

 

২. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাঃ প্রাক-প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় ভাগ-৩০শে এপ্রিল, ১৯৯৮ খ্রিঃ থেকে ২৩শে সেপ্টেম্বর-২০০০ খ্রিঃ (উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত ‘প্রথম জাতীয় প্রস্তুতি সমাবেশ’-এ ২রা এপ্রিল, ১৯৯৮ সালের যৌথসভায় গৃহীত “বহির্দেশীয় সাংগঠনিক শাখা বিলুপ্ত করা”র সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়) পর্যন্ত ।

 

৩.  ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখাঃ প্রতিষ্ঠার প্রথম ভাগ- ২৪শে নভেম্বর, ২০০০ খ্রিঃ থেকে ২৩শে ডিসেম্বর (জাতীয় সমাবেশ পর্যন্ত) ২০০৬ খ্রিঃ পর্যন্ত ।

 

৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাঃ প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় ভাগ- ১৩ই জানুয়ারী        (রিভিউ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত) ২০০৭ খ্রিঃ থেকে ২৪শে নভেম্বর, ২০১২ খ্রিঃ পর্যন্ত ।

 

উল্লিখিত চারটি শাখার মধ্যে প্রাক-প্রতিষ্ঠার প্রথম ভাগে প্রায় এক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উন্মেষগত ভূমিকায়, প্রায় দুই বছর কাঠামোগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বীজতলা হিসেবে তথা প্রাক-প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় ভাগের ভূমিকায় ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, ২০০০ সালের ২৪শে নভেম্বর সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রথম ছয় বছর কাঠামো ও মতাদর্শের পারস্পরিক সম্পর্ক ভিত্তিক প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার প্রথম ভাগের ভূমিকায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক রূপদানের ভূমিকা তথা সংগঠন গড়ে তোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পুনরায় উঠে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ।

 

অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায়- প্রথম ১ বছর + শেষ ৬ বছর= ৭ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, প্রায় ২ বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, প্রায় ৬ বছর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা= ১৫ বছরের পথচলা ।

 

যতোটুকু সংগঠন, ততোটুকুই বিকাশ এবং যতোটুকু বিকাশ ততোটুকুই পরিকাঠামোগত প্রকাশ (জাতীয় সাংগঠনিক তৃতীয় রিপোর্ট-২০০৩, পৃষ্ঠা-১৯) এর নীতি অনুসারে আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও তার ক্রিয়াগত দিক থেকে প্রথমে প্রথাগত ‘আহ্বায়ক কমিটি’ (১৯৯৮ খ্রিঃ), যা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে চালিত হয় এবং তা অন্তর্বীজ স্তরগত ক্রিয়া দ্বারা সম্পন্ন করে বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণের সংগঠন-কাঠামোর দিকে অর্থাৎ ‘৩’ কাঠামোগত ক্রিয়ার কোষ ধরে, আহ্বায়ক থেকে পরিচালনা বোর্ড এবং তদুপরি পূর্ণাঙ্গ ক্রিয়ার শর্তে কন্ট্রোল বোর্ড ও এডিটোরিয়াল বোর্ড-এর বিকাশ (১৯৯৯ খ্রিঃ) ঘটে । এক্ষেত্রে পরিচালনা বোর্ড, কন্ট্রোল বোর্ড, এডিটোরিয়াল বোর্ড বা ‘৩’ এর কোষগত সমন্বয়ে সংগঠন প্রধান (১৯৯৯ খ্রিঃ) এবং সামগ্রিকতার শর্তগত দিক থেকে প্রত্যক্ষ ক্রিয়া রহিত হওয়ায় উদ্ভূত- জাতীয় সার্বক্ষণিক প্রতিনিধি, জাতীয় সমন্বয়কারী (২০০০ খ্রিঃ) এবং নির্বাহী প্রধান (২০০৩ খ্রিঃ), সাথে আনুভূমিকের শর্তে কাঠামো পর্ষদের প্রাথমিক রূপ তথা পর্যবেক্ষণ শেল (২০০৪ খ্রিঃ), এরপর শৃঙ্খলা বা চেইন সহ যাবতীয় ক্রিয়ার সাথে আর্থিক দিকের বিকাশ প্রাপ্তিতে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির (২০০৪ খ্রিঃ) রূপ লাভ করে ।

 

২০০৬ খ্রিস্টাব্দের পর সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্তর থেকে রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্তরে উন্নীত হওয়ার শর্তগত দিকটা এসে পড়ে এবং সাংগঠনিক এই অনিবার্য শর্তের দিক থেকে সংগঠন-কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকা নিষ্ক্রিয়দের পরিবর্তে বিগত (প্রতিষ্ঠার প্রথম ছয় বছর) সময়ে কাঠামো ও মতাদর্শের পারস্পরিক সম্পর্ক ভিত্তিক (বীজতলা-ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়) অনুশীলনের ফলে অপেক্ষাকৃত দক্ষ ও মতাদর্শিকভাবে প্রাজ্ঞ অর্থাৎ অগ্রগামীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেতৃত্বের অবস্থানে তথা কমিটি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে পথচলা শুরু হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে জাতীয় সমাবেশ (সর্বশেষ ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ) ও ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের পরে জাতীয় কর্মশালার মতো কেন্দ্রভিত্তিক কার্যক্রম থেকে সংগঠন সরে আসে । এতে এক দিক দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং অপর দিক থেকে সংগঠন প্রকৃতস্থেই কেবল স্বতঃস্ফূর্ত স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন সংগঠকদের উপর ভিত্তি করে এগুতে থাকে । ২০০০ সালে প্রকাশিত প্রথম সাংগঠনিক রিপোর্ট-এর পদাঙ্ক অনুসরণেই ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত হয় এ পদ্ধতি ।

 

[দ্রষ্টব্যঃ “সংগঠন প্রধান (অস্থায়ী) হিসেবে আমাদের আন্দোলনের দিশারী বড়দা (এ আর শিকদার-আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্ রাজু শিকদার)’র নির্দেশে অন্তর্বীজ ফ্রন্টের এক সাধারণ সভা ডাকা হয় । উক্ত সভায় তিনি তাঁর দীর্ঘ দু-তিন মাস অন্তর্বীজ ফ্রন্টে অনুপস্থিত থাকার কারণ হিসেবে ইউনিটে জবাবদিহি করেন । তিনি বলেন, অতিমাত্রায় তাঁর উপর নির্ভরশীলতা ভাঙতেই এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি । তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে- “অন্যদের নিষ্ক্রিয়তা, অদক্ষতাই সংগঠনকে ব্যক্তিনির্ভরতার পথ ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে । এভাবেই চেতনাগত মানের পঙ্গুত্বই সংগঠনের মধ্যে ব্যক্তিবাদের প্রভাব বিস্তারকে পথ করে দেয় । চেতনাগত এই অবনয়নের ফাঁক গলেই নেতারা অসংখ্য কর্মীর আত্মত্যাগে গড়ে ওঠা সংগঠনকে ভুল পথে চালিত করে, স্বীয় স্বার্থে সংগঠন ও আন্দোলনকে লক্ষ্যভ্রষ্ট, দালালি আর লেজুড়বৃত্তিতে সম্পৃক্ত করে । তাই মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সংগঠন প্রসারের চেয়ে প্রয়োজন সাংগঠনিক চেতনানিষ্ঠ দক্ষ হওয়া । এটা হতে না পারলে সংগঠন বড় হলেও তা দিয়ে কিছু হবে না । তাছাড়া সংগঠনের প্রধান লক্ষ্যই যখন স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন হয়ে গড়ে ওঠা, সেখানে এই নির্ভরশীলতা না ভাঙালে, নিজ নিজ এলাকায় কীভাবে সংগঠন বা স্বকীয় চেতনায় ইউনিট গড়ে তুলবে? আমার সন্তানের শিশুত্বের অসহায়তায়, তার হাত-পা কেটে পঙ্গু করে রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির ব্যবসা করতে চাই না- আপনারাও চাইবেন না । তাই সর্বাগ্রে ভাঙতে হবে নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা, নির্ভরশীলতা ও চেতনাগত পঙ্গুত্ব । সেই সাথে যাঁরা বড়দার সামনে সংগঠনপ্রাণ, তাঁরা বড়দার অনুপস্থিতে কতোটা সাংগঠনিক-সেটা বোঝার জন্যও প্রয়োজন ছিল এই অনুপস্থিতির ।”]

 

অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে স্থানিক সব ক্ষেত্রেই যে নেতৃত্ব টিকে থাকে, তা কেবল তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বকীয়তার উপর ভিত্তি করে এবং যেখানে অনুকূল পরিবেশের সাথে নেতৃত্বের যতো বেশি মতাদর্শিক প্রাজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল, সেখানে সংগঠন ততো বেশি বিস্তার লাভ করে বা এগিয়ে যায় । বিপরীতক্রমে কেন্দ্র থেকে স্থানিক পর্যায় পর্যন্ত সারগতভাবেই যাঁরা দুর্বল, অদক্ষ-তাঁদের দুর্বলতা প্রকাশ পেতে থাকে এবং অনেকেই ঝরে পড়ে । কমিটি পুনর্গঠনের ঘোষণায় ঝরে পড়াদের নাম না থাকায় সাংগঠনিক নীতি অনুসারে এমনিতেই অব্যাহতি বলে গণ্য বা ঘোষিত হয় বিধায়- এক্ষেত্রে তাঁদের জন্য আলাদা করে অব্যাহতি প্রদানের ঘোষণার প্রয়োজন হয়নি ।

 

অতঃপর কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে কেবল ‘স্থায়ী বোর্ড’ হিসেবে থাকা পরিচালনা বোর্ড কর্তৃক অগ্রগামী নেতৃত্বদের নিয়ে ‘দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদ্যাপন’ ঘোষণায় কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । সেই মোতাবেক ১২/০১/২০১২ খ্রিস্টাব্দে সর্বোচ্চ অগ্রগামীদেরকে প্রথমে জাতীয় সার্বক্ষণিক প্রতিনিধি ও জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি সভ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তদুপরি সংগঠন-কাঠামোগতভাবে কমিটি পুনর্গঠনের দায়িত্বগত অবস্থান তথা নির্বাহী প্রধান, কাঠামো পর্ষদ প্রধান ও কন্ট্রোল বোর্ড প্রধানের নাম ঘোষণা (০৩/০২/২০১৩ খ্রিঃ) করা হয় । এর ধারাবাহিকতায় ২৪শে নভেম্বর

 

 

Proclaim the 12

 

In ‘proclaims 12 years’, hearty greetings to all at the moment of celebrating 12 years of the establishment of Bangladesh Sanskritic Muktijot.

 

Bangladesh Sanskritic Muktijot formally started its journey since 24th November 2000 A.D. with the aim of changing the socio-cultural base in non-violent way declaring that “Wide Movement is constant forever”, has passed over twelve years of its formation. In this transitional period of millennium with the above-mentioned declaration, the formerly declared second stage means ‘Political-Wide Movement’ is started form 24th November, 2012 A.D. in the way of completion of the first stage that is ‘Socio-Wide Movement’ among the specified three stages. The objective of the first stage of Wide Movement was declared ‘to form the organization’. The main aim of the second stage is ‘to ensure solidarity’ in national life.

 

In the celebration of 12 years of establishment, the organization is declared as the result and experiences of great movement of 12 years. There was the preparatory period before the formation and like that, there were experiences of preparatory period in the journey of first formation. In the same way, the experiences of first stage shall remain in the way of second stage. Therefore, according to the declaration as mentioned in the preface of the constitution or in the organizational structure, there was the pre-establishment period or preparatory period before 24th November 2000 A.D.     

 

How was the journey started?

 

In 2nd November, 1997, ‘Borda’ ( A.R. Sikder) along with five/seven friends, sitting on a concrete bench of small triangle courtyard of Dhaka University Snacks ( DUS-fast food shop), DU, expressed some objective truth in the usual discussion of life in late afternoon. Specifically, addiction, violence and all omen of errant were increasing tremendously among the young generation who were the victim of this derogation in national life, which was regular. The traditional topic of discussion relating to youth  and student, where the discussion became relevant and live in the speech of  ‘Borda’, which made them worried about the upcoming situation of the nation or country and uncertain future. For the first time, we asked ourselves, how we are? How we want to live? As these questions have heard for the first time and related with another question-Where is the state going? Though this was traditional, pertinent, old and regular, it seemed to hear and see for the first time. The primary proposal of forming Bangladesh Sanskritic Muktijot has come as a result of the truth disclosed from our existence in the state specially in the country. Our great journey has been started with the conveyance -where Bangladesh and the spirit of Bangladeshi people, there is Muktijot and where there is the country/motherland and patriotism, there is the ‘organization’. Above all, we will reach there where there is the expectation of youth for the emancipation of our motherland and humanity with the message of unity and Wide Movement.

 

The beginning of the primary proposal of that small triangular courtyard of Dhaka University has gradually reached to Islamic University, University of Khulna, University of Kolkata, Peoples University of Russia, National University of Australia, Eden collage, Rajendra college of Faridpur, Rajbari Collage, Ajizul Haque College, Mymensing Anandamohon College, Sherpur College including many educational institutions by crossing  the arena of DU. In this way, the pre-establishment period or preparatory period continued in different educational institutions.

 

Before this discussion, some matters become very important to mention relating to the organizational structure after 15 years (12+3). Because, since 2001, we have published five “National Organizational Report” with the explanation of the philosophy  but the inter-relation between the organizational structure and philosophical declaration along with the background and development has not discussed yet. Only, practical experiences have published through different papers. So, only necessary discussion has expressed for the spread of the organization according to the declared principle “Jototuku bikash tototuku prokash”. There was an option of being all philosophical discussion as a complex one instead of the spread of the organization before 15 years. But, today it will be easy to understand and identify this for the present global perspective with long term practice.

 

   What is Muktijot? In a single word-, Muktijot is the ‘practical result’ of specific philosophical declaration. So, Bangladesh Sanskritic muktijot is a philosophy based organization and its organizational structure is unique one.

 

It is mentioned here that, philosophy and organization are different from each other. At the same time, there are some differences between them though they have an indivisible mutual relation. In that respect, specified clarification is needed here shortly.

 

 

Some relevant discussion regarding the background and development along with the mutual relation of Organizational Structure:

 

In global perspective, the discussion of organizational structure origins mainly from the crisis of ‘dictatorial power and protest of it’ or the centralized organizational structure.

 

In political thoughts, Anarchism arose from the protest against ‘authoritative power’ of the state. Though in the world, the organizational structure is discussed more or less in case of the institutionalization of state and society, it demands supreme priority and essentiality after fall of Soviet Union or socialist power. The arm business, state power with advanced military forces, the undemocratic veto power in United Nations (in Security council) without any ideology behind the cold war or balance of power are inconsistent with the traditional concept of democracy and against  the world peace. As well as, the United Nations formed for the coordination of nations reveals the contrary meaning of it. Though the United Nation which is formed and exists to keep the balance of power, the continuation of former situation after the fall of Soviet Union proves that the former logics were a kind of fake fear and fabrication in the crisis and its solution.

 

So, the unnaturalness or crisis and imbalance of centralized structure of state are not only the problem of any particular state but it is worldwide also. The solution of this crisis depends on the whole World. In addition, this solution is highly desired by this world and still haunts as unknown, indefinite unanswered question.

 

We get such a reference from the writing of Mikhail Gorbachev the President of former Soviet Union who is known as a witness of world tumultuous crisis. His statement published in the daily newspaper Prothom Alo on 8th July, 2008 (Published in I.H.T) “in my view I notice the same problem or a big problem but the role has changed… it seems that the cold war is running…. Historically, the empire took the excess collection of war weapon…. we have to look in very deep to the solution. The spread of the crisis of Horizontal will gets the tremendous result, if we do not solve the vertical problem.”

 

Though there is no politically planned shape of a Whole World or the existence of unified global state, the interrelated ‘two idioms’ of structure i.e. ‘horizontal’ and ‘vertical’ have come to solve any crisis of world irrespective of state and nation. It is mentioned that in the meantime, the idioms (How a person become a citizen without a state?) of integral global thought and the concept of ‘cosmopolitan’ are used as severally. That means, the integral global thought, or the concept of ‘cosmopolitan’ or Whole World are not only backdated, but it is inevitable for the solution of the crisis also.

 

To make the matter easy, we can give an example of unitary method, if ten khanjindar ( who presents food) need to serve food to hundred khajindar, then how many people need to serve thousand people? Or in perspective of Bangladesh, if there are needed 300 member (elected) of parliament for sixteen corer people then how many are needed for 700 corer people of the world? Moreover, the solution of this unitary method is being difficult and impossible. The United Nations is performing its activities with all state and government and they are trying to give example of European Union as united form for the structural establishment of integral global thought. In this case, as there is no definite form of ideological structure, dilemma has become its feature and unity as well as effectiveness remains out of the arena of United Nations that formed only with a mutual understanding of different countries. Overall the Soviet Union was the example of unified nation or humanistic mass collectiveness and after the failure of its experiment, the only one example of European Union whose condition proves that the structure or shape of integral global thoughts still unknown to the world.

 

We get the similar thoughts regarding this undecided crisis from the writing of Kofi Annan titled ‘A time of crisis and  opportunity” that “ We have now learned decisively that no country, no matter how powerful or prosperous, can control the forces of globalization on its own. The lack of inclusive processes and institutions needed to manage the risks and ensure all gain from the benefits has also been exposed. We can waste no time. Only by working together can we hand over a healthy and sustainable planet to future generation. As the woeful international response to the conflicts in the Middle East and elsewhere highlights, our structures are at present incapable of meeting the challenges of today, let alone tomorrow.”(published in Daily Prothom Alo on 4th February,2009. Main article ‘Time of crisis and opportunity, posted 27th January, 2009, Gulf news).                         

 

As a result, the ideological solution or direction regarding structure has become inseparable to the present global philosophical crisis. In this case, it is certain that mutual understanding or noble intention of any person or community is of no use. So, the desirable philosophy shall be scientific or objective for the solution of crisis. Overall,where there is no definite philosophy with exact application for the present world- the solution or direction regarding structure is absurd here.

 

It is to be remembered that when any organization calls for change, the question arises relating to sociological-politicals thoughts that ‘Do you want to change? - that is good, but the philosophy is needed for the change, what is your philosophy?’ Moreover, if the answer is not properly given, it will be funny to the people who have knowledge about socio-political thoughts or represent fully the different meaning.

 

Because, the movement-agitation is possible without specific ideology and most of all are like that. This movement- agitation can be defined as a movement or agitation depends on few demands or for changing government. It cannot be said movement to change the society. As example, most of the people of many countries including Arab, America have become agitated and many changes have happened through the leadership of youth, but mainly that could not change the society or it cannot be treated as movement to change the society. Protest-agitation-strike and movement for real change of society are not same.

 

Therefore, all protest or movement of human being expresses some message. In that case, the above- mentioned movement express that the integral global thought has become relevant in present world with the technological development. That means, any types of short-term national movement without any philosophical basis across the national territory (previously only the communism or others philosophical movement was inter- nationalized). On the other hand, the centralized state structure based on nationalism, which is traditionally defined as a instrument of solidarity has become helpless and lose its appeal-it is a new message to the present world. There is no solution of this crisis without any scientific philosophy of integral global thoughts. It is more clarified here, when a short-term agitation of one country has become spread out all over  the world at a time, as recent example-  the economic depression, then this agitation proved that the agitation will be occurred repeatedly which creates global anarchy and disruption. It is natural, there was no existence of non-protesting human being for long time in the history of the society. The live must go ahead for their survival.

 

To solve this ideological crisis, the scientific philosophy has to give a structure for the ‘unified world’ as well to give a structure to maintain unity of nations or ‘humanistic mass collectiveness’.

 

Bangladesh Sanskritic Muktijot has taken its form before 15 years with the clarification of above-mentioned global facts and realities.

 

It has mentioned in prior, “Philosophy and Structure is not the same thing though they are inter-related with each other having some differences also.”

For the clarification of the relation between philosophy and structure, it can be said as previous example that society is changed in natural process and it can be changed by human being also -this concept has established in the world by the Marxist Philosophy with Leninism and has established as Communism in one-fourth parts of the world.

 

However, that Ideology based society has already fallen down; it was being past but it was an experimental field in relation with the establishment of Philosophy based humane society. Specifically, it can be treated as only one ‘dead body’ for the postmortem or experiment in a laboratory also. Specially, it was the first example of fully established society -state or the first socio-economic-state of present world in relation with the establishment of developed society by human effort in continuation of social evolution of thousand years. In the view of all sociologists in respect of different groups, recognize that it was the first society build by human being based on hypothesis and treated as enriched field to advance the people of whole world philosophically though existed no longer.

 

            Though the integral global thought has been past, in philosophical view the socialist voice ‘All workers, unite’ and the movement to establish that voice- from which the objective basis of the establishment of the integral global thought has come closer to human hand. The victory of Soviet Union or socialist Movement against Fascism as the “common enemy’’ of about whole world during the second world war-which got the long cherished  result or natural proliferation  of global civic consciousness in thoughts by getting release from sufferings of peace loving people of the world. The global civic thought has not overthrown with the fallen down of Soviet Union rather it has developed with the technological advancement and has become essential in present time. Though, this thought not derived from Marxist or Socialist view, the advancement of this thought does not mean to return to the Marxist Philosophy. In spite of that victory against Fascism gave strong basis of the possibilities to establish the society in a philosophical way that means it was the first society created by human effort having philosophical view, which exists or not in later, that can be established –which got the proof or become scientific. Overall, the matter touches the people of all states that the exactness and strength of state structure historically used as a instrument to consolidate that society or the form of state to rebuilt the society.

 

Structurally, this was the centralized state structure- that got the practical form as organizational structure of prior Communist party with the principle of “Democratic centralism” by the hand of grate leader Vladimir Ilyich Lenin. That means the organizational structure based on “Democratic centralism” appeared as centralized state structure with more consolidated form in later. 

 

In this case, the important matter is that the centralized state structure is not new rather the traditional concept of state or theory of state, which structurally bears the centralized character. In the discussion of state as an organization, though there some difference in different stages, it bears the same centralized character or reflects the centralized organizational structure. So that, the concept of centralized structure in the state’s evolution, appeared with its own definition theoretically by the hands of Lenin for the first time. Such as, we go to the market for shopping every day and buy many goods. Man bought these in previous time. The term “Goods” has got its real meaning with the explanation of the questions “how it became as product with the process of production” by the hands of Karl Marx firstly and all matters relating to society-state have identified differently in his view. The theoretical establishment of the principle of Democratic centralism along with the organizational structure or the centralized state structure is the same. Similarly, it gave the Marxism completeness. Because the form of structure has not been found before Lenin even though the period of Karl Marx. Therefore, Marxism had to wait up to the period of Lenin for the complete structure.

 

Marx was the successful disciple of Hegel and like that, Lenin was the competent successor of Marx. Because the concept of socialism has come before Marx, this concept became more practical with the Marxist theory of Dialectical Materialism. Therefore, the dialectical process has more clarified by the excellent wisdom of Hegel with the western view of state before Marx. However, this dialectical process got the scientific base by the hands of Marx among many students of Hegel and it has declared the epoch making declaration-humanistic society and world can be changed by philosophy –which is the main purpose of philosophy.

 

To understand the importance of this decision of Marx relating to philosophy and the relation between Marx and Lenin in philosophical view, more clarification is needed here. This clarification is to be started with a question.

 

What would be the situation of the society if we forget the relation between parents and children for a single moment? Certainly, the society becomes inhuman. It is understood by all- society cannot exist for a single moment without ethics-morality. In present situation, father addresses children and the respect of parents related to the status of children-it has taken thousands of years to get this situation. Though the practice and utility of philosophy continued on the basis of conscience in relevance with ethics-morality, philosophy plays main role to change the society and world-it has revealed firstly in Marxist view. To speak this concept philosophically, the world had to wait up to Karl Marx. Similarly, the concept treated as only a progressive thought or demand if Lenin would not give a complete form of it. Like that, the concept of socialism practiced as a progressive thought and demand only before Marx. This has revealed in Marxist view and it has got the practical form or basis by the hands of Lenin.

 

This implementation and establishment by Lenin makes him pioneer in both theoretical and practical field. In the history of East –Western view about society and state, the great leader Lenin came as only one example of complete philosopher in both theoretical and practical field with basic structural works. Specially, flying in the sky of man with airplane-rocket, going to the moon-have taken as a natural truth today, therefore man can change the society or society can changed by philosophy-to prove the accuracy of this demand relating to society and state, Vladimir Ilyich Lenin is the exemplary one.

 

In this view, Marxism has got the practical and complete form by Lenin. Similarly, Lenin had to identify the new form of the world in the stage of imperialism (the Highest Stage of Capitalism) and to show the characteristics of the new world advanced from the period of Marx to win the philosophical conflict in global perspective. Like this, Lenin also had to face the powerful Tsar’s rule empowered in state administration for long time as opposite party and to do this He had to clarify many matters like “Strategy and tactics” for the identification of enemy –supporter in nationally –internationally along with Keronosky govt. Therefore, the idea of structure was essential to him to establish the united power (party-organization) or unity.

 

[According to the theory of dialectical materialism of Marx, sense comes from matter. Therefore, the rules are applicable to matter, also applicable to society. This is treated as dialectical materialism in case of matter and becomes historical materialism in case of society relating to the conflict between oppressor and oppressed in economic aspect. There are three rules that remain activated in nature for the change. Such as- a) From quantitative change to qualitative change, b) Unity of opposites, and c) Negation of negation.

 

Lenin specified the principle of “Democratic centralism” with the view of second rule ‘Unity of opposite’ among the three rules of Marx as organizational structure. Though it does not mean that the other two rules are not applicable here rather this three rules are applicable in everywhere. The second rule has taken with serious consideration here along with the two rules.]

 

The idea of Lenin as Leninism that recognized as basic thought or ‘ism’ primarily for the identification of the new stages of the imperialistic world. Nevertheless, the idea of Lenin in relevance of organizational structure was more important than the basic thoughts to identify the stage of imperialism. Specially, the principles of party-organization along with the principle of ‘Democratic centralism’ reflected the criteria of centralized state structure. The developed centralized state structure derived from the necessity to rule, became specified through the organizational principle of ‘Democratic centralism’ and it was established in Soviet Union through practice but not from the natural process or necessity. That was the latest centralized state structure of that period created by human effort- its capability was proved during Second World War.

 

However, this decision has not noticed by any Marxist in present time still now. Therefore, they can raise a debate habitually relating to this decision. According to above decision, it said that where the Russian tsar faced great crisis to protect the nearer opposite empire and its weakness  noticed during First World War, there the defeat and prevention of the German power along with the powerful state of United Kingdom or other powerful states after 20/25 years  was surprising. In which the role of centralized structure or the practice of the above organizational structure became clarified. That means there was a philosophical power behind this immense strength and sprit. To give the complete form of this philosophy, the importance of structure got serious consideration in ‘relevance to war’. Socialism is the interim period to advance from capitalism to communism or the pre stage of communism, which specified and defined as a developed form of capitalism made by human effort. The state structure existed in all capitalist country during that period by evolution would not be treated as different but as the advanced form of centralized state structure made by human effort. However, it can be treated as advanced or latest form of centralized state structure. The difference is that the centralized state structure of all countries except Soviet Union were developed by the way of evolution but in case of Soviet Union it has got the advanced or latest form of centralized state structure by conscious human effort or practice. Overall, it bears the character and element of centralized or authoritative bureaucracy (dependent to centre) in state structure. The concept of the state accepted by the present world developed by evolution is that the state has been drive by only One or a group of people not by the mass people. That reflects the traditional concept of rule by One in the of mass people, which established as contrary meaning of democracy. Though there is no King to rule like as feudal society, there is the rule of only One or a group of people and the state structure is subordinate to that ‘One’. Whether King or peyada-One is essential in everywhere, by birth or election, still now we are in the level of tenant as well as spectator. The right to elect One instead of others as the rule of mass people has become false or utopia or as “Shuvongkorer  Faki” in the meaning of democracy in the present technologically advanced world. It is the amazing reality as like as the story ‘Naked King’ of Leo Tolstoy.

 

Overall, the existed state structure or administration was subordinate to One or a group of people from the beginning. Now, it exists as centralized form or character though it has passed the traditional period of Slavery, Feudalism, Capitalism, and Socialism.

 

Now the question is that-What is the problem/gap here?

 

Though Karl Marx said “machine is ever upgradeable”, His analytical view was mainly dependent on social classification based on economic status. The proletariat class has risen by industrial revolution or industrial development but the view of Marx turned to the clash between oppressor and oppressed from the advancement of technology. Even though He explained the society with the concept of class struggle and said “ the conflict between oppressor and oppressed is the key factor of the history ”. According to this Marxist decision, the society has changed and come in present form by the conflict between ruling class and proletariat. However, according to the philosophy of Muktijot- the society changed for invention but not for the class struggle. The society-civilization came to this present stage by the striking forces of technological development. This technological development is the result of human intellect, which crosses the territorial boundary. The effect of the result of this human intellect reaches in each territory and changes its life-style. To consolidate the effects of this changes, the state plays its role in own form as changing character with its laws, rules and regulations. So, the origin and role or the present form of the state reflects the term ‘Management’.

 

According to this, the reason behind the change of the society or civilization depends on the gradual technological development and the role of the state is to consolidate the effect of this striking forces. So, it invalids the speech of Marx- clash between oppressor and oppressed is the key factor of  history or the human history is ‘History of class struggle’ as the reason of social change and the speech of Lenin ‘Economics supersedes politics’ in case of state and politics. As like as, the decision mentioned regarding Imperialism, the Highest Stage of Capitalism (Capitalism has reached in the highest stage or come to an end) has lose its exactness. So, the character of the state structure or centralized form of organization or the principle of ‘Democratic centralism’ of Lenin has flourished and that would be the first and fundamental thought in relevance of state structure as a great intellectual achievement in the history of political philosophy. 

 

However, it can be said as a decision regarding the history of the society and civilization, the history of human civilization is- gradual technological development by the wining of the nature and its surroundings and the new habituation with it. In addition the various necessity of human being, various new invention and cross over the territorial boundary, human mutuality through business or war and the increase or development of social arena- these are the history of human civilization. Basically, state means only an existing institution to consolidate the effect of technological development in different territory and to habituate the life-style with mutuality derives from ‘new invention-new habituation’. Therefore, state plays its role as a highest institution or organization among all institutions along with families of a specific territory and goes forward as an institutional form to control over the society by a small group. In this aspect, ‘changing character’ refers the meaning of strategy of state to control the society but not its character. However, the character to control by a group of people or One over the large group is existing still now.

 

So, the conflict between oppressor and oppressed penned by Marx is not the reason of social change rather it is the bearer or indicator of the effect of technological invention and the bloody war of physical labor based civilization was happened due to the insufficient knowledge and technological invention. Though this conflict is treated as struggle, it is also an obstacle as resemble as crippling in the way of complete development of a child. Therefore, which resemblances is noticed between a child and animal or the insufficiency of humanity of a child, the same resemblances is also  noticed in the advancement of society.

 

However, Marx specified the labour as the Creator of civilization, the invention, or gradual technological development makes the labor easy, which is the intellectual achievement of human being according to above decision. As the intellectual achievement is being primary, the words of Marx “If the Base (Economy) change, the Super-structure (Knowledgeable/cultural aspect) will be changed that means the words Base is primary and the Super-structure is secondary” lose its appeal. Based on traditional view, political movement means the movement depends on economic demands or political movement begins from economic demands (wages of the workers or professional facilities are the main concern)-this view also becomes incorrect. The intellectual achievement is specified as primary not the profession in the explanation of human evolution, which determines the inconsistency of Marxism. The words of Marxist philosopher Mao Tse tung “If the Base (Economy) change, the Super-structure (Knowledgeable/cultural aspect) will be changed and like this the Super-structure also influences or changes the Base” states that the priority of knowledgeable aspect in the changeable reality of the gradually developed world was noticed in the eye of him after Marx and Lenin.

 

[It would be necessary to say something here about Joseph Stalin though it is not relevant. Many writers supported and financed by the imperialist who were against socialism, treated Joseph Stalin as a giant and made him controversial to hide his great role in the Second World War. Specially, they highlighted the negative sides of his ruling period which was to protest the internal-external conspiracy and started the one sided controversy against him. The followers of Trotsky also made him controversial and invaded him with much fascinating theories. They misinterpreted the struggle to establish socialism through Second World War in many countries, which means the establishment of socialism in state structure. But according to the Marx’s statement “If the Base (Economy) change, the Super-structure (Knowledgeable/cultural aspect) will be changed”, the role of Stalin got the accuracy and exactness theoretically. In contrary, who criticized the role of Stalin they detached themselves from Marxism. They also invaded Lenin theoretically in primary stage in the name of ‘Party-Democracy’ with the principle of ‘Democratic centralism’ ’ and created obscurity about it. Then Stalin encountered them theoretically by written down two books ‘Foundation of Leninism’ and ‘Problem of Leninism’. Again the followers of Trotsky demanded themselves as genuine Marxist instead of Stalin but in practically they are not the Marxist rather conceptually they are similar with the imperialist as against socialism which reflects the relation as like as birds of a feather flock together. They always criticized the role of Stalin as a ruler without understanding his mutual relation and responsibility along with the theoretical or philosophical movement clearly but did not say anything about the truth.]

 

According to the present stream of social-political philosophy, science has developed by keeping outside the values of life and intellectual achievement and human being became secondary to technological development. Economy or occupation is primary in the voice of ‘All workers, unite’ and other matters were secondary to economy. Therefore, there is certain difference between life and occupation. If we make difference among them, there is no alternative of life but occupation has many alternatives. Naturally, according to the sequence of necessity of life and occupation, life is primary and occupation is secondary though it is essential one. This difference among life and occupation has being obscure and the role of human being along with technological development has treated as similar by making human being important as developing class and keeping the whole society under a class based on occupation. Therefore, the speech “Base (economy) is primary and Super-structure (cultural/knowledgeable aspect) is secondary” has become the erroneous example of traditional economic tendency. It is not only the Marxist tendency but it has become a common tendency of global thought regarding state and society that derives from Western view.

 

So that, in the history of society, the existence of state or ruling by a class was not identified in the time of Slavery, Feudal, and Proletariat ruling. Though, there was the same characteristic in the state management instead of strategic differences, they are habituated to classify the society in Slavery, Feudalism, Capitalism, Socialism etc. and they explained the feudalist society as more consolidate than Slavery and the Capitalist society than feudalist in the discussion of state structure. They also explained this more consolidates form as centralized or new changing form. The three organs legislature, judiciary, and executive have come by decreasing the ruling of aristocrat- Knight, Barron and Duke etc. of Feudalist society. It determines the administration of One of that replacement and summarization of ruling power.

 

According to the philosophy of Muktijot, the centralized state structure means not only the strategic plan to administrate but also the ruling by a group over mass people, which determines the character to control over mass people by a group (authoritative power). That reflects the criteria of “authoritarianism” which is contrary to the term “co-ordination”.

 

The discussion of human society must begin from human being and that is the “unit” of society. Specifically, only ‘an individual” is the unit of society. An individual cannot create an organization like that an individual cannot form any social institution – this is an important aspect regarding institution. So, the society, state or organization that means any organization reflects the collectiveness of human being and the ideological aspect is that how to keep them united or what would be the process of it. That process or practical form of philosophy is related with structure, which is similarly determined as institutional form. An individual bears the identity of a citizen in case of state and the institutional identity in case of other institutions as a unit or cell of the ‘society’. The society has a largest arena and all individual along with the state are subordinate to it. The structure of the institutions is changed according to the process that changes the structure of that large arena or society. The structure of all organizations or institutions along with the state existing in the society is not related with that institutionalism but with the social structure. Therefore, the origin and evolution of any organizational structure along with the structure is related with that society.  

 

So, according to the above mentioned decision, “The history of human civilization is- gradual technological development by the wining of the nature and its surroundings and the new habituation with it. In addition the various necessity of human being, various new invention and cross over the territorial boundary, human mutuality through business or war and the increase or development of social arena”- there is no scope to divide the society as oppressor and oppressed or in any form  rather that is unique. As the discussion of society must begin with the human being, the specification of the advancement and the evolution of it must be identified by the consolidation of human intellect. Certainly, this intellectual advancement is treated as human civilization. So, the civilization would be divided but not the society and in this aspect civilization is divided into two phases- physical labor based civilization and knowledge based civilization. The continuation of social evolution of thousand years would not divide in any form except that two phases.

 

Whether we agree or not– the discovery of the ‘whole world’ has completed geographically with the discovery of the territory of America on 12 October in 1492 A.D. It can be said in respect of evolution and its age, the geographical discovery of the world has completed recently. The geographical completeness of the whole world has completed through that discovery. So, this world has got this present form by overcoming the imbalance and controversy as like as the indiscipline childhood of long way.

 

According to the philosophy of Muktijot, it has said to specify the civilization not the society, the past civilization has determined as physical labor based civilization and the present civilization has determined as knowledge based civilization. So, in the movement of social change, ‘violence’ is identified as inhuman practice in respect of scientific advancement, which is the helplessness of past physical labor based civilization. In present situation, the way that determines the violence and certainty of bloody war coming in any form either religion or science derives from past physical labor based civilization that must be bound to be evil course. This must be wrong a way or thoughts in present situation. In this scientific and well-civilized world, knowledge is only the philosophical lead and non-violence is the scientific way. Naturally, according to the declaration of Muktijot ‘the voice of the greatest Sanskritic Sangram to establish the human dignity for human emancipation, ‘non-violence’ is the way. This way is also related with present global perspective created through the technological development. There is no relation between this scientific way and the traditional concept of ‘non-violence’ previously said by Gautama Buddha, Gandhi, and Martin Luther King etc.

 

The classification of the society in five periods like as Primitive, Slavery, Feudalism, Capitalism, and Socialism has specified to make the social history easy to all learners for understanding and memorizing it but it is a great ‘mistake’ of present world to define human civilization with that classification according to traditional theory of sociology. This theoretical mistake of social or political thought has come and established by making the traditional economic tendency as primary. The world may be surprised to know that mistake regarding the traditional analysis and definition of society. Many of the famous sociologists may try to divert this mistake as true to protect their intellectual achievement and vanity of wisdom and treat us as their opponent. However, we know that whether there is thesis or anti-thesis, the truth must be existed and established.

 

The sociological and political thoughts of the present world depend on traditional economic tendency and it is naturally reflected in all studies regarding sociology and politics.

 

The present global situation or the present technological development has originated from Western intellectual achievement. So, the development of Western political thought has become the history of development of global political thought. Now that history has become relevant to solve the philosophical crisis of the world. Though it brings the world in present stage through technological development, the existence of ‘social philosophy’ in Western view is not much traditional as like as the ‘political philosophy’. They thought that the society is under the control of state until the period of 17th century. They understood the truth that society controls the state in 17th century. This thought continues about four hundred years in the global thought regarding society. In this way, this period is very short relating to sociological thought. Though this thought is old in case of political thought, its relation with society has gone forward as reverse meaning during a long time. It is the main reason to treat the life and occupation in same meaning and same footing. It is essential to clarify the meaning of society to solve the present philosophical crisis and specially the above-mentioned statement “the structure of all organizations or institutions along with the state existing in the society is not related with that institutionalism but with the social structure.” So, the traditional ‘social philosophy’ and ‘political philosophy’ of present world have become defective.

 

Any type of organization or institution along with the state and society reflects the collectiveness or unity and an individual is the ‘unit or cell’ of the society. So, according to this unity, the proper identity of involvement in any institution or organization along with the state and society of an individual is found in the process of being collectiveness. The discussion about state and society means the discussion of ‘collective people’. The origin and evolution of society and state refers the discussion of ‘collective people’ in relation to whole life.

 

The common physical criteria existed in adaptation process of all living thing of the nature are that- 1. Taking food, 2. Self-protection, 3. Heredity. The existence of any living thing in the nature means that they hold all these three common criteria. If there is the absence of any criteria among the three, the existence must be extinct.

 

In the adaptation process of living things –it needs to take food and self-protection (security), which is derived from the condition to protect ‘life’ (in the meaning to survive) or this is only the personal matter. But the heredity, which is necessary for every living thing and in that case the presence of ‘second’ one is essential. The living thing can fulfill the two criteria (taking food and self-protection) by own-self but in the matter of heredity, the presence of second one or opposite sex is essential and result of which is to continue the next generation. Therefore, in heredity, the presence and existence of three is essential. With this meaning, this is the first collective characteristics of all living thing, which is the only biological need. It is the common biological characteristic of all living thing that the necessity of being collective or the presence of two is natural and essential for the existence of third one or next generation.

 

The biological need of being collective of every living thing is related only to heredity among the three biological criteria of adaptation. The necessity of collectiveness is not essential for the other two criteria-(taking food and self-protection), but in case of self-protection it may be necessary. So, collectiveness is essential for heredity.

 

The other two criteria-(taking food and self-protection) may be active for the collectiveness of two or more though it has derived from the biological characteristic of heredity. The development or the increment-decrement of the society is related to the biological characteristic of taking food and self-protection. The first collectiveness derives from the biological need but the stability of heredity or the generation is related with the other two criteria, which is the consequence of biological collectiveness. This collectiveness means society and spread means development. The matter of ‘spread or reduction’ of the society indicates the cultural aspect in relation to social development.

 

Society or social unity does not start from that first ‘biological’ collectiveness and it was only the biological need until then. The next generation and the consequence of that biological collectiveness determine the ‘Constancy’ of the society or social unity. This social unity derives from the condition of ‘mutual dependency’ or security in respect of the two biological criteria- taking food and self-protection which identify the new stage of ‘mutual understanding’ or mutual unity from biological need. So that undoubtedly the term culture (sanskriti) is related with the condition of Constancy of society, which is constant forever.

 

Society means the continuous and indispensible ‘Collectiveness’  of three or more in relation to the ‘Constant-life lead’ which is the continuous process deriving from the two criteria of taking food and self-protection. Therefore, the existence of three or more means be collectiveness of three or more. Here, the condition of consolidation and coordination is essential. So, the Ethics-morality start from that condition of consolidation and coordination which is the origin of human society. It will be a mistake to compare it with today’s Ethics-morality because it bears the biological criteria for being originate from the biological need. This may be existed among many animals. But in case of human being, the developed form of today’s Ethics-morality is the result of humane character or the different shape of brain that continues the human heredity and mutual understanding in relation with the social ‘Constancy’. Still now the previous decision regarding the origin of ethics-morality remains for the biological existence of human being as living thing. 

 

The condition of consolidation and coordination or the above-mentioned ‘mutual understanding’ is determined as ‘cultural aspect’ and in economic term it bears the criteria of ‘management’ of institution according to present institutional definition. Management is not necessary for an individual- the origin, space, definition of management related with the process of coordination of collectiveness or more than one . In political term, the criteria of consolidation and coordination can be treated as the State. This is the original and fundamental characteristics of State. For this reason, Marx intellect’s cannot avoid the matter in discussion of modern state, “the administrators of modern state are a general managerial committee of whole bourgeoisie class ’’ ( Manifesto of the communist party, Bourgeoisie and Proletarians ) The origin and existence of the State depends on this criterion of society. The development of this criterion is related with the social arena. So, the change of the state structure depends on social structure. The state is existed in relation with society from the origin to development. Therefore, the state can be abolished by the abolition of the society.

 

The theory of abolition of state has become inconsistent with the declassed society referred by Marx. Marx has declared the state as a ‘weapon of oppression’ or ruling weapon in his social philosophy. It is mentioned here that the ‘cultural adaptation’ is proved as more strong and primary in case of society. The existing centralized state getting through technological development is only a form of state though it gets the character as against mass people. The denial of the existence of the state in opposition to it is as like as to cut down the tree instead of weeds. It is not only unscientific or absurd but also a great theoretical mistake.

 

In which form the ‘communist society’ of Marx exists, the state exists in that form. Either primitive communal society or future communal society- if there is society, there will be the existence of the state. In primitive communal society, there was the existence of three or more in cave or community however their life-style was, the form of state was existed for the consolidation and coordination. In future, in which form the society will exist, the state will exist in that form.

 

It is not only the limitation of Marx but also the common tendency of traditional thoughts. It has become the main stream of global thoughts from long time by the way of Western view instead of being a common tendency. The existence of the state along with the ‘Ethics-morality’, marriage-life-style, religion, literature, and education-culture has measured in economic standard because of traditional tendency though the economy did not get the complete form and remained as an imbalanced form. It has understood by considering the management as the part of economy but the contrary is true. Therefore, economy is the part of management as like as the state is subservient to society. What would happen to adjoin the carriage before horses? That is happening in every stages of life along with the economic depression.     

 

The economic institutions like IMF, World Bank are working all over the world by crossing the territorial boundary to solve the economic depression, but why the leaders of all country get together in one stage for this solution? The reason is that-state is the highest management institution like all institutional sectors and the economy is the part of it, the state structure or politics has become inevitable for solving the crisis. As the crisis is worldwide and there is no unified political institution, the lathel sarder(armed cheif) leaders of all country are compelled to get together in one stage/place for an instant solution.

 

As for example, –snake-frog and mongoose live together forgetting the internal conflict among them during the time of flood. So, in the time of economic depression, when all leaders get together in one stage for discussion forgetting the internal conflict and cross over the territorial boundary, then there is no way of identification that who belongs to which country.       

 

            Though the society is being the global community in present time, a unique institution with political management or a structural form is essential for solving or consolidating the internal crisis. The world leaders take this political endeavor for the lack of this unique management. As they are the political leaders, their activities reflect the politics-therefore it naturally proofs that economy is the part of politics, but are they do not understand it? Or they understand but act as a foolish. This may be ‘acting’ because the establishment of unified world may be a threat to the existence of specified territory of Lethel sorder (armed cheif) and the arms business may be stop or past for the abolition of violence or territorial conflict as well as the concept of nationalism or democracy.

 

It is understood from the (previous) statement of Coffee Anan, the unique political-structure to consolidate the global community is totally unknown to the present world. As their previously defined Slavery, Feudal and Democratic form of state structure was subservient to ‘One’ person, but the political-structure as subservient to ‘global community’ appears as contrary to previous system.       

 

                        Therefore, it is clear that the whole world has fallen in social or political- philosophical crisis, which is tremendous from any previous time and its solution is completely unknown to the present political leaders as they are influenced by capitalist tendency.

 

When the traditional stream of political-philosophy or the global political thought has started to be erroneous? A simple answer can be given. When the meaning of state and society has confined with the territory of lethel sorder and authoritative activities of lethel bahini within their specific territorial boundary and its calculation of benefit or lose has got priority as political discussion, then the political thought of them has become erroneous.

 

In this case, the traditional authoritative power has the priority in the definition of the state in which the theory of statelessness is the proper example. The followers of the theory of statelessness in their political discussion indicate the abolition of state to oppose the authoritative power. At last, they deny the existence of state to oppose the authoritative power.

 

As the lethel bahini or sorder was originated for the consolidation of the society and Marx has specified that as a source of class struggle. So the activities of the sorder and sorder bahini are seen in the form of King, foot-solder, office-superintendent, minister of Sultan, deputy etc. Basically it refers the authoritative power of the lethel sorder and lethel bahini that is established as political philosophy getting the term of king or tenant. According to this, the history of political theory has been started from the authoritative power except the pre historic period. As a result, ‘coordination’, which is the basic feature of any institution remains as secondary or did not come to the light.

 

Naturally, human beings are different from each other not only for physical appearance but also for their intellect. There are differences among their opinion also. But it also reflects the meaning of being ‘united’ or ‘consolidated’ through mutual understanding with the condition of collectiveness and consolidation in relation to the ‘Constant-life lead’. So, the matter of being ‘unanimous’ or ‘unanimity’ of humane collectiveness becomes essential. Though there are differences of opinion (derives from the previously mentioned biological need of ‘food and security’), the essentials of being ‘unanimous or unanimity’ of humane collectiveness has become ‘prime’ for the ‘survival’. So undoubtedly, ‘One’ or ‘unanimous or unanimity’ of humane collectiveness is fixed for the coordination or consolidation. If there is lack of communication for being remote or indirect, the mutual understanding becomes secondary as the matter of coordination becomes clear in respect of mutual understanding for being nearer or direct. The remoteness accretes with the increase of the bounds of collectives. That above-mentioned ‘one of unanimity’ deriving from the coordination, becomes the leader or director for the lack of communication and the commands of the leader become mandatory to the large people without any question or opinion. Then that ‘one of unanimity’ has become the substitute of ‘leader or director’ or the ‘authoritative power’ and the concept of bureaucracy as minister or office-superintendent etc. arose from the implementation of that ‘enforcing order’ –which derives from the condition of remoteness and develops with the character of controlling organization. By this way, the ‘authoritative power’ has become primary in everywhere instead of the meaning of ‘coordination’ as secondary.  

 

The history of the society or collectiveness and its accretion has come in this present condition by passing over thousands years. In that sense, the concept of society and state has originated recently.        

 

In that case, it is not necessary to know the very old history of world, because the geographical completeness of the whole world has accomplished at 12th October in 1942 that means from about 1500 BC. Therefore, we can give the example of British imperialism, as nearer history, the successor, /inheritor of the world thrilling British kingdom were Teutonic tribe who are the new form of lathel Sardar. As, dacoit is the developed form of thief, the Teutonic tribe means Angles, Saxon, Jutes- the three German nations from which the present English Nation has been originated.

 

The ‘courtesy’ is considered as ‘weakness’ to the discourtesies and ‘hospitality’ is considered as an opportunity to the dacoit. In the view of above-mentioned traditional political philosophy, hospitality is considered as ‘weakness’ but not the symbol of noble culture and the thief or dacoit treated as Hero in traditional history. The historical part of ‘Kalikot-Vasco-Da-Gama’ proved this. To understand the history clearly, the term lethel sorder and lathial is more nearer to above-mentioned traditional political philosophy. So, the term of lethel has come to understand that.

 

The Indian Subcontinent and its community is the most oldest and vast in the world still now and for its huge territory is known as ‘Subcontinent’. It is about five thousand years old. The Indian Subcontinent and its people is known to the world through British nation and this community is known as ‘unprogressive’ to many people by the way of existing educational institution. Naturally, the ancient social history is most important to understand the relation between the state and society, which is not possible to any other place of the world like Indian Subcontinent. There is no example of that oldest and vast society in any other place of the world that exists containing that characteristics.

 

In the above-mentioned discussion of Lethal, ‘Mughal Empire’ was well known as one of the greatest kingdom in the ruling history of Indian subcontinent like as other territories. This empire was stable in the period of Great Emperor Akbar and this was possible for being the ruling structure as subservient to society or compromising with the society. It is fallen down in great crisis when contrary happens. Not only the Mughal Empire but also during all ruling period in the history of subcontinent, the matter of compromise or being subservient of the state to the society was primary for the stability of the state or solving the crisis of existence. In this case, compromise with the society or being subservient of the state means not to interfere in the internal matter of the society. Besides this, in the same time, there was the existence, origin, or abolition of many independent states within that social arena and sometimes there was the existence of only one largest state all over the whole subcontinent but the social structure was same though there was the variation of the state. It proves that human society is large than state. The society continues with its own stream though there exist various states or only a large state and its up and down. Therefore, the society continues with its own stream within its large arena and the state exists as subservient to society with its changing character.

 

In relation to the matter of compromising with the society or being subservient of the state, the term ‘not to interfere in the internal matter of the society’ refers the coordinative consolidation but not the authoritative consolidation. The existence of the state was possible in that coordinative consolidation because the social infrastructure of the locality or villages was self-supporting character and the judiciary-security along with economic necessity that means the whole life was more filled which depended on self-authoritative power. The use and influence of sealed coin of state was not the main factor as the medium of exchange until the placing of rail line or the effect of technological development. The center of power or authority fixed on the rural infrastructure and the large society continues as unique social form with its unique character through heredity and mutual understanding.

 

Many people have said about this self-supporting society, even though the history also supports it. According to the traditional social and political science originated from Western society,  the stability of society without dependency on state or keep it as subservient  is not only impossible, but also the solidity or existence of society without state is difficult to imagine. As for example, Aristotle has defined man as ‘God’ or ‘savage’ who is out of society or state to identify the relation of man with state. As a result, historically, this has become unprogressive, mysterious or miraculous –supernatural as well as surprising due to the absence of the explanation of stability and consolidation of large human society. Specially, there is no effort to understand that clearly in this modern time and how much immature the traditional political and social thought are!”

 

In this case, the old society is existing with the relation between the ‘state and society’ in the social arena of unified world. It is existing with the decision that, “the structure of all organizations or institutions along with the state existing in the society is not related with that institutionalism but with the social structure” and “the change of the society depends on the technological development” since four/five thousands of years, not only four hundreds of years. The mutual relation between the various localities and the expected shape of its role to one another and some elements of it are present here.

 

This old society is breaking down rapidly in the present time than the previous twenty or thirty years.

 

We have said previously that state or society means the discussion of collectiveness. In which power the ten hijackers can hijack in a busy market of ten thousand people, with that power one lethel sorder can control fifty thousand people by five hundred-lethel bahini(Staff battalion). They can do that because of their unity and definite purpose. But there is no unity among that people of the market or the fifty thousand people of any locality. In this way, the territory controlled by the lethel solder (armed chief) with his lethel bahini (Staff Battalion) is called King or kingdom and the lethel bahini means minister, deputy, office-superintendent is used to control that fifty thousand people. Todays’ armed forces and bureaucrat are the new form of these. So, that structural strategy is for the control of remote and large community. That fifty thousand people not stay collectively due to the lack of communication though they cover a vast area. As a result, at least five hundred have to face one hundred among fifty thousand. So, fifty thousand reflect one hundred for the lack of communication. In this way, that fifty thousand remain back of five hundred through one hundred and like this the society also remains back to state according to political theory. The territory controlled by the lethel sorder has become prior for the breakdown of the relation between state and society and the power belonging to the lethel sorder as like as the capital and the King’s scepter based on that power. The large community is always subservient to a common center or a ruling group in all cases. The ruling system of controlling a large community by One or a group of people is existing and the centralized character of state is getting priority.

 

[Today we have to select that ‘One’ by election though there is no King or the lethel sorder. As example, the shoes of Ram are needed in case of Ram’s absence. This is the real feature of today’s democratic state structure. Democratic philosophy is still now utopia. The latest form of democratic structure is absent in human society. The concept of ‘democracy’ is used as a balm in the philosophical crisis of the world, which is called ‘Dogmatism’ in Western language. It may apply in anywhere in any form as it has no existence in reality. The American democracy in Iraq reflects one form, the Islamic democracy reflects another form, and Russian democracy reflects different feature. The caretaker government treated as ‘pure gold’ of democracy until its fault was discovered. As, the democracy has no definite form, it applies in anywhere in any form. Such as the idiom, ‘a hoax’ is used frequently with the meaning of uselessness.] 

 

In the present time, the world community reflects “collectiveness” and which is subservient to large human society through technological development having mutual understanding. The epoch making agitation like ‘French Revolution’, ‘Renaissance’ spread out among the neighbouring countries within very short time because the effect of technological development do not consider any territorial boundary- like that, which was true for the neighbouring countries in previous time, now it is true for the whole world. It took long time to communicate with one person of one place to another of a village, now it takes short time to communicate with each other from one place to another place of the world. The recent ‘Arab agitation’ has spread out all over the world within very short time than ‘French Revolution’. The world community has expressed its unique shape firstly overcoming the mistake about territory by the spread out of the agitation in Arab and America. Now, the ‘fifty thousand’ reflect total ‘fifty thousand’, not one hundred (through video conference, radio, television, mobile, and internet). The present system of bureaucracy as an controlling organization derived from the remoteness and the lack of communication with the accretion of social arena for the coordination has lose its appeal- which was established to implement the ‘enforcing order’ only.

 

It will be a mistake if we treat that controlling organization as useless only rather it has become the main reason of the anarchy and imbalance situation of present time. As an example, the sufferings of any flooded area in the time of natural disaster-demand of food of the shelter less people has noticed by all people through  electronic media and that demand  came forward as the demand of the whole people, not only the demand of that specific territory. In this case, the government has enough food stock to meet that demand and takes measures to meet it. But the implementation depends on the traditional bureaucrat system to follow the existed rules-regulations. This is the only legal way to meet that public demand, otherwise it would be implemented by violating the rules-regulation because it is uncertain to meet that demand within 18 months according to the traditional system. So, the demand of food is fulfilled by violating the traditional system. It is happening not only in the matter of food but also in every spheres of life as like as ‘from mending shoes to reading books’ and ‘from making voter identity card to building roads’. This is the common tradition of the present world to legalize that violation by referring the ‘emergency situation’. This has become the natural or main process/ system by applying this from 60/70 years without any alternatives. In contrary to this, public agitation must spread out all over the country not only in that specific territory. Though that was the demand of 100 people of that specific flooded area, it has become the demand of 50000 people through electric media. It is noticed here that the government has the will, there was enough food stock but if we meet it through traditional bureaucratic system it creates devastating death and agitation and contrary of it is treated as violation of traditional system. Whether the demand is fulfilled by the traditional system or by breaking it, the result brings same devastating death and anarchy. For this reason, we have said earlier that the public agitation like Arab and America will be happened frequently in the world. Because, gradually the world community has appeared like as a house with the condition of collectiveness (through mobile phone and internet).      

 

[It is mentioned here that the ‘emergency situation’ may arise and special measures for flood may be legalized but this is not the main factor. It has clarified in the relevance discussion that- the imposition and frequent implementation of the rules of ‘emergency situation’ in every spares of life (like-from mending shoes to reading books) in developed countries from 60/70 years proves that the traditional state or organizational structure has lose its appeal and it has understand that this ineffectiveness is proved as sufferings to all.]   

 

At present time, the term ‘collectiveness’ refers the meaning of coordination and consolidation of the structure of organization. The state structure (existing centralized organizational structure) established on the basis of ‘authoritative power’ of One expresses the ‘contrary meaning’ of that structure for the technological development. So, in case of modern world and its society, the both criteria of coordination and consolidation are essential for any appropriate organizational structure. The term ‘Decentralized centralization’ or ‘Idiom’ has taken as the philosophical direction to express those criteria in a single word. Therefore, Muktijot has taken the organizational structure of ‘Decentralized centralization’ as specific philosophical direction-which is declared as the organizational structure of the present world.

 

It can be said to clarify the idiom, “according to science, we are saying that the form of the state in respect of society which is going forward to decentralized character and which is the essential truth or result. We are saying about the ‘Decentralization’ that the whole society and its spontaneous participation will be treated as the center of power, whichever is isolated would be unscientific with the definition of social unity. That would not be free from centralization (coordination). It is noticed here that there is the term ‘centralization’ but not ‘centralized’. As like as the present state structure, the center of power is not in ‘center’ but the center of power is in ‘decenter’ here and that forms the ‘decentralized structure’, whose power is in mass people. It is as against the isolation (coordination of mutual understanding and heredity or unity of various center or stages) and gets the form of ‘centralization’ with the meaning of collectiveness through coordination. Summarily, we have specified the idiom ‘Decentralized centralization’ by adjoining the terms ‘Decentralized’ and ‘Centralization’-(National Second Organizational Report-2001, of First Stage, National Third Organizational Report-2003, p-6, National Fourth Organizational Report-2004, p-8).

 

There is much more differences between the traditional term of ‘Decentralization’ and our philosophical term ‘Decentralized centralization’. In the political philosophy, the theory of statelessness was originated as a protest against the authoritative power, whether it is scientific or not, their statement was clear. Now, who use the term ‘Decentralization’ frequently, it is difficult to understand what they want to say really. So, it is absurd to find out the similarity with traditional meaning of ‘Decentralization’. 

 

“In this case, there may be similarities of words between the concept of ‘Decentralized centralization’ structure and the others utopian expectation, this may be the part of the crisis be isolated from the relevant fact (utopian imagination or concept is not the basis of unity rather science is the basis of unity) or the reflection of incomplete truth. We think about the ‘whole’ as the truth and go forward with the scientific direction to solve this crisis but not about the ‘part’ as utopian imagination or will.

 

It is said that the truth is established in the same time and in same perspective in respect of place or time-in which the whole truth is existed. A philosophy would be correct to solve the philosophical crisis of the present global perspective, what would be that one- Coming world will give the solution.” ( National Fourth Organizational Report-2004, p-8). 

 

Once again, let’s come back to that unitary method, if ten khajindar (Who presents foods) need to serve food to hundred people, then how many khajindhar need to serve thousand people? Or in perspective of Bangladesh, if there are needed 300 member of parliament for sixteen corer people then how many are needed for 700 corer people of the world? 

               

Therefore, according to the direction about the implementation of ‘Decentralized Centralization’ structure of Bangladesh Sanskritic Muktijot, when the number of member were two hundreds, then the number of leaders were ten only for coordination and this ten numbers reflects the one through coordination/ this ten coordinated-like person or hypothetical term condition thesis- antithesis by one and the very ‘one’ not only the person of coordination but also the term of hypothetical- synthesis. As there eleven (10+1=11) is enough for coordination of two hundreds organizer, the highest number of leaders (effective) is also eleven (10+1=11) for coordination of innumerable organizer. Even, the number of leaders is eleven (10+1=11) for coordination of six billion people of the world. So, according to our organizational structure, if there needed eleven (10+1=11) for coordination of two hundreds, the number of leaders is also that eleven (10+1=11) for coordination of two thousands core people!

 

The discussion was raised about the structural two idioms ‘Horizontal’ and ‘Vertical’ in 2008 or referred in the writing of Gorbachev’s in case of state structure to identify the technical term. Bangladesh Sanskritic Muktijot has practiced this structure from ten years ago (1997-2008) and the report of its practice and implementation has published regularly for few years after the experiment (National Organizational Report-2003, 2004, 2005, 2006).

 

Overall, it has said in the writing of Kofi Annan titled as ‘Destruction and Change’ – “Now it is needed to change our basis of mentality. The solution of economic crisis will not found in economy. We have to look forward beyond the economic institutions and the territory of the developed countries.” Bangladesh Sanskritic Muktijot have passed over fifteen years and declared about the change the basis of our mentality many years before of the statement of Kofi Annan through sanskritic sangram which did not come from will/utopian imagination but from the scientific way overcoming the traditional wrong conception. The exactness and the uniqueness of the organizational structure of ‘Decentralized Centralization’ having the criteria of coordination along with the previous practice have come into light through the celebration of 12 years.

 

Theoretical direction of  the Structure:An individual is taken as a standard of past and future of many people in the beginning of the structure which is accepted as a unit of objective medial place ( in meaning of synthesis) and the cell of unity is constituted with three in the first commencement of decentralized structure; to understand that we have treated that as ‘trio members of first stage’ of Antorbiz Front. After that, the three (3) is taken as the core of the structure and the unit structure of 10 is taken as a Unit of organizational structure. In this way, gradually the organizational structure expands with the Unit of 10 (as the form of general structure 10+10+1=21). Though the Three (3) is the core of the structure, the complete committee gets the complete form through the number of 5, 7, and 10. As the ‘Unit’ structure of 10 is the core of organizational structure, the Unit or ‘1’ means Authority with that standard-whose power is zero-[page-1, Organizational Structure-2009].” So, as the core of structure, Unit means 10+1. Though, 10 means ten members, ‘1’ is the indicator of ‘Whole Unit’ as the meaning of synthesis. The opinion of 10 members is accepted as ‘One Voice’ of ‘1’. That ‘1’ is supreme here but only the indicator of the opinion of Whole instead of personal opinion.     

 

Chronological Expansion of the Organization

 

Let’s  back to the beginning.

 

In the first stage of organizational expansion, the organizational activities in Faridpur Rajandra College, Rajbari College, Kustia College, Jhenaidah K.C College, Jessore M.M College, Chuadanga Damurhoda College with many educational institutions were co-ordinated by Islamic University & Faridpur Rajandra College. The activities of other institutions of Bangladesh such as Rajshahi University, Chittagong University & Sherpur College, Jamalpur Ashek Mahmud College, Mymensing Anadomohon College, Norsindhi College, Bogra Ajizul Hoqur College, Brahmanbaria ( Nasir Nogor) College, were co-ordinated by the University of Dhaka. On the other hand, when the activities spread out in many educational institutions all over the world, then it was co-ordinated by the Kolkata University. The organizational activities were mainly directed from four educational institutions such as the branch of Dhaka University, Islamic University, Rajandra College & Kolkata University to other institutions. Some collective counseling was completed in short duration with the representatives of various educational institutions where the organizational activities were continuing from February, 1998. After that, three counseling were held in 1) Sherpur Town, Dhakolhati 2) Dhaka, Mirpur) and 3) Faridpur town at Alipur. At last, according to above decision, another collective counseling was held on 2nd April, 1998 in Jhenidah District  along with Dhaka University, Islamic University, Khulna University, Kolkata University and Rajendra College with many other institutions. In that counseling, the work plan was taken with the oath of instant spread of the organization in everywhere to give the organization a unified form. Beside this, the discussion about organizational structure with the formation of a central leadership became relevance instead of the organizational practice by oneself.

 

The following work plan and proposal were taken according to Borda’s discussion about the spreading of the organization and the working strategy with organizational structure-

 

1. A large number of students have admitted into the educational institutions of the neighbouring country India for regular violence, political turmoil situation and session jam in our educational institutions since three or four years (the situation of educational institution during that time and the advertisement of higher education in India will be noticed from the national daily newspaper of 1995 to 1998). Most of them were from the middle class family and those families were related with education, which played a vital role in the politics of Bangladesh. The leadership grows from that families and the children of those families go for the higher education. The central leadership (High Command) was shifted from Dhaka University to Kolkata University with the approval of all due to favorable situation to spread out the organization all over the country and grow leadership with their coordination.

 

2. The decision of a National Council with all branches was taken nearly 2000. The proposal of experiment raised instead of instant implementation as the organizational structure is unique and Kolkata University was approved as a laboratory for the experiment and analysis of the organizational structure. That structural experiment or implementation was approved after the formation of first convener committee from the condition of coordination and resemblances in other branches. The decision of the formation of convener committee in other new branches was taken along with the approval of existing convener committee before the National Council.

 

3. A decision had taken to continue its work with the same name in national and international perspective that is Bangladesh Sanskritic Muktijot and before the national council of 2000, the organization was known as “Bangladeshi Sanskritic Muktijot’’. Specially, the representatives of Dhaka University, Islamic University, Khulna University, Kolkata University and Rajendra College gave their opinion to transfer the central command from Dhaka University to Kolkata University for the expansion of the organization and in everywhere where there are Bangladeshi students.

 

4. The presence of all members, who are concerned with national and international organization, is declared as mandatory and their absence shall deem to be expelled. Besides that, after the national council for the protection of unity of the organization, the practice is allowed only in the national field, so that there cannot be started lobbing- grouping from the tendency of practice their personal organization. Therefore, foreign practice or foreign branch of organization shall be abolished. In that case, if the goal of any member is to establish the ideology of organization, he must be stayed in Bangladesh as ideological sangram includes the whole life.

 

We have understand at this present situation and  from the experience of past fifteen years of Muktijot that, the decisions of collective council, which was held at second April in 1998 for the expansion, were so much substantial . Because only within two years we have spread our organizational activities among the three-fourth or forty-eight districts among sixty-four districts in Bangladesh, which can be noticed from the first report and as the structure of organization is distinct, it has realized that its experiment was also appropriate in global perspective.

 

After the review of the decisions of past one era, though the organization was spread out through different educational institutions, there were some institutions played its role as a coordinator to teach the philosophy and used as seedbed or seed plot for the experiment and implementation that are given below chronologically:

 

1. The First stage of Pre- establishment: From 2nd November 1997 to 2nd  April 1998, Dhaka University Branch.

 

2. The Second stage of Pre- establishment: From 1998 to 23rd September 2000 (decision for national council which was taken in 2nd  April in 1998 to vanish the foreign branch at Rajlakkhi complex in uttara ) at Kolkata University.

 

3. The First stage of establishment: From 24th November 2000 to 23th December 2006 (till national council of 2006 A.D) in Islamic University.

 

4. The Second stage of establishment:  From 13th January 2007 to 24th November 2012 (decision of review) in Dhaka University.

 

The Dhaka University was acting as the manifestation of starting among the above mentioned four branches for the first one year and then in second stage, about two years  the Kolkata University acting as laboratory of experiment, in third stage or the first six years after the establishment of organization at 24th November in 2000, Islamic University acting in case of practical field which is based on structure and philosophy and again Dhaka University has come forward to complete the structure of organization /build up the organization.

 

Overall, First one year (about) and last six years in total seven years Dhaka University Branch, about Two years Kolkata University Branch and about six years Islamic University Branch in total fifteen years journey.

 

The first ‘Convener committee’ (1998) was formed with functional activities of our organizational structure according to the principle of ‘Jototuku shonggothon, tototuku e bikash ebong jototuku bikash tototuku porikathamogoto prokash’ (National Organizational Report-2003, page-19) which was drive with the character of democratic centralism. After the formation, it completed the stage of Antorbiz Front and started the structure of Decentralized Centralization. As ‘Three’ is the core of the structure, the three Boards-Porichalona Board, Control Board and Editorial Board (1999) have originated from that convener committee. The Supreme Authority (1999) holds the form of synthesis of ‘3’ or three Boards as like as Porichalona Board, Control Board, and Editorial Board. The position of Jatiyo Sharbokkhonic Protinidhi- Jatiyo Shomonnoykari(2000) and Nirbahi Prodhan(2003) have derived from the repletion of direct functions of the Supreme Authority. By this way, the ranks of Porjobekkhon Cell (2004) as the primary form of Kathamo Parshad has originated from the condition of horizontal of the structure and Jatio Steering Committee (2004) has originated with the spread of economic function along with the discipline and chain.

 

The condition of the upgradation of the organization from the stage of socio-wide movement to political-wide movement came closer after 2006. The organization started its activities to reform the committee with the senior authorities who were competent and philosophically prudent by the practice based on the mutual relation of the structure and philosophy (place of commencement- Islamic University) instead of the inactive central leadership during that time (early six years of establishment) along with the complete development of the organizational structure after the experiment. In continuance with this, primarily the national council (at last 2006) and then the national workshop as all central activities were stopped after 2009. As a result, the central committee became inactive and on the other hand, the organization expanded its activities with the organizer having the character of unique and spontaneous leadership. This strategy has accepted from 2006 according to the first published organizational report of 2000.

 

[Mentioned: “The general council of Antorbiz Front has called with the lead of Borda (A R Shikder- Abdur Razzak Mullah Razu Shikder), pioneer of our movement as Supreme Authority of the organization (temporary). Then Borda has accountable himself in the Unit for being absent in Antorbiz Front in that council. He said that the reason of His absence was to break the dependency on Him. He remembrance to all that- “incompetency and inactiveness of others make the organization depended on an individual in the way of personal dependency. In this way, the incapacity to knowledge paves the way in the organization to influence by the individualism with individual dependency. Due to the lack of such knowledge, the leaders misguide the organization, deviate the definite goal of the organization and movement for their own interest and involve the organization in broker as well slavish which constituted by the dedication of many members. Therefore, it is essential to be prudent than the expansion of the organization to reach the noble objectives. If it is not made then there is nothing by the expansion of the organization. As the main aim of organization is to make distinct and spontaneous leadership, so how they can establish the organization or a unit with distinct knowledge in their own area with this dependency? We do not want to make our child beggar by making them psychically disable by taking the chance of childish helplessness, you should not want this also. Therefore, firstly we have to overcome our inactiveness, dependency, and lack of knowledge. In the same way, it is also needed to understand how much organized the organizer in the absence of Boarda who were dedicated for the organization in presence of Boarda.”]

 

Therefore, the leadership exists on basis of the distinct and spontaneous from center to root level. The organization spread out there where the leaders have competency and philosophical prudency with the favorable surroundings. On the other hand, who are incompetent from center to root level, their incompetency, and weakness is found, and they become inactive gradually. So, it is unnecessary to declare them as overlooked from the organization because according to the principle of organization, they are treated as overlooked when their name is absent in the declaration of the reformed committee.

 

The decision to reform the central committee has accepted with the declaration of the ‘celebration of 12 years’ by the Porichalona Board as ‘Permanent Board’ means as central committee and the senior authorities. In this continuence, the senior authorities are declared as Jatio Sharbokkhonic Protinidhi and the member of Jatio Steering Committee on 12th January, 2012. The responsible ranks of the Chain- in- lead, Kathamo Porshad Prodhan and Control Board Prodhan were declared on 3 February 2013 as the responsible position to reform the committee. The reformed central committee or the structural position in the organization was declared on 24 November 2012 along with the declaration of the Political-Wide Movement. In this way, the central and zonal committees are formed with the active authorities who were come forward spontaneously. It is mentioned here that though the stage of Political-Wide Movement has declared, the stage of Socio-Wide Movement will be completed formally on the date of the celebration of 12 years. The above-mentioned journey of 15 years will be determined until that day.

 

The previous ‘15 years was the time of establishment’ with the declaration- ‘to form the organization’ and hearty greetings and respect to the founder organizer in the time of first formation in this ‘Proclaim of 12 Years’ with this long journey.

 

The time of first formation of the organization is treated as the time of making leadership. So, the inclusion and exclusion of an organizer in the organization during that period was the natural process. Even though, all the ranks and position were temporary except a structural rank (Porichalona Board) which was permanent for the reason of experiment (4th National Organizational Report-2004, page-50). So, the decision of ‘overlook’ and ‘exemption’ have become prior discussion instead of suspension after the three years of formation (2002). For this reason, the alteration of central committee or all responsible ranks was regular before 24th November 2012.

 

As an individual does not hold all qualities at same time, so a leader cannot gather all competencies in every situation. In the way of the organizational expansion, someone remained active for his/her own qualification and someone became inactive. So, though the founder organizer are those who are active and expanded the organization still now, hearty greetings and respect to them in this ‘Proclaim of 12 Years’ who remained with us for ‘a single day’ during 15 years.

 

In this case, as no one can gather experience before journey, so after journey at national level from 24th November 2000 to 2001(one year), First National Report was published, which is known as “Second Organizational Report 2001”. Here, in the  first year of commencement, practicing reports of Kolkata University was published as “First organizational Report’’ (Which is mentioned later as appendix) by taking the opinion of all universities and colleges which was the sample report because the organization is distinct in structure and feature. Usually after one year, when the Second organizational Report was published and then the necessity of ‘‘First Organizational Report” was ended and it was withdrawn.   

 

Besides this, the First organizational report was the report of pre-establish stage. So, the experience and directions of the first year of the establishment was published as Second Organizational Report. The above-mentioned organizational report is added here according to the decision to publish all previous papers as the records of establishment and these papers will publish without mentioning the name of the organizer who were excluded from the organization according to the organizational principles (Second National Organizational Report-2001, page-8; Fourth National Organizational Report-2004, page-64). 

 

  Muhammad Aminur Rahaman
Nirbahi Prodhan
Bangladesh Sanskritic Muktijot

 

 

 

বিগত তিন বছরের সাংগঠনিক রিপোর্ট

 

প্রথম ধাপ

 

 

সাথী,

সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দ,

         

সহস্রাব্দের সায়াহ্নে, একবিংশের দুনিয়াকে সামনে রেখে, কালের এই মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রিয়তম সাথীরা গ্রহণ করুন সংগ্রামের রক্তিম শুভেচ্ছা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের শুভ্র অভিনন্দন ।

         

আমাদের জাতীয় জীবনে এমন এক একটি দিন আসে, যে দিন থেকে ইতিহাস নতুন বাঁকে মোড় নেয় । নতুন পথে যাত্রা করে, নতুন দিক নির্দেশনা ঘোষণা করে । কারণ- আমাদের এ জগৎ-জীবন, সমাজ-সভ্যতা, গ্রহণ ও বর্জনের এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত সম্মুখপানে এগিয়ে চলেছে । এ গতি তার স্বাভাবিক, যার প্রমাণ আমরা পাই ইতিহাসের পাতায় বিবৃত প্রতি ছত্রে ছত্রে, দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে এ প্রক্রিয়া তার অনিবার্যতা নিয়ে ফুটে ওঠে । এই ধারা ছিল, আছে এবং থাকবে । সমাজ বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশমান প্রয়োজনবোধই বাধ্য করে মানুষকে ইতিহাস নির্ধারিত অগ্রগায়নের পথিকৃৎ, অভিযাত্রী হতে । মনুষ্যত্বের অগ্রণী সেই পথিকৃৎ অভিযাত্রীর পথ ও পদচিহ্ন বুকে নিয়েই নির্মিত হতে থাকে ইতিহাস । দেশ ও জাতির দুঃসময়ে সূচিত হয় যে যাত্রা, ঘোষিত হয় যে ঐতিহাসিক বার্তা, শপথ; পরিবর্তনের সেই ঝান্ডা আগুয়ানের অভিযাত্রীরা দিকে দিকে ছড়িয়ে দেয়, যা কোটি জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় নতুনের দীপ্ত ঘোষণা নিয়ে, জন-অরণ্যে প্রতিধ্বনিত হয় ঐক্যতার অগ্নিমন্ত্র, কালের গর্ভে জন্ম নেয় মানবমুক্তির এক মহান ইতিহাস ।

         

তেমনি এক মহান লক্ষ্যে ১৯৯৭ খ্রিঃ-এর ২রা নভেম্বর সূচিত হয়েছিল আমাদের শপথ । আজকের এই সম্মেলন সেই সূচনারই মহান পরিণতি । মিলনের এই মহাসন্ধিক্ষণ, এই মুখোমুখি হওয়া সেই শপথেরই ধারাবাহিক দর্পণ । শপথবদ্ধতায় দৃঢ় থেকে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, মেধা-মনন ও আত্মিক প্রয়াসে উত্তরণের প্রথম পর্যায় শেষ করেছেন, অন্তর্বীজ ফ্রন্টের সেই সব আদর্শিক সতীর্থ বন্ধুগণ সাংগঠনিক পুরোধা অগ্রণীদেরকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ।

         

মহান ছাত্রত্বের পরিচয় যখন কালিমালিপ্ত, জাতীয় ইতিহাসে বিবেক বলে পরিচিত মহান ঐতিহ্যের উত্তরসূরি আজকের ছাত্রসমাজ যখন জাতির কাছে ক্রমশঃ স্বার্থপর-আত্মকেন্দ্রিক, নেশাগ্রস্ত, খুন-ধর্ষণ, রাহাজানি, ছিনতাই, চাঁদাবাজির মতো চরম জঘন্যতায় বিশৃঙ্খল প্রজন্ম হিসেবে ধরা দিচ্ছে, তখনও দেশজ আবর্তে বেড়ে ওঠা চেতনায় তারুণ্যের আত্মবোধ নির্লিপ্ত ছিল, আমিও যে ছাত্র- ওই কলঙ্ক যে আমার ছাত্রত্বকেই ঘিরে- ওর দায়ভার যে ছাত্র হিসেবে আমার কাঁধেও বর্তায়- আমাদের সে বোধ অনৈক্য, বিচ্ছিন্ন থাকার মজ্জাগত ভাবনায় ছিল লুপ্ত, আমরা লুপ্ত ছিলাম প্রশ্নহীন, যা প্রতিবাদহীন নির্লিপ্তেরই প্রতিপাদ্য এবং তা এই পারিপার্শ্বিক আবর্তগত শিক্ষায় প্রাপ্ত চেতনাবোধের স্বাভাবিক পরিণতি । অন্যদিকে সর্বস্তরের মানুষের মতোই হয়তো বিশ্বাস স্থাপিত হয়েছিলো ঘৃণ্য ঐ অপবাদ তথা নিজেরই বিরুদ্ধে উত্থাপিত কলঙ্কে ।

 

কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রাখাতেই আবর্তগত ভিন্নতায় মানসপটে উঠে এলো দেশমাতৃকার অসহায় মুখ, ক্রমশঃ স্পষ্ট হতে থাকলো স্বদেশের বীভৎস দীর্ণতা । বিদেশের মাটিতেই প্রথম প্রয়োজন হয়েছিলো দেশের পরিচয়, বহির্বিশ্বের চোখে এভাবে নিজের দেশমাতৃকার ছবি দেখে আঁতকে উঠেছিলাম, সে মায়ের মালিন্য মাখা মুখ, সকরুণ চেহারা, তাঁর সন্তান হিসেবে নিজেদের ভিখিরী-বেগারস্-মিসকিন বলে মূল্যায়িত পরিচয়ে কাঁপিয়ে তুলেছিল আমাদের জন্মগত নাগরিক সত্তাকে । কিন্তু তখনো আত্মকেন্দ্রিক ভুল শিক্ষার অন্ধকারে আমরা নিমজ্জিত, বিভ্রান্তির বৈরিতায় অনৈক্য, ও পারস্পরিকতাবিহীন বিচ্ছিন্ন । ঠিক তখনই এই তমসাচ্ছন্ন চেতনায় ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারা থেকে বিশ্ববীক্ষার এক শাণিত সুতীব্র আলো ফেলেছিলেন আমাদের প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক বড়দা (এ আর শিকদার- আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্ রাজু শিকদার) । যাঁর আলোক-উদ্ভাসিত পথে, দেশে বিদ্যমান আদর্শগত সংকটে বিপর্যস্ত পারিপার্শ্বিকতায় গড়ে ওঠা আমাদের মনন ও গতানুগতিক মানসিক ধারায় একা-অনৈক্য-বিশৃংখল থাকার অনাদর্শিক বৈকূল্যতার ঘৃণ্য প্রতিমূর্তি ভেঙে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলাম- আমাদেরত্বে, ব্যক্তিকে সমষ্টি ভাবনার মহান উত্তরণে সূচনা করেছিলাম ইতিহাসনিষ্ঠ দায়িত্ব পালনের মহতী লক্ষ্যে, চেতনাকে গড়ে তোলা, সংগঠিত ও সংহতকরণের দৃঢ়বদ্ধতায় আদর্শগত সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপনে এক মহান সাংস্কৃতিক আন্দোলন । আজ প্রথম জাতীয় সম্মেলনে তথা জাতীয় জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তাঁকে জানাচ্ছি আমাদের হৃদ্স্পন্দিত সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ।

 

সুহৃদ সহযোদ্ধাগণ,

আমরা “লক্ষ্যনিষ্ঠ সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা চাই” “চেতনার একাত্মতা চাই” । আর তাই গণমানুষের ভাবনার জগৎকে ঘিরে গড়ে তুলতে চাই, “জাগরণ” বা “রেনেসাঁস” । অবশ্যই তা নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক, সর্বব্যাপক নবজাগরণের প্রত্যয়ী “গণজাগরণে”র রূপে । আর এর রূপকার হবেন যাঁরা, যাঁদেরকে নিয়ে আজকের এই সম্মেলন, তাঁদেরকে অবশ্যই ইতিহাসনিষ্ঠ অভিজ্ঞানের আলোকে আগামীর পথ নির্ধারণ করতে হবে ।

         

ইতিহাসগতভাবে আমরা দেখি, সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারায়, চিন্তার ক্ষেত্রে সব পরিবর্তনের বা রেনেসাঁসের বীজ, ভিন্ন আবর্ত থেকেই আসে । বিশেষতঃ সমকালীন বাস্তবতায় তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক, যখন বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতিতে বিশ্বে “কমিউনিকেশন রেভ্যুলেশন” ঘটে গেছে । মুহূর্তের মধ্যে আজ যে-কোনো চিন্তন বা বার্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে, গড়ে তুলছে অখন্ড বিশ্বমনন । বিজ্ঞানের কোনো জাতীয় সীমারেখা থাকে না, তা সমগ্র বিশ্ব মানবিকতার । তাই বিজ্ঞানে নির্ভর আধুনিক পারস্পরিকতায় আজ ‘চিন্তার ক্ষেত্র’ ব্যাপ্ত ব্যাপৃত বিশ্বময় । ভাবনার পরিপূর্ণ ভ্রূণ বা সভ্যতার সুস্থ বীজ-এর প্রাপ্তি কখনোই শুধু জাতীয় সীমারেখার মধ্যে নয় বরং জাতীয় জীবন ও মননকে সামনে রেখে সচেতন জাগরণ ও মুক্তির লক্ষ্যে তা আন্তর্জাতিক বা বিশ্বমুখিন । এই ধারা আজ বাস্তবতা ও প্রয়োজনবোধ-এ সম্পৃক্ত, ইতিহাস দ্বারা তা নির্ধারিত ।

 

কিন্তু ইতিহাসনিষ্ঠ সেই ধারা বা বীজ বেড়ে ওঠে, সংহত ও সংগঠিত রূপ পায় নির্দিষ্ট দেশের মাটিতে প্রোথিত হওয়ার পর, সেই দেশের বৈশিষ্ট্য অনুসারে । আর সেই বিশিষ্টতাই তার পরিচয় ও তার সত্তা ।

 

বস্তুনিষ্ঠ এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই, সে ধারা বা বীজ স্বদেশের মাটিতে রোপণের মহান লক্ষ্যে গত তিন বছর আমরা তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ তথা ক্রমবিকাশের প্রস্তুতিপর্বে বিগত তিন বছর ধরে কষ্টসাধ্য সহিষ্ণুতার পথ পেরিয়ে এসেছি, শেষ করেছি উত্তরণের প্রথম ধাপ বা সূচনাকাল ।

 

আজ এ-ধারাকে বিকশিত, বেগবান এবং পরিপূর্ণ লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁদের, যাঁরা দেশে অবস্থান করছেন, যাঁরা মাতৃরূপ স্বদেশের একই উদরে জন্ম নেয়ার বোধে আমাদের সহোদর এবং সচেতন যন্ত্রণায় দগ্ধ, অশ্রু-ক্রোধে প্রতিবাদী একই আদর্শিক পথে সংঘবদ্ধ । সেই সাথে, আমরা যাঁরা আদর্শিক চেতনায় আজ অখন্ড, আত্মিক ঐক্যবদ্ধ এই সম্মেলন কক্ষে ।

 

আগামীর আদর্শিক যুদ্ধ ঘোষণার এই সদ্ধিক্ষণে, তা নিয়ে সহযোদ্ধাগণের বিচার-বিশ্লেষণ ও জ্ঞাতার্থে বিগত তিন বছরের (দু’বছরের রিপোর্ট পূর্বপ্রকাশিত) রিপোর্ট পেশ করা হচ্ছে ।

 

এক্ষেত্রে প্রথমেই সকল সাথীদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সংস্কৃতি বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলতে আমরা কী বোঝাতে চাইছি । ‘সংস্কৃতি’ অর্থ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যাপিত জীবন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও তদানুসারে পারিপার্শ্বিক পরিমন্ডলে আবর্তিত তার জীবন সম্পর্কীয় ভাবধারা, জীবন সংশ্লিষ্ট চেতনাগত এই পরিমন্ডলই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল । আর সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে তার জীবনপ্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে যা কিছু এবং সমাজজীবনের অগ্রগতি বা মুক্তির লক্ষ্যে সমাজে বিদ্যমান এইসব বিষয়গুলির সাথে দ্বন্দ্বে, সে যা কিছু বিকাশ সাধন করে, গড়ে তোলে বা গড়ে তুলতে চায়, প্রগতির ধারা বিনির্মাণে তার সবটাই সংস্কৃতির অঙ্গীভূত । এই ব্যাপক অর্থে গৃহীত সমাজজীবনে ব্যাপৃত অর্থনীতি-রাজনীতি, ধর্ম-দর্শন, শিল্প-সাহিত্য বিষয়গুলোকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ও আদর্শের ভিত্তিতে যে সর্বব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা, তাকেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলা হচ্ছে ।

 

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখা বা বলা যেমন ভুল ও সংগঠনবিরোধী, তেমনি একে নিছক শিল্প-সাহিত্যের রসালো আড্ডা কিংবা সংগ্রাম বিযুক্ত লক্ষ্যবিহীন ধর্ম-দর্শন-অর্থনীতির গুরুগম্ভীর চর্চাকেন্দ্র ভাবা বা পরিণত করাটাও এই সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে সীমাবদ্ধ ও সাংগঠনিক লক্ষ্যকে বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়ার শামিল । জ্ঞানতত্ত্বের এই শাখাগুলো মিলেই গড়ে তুলবে এই আন্দোলনের লক্ষ্যনিষ্ঠ ধারা, তাই এসব এর অংশ, কিন্তু অংশ কখনোই সম্পূর্ণের সংজ্ঞা বা পরিচয় হতে পারে না ।

         

সুতরাং ব্যাপক অর্থে গৃহীত এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারা সম্পূর্ণ নতুন না হলেও ইতিহাসের পটভূমি থেকে বিশ্ববীক্ষার দ্বারা নির্ধারিত ও নির্দিষ্টকৃত এ-পথ স্বতন্ত্র এবং সমকালীন বাস্তবতায় তার রূপ নতুন, প্রায়োগিকতায় ভিন্ন ।

 

সে ক্ষেত্রে আমরা অনভিজ্ঞ অনভ্যস্ত; কাঁচা হাতে এই জটিল সংগ্রাম পরিচালনা শুরু করেছিলাম, এতে আমাদের ভুল-ভ্রান্তি, ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতেই পারে, রয়েছেও আর ভুল ঐক্যতাকে বিনষ্ট করে, সাংগঠনিক অস্তিত্বকে করে তোলে বিপন্ন । অস্তিত্বের প্রশ্নেই তাই ভুলের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম ও সতর্কতা বজায় রাখতে সংগঠন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ । কিন্তু তবুও ভুল মানবজীবনের এক স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, ইচ্ছা করলেও তার ঊর্ধ্বে আমরা দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারি না । কারণ আমরা জানি- মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানই তার ভুলের উৎস । মানুষের জানা-বোঝা বা করার সীমাবদ্ধতাই মানব-জীবনে ভুলকে করেছে অনিবার্য বৈশিষ্ট্য এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাই যেখানে মৌলিক স্লোগান, সেহেতু ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রশ্নে ভুলের উৎস হিসেবে সে সীমাবদ্ধতা ভাঙতে, সমষ্টিগতভাবে পারস্পরিক মতবিনিময়, জ্ঞানের আদান-প্রদান, সংযোজন-বিয়োজন তথা সামষ্টিক জানা-বোঝা ও করাকে যথার্থ সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সীমিত জ্ঞান বা আমাদের সীমাবদ্ধতা ভেঙে আমরা হতে পারি আপেক্ষিক অর্থে নির্ভুল-ক্রটিমুক্ত-ব্যাপক চেতনায় সমন্বিত, সংহত, সংঘবদ্ধ এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি । সাংগঠনিক পরিভাষায় যা যৌথ চেতনা বলে গৃহীত । ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক শক্তি অর্জন তথা লৌহদৃঢ়, সুশৃঙ্খল সংগঠন গড়ে তোলার মূল আওয়াজ বা মূলনীতি (বর্তমানের গৃহীত লাইন বা দলিল অনুযায়ী)-এর এ-পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি বা সংগঠন কর্তৃক যৌথ চেতনা বলে গৃহীত । যৌথ চেতনার মৌলিক শর্ত পূরণে পরিচালনা বোর্ড, পরিকাঠামোর বিধিমতে এ-রিপোর্ট পেশ করছেন । এক্ষেত্রে যৌথ চেতনার দুটো লক্ষ্য সামনে থাকছে ।

 

প্রথমতঃ ঐক্যের প্রশ্নে, শুধু ভুল আবিষ্কারই নয়, বরং মূল লক্ষ্য- সে ভুল শুধরে সংগঠনকে দৃঢ়বদ্ধ, বেগবান করা; যা সম্মেলনোত্তর কঠোর গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বাস্তবায়নে, সম্মেলন কক্ষে এখানে উপস্থিত প্রতিটি সম্মানিত প্রতিনিধি বন্ধুগণ নিজ নিজ ইউনিট-এ যৌথভাবে তৈরি করা মূল্যায়ন রিপোর্ট কেন্দ্রে পাঠাবেন এবং এটা বাধ্যতামূলক সাংগঠনিক নির্দেশ থাকছে ।

 

দ্বিতীয়তঃ পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও চেতনার সমন্বয়ের প্রশ্নে, গত তিন বছরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অর্জিত আমাদের অভিজ্ঞতা, অগ্রগতি বা পিছিয়ে পড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার এ-পর্বে প্রাপ্ত ফল, যা প্রতিটি ইউনিট ও সাথীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশিকা, গঠনতন্ত্র অনুসারে কর্মের নমুনা বা দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় । পরিকাঠামো বোঝার স্বার্থে অন্তর্বীজ প্রতিনিধিদের তাই নাম উল্লেখ করে রিপোর্ট পেশ করা হচ্ছে, যা পরবর্তী রিপোর্টে সাধারণত হবে না ।

 

“অন্তর্বীজ ফ্রন্ট” যেহেতু এতদিন জাতীয় সংগঠনের একক হিসেবে অথবা সাধারণভাবে বলতে গেলে “মডেল” হিসেবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথে গড়ে তোলা হয়েছিল, সেহেতু আগামীর জাতীয় স্তরে গড়ে তোলা সংগঠন এবং প্রতিটি ইউনিটে বিশেষ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সাংগঠনিক পরিকাঠামোর এই রূপই সাধারণভাবে রূপায়িত হবে ।

 

সুতরাং সে অনুসারেই বিভিন্ন কার্যক্রমের রিপোর্ট পেশ করা হচ্ছে । দু’বছরের রিপোর্ট পূর্বপ্রকাশিত হওয়ায়, তা শুধু ঐ রিপোর্টটির সাথে সংযুক্ত করা হলো । কিন্তু এখন শুধু শেষ (চলতি বছর) বছরের রিপোর্টটিই বিগত বছরের মূল্যায়ন রিপোর্ট আকারে পেশ করা হচ্ছে ।

 

জাতীয় সাংগঠনিক প্রথম রিপোর্ট-২০০০ খ্রিঃ

(২রা নভেম্বর ১৯৯৯ খ্রিঃ হতে ২৩শে আগস্ট ২০০০ খ্রিঃ পর্যন্ত)

 

ভূমিকাঃ

 

জাতীয় ক্ষেত্রে এক ব্যাপক গণচেতনা তথা গণজাগরণ গড়ে তুলতে ২রা নভেম্বর ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তারুণ্যকে ঘিরে এক মহান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল । সেই শপথের পথ বেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এই বার্তা । সংকট আর বিঘ্নতার পথ পেরিয়ে তা তৃতীয় বর্ষে পা ফেললো সাফল্যের আত্মতুষ্টির বদলে তা বাড়িয়ে তুলেছে আমাদের দায়বদ্ধতা । সেই সাথে বেড়েছে প্রতিকূলতার বিপক্ষে লড়ার অভিজ্ঞতা ও পরিপক্কতায় আমরা আজ আরো দৃঢ় । আর সেই দৃঢ়বদ্ধ অবস্থান থেকেই সাংস্কৃতিক সংগ্রামে গুণগত পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে, সামাজিক সংগ্রামে পরিমাণগত সংখ্যা বৃদ্ধিতে আমরা তৃতীয় বর্ষে পা রাখি । তৃতীয় বর্ষে পা রাখাতেই আমাদের পথপ্রদর্শক প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক বড়দা (এ আর শিকদার-আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্ রাজু শিকদার), আন্দোলনের প্রথম ধাপের যবনিকা ঘটাতে বিগত বছরের সারসংকলন পূর্বক আগামীর কর্তব্য পথের ঘোষণা দেন । “প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০ খ্রিঃ”-এর, যা আগামীতে সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে গণ্য ও পালিত হবে এবং শুরু হবে নতুন পর্বের পথচলা ।

         

উক্ত ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংগঠন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে । মূলতঃ এ বছরের সাংগঠনিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল- “প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০ খ্রিঃ” ।

         

অন্তর্বীজ ফ্রন্টঃ সাংগঠনিক তৎপরতার প্রথমেই উঠে আসে অন্তর্বীজ ফ্রন্টের পুনর্গঠনের দাবি । এই সম্মেলন সফল করার প্রতিটি প্রধান শর্ত অন্তর্বীজ ফ্রন্টের দক্ষতার উপরই নির্ভরশীল, তাই সম্মেলন পূর্বে তাঁদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও শক্তি যাচাইয়ের প্রশ্নও একই সাথে উঠে আসে ।

 

সংগঠন প্রধান (অস্থায়ী) হিসেবে আমাদের আন্দোলনের দিশারী বড়দা ( আর শিকদার-আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্ রাজু শিকদার)’র নির্দেশে অন্তর্বীজ ফ্রন্টের এক সাধারণ সভা ডাকা হয় । উক্ত সভায় তিনি তাঁর দীর্ঘ দু-তিন মাস কলকাতায় তথা অন্তর্বীজ ফ্রন্টে অনুপস্থিত থাকার কারণ হিসেবে ইউনিটে জবাবদিহি করেন । তিনি বলেন, অতিমাত্রায় তাঁর উপর নির্ভরশীলতা ভাঙতেই এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি । তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, “অন্যদের নিষ্ক্রিয়তা, অদক্ষতাই সংগঠনকে ব্যক্তিনির্ভরতার পথ ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে । এভাবেই চেতনাগত মানের পঙ্গুত্বই সংগঠনের মধ্যে ব্যক্তিবাদের প্রভাব বিস্তারকে পথ করে দেয় । চেতনাগত এই অবনয়নের ফাঁক গলেই নেতারা অসংখ্য কর্মীর আত্মত্যাগে গড়ে ওঠা সংগঠনকে ভুল পথে চালিত করে, স্বীয় স্বার্থে সংগঠন ও আন্দোলনকে লক্ষ্যভ্রষ্ট, দালালি আর লেজুড়বৃত্তিতে সম্পৃক্ত করে । তাই মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সংগঠন প্রসারের চেয়ে প্রয়োজন সাংগঠনিক চেতনানিষ্ঠ, দক্ষ হওয়া । এটা হতে না পারলে সংগঠন বড় হলেও তা দিয়ে কিছু হবে না । তাছাড়া সংগঠনের প্রধান লক্ষ্যই যখন স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন হয়ে গড়ে ওঠা, সেখানে এই নির্ভরশীলতা না ভাঙালে, নিজ নিজ এলাকায় কীভাবে সংগঠন বা স্বকীয় চেতনায় ইউনিট গড়ে তুলবে? আমার সন্তানের শিশুত্বের অসহায়তায়, তার হাত-পা কেটে পঙ্গু করে রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির ব্যবসা করতে চাই না- আপনারাও চাইবেন না । তাই সর্বাগ্রে ভাঙতে হবে নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা, নির্ভরশীলতা ও চেতনাগত পঙ্গুত্ব । সেই সাথে যাঁরা বড়দার সামনে সংগঠনপ্রাণ, তাঁরা বড়দার অনুপস্থিতিতে কতোটা সাংগঠনিক, সেটা বোঝার জন্যও প্রয়োজন ছিল এই অনুপস্থিতির । সংগঠন কারো বাপের নয়, আমরাও কারো গোলাম নই । কোনো ব্যক্তিকে সামনে রেখে নয়, সংগঠন করছি দেশ আর আদর্শকে সামনে রেখেই । ব্যক্তির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হওয়া আর ব্যক্তিনির্ভরতা এক নয় । ব্যক্তিনির্ভরতা কাটিয়ে আদশিক-নির্ভরতা উঠে না আসলে, ব্যক্তির সাথে দ্বন্দ্ব হলে আদর্শকে একদিন ত্যাগ করবে, অন্য নিষ্ক্রিয় বলে নিজে নিষ্ক্রিয় হওয়ার যুক্তি খুঁজবে । কিংবা যার হাত ধরে সে একদিন সংগঠনে এসেছিল, তার সংগঠন চ্যুত হওয়ায় সেও সংগঠন ত্যাগ করবে । অন্যের মুখে ঝাল খাওয়া এমন অনেক নিজেস্বতাহীন গাধা-গরু আমি দেখেছি, কিন্তু এমন গাধা-গরুর সাথে গোয়ালে যাওয়া যায়- যুদ্ধে যাওয়া যায় না বা মুক্তিজোট করা যায় না । এটাও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যক্তিবাদেরই এক ঘৃণ্য রূপ । এই স্পষ্টতার জন্যও প্রয়োজন ছিল এই অনুপস্থিতির । নিছক আড্ডা দিতে কিংবা অন্য স্বার্থে এই বিভূঁইয়ে কেউ সংগঠন নিয়ে খুব দৌড়াচ্ছেন আর আমরাও তাকে হয়তো সাংগঠনিক বলছি । কিন্তু সে প্রকৃতই সাংগঠনিক কি না তার প্রমাণ পাওয়া যাবে, সে দেশে নিজ এলাকায় কী করছে, যেখানে বড়দা বা কেউ নেই । অভিনয় কখনো দীর্ঘমেয়াদী হয় না, ভন্ডমিটা নিখুঁত হয় না, সময় সব সত্যকেই প্রকাশ করে দেয় । সে সময় সমাগত “প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০ খ্রিঃ”-এ এর প্রমাণ মিলবে কে প্রকৃত শপথের সৈনিক অথবা কে ভন্ড, বেঈমান! আদর্শের পথে সবাই চলতে পারে না, কিন্তু কেউ কেউ পারে- তাঁরাই ইতিহাস, তাঁরাই এগিয়ে নিয়ে যায় সভ্যতাকে । অহেতুক নিজের ভন্ডমি আর বেঈমানের পরিচয়টা দেওয়ার চেয়ে সংগঠন না করা অনেক ভালো ।”

 

তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে, সেই সাথে তাঁরই নির্দেশে, সংগঠনের আহ্বায়ক আবু লায়েস মুন্নার অনুপস্থিতিতেও ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের নেতৃত্বে সংগঠনের প্রসারতা ও গতি অক্ষুণ ছিল । কিন্তু বড় ধরণের সংকটেরও সৃষ্টি হয়েছিল । যদিও তা সংগঠনকে পিছিয়ে দেয়নি, এগিয়েই দিয়েছে । কারণ, সংকটেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সংগঠকদের ভূমিকা, দক্ষতা বা সাংগঠনিক চরিত্র । অনেকে এই সময়ে নিজ যোগ্যতা বলে নেতৃত্বের সম্মুখভাগে চলে এসেছেন, অনেকে পিছিয়ে পড়েছেন । সর্বোপরি, তাঁর এই অনুপস্থিতিতেই প্রমাণ মিলেছে বা পরিমাপ করা গেছে সাংগঠনিক শক্তিকে এবং দীর্ঘ সময় পর সেই শক্তির উপর দাঁড়িয়েই তিনি “প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০ খ্রিঃ” এর ঘোষণা দিয়েছিলেন । সেই সাথে সাংগঠনিক রিপোর্টের ভিত্তিতে খুব দ্রুত অন্তর্বীজ ফ্রন্ট পুনর্গঠিত করতে পেরেছিলেন ।

 

অন্তর্বীজ ফ্রন্ট পুনর্গঠনে এবার বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয় নতুনদের উপর । নেতৃত্বের পুরোভাগে তুলে আনা হয় তাঁদের ।

 

সেই সাথে বিগত বছরের দৃঢ় প্রচেষ্টার ফলে প্রথমবারের মতো সংগঠনে পরিকাঠামোর প্রাণকোষ তথা “ইউনিট”কে পরিপূর্ণ সাংগঠনিক রূপ দেয়া হলো । অর্থাৎ ইউনিট পরিচালক বা আহ্বায়ক (মুখপাত্র পরিচালনা বোর্ড প্রতিনিধি), আদর্শিক শিক্ষক (সমন্বয়কারী অথোরিটি বা কন্ট্রোল বোর্ড প্রতিনিধি) এবং এডিটিং সম্পাদক বা বোর্ড প্রতিনিধি (তথ্য ও লেখা বিষয়ক) । যদিও অন্তর্বীজ ফ্রন্ট ইউনিটের ক্ষেত্রে এডিটিং প্রতিনিধির প্রয়োজন ছিল না বলে অবশেষে তা বাদ দেয়া হয়েছে । কিন্তু ইতোপূর্বে ইউনিটসমূহে এই সাংগঠনিক রূপ দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি ।

 

সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ে অনুশীলনঃ সম্পাদনা বা এডিটরিয়াল বোর্ড সভ্যগণ প্রয়োজন ছিল না বিধায় বাদ দেওয়া হয়েছে ।

 

ইউনিটসমূহ পুনর্গঠিত হওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে সাংগঠনিক শক্তি যাচাই ও অনুশীলনের প্রশ্নে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা” দিবস হিসেবে আমাদের বিশ্বস্বীকৃত, আমাদের অহংকারী ইতিহাস মহান “২১ উদযাপনের” ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় । বিশেষতঃ যখন আমরা বিদেশের মাটিতে সংগঠিত সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে বিরাজ করছি । সেই সাথে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও আজিজুল হক-দের সংগঠন “ভাষা শহীদ স্মারক সমিতির” আমন্ত্রণপত্র আমাদের হাতে এসে পৌঁছানোর পর তা আরো ব্যাপকতা পায় ।

         

পরিকাঠামো অনুসারে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য “মিশন কাঠামো” গড়ে তুলতে হয় । সেই হিসেবে এ-মিশনের নাম দেওয়া হয় “মিশন মহান ভাষা দিবস” এবং “মিশন মহান ভাষা দিবস-২০০০” গঠনের সাথে সাথে ‘২১-এর ক্রোড়পত্র’ বের করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় ।

                                     

মিশন কর্তৃক প্রেরিত

সাংগঠনিক রিপোর্ট

 

বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, যেহেতু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে ইতোমধ্যেই পরিচিতি লাভ করেছে, সেহেতু আমরা মনে করি যে- সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমাদের এ পদার্পণ বিশেষ প্রয়োজন । যা সংগঠনকে অতি দ্রুত অগ্রসর হতে সাহায্য করবে । এই গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনাপূর্বক মহান ২১শে ফেব্রুয়ারীকে সামনে রেখে সংগঠন কলকাতার একটি বৃহৎ সংগঠন ‘ভাষা শহীদ স্মারক সমিতির’ সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাঁদের সঙ্গে যৌথভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারী পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । উল্লেখ থাকে যে, ভাষা শহীদ স্মারক সমিতির সভাপতি বিখ্যাত সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং কর্ণধার সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট আজিজুল হক ও সমকাতারের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রতন বসু মজুমদার সহ আরও অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বগণ । সংগঠন তাঁদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে । গর্বের বিষয় এই যে, কলকাতার কার্জন পার্কে অবস্থিত ভাষা শহীদ স্মারক ২১শে ফেব্রুয়ারীতে প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করার জন্য তাঁরা সংগঠনকে আহবান জানান । যা এককথায়, সংগঠনের জন্য বিশাল পাওয়া ।

         

সমস্ত আয়োজন সুসম্পন্ন হওয়ার পর ২১ তারিখ সকাল ৭ টায় গ্র্যান্ড হোটেলের বিপরীতে আমরা সমবেত হই এবং অর্ধশতাধিক ছাত্রছাত্রীর একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহ আমরা কার্জন পার্কের দিকে অগ্রসর হই ।

 

কার্জন পার্কে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট-এর পুষ্পস্তবকটি সর্বপ্রথম ভাষা শহীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মাণকৃত “ভাষা শহীদ স্মারক”-এ অর্পণ করা হয় । তারপর পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা । এঁদের মধ্যে ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আজিজুল হক সহ বিশিষ্ট সাহিত্যিক দিব্যেন্দু পালিত, চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন সহ বেতার ও দূরদর্শনের বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী, আবৃত্তিকার, কলামিস্ট বৃন্দ । এর পরই বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের শিল্পীদের নিয়ে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় কার্জন পার্কের লালন মঞ্চে । সম্পূর্ণ ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এই অনুষ্ঠান কার্জন পার্কে উপস্থিত সকলেরই প্রশংসা কুড়ায় । গোটা কার্জন পার্ক জুড়ে আধিপত্য ছিল আমাদের । “মুক্তিজোট”-এর পক্ষ থেকে উপস্থিতদের মার্জিত সাজসজ্জা, হৃদয়গ্রাহী আচরণ, যাঁরা সব পরিস্থিতি দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনায় সাংগঠনিক তৎপরতায় অন্যদের চোখে ব্যতিক্রম ভাষাদার হিসেবে ধরা হয় । এরই সুবাদে সকল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচয় ও মতবিনিময়ের দরজা অবারিত হয় । যা সংগঠনকে সকলের মাঝে পরিচিত করে তুলতে বিশেষ সহায়তা করে । একই সাথে “২১-এর ক্রোড়পত্র” বিনামূল্যে সকলকে প্রদান করা হয় ।

 

এরই মধ্যে আকাশবাণী কলকাতা, জি নিউজ-এ সংগঠনের আহ্বায়ক আবু লায়েস মুন্নার সাক্ষাৎকার সংগঠনের জন্য আরও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে । প্রকৃতপক্ষে, একুশের সকাল ছিল সংগঠনের জীবনে এক নব অধ্যায় । সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সদনের শিশির মঞ্চে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির আমন্ত্রণে সংগঠন সেখানে যায় এবং গ্রীন রুমে অবস্থানরত শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাঁদের মাঝে একুশের ক্রোড়পত্র বিতরণ করেন । শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন আবৃত্তিকার পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, জগন্নাথ বসু, উর্মিলা বসু ও ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় । কণ্ঠশিল্পী স্বাগতালক্ষ্মী দাসগুপ্ত, ইন্দ্রনীল সেন, অজিত পান্ডে, লোপামুদ্রা মিত্র, শতরূপা সান্যাল সহ আরও অনেকে । এ-পর্যায়ে সংগঠন তার সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের প্রশ্নে পূর্ণ প্রমাণ দান করে ।

 

অন্তর্বীজ ফ্রন্ট ব্যাঙ্গালোরঃ এছাড়া মাতৃভাষা বিজয়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে অন্তর্বীজ ফ্রন্ট ব্যাঙ্গালোর শাখার উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় । সেখানকার অথোরিটিদের নেতৃত্বে ব্যাঙ্গালোরে শিক্ষারত প্রায় অর্ধশত সাংগঠনিক সভ্যের প্রত্যক্ষ কর্মকান্ডের, প্রভাতফেরী, বিকেলের আলোচনা সভা, যে সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন । এবং অত্যন্ত সুন্দর প্রচ্ছদে পত্রিকা প্রকাশ করেন । পত্রিকার নাম দেয়া হয় “মহান একুশ” এবং ইংরেজীতে নাম “21 February” ।

 

সম্মেলনকে ঘিরে দেশে সাংগঠনিক তৎপরতা সম্পর্কে জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে এরপর সারাদেশ ব্যাপী ভ্রাম্যমান সিটিং এর সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক, সংগঠনের আহ্বায়ক- আবু লায়েস মুন্না কলকাতা ত্যাগ করেন ।

         

সেক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুসারে পাবনা, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, রাজশাহীতে বিভিন্ন সাথীদের সাথে যোগাযোগ দেয়া হয় । অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল- শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিদের সাথে সল্প পরিসরে সিটিং হয় । সে সভায় উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলা প্রধান, ঢাকা মহানগর প্রধান এবং সংগঠনের আহ্বায়ক ।

 

সেই সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে- ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মাগুরা এবং ফরিদপুরের প্রতিনিধিদের নিয়ে ফরিদপুরে সভা করা হয় । সেই সাথে তার যোগাযোগের ভিত্তিতে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান-এর নেতৃত্বে মহানগর প্রতিনিধিদের সহ একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় ।

 

সর্বশেষ ঢাকা মহানগর প্রধানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ সহ ভূঁইয়া একাডেমী, চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিদের সাথে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় ।

 

এভাবে যথাসম্ভব সর্বত্র প্রতিনিধিদের সাথে ভ্রাম্যমান সভার মাধ্যমে সাংগঠনিক তৎপরতা তথা সম্মেলন সফলের জন্য ন্যূনতম সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে যাঁরা কলকাতায় ফিরে আসেন । এবং অন্তর্বীজ ফ্রন্টের সভা ডেকে সমস্ত সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মকান্ড সম্পর্কে মূল্যায়ন আলোচনা শেষে ২৩শে আগস্ট-২০০০-এ “প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০”-এর প্রস্তুতি প্রসঙ্গে একদিনের কর্মশালার তারিখ নির্ধারণপূর্বক পরীক্ষাকে সামনে রেখে ৩ মাসের জন্য সাংগঠনিক কর্মকান্ড স্থগিত ঘোষণা করা হয় ।

 

প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০-এর প্রত্যক্ষ প্রস্তুতিপর্ব পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী ২৩শে আগস্ট ২০০০-এ অন্তর্বীজ ফ্রন্টের একদিনের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে, সম্মেলন প্রসঙ্গে পূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ।

 

২৩শে আগস্ট কর্মশালায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা যেভাবে গৃহীত হয়ঃ

 

সাথী,

 

চেতনাকে গড়ে তোলার আন্দোলনই সাংস্কৃতিক আন্দোলন । সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার উৎসরণে বিনির্মিত চেতনাই গড়ে তোলে মানবমুক্তির ভিত ।

 

অবক্ষত মূল্যবোধের কালচে স্রোতে যখন ভেসে যাচ্ছে হতাশমৈথ তারুণ্য । দুর্বিনীত পঙ্কিলতা যখন অক্টোপাসের মতো ক্রমশঃ ঘিরে ফেলেছে যৌবনের সৃষ্টিশীল দুর্বারতা, যখন মহান ছাত্রত্বের গা থেকে খুলে নিচ্ছে মহত্ত্বের পরিচয়, তাঁদের মানবিক মননকে যখন খুবলে খাচ্ছে দেশের স্বার্থান্বেষী ভাগ্য বিধাতারূপী তথাকথিত দেশপ্রেম বর্জিত ক্ষমতাসর্বস্ব রাজনৈতিক শকুনেরা, সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তির পথে আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন শিকড়বিচ্ছিন্ন, ইতিহাসের বিকৃতিতে বিস্মৃত, স্ব-ঐতিহ্য, তথাকথিত বিজাতীয় বেনো সংস্কৃতির উন্মত্তে ভুলেছে তারা অস্পৃশ্যতার সীমারেখা এবং অনিবার্য পরিণতিতে তারুণ্যের দুঃসাহস শৃঙ্খলিত, আমাদের দুর্জয়তা যখন গতানুগতিকতার অমানবিক নির্লিপ্ততায় নিমজ্জিত প্রতিবাদী তারুণ্য, যখন আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতায় বিকিয়ে দিচ্ছে নিজের নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা এবং দেশ ও তার ভবিষ্যৎ যখন এই গাঢ় অন্ধকারে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বিদেশের মাটিতে আমরা আবিষ্কার করলাম আমাদের দেশজ দীনতাকে, স্বদেশের টান আমাদের হাতকে করলো মুষ্টিবদ্ধ ।

 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গত ত্রিশ বছর ধরে স্বার্থান্বেষীদের স্বীয় স্বার্থে গড়ে তোলা ঘৃণ্য আবর্তে আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং সেই ঘৃণ্য আবর্তের পাকেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চেতনা, যা অধঃপতিত বিশৃংখল বিভ্রান্ত, অনৈক্য । আবর্তগত ঘৃণ্যতা থেকে বাঁচতে সমগ্র দেশ ও জাতিকে সামনে রেখে ছাত্রত্বের দায়বদ্ধতা থেকে ১৯৯৭ সালের ২রা নভেম্বর দল-বল নির্বিশেষে এক সর্বব্যাপক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলাম আমরা । সেই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ তিন বৎসর কাল কলকাতায় অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাতের দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট তার লক্ষ্যে দৃঢ় ও অবিচল থেকে, দেশের জেলা সমূহ সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে পরিমাণ সাংগঠনিক ক্রিয়াকর্ম প্রসার ও প্রচার করতে পেরেছে, তার ফলাফল নির্ধারণের উপযুক্ত ও সঠিক সময় আজ আমাদের সামনে সমাগত । বিগত তিন বছর আমরা কী করতে পেরেছি আর কী-ই-বা করতে পারিনি, তার যথাযথ মূল্যায়ন তথা পরীক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে এবং এই পরীক্ষা ক্ষেত্রটাই হলো কাউন্সিল । বর্তমানে কলকাতাকেন্দ্রিক এই সংগঠন একটি সুষ্ঠু কাউন্সিলের মাধ্যমেই তার ভিত্তি দেশের মাটিতে প্রত্যক্ষ ও দৃঢ়ভাবে স্থাপন করতে পারে । অন্যথায় সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করার পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য । বোধ করি, তা আমাদের কারোরই কাম্য হতে পারে না । কেননা, শপথের সত্যতায় আজ আমরা ছড়িয়ে পড়েছি দেশের অসংখ্য জনপদে ।

 

এমতাবস্থায়, কাউন্সিলের গুরুত্ব অনুধাবন পূর্বক কলকাতাস্থ সংগঠনের “অন্তর্বীজ ফ্রন্ট”-এর উপস্থিত সকল সভ্যদের নিয়ে একটি সাধারণ সভার আয়োজন করা হয় গত ২৩শে আগস্ট ২০০০ খ্রিঃ তারিখে । যাতে প্রথম পর্যায়ের যবনিকা টানা হয়েছে ।

 

উপস্থিত সকল সভ্যদের মতামতের ভিত্তিতে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হয়েছেঃ

 

১) আগামী ২৩শে সেপ্টেম্বর-২০০০ -কে সামনে রেখে রোজ শনিবার সকাল ১১ টায় ঢাকায় নির্ধারিত স্থান (যা পরে পত্রের মাধ্যমে সকলকে অবগত করা হবে) প্রস্তুতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে ।

 

২) ২৩শে সেপ্টেম্বর-২০০০ -কে সামনে রেখে প্রত্যেক সহযোদ্ধা, যাঁরা কলকাতায় অবস্থান করছেন, তাঁরা কমপক্ষে দশ দিন পূর্বে দেশে ফিরে যাবেন ।

 

৩) প্রত্যেক সদস্যের হাতে যথাসময়ে সম্মেলনকে সফল করার সমস্ত রকম কার্যপ্রণালী সম্বন্ধীয় কাগজ-পত্রাদি প্রদান করা হবে । আগামী ১৩ই সেপ্টেম্বর-২০০০ সদস্যদের বাড়ির ঠিকানায় পত্র পাঠানো হবে এবং প্রত্যেককেই পত্র-প্রাপ্তির উত্তর যথাসময়ে অবশ্যই দিতে হবে ।

 

৪)  অন্তর্বীজ ফ্রন্ট-এর সকল সহযোদ্ধা, যাঁরা দায়িত্ব গ্রহণ পূর্বক দেশে যাচ্ছেন, তাঁদের যোগাযোগের ঠিকানা গ্রহণ করা হয়েছে ।

 

৫)  যেহেতু কলকাতাস্থ অন্তর্বীজ ফ্রন্ট-এর সভ্যরাই দেশের সকল ইউনিট সমূহের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী সাংগঠনিক অগ্রজ সংগঠক এবং তাঁরাই প্রস্তুতি সমাবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, সেহেতু প্রস্তুতি সমাবেশ সুষ্ঠুভাবে সফল করার দায়ভার শুধুই তাঁদের, তথা অন্তর্বীজ ফ্রন্ট-এর উপরই বর্তাবে ।

 

বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে যে, এই সন্ধিক্ষণ তথা সাংগঠনিক বিশেষ মুহূর্ত (প্রস্তুতি সমাবেশ থেকে) সংশ্লিষ্ট কর্মপ্রক্রিয়ায় (প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০) যারা নিষ্ক্রিয় থাকবেন, তাদের শপথের অসত্যতা প্রমাণিত হবে । অর্থাৎ প্রকৃত সাংগঠনিক শপথের সুদৃঢ় সাথীদের পরিচয়ও মিলবে এই সম্মেলনে ।

         

নিম্নে প্রথম জাতীয় সম্মেলনের তিনটি পর্ব ও প্রক্রিয়া সমূহ ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো ।

 

প্রথম জাতীয় সম্মেলন ২০০০-এর প্রস্তুতি প্রণালীঃ

 

বিগত তিন বছরে দেশের ৬৪টি জেলার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হলেও সাংগঠনিক কর্মকান্ড সক্রিয় থেকেছে মোট ৪৮ জেলায় ।তন্মধ্যে বিভিন্ন কারণে শুধু ৪০টি জেলাকেই সম্মেলনভুক্ত অঞ্চল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিভাগীয় শহরগুলোকে স্বতন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয়েছে ।

         

৪০টি জেলাকে ৮ (আট)টি অঞ্চলে বিভক্ত করে অন্তর্বীজ ফ্রন্ট-এর সভ্যদের হাতে দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছে । অঞ্চল প্রধান হিসেবে এরা নিজ নিজ অঞ্চলভুক্ত জেলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা ও পৌর ইউনিটগুলোর সাথে সাংগঠনিক যোগাযোগ স্থাপন করে প্রস্তুতি সমাবেশ ও উক্ত অঞ্চলসমূহের অন্তর্বীজ ফ্রন্ট সভ্যদের সাথে যৌথ নেতৃত্বে সম্মেলন প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় গৃহীত সুনির্দিষ্ট তিন পর্ব বা তিন স্তর পূর্ণ ও বাস্তবায়িত করবেন ।

         

প্রথম সম্মেলন সর্বান্তকরণে সফল করার স্বার্থে সম্মেলন পর্বকে তিনটি স্তর বা তিন পর্বে বিভক্ত করা হয়েছে ।

প্রথম পর্ব- ঢাকায় সম্মেলন প্রস্তুতি সমাবেশ

দ্বিতীয় পর্ব- আঞ্চলিক সমাবেশ

তৃতীয় বা শেষ পর্ব- কেন্দ্রীয় সমাবেশ বা সম্মেলন ।

 

সম্মেলন প্রস্তুতি সমাবেশঃ

 

১)       ক) প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০ সফল করার স্বার্থে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন আঞ্চলিক স্তরে সমাবেশ-এর তারিখ নির্ধারণ ও সম্মেলন সম্পর্কিত আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি গ্রহণ, প্রথম পর্বের এই প্রস্তুতি সমাবেশ যা “কেন্দ্রীয় মিনি কাউন্সিল” হিসেবে আখ্যা পেতে পারে, তা সম্পূর্ণই “অন্তর্বীজ ফ্রন্ট”-এর উপর নির্ভরশীল ।

 

খ) “অন্তর্বীজ ফ্রন্ট”-এর যে সভ্য আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি তাঁর নিজ অঞ্চলভুক্ত যে সব সম্মানিত “অন্তর্বীজ ফ্রন্ট”-এর সভ্যরা রয়েছেন তাঁদের সাথে, যোগাযোগের মাধ্যমে যৌথ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিটি জেলা থেকে ন্যূনতম তিনজন প্রতিনিধি (এরা প্রতিটি জেলাধীন অন্তত তিনটি থানার একজন করে প্রতিনিধি) কে নিয়ে প্রস্তুতি সমাবেশে উপস্থিত করবেন । অর্থাৎ একটা অঞ্চলভুক্ত যদি ৫টি জেলা থাকে, তবে তার আঞ্চলিক প্রতিনিধি মোট ন্যূনতম সংখ্যা হবে ৫×৩= ১৫ জন ।

 

গ) স্বতন্ত্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ থেকেও তিন জন করে প্রতিনিধি থাকবেন ।

 

ঘ) প্রথম পর্বের এই সমাবেশে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন, সম্মেলন-এর তারিখ নির্ধারণ সহ আনুষঙ্গিক সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে । এর সাফল্যের উপরই নির্ভর করেছে মূল সম্মেলন সফল করার যোগ্যতা, নিশ্চয়তা ।

 

ঙ) আঞ্চলিক সমাবেশ সমূহের তারিখ ও স্থানগুলিও এই সমাবেশে উপস্থিত প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে ।

 

চ) “অন্তর্বীজ ফ্রন্ট”-এর নেতৃত্বে আসা প্রতিটি ইউনিট প্রতিনিধি, তাঁদের দেওয়া সিদ্ধান্ত অনুসারে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে আঞ্চলিক সমাবেশ সফল করতে সচেষ্ট হবেন । আর এ জন্যই সম্মেলনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি সমাবেশ সফল করতে “অন্তর্বীজ ফ্রন্ট”-এর প্রতিটি সভ্যকে নিজ নিজ এলাকা ও অঞ্চলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে । এটা শুধু তাঁদের দক্ষতার উপর নির্ভরশীল এবং তাঁদের দায়িত্বেই অর্পিত । সাংগঠনিক জীবনে তাঁদের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জও এটা ।

 

আঞ্চলিক সমাবেশঃ

 

২)       ক) প্রস্তুতি সমাবেশ নির্দিষ্ট তারিখ অনুসারে যে সব প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন, তাঁরা নিজ নিজ থানা ও ইউনিট (১১ জন) সমূহ দ্রুত পূরণ করতে সচেষ্ট হবেন ।

 

খ) ইউনিট সম্পূর্ণ না হলেও যে ক’জন হয় (ন্যূনতম ৫ জন), তাঁদের নিয়ে আঞ্চলিক সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন । অর্থাৎ প্রস্তুতি সমাবেশ থেকে ফিরে এসে, প্রতিনিধিবৃন্দের সক্রিয়তা আঞ্চলিক সমাবেশে উপরোক্ত সংখ্যক অনুসারে সভ্যদের উপস্থিতিতে সমাবেশ সফল করতে সক্ষম হবেন ।

 

গ) আঞ্চলিক সমাবেশে উপস্থিত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত করবেন সম্মেলনে তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী নেতৃত্বকে । প্রতিটি ইউনিট থেকে ন্যূনতম তিনজন প্রতিনিধি পাঠাবেন । অর্থাৎ একটি জেলাভুক্ত তিনটি থানা অনুসারে তিনটি ইউনিট । সেক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা থেকে মোট ৯ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে সম্মেলনে উপস্থিত হবেন ।

 

ঘ) আঞ্চলিক সমাবেশে “সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি”-এর পক্ষ থেকে প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত হয়ে সংগঠন ও সম্মেলন প্রসঙ্গে যথাসম্ভব বিস্তারিত জানাবেন । উল্লেখ্য যে, এখানেই সকল প্রশ্নোত্তর আলোচিত হবে ।

 

তৃতীয় বা শেষ পর্ব:

৩)       ক) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্মানিত প্রতিনিধিবৃন্দ সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত থাকবেন ।

 

খ) সহযোদ্ধাদের সাংগঠনিক শপথ উজ্জীবিত সুশৃঙ্খল, সুসংবদ্ধ সুচিন্তিত মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা থাকবে । কিন্তু সম্মেলনে প্রশ্নোত্তরের কোনো পর্ব থাকবে না । সম্মেলনপূর্ব সাংগঠনিক প্রশ্নোত্তরের পর্ব যেহেতু আঞ্চলিক সমাবেশে করা হবে এবং সম্মেলনে উপস্থিত সকল প্রতিনিধিদেরকে সম্মেলন শেষে বাধ্যতামূলক রিপোর্ট করার জন্য সাংগঠনিক নির্দেশ থাকছে । তাই সম্মেলনে কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকবে না ।

 

গ) পরবর্তীতে রিপোর্টে লিখিত সকল প্রশ্ন ও মতামত ছাড়াও সংগঠনের যে-কোনো সভ্যের সাংগঠনিক স্বচ্ছতা অর্জনের জন্য সংগঠন সকল প্রশ্ন ও মতামত প্রসঙ্গে আলোচনা করতে বাধ্য । কারণ সংগঠন কঠোরভাবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ও যৌথ চেতনার মাধ্যমে সাংগঠনিক স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী । সংগঠন শুধু এইভাবেই ত্রুটিমুক্ত, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হতে পারে ।

 

সম্মেলনে ঘোষিত হবে- আগামী কর্মশালা মহতী লক্ষ্য পূরণের অমোঘ শক্তির সুদৃঢ় সাংগঠনিক ভিতের উপর ঘোষিত হবে তারুণ্যের দীপ্ত শপথ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দিশা হিসেবে সহযোদ্ধা সাথী-বন্ধুরা, দুঃসাহসী সততায় একাত্ম হয়ে ঘোষণা করবে চেতনাকে গড়ে তোলার এক মহান ইশতেহার ।

 

প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০ সফল হোক

সাংস্কৃতিক সংগ্রাম জিন্দাবাদ

মুক্তিজোট জিন্দাবাদ

 

 

দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বীজ ফ্রন্ট-এর কার্যক্রম এলাকা

 

১.        অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) জামালপুর খ) শেরপুর গ) টাঙ্গাইল ঘ) ময়মনসিংহ ঙ) নরসিংদী

২.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) ঝিনাইদহ খ) মেহেরপুর গ) চুয়াডাঙ্গা ঘ) মাগুরা ঙ) রাজবাড়ী চ) যশোর ছ) ফরিদপুর জ) নড়াইল

৩.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) গাইবান্ধা খ) বগুড়া গ) রাজশাহী ঘ) পাবনা ঙ) নবাবগঞ্জ চ) নওগাঁ ছ) নাটোর

৪.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) পঞ্চগড় খ) দিনাজপুর গ) ঠাকুরগাঁও

৫.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) নীলফামারী খ) রংপুর গ) কুড়িগ্রাম গ) লালমনিরহাট ঘ) জয়পুরহাট

৬.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) চট্টগ্রাম খ) রাঙামাটি

৭.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) নেত্রকোনা খ) কিশোরগঞ্জ

৮.       অঞ্চলভুক্ত জেলা সমূহঃ ক) সাভার খ) মানিকগঞ্জ (Connected) গ) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

# তা ছাড়াও অন্তর্বীজ ফ্রন্ট-এর কার্যক্রম এলাকা হিসেবে নিম্নলিখিত ৪টি বিভাগীয় শহর ঘোষণা করা হয়ঃ

# ঢাকা বিভাগীয় শহর

# খুলনা বিভাগীয় শহর

# বরিশাল বিভাগীয় শহর            

# রাজশাহী বিভাগীয় শহর           

 

যে জেলাসমূহের দায়িত্ব সংগঠনের উপর ন্যস্ত থাকছে, সেগুলো হলোঃ

ক) কুমিল্লা

খ) ব্রাহ্মণবাড়িয়া

গ) মৌলভীবাজার

ঘ) গোপালগঞ্জ

ঙ) সাতক্ষীরা

চ) নারায়ণগঞ্জ

ছ) মুন্সিগঞ্জ

জ) গাজীপুর

 

 

কালায়ন

 

একটি সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংগঠক, সেই সংগঠনের মুখপত্র । এবং বিশেষতঃ তা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার । একজন ছাত্রের হাতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র যখন কলম, জ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত হওয়াটাই যখন তার যুদ্ধ, তখন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মহান সৈনিক হিসেবে, এটা তার রণভূমি । মুক্তিজোট তা জানে বলেই সূচনালগ্নেই সে উদ্যোগী হয়েছে, তার ধারাবাহিক ত্রৈমাসিক মুখপত্র “কালায়ন” প্রকাশে ।

         

এমন-কি সংগঠনের পরিকাঠামো গত তিনটি স্তম্ভ হিসেবেও এটি গৃহীত । এডিটোরিয়াল বোর্ডের মূর্ত রূপ- কালায়ন । এছাড়া স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্নতার প্রশ্নে স্থানিক সচেতন ইউনিট গড়তে প্রধান ও প্রথম কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে “লণ্ঠন” প্রকাশের । স্থানিক ইউনিট নিজস্বতার জন্য, লণ্ঠন এবং সমগ্র দেশের স্থানিক পর্যায় থেকে বিশেষীকৃত, বিশ্লেষিত ও সমাধিত হয়ে কেন্দ্রীয় মুখপত্র হিসেবে, সংগঠনের জাতীয় মুখপত্রে রূপ পাবে ।

         

কিন্তু চরম অর্থনৈতিক সংকটে এক পর্যায়ে কালায়ন প্রকাশ শুধু অনিয়মিতই নয়, বরং বন্ধ করে দিতে হয়েছে । অথচ, সাংস্কৃতিক সংগ্রামে তা সচল না রাখলে, সংগঠন ক্রমশঃ বিভ্রান্তি ও নৈরাজ্যের শিকার হতে পারে । যা এক্ষেত্রে আত্মঘাতী বলে বিবেচনাযোগ্য । সম্মেলনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হওয়ার পর পুনরায় পত্রিকা প্রকাশ করা হবে ।

 

আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ব বোধ

       

আমরা যেহেতু আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী; তাই ভারত, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেয়ার মহান দায়িত্ব পালন করে চলেছি এবং বিশ্বব্যাপী আমরা ছড়িয়ে পড়তে চাই । সেই সাথে বিশ্বের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমমনা আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী সংগঠনের সাথে সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে সংগঠন বদ্ধপরিকর । সেক্ষেত্রে আমাদের স্লোগান “মানব যেহেতু বিশ্বব্যাপী, তাই মানবমুক্তির সংগ্রামও বিশ্বব্যাপী” । আমাদের বিশ্বাস- মুক্তিচেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শান্তির জন্য সৌহার্দ্য-এর কোনো জাতীয় সীমারেখা থাকে না ।

 

সাংগঠনিক রিপোর্টের মূল্যায়ন

 

এই রিপোর্ট ২৩শে আগস্ট পর্যন্ত কর্মকান্ডের উপর পেশ করা হলো ।

         

কারণ- পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ২৩শে সেপ্টেম্বর ও আঞ্চলিক সমাবেশ এবং সর্বশেষ আজকের সম্মেলন প্রসঙ্গে রিপোর্ট-এর সাথে যেহেতু অনেকে সংগঠন থেকে বাদ পড়ার প্রশ্ন রয়েছে, এবং একই সাথে দেশব্যাপী উঠে আসা প্রশ্ন রয়েছে, তাই সম্মেলনে ...পরিপূর্ণ রিপোর্ট পেশ করা সম্ভব নয় ।

 

তবুও এ-রিপোর্ট পেশ করা হলো, যাতে সম্মেলনে উপস্থিতি প্রতিনিধি বা অগ্রণীরা পরিকাঠামোতে (গঠনতন্ত্র) বর্ণিত ধারার রূপ বুঝতে পারেন এবং যারা বাদ পড়বেন, তাদের কর্মকান্ড প্রস্তুতি সমাবেশ ও সম্মেলন পর্যন্ত কী ছিলো, দায়িত্বের সাথে কতোটুকু সাযুজ্যপূর্ণ, তা বুঝতে পারেন । কারণ বহিষ্কৃতরা সাংগঠনিক মানদন্ডে, সর্বদাই নিকৃষ্ট বিধায়, তাদের বহিষ্কার বা বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে নিজেকে দায়ী না করে, সংগঠনকে দায়ী করে এবং বিভিন্ন বিভ্রান্তি ছড়ায় । এক্ষেত্রে নিজেকে উন্নত নির্ভুল বলা এবং সংগঠন, যা সমষ্টির চেতনা, তাকে হেয় করা যে নিকৃষ্ট ব্যক্তিবাদ কিংবা তাদের ভন্ডমিরই প্রকাশ, সেটার চুলচেরা জবাব দিতেই সভ্যদের হাতে এই খসড়া রিপোর্ট পেশ করা হলো ।

         

সম্মেলন শেষে, বিশ্লেষিত আকারে সম্পূর্ণ রিপোর্ট যথাসময়ে প্রতি ইউনিটে পেশ করা হবে । তবে অবশ্যই সেই সব ইউনিটে পাঠানো হবে । যেখান থেকে ইউনিট ফরম পূরণ আঞ্চলিক সমাবেশ ও সম্মেলন পর্যন্ত মূল্যায়ন রিপোর্ট কেন্দ্রে জমা পড়বে । কারণ- সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের সম্মেলন প্রসঙ্গে, বিভিন্ন প্রশ্ন সহ মতামত সম্বলিত গঠনমূলক রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক থাকছে । অতএব সংগঠন নির্দেশ দিচ্ছে, কেন্দ্রের কাছে দ্রুত রিপোর্ট পাঠাতে ।

 

সবাইকে পুনশ্চঃ ধন্যবাদ

 

             ধন্যবাদান্তে

          আবু লায়েস মুন্না

             পরিচালক

  বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট  

 

                                                                                             

(উল্লেখ্য যে, প্রথম ধাপের প্রথম রিপোর্ট-২০০০-এর সাথে সম্পৃক্ত বিধায়, প্রথম রিপোর্ট না পড়ে বা যথাযথভাবে না বুঝে, এই দ্বিতীয় রিপোর্ট সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বোধ আসবে না; যথাযথভাবে বুঝতে পারা যাবে না ।)

 

উপস্থিত সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দ,        

গ্রহণ করুন সামাজিক আন্দোলনের অহিংস মনস্কতা থেকে ঐকান্তিক শুভেচ্ছা এবং অবিরত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দৃঢ়বদ্ধতায় ব্যাপ্ত শুভ্র অভিনন্দন ।

 

অন্তরতম সাথীরা,         

বিদ্যমান সমাজগত বোধের বৈকূল্যে লক্ষ্যহীন, বিভ্রান্ত, বিশৃংখল যখন আমাদের সমকালীন প্রজন্ম; দেশপ্রেম বর্জিত তথাকথিত চলমান রাজনৈতিক ব্যবসাবৃত্তির করাল গ্রাসে যখন এদেশের যুব-তারুণ্য বিপর্যস্ত, ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তায় তারা যখন আত্মবিক্রয়ের পথে পা ফেলছে ভাড়াটে মিছিলে, নেশা হাতে, অস্ত্র হাতে, রক্তাক্ত লাশের ভবিতব্যে; আদর্শবর্জিত বৈশ্বিক দুঃসময়ের আগ্রাসী থাবায় ভোগী সংস্কৃতির পঙ্কে ছাত্র-যুবরা যখন আত্মসর্বস্বতায় আকণ্ঠ মগ্ন, বিবেকরহিত ঘৃণ্যতায় প্রতিবাদহীন নির্লিপ্ত, এমনই এক সর্বব্যাপী অবক্ষয়ে যখন ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে জাতীয় মূল্যবোধ, ন্যূনতম নৈতিকতা ও মানবিকতার অর্গল, ঠিক তখনি ২৪শে নভেম্বর ২০০০ খ্রিস্টাব্দে, কালের এক মহাসন্ধিক্ষণে দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল সমগ্র দেশকে সামনে রেখে অহিংস পথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেয়ার অগ্নিস্পর্শিত মহান ডাক এবং মহান সে লক্ষ্য পূরণে, বিশ্ববীক্ষার আলোকে বিশ্লেষিত স্বদেশ ইতিহাসের পারম্পর্যতায় ঘোষিত হয়েছিল, “সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থান”-এর সংগ্রামী দিশা ।

 

সুহৃদ সহযোদ্ধাগণ,         

ইতিহাসনিষ্ঠ এই সংগ্রামী দিশায়, সামাজিক ঐক্যতা গড়ে তোলার মহান শপথে, অহিংস’র বীজমন্ত্রে উচ্চারণ করেছিলাম- অনাদর্শিক অনৈক্যতা নয়, চাই দেশবোধের আদর্শিক চেতনা, আত্মসর্বস্বতার বদলে চাই- সমষ্টির চেতনায় একাত্মতা, প্রতিবাদহীন নির্লিপ্ততার তথাকথিত ব্যক্তি ভদ্রতা নয়, সংগ্রাম বিবর্জিত ব্যক্তি অবস্থানের ঘৃণ্য বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং চাই সাংগঠনিক পরিকাঠামোয় সংঘবদ্ধতা, চাই দুর্বার সামাজিক আন্দোলনের পথে অপ্রতিরোধ্য সংগঠক হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তোলা, দেশকে সামনে রেখে সর্বব্যাপক সাংস্কৃতিক সংগ্রামে নিজেদেরকে জ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত করা, আর এভাবেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের অগ্নিভ পথে চাই চেতনার বিনির্মাণ, সংহত ও সঙ্ঘবদ্ধতায় সামাজিক শক্তির উত্থান, যার ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশ ও উপস্থিতিতে উন্মোচিত করবে মানবমুক্তির দ্বার, সমূলে উচ্ছেদ করবে দেশমাতৃকার বুকে চলা রাষ্ট্রিক-সামাজিক দর্বৃত্তচারিতার উন্মত্ত দাপাদাপি, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের উৎস দুর্গের পতন শেষে, তার ধ্বংসস্তূপে উড়াবে দেশ সৃজনের বিজয় নিশান, সুশৃংখল নব চেতনাই যার বৈশিষ্ট্য, আত্মপ্রত্যয়ের স্পর্ধাই যার ঐতিহাসিক পরিচয়, যেখানে বাস্তবায়ন ঘটবে- “বাংলা হবে বাংলার” ।

         

উপসংহারে আমরা বলতে পারি- অনাগত গণজাগরণের মহাদ্রোহ যজ্ঞের সেই শপথের উত্তাপে আমরা মূল স্লোগান তুলেছিলাম, দেশজ চেতনার আদর্শিক বিনির্মাণ চাই, চেতনার সংহতকরণে পরিকাঠামোয় সঙ্ঘবদ্ধতা চাই, আর মহান এ-পথে জ্ঞানতত্ত্ব অর্জনের উত্তরণ । তাই সচেতন সমকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল, দল-মত নির্বিশেষে “সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা চাই” জাতীয় স্তরে দেশবোধে দীপ্ত তরুণদের সুস্থ আড্ডা (সাংগঠনিক ভাষায় ইউনিট গড়ে তোলা) গড়তে চাই ।

 

দেশবোধে আগুয়ান সহযাত্রীরা,

উক্ত স্লোগান আমরা তুলেছিলাম, কারণ আমরা ইতিহাসের দিশায়, অতীত বুঝেছিলাম- বাংলার পট পরিবর্তনের সূচনায় মহান দিশারী ছাত্র-যুবরাই । আর আমরা বর্তমানকেও দেখছি, তারুণ্যকেই বইতে হচ্ছে অবক্ষয়ের নিকৃষ্ট অপবাদ; ধ্বংসের মানদন্ডে আজ যেহেতু তারাই দন্ডিত, সেহেতু সেই দন্ডিত তারুণ্যের যন্ত্রণা থেকে আজকের স্বদেশক্রান্তিতে ঐতিহাসিক পট সৃজনের পতাকাও আমরাই বইবো, আর সেই সাথে বুঝি অতীত এবং বর্তমান আলোকে আগামীকে, জানি বার্ধক্যের আগামী বলতে বোঝায় মৃত্যুকেই, তাই দ্রোহের আগুনে আগামী হয় শুধু ছাত্র-যুব-তারুণ্যের, সৃষ্টি-সংগ্রামও নতুনেরর । তাই যুগে যুগে পরিবর্তনের ঝান্ডা যেমন আমরা বহন করেছি, আগামীর বিজয় নিশানও আমরাই উড়াবো । অস্তিত্ব ও যন্ত্রণার সদম্ভ তারুণ্য জানিয়েছে- জরা-ভয়-ক্ষয়ের জন্য নয়, জয়ের জন্যই আমরা, আগামী বিনির্মাণের ইতিহাসগত মহাযজ্ঞে সহযাত্রী শুধু আমরাই । জাতীয় জীবনে অন্ধকারময় ভবিতব্যকে রোখার স্ফুলিঙ্গ ধারার আলোকময় দাবানলও আমরাই । সংগঠিত দুর্বৃত্তচারিতার বিরুদ্ধে গণজাগরণের জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে, তাই আমরাই শপথ নিয়েছিলাম সে প্রত্যয়ী পথের পথিকৃৎ হতে, সংগ্রামের পথে শাণিত সুতীব্র ফলাকা হিসেবে গড়ে উঠতে ।

         

প্রত্যয়ী সে পথচলায় আমরা প্রায় এক বছর পেরিয়ে এসেছি । আগামীর কুহেলিকাময় পথের বিভ্রান্তি কাটিয়ে, প্রচ্ছন্নতার আলো ফেলতে বিগত এক বছরের হিসেব কষার সময় আজ সমাগত । সময়ের এই প্রান্তিক সূচনার সন্ধিতে, সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাচ্ছি আমাদের প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক, পথপ্রদর্শক বড়দাকে (এ আর শিকদার-আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্ রাজু শিকদার), যাঁর মহান দীক্ষা ও প্রদর্শিত পথই সাংগঠনিক উত্তরণের দিশা হয়ে প্রোজ্জ্বলিত আমাদের আদর্শিক অস্তিত্বে ।

         

সেই সাথে অভিনন্দন জানাই কন্ট্রোল বোর্ড প্রধান এবং এডিটোরিয়াল বোর্ড প্রধান-এর সম্মানিত প্রধানদ্বয়কে, যাঁদের কার্যকরী সমন্বয় ও সম্পাদনায় পরিচালনা বোর্ড কর্তৃক এই রিপোর্ট সহ বিগত বছরটিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালনায় ছিলেন আত্মবিশ্বাস, প্রেরণার রক্ষণাত্মক ব্যূহরূপে ।

         

এবং বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই সর্বোচ্চ অগ্রগামী অন্তর্বীজ ফ্রন্ট সভ্যসহ সেই সম্মানিত সহযোদ্ধাদের, যাঁরা অঞ্চল প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন সংগঠনের মাইলফলক হিসেবে এবং অবশ্যই অভিনন্দন জেলা ও শিক্ষাঙ্গন প্রধানদের, যাঁরা আদর্শিক আলোকবর্তিকা হাতে সাংগঠনিক ভিত্তি প্রস্তরসম আগুয়ান নেতৃত্বদানকারী প্রতিনিধিদের সমাহারে আজকের সম্মেলনকে সর্বোতভাবে সাফল্যমন্ডিত করে তুলেছেন ।

 

উপস্থিত প্রিয়তম অগ্রণী সাথী প্রতিনিধিবৃন্দ,

বিগত বছরটিতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের আদর্শিক পথচলায় দুর্লঙ্ঘ্যতা থাকলেও কখনো ক্লান্তি ও ক্লেদ আসেনি বরং এসেছে দৃঢ়তা, দারুণ সংকট থাকলেও থাকেনি দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যস্ততা, আঘাত পেলেও ভেঙে পড়িনি, হোঁচট খেলেও উঠে দাঁড়িয়েছি, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও হেঁটেছি, প্রতি পদে পদে অভিজ্ঞতায় আমরা নিজেদেরকে গড়েছি, কারণ আমরা বিশ্বাস করি- সংকট ও প্রতিকূলতার মাঝেই চেনা যায় সাংগঠনিক চরিত্রকে, যেমন ঝড় চিনিয়ে দেয় বৃক্ষের দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিকে, আর অভিজ্ঞতাই শুধু বাঁচাতে পারে ভবিষ্যৎ আঘাত থেকে; বাঁচার জন্য, জয়ের জন্য, এগিয়ে যাবার জন্যই সব প্রতিকূলতাগুলো হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতাময় শিক্ষার এক একটি আলোকবর্তিকা- যা আমাদের পথকে করেছে তমসামুক্ত, সে আলোকচ্ছাটাতেই দেখেছি, যাচাই করেছি, আমাদের আদর্শিক বিশ্বাস ও পথের সঠিকতাকে এবং নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও শপথের সত্যতাকে । বারে বারেই জেনেছি- দ্বিধা জন্ম দেয় দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যতাকে, ভয়ে বাড়ে ভীরুতা এবং শুধু সংগ্রামের পথেই জন্ম হয় সংগ্রামীর দৃঢ়তা, সাংগঠনিক ঐক্যতা-একাত্মতা, সংগ্রামই চেনায় প্রকৃত সংগ্রামীকে- তার দৃঢ়তাকে, যা অহিংসার পথে সাংগঠনিক দিশায় তাঁর সুস্থ ধারা বিনির্মাণের, পতন-স্খলন ও বিচ্যুতির বিরুদ্ধে টিকে থাকার মূল শর্ত ।

         

এই শর্ত সম্পন্নরাই মুক্তিজোটের অগ্রসেনা, যাঁরা এই সাংস্কৃতিক সংগ্রামে দৃঢ় আস্থা, নৈতিকতা ও সংঘবদ্ধতা গড়তে পারস্পরিক অভিজ্ঞতাসঞ্জাত মতবিনিময়, দ্বন্দ্ব, সমন্বয় ও ভুলমুক্ত হতে যৌথ চেতনার সংগ্রামে অবিরত সম্পৃক্ত (রিপোর্টের মাধ্যমে) থাকা এবং তাকে প্রাণসত্তার মতো আগলে রাখার প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়বদ্ধ । যৌথ চেতনার সেই লক্ষ্য, যা ব্যক্তি পর্যায় থেকে ইউনিট হয়ে আজ জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় সম্মেলন হিসেবে রূপান্তরিত ।

         

পূর্বতন বছরে প্রকাশিত সাংগঠনিক রিপোর্টের ভিত্তিতে উল্লিখিত যৌথ চেতনার সংজ্ঞার মূল লক্ষ্যের আলোকে পূর্বঘোষিত কর্মকান্ডের বাস্তবায়নে সংগঠনের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা, কার্যক্রম বিশ্লেষণ সহ আগামী কর্মের দিশা নির্ধারণে, এ-রিপোর্ট পেশ করা হচ্ছে ।

         

আন্তঃগাঠনিক পরিকাঠামো নীতি অনুসারে গত “প্রথম জাতীয় সম্মেলন-২০০০” গুণগত দিক থেকে সফল হলেও নির্দিষ্ট সংখ্যার নিরিখে পরিমাণগত দিক থেকে ব্যর্থ হয়েছে । সে কারণে গত সম্মেলন রিপোর্ট-এ ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংগঠন দারুণ প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় । মূলতঃ একটি সম্মেলনের ব্যর্থতা ও সফলতা পূর্ববর্তী বছরের সাংগঠনিক কর্মকান্ডেরই ব্যর্থতা ও সফলতার প্রতিচ্ছবি বহন করে এবং পরবর্তী বছরকে তা দারুণভাবে প্রভাবিত করে । তাই জাতীয় সম্মেলনকে বলা হয় সংগঠনের অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ । এ-জন্য সংগঠনের প্রতি যাঁদের বিন্দু মাত্রও দরদ থাকে, তাঁরা এ-সময় কিছুতেই, কোনো অবস্থাতেই নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না, বরং যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ।

         

অন্যদিকে- যারা সংগঠনবিরোধী, তারাও এই দুর্বল মুহূর্তকে সামনে রেখে বিভিন্ন ক্ষোভ, ওজর-আপত্তি ও ব্যস্ততা দেখিয়ে হয় নিষ্ক্রিয় থাকে, না হয় বিভ্রান্তি ও অনৈক্যতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন খুঁত ও ক্ষত উসকাতে ব্যতিব্যস্ত থাকে, যাকে মাছির চরিত্র বা ঘা বিস্তারী ক্ষুদ্র প্রাণী বলে আখ্যা করা হয় । খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সাংগঠনিক কর্মকান্ড ও প্রসারে বেশির ভাগ সময় এরা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করেছে । অথচ খেলতে খেলতে যেমন খেলোয়ার, তেমনি সাংগঠনিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সাংগঠনিক চেতনা-চরিত্র অর্জন তথা সংগঠনকে বোঝা যায় । বিশেষতঃ গঠন কাঠামো ও তত্ত্বে এ-সংগঠন একেবারেই ভিন্ন ও স্বতন্ত্র ধরণের- বিধায় তারা যখন প্রচলিত অন্যান্য রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে মেলাতে গিয়ে কিংবা চলমান সামাজিক আবর্ত থেকে প্রাপ্ত নিজস্ব ধ্যান-ধারণাকৃত চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নিজের মতো করে মেলাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, তক্ষুণি ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে উঠে বিশৃংখলা ঘটানোর সুযোগ খোঁজে । সংগঠন সম্পর্কে তাদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলে তারা চুপসে যায় কিন্তু নিজের মত ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একচুলও সরে দাঁড়ায় না, অথচ তারা একবারও ভাবে না, সংগঠনে সে যেমন নিজের মত থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে না; তেমনি অন্যরা যদি তার মতো নিজ নিজ মত বা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না সরে দাঁড়ায়, তবে কি সংগঠন হবে? একই সময় একই ক্ষেত্রে দশজনের দশ দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি সংগঠন হয়, তবে তো মোট দশজনের দশটি সংগঠন হবে, আর একা একা কি সংগঠন হয়? সংগঠন মানে দশজনের একমতে আসা, দৃষ্টিভঙ্গি একাত্ম হওয়া বা সংগঠিত হওয়া । সে দৃষ্টিভঙ্গি কোনো ব্যক্তির নয় বরং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে, নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে । নির্দিষ্ট পথ-মত ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ঐক্যবদ্ধ বা সংগঠিত হওয়া । এক্ষেত্রে সমাজবদলের লক্ষ্যে, সমষ্টির স্বার্থে সামাজিক বিকাশ, প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস বিশ্লেষণের দ্বারা যাচাইকৃত নির্দিষ্ট মত ও দৃষ্টিভঙ্গিই মুক্তিজোটের দৃষ্টিভঙ্গি ।

         

অর্থাৎ সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসনির্ভর, ইতিহাসনির্দিষ্ট, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো ব্যক্তির মত বা ব্যক্তি দৃষ্টিভঙ্গি নয়; কারণ সমাজ সমষ্টিগত ব্যাপার, তার বদলও সমষ্টির উপর নির্ভরশীল, ব্যক্তিমত ও ইচ্ছার উপর তার বদল বা পরিবর্তন নির্ভর করে না । সমাজগতভাবে এখানে ধনী-দরিদ্র সহ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ইত্যাদি বহু মত বহু চেতনায় আমরা বিভক্ত; সেক্ষেত্রে ঐকমত্যের প্রশ্নে, সমাজগত অবস্থান থেকে প্রাপ্ত বিভেদকৃত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা চেতনা ভেঙে সামষ্টিক তথা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একাত্ম হওয়াই, ঐক্যবদ্ধ বা সংগঠিত হওয়াই, ঐক্যবদ্ধ বা সংগঠিত হওয়ার একমাত্র পথ । সংগঠন গড়ে তোলার সংগ্রামের এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই সামষ্টিক চেতনা বা সাংগঠনিক চেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গি বলা হয় । ব্যক্তি চেতনার বিরুদ্ধে যার অবস্থান । সংগঠন গড়ে তোলার এ-পর্যায়ের মূল সংগ্রাম বলতে তাই বোঝায়- ব্যক্তি চেতনা ভেঙে সামষ্টিক চেতনায় উন্নীত হওয়া বা আত্মসর্বস্বতা থেকে সাংগঠনিক চেতনায় লীন হওয়ার সংগ্রাম । ব্যক্তি-ইচ্ছা বা ব্যক্তি চেতনার সাথে প্রতিনিয়ত সাংগঠনিক দ্বন্দ্বে, সাংগঠনিক চেতনাতেই দৃঢ়বদ্ধ ও রূপান্তরিত হওয়াকে বলে আদর্শিক সংগ্রামে সাংগঠনিক হওয়া । পরিকাঠামোবদ্ধতাই যে উত্তরণের নির্ধারণী ভূমিকা পালন করে ।

         

‘আমিত্ব’-এর অনৈক্যতা ও পঙ্গুত্ব ভেঙে ‘আমাদেরত্ব’-এ বিশ্বাস স্থাপন করা তথা ব্যক্তি চেতনা, আত্মসর্বস্বতা ত্যাগ করে, সামষ্টিক চেতনায় বা সাংগঠনিক চেতনায় একাত্ম হওয়ার আদর্শিক সংগ্রামের শপথ নিলেও সাংগঠনিক বিশ্বাসে অনাস্থা, অনৈক্যতা ও বিদ্বেষের ন্যায় ক্ষত বা ঘা বিস্তারী মাছির চরিত্র সম্পন্নরা আমিত্ব বা ব্যক্তিবাদের ঘৃণ্য দৃষ্টিতেই আটকে থাকে । ফলে, এরা এমন-কি সম্মিলিত মত বা যৌথ চেতনা, যা মূলতঃ আদর্শিক বা সাংগঠনিক চেতনার প্রতিমূর্তি হিসেবে “অথোরিটি”কেও ব্যক্তি মনে করে, কারণ- যে সাংগঠনিক চেতনায় সংগঠন করে না, তার সাথে সাংগঠনিক “অথোরিটি”রও কোনো সম্পর্ক থাকে না । চেতনাই যে সম্পর্কের ভিত, সেই ভিত না থাকলে অথোরিটির সাথে সম্পর্ক হয়ে ওঠে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, ফলে ব্যক্তিবোধ বা আত্মবোধের অহমজাত সংঘাত সেখানে থাকবেই । এরা বিন্দুমাত্রও বোঝে না “ঐকমত্য বা সংঘবদ্ধতা” মানে সেখানে একজন প্রতিনিধি বা অথোরিটি আছেন, যাঁর মাধ্যমে সবার মত প্রকাশিত হচ্ছে- সে মত বা দৃষ্টিভঙ্গি ঐ প্রতিনিধির নিজের না বরং সবার । তাঁকে সম্মান জানানো মানে নিজেদের মতের “ঐক্যতাকে” সম্মান জানানো ।

         

চিন্তা-চেতনা বা আদর্শ সর্বদাই বিমূর্ত । ঠিক যেমন একজন মানুষ কাউকে খুন করতে বদ্ধপরিকর হলেও যতোক্ষণ পর্যন্ত না সে খুন করছে, অর্থাৎ বিমূর্ত থেকে তার চেতনাকে মূর্ত রূপ দিচ্ছে, ততোক্ষণ তাকে খুনী বলা যায় না । ঠিক তেমনি, কোনো চেতনা ও আদর্শকে ঘিরে যে সংগঠিত বা ঐক্যবদ্ধ রূপ, তাকে স্বীকার করা হয় না; যতোক্ষণ সেই সম্মিলিত মত একজনের মধ্য দিয়ে বিশেষীকৃত রূপ হিসেবে মূর্ত বা বাস্তব রূপ পাচ্ছে । মসজিদে যখনই সম্মিলিতভাবে বা জামায়াতে নামাজ পড়ছে মানেই- সেখানে একজন ইমাম বা অথোরিটি আছেন । তাঁকে অস্বীকার বা অমান্য করা মানেই ঐক্যতাকে অস্বীকার করা এবং তাঁর নির্দেশ মান্য করা মানেই কোনো ব্যক্তির নয় বরং ঐকমত্যের নির্দেশ অনুধাবন করা । তা না করে উল্টো বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী নিজের ব্যক্তি-ইচ্ছার ঘৃণ্যতাকেই প্রকাশ করা । যে কারণে ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে- ইমামের আগে সেজদায় গেলে পরকালে হাশরের মাঠে তাকে গাধার চেহারায় প্রকাশ করা হবে । এভাবেই সম্মিলিত মতের বা সংগঠিত রূপের বড় মানদন্ড ও প্রমাণ “অথোরিটি” । প্রতিটি আদর্শের ক্ষেত্রে এটা মৌলিক ।

         

ইসলাম ধর্মের অথোরিটি, যেমন- হযরত মুহাম্মদ (সঃ), তাঁকে অস্বীকার করা বা অসম্মান করা মানে আর কোনোভাবেই ইসলামে বিশ্বাসী বা ইসলাম ধর্মের মিত্র নয় । আদর্শের ভিতর এবং বাহির দু’ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য । বরং ভিতর থেকে এটা হলে সেটা ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতা রূপে প্রতিফলিত হয় । যে কারণে ইসলামে মুনাফেকী বা বিশ্বাসঘাতকতাকে জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য করা হয় । এজন্য উপদলীয় কোন্দল থেকে শুরু করে সমস্ত রকম বিশৃংখলা এখান থেকেই সৃষ্টি হয় । অথোরিটি প্রসঙ্গে উদাহরণে ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, ইসলামের আদর্শ তথা সামন্ততান্ত্রিক বিশ্বে এর এত দ্রুত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রসারের কারণগুলির মধ্যে অথোরিটির এই সুদৃঢ় ভিত্তি অন্যতম । পরবর্তীতে ইসলামেও একাধিক মতের সৃষ্টি হয়েছিল মূলতঃ নবী করিম (সঃ)-এর আদর্শিক উত্তর সাধকদের মধ্যে অথোরিটি সম্পর্কিত (খলিফা) যথার্থ উপলব্ধি ও দৃঢ় আস্থা দুর্বল হওয়ার ফলশ্রুতিতে, শত্রুরা তাই অথোরিটিকে ঘিরেই বিভ্রান্তি বা শত্রুতা শুরু করে । শুধু ইসলাম নয়, বিশ্বে স্বীকৃত মানবতাবাদের পবিত্র ধর্ম বা ধর্মীয় মতাদর্শ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবক্তা বা অথোরিটি গৌতম বুদ্ধকেও সে ধর্মের শত্রুরা তৎকালে এক বাঈজীকে দিয়ে তাঁর চরিত্রে এক মিথ্যা কলংক লেপনে কিছুদিনের জন্য ধর্ম প্রচারকে বিপর্যস্ত করেছিল । খ্রিস্টান ধর্মে খ্রিস্টান মতাদর্শে যীশুর জন্ম নিয়ে তাঁর পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করতে শত্রুরা বারে বারেই প্রয়াসী হয়েছে । হিন্দু ধর্মের পবিত্র আধ্যাত্মকে বিশ্বে স্বীকৃতিতে নিয়ে গিয়েছিলেন যিনি, উপমহাদেশের সেই মহৎপ্রাণ স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক দর্শন বা মতাদর্শিক উপলব্ধির অথোরিটি ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে শত্রুরা তাঁর আধ্যাত্ম অবস্থা তথা ‘কল্পতরু’ অবস্থাকে হিস্টিরিয়া রোগীর অবস্থাতুল্য বলে হাস্যকর করে তুলেছিল ।

         

সামন্ততান্ত্রিক পরবর্তীতে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রগামী ও বিজ্ঞাননিষ্ঠ সংঘবদ্ধতার দাবি নিয়ে যে মহান মতাদর্শটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং দেশে দেশে বিপ্লব সংগঠিত করেছিল, তা কমিউনিস্ট মতাদর্শ । বৈজ্ঞানিক এই মতাদর্শটিও প্রযুক্তি বিপ্লবের সাথে সাথে নিজের তাত্ত্বিক বিকাশকে এগিয়ে না নেয়ার ফলশ্রুতিতে যে বিপর্যয় সূচিত হয়েছিল, তা প্রথম আঘাত হানে বা প্রকাশ পায় ‘অথোরিটি’-তে । কমিউনিজমের মূল অথোরিটি কার্ল মার্কস্ এবং কার্ল মার্কস্-এর পথ ধরে পরবর্তীতে মহামতি লেনিন, তারপর যোসেফ স্ট্যালিন । পূর্বতনদের সাথে এদের নিজেদের সিদ্ধান্ত না মিললেও এঁরা পূর্ববর্তীকে বিকশিত করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন । পরবর্তীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছেন, প্রাণসত্তার মতো মতাদর্শিক ঐক্যতার প্রশ্নে মতাদর্শিক অথোরিটিকে আগলে রেখেছিলেন বা রক্ষা করেছিলেন । সমস্ত প্রকার বিতর্ক থেকে পূর্বতনদেরকে বাঁচিয়েছিলেন । কিন্তু পরবর্তীতে ‘ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ’ নিজেদের তাত্ত্বিক শূন্যতা পূরণ তথা নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে নির্লজ্জভাবে তাঁদের পূর্ববর্তী অথোরিটি স্ট্যালিনকেই আঘাত করে বসেন । ফলে দেশে দেশে বিপ্লব মুখ থুবড়ে পড়ে । ইতিহাসখ্যাত “মহাবিতর্ক”-এর উৎপত্তিতে অথোরিটিকে ঘিরে বহু মত, বহু দলে এর মতাদর্শিক ঐক্যতা ভেঙে পড়ে । এমন-কি, এ-প্রসঙ্গে বলা যায় চীন এবং এই উপমহাদেশে একই সময়ে কমিউনিজম মতাদর্শ ভিত্তিক “কমিউনিস্ট পার্টি” গড়ে উঠলেও চীনে বিপ্লব সফল হয়, কিন্তু এই উপমহাদেশে তা হয়নি । এর কারণ হিসেবে বলা যায়, এখানে কখনো সত্যিকারের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠেনি । তার বড় প্রমাণ, এখানে মাও সেতুং-এর মতো কোনো অথোরিটি গড়ে ওঠেনি ।

         

এভাবেই মতাদর্শিক সঠিক ঐক্যতা বা সাংগঠনিক মূর্ত রূপ কিংবা ‘যৌথ চেতনা’র সার্থক প্রতিমূর্তি তথা দৃঢ় সংগঠন গড়ে উঠছে কিনা এর বড় প্রমাণ, সেখানে যথাযথভাবে অথোরিটি গড়ে ওঠার উপর নির্ভরশীল । অর্থাৎ ‘অথোরিটি’ই সেই অর্থে সংগঠনের প্রামাণিক মানদন্ড ।

         

কিন্তু ধর্মীয় মতাদর্শিক অথোরিটি, যা সারগতভাবে ঈশ্বরত্বের উপর দাঁড়ানো । আর ঈশ্বরীয় মানেই প্রশ্নহীন আনুগত্য বা আত্মিক বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ আধ্যাত্ম । প্রশ্ন, দ্বিধা ও যুক্তি বিজ্ঞানের জননী হলেও দ্বিধা আর যুক্তিতে ঈশ্বরীয় বিশ্বাস জীবন্ত হয়ে ওঠে না । কারণ দেহ সংশ্লিষ্ট চেতনাই বিজ্ঞানের সীমানা এবং যুক্তি, প্রশ্ন, দ্বিধা দেহগত বা ইন্দ্রিয়গত, সেই অর্থে বিজ্ঞান দেহগত প্রমাণসম্পৃক্ত আর ঈশ্বরীয় বিশ্বাস দেহাতিরিক্ত অসীমের বিশ্বাসেই স্থিত, এখানেই ব্যক্তির আত্মিক মুক্তি ।

 

[মুক্তিজোট ব্যক্তির আত্মিক মুক্তির পক্ষে দৃঢ়ভাবে অর্থাৎ দেহগত সীমাবদ্ধতায় সৃষ্ট আত্মিক দৈন্যতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মানবিক শান্তি, স্নিগ্ধতা তথা আস্তিকতাকেই গ্রহণ করে । যে কারণে বড়দা বারে বারেই বলেন, ‘শারীরিক সুস্থতার জন্য ব্যায়াম আর আত্মিক স্থিরতার জন্য ধ্যান’ । আদর্শবর্জিত অস্থির দুঃসময়ে বস্তুগত জ্ঞানের অসম উল্লম্ফনে মানুষের মননজগতে যে চাপ, সে যন্ত্রণা থেকে মুক্তিতে আত্মিক বিশ্বাস (ঈশ্বর আছে কি নেই, সে প্রশ্ন অবান্তর) যা মননের ভারসাম্য তথা মনুষ্যত্বের শান্তিতে যথার্থ মুক্তিসংগ্রামে তার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য । সমাজজীবনে বস্তুগত মুক্তি শুধু নয়, জীবন ও মননগত সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেকে আসা যোদ্ধা হিসেবে আমরা, জীবনের জন্যই, শান্তির জন্যই আত্মস্পর্শিত সত্যের সীমান্তরক্ষী, তাই মুক্তিজোটে নাস্তিক্যের কোনো জায়গা নেই ।]

         

তবু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনের প্রশ্নে প্রধানতঃ শারীরবৃত্তীয় (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলো শারীরবৃত্তীয়) প্রয়োজনীক সৃষ্ট সামাজিক সংগ্রামে বিজ্ঞান তথা বস্তুগত (দেহগত দিক নির্ভর) মুক্তি ও উন্নয়নে বস্তুগত দিকই বা বিজ্ঞানই প্রধান দিক ও দিশা । তাই সামাজিক মুক্তিতে, সামাজিক শক্তির উত্থানে, বিজ্ঞানই একমাত্র মানদন্ড হিসেবে গৃহীত । সেই মানদন্ডে বস্তু থেকেই চেতনা এবং প্রকৃতিতে এক বস্তুর মতো অন্য বস্তু যেমন হুবহু আকৃতিতে এক রকম হয় না, সেহেতু বস্তুর এই ফেনোমেননগত পার্থক্যের কারণে চেতনার প্রকাশও হুবহু এক রকম হয় না । ফলে সম্মিলিত চেতনার একই প্রকাশ বা চেতনার অখন্ডতার প্রতিমূর্তি হিসেবে সমাজবিজ্ঞানে অথোরিটি’র জন্ম । বিজ্ঞানের ভিতের উপর দাঁড়ানো চেতনা বিনির্মাণের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে তাই অথোরিটি প্রশ্নহীন আনুগত্য বা ধর্মীয় আদর্শের অথোরিটির মতো নয় বরং অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন, যুক্তি তথা দ্বান্দ্বিক (এখানে উল্লেখ থাকে যে, দ্বান্দ্বিক ক্রিয়া বলতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার দ্বন্দ্বাত্মক পদ্ধতি বা দ্বান্দ্বিক সংগঠন নীতির কথা বলা হচ্ছে না । বরং বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণ সংগঠন নীতি অনুসারে মতবিনিময়ের মাধ্যমে সমন্বয়ের পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে । এবং এক অর্থে Oneness in approach, singleness of purpose... তথা একই লক্ষ্যে একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করার প্রশ্নে ঐকমত্যের একই সিদ্ধান্ত মূর্তায়িত করার প্রশ্নেই বস্তুর ফেনোমেননগত পার্থক্যকে এককের মাধ্যমে প্রকাশের শর্তই ‘অথোরিটি’, সেক্ষেত্রে মতবিনিময় থাকতে পারে, তর্ক থাকতে পারে না । সমন্বয়ের পথ ধরেই একক যেখানে মূর্তায়িত অথোরিটি মারফত, সেখানে দ্বন্দ্বাত্মক পদ্ধতি থাকতে পারে না । কারণ- তাতে বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণের চেইন অব কমান্ড গড়ে ওঠার পরিবর্তে ভেঙে পড়তে বাধ্য । গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার সংগঠন নীতি যেমন দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করে, তেমনি বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণ সংগঠন নীতি অনুসরণ করে সমন্বয় পদ্ধতি । তবে এ-সমন্বয় রাষ্ট্রতত্ত্বের ইতিহাসে উল্লিখিত সমন্বয়বাদ থেকে একেবারেই ভিন্ন) ক্রিয়াতেই সচেতনভাবে তা গড়ে উঠবে । এই গড়ে ওঠাটাই ‘চেইন অব কমান্ড’ গড়ে ওঠা । এক্ষেত্রে সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গি বা সম্মিলিত মতের সাথে যে যতো একাত্ম হতে পারবে অর্থাৎ ব্যক্তি চেতনা ভেঙে সাংগঠনিক চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকেই নিজস্ব চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যিনি রূপান্তরিত করতে পারবেন (যে-ই স্তরে সংগঠন ও জীবন যখন একাকার), তথা যাঁর মধ্যে সর্বাধিক সম্মিলিত মতের সর্বোচ্চ সমন্বয়ের প্রতিফলন ঘটবে, তিনিই অথোরিটি হিসেবে উঠে আসবেন ।

         

এ-প্রক্রিয়ায় সাংগঠনিক ইউনিটে যখন কারও মধ্যে এই সম্মিলিত মতের সর্বাধিক সমন্বয় তথা সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে, তখন তিনিই ইউনিট প্রধান- সাংগঠনিক চেতনায় তিনি তখন ব্যক্তি নন, ঐ ইউনিটের জন্য তিনিই সংগঠন । এজন্য রিপোর্টভিত্তিক সংগঠনের পক্ষ থেকে যখন কাউকে কোনো ইউনিট/এলাকা বা অঞ্চল প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন সাথীদের নির্দেশ (আদেশপত্র) দেয়া থাকে “সাংগঠনিক চেতনায় তিনি ব্যক্তি নন- ‘সংগঠন’, তাই তাঁকে যথাযোগ্য সাংগঠনিক সম্মান প্রদর্শন করুন” । এইভাবে বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণে সাংগঠনিক নীতি বিধায় সকল কর্মকান্ডের উৎস বা ভরকেন্দ্র যখন ইউনিট, তখন অথোরিটি-এর বাস্তবায়ন ইউনিট থেকে উৎসাহিত হয়ে জেলা/অঞ্চল এবং জাতীয় স্তরে “সংগঠন প্রধান”-এর রূপ পায় । যৌথ চেতনার সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে ‘সংগঠন প্রধান’ জাতীয় অথোরিটি হিসেবে যখন সর্বোচ্চ সমাবেশ হিসেবে (অভ্যন্তরীণ) জাতীয় সম্মেলন কক্ষে সর্বশেষ বক্তব্য দিতে ওঠেন, তখন তাঁকে সাংগঠনিক সম্মান প্রদর্শন করতে সাংগঠনিক নীতি অনুসারে সবাই দৃঢ়ভাবে উঠে দাঁড়ান । এই সম্মান প্রদর্শন কোনো অবস্থাতেই কোনো ব্যক্তির প্রতি নয় বরং সাংগঠনিক চেতনার প্রতি । অর্থাৎ আমিত্ব বা ব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধেই সম্মিলিত মত বা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ সাংগঠনিক মতের রূপকেই সাংগঠনিক সম্মান প্রদর্শন করা হয় । অনেক সময় সাংগঠনিক চেতনা বর্জিত ব্যক্তিবোধ বা অহংবোধে আটকে থাকাদের চোখে একে ব্যক্তিবাদ মনে হয় । যা তারই নিজের ব্যক্তিবোধের ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচায়ক ।

         

এখন বিশেষতঃ সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একাকার হওয়ার এই আন্দোলনে, ব্যক্তি থেকে সমষ্টির চেতনায় লীন হওয়ার যে পথ বা বর্তমানে চেতনা বিনির্মাণে যে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম চলছে, সেখানে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই নেই বলে সাথীদের সাংগঠনিক দৃঢ়তা যাচাই তথা সংগঠনের ভিতর শত্রু-মিত্র যাচাইয়ের বর্তমান প্রধান মানদন্ড অথোরিটি । ইউনিট থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত অর্থাৎ ইউনিট প্রধান থেকে সংগঠন প্রধান পর্যন্ত অথোরিটি গড়ে ওঠার এই প্রক্রিয়াকেই আমাদের সাংগঠনিক ভাষায় ‘চেইন অব কমান্ড’ বলা হয় । যতোক্ষণ পর্যন্ত না যৌথ চেতনার উপর তা যথাযথভাবে গড়ে ওঠে, ততোক্ষণ পর্যন্ত যথার্থ ‘চেইন অব কমান্ড’ গড়ে ওঠে না এবং যথারীতি ‘চেইন অব কমান্ডে’র ভিত্তিতে সুদৃঢ় সচেতন সংগঠনও গড়ে উঠতে পারে না । সাংগঠনিক যতো বিশৃংখলা বা অনৈক্যতা এখান থেকেই সৃষ্টি হয় । তাই অথোরিটি ঐক্যতা ও অনৈক্যতা, শৃংখলা ও বিশৃংখলা, শত্রু-মিত্র ইত্যাদির একমাত্র মানদন্ড । যে অথোরিটিকে অস্বীকার করে সে ‘চেইন অব কমান্ড’কে অস্বীকার করে অর্থাৎ সে সংগঠনবিরোধী ।

         

পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে, ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিবোধ থাকবেই এবং সেই অর্থে ইউনিট প্রধান থেকে সংগঠন প্রধান পর্যন্ত ব্যক্তিবোধ দ্বারা চালিত হয়ে ব্যক্তিবাদের খপ্পরে পড়ার প্রবণতা থাকবেই, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তাঁদের ভুলের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, প্রয়োজনে অথোরিটির দায়িত্বে যিনি আছেন, তাঁকে শোধরানো না গেলে তাঁকে অপসারণ করতে হবে । তবুও ব্যক্তিবাদের ঘৃণ্যতা থেকে অথোরিটি বা যৌথ চেতনাকে প্রাণসত্তার মতো আগলে রাখতে বা রক্ষা করতে হবে । কিন্তু কোনো অবস্থাতেই যতোক্ষণ পর্যন্ত তিনি অথোরিটির দায়িত্বে আছেন, ততোক্ষণ পর্যন্ত তাঁকে অস্বীকার বা অসম্মান করা মানে সংগঠনকেই অস্বীকার বা অসম্মান করা, ঠিক যেমন তাঁর ভুলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করা মানে নিজের শরীরেই গ্যাংগ্রিন জন্ম দেওয়া বা প্রশ্রয় দেয়া ।

         

তাই অথোরিটিকে ব্যক্তি মনে করা, অথোরিটির প্রতি সাংগঠনিক সম্মান প্রদর্শনকে ব্যক্তির প্রতি সম্মান মনে করা নিজেরই সাংগঠনিক চেতনাবর্জিত ব্যক্তিগত অহংবোধ বা ইগোবোধে আটকে থাকারণ ঘৃণ্য পরিচায়ক, যার বিরুদ্ধেই মূলতঃ সংগঠনের অবস্থান ।

         

ব্যক্তি চেতনার দ্বারা চালিতরাই মূলতঃ মাছির চরিত্র ধারণ করে । ক্ষত উসকে উপদলীয় কর্মকান্ড চালায় এবং যথারীতি তা শুরু করে অথোরিটির সম্পর্কে বিভ্রান্তির সৃষ্টি দিয়ে । জাতীয় সম্মেলনকে ঘিরে যা চরম রূপ ধারণ করে । অথোরিটির মানদন্ডে যাচাই হয়ে এরা অবশেষে জাতীয় সম্মেলনের দিনে তাদের ঘৃণ্য পরিচয় বহন করে কিংবা তা প্রকাশ হয়ে যায় ।

         

সেই সাথে যাঁরা সাংগঠনিক দৃঢ়তাসম্পন্ন, তাঁরা জানে- তাঁর সংগঠন সদ্যজাত নবজাতকের ন্যায় । যার সারা শরীর মূলতঃ স্পর্শকাতর । সেই অর্থে সর্বত্রই ঘা বা ক্ষত । সেজন্য তাঁরা অনেক বেশি সতর্কতায় সংগঠন নামক নবজাতককে রক্ষা করতে একাট্টা হয়ে পড়ে এবং সেই শিশুকে পরিপূর্ণতা দানে বা আগামীর প্রশ্নে ছুটতে থাকে । ফলে এঁদের কর্মকান্ড ও যোগ্যতার নিরিখে তাঁরা অগ্রগামী সহযোদ্ধা হিসেবে নেতৃত্বে উঠে আসে- এই জাতীয় সম্মেলনেই ।

         

আর এ-কারণেই জাতীয় সম্মেলন এক চ্যালেঞ্জ, যেমন অস্তিত্বের তেমনি অগ্রযাত্রার । যে জন্য জাতীয় সম্মেলন সন্ধি ও সংকটের, যে সংকটেই যাচাই হয় শত্রু-মিত্রের । সাংগঠনিক এই সংকটেই আবিষ্কৃত হয় সাংগঠনিক সহযোদ্ধাদের ও দায়িত্ব জ্ঞানহীন নেতৃত্বলোভী সাংগঠনিক দুশমনদের ।

         

পূর্ব বছরের সাংগঠনিক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, যাঁরা দায়িত্ব পালন করবে না- তাঁদের বহিষ্কার হিসেবে ধরা হবে অর্থাৎ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়াও এই জাতীয় সম্মেলনে নির্দিষ্ট হয়ে থাকে ।

 

আন্তঃগাঠনিক নীতি অনুসারে- গত সম্মেলন ব্যর্থ হয়েছিল, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে । যেহেতু জাতীয় সম্মেলন পূর্ববর্তী বছরের প্রতিচ্ছবি এবং পরবর্তী বছরের জন্য সাফল্যের ভিত্তি, সেহেতু সম্মেলন ব্যর্থতার অনেকখানি গত সম্মেলনের রিপোর্টে ঘোষিত কর্মনীতির বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করেছে । ফলে গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়ায় গত বছরের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবার যাঁদের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে না, তাঁরা বহিষ্কার হিসেবে গণ্য হবে

         

গত ‘জাতীয় সম্মেলন-২০০০’-এ অবশ্যপালনীয় কর্মনীতি হিসেবে ঘোষিত হলেও যা পালন করা হয়নি, তার মধ্যে অন্যতম হলোঃ

 

১)  সাংগঠনিক ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশ,

 

২)  সংগঠন রেজিস্ট্রেশন এবং সংগঠন রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার ফলশ্রুতিতে সাংগঠনিক ঘোষণাপত্র, দলিল ও গঠনতন্ত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশ,

 

৩)  লণ্ঠনের প্রচ্ছদচিত্র,

 

৪)  সাংগঠনিক চাঁদা নিয়মিতকরণ ও তা গ্রহণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ,

 

৫)  সম্মেলন পরবর্তীতে সকল ইউনিট থেকে সম্মেলনের উপর রিপোর্ট তৈরি করে অস্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে জাতীয় সমন্বয়কারীর কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে চরম গুরুত্বহীনতা । রিপোর্টই সংগঠনের দিশা বিধায় সম্মেলন সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়ার কথা ছিল, রিপোর্ট না করার দরুণ এই বর্তমান সম্মেলনকেও অনেকটা দিশাহীন অন্ধকারেই পথ হাঁটতে হয়েছে অথচ রিপোর্টকেই সংগঠনের অস্তিত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, যে রিপোর্ট করে না সে মুক্তিজোট-এর হতে পারে না ।

 

উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডের ব্যর্থতা সংগঠনকে এক বছর পিছিয়ে দিয়েছে অর্থাৎ যেখান থেকে যাত্রা মূলতঃ সেখান থেকে খুব বেশি দূরে এগিয়ে যাওয়া যায়নি ।

 

এই ব্যর্থতার জন্য যতোখানি না গত বছরের সম্মেলন দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী হিসেবে মূলতঃ দু’টি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে । তা হলোঃ

 

প্রথমতঃ কেন্দ্রীয় কমিটি (সি.সি.) গড়ে না ওঠা;

দ্বিতীয়তঃ আর্থিক সংকট ।

 

কেন্দ্রীয় কমিটিঃ ইউনিট ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার ব্যাপারে সাংগঠনিক প্রতিনিধিদের বার বার নির্দেশ সত্ত্বেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি । ফলে কেন্দ্রীয় কমিটিও গড়ে ওঠেনি । যে কারণে কোনো সাংগঠনিক কর্মকান্ডই যথাযথভাবে করা যায়নি ।

 

আর্থিক সংকটঃ ইউনিট পূরণ তথা কেন্দ্রীয় কমিটি না থাকাতে আর্থিক ব্যাপারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি ।

         

উপরোক্ত দু’টি সমস্যা অর্থাৎ আর্থিক সংকট ও কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ার লক্ষ্যে এবং আর্থিক সংকট নিরসনকল্পে দু’টি স্লোগানকেই গ্রহণ করা হয় ।

         

ইউনিট ফরম পূরণ করুন

সভ্যচাঁদা নিয়মিত করুন (পূর্ব বছরের জাতীয় সম্মেলনে অনুমোদিত দশ টাকা হারে সভ্যচাঁদা)

         

এমতাবস্থায়, উক্ত স্লোগান বাস্তবায়নে সংগঠনের দায়িত্ব নতুনভাবে বণ্টন করা হয় । যাঁরা সারা দেশব্যাপী প্রস্তুতি গ্রহণপূর্বক সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুসারে ‘দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০০১’কে সামনে রেখে ২১শে সেপ্টেম্বর-২০০১ জাতীয় প্রস্তুতি সমাবেশের তারিখ নির্ধারণ করেন এবং উক্ত প্রস্তুতি সমাবেশ তাঁরা সর্বান্তকরণে সফল করেন ।

 

প্রস্তুতি সমাবেশ উপস্থিত জাতীয় স্তরের অগ্রণী প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে ৯ই নভেম্বর ‘দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০০১’ এবং সে লক্ষ্যে অঞ্চল ভাগ এবং আঞ্চলিক সমাবেশের তারিখ নির্ধারণ করেন । কিন্তু অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে নিম্নোক্ত তারিখে আঞ্চলিক সমাবেশগুলি সম্পন্ন হয়েছে ।

 

 

অঞ্চলের নাম                                                  তারিখ

 

নরসিংদী অঞ্চল                                          ০৫-১০-২০০১ খ্রিঃ

(নির্বাচনোত্তর প্রতিকূলতার কারণে আংশিক সফল)

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            মনোহরদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠ ।    

 

ময়মনসিংহ অঞ্চল                                           ০৬-১০-২০০১ খ্রিঃ

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      শেরপুর, জামালপুর, টাংগাইল, ময়মনসিংহ ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা স্টেডিয়াম ।     

 

রাজশাহী অঞ্চল                                             ১৬-১০-২০০১ খ্রিঃ

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      পাবনা, চাপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, রাজশাহী ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড অডিটোরিয়াম ।

 

বগুড়া অঞ্চল                                                  -১০-২০০১ খ্রিঃ

(অঞ্চল প্রধানের অনুপস্থিতিতে আংশিক সফল ।)

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ।

 

অনুবর্তী উপঅঞ্চলঃ                       রংপুর ।

 

উপঅঞ্চলভূক্ত জেলাসমূহঃ                  লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ।

 

সম্মেলন স্থানঃ            

 

পঞ্চগড় অঞ্চল                                               ১৯-১০-২০০১ খ্রিঃ

(আংশিক সফল- দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের অভাবে)

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            উপজেলা ডাকবাংলো, বোদা উপজেলা ।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল                                         ২১ -১০-২০০১ খ্রিঃ

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ।

  

অনুবর্তী উপঅঞ্চলঃ                       কুমিল্লা ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            নাসিরনগর উপজেলা টাউন হল ।

 

চট্টগ্রাম অঞ্চল                                  

(ব্যর্থঃ দায়িত্বপ্রাপ্তদের  অনুপস্থিতি ও দায়িত্বহীনতার  জন্য ।)

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      পার্বত্য রাঙামাটি, পার্বত্য বান্দরবান, পার্বত্য খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ।

 

ঢাকা অঞ্চল                                                 ২৬-১০-২০০১ খ্রিঃ

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      ঢাকা জেলা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            শিববাড়ী ।

 

 

চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ অঞ্চল                                   ৩০-১০-২০০১ খ্রিঃ

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ।

 

সম্মেলন স্থানঃ                            ঝিনাইদহ সরকারী উচ্চ বিদ্যলয় । 

 

ফরিদপুর অঞ্চল                                             ০২-১১-২০০১ খ্রিঃ

 

অঞ্চলভুক্ত জেলাসমূহঃ                      রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মাগুরা, ফরিদপুর

 

সম্মেলন স্থানঃ                            ফরিদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমী ।

 

 

কর্মসূচিঃ সর্বশেষে, নিয়মিত রিপোর্ট করুন, চেইন অব কমান্ড (অথোরিটি)-কে কঠোরভাবে মেনে চলুন । ইউনিট ফর্ম পূরণ করে কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে তুলুন । এবং সভ্যচাঁদা নিয়মিত করে সাংগঠনিক কর্মকান্ডকে বেগবান করুন । “দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০০১”-এর কর্মদিশাকে বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হউন ।

 

[কঠোরভাবে নির্দেশ থাকছে, প্রতিটি ইউনিট যেন এক মাসের (ডিসেম্বর) মধ্যে জাতীয় সমন্বয়কারী বরাবর সম্মেলন বিষয়ক রিপোর্ট প্রেরণ করেন ।]

পুনশ্চঃ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।

 

সামাজিক আন্দোলন সফল হোক

বাংলাদেশ অমর হোক

সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অমর হোক

বাংলাদেশ অমর হোক, অমর হোক ।

 

              শুভেচ্ছান্তে

                                                                                               

          (আবু লায়েস মুন্না)

        পরিচালনা বোর্ড প্রধান

    বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট

 

 

 

প্রচ্ছদ প্রবন্ধ

 

 

একবিংশ শতাব্দীর শাব্দিক পদচারণা সর্বত্র, নতুন নতুন রোলে কোরাসের ধ্বনি উঠছে দিকে দিকে কিন্তু এখনো বিশ্বসভ্যতার কণ্ঠদেশ জুড়ে লা’নতের চিহ্ন, যন্ত্রপিষ্ট মনুষ্যত্বের আদর্শবর্জিত সমকালীন দুনিয়ার গাঢ় অন্ধকারে এখনো চলছে লুটেরাদের উন্মত্ত প্রেতনৃত্য, এখনো সেই দুঃসময়, আরো অন্ধকার নিয়ে শুধু সময়কে ভাগ করার হিসেবী আছরে ইবলিসীয় খেরোখাতায় এসেছে “নতুন” । আর সে নতুনত্বের জঠরে বন্দী তৃতীয় দুনিয়ার আমরা ক্রমশঃ বেহাল-যুযুধান । এখন ভোগবাদী সভ্যতার ধারায় বিজাতীয় সাংস্কৃতিক বেনিয়াবৃত্তির আগ্রাসী থাবায় মধ্যরাতে জেগে ওঠে তরুণদের দল বিনোদনের বেলেল্লাপনায় । দেশী সংস্কৃতি হয়ে উঠে পানসে ‘ব্যাকডেটেড’ । অতিশয় আত্মবিকৃত শিকড়বিচ্ছিন্ন আমরা, হয়ে উঠি বিভ্রান্ত-বিশৃংখল, নতুনের জঘন্যতায় নতুন শতাব্দীর নতুন প্রজন্ম । চোখ জুড়ে উঠে আসে বিদেশীয় রংচড়া স্বপ্ন, মগজে আবাদ হয় বিদেশের মাটি কিংবা দেশের মাটিতেই বিদেশ অনুকরণের চেতনায় আমৃত্যু এ্যালসেশিয়ানের মোড়কে ব্যর্থ নেড়ীকুত্তার দীর্ঘশ্বাস ।

 

কখনো এখানে উচ্চারিত হয়েছে তথাকথিত প্রগতির কণ্ঠে “বাংলা হবে ভিয়েতনাম”, এখন উচ্চারিত হচ্ছে তালেবানী মধ্যযুগীয় মরুহ্রেষায় “বাংলা হবে আফগান” । শুধু স্বাধীনতার সিকি শতাব্দী পরও জনজোয়ার ফুঁসে উঠে দাবি করেনি “বাংলা হবে বাংলার” । এখনো এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আকাশছোঁয়া ইমারত নির্মাণের মতো দেশজ বাস্তবতাবর্জিত বহুবিধ শিক্ষা দিয়ে গড়া হয় অনেক মগজ, যার বাস্তবায়নের সুযোগ এদেশে নেই । সর্বোচ্চ ব্যয়সাপেক্ষ শিক্ষাঙ্গনগুলো কাকের বাসার ভূমিকা পালনে অবতীর্ণ হয়ে ফুটিয়ে চলেছে কোকিলের ন্যায় চরিত্রসম্পন্ন কুলীন জারজদের, যাদের শিক্ষা-দীক্ষা-সেবা সমৃদ্ধ করে বিদেশকে । একবিংশে আজ কোথায় সেই দেশজ চেতনার অভাব মোচনে বৌদ্ধিক উৎকর্ষ অর্জনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগময় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ও তার সমাজকে ঘিরে সু-সভ্যত নাগরিক চেতনা? কিংবা দেশজ চেতনাসম্পন্ন সচেতন দৃঢ়তায় সামাজিক শক্তির উপস্থিতি?

 

এই ভাবেই আজও যার অনুপস্থিতিতে বিজ্ঞান-দর্শন, রাজনীতি-অর্থনীতি-আইন সহ রাষ্ট্রিক-সামাজিক সর্বস্তরে, পরাধীন মননের ফাঁসে আটকে পড়া জাতি, আর তার ভাগ্যবিধাতারূপী দেশজ চেতনাবর্জিত সারবত্তাহীন ফসিলদের বিকলাঙ্গতার গতানুগতিক ক্রম-অবনয়নের প্রদর্শিত এ-ধারায়, ছাত্ররা বড়জোর এখন কালো হাতের ইশারায় দেশপ্রেমবর্জিত নীতিহীন চলমান রাজনৈতিক বেনোবৃত্তির শর্তে “নৈতিকতা” বিকিয়ে পঙ্গু চেতনায় স্লোগান তুলছে । সে প্রশ্রয়ে দ্রুত অর্থ আয়ের খায়েশে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির অসাধু পথে বাড়িয়ে তুলছে নিজেদের অনর্থক মৃত্যু । এবং সে লাশ নিয়ে জমে ওঠে তথাকথিত ঘৃণ্য রাজনীতি । মুছে যায় বৈধ-অবৈধ-এর পার্থক্য, শাহাদৎ বরণের মহত্ত্ব । এগুলো এখন সমকালীন দুঃসময়ের লাইসেন্স ।

 

“এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”... বাংলার এই শ্রেষ্ঠ উচ্চারণের রূপ এখন বেদখল । মিছিলগুলো এখন ভাড়াটেদের কাছে লিজ দেয়া । বিক্রি হয়ে যাচ্ছে লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের কলম, কবির কবিত্ব, প্রতিবাদী মিছিল, অনুকরণীয় আদর্শ চরিত্র; সবক্ষেত্রে অনাদর্শিক চরিত্রই এই সামাজিক প্রতিষ্ঠায় আমাদের সামনে আদর্শ হিসেবে অনুকরণীয় এবং ইতিহাস বিকৃতিতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি আমরা, বিকৃত আমাদের নৈতিকতা, অতঃপর আদর্শবর্জিত গাঢ় অন্ধকারে ক্রমশঃ এগিয়ে চলছে আমাদের দেশ, আমরা কিংবা আত্মবিক্রয়ের সীমান্তে পরবর্তী উত্তরসূরিরা ।

 

দেশের প্রতি ইতিহাসনিষ্ঠ দায়বদ্ধতা পালনে বিস্মৃত বাংলার তারুণ্য, নেশা ও হিংসার মতো বহুবিধ বৈশিষ্ট্য জেঁকে অবক্ষত মূল্যবোধের দৈন্যতায় দীর্ণ যখন আমাদের অন্ধকারময় আগামী, আর উত্তর প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিতব্য, ঠিক তখনই ২৪শে নভেম্বও ২০০০, উচ্চারিত হলো সমগ্র দেশকে সামনে রেখে, বিশ্ববীক্ষার আলোকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের অগ্নিস্পর্শিত ডাক- ঘোষিত হলো “সচেতন সামাজিক শক্তি” উত্থানের পাল্টা ইশতেহার আর সে লক্ষ্য পূরণে উঠে এলো “সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা”-র স্লোগান কিংবা চাই “চেতনার সংহতকরণের দ্বারা তারুণ্যের দৃঢ় সঙ্ঘবদ্ধতা” । কারণ, ছাত্র-যুব সমাজকেই বহন করতে হচ্ছে সকল সামাজিক অসুস্থতার দায়ভার-নিকৃষ্ট অপবাদ, অথচ এর বলি ছাত্র-যুবক হলেও এর জন্য কোনোমতেই ছাত্ররা দায়ী নয় । 

 

জঙ্গলে জন্ম নিয়ে বেড়ে-বলে ওঠা মানুষের চিন্তা, চেতনা ও আচরণ জংলীর মতোই হয় । আর এর জন্য তাকে দায়ী করে যারা; হয় তারা মূর্খ, নয় হীনস্বার্থে মানুষবেশী সাক্ষাত শয়তান, জ্ঞানপাপীর দল । স্বাধীনতাত্তোর আমাদের প্রজন্মকে খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস সহ নারকীয়তার বহু দোষে দুষ্ট প্রজন্ম হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে । কিন্তু এর জন্য দায়ী কারা? স্বাধীনতা-উত্তর যে পারিপার্শ্বিকতায় আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা তা গড়ে তুলেছে কারা? কাদের লালসা পূর্ণ করতে আমরা আজও বুকের তাজা রক্ত ঢেলে কানায় কানায় ভরিয়ে দিচ্ছি তাদের কালো হাতে ধরা রক্তের পেয়ালা? ছাত্র হয়ে অন্য ছাত্রের বুকে গুলি চালানোর দানবীয় শিক্ষার উৎস কোথায়? ভ্রাতৃঘাতী জঘন্য যুদ্ধের রণক্ষেত্র কেন আমার শিক্ষাঙ্গন নামক পবিত্র ইবাদতভূমি? কোন জন্তুগুলোর মুখ ভিজে আছে আমার ভাইয়ের রক্তে? কোন হায়েনাদের দাঁত এখনো রঞ্জিত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে?

 

রাষ্ট্রিক ষড়যন্ত্রের আবর্তে আমাদের জন্ম, বুলেট-বারুদের ময়দানে বেড়ে-বলে উঠেছি আমরা । এখনো শকুনের পাখায় ঢাকা আছে নীল আকাশ । মুক্তির উপমা আমি দেখলাম কবে? ষড়যন্ত্রে ভরে থাকা আমার ইতিহাস, স্বাধীনতায় বিশ্বাস থাকবে কী করে? বারুদের গন্ধে ঠাসা আমার বাতাস, নির্মল নিঃশ্বাসে সুস্থতার স্বাদ পেলাম কবে?

 

জঙ্গলে নয়, স্বাধীনতোত্তর বাংলার আবর্তেই আমাদের জন্ম, তাহলে এই জংলিত্বের পাশবিক নিচুতায় নামিয়ে আনল কারা? এই আবর্ত গড়ে তোলার দায়িত্বে এতদিন কারা ছিল?

 

আমরা ক্লান্ত-শ্রান্ত, কিন্তু নির্লিপ্ত নই; কারণ আগামী আমাদের- আমরাই আগামীর । সে আগামীর প্রশ্নে- জীবনের প্রশ্নে- আমাদের সুস্থতার দ্বার আমাদেরই খুলতে হবে । আমাদের পিছনে আমাদেরকেই দাঁড়াতে হবে দল-মত নির্বিশেষে । রাজনীতির নামে ক্ষমতালিপ্সুদের মুখোশ ও মঞ্চবদলের তথাকথিত ভিন্নতার আড়ালে অভিন্ন ঘৃণ্য খেলায়, তারুণ্যের আর বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদ নয় বরং দেশকে সামনে রেখে আমরা হবো দেশজ চেতনা লাভে, বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা অর্জনের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানের মহতী লক্ষ্যনিষ্ঠ, আদর্শগত চেতনায় সংহত এবং সেই সচেতন সঙ্ঘবদ্ধতাই দেবে আগামীর দিকনির্দেশনা ।

 

যৌবন চায় আড্ডা । সহজাত সে আড্ডা যখন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নেশা অথবা হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানিময়, স্বার্থান্বেষী মানুষবেশী শুয়োরের খোঁয়াড়ে, রাজনীতির নামে এবং নেশাগ্রস্তদের ডেরায়, ঘাতকদের মিছিলে; তখন জাতীয় স্তরে আড্ডা গড়ে না তোলাটাই আত্মঘাতী । হিংসা যখন ঘাতকের প্রামাণ্য হাতিয়ার, তখন অহিংস’র ডাক না দেওয়াটাই ভ্রষ্টাচার । তাই সর্বস্তরে গড়ে উঠুক অহিংস’র শপথবদ্ধদের আড্ডা । সে আড্ডা হবে সচেতন, সৃষ্টিশীলতার আড্ডা, যেখানে মিলেমিশে থাকবে বাবা-মা, ভাই-বোনের নির্মল হাসির উচ্ছলতা, দেশমাতৃকার বুকে ভর করা গাঢ় অন্ধকার দূর করার দীপ্ত শপথ এবং তা হোক জাতীয় স্তরে দেশের প্রতিটি পরিবার থেকে শিক্ষাঙ্গন ও জনপদে । সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ পরিক্রমায় চেতনার সংহতকরণের দ্বারা বিনির্মিত হোক মুক্তির দিশা । সে লক্ষ্যেই শাণিত হোক শপথ, যা আলোর মতো, সে আলো হাতে চারপাশে ছড়িয়ে আলোর পথযাত্রীরা আপাতদৃষ্টে তা বিচ্ছিন্ন কিন্তু একই আলোর সাধনায় একাত্ম, দিকে দিকে ক্রমশঃ প্রোজ্জ্বলিত “লণ্ঠন” নামের প্রতীকে । এই গাঢ় দুঃসময়ের বিরুদ্ধে আলোর কাফেলায়, দেশকে সামনে রেখে- চেতনাকে গড়ে তোলার মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে আদর্শনিষ্ঠ, ঐক্যবদ্ধ, “সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থান”-এ, বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন ও জনপদে উত্তোলিত মুষ্টিবদ্ধ হাতের মূর্ত রূপ আলোকময়...“লণ্ঠন” ।

 

 

এবং দল-মত নির্বিশেষে আজ এ-উৎসবে বাবা হিসেবে তাকে জানান, “আজকের জন্য অন্ততঃ আপনারা দল-মত নির্বিশেষে শুধু অভিভাবক হিসেবে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ান কিংবা পারস্পরিক বোধে একাত্ম আর শৃঙ্খলায় আমরা সবাই হয়ে উঠি আমাদের; কারণ রাজনীতিতে মিথ্যা চলছে, কিন্তু সন্তানের কাছে মিথ্যা চলে না । তেমনি স্নেহের টানাপোড়েন নেই বলে বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা প্রাসঙ্গিক এই সভা- যা বিবেকী বোধের উপর নির্ভরশীল, সেখানে মিথ্যা চলে না ।”

 যদি দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা না থাকে, তবে শিক্ষাঙ্গনে “লণ্ঠন” নামে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করা যেতে পারে ।

 

সতর্কতাঃ

১) অনেক সভ্যই এ সংগঠনকে অন্যান্য রাজনৈতিক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে মিলাতে চান, যেখানে তারা শুধু ভুলই করে না, এটা সংগঠনবিরোধীও বটে । যদিও আমরা স্পষ্ট বলেছি, এটা “অ-রাজনৈতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ।” এ-দিকটা ভালো করে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং সতর্ক থাকবেন ।

২) এর বাহ্যিক পরিকাঠামো অনুসরণ করে কেউ আলাদা সংগঠন করার মতো বেঈমানী করতে চাইলেও সভ্যদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, ‘মুক্তিজোট’ ভিন্ন এবং ব্যাপক । সে-ই শুধু তার শেষ কথা বলার ক্ষমতাধর । সব অপশক্তির বিরুদ্ধে অহিংস’র হৃদ্স্পন্দিত সুনির্দিষ্ট আদর্শ সম্পৃক্ত পরিকাঠামোই আদর্শিক সংগঠনের হাতিয়ার, মানবিক মমত্ব এবং বিজ্ঞাননিষ্ঠতাই তার ভিত এবং বিকাশের ধারায় অর্জিত জ্ঞানতত্ত্বই তার শক্তির উৎস এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা অর্জনের এই মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে আগামী “সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থান”-ই তার লক্ষ্য ।

 

 

সাংগঠনিকভাবে আমাদের ছড়িয়ে পড়তে হবে । এটাই এখন প্রতিটি সভ্যের সাংগঠনিক ধ্যান-জ্ঞান হবে ।

 

বাহ্যিক কর্মসূচিঃ

সব সংগ্রামই চালিত হয় নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে, তা অসংখ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় । আমরা যেহেতু সুস্থ ধারা বিনির্মাণে (১) সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ও (২) সামাজিক সংগ্রাম অর্থাৎ এ-পর্বে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ গ্রহণ করেছি এবং আদর্শগত সংগ্রামের এই ডাক দল-মত নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চাই, সেহেতু তার মাধ্যম হিসেবে দুইটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিঃ

১)       শিক্ষাঙ্গন ও স্থানিক সর্বস্তরে মননশীল সুস্থ আড্ডার প্রশ্নে “লণ্ঠন” নামক পত্রিকা প্রকাশ ।

২)       “স্বজন” নামের স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি গ্রহণ । কিন্তু “স্বজন” সম্পর্কিত সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য যে সময়ের দরকার, তা নেই বিধায়- পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা আপাতত স্থগিত করা হলো ।

৩)       স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি গ্রহণ । কিন্তু রক্তদান কর্মসূচি সম্পর্কিত সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য যে সময়ের দরকার, তা নেই বিধায়- পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা আপাতত স্থগিত করা হলো ।

 

“লণ্ঠন” বিষয়ক নির্দেশনাঃ

১)       প্রচ্ছদ নির্দেশনা ও প্রচ্ছদ প্রবন্ধ পাঠিয়ে দেওয়া হলো । সমগ্র দেশব্যাপী একই প্রচ্ছদ প্রবন্ধ থাকবে ।

২)      ইউনিটে যিনি সম্পাদক (এডিটোরিয়ালবোর্ড প্রতিনিধি), তিনি “লণ্ঠন”-এর সম্পাদনা করবেন । সমন্বয়কারী (কন্ট্রোল বোর্ড প্রতিনিধি) বা আহ্বায়ক (হাই কমান্ড বোর্ড প্রতিনিধি)-এর একটি বাণী থাকবে । যা “কালায়ন” প্রথম সংখ্যার আহ্বায়ক-এর বাণীর আদলে হবে । উল্লেখ থাকে যে, “লণ্ঠন” মূলতঃ “কালায়ন” প্রথম সংখ্যার অনুসরণে করতে হবে ।

 

                  

         

সংগঠন প্রধানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এই কর্মসূচিসমূহ ঘোষিত হচ্ছে ।

(এডিটোরিয়াল বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্ট-এর ভিত্তিতে, কন্ট্রোল বোর্ড-এর পক্ষ থেকে উক্ত প্রদত্ত রিপোর্ট বিশ্লেষিত এবং পরিচালনা বোর্ড-এর সহযোগিতায় যৌথভাবে নিম্নোক্ত পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত পেশ করা হচ্ছে, যা এ-বছরের কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত ।)

 

সাথী,

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের শুভ্র শুভেচ্ছা এবং সামাজিক সংগ্রামের দৃঢ়বদ্ধ চেতনা থেকে জাতীয় সম্মেলন তথা যৌথ চেতনার সফল রূপান্তর উত্তর সংগ্রামী অভিনন্দন ।

 

চেতনাকে গড়ার আন্দোলনই সাংস্কৃতিক আন্দোলন । সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার উৎসরণেই বিনির্মিত হয় মানবমুক্তির ভিত । আর তা যখন সামাজিক মুক্তির লক্ষ্য সাধনে দেশজ চেতনাকে ঐক্যবদ্ধ ও সংহতকরণের ডাকে নির্ধারিত হয় দুর্বার সাংস্কৃতিক সংগ্রামে, তখনই তা আদর্শনিষ্ঠ সুস্থ ধারায় বদলে দেয়ার শপথে উজ্জীবিত কণ্ঠে ঘোষণা করে “সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থান”-এর ইতিহাসনিষ্ঠ পাল্টা ইশতেহার ।

 

উক্ত ঘোষিত মহান ঐতিহাসিক লক্ষ্য পূরণের সাংগঠনিক যৌথ চেতনার শর্তে দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০০১ সফল হয়েছে । যা ছিল আমাদের শপথবদ্ধতার দৃঢ় প্রত্যয়েরই সাংগঠনিক অগ্রযাত্রার পদচিহ্ন, পথ এবং সঠিকতার আদর্শিক বিনির্মাণের মাইলফলক । যা প্রথম ধাপের দ্বিতীয় বছরের কর্মদিশা হিসেবে জাতীয় স্তরে গৃহীত হলো ।

 

সাংগঠনিক রিপোর্টে বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত শৃংখলা তথা চেইন অব কমান্ড বা অথোরিটির প্রসঙ্গে তত্ত্বগত ভিত্তি নানা শাখা থেকে আলোচিত হয়েছে । যার প্রায়োগিক সিদ্ধান্তঃ

 

ক)       পূর্বতন নেতৃত্ব পরবর্তীর জন্য অথোরিটি হিসেবে গৃহীত । অর্থাৎ তিনজন সভ্যের মধ্যে একজন পূর্বতন, অন্যরা অনুগামী । এইভাবে ১১ জন পর্যন্ত ১ জন প্রধান বা পূর্বতন এবং অন্য ১০ জন অনুগামী । এক্ষেত্রে ঐ পূর্বতন ১ জনই ১০ জনের “অথোরিটি” বা উক্ত ইউনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, তাঁর নির্দেশই বিশেষ বা সর্বোচ্চ । তিনি ব্যক্তি নন, সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনিই সংগঠন বা চেইন অব কমান্ড । তাঁকে গুরুত্ব না দেওয়া মানে চেইন অব কমান্ডকে গুরুত্ব না দেওয়া, বিশৃংখলা সৃষ্টি করা- যা সংগঠনবিরোধী, সেই সঙ্গে বেঈমানীর শামিল । অজ্ঞাতে করলে তা আত্মবোধ বা অহমবোধেরই ঘৃণ্য প্রকাশ । যার বিরুদ্ধে তাঁর নিজেকেই সংগ্রাম করতে হবে ।

 

খ)       পূর্বতন সংগঠকের সমালোচনা তাঁর সমস্তর থেকে ঊর্ধ্বগামী হবে । কোনো অবস্থাতেই কোনো নেতৃত্বের সমালোচনা তাঁর অধঃস্তন নেতৃত্বের নিকট করা যাবে না ।

(অর্থাৎ একজন অনুগামী তাঁর পরিচালক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কারও ভুল নিয়ে সমালোচনা করার সময় লক্ষ্য রাখবেন তিনি তাঁর (সমালোচিত ব্যক্তির) সমকাতারের বা ঊর্ধ্বতন কি না । যদি না হয়, তবে তাঁর সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই সমালোচনা করা যাবে না । শুধু তা-ই নয়, ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের অনুগামীদের সামনেও তাঁর সমালোচনা করা যাবে না । এ-সকল বিষয়াদি লক্ষ্য রেখে যে সমালোচনা হবে, তার যথাযথ সমাধানের জন্য, যিনি সমালোচনা গ্রহণ করলেন, তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, প্রয়োজনে তা নিরসনের জন্য ক্রমপর্যায়ে কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে ।)

 

গ)       আন্তঃসংগ্রাম বা বিশেষ সিটিং, যা শুধুমাত্র চেতনাগত দিক থেকে পরিপক্ক ও সাংগঠনিকভাবে বিশেষ চেতনায় উন্নীত সাথীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, সেই সিটিং-এ উপরোক্ত নীতি কার্যকর হবে না ।

(মুক্তিজোট মানেই ভুলের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম । তাই সাথীদের সকল ভুলত্রুটি নিরসনের জন্য এই আন্তঃসংগ্রামের আহ্বান করা হয় বিশেষ মুহূর্তে । এই সময় সাথীরা ঐক্যতার প্রশ্নে নিজেদের ভুলত্রুটি নিয়ে আত্ম-সমালোচনা সহ পারস্পরিক ভুলত্রুটি নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা করে থাকেন এবং যেহেতু এই সংগ্রাম কঠোরভাবে নিজেদের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়, তাই একে আন্তঃসংগ্রাম বলে অভিহিত করা হয় । আন্তঃসংগ্রাম করা হয় সাংগঠনিক ঐক্যতার প্রশ্নে এবং নিজেদের আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনে । এরপরও যিনি ধীরে ধীরে নিজের আত্মশুদ্ধি বা সেই ভুল সংশোধনের চেষ্টা করবেন না, তাকে প্রয়োজনে সংগঠন থেকে ক্রমান্বয়ে ‘ওভারলুক’, অব্যাহতি এবং বহিষ্কার করা হবে ।)

 

ঘ)       সমালোচনার ক্ষেত্রে সর্বদাই মনে রাখতে হবে, যার ভুল প্রথমে তাকেই বলতে হবে । যদি দেখা যায়- ভুল সংশোধন হচ্ছে না, তখন তা ঊর্ধ্বতনের নিকট উপরোক্ত নীতি অনুসারে বলতে হবে । নচেৎ পূর্বতনের অনুমতি ও উপস্থিতিতে আন্তঃসংগ্রাম ডেকে তা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে । মনে রাখতে হবে, আন্তঃসংগ্রামে অনুপস্থিত কোনো সাথীর সাথে (সি.সি. ব্যতিরেকে) আন্তঃসংগ্রামের কোনো আলোচনা কোনোক্রমেই করা যাবে না ।

 

ঙ)       ভুলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা প্রতিটি সভ্যের মৌলিক সাংগঠনিক কর্তব্য ও অধিকার, তাই সংগঠনের প্রতিটি সভ্যই তাঁর ঊর্ধ্বতন এমন-কি সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বা অথোরিটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা করতে পারবেন এবং ঊর্ধ্বতন তা শুনতে, গ্রহণ করতে এবং উত্তর দিতে বাধ্য, তবে অবশ্যই চেইন ব্রেক করে নয় । অর্থাৎ থানা থেকে জেলা, জেলা থেকে অঞ্চল, অঞ্চল তার উত্তর না দিতে পারলে কেন্দ্রে পাঠাবেন । এক্ষেত্রে কোনো সভ্য তার ঊর্ধ্বতনের সমালোচনা করতে দ্বিধা থাকলে কেন্দ্রে সংগঠন প্রধান বরাবর (পর্যবেক্ষণ সেল) গোপন রিপোর্ট করবেন । কিন্তু কোনোমতেই অধঃস্তন কিংবা কোনো অবস্থাতেই সংগঠনবহির্ভূত অথবা সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত কারও সাথে শেয়ার করা যাবে না । সেই সাথে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সমালোচনাকারী নিজেও বুঝতে ভুল করছেন কি না । সেক্ষেত্রে নিজের ভুল শুধরে নিতে হবে । সাধারণ চেতনা এবং সাংগঠনিক বা বিশেষ চেতনার পার্থক্য যেহেতু আছে, তাই দৃষ্টিভঙ্গিগত দিককে খুঁটিয়ে দেখতে হবে- মোটকথা, স্বচ্ছতার স্বার্থে সর্বক্ষেত্রে প্রশ্ন করার সততা থাকতে হবে । সেই সাথে যারা শুধু ভুল নিয়েই সরব হয়, গুণ সম্পর্কে নিঃশব্দ থাকে- তাদের আবিষ্কার করে বর্জন করুন । স্মরণ রাখুন- ঐক্যতা গড়ে তোলার জন্যই ভুলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম; যা ঐক্যতা বিনষ্ট করে, তা শুধু ভুল নয়, আপাতদৃষ্টে যতো সঠিকই হোক, তা সংগঠনবিরোধী ।

 

অতএব, ভুলের বিরুদ্ধে সতর্ক সংগ্রাম গড়ে তুলুন এবং সর্বক্ষেত্রে (অথোরিটি) চেইন অব কমান্ড মেনে চলুন ।

 

অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি

 

ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া

বিগত বছরের সাংগঠনিক কর্যক্রম থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগামীর তথা চলতি বছরের কর্মদিশা নিরুপণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংগঠন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, বর্তমানে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ইউনিট গঠন যা আমাদের মূল কর্তব্য এবং ধ্যান ও জ্ঞান হবে । বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংগঠন দ্রুত প্রসারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্তভাবে ইউনিট গঠনের কৌশল নির্দিষ্ট করেছে ।

১ ।      বর্তমানে চলমান ইউনিটগুলো পূর্ণাঙ্গ তথা ১১ জন হওয়ার সাথে সাথে পরপর (কমপক্ষে ১৫ দিনের ব্যবধানে, সর্বোচ্চ ১ মাস) দুইটি ইউনিট সিটিং করবে এবং তৃতীয় সিটিং-এর সংশ্লিষ্ট জেলা সমন্বয়কারী/সমন্বয়কারী বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের উপস্থিতিতে দুই অথবা তিনটি ইউনিটে বিভক্ত করে প্রতিটি ইউনিটে একজন পরিচালক নির্ধারণ করবে । নতুন ইউনিটগুলো আবার পূর্ণাঙ্গ ইউনিট গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে এবং ১১ জন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা আবার নতুন ইউনিট গঠন করার প্রক্রিয়াধীন হবে ।

 

তিনটি সিটিং-এর ক্ষেত্রে যা করণীয়ঃ

ক) পূর্ণাঙ্গ ইউনিট হওয়ার পর প্রথম সিটিং-এর পূর্বেই সকল সাথীর আহ্বান, প্রথম বছরের সাংগঠনিক রিপোর্ট ও লণ্ঠন প্রচ্ছদ প্রবন্ধ পড়া বাধ্যতামূলক ।

খ)  দ্বিতীয় সিটিং-এর পূর্বে দ্বিতীয় বছরের সাংগঠনিক রিপোর্ট ও বর্তমান কর্মসূচি পড়া বাধ্যতামূলক ।

গ) দ্বিতীয় সিটিং-এর পরপরই সাথীরা তাদের ইউনিটের অন্যান্য সাথীদের সম্পর্কে পারস্পরিক ব্যক্তিগত রিপোর্ট করে পরিচালকের নিকট জমা দিবেন । এক্ষেত্রে সাথীরা সংশ্লিষ্ট পরিচালকের সম্বন্ধেও রিপোর্ট করবেন । পরিচালক উক্ত রিপোর্ট সমন্বয়কারীর নিকট জমা দেবেন । অতঃপর পরিচালক সমন্বয়কারী বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের অনুমতি ও উপস্থিতিতে তৃতীয় সিটিং করে ইউনিট ভেঙে নতুন ইউনিটসমূহ গঠনের প্রক্রিয়া চালাবেন ।

 

রিপোর্ট

রিপোর্ট সম্পর্কে সংগঠনে যা ঘোষণা করা হয়েছে- “যে রিপোর্ট করে না, সে সংগঠন করে না” । সক্রিয় সভ্য বা সক্রিয় ইউনিট বলতে বোঝায় মূলতঃ যিনি নিয়মিত রিপোর্ট ও সভ্যচাঁদা দিয়ে থাকেন । সেহেতু রিপোর্ট-এর গুরুত্ব অনুসারে বর্তমানে রিপোর্টকে তিনটি দিক বা বৈশিষ্ট্যে ভাগ করা হয়েছে ।

ক)     ব্যক্তিগত রিপোর্টঃ প্রতিটি সভ্য নিজে কতোটা সাংগঠনিক চেতনায় উন্নীত হলো । তথা ব্যক্তিস্বার্থ ভেঙে কতোটা সমষ্টির স্বার্থবোধে একাত্ম হচ্ছে, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রসারে প্রত্যহ কতোটা ভূমিকা পালন করছে এবং তাঁর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কতোটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করবেন । যা তাঁর নিজের কাছেই থাকবে । এককথায়- নিজের মধ্যেই নিজেকে নিয়ে যে মৌলিক সংগ্রাম ও একান্ত জীবনবোধ, তা নিয়মিত ডায়েরী লিখন হিসেবে নিজের কাছে থাকবে । অবশ্য ঊর্ধ্বতন অথোরিটি দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে বাধ্য থাকবেন, যা গোপন রাখা হবে ।

খ)      পারস্পরিক সাথীদের সম্পর্কে রিপোর্টঃ ইউনিট-এর অন্যান্য সাথীদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সাংগঠনিক চেতনার মান, তাঁদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অর্থাৎ অন্য সাথীদের সম্ভাবনা, বৈশিষ্ট্য, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সংগঠন প্রসারে ভূমিকা সম্পর্কে রিপোর্ট করবেন, যা তিনি ইউনিট পরিচালকদের নিকট জমা দেবেন ।

গ)      সামগ্রিক ইউনিট রিপোর্টঃ প্রত্যেক সভ্য তাঁর সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা, কর্মপদ্ধতি, সফলতা, ব্যর্থতার যোজন-বিয়োজন করে সংগঠন প্রসারের স্বার্থে কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, সে সম্পর্কে রিপোর্ট ।

উল্লেখ থাকে যে- প্রথম রিপোর্ট প্রাত্যহিক, যা নিজের কাছে থাকবে; দ্বিতীয় ও তৃতীয় রিপোর্ট পরিচালকের মাধ্যমে সমন্বয়কারীর কাছে যাবে । সমন্বয়কারী সেগুলো ফটোকপি করে মূল কপি অঞ্চল প্রধানের নিকট জমা দেবেন । অঞ্চল প্রধান সেগুলোর ফটোকপি রেখে মূল কপি কেন্দ্রীয় এডিটোরিয়াল বোর্ড-এ জমা দেবেন ।

 

বি.দ্রঃ প্রতি তিন মাস পর পর উপরোক্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক নির্দেশ থাকছে ।

 

বাহ্যিক কর্মসূচি

 

লণ্ঠন

লণ্ঠনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নিয়মাবলী মেনে চলার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ থাকছেঃ

১ । স্থানীয় পর্যায়ে (জেলা, থানা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ) কমপক্ষে পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ সক্রিয় ইউনিট না থাকলে লণ্ঠন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যাবে না ।

২ । শুধুমাত্র কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি পাঁচটি সক্রিয় পূর্ণাঙ্গ ইউনিট থাকে, তাহলে উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লণ্ঠন প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে ।

৩ । লণ্ঠন প্রকাশের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরে প্রকাশিত নির্দেশাবলী কার্যকর থাকবে ।

 

সক্রিয় ইউনিট

সক্রিয় ইউনিট বলতে যা বোঝানো হচ্ছেঃ

ক)       যে ইউনিটের সভ্যরা নির্ধারিত মাসিক চাঁদা ১০ টাকা নিয়মিত প্রদান করে ।

খ)       যে ইউনিটের সভ্যরা নিয়মিত উল্লিখিত রিপোর্ট প্রদান করে ।

উল্লেখ থাকে যে- যেহেতু ইউনিটসমূহ ভাঙা-গড়ার প্রক্রিয়া অবিরত থাকছে, সেহেতু দেখতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিটের সমান সংখ্যক (তথা ১১×৫ = ৫৫ জন) আছে কি না । অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে এমন ৫৫ জন সংগঠক যদি নিয়মিত থাকে, তাহলেই লণ্ঠন প্রকাশ করা যাবে । অন্যথায়, লণ্ঠন প্রকাশ করার উদ্যোগ সংগঠনবিরোধী বলে গণ্য হবে ।

 

উপসংহারে বলা যায়, এ-বছরের জন্য তিনটি কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছেঃ

 

ক)       সুশৃঙ্খল সংগঠন গড়ে তোলার স্বার্থে চেইন অব কমান্ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে ।

খ)       ২০০ সক্রিয় ইউনিট গড়ে তোলার স্বার্থে রিপোর্ট ও সভ্যচাঁদা নিয়মিত করতে হবে ।

গ)       উপরোক্ত দুইটি কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পরে লণ্ঠন প্রকাশের শর্তাবলী মেনে লণ্ঠন প্রকাশ করতে হবে ।

উল্লিখিত নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে কঠোর ও দৃঢ়বদ্ধ হবেন এই প্রত্যাশায় ।

পুনশ্চঃ ধন্যবাদ ও অভিনন্দন ।

 

“ইউনিটসমূহ দ্রুত পূরণ করুন

সভ্যচাঁদা নিয়মিত করুন ।”

 

 

 

সূত্রঃ

(১) বস্তু বা জগত ক্রমপরিবর্তশীল, সর্বদা প্রবহমান, তাই চেতনাও পরিবর্তনশীল, প্রবহমানঃ চিত্রে ১/ক-এ যখন ডিম (Base) দেখি, তখন ডিমের চেতনা (Superstucture)-ই জন্ম নেয়, বাচ্চা নয় এবং মুরগির ‘তা’-এর সাথে ডিমের মধ্যে অবস্থানরত পরস্পরবিরোধী (Unity of opposites) জৈব সাদা ও হলুদ অংশের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ডিম ফুটে (বিপর্যয়) সৃষ্টি হলো বাচ্চা (চিত্র-খ) -তখন আমাদের চেতনাতেও তার পরিবর্তন ঘটে বাচ্চার উপলব্ধি-ই ধরা পড়লো, ডিম নয় । এভাবে বস্তু বা Base থেকে চেতনা বা Superstructure এবং বস্তুর Base বদলালে চেতনাও (Superstructure) বদলে যায় । সামাজিক বা ঐতিহাসিক ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হলো বস্তু বা Base এবং আইন, শিল্প, সংস্কৃতি হলো-Superstructure । বস্তু বা Base (এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা) পরিবর্তনশীল, প্রবহমান বলে Superstructure পরিবর্তনশীল, প্রবহমান । ডিম ফুটে যেমন বাচ্চা, তেমনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা Base বদলের পথ ধরে সমাজ পরিবর্তিত হয়ে দাস থেকে সামন্ত, সামন্ত থেকে ধনতন্ত্রে পরিবর্তিত হয়েছে । তাই মার্কসবাদের  কথা হলো “Base বদলালে অল্প-বিস্তর দ্রুতবেগে Superstructure বদলে যায়” (কমিউনিস্ট ইশতেহার) ।

 

সূত্রঃ

(২) পরস্পর বিপরীতের সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই এই পরিবর্তন ঘটে এবং এই পরিবর্তনের কারণ অভ্যন্তরীণ, পরস্পরবিরোধী সত্তার উপস্থিতিঃ চিত্রে ১/ক-এ বস্তুর ক্ষেত্রে ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার কারণ- তার অভ্যন্তরে সাদা ও হলুদ অংশের পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্ব ।

 

সামাজিক বা ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে ডিম বা Base-এর স্থলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং এর অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বরত পরস্পরবিরোধী সাদা ও হলুদের স্থানে রয়েছে উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক । এই দুই শক্তির পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বে ডিম ফুটে বা বিপর্যয় বলতে এক্ষেত্রে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ বদল হয় । তাই এখানেমার্কসবাদের সিদ্ধান্তে বলা হলো, “বিকাশমান শ্রেণী (সংঘর্ষ বা হিংসা) বলপূর্বক অন্য শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে ।”

 

সূত্রঃ

(৩) বস্তুর এই পরিবর্তন বা গতি সর্বদাই গুণগতভাবে উন্নততর দিকে ঘটে অর্থাৎ সম্মুখ গতিঃ বস্তুর ক্ষেত্রে এই যে ডিম ফুটে বাচ্চায় পরিবর্তিত হলো, তা গুণগতভাবে অগ্রগামিতা বা মৌলিকভাবে উন্নততর বিকাশ, (বিপ্লব বলতে বোঝায় আমূল বা মৌলিকভাবে গুণগত বদল) লক্ষ্যণীয়- এক্ষেত্রে বাচ্চা পুনরায় ডিম-এর রূপে ফিরে যেতে পারবে না । ঐ বাচ্চাকে বিকাশের পথে সামনের দিকেই এগিয়ে যেতে হবে, যদিও বয়ঃপ্রাপ্তিতে সে ডিম দিলেও তা অতীতের একটি ডিমের স্তর নয়, বরং অনেক গুলো ডিম সে ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে, অর্থাৎ নিঃসন্দেহে তা অগ্রগতি উন্নততর বা সম্মুখ গতিরই স্তর নির্ণায়ক । অর্থাৎ বস্তুর গতি সর্বদাই একমুখী এবং তা সম্মুখ গতি, অতীত বা পশ্চাতমুখী নয় ।

 

সামাজিক বা ঐতিহাসিক ক্ষেত্রেও সমাজব্যবস্থা যখন দাস থেকে সামন্ততন্ত্র এবং তা থেকে ধনতন্ত্রে পরিবর্তিত বা বিকাশ লাভ করে, তখন তা পূর্বের সমাজব্যবস্থা থেকে উন্নততর অবস্থারই নির্ণায়ক এবং সামন্ততন্ত্র, দাস ব্যবস্থায় এবং ধনতন্ত্র সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যায় না । তা সর্বদা সম্মুখেই যায় ।

 

“বস্তুর এই নিয়মের বরেই মার্কস্বাদে যখন বলা হয়েছিল Base বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদল হলে, সমাজব্যবস্থা বদলে যায় এবং সেই সমাজ সর্বদা অগ্রগতির দিকেই অর্থাৎ পশ্চাতমুখী নয়; তখন- দ্বিতীয়ত মহাযুদ্ধের সুযোগে যোসেফ স্ট্যালিন লাল ফৌজের সাহায্যে দেশে দেশে বিপ্লবকে ত্বরান্বিত তথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা Base বদল করে ধনতন্ত্রের বদলে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ।

 

সূত্রঃ   

(৪) প্রকৃতি এক বস্তুময় সত্তা এবং প্রকৃতির যাবতীয় বস্তুই পরস্পর নির্ভরশীল ও সম্পৃক্ত, কোনো বস্তুই বিচ্ছিন্ন নয়ঃ বস্তুগত উদাহরণের ক্ষেত্রে ডিম, সাদা-হলুদ অংশ বা এর প্রয়োজনে মুরগি এবং ঐ মুরগির খাদ্যগ্রহণ, বর্জন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সবাই পরস্পর নির্ভরশীল ও সম্পৃক্ত । এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো কিছুকেই ভাবা যায় না । সেই সাথে এরা সবাই বস্তুময় সত্তার স্তরেই (ভর/অবস্থান-বস্তু) রয়েছে ।

 

সুতরাং সামাজিক ঐতিহাসিক ক্ষেত্রেও ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই পারস্পরিকতা, নির্ভরশীলতা ও সম্পৃক্ততা রয়েছে । এখানে বিচ্ছিন্ন করে কোনো কিছুই ভাবার নেই ।

 

মার্কস্বাদে বস্তুবাদী এই বৈজ্ঞানিকতার সূত্র ধরে বলা হয়েছে “আদিম সাম্যবাদী থেকে দাস, সামন্ত এবং সামন্ত থেকে ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদ । এর এই সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসে কোনো সমাজব্যবস্থা (আদিম, দাস, সামন্ত বা ধনতন্ত্র) কেই বিচ্ছিন্ন করে বিশ্লেষণ করা যাবে না । আর তাই আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থাই- সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসে- দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে দাস, সামন্ত, ধনতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের পথে- এক উন্নততর সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি লাভ করবে । ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক শ্রেণীবিভাজিত শোষণব্যবস্থা লুপ্ত হয়ে শ্রেণীহীন, শোষণহীন এক মহান মানবীয় সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা পৃথিবীতে আসবে । যেখানে মানুষ সম্পদকে সামনে রেখে জন্ম নিয়ে সম্পদের দাসবৃত্তি না করে, মানুষ জীবন ও মনুষ্যত্বকে সামনে নিয়ে জন্মাবে এবং মানুষ হয়ে, সম্পদের বলে সম্পদের জন্য ব্যাপক মানুষকে শোষণ করার নিকৃষ্ট স্বার্থের সম্পর্কের বদলে মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা পাবে । অর্থাৎ Negation of negation নেতির নেতিকরণের সূত্রের বলে এভাবেই সমাজ বিবর্তনের ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক সূত্রে পারস্পরিকতার পথ ধরে আদিম সাম্যকেই উন্নততর সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার পরিণতি ঘোষণা করা হয়েছে ।

 

সুতরাং আমরা দেখলাম শুধু দ্বান্দ্বিক নিয়মেই নয়; তা সামাজিক, রাষ্ট্রিক পর্যায়েও প্রমাণিত । বিশেষতঃ আদিম সাম্য থেকে ধনতন্ত্র পর্যন্ত সামাজিক বিকাশ বিবর্তনের ইতিহাসে তা প্রমাণিত ।

 

কিন্তু সাত দশক পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা । কিন্তু তত্ত্বগতভাবে দুটো জিনিস রহস্যময় । এক- আমাদের ধারণা ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাস প্রগতির, উত্তরণের । তাই সমাজতন্ত্র থেকে আবার ধনতন্ত্রে অবতরণ মার্কস্বাদী চিন্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় । দুই- এই অবতরণ হলো শান্তিপূর্ণ এবং সমাজতন্ত্রের শাসক শ্রেণী-শ্রমিক শ্রেণী বিনাযুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের শত্রুদের হাতে তুলে দিল । মার্কসীয় রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে এই শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তত্ত্বগত ব্যাখ্যাও আমরা করতে পারিনি ।

 

প্রশ্ন থেকে যায়- ওই পরিবর্তনের মুহূর্তে তবে কী শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল? যদি ছিল, তাহলে নিজের স্বার্থরক্ষার জন্য- নিজের সরকারকে বাঁচানোর জন্য- লড়াই করলো না কেন? কিন্তু যদি বলি, শ্রমিক শ্রেণী ওই মুহূর্তে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না, তখন প্রশ্ন আসবে- তবে কবে ওরা রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরে গেল এবং কী প্রক্রিয়ায়? দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থাকবে, যে শাসক শ্রেণীর হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র, সে হঠাৎই সন্ন্যাসী হয়ে যাবে কেন? তৃতীয় একটা উত্তর কেউ দেন- বিশেষ করে ট্রটস্কিপন্থীরা, যে সোভিয়েত ইউনিয়নে কোনোদিনই শ্রমিক শ্রেণীর সরকার ছিল না । এই উত্তর যে গ্রহণযোগ্য নয় । শ্রমিক শ্রেণীর সরকার যদি না হতো, তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মান সমরযন্ত্রের সামনে সোভিয়েত ইউনিয়ন দাঁড়াতে পারতো না । মোটকথা, এই যে রহস্যের তত্ত্বগত সমাধান আমাদের জানা নেই ।

 

দেখা যাক, পাঠসূচিতে উল্লিখিত দ্বান্দ্বিক নিয়মে বিশ্লেষিত ৪টি সিদ্ধান্ত, যা বস্তুগত ক্ষেত্রে সঠিক হলেও সামাজিক ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের মধ্যে অসংগতিপূর্ণ ।

 

সিদ্ধান্ত (১) পৃথিবী বা প্রকৃতি মূলতঃ বস্তুগত সত্তা এবং তা পরস্পরসম্পৃক্ত, নির্ভরশীল ও একে অন্যের দ্বারা নির্ধারিত ।

 

সিদ্ধান্ত (২) বস্তু সর্বদাই গতিশীল । প্রতি বস্তুই পরিবর্তিত হচ্ছে, বিকাশ লাভ করছে বা ক্ষয় হচ্ছে ।

 

সিদ্ধান্ত (৩) এইভাবে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সর্বদাই গুণগতভাবে উন্নততর অবস্থায় ঘটে থাকে, এই পরিবর্তন বা গতি ঊর্ধ্বগতি বা সম্মুখ গতি ।

 

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে এরা ঠিক হলেও সমাজতন্ত্র ভেঙে ধনতন্ত্রে সমাজব্যবস্থার অবনয়ন, অর্থাৎ “সমাজব্যবস্থা সর্বদাই সম্মুখ গতি বা ঊর্ধ্বমুখী উন্নততর অবস্থার দিকেই যায়”- এই ৩নং সিদ্ধান্তটার অসংগতি । অন্যদিকে, “Base বদলালেই Superstructure বদলায়” সিদ্ধান্তটার বিপরীতে “Superstructure থেকেও Base বদলায়- সিদ্ধান্তটা এসে পড়ে ।

 

সিদ্ধান্ত (৪) পরস্পর বিপরীতের সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই এই পরিবর্তন ঘটে । সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে ধনতন্ত্রে অবনয়ন বা পরিবর্তন হয়েছিল “সংঘর্ষ অর্থাৎ হিংসা বা বলপূর্বক একে অপরের উচ্ছেদের নিয়মের মধ্যে নয়, শান্তিপূর্ণভাবে ।

 

এক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক নিয়ম বস্তুগত ক্ষেত্রে সঠিক হলেও সে সিদ্ধান্তে সামাজিক বা ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে অসংগতি রয়েছে ।

 

উপরোল্লিখিত ১ নং সিদ্ধান্ত এবং ২ নং সিদ্ধান্ত প্রকৃতি সম্পৃক্ত সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও সঠিক হিসেবে সমাজবিজ্ঞানে গৃহীত হলেও ৩ নং এবং ৪ নং সিদ্ধান্তের অসংগতি শুধু সমাজতান্ত্রিক সমাজবদলের সংগ্রামকেই নয়, দর্শনগত ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের কাছে ব্যাপক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে । সংকট উত্তরণের দার্শনিক ধারার যাত্রা শুরু করতে হলেও এখান থেকেই শুরু করতে হবে । এক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, ধনতন্ত্র অর্থাৎ মার্কসের জীবদ্দশায় মার্কসের আজকের অসংগতির জন্য তাঁর মনীষাকে খাটো করে দেখা যাবে না । বরং তিনি সহস্রাব্দের মনীষীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক । আমরা জানি, সমাজবদলের তত্ত্বে ‘উৎপাদিকা শক্তি (যন্ত্রাদি ও উপকরণ এবং শ্রম ও অভিজ্ঞতা)-র মধ্যে’ ‘যন্ত্রাদি অর্থাৎ উৎপাদনের হাতিয়ার দ্রুত বিকাশশীল, মূলতঃ সেই বিকাশই সামাজিক গতিময়তার মূল নির্ণায়ক । “যন্ত্রাদি” তথা বিজ্ঞানে অগ্রগতির এই কোষকেই বিশ্লেষণপূর্বক শুরু করতে হবে এবং অবশ্যই যে সত্যটা সর্বাগ্রে স্মরণ রাখতে হবে, তা হলো -“ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিকৃষ্ট, প্রেতাত্মার নারকীয়তা পূর্ণ, তাই তাকে ঘৃণা না করাটাই নিজেকে ঘৃণিত করা এবং বিনির্মিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা মৃত শরীরের মতো, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রচেষ্টা, মানসিক বিকলতা ও অসুস্থতারই লক্ষণ ।” নিজেকে ঘৃণিত প্রমাণ করতে চাই না বলেই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মানতে পারি না এবং মানসিক বিকলতা ও অসুস্থতাকে প্রশ্রয় দেই না বলেই, সমাজতান্ত্রিক পশ্চাদমুখিনতাকে পথ মনে করি না । বড়জোর- নতুন পথের সন্ধানে, ধনতান্ত্রিক সমকালীন প্রেক্ষাপটকে মগজে রাখি এবং সমাজতন্ত্র থেকে শিক্ষাটা নিতেই তাকে সম্মুখে রাখি, যেমন মৃত লাশকে সম্মুখে রাখে মেডিক্যাল শিক্ষানবীশরা শিক্ষার স্বার্থে ।

 

সন্ধানী পথিকরা কি শুধু পাশ্চাত্যেই থাকে, নাকি সে পথিকৃৎ প্রাচ্যে তথা বাংলাতে জন্মাবে? হবেন সেই পথিকৃৎ?

 

                 শুভেচ্ছান্তে

 (এ কে এম শাহনেওয়াজ গণী)       

এডিটোরিয়াল বোর্ড প্রধান (অস্থায়ী)     

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট       

 

 

(উল্লেখ্য, বর্তমান রিপোর্টটি প্রথম ধাপের দ্বিতীয় রিপোর্ট- ২০০১-এর সাথে সম্পৃক্ত বিধায় দ্বিতীয় রিপোর্ট না পড়ে অত্র তৃতীয় রিপোর্ট সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বোধ আসবে না । তাই যথার্থ অর্থবহতার প্রশ্নে দ্বিতীয় রিপোর্ট সম্পৃক্ত করে তৃতীয় রিপোর্ট পড়ার নির্দেশ থাকলো ।)

 

উপস্থিত সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দ,

গ্রহণ করুন অহিংস’র শপথবদ্ধতা থেকে হৃদ্স্পর্শিত শুভেচ্ছা এবং অবিরত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দৃঢ়বদ্ধতায় শুভ্র অভিনন্দন ।

 

অন্তরতম সাথীরা,

সমকালীন দুঃসময়ের বৈকূল্যে সমাজগত দুই অভিশাপ তথা রাজনীতির নামে দেউলিয়াত্বের হিংস্র দলবৃত্তির জঠরজাত সন্ত্রাস এবং নেশা । ধ্বংসাত্মক এই দুই লানতের চিহ্ন আজ যুব-তারুণ্যের কণ্ঠদেশ জুড়ে, ভবিষ্যতের প্রশ্নে ইতিহাস বিনির্মাণের ইতিহাসখ্যাত মহান স্রষ্টারা আজ সমাজের চোখে স্রষ্টার আসনচ্যুত । হিংসা ও নেশার উন্মত্ততায় তারা ইবলিসীয় আসুরিকতায় উপস্থাপিত । দলবৃত্তির পথ ধরে সমগ্র দেশ জুড়েই আছে সন্ত্রাসী ও তার সবচেয়ে পচনশীল অংশ নেশাগ্রস্ততার আড্ডা । সমাজগত মানুষ বলেই যৌবন চায় পারস্পরিক অনুষঙ্গপূর্ণ আড্ডা । দলবৃত্তির বাইরে কোনো আড্ডা নেই- তাই অনুষঙ্গের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত তারুণ্য বাধ্য হয় চলমান সেই আড্ডায় গা ভাসাতে, অতঃপর সেই আড্ডা থেকেই দলবৃত্তির পথে হয়ে পড়ে অন্ধকারের ত্রাসী কিংবা তার সবচেয়ে পচনশীল অংশ- নেশাগ্রস্ত । আড্ডা থেকেই সন্ত্রাসী, আড্ডা থেকেই নেশাগ্রস্ততা; আর তাই ছাত্র, যুব, তারুণ্যের মধ্যে ঘনিয়ে আসা এই সর্বগ্রাসী নেশার ভয়ালতার বিরুদ্ধে তারুণ্যের জ্বালা থেকে নিজেদের মধ্যে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলতে সমগ্র দেশ জুড়ে ডাক দিয়েছিলাম বিকল্প সুস্থ আড্ডার । আর সে প্রশ্নেই দল-মত নির্বিশেষে সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা-এর স্লোগানে, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে, সামাজিক আন্দোলনের পূর্ণতায় ২৪শে নভেম্বর ২০০০ তথা সহস্রাব্দের সন্ধিতে ঘোষণা করেছিলাম সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানের পাল্টা ইশতেহার । যৌবনে অন্ধকারময় দুঃসময়ের বিরুদ্ধে নেশামুক্ত তারুণ্য পেতে দেশজ চেতনায় সুস্থ আড্ডা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা ছড়িয়ে পড়েছিলাম সমগ্র দেশে ।

 

আত্মস্বার্থ, আত্মসর্বস্বতার পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা, অনৈক্যতা ভেঙে সমষ্টির চেতনায় সামগ্রিক হওয়ার লক্ষ্যে, দেশবোধের উন্মেষণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও ব্যক্তিনির্ভরতার ঊর্ধ্বে উঠে নির্দিষ্ট আদর্শিক ধারায় লীন হওয়ার সংগ্রামে এক অখণ্ড সংঘবদ্ধতা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে, অহিংস’র দীক্ষামন্ত্র উচ্চারণে, জ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত হওয়ার ঘোষণায়, জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে ঘর (পরিবার) থেকে শিক্ষাঙ্গনে, টেবিল থেকে লাইব্রেরিতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথে ক্রমশঃ উত্তরিত গণজাগরুক রূপে দেশমাতৃকার ললাট থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলাম ক্লিষ্টতার সমস্ত ক্ষত, যৌবনের কণ্ঠদেশ জুড়ে উঠে আসা নেশাসন্ত্রাস-এর মতো ইবলিসীয় আসুরিকতার চিহ্ন ।

 

লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে বহুবিধ অবিশ্বাস, দ্বিধা আর বিভ্রান্তিকর অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমরা পেরিয়ে এসেছি তিন বছর । অভিজ্ঞতার আলোকে, আগামীর পথনির্দেশনা সহ বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সতর্ক করার সময় আজ সমাগত । আদর্শগত বিশ্বাসের সুগভীর ভিতের উপর গড়ে তোলা আমাদের সংগ্রামের দুর্ভেদ্য ঐক্যকে আরো লৌহদৃঢ় করে চেতনাকে আরো শাণিত করার প্রশ্নে এবং আমাদের যাত্রাকে আরো বেগবান করতে আয়োজিত এই তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সমাবেশ-২০০৩ ।

 

একাত্ম হওয়ার এই মহান আনন্দ-উৎসবে প্রথমেই সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাচ্ছি আমাদের আদর্শিক প্রাণসত্তা, প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক বড়দা-কে-যাঁর মহান দীক্ষা ও প্রদর্শিত পথই সাংগঠনিক উত্তরণের দিশা হয়ে প্রোজ্জ্বলিত আমাদের মতাদর্শিক অস্তিত্বে । আন্তরিক অভিনন্দন জানাই কন্ট্রোল বোর্ড এবং এডিটোরিয়াল বোর্ড-এর সম্মানিত প্রধানদ্বয়কে, যাঁরা বিগত বছরটিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালনায় ছিলেন আত্মবিশ্বাস ও প্রেরণার রক্ষণাত্মক ব্যূহ রূপে এবং যাঁদের কার্যকরী সমন্বয় ও সম্পাদনায় পরিচালনা বোর্ড কর্তৃক এই রিপোর্ট যথাযথভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব হলো । সেই সাথে- যতোটুকু সংগঠন ততোটুকু বিকাশ এবং যতোটুকু বিকাশ ততোটুকু পরিকাঠামোগত মতাদর্শিক প্রকাশ, সেই বিকাশমান ধারায় প্রকাশিত নির্বাহী প্রধানকে, জাতীয় সার্বক্ষণিক প্রতিনিধি, সমস্ত অঞ্চল প্রধান ও আজকের এই সমাবেশে উপস্থিত সম্মানিত কাউন্সিলর সহ সমস্ত সাংগঠনিক সহযোদ্ধা তথা সংগঠনের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ।

 

শুভেচ্ছা জানাচ্ছি জাতীয় সমন্বয়কারীর আসনে উপবিষ্ট প্রতিনিধি সহ জাতীয় সার্বক্ষণিক প্রতিনিধি বৃন্দদেরকে, অভিনন্দন জানাচ্ছি সর্বোচ্চ অগ্রগামী সাংগঠনিক ব্যূহ সেই সহযোদ্ধাদের, যাঁরা অঞ্চল প্রধান-এর দায়িত্ব পালন করছেন সংগঠনের মাইলফলক বা আর্দশিক দৃষ্টান্ত ও দিশা হিসেবে ।

 

সর্বোপরি, অবশ্যই সশ্রদ্ধ অভিনন্দন সমাবেশে উপস্থিত বিভিন্ন জেলা, শিক্ষাঙ্গন প্রধানদের, যাঁরা আদর্শিক আলোকবর্তিকা হাতে সাংগঠনিক ভিত্তি স্থাপনে সচেষ্ট এবং তাঁদের চেষ্টার সংগ্রামী ধারায় জন্ম নেয়া আজকের সমাবেশে উপস্থিত ভিত্তিসম আগুয়ান নেতৃত্বদানকারী সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ।

 

প্রেক্ষাপটঃ আন্তর্জাতিক

 

সুহৃদ সহযোদ্ধাগণ,

মানবরূপে ভূমিষ্ঠ হলেও আমরা মানবীয় হয়ে উঠি সমাজগত পারস্পরিকতায় । সংঘবদ্ধতাই যখন সামাজিকতার সংজ্ঞা, পারস্পরিকতাই তখন মনুষ্যত্ব- যা সমাজকে করে তোলে সুসভ্যতঃ মানবীয় ।

 

কিন্তু অমানবিক হিসেবের নিগড়ে বন্দী যখন যাপনের সব শর্ত, মানবীয় জীবন তখন নেমে যায় পশুত্বে আর পশু আত্মস্বার্থে পালবদ্ধ থাকলেও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার অভাবে কখনোই সামাজিক নয় ।

 

অখণ্ড হয়ে ওঠা আজকের বিশ্বে যখন মানুষ হয়ে উঠেছে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, অনৈক্য পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দীর্ণ, তখন মনুষ্যত্বের সেই পারস্পরিক দায়বদ্ধতার শর্তে সমাজ আর কখনোই সমাজ নয়-স্রেফ পালবদ্ধ । দুনিয়া এখন পালবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক জীবের খোঁয়াড় । মানবজীবন যখন বুদ্ধিবৃত্তিক জীব হিসেবে শুধু হিসেবকেই জীবন ভেবে সভ্যতা সহ সবকিছুকেই মিথ্যা ঘোষণা করেছে, তখন বিশ্বসমাজ হারিয়েছে মানবীয়তার সংজ্ঞা আর জীবন হারিয়েছে বাঁচার অর্থ । অনৈক্যতা আর পরস্পরবিচ্ছিন্নতায় পরিবারগুলো ভেঙেছে, যৌথজীবনের শিকড় হয়েছে আলগা । নেশা ও হিংস্রতাকে আশ্রয় করে আগ্রাসী থাবায় যুযুথান মানব সংস্কৃতি, ধ্বস নেমেছে যাপনের সর্বব্যাপী নৈতিকতা জুড়ে । অবক্ষয়ের বিশৃঙ্খল লানতে পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে গাঢ় অন্ধকার, কায়েম হয়েছে পরিপূর্ণ জাহেলিয়াত । সমাজগত মানবীয় শূন্যতায় আত্মস্বার্থ সর্বস্বতায় দুনিয়ার অনৈক্যতা ও পরস্পরবিচ্ছিন্নতা নির্দিষ্ট করে আদর্শগত সংকটের মহাকালকে এবং একই সাথে সে অনিবার্য করে তোলে জীবনকে জাহেলিয়াত থেকে মুক্তির মহান আর্তির মানবীয় দায়বদ্ধতাকে । জীবন, জগৎ আর সামাজিক মুক্তির মহান দায়ে ঐক্যের অনিবার্যতায় সে দাবি করে পাল্টা ইশতেহার । অন্ধকারময় দুঃসময়ের বিরুদ্ধে সকালের বার্তাবাহী সদম্ভ ঘোষণা, মানবমুক্তির মহান বার্তা, আদর্শহীনতার বিরুদ্ধে পাল্টা আদর্শ- যা ঐক্যের বোধকে শাণিত করে জীবন থেকে উঠে আসে জীবনের জন্য, স্বদেশ থেকে দেশে দেশে ক্রমশঃ সমগ্র বিশ্বজুড়ে । অন্ধকার থেকে উঠে এলেও সূর্যস্পর্শিত দিশায় উৎসারিত হয়- দুনিয়া আলোকিত করার দৃঢ় প্রত্যয়ে, দুর্বিনীত দুর্জয়ে, মহাকালের বুকে জানায় তার সদম্ভ অস্তিত্ব । ইতিহাস যার অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক ভিত দান করে আগামীর জয়কে করে অনিবার্য এবং যবনিকা টানে বিদ্যমান মানবিকতা বর্জিত সামাজিক অন্ধকারের ।

 

আমরা জানি, সমাজ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র রাষ্ট্র, বিবর্তনের ধারায় আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় যার বৈশিষ্ট্যিক রূপ নেমেছে কেন্দ্রীভূত কাঠামোপূর্ণতায় । বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি মার্কিনের জঘন্য ইরাক আগ্রাসনে সে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর দানবীয় বীভৎস দন্ত-নখ বেরিয়ে আসাতে কেন্দ্রীভূত কাঠামোর সমাজবদ্ধ ব্যাপক গণবিরোধী রূপ আজ প্রকাশিত । বিশেষতঃ আগ্রাসনকারী দেশের সাথে সমগ্র বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও এই চরম ঘৃণ্য আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়া এবং তার সাথে বিশ্বের বেশির ভাগ কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রিক সংশ্লিষ্ট সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নির্লজ্জ ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্তদের দলবৃত্তির বাইরে এসে সামাজিক ফ্রন্টের মাধ্যমে তাদের বিবেকতাড়িত প্রতিবাদে শামিল হওয়া থেকে প্রমাণিত হয়- রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কেন্দ্রীভূত দলবৃত্তি নয়, সামাজিক ফ্রন্টই গণস্বার্থে রক্ষাকবজ । কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো সম্পৃক্ত রাজনৈতিক কেন্দ্রীভূত দলবৃত্তি আজ ব্যাপক এবং সমাজজীবনের বিরোধী স্থানে দাঁড়িয়েছে, স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে তার গণবিরোধী চরিত্র ।

 

সেই সাথে, যেহেতু সমাজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার (রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সম্পৃক্ত রাজনৈতিক দলবৃত্তি বা সরকার) বিধায় এর দেউলিয়া হয়ে পড়া (দেউলিয়া = মানুষকে দেয়ার ক্ষমতা হারানো) বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টতা পেয়েছে সমগ্র সমাজ । আর তাই সমস্ত সমাজও মানবীয়তা হারিয়ে নেমে গেছে সঙ্ঘবদ্ধতার নামে পরস্পরবিচ্ছিন্ন যুথবদ্ধতার পাশবিক স্তরে ।

 

উপসংহারে বলা যায়, কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো থেকে উদ্ভূত ও তার আশ্রয় যে রাজনৈতিক দল, স্বাভাবিকভাবেই তা কেন্দ্রীভূত সংগঠন-কাঠামোয় আবর্তিত হয়ে আজ রাষ্ট্রের সাথে সেও হিংস্র দানবীয় চরিত্র নিয়ে মানবীয় সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে । রাজনৈতিক দলবৃত্তি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় গণবিরোধী চরম ঘৃণ্যতায় হিংসা, বিদ্বেষ, আত্মস্বার্থ, অনৈক্যতা সহ চরম অবক্ষয় নৈতিক মানের চরম ধ্বস নিয়ে সমাজ অভ্যন্তরে জেঁকে বসেছে । তারই উদগিরিত বিষে বিষাক্ত আজ সাংস্কৃতিক মনন, যা ক্রমশঃ দ্রুততায় ও ভয়ানক বিপন্নতায় বিষিয়ে দিচ্ছে মানুষের জাগতিক জীবন । হিসেবের দড়িতে বাঁধা জীবন সমাজবদ্ধ হয়েও পরিবার দাম্পত্য থেকে সর্বক্ষেত্রে ও সর্বস্তরে পরস্পর বিচ্ছিন্ন; একা ।

 

বৈশ্বিক সেই দুঃসময়ের বিষক্রিয়া প্রথম শুরু হয় আর্থ-ব্যবস্থায় দুর্বল, প্রতিরোধক শক্তিহীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেই । আমাদের স্বদেশভূমি বাংলাদেশেও সে বিষক্রিয়া তীব্রভাবে সমাজজীবনে ফুটে উঠেছে । বিশেষতঃ তা ছাত্র, যুব ও তারুণ্যের দর্পণেই প্রতিফলিত হয় । যে বিকলতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে করেছে আরো দুঃসহ ।

 

প্রেক্ষিত জাতীয়

 

অন্যদিকে চলমান এই বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেউলিয়াত্বের সাথে বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রকাঠামো, তার জন্মলগ্ন থেকে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াতেই ছিল বিকলতা, যে বিকলতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে করেছে আরো দুঃসহ । ব্রিটিশপূর্ব অনেক শাসক বাইরে থেকে এসে এই উপমহাদেশ শাসন করলেও তাদের সাথে ব্রিটিশদের পার্থক্য হলো অন্যান্য শাসকরা (দীর্ঘস্থায়ী শাসনের ক্ষেত্রে) শেষ অবধি এ দেশেই বংশপরম্পরায় থেকে গেছে অর্থাৎ তারা এ দেশের জনসমাজ সম্পৃক্ত ছিল । কিন্তু ব্রিটিশরাই প্রথম (দীর্ঘস্থায়ী শাসনের ক্ষেত্রে) শাসক, যাদের লক্ষ্য ছিল এ-দেশ (জনসমাজ) নয় অর্থাৎ তাদের দেশ বা ব্রিটিশ । আক্ষরিক অর্থেই শাসক হিসেবে তারা বিদেশী, ফলে শোষণের স্বার্থেই বিদেশমুখিনতায় গড়ে তোলে চলমান এই শাসনব্যবস্থা ।

 

ব্রিটিশ উপনিবেশ অন্যত্রও ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রকে চালনার স্বার্থে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদেরকে এখানে বিকাশের যে স্তরে (সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক-রাষ্ট্রিক কাঠামো পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে চলমান আধুনিক ধনতান্ত্রিক সামাজিক রাষ্ট্রিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠাকাল) যেভাবে নিশ্চিহ্ন (অভিজাত, অমাত্য ও রাজকর্মচারী এমন-কি শেষ অবধি রয়ে যাওয়া সৈনিকদেরও ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে নিকেশ করা হয়) করা হয়েছিল, তা আর কোথাও হয়নি । সেক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা চালনার স্বার্থে ব্রিটিশরা পরবর্তীতে যে অংশকে নিজেদের মতো করে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে তুলে আনে, সেটাও তাদের (ব্রিটিশদের) চেতনাপ্রসূত অর্থাৎ বিদেশী চেতনা । মূলতঃ তারা ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী ।

 

এরপর ব্রিটিশমুক্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও শাসনব্যবস্থা ছিল প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানিরা, অর্থাৎ বিদেশী শাসক গোষ্ঠী । সবশেষে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে শাসনব্যবস্থায় (ক্ষমতায় আসীন হয় বা

রাজনৈতিক অর্থে) বাংলা হয়ে ওঠে বাংলার এবং নেতৃত্বে থাকা মূলতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণী শাসনকার্য পরিচালনায় উঠে আসে ।

 

কিন্তু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিদেশমুখী রাষ্ট্রকাঠামোর ধারায় শিক্ষিত অর্থাৎ দেশজ চেতনা বর্জিত বিদেশমুখী চেতনায় পুষ্ট ছিল । ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলেও দেশজ চেতনার অভাবে তাকে ব্যাপক সামাজিক স্বার্থে স্বদেশমুখী করে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, সে ব্যর্থতা তাদের নয় বরং দেশজ চেতনার অভাব থাকার ফলশ্রুতিতেই দেশকে ভালোবাসলেও (আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক তথা সামগ্রিক অর্থে) বাংলাকে বাংলার করে তুলতে পারেনি এবং অদ্যাবধি ক্ষমতায় অনেকে এলেও এবং প্রচণ্ড প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও একই কারণে (দেশজ চেতনার সংকট) তাঁরা ব্যর্থ হন ।

 

[উল্লেখ্য, এখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা কম-বেশি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হলেও সেটা এই বিদেশমুখী ব্যবস্থার কারণেই সম্ভব হয়নি । কারণ আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার সাথে তালকাটা এক বিকৃত সামাজিক অবস্থায় সমাজতন্ত্রই হোক আর যতো আধুনিক সমাজব্যবস্থাই হোক না কেন, তা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং বিদেশমুখী রাষ্ট্রকাঠামোয় যতো সৎ নেতৃত্বই আসুক আর যতোই চেষ্টা করুক; বিদেশমুখী রাষ্ট্রিক অবকাঠামোগত বিকারগ্রস্ততা দূর করার প্রশ্নে দেশজ চেতনায় উন্নীত না হয়ে কিছুই সম্ভব নয়, আর যা কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব নয়, কেবল শিক্ষারত ছাত্র-যুবরাই তা পারে- দৃষ্টান্তস্বরূপ যেমন জাপানের ছাত্র-যুবরা স্বদেশকে সামনে রেখে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এক আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি তথা জ্ঞানতত্ত্বে সমৃদ্ধ হয়ে নিজেদের স্বদেশে ফিরে গড়ে তোলে বিধ্বস্ত জাপানকে- আজকের উন্নত জাপানে ।]

 

আর তাই অদ্যাবধি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষিত অংশের মননগত বা আচার-আচরণ ও চিন্তা-চেতনা তথা সাংস্কৃতিক জীবনে পাশ্চাত্য তথা বিদেশ-ই প্রতিফলিত হয় । যা দেশজ চেতনার অভাবকেই তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলে ।

 

[যে কারণে লণ্ঠনের প্রচ্ছদ প্রবন্ধে উচ্চারিত হয়েছিল... “দেশী সংস্কৃতি হয়ে ওঠে পানসে ‘ব্যাকডেটেড’ । অতিশয় আত্মবিকৃত শিকড়বিচ্ছিন্ন আমরা হয়ে উঠি বিভ্রান্ত, বিশৃঙ্খল, নতুনেরর জঘন্যতায় নতুন শতাব্দীর নতুন প্রজন্ম । চোখ জুড়ে উঠে আসে বিদেশীর রংচড়া স্বপ্ন, মগজে আবাদ হয় বিদেশের মাটি কিংবা দেশের মাটিতেই অনুকরণের চেতনায় আমৃত্যু এ্যালসেশিয়ান মোড়কে ব্যর্থ নেড়িকুত্তার দীর্ঘশ্বাস, কখনও এখানে উচ্চারিত হয়েছে তথাকথিত প্রগতির কণ্ঠে বাংলা হবে ভিয়েতনাম, এখন উচ্চারিত হচ্ছে তালেবানী জন্তুসম মরুহ্রেষায় বাংলা হবে আফগান শুধু স্বাধীনতার সিকি শতাব্দী পরও জনজোয়ার ফুঁসে উঠে দাবি করেনি বাংলা হবে বাংলার । এদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় (বুয়েট, বিআইটি ইত্যাদি) আকাশছোঁয়া ইমারত নির্মাণের মতো দেশজ বাস্তবতা বর্জিত বহুবিধ শিক্ষা (এদেশে পঠিত প্রতিটি জ্ঞানশাখার পাঠ্যগ্রন্থসমূহে বিদেশী পণ্ডিতের উদ্ধৃতি ছাড়া কোনো কিছুই পূর্ণতা বা গ্রহণযোগ্যতা পায় না । বিগত তিনশ বছরে এদেশে কি কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি জন্মায়নি?) দিয়ে গড়া হয় অনেক মগজ, যার বাস্তবায়নের সুযোগ এদেশে নেই । সর্বোচ্চ ব্যয়সাপেক্ষ শিক্ষাঙ্গনগুলো কাকের বাসার ভূমিকা পালনে অবতীর্ণ হয়ে ফুটিয়ে চলেছে কোকিলের ন্যায় চরিত্র, সম্পূর্ণ কূলীন জারজদের । একবিংশে আজ কোথায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও তার সমাজকে ঘিরে নাগরিক চেতনা কিংবা নাগরিক চেতনা সম্পন্ন সচেতন দৃঢ়তায় সামাজিক শক্তির উপস্থিতি?]

 

সেই সাথে বিদেশমুখী রাষ্ট্রিক বিকৃত ধারায় চুম্বক দণ্ডের ন্যায় তা আজ আত্মস্বার্থে চালিত দেশপ্রেম বর্জিতদের সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্যে তুলে এনেছে । দল-মত নির্বিশেষে স্বার্থান্বেষীরা স্বীয় স্বার্থেই ক্রমশঃ স্বদেশবিমুখ রাষ্ট্র সম্পৃক্ততার (রাজনৈতিক দলবৃত্তি) দ্বারা সংহত ও সংঘবদ্ধ, তাদের পরিচয় আজ রাজনৈতিক, যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি স্বাধীনতার বত্রিশ বছর অতিক্রমণের পথে আজ প্রত্যেকটা দল থেকে দেশপ্রেমী, সৎ নেতৃত্বকে পিছনে ফেলে (দলীয় লবিং-এ পরাস্ত হচ্ছে) সম্মুখে উঠে আসছে দেশপ্রেম বর্জিত সমাজবিরোধী । সর্বোপরি, বলা যায়- আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে দেউলিয়া হয়ে পড়া চলমান আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে দেশজ রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার বিকারগ্রস্ততা মিলেমিশে আজ যে রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিয়েছে, তার একদিকে রয়েছে সেই ভয়ানক রাজনৈতিক দলবৃত্তির দানবীয়তা এবং বিপরীতে রয়েছে ব্যাপক জনসমাজ ।

সেই সাথে, এই মানদণ্ডে দেশের সমগ্র জনসমাজ আজ দুই ধারায় বিভক্ত । এক অংশ- দেশপ্রেম বর্জিত আত্মস্বার্থে রাষ্ট্র সম্পৃক্ততায় রাজনৈতিক দলবৃত্তিতে সংঘবদ্ধ, যে অংশটা ক্ষুদ্র আর তার বিপরীতে ব্যাপক জনগোষ্ঠী, যারা অনৈক্য এবং অসংগঠিত । ফলশ্রুতিতে এই ব্যাপক অংশ অসংগঠিত থাকার কারণে আজ স্পষ্টতঃ গণবিরোধী চরিত্র সম্পন্ন মুষ্টিমেয় রাজনৈতিক দলবৃত্তির নিকট বিপর্যস্ত, অসহায় । যে প্রবণতার প্রধানতম শিকার ছাত্র, যুব ও তারুণ্য ।       

 

সুতরাং দেশজ প্রেক্ষিতে উঠে আসে মূল সংকট অনৈক্যতা ও দেশজ চেতনার অভাব এবং তা বদলেও চাই ঐক্যের ডাক ও দেশজ চেতনায় সমন্বিত জ্ঞানতত্ত্ব । সেই সাথে তার প্রধান শিকার যেহেতু ছাত্র, যুব ও তারুণ্যই, তাই তা বদলের সংগ্রামের অগ্রসেনারাও আজকের ছাত্র, যুব ও তারুণ্য ।

 

উত্তরণের ভিত

 

অন্ধকারের মধ্যে আলোর বিচ্ছুরণ যেমন তীব্রতা পায়, তেমনি মতাদর্শগত বৈশ্বিক সংকট আর অন্ধকারের চরিত্র যখন স্পষ্ট, তখন মুক্তির আলোকময় দাবিও অনিবার্য হয়ে ওঠে । আর তাই আজ কেন্দ্রীভূত দানবীয় রাষ্ট্রকাঠামোর বিপরীতে চাই মানবীয় বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র (সংগঠন) কাঠামো, সংঘবদ্ধ হিংস্রতার বিপরীতে চাই অহিংস’র দীক্ষামন্ত্র, দেউলিয়া ও বিকৃতিগ্রস্ত রাজনৈতিক পথের বিপরীতে চাই সর্বব্যাপী সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ এবং আত্মস্বার্থের পাশবিক দলবৃত্ততার বিপরীতে চাই সামষ্টিক স্বার্থে আদর্শনিষ্ঠ লৌহদৃঢ় সংগঠন । রাষ্ট্রশক্তিকে রুখতে চাই সামাজিক শক্তি এবং তার বিকৃতিগ্রস্ত অবস্থানের বিপরীতে চাই দেশজ চেতনায় সমন্বিত জ্ঞানতত্ত্ব ।

 

এই সবকিছুই চাই ভবিষ্যতের প্রশ্নে আর ভবিষ্যতের শর্তবদ্ধতা থাকে শুধু ছাত্র, যুব ও তারুণ্যেরই । ভবিষ্যৎ সে বিনির্মাণেরই হোক কিংবা অনিশ্চয়তারই হোক, ভবিষ্যৎ প্রাসঙ্গিকতায় সর্বব্যাপী অনিশ্চয়তার প্রকাশ তথা সমকালীন সমাজমননের যাবতীয় অস্থিরতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার বিষক্রিয়ার নীল উন্মত্ততার প্রত্যক্ষ শিকার যেমন ছাত্র, যুব ও তারুণ্যই- তেমনি সে দাবি পূরণের অগ্রসেনারা তারাই (ছাত্র, যুব ও তারুণ্য), যাঁরা চিরকালীন ইতিহাসে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের স্রষ্টার আসনে আসীন থেকেছে । বদলে দেয়ার দায়বদ্ধতা পালনের স্বদেশক্রান্তিতে যুগে যুগে পথ ও পথিকৃতের মহান দিশারী হয়ে প্রোজ্জ্বল থেকেছে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের চিরকালীন সংগ্রামে । সেই সূত্রবদ্ধতা ধরেই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ছাত্র, যুব ও তারুণ্যের মাঝে চাই ইতিহাসনিষ্ঠ ঐক্যতার ডাক ।

 

কিন্তু আর্থ-সামাজিক ভিত্তিগত কারণেই যখন আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতায় তারা পরস্পরবিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিক দলবৃত্তির জঠরজাত ঘৃণ্য দুই রূপ সন্ত্রাস এবং নেশায় উন্মত্ত, তখন সংঘবদ্ধতা বলতে সমগ্র দেশ জুড়ে দলবৃত্তির পথে শুধু এরাই আছে । বর্তমানে আড্ডা বলতেও জাতীয় স্তরে এদেরই অবাধ বিচরণ । এর বাইরে ব্যাপক ছাত্র, যুব ও তারুণ্যের অ-রাজনৈতিক কোনো জাতীয় সংঘবদ্ধতা নেই কিংবা তার পথ ধরে পারস্পরিক অনুষঙ্গপূর্ণতায় জীবনবোধ সম্পন্ন একই সুর, স্বর আর চেনা বন্ধনে দৃঢ় বিশ্বাসের ভিতে গড়া কোনো আড্ডাও নেই ।

 

আমরা জানি, জীবনবোধের পারস্পরিকতায় একই সুরে-একই স্বরে-চেনা হয়ে ওঠার জন্য একটাই চেনা বন্ধন, লক্ষ্য ও ডাক চাই । সে প্রশ্নেই আমরা বাধ্য নিজের স্বদেশটাই সামনে রাখতে । কারণ চেহারা, রুচি, পছন্দ, অপছন্দের ক্ষেত্রে আমাদের ভিন্নতা থাকলেও একই দেশ, একই স্বদেশমাতা আমাদের-বাংলাদেশ । এক দেশেই আমরা জন্মেছি, জন্মগত এই বন্ধন আমাদের বড় চেনা । স্বদেশ আমাদের মা, এই একটা ক্ষেত্রে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা এক । আড্ডা যেহেতু সমগ্র দেশ জুড়ে, কারণ একজন এক স্থানে আড্ডা দিতে অভ্যস্ত হলে, দেশের অন্য জায়গায় গিয়েও আড্ডার অভাব পুরণে ক্ষয় ও পচে যাওয়া পথ সৃষ্টিকারী চলমান আড্ডা সে পাবে, সুতরাং সমগ্র দেশ জুড়ে একটি বিকল্প আড্ডা অনস্বীকার্য । লক্ষ্য যখন জাতীয় প্রয়োজন, চেনা সুর ও বন্ধনের ডাক, তখন একটাই যেন ডাক- মা । মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশ এবং সহোদরসুলভ আত্মিক বন্ধনপূর্ণ ভালোবাসাময় বিশ্বাসী এ-সংঘবদ্ধতায় গড়ে তোলার স্বার্থে দেশ যখন মা, আর তার উদর থেকে জন্মানোর শর্তে আমরাও তখন হয়ে উঠি সহোদর । তাই জাতীয় স্তরে আড্ডা গড়ে তোলার লক্ষ্যে অনিবার্যভাবে সামনে রাখতে হয় এবং হবে দেশকেই । সুতরাং আমরা বাধ্য হয়েছি চলমান আত্মকেন্দ্রিকতা ও সন্ত্রাসের চেয়েও ভয়ংকরভাবে আমাদের মধ্যে সর্বগ্রাসী রূপ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যে নেশা, সেই নেশার বিরুদ্ধে নিজেদের মধ্য থেকে জাতীয় স্তরে বিকল্প আড্ডা গড়ার মাধ্যমে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ার প্রশ্নে ডাক দিতে নেশামুক্ত তারুণ্য পেতে দেশজ চেতনায় সুস্থ আড্ডা গড়ে তুলুন অর্থাৎ অনেকটা বাধ্যবাধকতা থেকেও দেশ উঠে এসেছে; আর তাই মা-মাতৃভূমি একটাই লক্ষ্য-একটাই ডাক-চেনা সুর আর বিশ্বাসী বন্ধনের নাম আমাদের কাছে- বাংলাদেশ

 

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিতকে নিয়েই জীবনবোধ আর বোধের উন্মেষণের সংগ্রামকেই আমরা সাংস্কৃতিক সংগ্রাম বলে বুঝি এবং তা সমাজদর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষিকরূপ অনুসারেই সমাজ সংশ্লিষ্ট বা সামাজিক আন্দোলন হিসেবেই গণ্য ও পূর্ণতা পেতে বাধ্য । কারণ- যে সংগ্রাম সমাজসংশ্লিষ্ট, তাই সাংস্কৃতিক এবং যা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট, তাকেই রাজনীতিক বলে । মূলগত অর্থেই আমরা সামাজিক এবং আমাদের সংগ্রামও তাই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক নয় ।

 

[সমাজের সাথে রাষ্ট্রের এবং সাংস্কৃতির সাথে রাজনীতির যতোটুকু সম্পর্ক আছে, ততোটুকু আমরা সম্পর্কিত । সেক্ষেত্রে আমরা জীবনবোধের প্রশ্নে তাকে জানি- তার শিকার হতে নয়, তা থেকে বাঁচতে এবং বাঁচাতে । তাদের দায়ী কিংবা বিরোধিতা এবং বিদ্বেষ-কোনোটাই আমরা করি না । সংগঠন তাই সর্বদাই বলে দেয় যে, কেউ রাজনীতি করলেও এ-সংগঠন করতে পারে এবং রাজনীতি করা না করার সাথে এর সম্পর্ক নেই, সেই সাথে আমরা কখনোই বলি না এ গ্লাসের জল পান করো না বরং জানাই এই গ্লাসের জলে কী আছে, তেমনি আমরা বলি না রাজনীতি না করে টেবিলে ফেরো বরং জানাই রাজনীতি কী এবং টেবিলে ফেরার যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ স্বকীয় বোধকে অস্বীকার করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া নয় বরং বোধটাকে জাগিয়ে দিয়ে তার স্বকীয়তাকে গড়ে তুলি বোধের উন্মেষণে গৃহীত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ধারায় । তাই আমরা জানাই, রাজনীতি যদি হয় দেশজ স্বার্থে- তবে তা করা না করা- কোনোটাই সংকটের সমাধান দিতে পারে না । কারণ- দেশের বিদ্যমান সংকটের উৎস দেশজ চেতনার অভাব । যা সমাধানে রাজপথ নয়, কোনো দলের ও ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে-বিপক্ষে গিয়েও নয় বরং দেশমুক্তির পথ পড়ার টেবিল, পক্ষ-বিপক্ষের ধারায় সম্পৃক্ত হয়ে অনর্থক লাশ না হয়ে টেবিলে (দেশকে সামনে রেখে জ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত হওয়া) স্থিত হন । বড়দা এজন্য বলেন “রাজনৈতিক দলের পক্ষে না গেলেও মন্দ নয়, তাতে তোমার পরিবার ও তোমার মা সন্তান হারানোর যন্ত্রণা থেকে বাঁচবে । কিন্তু তাকে (রাজনীতি) ঘৃণা করে অহেতুক বিরোধিতার চেয়ে বরং তার অক্ষমতা ঘোচাতে যদি পড়ার টেবিলে যাও তবে তোমার দেশমাতা বাঁচবে” ।]

 

অথচ আজকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলীয়বৃত্তের জঠর থেকে জন্মানো সন্ত্রাস ও সর্বোচ্চ পচনশীল রূপ নেশাগ্রস্ততা বিভিষীকার মতো ছেয়ে গেছে ছাত্র, যুব ও তারুণ্যের মধ্যে । এই দুই সহজাত ঘৃণ্যরূপ যখন দলীয়বৃত্ততার পথ ধরে সারাদেশে মূলতঃ আড্ডার মধ্য দিয়েই ছড়িয়ে পড়ছে, আমরা তখন তার বিপরীতে ভিতর থেকে যখন প্রতিরোধে সমগ্র দেশব্যাপী বিশ্বাসী, আত্মিক বন্ধনের অনুষঙ্গপূর্ণ আড্ডা গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ডাক দিলাম (অবক্ষয় ও নৈতিক ধ্বস, যা সাংস্কৃতিক এবং তা থেকে মুক্তির ডাক মানেই সাংস্কৃতিক মুক্তি) । জন্মকালীন সে সময় থেকেই তা অদ্ভুত সন্দেহ আর বিভ্রান্তির মধ্যে আক্রান্ত হয়ে পথ চলছে, যা যুগপৎ হাস্যকর এবং বিস্ময়কর । দ্বিধাগ্রস্ততার ভূত আমরা দেখেছি চারপাশ জুড়ে ।

 

অবশ্য হাসি আর বিস্ময় দুটোই উবে যাচ্ছে এর বাস্তব অন্ধকার দিকটা দেখে । রাজনৈতিক বেনোবৃত্তিতে দেশ শব্দটা যখন পচে গেছে, তখন সমগ্র দেশ জুড়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নাম শুনলেও মানুষ দ্বিধায় ভ্রু কুঁচকাচ্ছে । সেই সাথে ‘দেশ’ শব্দটা যাদের ব্যবসায়িক মূলধন, তারা আমাদের গায়ে সন্দেহের দুর্গন্ধময় নোংরা ছিটাবেই । সংঘবদ্ধতা যখন গণবিরোধী লুটেরাদের রূপ, তখন সংঘবদ্ধতার কথা শুনলে জনসাধারণ অস্বস্তিতে ভুগবেই আর জাতীয় সংঘবদ্ধ গণবিরোধী লুটেরা দুশমনকে পরাভূত করতেও যে জাতীয় সংঘবদ্ধতা দরকার এটা জনসাধারণ ভুললেও, গণবিরোধীরা জানে । আত্মস্বার্থে তাই তারা শংকিত ও সন্ত্রস্ত হয়ে বিভ্রান্তির আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত করবেই (মিডিয়া বা পেপার-পত্রিকা যেহেতু তাদেরহাতেই) । আড্ডা মানেই যেখানে সন্ত্রাস আর নেশা, তার বাইরে কিংবা তা থেকে দূরে থাকতে এবং বাঁচতেও যে চাই দেশব্যাপী বিকল্প আড্ডা, তা মানুষ বিশ্বাস নাও করতে পারে । দলবৃত্তির হিংস্র খলনায়ক তাদের অশুভ থাবায় ভেঙে দিতে পারে এ-আড্ডা এবং মুক্তি শব্দটা যখন রাজনৈতিক দেউলিয়া বৃত্তির স্বার্থোদ্ধারের ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষের মানদণ্ড হিসেবে বহুচর্চায়, বহুব্যবহারে বিভক্তির অসম্মানকর শব্দে পরিণত হয়েছে; তখন মুক্তিজোট উচ্চারণে আমাদের দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যের ডাকের বিপরীতে দলবৃত্তির ঘৃণ্য ভাগের যূপকাষ্ঠে বলি দেয়ার অপচেষ্টা হতেই পারে ।

 

[সাথী বন্ধুরা তাই পেপার-পত্রিকা সহ বাহ্যিক যাবতীয় বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার থাকবেন, বিচ্ছিন্ন হতাশ কিংবা বিভ্রান্তির ফাঁদ থেকে সর্বদা মুক্ত থেকে সাংগঠনিক অবস্থায় দৃঢ়বদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ থাকবেন ।]

 

সত্যি আমরা স্বাধীনতার পরেও এক চরম দুঃসময়ে জন্মেছি । সবকিছুই ইতোমধ্যে বিপরীত অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে । ভালো এখন মন্দের ফাঁস, সাদা শব্দটি কালোর অর্থে প্রতিফলিত আর আলো প্রকাশ করে ঘুটঘুটে কালোর অর্থ । ঠিক যেমন যৌবন এখন সৃজন ও নির্মাণের পুরোধা না হয়ে ধ্বংসের হাতিয়ার হয়েছে । আশীর্বাদের বদলে তা এখন অভিশাপ । যুব হওয়া এখন পাপ । জীবনের অধিকারে আমাদের বেঁচে থাকার কথা থাকলেও আমরাই লাশ হচ্ছি আর মৃত্যুমুখী বৃদ্ধরা যুব-তারুণ্যের সে লাশ নিয়ে রাজনৈতিক সওদায় নামে । তাই জীবন নয় মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত এ সময়-রূপান্তরিত দুঃসময়ে এবং দুঃসময় প্রেতাত্মার মতো উল্টো পায়ে সবকিছুর বিপরীত অর্থে আমাদের নরকে টানছে । রচনা করছে এক জগদ্দল অন্ধকার । আর অন্ধকারেই সংঘবদ্ধ লুটেরা কায়েম করে তাদের প্রেত্ রাজ । যেখানে জীবন্ত মানুষের বদলে তরতাজা রক্তাক্ত লাশের আর্তি ও আতিথেয়তার নির্লজ্জ কামড়াকামড়িতে ‘এ লাশ আমার’, ‘আমাদের’ রব পড়ে । আর তাই জীবনবোধের সম্মিলিত আমাদের এই জাগরণে তাদের লাশের অভাব হবে । লুটেরার স্বার্থে গড়া সন্ত্রাস আর নেশার ডেরা না থাকলে তাদের সেবক কমবে । সেজন্য চলমান অন্ধকারকে পাথেয় করা রাজসিক ক্ষমতাধররা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে সবকিছুর উল্টো অর্থ করে প্রমাণ দিচ্ছে তারা অন্ধকারের প্রতিভূ, তাই জীবন্তদের অস্তিত্ব আর আলো হাতে সংঘবদ্ধ জাগরণে তারা শংকিত হয়ে বিভ্রান্তি ছড়াবেই ।

 

ইতোমধ্যেই তারা বিভ্রান্তির অন্ধকার দিয়ে ঢেকে দিয়েছে জাগরণে বিশ্বাসী জীবিতদের পথনির্দেশনার সবগুলো মাইলফলক, বিস্মৃত করার কালো ছোপ দিয়ে ঢেকে দিয়েছে স্মৃতিকে জাগ্রত করার ঐতিহাসিক সব বীজমন্ত্র । পক্ষ-বিপক্ষের ভাগে ইতিহাসের পথগুলো হারিয়েছে উল্টো অর্থে, স্বার্থ উদ্ধারের গণবিরোধী লক্ষ্যে ।

 

ধর্ম, দর্শন, দেশ ও ইতিহাস এবং জীবন ও সংঘবদ্ধতা কিংবা যৌবন ও আড্ডা অথবা চেতনার বিনির্মাণে ঐক্য ও মুক্তি সবই আজ উল্টো অর্থে দুঃসহ অন্ধকারে প্রেতপুরী কায়েম করেছে । তখন তার বিপরীতে জীবিতদেরও জাগতে হবে জীবনবোধের তাড়না থেকেই এবং তা একা নয়, মৃত্যুকে রুখতেই- তাই সম্মিলিত জাগরণের সমকণ্ঠে উচ্চারণ করতে হবে অগ্নিস্পর্শিত স্পর্ধায় । আর যৌবন যখন সৃজন ও যুদ্ধেও, তখন সে যুব-তারুণ্যেকেই শপথের আলো ফেলতে হবে ঢাকা পড়া ইতিহাসের মাইলফলকে । অগ্নিভ সে হলকায় বিস্মৃত মুক্তির পথকে সঠিক অর্থপূর্ণতায় দিতে হবে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দিশা ।

 

ইতিহাসনিষ্ঠ সে বৈজ্ঞানিক দিশা নির্মাণের দায়বদ্ধতার আলো ফেলতেই উঠে এলো বিশ্ববাজারে পণ্য করে ফেলা ‘দেশ’ নামক আমাদের জননী জন্মভূমি-বাংলাদেশ । তাঁর মাতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠাত্রী হওয়া মাত্রই জন্মগত বোধের মূলে জ্বলে উঠলো প্রতিরোধের দুর্দমনীয় যৌবন, অস্তিত্বের প্রখরতায় মৃত্যুকে পরাভূত করার স্বপ্নে উচ্চারিত হলো অহিংস’র দীক্ষামন্ত্র । বিপরীত অর্থে গড়া লক্ষ্যবিমুখতা ভেঙে জীবনকে গড়ে তুললো যাপনের প্রোজ্জ্বলনে, সংঘবদ্ধতার দীপ্তময় দিশা, সুগভীর বিশ্বাসের ভিতে জন্ম নিল আত্মিক বন্ধনের সুদৃঢ় প্রত্যয়, মনুষ্যত্ব । অর্জনের পারস্পরিকতায় সে প্রত্যয় আরো শাণিত হলো সচেতন অনুষঙ্গ আর মানবিক আড্ডায় । যখন আড্ডাগুলো চলমান ঘৃণ্যের অভিশাপ ছিঁড়ে সংজ্ঞায়িত হয়েছে দেশবোধের নতুন সংজ্ঞায়, বিচ্ছিন্ন হয়েও একই আলোকময় দিশায় অখণ্ড । ঐক্যের ডাক এখন মুক্তির অর্থপূর্ণতায় পাল্টা ইশতেহার আর তা আদর্শিক উচ্চারণে ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র দেশ জুড়ে । গণজাগরণের দ্রোহী ঢেউ হয়ে প্রতি জনপদে, শিক্ষাঙ্গনে আর ঘরে ঘরে, জাতীয় প্রত্যশা পূরণে টেবিল থেকে লাইব্রেরিতে । সমাজবদলের শপথে উজ্জীবিত অগ্রসেনারা কলমকেই হাতিয়ার কওে সশস্ত্র হয়েছে, উত্তরণের অগ্রণী পথে সজ্জিত হচ্ছে জ্ঞানতত্ত্বে ।

 

এভাবেই বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষিত আর তার অবিচ্ছিন্নতায় অঙ্কিত আমাদের স্বদেশ সংকট, যৌবনের শর্তবদ্ধতায়, সৃজনের পথপরিক্রমায়, ইতিহাসনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক দিশায়, চলমান জাগতিক জীবনের অন্ধকারময় দুঃসময়কে রুখে মানবমুক্তির ভিত রচনায় আমরা ডাক দিয়েছিলাম চেতনা বিনির্মাণের- সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ধারায় ঘোষণা করেছিলাম- সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানের পাল্টা ইশতেহার আর তাকে বাস্তবায়িত করার প্রশ্নে ইতিহাস নির্মাণের অগ্রনায়ক মহান ছাত্র-যুবদের দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যের প্রত্যয়ে সমকণ্ঠে স্লোগান তুলেছিলাম সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা চাই ।

 

অতঃপর ইতিহাসনির্দিষ্ট এই পথে নেশামুক্ত তারুণ্য পেতে, দেশজ চেতনায় সুস্থ আড্ডা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেয়ার মতাদর্শিক উত্তরণে দুই ফিল্ড ঘোষিত হয় । প্রথম ফিল্ড- জ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত হওয়ার নির্দেশে গন্তব্য হয় পড়ার টেবিল (শুধু পরীক্ষা পাশ নয়, দেশকেও সামনে রাখতে হবে) ও পেপার-পত্রিকা, গ্রন্থরাজি এবং দ্বিতীয় ফিল্ড- গণসংযোগ বা কনভিন্স (পরস্পরকে জানা ও উপলব্ধিগত আত্মিকতায় সংঘবদ্ধ বা মানবিক বোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া) যে পথে আদর্শনিষ্ঠ সুস্থ ধারা বিনির্মাণে গড়ে উঠবে লৌহদৃঢ় সংগঠন ।

 

এককথায়, দেশবদলের দুই ফিল্ড- পড়ার টেবিল ও কনভিন্স । প্রথম ফিল্ড থেকে উৎসারিত জ্ঞানতত্ত্ব এবং দ্বিতীয় ফিল্ড থেকে উৎসারিত সংগঠন । এভাবেই সামাজিক আন্দোলনে ও অবিরত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে দূর হবে নেশা সন্ত্রাস, জন্ম নেবে সচেতন সামাজিক শক্তি (Social Power with knowledge) ।

 

অর্থাৎ জ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন সচেতন সুদৃঢ় সংগঠন । যা রাষ্ট্রিক দলবৃত্তির বিকারগ্রস্ততার অক্ষমতা মোচনে সামাজিক স্বার্থরক্ষাকারী ব্যাপক জনসমাজের নিজস্ব হাতিয়ার । বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণের সংগঠন-কাঠামোয় সংহত ও বিকশিত পথে ব্যাপক সামাজিক রূপে চিহ্নিত ।

 

আগুয়ান সহযোদ্ধাগণ,

সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানের মহতী লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় আস্থা ও শপথবদ্ধতা থেকে মহান সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে আত্মকে লীন করা, ব্যক্তি ভেঙে ব্যাপ্তিতে গড়ে উঠে আদর্শগত অখণ্ডতায় রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় আমরা তিন বছর পেরিয়ে এসেছি ।

 

মতাদর্শিক দিশার জলন্ত মশাল হাতে, শপথের উত্তাপ ও জয়ের অদম্য প্রত্যয়কে পাথেয় করে আমরা বিভ্রান্তির অন্ধকার আর প্রতিকূলতার কূয়াশাপূর্ণ রাত্রির বন্ধুর পথ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছি ।

 

বন্ধুর এই পথচলার অভিজ্ঞানের মশালই আমাদের সম্মুখ চলার পথকে আলোকিত করবে, যৌথ চেতনার শর্তে আজকে এই সম্মেলন কক্ষে সে মশালই আমি আপনাদের হাতে তুলে দেবো, দেশবোধের আদর্শনিষ্ঠ এই ধারা আর তারুণ্যের সদম্ভ পথচলার এই স্পর্ধিত দুঃসাহসের অগ্রযাত্রাকে আরো আগুয়ান, আরো দুর্বার, আরো বেগবান করতে ।

 

বিশেষতঃ গত বছর সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর মাত্র সপ্তাহ দেড়েক আগে তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০০২ কে জরুরি ঘোষণায় তা না করার সিদ্ধান্তের মতো হোঁচটের অভিজ্ঞতা যখন রয়েছে, তখন তার প্রেক্ষিতের অনিবার্য ফল এ জাতীয় সম্মেলনেও রয়েছে । স্বাভাবিকভাবে আজকের এই সম্মেলনের সাথে যৌথ চেতনার সাংগঠনিক শর্ত যতো গভীরভাবে এসেছে, তা ইতোপূর্বের সম্মেলন থেকে আলাদা গুরুত্ব বহন করে ।

 

সংকট ও সাফল্য দুই-ই অর্জনের মধ্যে সাফল্যের চেয়েও গড়ে ওঠার প্রশ্নে বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা থাকে- সমস্যা বা সংকট আবর্তিত প্রতিকূলতার মধ্যে সাফল্য যেমন অহংকারের অন্ধত্ব না হয়ে প্রেরণার উৎস হয়, তেমনি সংকট বা সমস্যা আমাদের হতাশ, হীনমন্য না করে বরং শিক্ষণীয় দিশা হয়ে এগিয়ে দেয় । সর্বদাই অহংবোধ এবং হতাশা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার শপথ একজন প্রকৃত সংগঠক হওয়ার মূল শর্ত । সংকট যেমন সংগঠককে চিনিয়ে দেয় এবং তাঁকে গড়ে তোলে, তেমনি সাফল্য তার সাংগঠনিক চরিত্রকে বিষিয়ে দিতে পারে । সমস্যার সময় মনে রাখতে হবে- আমাদের জন্ম সমস্যা সমাধানের জন্য, নিজের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য নয় । আমরা যেন সর্বদাই সমাধানের জন্য তথা ঐক্যতাকে দৃঢ়বদ্ধ করার প্রশ্নে নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করাতে পারি ।

 

কিন্তু এ-পর্যায়ে সংগঠনের যেহেতু গড়ে ওঠার কাল, তার মানেই তা সংকটকালীন এবং সংগঠক হিসেবেও যেহেতু গড়ে ওঠার সময়, তাই সংকটের ফাঁদে পড়ে হাত-পা ছোঁড়া তথা সমাধানকারী না হয়ে নিজেকে সমস্যা হিসেবে দাঁড় করানোর সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে । তাই সতর্ক হওয়ার চর্চাটাও বেশি থাকতে হয় এবং কখনো সমস্যার প্রতিমূর্তি না হয়ে যেন সমাধানের দৃষ্টান্ত হই । এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নিজেদের এগিয়ে তথা গড়ে তোলার প্রশ্নে যেখান থেকে শিক্ষা আসে, সেই সমস্যাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছি । সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকটের ক্ষেত্রে আত্মকেন্দ্রিকতাই মূল সংকট এবং বাহ্যিক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বড় সমস্যা । উভয় ক্ষেত্রেই তা সমাধানের একমাত্র পথ মতাদর্শিক স্বচ্ছতা অর্থাৎ সাংগঠনিক সমস্যার সমাধান সংগঠনগতভাবেই হবে- ইতোপূর্বে ঘোষিত এই প্রত্যয়, যার অর্থ দাঁড়ায় সাংগঠনিক সংকটের মীমাংসা মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাংগঠনিক পথেই দিতে হবে- ব্যক্তি-ইচ্ছা বা নিজের মতো করে নয় । কিংবা বাহ্যিক পেপার-পত্রিকা বা সংগঠন বহির্ভূতের বিতর্কমূলক সন্দেহভিত্তিক কুটিল বাচালতা থেকেও সংগঠন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়া নয় ।

 

আদর্শগত ধারার প্রায়োগিক দিক

 

বর্তমানে সংগঠনগত সমস্যা সমাধানে মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করে সংগঠনগত পথে মীমাংসা দেয়ার বস্তুনিষ্ঠ সে ঘোষণা শুধু কথাই থেকে গেছে- প্রয়োগ হয়নি । বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান মতাদর্শিক প্রতিনিধিত্বে থাকা অথোরিটিগণ নিজের মতো করে দিয়েছেন । ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ থেকে, সংগঠনগতভাবে নয় । যদিও আমরা জানি, সংগঠন কোনো ব্যক্তি-ইচ্ছা দ্বারা গড়ে ওঠেনি । তা ব্যক্তি-ইচ্ছা দ্বারা চালিতও হতে পারে না বরং সংগঠন গড়ে উঠেছে সামাজিক বিকাশমান ধারায় ইতিহাসনিষ্ঠ বিশ্লেষণ থেকে, মতাদর্শকে ভিত্তি করে । অর্থাৎ সংগঠন যেহেতু ব্যক্তি দ্বারা নয় মতাদর্শ দ্বারা গড়ে উঠেছে, তাই তার সমস্যার সমাধানও মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিকে মানদণ্ড করে সংগঠনগতভাবে হতে হবে, নিজের মতো করে নয় । তাছাড়া সংগঠন মানেই ব্যক্তি-ইচ্ছা, ব্যক্তি চেতনার বিরুদ্ধে সমষ্টির চেতনা এবং যেহেতু আত্মসর্বস্বতার বিরুদ্ধেই মতাদর্শিক পথের জন্ম হয়েছে, সুতরাং সংগ্রামটাও হবে সেই পথে । তাহলে কী করে সাংগঠনিক সংকটের মীমাংসা মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংগঠনগতভাবে না হয়ে ব্যক্তি-ইচ্ছা বা নিজের ইচ্ছার মতো হতে পারে? আর ব্যক্তিমত মানেই দশজনের দশ মতের দ্বন্দ্ব অনিবার্য, সেখানে লবিং-গ্রুপিং এবং অনৈক্যতাই আসবে । অনৈক্যতা বা সংগঠনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমত তাই ভয়ানক সংগঠনবিরোধী, কিংবা সংগঠনকে ক্রমশঃ কলহের মধ্যে ঠেলে বিপর্যস্ত করে তোলে । সাংগঠনিক সমস্যার সমাধান সংগঠনগতভাবে না হয়ে নিজের মতো করে করলে সমাধানের চেয়ে সমস্যা আরো বাড়তে থাকবে । অনেক সময় মনে হতে পারে, বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে মতাদর্শগত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে একটা কাজ করলে সংগঠনের জন্য ভালো হবে, অথচ তা যদি আদর্শগত মৌলিক সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিপরীতে হয়- তবে দৃশ্যত যে ভালোটুকু আজ সংগঠনের জন্য হলো, আগামীতে ঐ ভালোটুকু সুদে-আসলে মন্দের ভয়ংকর তাণ্ডব হয়ে বেরুবে । সুতরাং প্রতিটি ঘটনার প্রতিটি বিষয়ে মতাদর্শিক মানদণ্ডের বিশ্লেষণপূর্বক সাংগঠনিক চেতনা (নীতিগতভাবে ঐক্যের লক্ষ্যে বা সংগঠিত হওয়ার স্বার্থে) দ্বারা চালিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোনো অবস্থাতে নিজের মতো করে ভাবা বা ব্যক্তি-ইচ্ছা তাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না ।

 

মনে রাখতে হবে, মতাদর্শ হলো নীতি এবং সংগঠন হলো সেই নীতি প্রয়োগের ফল । কিংবা মতাদর্শ বীজ এবং সংগঠন তার অঙ্কুরোদ্গমিত রূপের বৃক্ষে পরিণত হতে পথচলা । কনভিন্স ও বইয়ের টেবিল হলো তার বীজতলা । এককথায়, নীতিগত দিশা হলো মতাদর্শ এবং প্রায়োগিক দিক হলো সংগঠন । নীতি বা মতাদর্শগত দিককে অস্বীকার করে যে সংগঠন, তা আসলে সংগঠন নয়- ব্যক্তিবাদের ক্ষণস্থায়ী তাড়না থেকে গড়ে ওঠা ক্ষণস্থায়ী গ্রুপ বা ডেরা । বীজ ছাড়া যেমন বৃক্ষ হয় না, তেমনি মতাদর্শ ছাড়া সংগঠন বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না ।

 

এই নীতির রূপই হলো অথোরিটি আর তাই অথোরিটি নীতি বা মতাদর্শেরই প্রতিনিধিত্ব করবেন । নিজের মত বা ব্যক্তি-ইচ্ছার নয় । তার মূল কাজই ব্যক্তিবোধ, আত্মকেন্দ্রিকতাকে ভেঙে নীতিগত, আদর্শগত অখণ্ডতায় সুদৃঢ় সংগঠন (ঐক্যে) গড়ে তোলা ।

 

কিন্তু আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম- মতাদর্শের প্রতিনিধিত্বের আসনে (ব্যক্তিচেতনা বিরোধী সত্তা) আসীন অথোরিটিগণ তাঁদের নিজেদের মতো করে প্রতিটি বিষয়ের বিশ্লেষণ করছেন (সাংগঠনিক চেতনাগত জায়গাটা মতাদর্শিক উপলব্ধিতে প্রয়োগগত ক্ষেত্রে পরিষ্কার না হওয়ার জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি আসলেই তাঁরা অনেকটা বাধ্য হয়েই এমনটা করছেন) এবং সংগঠনের সমস্যার সমাধান দিচ্ছেন, যা সংগঠনকে মতাদর্শগত ভিত্তির উপর দাঁড় না করিয়ে আবেগসর্বস্ব সদিচ্ছা তাড়িতদের ঝাঁক হিসেবেই আমাদের গড়ে তুলছে । যে কারণে ক্রমশঃ সংগঠন বাড়ার সাথে সাথে সমস্যা বাড়ছে এবং তা সমাধানে সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছে । কারণ ব্যক্তি অবস্থান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত কখনো সামগ্রিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, বড়জোর আপাত সমাধান দিতে পারে । একটা রোগ নির্মূলের বদলে সে রোগটাকে পুষে রাখলে পরবর্তীতে তা যেমন মরণব্যাধিতে রূপ নেয়, তেমনি এই নিজের মতো করে সমাধান দিয়ে ক্রমশঃ তা মরণব্যাধির রূপ নিচ্ছে । সংগঠনে এটাই এখন মূল ও ভয়ানক সমস্যা । নীতিগত (অথোরিটি) ক্ষেত্রেই বড় রকমের ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে অর্থাৎ যে সরষে দিয়ে ভূত তাড়াবো, সেই সরষের মধ্যেই ভূত । যাঁরা ব্যক্তিমতের ভূত ধ্বংস করবেন, খোদ সেই অথোরিটিদের মধ্যে এখনো তা রয়ে গেছে । কেন্দ্র থেকে ফিল্ড পর্যন্ত এ ঘটনা ঘটছে । এটা তাঁরা করছে অজ্ঞাতে । মতাদর্শিক উপলব্ধি বা আদর্শগত পথ সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে কিংবা পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা থেকে ।

 

কিন্তু তৃতীয় জাতীয় সমাবেশ-২০০২ না হওয়ার ফলশ্রুতিতে সংগঠনের মধ্যে কিছুদিনের জন্য স্থবিরতা এলেও পরবর্তীতে আঞ্চলিক স্তরে আঞ্চলিক কর্মশালা সমূহ এবং জাতীয় স্তরে দ্বিতীয় জাতীয় কর্মশালার পর নতুনভাবে সংগঠনের প্রাণোন্মদনার সৃষ্টি হয় । এই প্রসারমান ধারাকে স্থায়িত্ব দিতে পারে শুধু মতাদর্শগত স্বচ্ছতা বা সাংগঠনিক চেতনা । সদিচ্ছা বা ভালোবাসা প্রাথমিক শর্ত হলেও স্থায়িত্বের প্রশ্নে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে একাত্ম হয়ে ওঠার মূল শর্ত মতাদর্শগত স্বচ্ছতায় গড়ে ওঠা সাংগঠনিক চেতনা । ফলে অস্তিত্বের প্রশ্নে, স্থায়িত্ব ও জয়ের প্রশ্নে প্রথম এই মূল মানদণ্ড অর্থাৎ আদর্শগত স্বচ্ছতা দরকার । তাছাড়া সংগঠনে যতো প্রকার সমস্যা তা মূলতঃ এই সংকট থেকেই আনুষঙ্গিক সমস্যা হিসেবে এসেছে । আর তাই এ-বিষয়টা স্পষ্ট হলে সংগঠনগতভাবে অন্যান্য সমস্যার সমাধান ধীরে ধীরে হয়ে যাবে । আদর্শিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গে প্রথমেই মূল বিষয়টাকে গভীরভাবে বোঝা দরকার । যদিও গত দ্বিতীয় জাতীয় সমাবেশের রিপোর্টে অথোরিটিআদর্শগত দিকের সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছিল । এবার তার প্রায়োগিক অর্থাৎ সংগঠনগত দিকটাকে তুলে ধরা হলো ।

 

মতাদর্শিক নির্ভরতার প্রেক্ষাপট

 

সংগঠন যদি মতাদর্শগত নির্ভরতার পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে গড়ে ওঠে বা উঠতে থাকে, তবে তা কখনো স্থায়িত্ব পেতে পারে না । কারণ যা ব্যক্তিনির্ভর, তা ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেই ভেঙে যায় এবং ব্যক্তি-ইচ্ছায় ও তার মন-মর্জি মাফিক চলতে থাকে । সমকালীন বাস্তবতায় তা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের দালালিবৃত্তির কিংবা ব্যক্তির লালসাপূর্ণ খায়েশ মেটানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়, সমাজ বা সামগ্রিক স্বার্থে নয় । আর তখন সেই সংগঠনের সভ্যরা মানুষ, মনুষ্যত্ব, সমাজ ও সামগ্রিকতার লক্ষ্যে কাজ করলেও অজ্ঞাতে ব্যক্তির দালালী বা ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের খোঁয়াড়ে ভেড়ায় রূপান্তরিত হয় । আর ভেড়া সর্বদা সম্মুখে থাকা ভেড়াটির পশ্চাদভাগ অনুকরণে পিছন পিছন চলে, পথ দেখে চলে না । চলমান রাজনৈতিক দলবৃত্তিতে প্রায়শই এমনটা দেখা যায়, অমুক ভাই যেখানে- আমরা আছি সেখানে । ‘অমুক ভাই’ আজ এখানে তো কাল ওখানে, ভেড়ার পালগুলোও যথারীতি সেই কদাকার শব্দে চলতে থাকে । এমন-কি বিপ্লববাদ সহ এরূপ বহুবাদের খোঁয়াড়েই (যেখানে পথ চেনাটা অনিবার্য) এই ভেড়াদের ভীড়, যারা পথটা পর্যন্ত জানে না, লক্ষ্যটাও ঠিকমতো বোঝে না, তবে এরা ভেড়ার অনুকরণের চরিত্র পেলেও কখনো শিং গজিয়ে ষাঁড়ের মতো হাম্বা স্বরে বিপ্লবের চিৎকার তোলে কিংবা মুখে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ তুলে নতুন দিনের চাষে মাটি খোঁড়ে ।

 

তারুণ্য মানেই উন্মাদনা, সৃজন অথবা ধ্বংস, কিংবা সর্বক্ষেত্রে তারাই অগ্রগামী । ফলে এই উন্মাদনার টানে তারা খোঁয়াড়ের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকে । চেতনাবর্জিত মানুষের আত্মবোধ কিংবা নৈতিক বোধ গড়ে ওঠে না । যে কারণে অভাবের তাড়নায় নিজেকে বিকিয়ে দেয় । অথবা হাত পেতে ভিক্ষা করতেও পারে কিংবা অতিরিক্ত অর্থ এলে সে হাতে নেশা উঠে আসে । উৎস সেই একই, অর্থাৎ- চেতনা । জীবনের বাস্তবতা তাদের আজকের পতনের পথে আনলেও চেতনাগত প্রভাবটাই একে এত দ্রুত পচনের স্তরে এনে ফেলেছে । যে কারণে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের পথের চেয়েও শিকার বনে যাওয়ার কদর্য পথেই তারা যাচ্ছে । অবক্ষয় ও নৈতিকতার চরম ধ্বসের প্রতিরোধে যখন আদর্শিক ধারা গড়ার শপথ অর্থাৎ চেতনা গড়ে তোলার মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ডাক দিলাম, তখন প্রথম শপথ হিসেবে তাই ঘোষিত হয়েছিল-পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান মহান স্রষ্টার জিম্মায় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিয়ে মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিসংগ্রামে (আন্তর্জাতিক, বিশ্বব্যাপী), দেশ ও মাতৃভূমির স্বার্থে (জাতীয়, দেশজ) সংগঠন ও আদর্শের কাছে নিজেকে (আত্মকে) উৎসর্গ করলাম ।

 

অর্থাৎ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যক্তিনির্ভরতার বদলে সাংগঠনিক ও আদর্শিক নির্ভরতা এবং আত্মকে ভেঙে সমষ্টির চেতনায় একাত্ম হওয়ার শপথ দিয়ে সংগ্রাম শুরু হয় । যে কারণে আমরা বলি, দেশীয় আবর্ত বদলের সংগ্রাম শুরু হয় নিজেকে বদলের মধ্য দিয়ে, পরিবর্তনের সদিচ্ছা বা শপথ প্রকাশিত হয় নিজেকে অবিরত পরির্বতন করার মধ্য দিয়েই- যা পরিবার, দাম্পত্য সহ জীবনের সর্বদিক ব্যাপ্ত করে একান্ত জীবন থেকে শুরু হয়ে তা উত্তরণের পথে ক্রমশঃ পূর্ণতা পায় সামাজিক জীবনের বদলের মধ্য দিয়ে । আর তাই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম বলতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনে সম্পৃক্ত সবকিছু নিয়েই সাংস্কৃতিক (চেতনা বিনির্মাণ) সংগ্রাম । ধর্ম, দর্শন, রাষ্ট্রিক, সামাজিক ইত্যাদি জীবন সম্পৃক্ত সকল দিক সহ জ্ঞানশাখার প্রতিটি বিষয়ই যার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । আর তা কখনোই ব্যক্তিনির্ভর বা ব্যক্তি ইচ্ছাধীন হতে পারে না । যা সমাজ সম্পৃক্ত তা সমাজ বিকাশের ধারায় ইতিহাসনিষ্ঠ বিশ্লেষণে আসতে পারে, আর সে দিশা বা পথ ব্যক্তি ইচ্ছাধীন নয় বরং ইতিহাসনির্দিষ্ট, সমাজসংশ্লিষ্ট । সমাজ যেহেতু ব্যক্তি-ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবে নির্দিষ্ট ধারা নিয়ে গড়ে উঠেছে, তা বদলের দিশাও সেই সামাজিক ধারাই দিতে পারে । ব্যক্তি নয় (কারণ ব্যক্তির বয়স ও স্থায়িত্ব- সর্বোচ্চ গেলে পঞ্চাশ থেকে সত্তর বছর, কিন্তু সমাজ হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে), যা সমষ্টির- তা বদলাতেও সামষ্টিক (সংগঠন) হতে হয় এবং যা সামাজিক ধারা সংশ্লিষ্ট, তা সামাজিক ধারা থেকেই উৎসারিত (দিশা বা মতাদর্শ) হতে হয় । কেউ জল বলছে, কেউ পানি বলছে, একজন আরেকজনের মতো করে বললেও বলতে পারে, নাও বলতে পারে কিংবা কেন বলবে? কিন্তু যখন H2O বা বৈজ্ঞানিকতায় যাবে- তখন সচেতনরা একমত হবেই । এভাবেই বিজ্ঞাননিষ্ঠতা, ব্যক্তি-ইচ্ছা নিরপেক্ষ ঐকমত্যের দিশা । সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে ঐক্যের ডাক ব্যক্তি-ইচ্ছায় নয় বরং সমাজ বিশ্লেষণেই গড়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক দিশা বা মতাদর্শ হিসেবে । যে কারণে ব্যক্তি নয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক-ব্যক্তিনির্ভর পঙ্গুত্ব ঝেড়ে মতাদর্শে লীন হওয়ার নির্দেশই শপথ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে ।

 

সুতরাং ব্যক্তিকেন্দ্রিক-ব্যক্তিনির্ভরতার পঙ্গুত্বে আত্মস্বার্থে গড়ে ওঠা দলবৃত্তির খোঁয়াড় থেকে তারুণ্যকে মুক্ত করার প্রশ্নে মতাদর্শগত সঙ্ঘবদ্ধতা ছাড়া কোনো পথ নেই ।

 

উপসংহারে সংগঠন বা মতাদর্শে লীন হওয়া মানে কখনোই স্বকীয়তা বিসর্জন নয় বরং সাংগঠনিক আদর্শনিষ্ঠ মনুষ্যত্ব বোধের উন্মেষে প্রকৃত স্বকীয়তাকেই গড়ে তোলা । সাংগঠনিক চেতনায় মতাদর্শগত পথে লীন হয়ে আমরা স্বকীয় অখণ্ডতা বা সঠিকতা অর্জন করি কথার অর্থ মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি বা মানদণ্ড অর্জন করা, যখন নিজের চলা বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলি আমার মতো না হয়ে বরং আমিত্বটা মরে সাংগঠনিক বা আদর্শিক আমিত্বের জন্ম হয় । তখন দেশের একপ্রান্তে এক সাথী সাংগঠনিক সমস্যায় যে মীমাংসা দিচ্ছে বা যে পথে ও পদ্ধতিতে দিচ্ছে তাঁর সাথে, যাঁর দেখা হয়নি সেই সাথীর সিদ্ধান্ত ও জীবন চলার পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম হচ্ছে । ঠিক যেমন- পাঁচ কেজি বাটখাড়া দিয়ে দেশের একপ্রান্তে একজন লোক যে পরিমাণ চাউল দেয়, তার চির-অদেখা দেশের অন্য প্রান্তে থাকা পাঁচ কেজির বাটখাড়ায় যে পরিমাণ চাউল দেয়, তা ঠিক একই রকম হয় । সেখানে তার দৃষ্টিভঙ্গির মান- তার ব্যক্তি-ইচ্ছা নয় বরং ইচ্ছানিরপেক্ষ পাঁচ কেজির বাটখাড়া ।

 

তেমনি নিজেকে আদর্শে লীন করলে সে নিজেই আদর্শ হয়ে পড়ে । অর্থাৎ আমার আদর্শ আমার মতো কথাটা স্বার্থক হয়ে পড়ে । তাঁর মধ্যে যে স্বকীয়তার জন্ম নেয়, সেখানে ব্যক্তিবোধের পলকা ব্যক্তিত্বের চেয়েও বেশি আদর্শিক । তখন তাঁর সে স্বকীয়তা হয় ঠিক মতাদর্শের মতো আর তাঁর উদারতা মহৎ দৃষ্টান্ত হয়ে, ব্যক্তি নয় বরং নিজেই হাজার মানুষের সঙ্ঘবদ্ধতার রূপ হয়ে পড়ে । তাঁর কষ্ট হয় হাজার হাজার মানুষের কষ্ট, তাঁর নির্দেশ ও ডাক হয়ে ওঠে হাজার বছরের প্রতীক্ষিত আর প্রত্যাশা পূরণে, কারণ তিনি তাঁর ষাট/সত্তর বছরের ব্যক্তি জীবনকে ধ্বংস করে সেখানে শত শত বছর ধরে চলে আসা সমাজগত জীবনধারাকৃত উপসংহার তথা আদর্শকে জন্ম দিয়ে আদর্শিক হয়ে পড়েছেন । যাঁর নির্দেশ ও জীবনচরিত মানে তার আদর্শিকতারই প্রতিফলন । নিজেকে ধ্বংস করেই সে শূন্যস্থানে আদর্শ তথা হাজার হাজার মানুষ বা মনুষ্যত্বকে স্থান দিয়ে যেমন তিনি আর ব্যক্তি নন- সমষ্টি, তেমনি তাঁর মধ্যে নিজেদের প্রত্যাশিত জীবনের প্রতিবিম্বিত রূপ পেয়ে কোটি জনতাও আর বিচ্ছিন্ন নয় বরং তাঁর মধ্যে ও মাধ্যমে অখণ্ড । অর্থাৎ পারস্পরিক একাত্মতার উত্তরিত রূপ হিসেবে তিনি যেমন কোটি জনতার মধ্যে ও কোটি জনতা তেমনি তাঁর মধ্যে লীন হয়ে রূপান্তরিত হন একই সত্তায়, যাকে আমরা বলি- One Body । নিজের মধ্যে যদি আত্মই ঠেসে থাকে, সেখানে অন্যদের জায়গা একজন দেয় কী করে? যদিও মানুষের জীবন যখন সংকটপূর্ণ, বিপর্যস্ত তখন তারা আশ্রয় খোঁজে । মগজজাত চাতুর্যতায় তাদের সেই সংকটের সুযোগ নিয়ে কাছে হয়তো টানা যায়, কিন্তু ইতিহাস বা আদর্শিক কি হওয়া যায়? যাকে দেখে মানুষ মনুষ্যত্ব অর্জনের দৃষ্টান্ত হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে? আর তাই আদর্শিক হওয়া মানে আত্মকে ধ্বংস করে সেখানে সমষ্টিকে জন্ম দেয়া । সমষ্টি সেখানে প্রতিফলিত মতাদর্শ রূপে, অর্থাৎ মতাদর্শে লীন হওয়ার সংগ্রামেই সে হবে কোটি জনতা আর সে-ই তখন সার্থক অথোরিটি ।

 

অনাগত সেই ব্যাপক রূপ বা সার্থক অথোরিটির গড়ে ওঠার প্রাথমিক স্তর বা সূতিকাগার হলো অথোরিটি-অনুগামীর পারস্পরিক সম্পর্ক, যা সংগঠনের ইউনিট পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্রই ।     

 

এক্ষেত্রে অথোরিটি নিজেকে লীন করার প্রক্রিয়ায় নিজের মধ্যে অনুগামীদের মতকে ধারণ করে সব আলোচনা শেষে তিনি যখন কথা বলেন বা সিদ্ধান্ত জানান, সেখানে সব অনুগামী তাঁর কথার প্রতিফলিত স্বর শুনতে পারেন । এক্ষেত্রে অথোরিটি মতাদর্শিক প্রতিনিধিত্বে আদর্শকেই হাতিয়ার করে তাদের সম্মিলিত মতকে সমন্বয়ের জায়গায় নিয়ে আসেন অর্থাৎ তিনি বাদ (Thesis), প্রতিবাদ (Anti-Thesis)-এর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের পর ঐক্যের সিদ্ধান্ত বা যে স্তর, অথোরিটি সেই সম্বাদ (Synthesis)-এর প্রতিমূর্তি । মতাদর্শ মূলতঃ সম্বাদ (Synthesis)-কেই প্রতিফলিত করে এবং অথোরিটি সেই সম্বাদরূপী মতাদর্শের মূর্ত রূপ । সেই অর্থে চলমান ঘৃণ্য সমাজ, যা আমরা বদলাতে চাইছি, সেই ঘৃণ্য চেতনা (সাধারণ চেতনা)-কেই আমরা বাদ বা Thesis ধরেছি এবং তা থেকে বিচ্যুত হয়ে সাংগঠনিক বা মতাদর্শের চেতনা ধারণ করার পথে যে লড়াই, তাকে আমরা প্রতিবাদ বা Anti-Thesis ধরেছি । আর এই Thesis এবং Anti-Thesis বা বাদ-প্রতিবাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে তাঁরা যখন ও যতোক্ষণ ঐক্যের চেতনায় স্থিত হয়, ততোক্ষণ তিনি বা তাঁরা সম্বাদ বা Synthesis । আর এই Synthesis-এর রূপই ঐক্যের বা সাংগঠনিক চেতনা তথা মতাদর্শিকতা । আর যেহেতু সম্বাদ বা Synthesis-এর মূর্ত রূপ অথোরিটি, তাই যতোক্ষণ একজনের মধ্যে সাংগঠনিক বা ঐক্যের (Synthesis) চেতনা যতো দৃঢ়ভাবে আছে, ততোক্ষণ ততো দৃঢ়ভাবে তাঁর ভিতর অথোরিটি থাকে এবং যতোক্ষণ সে ঐক্যের চেতনা থাকে না বা দূরে ও বিপরীতে অবস্থান করে, ততোক্ষণ অথোরিটির অবস্থানও তাঁর কাছে বিরোধী বা দূরের মনে হতে থাকে । একইভাবে যখন অথোরিটি, Synthesis বা সম্বাদের (মতাদর্শ) প্রতিনিধিত্ব না করে ব্যক্তিতে বা বাদ-প্রতিবাদের স্তরে নেমে যায় তখন Synthesis এর জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায় । ফলে ঐক্যতার নিশ্চয়তা বর্জিত সংগঠন হয়ে পড়ে অরক্ষিত বা তলাবিহীন ঝুড়ি । সুতরাং অথোরিটি সর্বদাই সম্বাদ বা মতাদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী ভূমিকায় ব্যক্তিমতকে ধ্বংস করে সম্মিলিত মতকেই নিজের মধ্যে স্থাপিত করে হয়ে ওঠেন সামগ্রিক সত্তা বা সংগঠন । এবং অনুগামীদের ক্ষেত্রে, তাঁরা কোনো কিছু না বুঝলেও (বিশেষতঃ সংগঠনের ভিতর বিভ্রান্তিকর অবস্থা শুরু হলে) যতোক্ষণ নিজের মধ্যে অথোরিটির জায়গাটা স্থিত ও দৃঢ় থাকে ততোক্ষণই তিনি সাংগঠনিক । এজন্যই বলা হয় ‘কে সংগঠন করে কিংবা না করে অথবা কে সংগঠনের মিত্র ও শত্রু এমন-কি নিজের মধ্যেও কতোটা সংগঠন আছে, তার একমাত্র মানদ এ-পর্যায়ে অথোরিটি ।’ আর এভাবেই তিনিও হয়ে ওঠেন সংগঠন (Synthesis) । অর্থাৎ পারস্পরিক একাত্মতার উত্তরিত রূপে তখন অথোরিটি অনুগামী হয়ে ওঠেন একই সত্তা অর্থাৎ Synthesis বা সম্বাদ । মতাদর্শ বা সাংগঠনিক চেতনায় স্থিত ও দৃঢ় বা One Body হওয়ার এই প্রক্রিয়ার স্তরই ক্রমশঃ রূপান্তরিত হবে কোটি জনতায় অর্থাৎ সামগ্রিক সমাজে ।

 

চেতনা বিনির্মাণে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এই প্রক্রিয়ায় অথোরিটি হলো প্রাণসত্তা এবং অনুগামী হলো দেহসত্তা অর্থাৎ প্রাণ ছাড়া দেহ যেমন মৃত আর মৃতদের জন্য সংগ্রাম নয়, তেমনি দেহ ছাড়া প্রাণ হলো প্রেতাত্মার মতো, যা জীবিতদের জন্য অশুভ বা অমঙ্গলের বার্তাবাহক । জীবিতদের জন্য জীবন্ত যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের হাতিয়ার বা সংগঠন হবে- এই দুই মিলে One Body । এই পর্যায়ে ইউনিট হলো তার সূতিকাগার ।

 

সুতরাং নিজের মতো করে নয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিনির্ভরতাও নয় বরং মতাদর্শিক নির্ভরতায়- সাংগঠনিক চেতনায় দৃঢ়বদ্ধ ও চালিত হতে হবে ।

 

প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত

 

অহিংস পথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেয়ার লক্ষ্যে ঘোষিত পথ ওমতাদর্শ অনুযায়ী অর্থ দাড়াঁয় বাইরে থেকে হিংসার পথে তাকে উচ্ছেদ করা নয় কিংবা চাপিয়ে দেওয়া নয় বরং ভিতর থেকেই সাংস্কৃতিক পথ ধরে তাকে নির্মূল করা । যেহেতু সংস্কৃতি একেকদেশের একেক রকম ভূ-প্রাকৃতিক বা স্থান-কালীক আবহের মধ্যে জনগোষ্ঠিগত জীবনধারা থেকে উৎসারিত বা স্বতন্ত্র, তাই মতাদর্শ বৈশ্বিক হলেও প্রায়োগিকতায় অবশ্যই দেশজ বাস্তবতায়  স্বকীয় বা স্বতন্ত্র হতে বাধ্য ।

 

সুতরাং স্পষ্টতই চলমান সমাজ আমরা বদলাতে চাই এবং তা ভিতর থেকে, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের উত্তরিত পরিণতিই যার বদলের অনিবার্যতাকে ঘোষণা করে । যা ব্যক্তি জীবন থেকে সেই বদলের শুরু হয়ে এই ধারা সামাজিক বদলের রূপ পরিগ্রহ করে ।

 

এই অর্থে, চলমান সমাজের আর্থ-সামাজিক তথা ব্যক্তি মালিকানাধীন ভিত্তি থেকেই উৎসারিত যে চেতনা অর্থাৎ সামাজিক আবর্ত (Superstructure বা সংস্কৃতি) আত্মসর্বস্ব ব্যক্তিচেতনার বাহক, যাকে আমরা সাধারণ চেতনা বলি এবং তার বিপরীতে বিনির্মীয়মান ধারায় আমরা যে কাঙ্ক্ষিত সমাজ গড়ে তুলছি কিংবা ভিতর থেকে জন্ম দিচ্ছি, তাকে সাংগঠনিক নির্ভরতায় বিশেষ চেতনা (মতাদর্শ ভিত্তিক) বা সাংগঠনিক চেতনা বলছি । সুতরাং চলমান ঘৃণ্য সমাজের সাথে বৈশিষ্ট্য ও সম্পর্কে জীবন ও যাপনের সামগ্রিক দিক থেকেই লক্ষ্যগতভাবে আমরা ভিন্ন ও বিপরীত ।

 

একদিকে চলমান সমাজ এবং তার ভিত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন আর্থিক ব্যবস্থা ও তার আবর্ত আত্মসর্বস্ব ব্যক্তিবোধ, অন্যদিকে তার বিপরীতে আমরা মতাদর্শগত ভিত্তিকতায় সামাজিক ও তার আবর্ত সামষ্টিক, পারস্পরিক মানবিকবোধে সমগ্র ।

 

জঙ্গলে বাস করলে একজন মানুষ যেমন তার জীবনচরিতে জংলিত্বই প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি এই চলমান সমাজে জন্ম বলেই তার আবর্তগত ধারায় আত্মকেন্দ্রিক, আত্মসর্বস্বতার মতো অনেক ঘৃণ্যতা আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রতিফলিত হবেই । যেহেতু এই সমাজের মধ্যেই আমাদের আগামী সমাজ, সংগঠনকে আধেয় করে আমাদের মধ্যে সাংগঠনিক সম্পর্ক, পারস্পরিক মনুষ্যত্ববোধের উন্মেষে সামষ্টিক চেতনাকেই প্রতিফলিত করবে । ফলে সমাজে জন্ম নেয়ার ফলশ্রুতিতে আমাদের মধ্যে চলমান ঘৃণ্য চেতনা পরিবর্তনের শর্তে মতাদর্শে লীন হওয়ার শপথ নেয়ার মানে এক অর্থে পুনর্জন্ম (চেতনাগত অর্থে) হওয়া । 

 

এখানে মতাদর্শের মূর্ত রূপ অথোরিটি বিধায় মতাদর্শ যেমন মাতৃরূপ বা জন্মদাত্রী, সেহেতু তার মূর্ত রূপ অথোরিটিগণও মাতৃসম আসনে আসীন । অর্থাৎ অথোরিটি ও অনুগামীর সম্পর্ক মা ও সন্তানের সম্পর্ক এবং অনুগামীদের পারস্পরিক সম্পর্ক হয়ে যায় সহোদরসম আত্মিকতাপূর্ণ ।

 

প্রচলিত সমাজের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক (দ্বন্দ্বের নয়) মা ও সন্তানের, তেমনি মায়ের একই উদর থেকে জন্ম নেয়া বলে মায়ের শর্তে পরস্পরের সবচেয়ে আপন ও আত্মিক সম্পর্ক সহোদর বা সহোদরাগণ ।

 

সাংগঠনিক চেতনায় অনুগামীরা অথোরিটির চেতনা প্রসূত (সাংগঠনিক ধারায়) সন্তান, মায়ের ক্ষেত্রে উদর অর্থাৎ শরীর, ওভাবে পশুও জন্ম নেয় কিন্তু সংগঠনের ক্ষেত্রে উদর নয় চেতনা বা মনন, যা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই সম্ভব । মানুষ ও মনুষ্যত্ব অর্থাৎ মননগত সৃজনে সচেতন সংগ্রামেই তা সম্ভব । উদরে কাটে দশ মাস দশ দিন, কিন্তু আদর্শগত এই ধারায় শপথ থেকে চলে আমৃত্যু এবং জীবনের সামগ্রিকতায় । যে জন্য বলা হয়, যেখানে আমি মানুষ, সেখানেই আমার মনুষ্যত্বের জন্য সংগ্রাম, যেখানেই মনুষ্যত্ব আমার সংগ্রামী অস্তিত্বে, সেখানেই আমি অথোরিটির চেতনা প্রসূত সন্তান এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবন নিয়েই আমার এই সংগ্রাম ।

 

ওখানে বলা হয়, জীবনের একটি সম্পর্কের মানদণ্ডে মা কিন্তু এখানে মতাদর্শগতভাবে জীবনের সামগ্রিক সম্পর্কের প্রতিরূপ সত্তা এবং সংগঠনগতভাবে বলা হয় অথোরিটি

 

ফলে সামগ্রিক জীবনে মূলতঃ যে পাঁচটি সম্পর্কের মধ্যে সে অতিবাহিত করে অর্থাৎ সন্তান, ভাই/বোন,বন্ধু, স্বামী/স্ত্রী এবং বাবা/মা, তারা সবাই দেহগত সর্ম্পকের শর্তে একেক জন এক একটি রূপেই আটকে থাকে অর্থাৎ সম্পর্কগুলো যদি সুতো হয়, তাহলে একেকজন একেকটি সুতোর বন্ধন দিয়েই টানতে পারে কিন্তু বিপরীতে অথোরিটি সামগ্রিক জীবনের (চেতনাগত বোধের বন্ধনে) সম্পর্কে সম্পর্কিত বলে, তা সব সম্পর্কের সুতোর গুচ্ছ যা স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী, সেই পুষ্ট দড়ি (ব্যক্তি সম্পর্কের মতো নয়) দিয়ে টান দেয় । যখন সংগ্রামের পথে এই আদর্শিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তখন সে খুব সহজেই একজনকে যেমন করে পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে দিতে পারে (যা আমরাকরছি), তেমনি আদর্শের প্রশ্নে সংগ্রামের পথে বেরও করে আনতে পারে, এটার প্রমাণ ইতিহাসে অসংখ্য আছে । মা/বাবা, ভাই/বোন, বন্ধু, স্বামী বা সন্তান এদের জন্য ক’টা জীবন শহীদ হয়েছে, আর অথোরিটি বা সত্তার প্রশ্নে কতোজন শহীদ হয়েছেন! সুতরাং সম্পর্কটা দাঁড়ায় অনেকটা সাধারণ সমাজে মা ও সন্তান, মতাদর্শে সত্তা ও অনুসত্তা এবং সাংগঠনিকভাবে অথোরিটি ও অনুগামী । ওক্ষেত্রে সহোদর ও সহোদরা (যেহেতু শরীরকেন্দ্রিক, তাই লিঙ্গভেদ আছে) কিন্তু এক্ষেত্রে মতাদর্শিকভাবে সাথী এবং সংগঠনগতভাবে সহযোদ্ধা (এখানে চেতনাগত সম্পর্ক বলে লিঙ্গভেদ নেই অর্থাৎ সমচেতনায় একাত্ম); ওখানে সামাজিক সম্পর্কে যেমন প্রতিবেশী বা বন্ধু, এক্ষেত্রে সৌম্য । সবক্ষেত্রেই মূল শর্ত দেহগত বা ব্যক্তিক নয় বরং চেতনাগত ।

 

সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক উপলব্ধিতে সব সম্পর্কগুলি কত ব্যাপক বিস্তৃত, কি ভীষণ সুগভীর ও দৃঢ়, যা মানুষ ও মনুষ্যত্ব কেন্দ্রিক (শরীরগত সীমানার বহু ঊর্ধ্বে) পবিত্র শপথ ও শুদ্ধতম ভাবনার সচেতন কঠোর, কঠিন কষ্টসাধ্য সংগ্রামের উপর নির্ভরশীল । যাঁরা এটা পারে, তাঁরাই ইতিহাস এবং মহৎ জীবনের দৃষ্টান্ত হয় । কাম, ক্রোধ, লোভ, দ্বন্দ্ব, হিংসার বহু ঊর্ধ্বের সে জীবন, তখন আর ষাট বছরে মরে না গিয়ে হাজার বছরের হয়ে ওঠে । যুগ যুগ ধরে সে জীবন মহান দিশায় আদর্শিক দৃষ্টান্ত হয়ে মানুষকে পথ দেখায় ।

 

কিন্তু বর্তমান অবস্থাতে অথোরিটি অনুগামী সম্পর্কটা সত্তা-অনুসত্তার, গভীর ও অখণ্ড সম্পর্কের পরিবর্তে অর্থাৎ মা ও সন্তানের সম্পর্কের পরিবর্তে মাঝে মাঝেই সতীনসম সম্পর্কে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, যেন এক ছাদের নিচে থাকতে হবে বলেই থাকছে । পারস্পরিক মতাদর্শিক গভীর উপলব্ধিজাত জীবন সম্পর্কিত জীবনের সাথে জীবনের যোগে, জীবন্ত কোনো সম্পর্ক গড়ে না উঠে, অনেকটা যান্ত্রিক-প্রাণহীন, একসাথে চলার জন্যই চলার মতো হালকা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে । সংগঠনে জীবনকে উৎসর্গ করা মানেই সংগঠনই তার জীবন এবং সাংগঠনিক সম্পর্ক মানেই জীবনের সম্পর্ক । আদর্শগত ভিত্তির উপর তা গড়ে ওঠে বলেই- তা এখানে যেমন পরস্পর পরস্পরের মধ্যে লীন হওয়ার চেষ্টায় চেষ্টিত থাকাই মূল সংগ্রাম, সেখানে এরা যে কোন ভিত্তির উপরে সম্পর্ক গড়ে তুলছে, সম্ভবত এরা নিজেরাও নিজেদেরকে প্রশ্ন করেনি বরং কোথাও কোথাও ব্যক্তি-সম্পর্ক ভিত্তিক বিনোদনখোরদের আড্ডায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং সে কারণেই সাংগঠনিক সমস্যার মীমাংসাও মতাদর্শগত মানদণ্ডে না হয়ে, ব্যক্তির মতো করে হচ্ছে । আর এটা সি.সি. হাউজ থেকে ফিল্ড পর্যায় পর্যন্ত সমস্ত ক্ষেত্রেই ঘটছে । সর্বক্ষেত্রেই যেখানে সামষ্টিক বা সামগ্রিক হওয়ার কথা এবং যার ভিত্তি হবে মতাদর্শ, সেক্ষেত্রে সর্বত্রই তা হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিক ।

 

অর্থাৎ মূল সংকটের উৎস আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মসর্বস্বতা, আর নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়া, অর্থাৎ ব্যক্তি-ইচ্ছা, ব্যক্তি-অনিচ্ছা, ব্যক্তি ভালোলাগা ইত্যাদির পেছনেই আটকে থাকা ।

 

কুফল হিসেবে আমাদের সামনে দুটো সমস্যা প্রতীয়মান হয়ে ওঠে যথাঃ

১ ।      অথোরিটি কোনো সাংগঠনিক সমস্যার সমাধান দিতে মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব না করে, নিজের মতো করে অর্থাৎ মতাদর্শিক মানদণ্ডের পরিবর্তে ব্যক্তি ইচ্ছা দ্বারা চালিত হয়ে সাংগঠনিক সমস্যার

সমাধান দিচ্ছেন ।

২ ।      অনুগামী যখন ব্যক্তি অবস্থানে নেমে আসছেন, তখন মতাদর্শিক অবস্থানে থাকা অথোরিটি (সামষ্টিক প্রতিমূর্তি)-কে বিষের মতো মনে হচ্ছে । এক্ষেত্রে ব্যক্তিসত্তার সাথে সামষ্টিক সত্তার দ্বন্দ্ব, দূরত্বই সৃষ্টি করতে থাকে ।

 

সংগঠনের বর্তমানে বেশির ভাগ সমস্যা এই দুই মূল ভুল থেকেই উৎসারিত হচ্ছে । ঘটনা বহুভাবে ঘটলেও অর্থাৎ উপর্সগ বহুভাবে প্রকাশিত হলেও মূল ভুল বা রোগ মূলতঃ এ দুটোই ।

 

সমস্যার প্রকাশ

 

সংগঠনের সবাই যেহেতু আমরা অথোরিটি এবং অনুগামী অর্থাৎ কোথাও আমি কারো অনুগামী এবং অন্যত্র কারো ক্ষেত্রে আমি অথোরিটি, সেই অর্থে আমরা সবাই শিক্ষক, সবাই ছাত্র । মতাদর্শগত শিক্ষা বা সাংগঠনিক সতর্কতা ও দিকনির্দেশনার প্রশ্নে তাই আমরা অনুগামী হিসেবেই (যেহেতু সবাই অনুগামী এবং আন্তঃসংগ্রাম ব্যতিরেকে অথোরিটির সমালোচনা অনুগামীদের সামনে করার নীতিতে বিরোধিতার কারণে) আমাদের মূল ভুল আত্মকেন্দ্রিকতার বিভিন্ন প্রকাশ ও তার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সর্তকতা নিয়ে আলোচনা করবোঃ

(১)      যখন একজনের মধ্যে সাংগঠনিক চেতনার পরিবর্তে ব্যক্তি চেতনা দানা বাঁধতে থাকে, তখন সে অন্যদের কাছে হালকা (ব্যক্তিত্ব) হতে থাকে, ক্রমশঃ সে একা হয়ে পড়ে । মুখে তার সংগঠন থাকলেও তার চারপাশের সাংগঠনিক সাথীদের আদর্শগত উপলব্ধির চেতনায় সবাই তা বুঝতে পারে । প্রথমেই সেই ব্যক্তি চেতনার দ্বন্দ্বটা উঠে আসে তার সামষ্টিক প্রতিমূর্তি অর্থাৎ অথোরিটির সাথে এবং অপেক্ষাকৃত সক্রিয় অনুগামীদের সাথে । কারণ সাংগঠনিক শিক্ষার শর্তে অথোরিটিই প্রথম মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং অথোরিটি সংগঠনের মানদণ্ড বিধায় মুখোমুখি না দাঁড়ালেও তার ভিতরে অথোরিটিকে ঘিরেই প্রশ্ন, জটিলতা বা অস্পষ্টতার সৃষ্টি হতে থাকে ।

(২)      সংগঠনের অনুষঙ্গের চেয়ে ব্যক্তি সম্পর্কের (সংগঠন বহির্ভূত) বন্ধুদেরকেই বেশি ভালো লাগে, অনেকক্ষেত্রে সাংগঠনিক অনুষঙ্গ এলার্জি হয়ে দাঁড়ায়, কিংবা যেহেতু তিনি ব্যক্তিবোধের চর্চায় আছেন, তাই সাংগঠনিক আলোচনা খুব বেশিক্ষণ এগিয়ে নিতে পারেন না । বরং তার ভাষা খুলে যায় ব্যক্তিগত আলোচনায় । ফলে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় যারা সহযোগী হয়, তাদেরই ভালো লাগে ।

(৩)      সমচেতনা সম্পন্নরা সর্বদাই সমচেতনা সম্পন্নদেরই খুঁজে নেয়, যেমন রতনে রতন চেনে শুয়োরে চেনে কচু, ঠিক তেমনি সংগঠনের মধ্যেও দুটো চেতনা থাকে, একটা হলো সাংগঠনিক চেতনা বা ঐক্যের চেতনায় সক্রিয় অংশ, আরেকটা অংশ থাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনাতাড়িত বিক্ষুব্ধ বা নিষ্ক্রিয় । যে সাথীটি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় নেমে গেছে, সে ঐ সব বিক্ষুব্ধ অংশ বা নিষ্ক্রিয় অংশদের অনুষঙ্গের দিকে ছোটে এবং নিজেকে সাংগঠনিক সক্রিয় ভাবে, সাংগঠনিক স্বার্থে নয় বরং সংগঠনের খুঁত খুঁজে সাংগঠনিক ভাষায় তা শাণিত করে নিজের আত্ম বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক চরিত্র আড়াল করে নিজেকে দক্ষ সংগঠক হিসেবে প্রমাণ করার ঘৃণ্য প্রয়াসে । তার সে যুক্তিতে অন্যরা থেমে গেলেও সে নিজেকে যতোই সঠিক ভাবুক, থেমে যাওয়াদের কাছে সে বেঠিকই থেকে যায় । একই সময় একজন বন্ধু যখন সংগঠন বিষয়ক আলোচনা করছে, হয় সে বিক্ষুব্ধ হচ্ছে (অভিযোগ) কিংবা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, পরক্ষণেই যখন সেই বন্ধুটি তার ব্যক্তিগত শেয়ারে যাচ্ছে, সে তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ।

(৪)      সংগঠন মানে সংগঠিত হওয়া- এই প্রাথমিক জ্ঞানটা পর্যন্ত মনে না থাকার ফলশ্রুতিতে, আর একা হওয়া সত্ত্বেও সে সতর্ক হয় না এবং অন্যদের অভিযুক্ত বা অন্যদের দায়ী করে সে মূলতঃ আত্মকে বাচাঁতে চাইছে এবং জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে নিজের ব্যক্তিবোধকে রক্ষা করতে চাইছে, সেটা যে সংগঠনবিরোধী- সেটাও তার হুঁশে আসে না । অর্থাৎ আত্মকে ধ্বংস করার পরিবর্তে আত্মকে রক্ষা করার প্রক্রিয়াতেই যে ব্যস্ত আছে, সেটা সে বুঝতে পারে না । 

 

সর্বশেষে সংগঠনের মধ্যে একা হয়ে পড়া কিংবা আত্মকে রক্ষা করার প্রয়াসে অভিযোগ সহ ন্যূনতম সাংগঠনিক হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পশ্চাতমুখী ব্যক্তিচেতনার অনুষঙ্গকে ভালোলাগা থেকেও যখন নিজেকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, তখন তার সর্বনিম্ন রূপ প্রকাশ করে অথোরিটির শেখানো সাংগঠনিক ভাষা দিয়ে অথোরিটিকেই অর্থাৎ শিক্ষা ও সতর্কতার দিশার বদলে তাঁকে দ্বন্দ্বের স্তরে নিয়ে ফেলে । যে অস্ত্রটা সেই অথোরিটি বা সংগঠন শিখিয়েছে, ব্যক্তিবোধের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ঐক্যকে রক্ষা করার স্বার্থে, তখন তা ঝলসে ওঠে সংগঠনের মোড়কে সংগঠনবিরোধী ব্যক্তি-ইচ্ছার সপক্ষে । কখনো কখনো তা হয় খুব বেয়াদবের মতো, যা প্রমাণ করে সে মাছির চরিত্র ছাড়িয়ে শুয়োরের বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টতা পেয়েছে । শুয়োর বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে প্রথম জন্মদাত্রীকেই বলাৎকার করে, এরাও তাই করে । প্রমাণ করে, সে যথেষ্ট বড় হয়েছে ।

 

ভুল জেনে নিজেকে অবিরত শুধরানোর শর্ত থাকলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নোংরা স্তরে নেমে যাওয়া সভ্যটি, যেখানে যে কারো মুখেই নিজের ভুল শুনলে সম্মানের সাথে না হোক ধৈর্য্যর সাথে তা শোনার কথা, সেখানে নিজের অনুগামী, যে তাঁর রক্ষণাত্মক ব্যূহ (অথোরিটির ভুল ধরিয়ে তাঁকে সতর্ক করা যার প্রধান কর্তব্য), তাঁর মুখে নিজের সমালোচনা শুনলে, শুধরানো তো দূরের কথা বরং ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের অথোরিটিগত অবস্থানের দোহাই দিয়ে অনুগামীকে থামায় এবং যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমালোচিত অথোরিটিটি বুঝতে পারেন এই কথাটি তাঁর অনুগামীর নয়, বরং তাঁর পূর্বতন অথোরিটির শেখানো, তখন তাৎক্ষণিক সতর্কতায় নিজেকে শুধরে নেয়ার পরিবর্তে তার অথোরিটিকেই দায়ী করে ভুল বোঝে । অর্থাৎ অনুগামীর মুখে সমালোচনা তার ইগোতে (আত্ম, অহংবোধ) বাধে এবং অথোরিটিকে ঐক্যের রূপ শিক্ষক বা সত্তা না ভেবে ব্যক্তি স্থানে নামিয়ে আনে, সতর্ক ও শিক্ষা গ্রহণের বদলে দ্বন্দ্ব-কলহে সে সম্পর্ক বিষিয়ে তোলে । নিজের নেমে যাওয়া ব্যক্তি চেতনার চোখে তার অথোরিটিও তখন ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং অনুগামীকে তার অস্তিত্ব বা রক্ষনাত্মক ব্যূহের পরিবর্তে বিরোধী শত্রু মনে হতে থাকে; সেই সাথে অথোরিটি বা সংগঠনকে খুব জটিল মনে হতে থাকে ।

 

সেই সাথে হল্লা শুরু করে, অনুগামীর কাছে তার অথোরিটি তাকে ছোট করে দিচ্ছে । অথচ অথোরিটি তাকে যে আদর্শিক দৃষ্টান্তের স্থানে এনেছিলেন, তিনি কেন এটা করতে যাবেন? এই প্রশ্ন নিজের মধ্যে থাকে না কিংবা দৃষ্টান্তের স্থানে থেকেও সে নিজেই নিজেকে যতো উলঙ্গ ও ছোট করছে, তা কি তার অথোরিটিও করতে পারবেন? বরং নিজেকে ছোট ও নগ্ন করার কারণে তার অথোরিটি যে তার চেয়েও বেশি অন্যদের কাছে মিথ্যেবাদী হয়ে পড়েছেন, অনেক বেশি ছোট হয়ে যাচ্ছেন; প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও বিশ্বাস হারানোর কষ্টে তিনিও কষ্ট পাচ্ছেন; সেটা সে একবারও চিন্তা করার ফুরসত পায় না । সত্যিকারেই ব্যক্তিতাড়িত মানুষ যে কতো হিতাহিত জ্ঞানশূন্য পশুর স্তরে নেমে যায়, তার চরম দৃষ্টান্ত এরাই তখন হয়ে ওঠে । অথচ অনুগামীদের কাছে আদর্শিক দৃষ্টান্ত হওয়ার শপথে এরা একদিন যাত্রা শুরু করেছিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত কী দৃষ্টান্ত এরা রেখে যাচ্ছে, সে প্রশ্নটা নিজেকে করার মতো চেতনাও অবশিষ্ট থাকছে না ।

 

অগ্রগামীদের ক্ষেত্রে     

সর্বোপরি আত্মকেন্দ্রিকতা চেপে বসলে একজন অগ্রগামীর রূপ হয় ভয়ানক জেদী, অর্থাৎ নিজের মতো করে একটা বুঝে (যেহেতু হীনমন্যতা ও জিদ আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে উৎসারিত) সেখান থেকে আর ওঠে না বরং জিদটাকেই বাড়িয়ে চলে কিংবা একটা ভুল থেকে উঠে না এসে অনুশোচনায়, হীনমন্যতায় পালানোর পথ খোঁজে । অগ্রগামীরা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ফাঁদে পড়লেও তা চেপে রাখতে কোনো অবস্থাতেই মিথ্যে বলেন না, এবং সংগঠনচ্যুত হন না বরং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, সংগঠনের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে বরং ভেঙে পড়েন । অবশ্য এক্ষেত্রে তাঁদের নিজ থেকে উঠে আসার জন্য প্রতীক্ষা করতে হয় কিংবা ভিতরে আত্মকেন্দ্রিকতার আগুন নিভে এলে তাঁকে সক্রিয় করতে সংগঠনকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, কারণ শেষ পর্যন্ত এঁরা শুধু অগ্রগামীই নন, সংগঠনের অস্তিত্ব ।

 

অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়াদের ক্ষেত্রে

এরা আত্মকেন্দ্রিক তাড়নায় যথেষ্ট বোকামী করে, প্রচণ্ড মিথ্যে বলতে থাকে, খরগোশের মতো জঙ্গলে মুখ গুঁজে ভাবে তাকে কেউ দেখছে না । চারপাশকে বোকা ভাবে, অথচ সংগঠন মানে অসংখ্য চোখ ও উপলব্ধির সম্মিলিত ব্যূহ সেখানে একটা মিথ্যা কথা বললে যে তা বোঝা যায়, অন্তত সচেতনভাবে না বুঝলেও আত্মোপলব্ধি দিয়ে অন্যেরা তার চাল-চলন, হাব-ভাবে বুঝে ফেলে; সেটা তারা ভুলে যায় । এরা ভয়ানক বেয়াদব ও নোংরা স্তরে নেমে যায় । এরা সংগঠনচ্যুত হয় এবং প্রচণ্ড বিভ্রান্তি ছড়ায়, এমন-কি সংগঠনচ্যুত হয়ে নোংরামির মধ্যে ডুবে থাকার কারণে অনেক কু-রুচিপূর্ণ কটু কথাও ছড়ায় । তবে এরা উপকারও করে, বিভ্রান্তির মধ্যে সংগঠকরা শিক্ষা পায় কীভাবে টিকে থাকতে হয় এবং জবাব দিতে হয় । অথবা সাংগঠনিক আস্থা কতোটা দৃঢ় এবং নিজের চোখ, কান বা মগজ দিয়েই সে চালিত হয়, না কি অন্যের চোখ কান ও মগজেই বেশি নির্ভরশীল?

 

উঠে আসার পথ

 

উল্লিখিত প্রবণতা অর্থাৎ একা হয়ে পড়া এবং অথোরিটির জায়গাটা অস্বচ্ছ হলেই নিজেকে দ্রুত সতর্কতায় তুলে আনতে হবে । যার পথ সাংগঠনিক ব্যস্ততা এবং অথোরিটির জায়গা স্বচ্ছ করতে অথোরিটিকে প্রশ্ন করে নিজেকে পরিষ্কার করে নেয়া ।

 

এককথায় বলা যায়- হাঁপরের আগুনে যেমন লোহার মরিচা ছাড়ে বা গড়াপেটায় তা চকচকে হয়, তেমনি সাংগঠনিক ফিল্ডেই একজন সংগঠক বেঁচে ওঠেন । তাই সমস্যা বা মরিচা যাতে না ধরে কিংবা এ-রকম সমস্যা হলেই তা থেকে মুক্তি পেতে সাংগঠনিক ফিল্ডে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং শত বিভ্রান্তির মাঝেও অথোরিটির জায়গাটাকে স্বচ্ছ রাখতে হবে । অথোরিটিকে প্রশ্ন করেই হোক কিংবা ভুল করলে কোনো ইগো বা আত্মবোধকে প্রশ্রয় না দিয়ে আত্মসমর্পণ করেই হোক । আপন সত্তার কাছে আত্মসমর্পণে কিংবা প্রশ্ন করতে যদি দ্বিধা আসে, তবে তার পতন অনিবার্য । চারপাশে যার বড় হওয়ার জায়গা কমে যায়, সে-ই মায়ের কাছে বড় হতে চায় এবং যে চারপাশে বড় হতে চায়, মায়ের কাছে সে শিশুই থাকে ।

 

অথোরিটিদের প্রসঙ্গে সতর্কতা

 

প্রসঙ্গঃ দুই ফিল্ড ও বিচ্যুতি

[সমস্যার উৎস বোঝানো ও সতর্কতার স্বার্থে রিপোর্টের এই অংশে প্রথম ফিল্ড তথা মৌলিক বা নীতিগত (পের্পাস-পত্রিকা) ফিল্ডকে দ্বিতীয় ফিল্ড এবং দ্বিতীয় ফিল্ড তথা প্রয়োগিক বা সাংগঠনিক (কনভিন্স) ফিল্ডকে প্রথম ফিল্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে ।]

 

কয়টা বিষয় খুবই প্রকট হয়ে উঠেছে । বিশেষতঃ যা শুধু গ্রাস ফিল্ড বা ইউনিট থেকে অঞ্চল বোর্ড পর্যন্তই নয়, খোদ সংগঠন প্রধানের সান্নিধ্যে থাকা ও গড়ে ওঠাদের মতো জাতীয় স্তরে সর্বোচ্চ অগ্রজ অথোরিটিদের (তিন বোর্ড, নির্বাহী, জাতীয় সমন্বয়কারী, জাতীয় সার্বক্ষণিক প্রতিনিধি এবং অঞ্চল প্রধান) মধ্যেও ভয়ানকভাবে ফুটে উঠেছে । শরীরে রোগের চেয়েও মস্তিষ্কের রোগ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সাংগঠনিক উপদলীয় কোন্দল বা ঐক্যতাকে ধ্বংসের সর্বোচ্চ নিকৃষ্ট নষ্টচক্র সর্বোচ্চ স্তর থেকেই জন্ম নেয় । সংঘবদ্ধতার শর্ত ও শপথে আবদ্ধ অনেক জানা মানুষ যদি আত্মকে ধ্বংস করতে না পারে বরং জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আত্মকে লালন করে; তখন সেই জানা, ঐ মানুষকে জানোয়ার করে তোলে, এ-যাবতকাল এই জন্যে আন্দোলনগুলো পথভ্রষ্ট হয়েছে কিংবা দালালীর পথ নিয়েছে, কর্মীদের জন্য নয় বরং অনেক-জানা সেই নেতৃত্বের জন্যই । দালাল হওয়ার সুযোগ আর আখের গোছানোর জানোয়ারবৃত্তির পথ চেনে অনেক-জানা আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্বদানকারী অংশটাই ।

 

আর এই আত্মকে ধ্বংস করার জন্যই দুই ফিল্ডসাংগঠনিক বা প্রয়োগিক ফিল্ড এবং নীতিগত বা আদর্শগত ফিল্ড । এই দুই ফিল্ড চ্যুতির পথ ধরেই জন্ম নেয় আত্মকেন্দ্রিক নেতৃত্বরূপী জানোয়ার । বড়দার ভাষায়-“সভ্যতার নিকৃষ্ট পাপ মায়ের সাথে ব্যাভিচার, দেশমাতার কথা বলে- দেশমুক্তি, মনুষ্যত্বের মুক্তির নামে যারা মানুষকে নিয়ে মানুষের রক্ত-ঘামে গড়া সংগঠনের নামে, সংগ্রামের আড়ালে আত্মস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার রূপে তা ব্যবহার করে, সেই সব মনুষ্যরূপী নিকৃষ্ট জানোয়ারদের এ-পথেই জন্ম হয় । দুই ফিল্ড চ্যুতি তারই জরায়ু- জানোয়ারের আঁতুড়ঘর । অহিংসের শপথবদ্ধ হলেও একই সাথে মনুষ্যত্বের স্বার্থে তোমার চেতনার গভীরে খঞ্জরটা চালানোর শপথটাও নিয়ো এদেরই জন্য ।” দুই ফিল্ড প্রসঙ্গে তাই আমরা এতোটাই সতর্ক ।

 

প্রথম ফিল্ডঃ

এই ফিল্ড মূলতঃ সাংগঠনিক ফিল্ড বা প্রয়োগিক ফিল্ড, যা মূলতঃ পারস্পরিকতার পথে সুদৃঢ় সংঘবদ্ধতা বা সংগঠন গড়ে তোলে ।

 

পারস্পরিকতার মধ্যে ক্রমশঃ আত্মকে ক্ষয় করার শপথ নিয়ে প্রথম পথচলা শুরু হয় কনভিন্স প্রক্রিয়া দিয়ে, এজন্য এই ফিল্ডকে সাংগঠনিক ভাষায় কনভিন্স বলে । কারণ- মূল অথোরিটি বা সংগঠন প্রধান থেকে শুরু করে প্রতিটি সাথীকেই কোনো না কোনোভাবে কনভিন্সেই থাকতে হয় । আত্মকে ক্ষয় করার জন্যেই যে পারস্পরিকতার শর্ত অনিবার্য আর যেহেতু প্রচলিত ব্যক্তিমালিকানাধীন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় আত্মকেন্দ্রিক মানসিক ধাঁচা থাকবেই, বিধায় তা তৃণমূল স্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত (মূল অথোরিটি)আছে । এজন্যই আত্মকে ক্ষয় করার শর্তেই কনভিন্স বা প্রথম ফিল্ড সবার জন্যই অনিবার্য । সুতরাং সংগঠন আমরা গড়ে তুলি না, আমরা আত্মকে বা নিজকে ক্ষয় করি । তা যতো পারি, বিপরীতভাবে পারস্পরিক সংঘবদ্ধতায় সংগঠন ততো দৃঢ়ভাবে গড়ে ওঠে অর্থাৎ সংগঠন হয়ে যায় । এজন্যই আত্মত্যাগের পথ মানেই সংঘবদ্ধতার পথ । আর সংঘবদ্ধতার পথ মানেই সুদৃঢ় সংগঠন । আর এর সর্বোচ্চ রূপ হলো, ওয়ান বডি- সংগঠন ।

 

দ্বিতীয় ফিল্ডঃ

এই ফিল্ড মূলতঃ মতাদর্শ বা নীতিগত ফিল্ড । আর মতাদর্শ গড়ে উঠেছে কোনো ব্যক্তি-ইচ্ছা বা ব্যক্তিমত থেকে নয় বরং ব্যক্তি-ইচ্ছা নিরপেক্ষ বিশ্ববীক্ষার আলোকে, ইতিহাস বিশ্লেষিত বৈজ্ঞানিক পথে । বিজ্ঞাননিষ্ঠ সেই মতাদর্শই, দিশা বা নীতি আকারে প্রত্যক্ষভাবে সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকা মারফত ক্রমশঃ প্রকাশিত হতে থাকে । অথোরিটি এই ফিল্ডেরই প্রতিমূর্তি, প্রথম ফিল্ড বা সাংগঠনিক পথ ধরে যে বিকশিত হয়ে পূর্ণতা পায় । মতাদর্শভিত্তিক সংগঠন মানেই ব্যক্তিমত দ্বারা চালিত হয়ে সংগঠন গড়ে তোলা নয় বরং মতাদর্শভিত্তিক দিশা হিসেবে প্রকাশিত সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকা অনুসরণপূর্বকই সংগঠন গড়ে তুলতে হবে । ব্যক্তি-ইচ্ছা বা নিজের মতো করে নয় । এজন্য সমাজবদলের মহতী লক্ষ্য পূরণের নির্দিষ্টকৃত মতাদর্শভিত্তিক সুনির্দিষ্ট দিশা তথা নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা ব্যক্তিমতকে নয় বরং তা ক্ষয় করে অবিরত সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকা চর্চার মাধ্যমে ও তা অনুসরণ করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে । এক্ষেত্রে প্রথম ফিল্ড যদি হয় বডি, তবে দ্বিতীয় ফিল্ড হলো প্রাণসত্তা । এজন্যই সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকার চর্চা মানে প্রাণেরই চর্চা এবং বিভিন্ন গ্রন্থরাজি পাঠ করে নিজের প্রাণের সাথে অর্থাৎ মতাদর্শের সাথে মিলিয়ে তাকে পুষ্ট করা । তাকে পুষ্ট করা মানে নিজের প্রাণকেই সতেজ করা । প্রাত্যহিক পাঠাভ্যাস মানে নিজের সাংগঠনিক জীবনকে সজীব করা । আর এ থেকে দূরে সরা মানে, ব্যক্তিমতের চর্চায় নিজেকে মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেয়া এবং অথোরিটি যেহেতু এই মতাদর্শ বা নীতিগত ফিল্ডেরই তথা দ্বিতীয় ফিল্ডের মূর্ত রূপ; তাই সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকা থেকে বিচ্ছিন্নতা ক্রমশঃ অথোরিটির সাথেই দূরত্ব সৃষ্টি করে । আর সে আদর্শ বিচ্ছিন্নতার মরণবার্তা অথোরিটির সাথে দ্বন্দ্বের রূপেই প্রকাশ পায় ।

 

সুতরাং দুই ফিল্ডঃ প্রথম ফিল্ড- কনভিন্স, দ্বিতীয় ফিল্ড- পের্পাস-পত্রিকা; যার সংগঠনিক পরিভাষা- প্রথম ফিল্ড সংগঠন (পারস্পরিকতা গড়া বা সংঘবদ্ধতা), যা পরিমাণগত; দ্বিতীয় ফিল্ড পেপার্স-পত্রিকা (মতাদর্শগত, নীতিগত দিশা ও অথোরিটি), যা গুণগত । এককথায়- প্রথম ফিল্ড বডি এবং দ্বিতীয় ফিল্ড প্রাণ, দুই ফিল্ড মিলিয়েই মুক্তিজোট জীবন্ত । অন্যভাবে মতাদর্শেরই প্রায়োগিক ফল সংগঠন । আর এর ক্রিয়া-বিক্রিয়াই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং সব মিলিয়েই বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট

 

ফিল্ড চ্যুতি যেভাবে আসে

একজন সংগঠকের পতন শুরু হয় মূলতঃ যখন তিনি নিজেকে অগ্রজ ভাবতে শুরু করেন, যেখান থেকে দায়িত্ব পালনের বিপরীতে আত্মঅহমিকার জন্ম দিতে থাকেন এবং নিজের মধ্যে নিজেকে নিয়ে অবিরত প্রশ্ন করার মূল শপথগত মৌলিক শর্ত ভুলে যান । মূলতঃ আত্মকে ক্ষয় করার জন্যই দুই ফিল্ড এবং আত্মকে ক্ষয় করার সংগ্রাম একান্ত নিজেরই, যার একমাত্র পথ নিজের মধ্যে নিজেকে নিয়ে (নিজের কর্মকাণ্ড) অবিরত প্রশ্ন করা ।

 

সুতরাং দুই ফিল্ড সম্পৃক্ততা যেমন আত্মকে ক্ষয় করে, তেমনি দুই ফিল্ড চ্যুতি ক্রমশঃ আত্মকেন্দ্রিকতায় ডুবিয়ে দেয় । নিজেকে অবিরত প্রশ্ন করার শর্তচ্যুত হয়েই তা ঘটতে থাকে ।

 

অগ্রজদের ক্ষেত্রে এই চ্যুতি বেশি ঘটে, কারণ অহমিকা তাঁরই আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যে যতো বেশি অগ্রজ তাঁর ক্ষেত্রে ততো বেশি ঝুঁকি । স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় স্তরে সর্বোচ্চ অগ্রজ অথোরিটিদের ক্ষেত্রে এই পচনক্রিয়ার ঘৃণ্যতার সম্ভাবনাও সর্বাধিক । অহমিকার অন্ধত্বে প্রশ্ন নামক সংগ্রামের অনিবার্য শর্তের অপমৃত্যু তাদের মধ্যেই প্রথম ঘটে ।

 

অবশ্য সর্বোচ্চ অগ্রজদের ক্ষেত্রে প্রথম ফিল্ড চ্যুতির জন্য এরাঁ সেই অর্থে ততোখানি দায়ী নন । কিন্তু দ্বিতীয় ফিল্ড চ্যুতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপেই এরাঁ নিজেরাই নিজেদের (অহমিকা, আত্মম্ভরিতা, হীনমন্যতা- যা আত্মকেন্দ্রিকতারই ঘৃণ্য রূপ) ক্ষেত্রে দায়ী । যদিও প্রথম ফিল্ডের বিচ্যুতি দ্বিতীয় ফিল্ডের চ্যুতিকে প্রকটিত করে প্রকাশের আলোতে নিয়ে আসে এবং প্রথম ফিল্ডের জন্য যেহেতু এঁরা সেই ভাবে দায়ী নন, বিশেষতঃ এমতাবস্থায় সম্পূর্ণরূপে একটা পরিস্থিতির চাপে ঘটে, কারণ সংগঠন এখনো পরিপূর্ণভাবে সচল ও গাঠনিক রূপের পূর্ণতা না পাওয়ার প্রতিকূলতাই এর প্রধান উৎস, বিধায় যতোক্ষণ সংগঠন পরিপূর্ণতায় না আসছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত প্রথম ফিল্ড সম্পর্কিত এই সতর্কতা ও হুঁশিয়ারি সর্বোচ্চ অগ্রজদের সাথে সাথে সমস্ত সংগঠনের জানা দরকার ।

 

প্রথম ফিল্ড, যাকে কনভিন্স বলা হচ্ছে (যা মূলতঃ পারস্পরিকতা, সংঘবদ্ধতা বা সংগঠনগত), তা কনভিন্স নাম হলেও, তা যেমন গ্রাস ফিল্ডের একজন নতুন সংগঠকের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে শুরু হয়ে পরবর্তীতে ক্রম-অগ্রগতির সাথে সাথে, সে যখন অথোরিটির পর্যায় থেকে আরো অগ্রজ অথোরিটিতে ক্রমশঃ অগ্রসরমান হতে থাকে, তখন তাঁর ক্ষেত্রে প্রথম ফিল্ডের বৈশিষ্ট্যও ক্রমশঃ ভিন্নরূপ হতে থাকে, অর্থাৎ কনভিন্স নাম হলেও আক্ষরিক অর্থে তিনি আর কনভিন্সে না থেকে, কনভিন্সকৃতদের গড়ে তোলার দায়িত্বে এসে পড়তে থাকেন । এক্ষেত্রে সাংগঠনিক পারস্পরিকতার শর্ত পালন তার ক্ষেত্রে কনভিন্স না হয়ে কনভিন্সকৃতদের গড়ার পর্যায়ে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে । এজন্য সাংগঠনিক পরিভাষায় যা অথোরিটি, মতাদর্শিক পরিভাষায় তাই- আদর্শিক শিক্ষক । যিনি নিজের জীবনে মতাদর্শিক প্রয়োগে নিজেকেই আদর্শিক দৃষ্টান্ত করে অন্যকে শেখান । এভাবে ইউনিট পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা একজন অথোরিটি যখন ক্রমোন্নয়নের পথে (প্রার্থী সদস্য পদ, সদস্য পদ, প্রার্থী সার্বক্ষণিক সদস্য পদ, সার্বক্ষণিক সদস্য পদ, প্রার্থী স্টাফ সদস্য পদ, স্টাফ সদস্য পদ) অগ্রগামির সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ জাতীয় স্তরের একজন অগ্রজ অথোরিটিতে রূপান্তরিত হন, তখন কনভিন্স বা প্রথম ফিল্ড বলতে তিনি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন রিপোর্ট-রেকর্ডের উপর । এভাবে মূল ও মৌলিক ভিত্তিস্তর অর্থাৎ ইউনিট থেকে (থানা, জেলা, শিক্ষাঙ্গন) আঞ্চলিক স্তরের প্রাণসত্তা (অথোরিটি) হিসেবে সর্বোচ্চ বিকশিত রূপের প্রামাণিকতা নিয়ে জাতীয় স্তরে যখন স্থিতি অর্জন করেন; বলাবাহুল্য-তিনি তখন আঞ্চলিক না হয়ে, হন জাতীয় । পক্ষান্তরে, জাতীয় হলেও পারস্পরিকতায় অখণ্ড রূপ (সংগঠন) বলেই সবগুলো অঞ্চল থেকে সমস্ত ইউনিট বা গ্রাস ফিল্ড পর্যন্ত থাকে তাঁর নাড়ির যোগসূত্র । এই যোগসূত্রই সর্বোচ্চ অথোরিটিগণের সংগ্রামী জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার, বেঁচে থাকার ও সংগ্রাম চালনার মূল চালিকা শক্তি বা মূল অনুশীলন ক্ষেত্র, আর এই নাড়ির যোগসূত্র হলো সর্বস্তর থেকে পাঠানো রিপোর্ট-রেকর্ড । এককথায় বলা যায়, অগ্রজ অথোরিটির সংগ্রামী জীবনের ফুয়েল রিপোর্ট-রেকর্ড । এখান থেকেই তাঁদের গ্রাস ফিল্ড-এ কী তাঁর দায়িত্ব, সেই কর্মদিশা নির্দিষ্ট ও আবিষ্কৃত হয় । সংগ্রাম, সংঘবদ্ধতা, যোগসূত্র, কর্মদিশা তথা অনুশীলন ক্ষেত্র বলতে (Battle field) সর্বোচ্চ অথোরিটিদের কাছে এই রিপোর্ট-রেকর্ড, যা ক্রমশঃ মূল, মৌলিক ও একমাত্র সাংগঠনিক কর্মদিশার উৎস হয়ে ওঠে । এ-পর্যায়ে সেই রিপোর্ট-রেকর্ডযথাযথ ও নিয়মিতভাবে না আসাতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর বাধ্যবাধকতা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে ধারণানির্ভর হয়ে (ব্যক্তি-ইচ্ছা, ব্যক্তি-চেতনা) নিজের মতো করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড (প্র্যাকটিস) চালাতে থাকেন । যার ফলশ্রুতিতে ক্রমশঃ জন্ম নেয় অভ্যস্ততা, অতঃপর নিজের অজ্ঞাতে এক পর্যায়ে নিজের মতকেই অর্থাৎ ব্যক্তি-ইচ্ছা, ব্যক্তিমতকেই সাংগঠনিক মত ভাবার ঘৃণ্য প্রবণতা স্থায়ী ও প্রধান হয়ে দেখা দেয় । দীর্ঘ দিন নিজের মতকে সাংগঠনিক পরিভাষায় বকতে বকতে যে ঘৃণ্য অভ্যস্ততার পাঁকে জড়িয়ে যায়, সেখান থেকে কোনটা নিজের মত আর কোনটা সংগঠনের- সেটা যেমন সে নিজেও বুঝতে পারে না কিংবা বুঝলেও উঠে আসার মতো সাংগঠনিক চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকে না; অন্যদিকে, যাঁরা তা শোনে, অনুগামী স্তরের সেই সাথীরাও অগ্রগামীর আসনে বসে থাকা ব্যক্তিমতের ঘৃণ্যতায় রূপান্তরিত অথোরিটি দ্বারা চরমভাবে বিভ্রান্ত, প্রভাবিত কিংবা সাংগঠনিক অনুশীলনোত্তর স্বাভাবিক উপলব্ধি দিয়ে এই অসাংগঠনিক চরিত্র ধরতে পারলেও প্রচণ্ড হতাশায় ভেঙে পড়েন । অর্থাৎ অনুগামীদের ক্ষেত্রে এক ভয়ানক সাংগঠনিক বিপদ ডেকে আনে ।

 

অন্য দিকে, এই রিপোর্ট-রেকর্ড না আসাতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর ক্ষেত্রে অনেক সময় ভুল হয়; কারণ সর্বোচ্চ অথোরিটিগণ সর্বজ্ঞাত ঈশ্বর নন, ফলে বাধ্যবাধকতায় ধারণা-নির্ভর বা অনুমান-নির্ভরতায় কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে যে ভুল হয়, তা ফিল্ডে অনেক সময় প্রচণ্ড বিতর্কের সৃষ্টি করে । বিশেষতঃ সাংগঠনিক অথোরিটি বা নেতৃত্ব নির্বাচন অন্যান্য সংগঠনের মতো না হয়ে সম্পূর্ণ রিপোর্ট-রেকর্ডের ভিত্তিতেই হয় বলে, তা না থাকায় এক্ষেত্রে ভুল হলে সংগঠনকে চরম বিপর্যস্ততার মধ্যে ফেলে দেয় । ফলে অগ্রজদের ক্ষেত্রে পারস্পরিকতা বা সংগঠনগত এই প্রথম ফিল্ড অনুশীলন বলতে রিপোর্ট-রেকর্ডকেই যখন বোঝানো হয় এবং এটা না থাকলে প্রথম ফিল্ড বা পারস্পরিকতা থেকে চ্যুতির বিষয়টিও সমার্থক হয়ে পড়ে । এভাবে প্রথম ফিল্ড চ্যুতির জন্য সে দায়ী না হলেও, এ-পথে আসা পচনটা ঠিকই তাকে বহন করতে হয় । যার প্রকাশ- প্রথম ফিল্ড তথা পারস্পরিকতাহীন আত্মকেন্দ্রিকতায় ক্রমশঃ বিচ্ছিন্নতার মতো ঘৃণ্যতায় ছিটকে পড়া । প্রথম ফিল্ড বিচ্যুতি মানে পারস্পরিকতা, সংঘবদ্ধতা (সংগঠন) থেকে চ্যুতি অর্থাং সাংগঠনিক চরিত্র হারিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্র্রিকতায় নিমজ্জিত বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় ।

 

প্রথম ফিল্ড চ্যুতিতে সংগঠনবিরোধী ঘৃণ্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিচ্যুতির জন্য সে দায়ী নয় বরং তার কারণ রিপোর্ট-রেকর্ড যথার্থভাবে নিয়মিত না আসা, কিন্তু দ্বিতীয় ফিল্ড অর্থাৎ মতাদর্শগত বা নীতিগত ফিল্ড চ্যুতির জন্য দায়ী সম্পূর্ণরূপে একজন অগ্রজ অথোরিটি নিজেই ।

 

একজন অগ্রজ অথোরিটি নিজে জানেন এবং অসংখ্য জনকে জানান, দ্বিতীয় ফিল্ড বা সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকা প্রত্যক্ষভাবে মতাদর্শগত বা নীতিগত দিশা বলেই সংগঠন গড়ে তোলার প্রশ্নে প্রাত্যহিক পাঠাভ্যাসে তাকে আত্মস্থ ও একাত্ম হওয়ার সাধনায় দৃঢ়বদ্ধ হতে হবে । নিজের মতো করে নয় বরং সাংগঠনিক পের্পাস বা দিশা অনুসারে সংগঠন গড়তে হবে এবং নিজেকে চালনা করতে হবে । সেই সাথে অগ্রজ বলেই অন্যদের চেয়ে বেশি সংগঠনগত অনুশীলনে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন যে, সাংগঠনিক পেপার্স-এ যা লেখা আছে, সংগঠন প্রসারের সাথে সাথে ক্রমশঃ তার পূর্বে বোঝা অর্থটুকু বদলে যেতে থাকে অর্থাৎ একই পেপার্স অগ্রগতির নিরিখে আরো ব্যাপক ও গভীরতাপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থকে প্রতিফলিত করতে থাকে ।

 

কিন্তু অগ্রজের অহমিকা থেকে সে তার সব জানা (প্রথম ফিল্ড চ্যুতির অভাবজনিত প্রতিক্রিয়া) ভুলে গিয়ে অহমিকাজাত ভাবনাতাড়িত হয়ে নিজের অজ্ঞাতে এমন ভাব ফুটিয়ে তোলেন- যেন সাংগঠনিক পেপার্স -পত্রিকা শুধু অনুগামীদের জন্যই নিত্যপাঠ্য, তিনি এর বহু ঊর্ধ্বে । তাই তা প্রাত্যহিক পাঠের শর্ত তো দূরের কথা, সযত্নে সাংগঠনিক সম্মানের সাথে যথাযথভাবে নিজের কাছে রাখার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাটুকুও অনেকেই হারিয়ে ফেলেন । কারণ- তারা প্রথম ফিল্ড চ্যুত হয়ে (রিপোর্ট-রেকর্ডের অভাবে) নিজের মতকেই দিশা করে সংগঠন গড়ার অনুশীলনে থাকেন । ফলে প্রথম ফিল্ডের চ্যুতিই এই দ্বিতীয় ফিল্ড (সাংগঠনিক পেপার্স) বা মতাদর্শগত ফিল্ড চ্যুতির পথকে সুগম করে । সাংগঠনিক জীবনে এ-এক অধঃপতিত অপসংস্কৃতি ।

 

প্রথম ও প্রধান ফিল্ড (মৌলিক ফিল্ড নয়) চ্যুত হলে যে সাংগঠনিক চরিত্র হারায়, ফিল্ডে পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়লে তা শুধু পুনরায় ফিরেই আসে না, বরং নিজ থেকে রিয়ালাইজেশন করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসার ফলশ্রুতিতে পূর্বের চেয়েও সে আরো বেশি চৌকষ ও দৃঢ়তা সম্পন্ন চরিত্র অর্জন করে এবং সাংগঠনিক নীতি যেখানে নিজেকে দৃষ্টান্ত করে (মুখের কথায় বা ভোকাবুলারিতে নয়) অন্যকে শেখানো, সেখানে নিজের ভুল শুধরে তিনি নীতিগতভাবেই আদর্শিক শিক্ষক (অথোরিটি)-এর সার্থকতায় পূর্বের চেয়ে সাম্মানিক স্থানে উত্তরিত হন ।

 

কিন্তু দ্বিতীয় ফিল্ড (সাংগঠনিক পেপার্স-পত্রিকা) বা মতাদর্শগত এই ফিল্ড চ্যুত হলে তিনি প্রত্যক্ষভাবেই নীতি বিচ্যুত হয়ে পড়েন, ফলে এই ক্ষেত্রে আর তিনি ফিরতে পারেন না- অর্থাৎ দ্বিতীয় ফিল্ড চ্যুতি মানে নীতি বিবর্জিত হওয়ার সর্বোচ্চ পচনশীল বা নিকৃষ্ট আত্ম-অন্ধ, আত্মকেন্দ্রিক (নিজের মত, নিজের ইচ্ছায় অন্ধ ও বুঁদ থাকা) বৈশিষ্ট্যের চরম প্রকাশ । আর যেহেতু দ্বিতীয় ফিল্ড বা নীতিগত ফিল্ডের মূর্ত রূপ মূল অথোরিটি (সংগঠন প্রধান), সুতরাং এই ফিল্ড চ্যুতির সর্বোচ্চ পচনশীল রূপের প্রকাশ ঘটে মূল অথোরিটির সঙ্গে বিদ্বেষমূলক বিরূপ, বিরোধী প্রতিক্রিয়া প্রকাশের মাধ্যমে ।

 

এককথায় বলা যায়- প্রথম ফিল্ড বিচ্যুতিতে সাংগঠনিক চরিত্র হারিয়ে যে সংগঠনবিরোধী ব্যক্তিকেন্দ্রিক তাড়নায় চালিত হওয়া, সেই পথেই ক্রম-অবনয়নে আসে দ্বিতীয় ফিল্ড বা নীতিগত চ্যুতি, যা চরম ঘৃণ্যতা নিয়ে প্রকাশ পায় মূল অথোরিটি বা সংগঠন প্রধানের সাথে চরম বিরোধী বিদ্বেষ প্রকাশের মাধ্যমে ।

 

[এ-পর্যায়ে চরম ব্যক্তিমতের অন্ধত্বে বুঁদ হওয়ার ফলশ্রুতিতে তার কাছে সাংগঠনিক (ঐক্যের লক্ষ্য) ও মতাদর্শিক মানদণ্ড  থাকে না, বিধায় মূল অথোরিটি তার কাছে ব্যক্তি বলেই প্রতিভাত হতে থাকে । ব্যক্তির সামনে ব্যক্তিই থাকে । তাই কোনো লক্ষ্য বা দায়বদ্ধতা থাকে না, আর যেখানে ব্যক্তি ও ব্যক্তিমত; সেখানেই বিদ্বেষ ও বিচ্ছিন্নতা এবং যেখানেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মসর্বস্বতা, সেখানেই চলমান সমাজের ঘৃণ্য চেতনা ও তার মানদণ্ডই (অর্থ, বিত্ত, চাকর বৃত্তি, নোকর বৃত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড ও ডিগ্রি) উঠে আসে ।

ফলে- সাংগঠনিক বা ঐক্যতার চর্চার বিপরীতে ব্যক্তি চর্চাই (ব্যক্তি বিদ্বেষ, ব্যক্তি ত্রুটি-বিচ্যুতি, নিজের দায়িত্ব পালনের অক্ষমতা এড়াতে একে-ওকে দায়ী করে নিজেকে বাঁচানো, নিজেকেই সঠিক ভাবা, কিংবা নিজের বিষয়গত ধারণা ও ভাবনারই চর্চাতে বুঁদ হওয়া) উঠে আসে । আর যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মসর্বস্ব¦তা সেখানেই চলমান সমাজের ঘৃণ্য চেতনা ও তার মানদণ্ডকেই (অর্থ, বিত্ত, নোকরবৃত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড ও ডিগ্রি) অগ্রগামী বা যোগ্যতার মাপকাঠি করে তোলে । অর্থাৎ দুই চেতনার (চলমান সমাজের চেতনা এবং মতাদর্শিক মানদণ্ডে সাংগঠনিক বা বিশেষ চেতনা) মধ্যে সর্বদা বিশেষ চেতনাকে আঁকড়ে থাকার শপথ থাকলেও এ-পর্যায়ে বিশেষ চেতনা আঁকড়ে থাকা তো দূরের কথা, এমন-কি সাংগঠনিক অগ্রগামিতার মানদণ্ড যেখানে সাংগঠনিক যোগ্যতা, সেখানে এই মতাদর্শিক মানদণ্ড বা বিশেষ চেতনার পরিবর্তে সাংগঠনিক অগ্রগামী নেতৃত্ব হওয়ার মানদণ্ড চলমান ঘৃণ্য সমাজের চেতনার নিরিখে (অর্থ, বিত্ত, ডিগ্রি, প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক অবস্থান) বিচার করার মতো মূর্খতায় নেমে যায় । অর্থাৎ গরুর গাড়ির চাকা হেলিকপ্টারের চাকা হিসেবে ব্যবহার করার মতো মূর্খতা, মূর্খতার পিছনে যুক্তি শানাতেও পিছু পা হয় না । এভাবে দুই ফিল্ড চ্যুতির ফলে দুই চেতনার বিভেদ ও মানদণ্ডকে গুলিয়ে ফেলার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীনতাও চেপে বসে, সেই সাথে একজন সাংগঠনিকভাবে নিজেকে কতোটা লীন করেছে কিংবা ভণ্ডামি করছে, তা চিহ্নিতকরণের দুই ক্ষেত্র তথা দাম্পত্য বা পারিবারিক জীবন এবং অর্থনৈতিক দিক বা আর্থ-সামাজিক জীবনে স্পষ্ট হয় । অর্থাৎ দাম্পত্য বা পারিবারিক জীবনে সে মতাদর্শিক (দ্বিতীয় ফিল্ড) মানদণ্ড বা চেতনাকে প্রতিফলিত করছে না কি চলমান সমাজের ঘৃণ্য চেতনাকে প্রতিফলিত করছে এবং আর্থিক দিক বা আর্থ-সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সংঘবদ্ধতার স্বপক্ষের আস্থা বা চেতনাকে (সাংগঠনিক বা প্রথম ফিল্ড) রক্ষা ও প্রতিফলিত করছে নাকি বিচ্ছিন্নতার তথা সাংগঠনিক পারস্পরিক সংঘবদ্ধতার বিপরীত চেতনা বা আস্থাকে প্রতিফলিত করছে । দুই ফিল্ড চ্যুতির ফলে চিহ্নিত এই দুই ক্ষেত্রকেও এরা ভুলে যায়, যদিও জানে এই দুই ক্ষেত্র চিহ্নিত বিধায় সবাই তাদের অসাংগঠনিক চরিত্র ও চেতনাকে সহজেই বুঝে ফেলবে । আক্ষরিক অর্থেই এরা আত্মকেন্দ্রিকতায় বুঁদ ও যুগপৎ নিলর্জ্জ ও বোকা হয়ে পড়ে ।

অথচ সংগঠক মাত্রই জানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনের সমগ্র দিক নিয়েই যেহেতু সংগ্রাম ও সংগঠন এবং মতাদর্শগত মানদণ্ডেই তা চালিত হয়ে পূর্ণতা পায়; সেহেতু আর্থিক, পারিবারিক সমস্ত কিছুই সংগঠনগত পথেই মতাদর্শিক মানদণ্ডে মীমাংসা হবে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড বা চলমান ঘৃণ্য চেতনার মানদণ্ডে তার মীমাংসা হতে পারে না । সামগ্রিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা এবং জীবনের সামগ্রিকতার প্রয়োজন পূরনের পরিপূর্ণ দিশা মতাদর্শগতভাবে দেয়া আছে বলেই তা সমগ্র জীবনের জন্য পরিপূর্ণ আদর্শ । সেখান থেকেই তার অধিকার জন্মেছে ব্যক্তিমত নয় মতাদর্শগত মানদণ্ডে চালিত হতে হবে এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনের সমগ্র দিক নিয়েই যেহেতু সংগ্রাম -এই ঘোষণা করার । ফলে চলমান সমাজের মধ্যেই বিশেষ চেতনা বা আলাদা চেতনার স্ফুরণ ও বাস্তবায়নে অনিবার্য বিজয়ের লক্ষ্যে তার অস্তিত্বকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । এজন্যই তা অস্তিত্বময় সঠিকতায় মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত ও বাস্তব সত্য, আর তাই এটা শুধু সংগঠন নয়- এটা একটা বিকাশমান পরিপূর্ণ সমাজ । দুই চেতনার মানদণ্ডে চলমান সমাজের সাথে বিকাশমান এই সমাজের ব্যাপক বৈপরীত্য বর্তমান, বাইরে থেকে হিংসার পথে উচ্ছেদ করা বা চাপিয়ে দেয়া নয় বরং অহিংস পথে ভেতর থেকেই নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক জন্ম দেয়া ।]

 

উল্লিখিত দুই ফিল্ড চ্যুতির ফলে চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় নেমে যাওয়ার ফলশ্রুতিতে মূল অথোরিটি বা সংগঠন প্রধানের সাথে শিক্ষা গ্রহণের (সংগঠন প্রধান মতাদর্শিক মূল সত্তা এবং অগ্রজ অথোরিটিগণ সহ অন্যান্য অথোরিটিগণ অনুসত্তা, ফলে অন্যসব অথোরিটির সাথে, সংগঠন প্রধানের সম্পর্ক শিক্ষা গ্রহণের) সাম্মানিক সম্পর্কের পরিবর্তে ব্যক্তি বিদ্বেষের ঘৃণ্য রূপ পাওয়ায় সে সংগঠন প্রধানের ব্যক্তিগত ক্ষত খুঁজে (যেহেতু মতাদর্শ ও সংগঠন যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়, সেটা সে ভুলে যায় এবং সাংগঠনিক মতাদর্শিক মানদ- না থাকায় ব্যক্তিই তার কাছে মুখ্য হওয়ায়) তাঁর ভাবমূর্তিকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে তাঁকে বিপর্যস্ত করার ঘৃণ্য পথে চলতে থাকে, ফলে সংগঠন প্রধান সহ সব অথোরিটিগণ এক প্রচণ্ড বৈরী ঝড়ের মধ্যে পড়ে যান ।

 

[এই অবস্থাটা যখন কোনো অঞ্চলের ক্ষেত্রে হয়, তখন তাকে সাংগঠনিক পরিভাষায় লবিং-গ্রুপিং বলে এবং তা যখন জাতীয় কিংবা কেন্দ্রীয় স্তরে ঘটে, তখন সে প্রবণতাকে উপদলীয় কোন্দল বলে । দুটো ক্ষেত্রে যে বা যারা তা শুরু করে, তাদের ক্ষেত্রে সবসময় দুটো অনিবার্যতা কাজ করে । তা হলো, দুই ফিল্ড চ্যুত হওয়া এবং এই বিচ্যুতির পূর্বে দেখা যাবে, বেশ কিছুদিন তারা সংগঠনের নামেই সংগঠনগত ভোকাবুলারিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চর্চার মধ্যেই কাটিয়েছে । আর এই চর্চা কোনো না কোনোভাবে উভয়ক্ষেত্রেই এক পর্যায়ে অথোরিটির বিরোধী অবস্থানে তাদের অজ্ঞাতে তাদেরকে নিয়ে যাবেই এবং যথারীতি প্রকাশ পাবে । কারণ ব্যক্তিবাদ কখনোই সাংগঠনিক সত্তার অনুবর্তী থাকতে পারে না ।

অঞ্চলিক ক্ষেত্রে (লবিং-গ্রুপিং) তা দেরিতে প্রকাশ পায় অর্থাৎ মূল অথোরিটি লবিংকে নির্মূল করতে সমন্বয় বা সিনথেসিস এর ভূমিকা পালন করার পর যে অংশটি তাঁর মতের বিপক্ষে গিয়ে আত্মমতেই অনড় থাকে, সেই অংশটি (সর্বদা দুটি চেতনাই স্পষ্ট হয়) লবিং-এর পূর্বে ব্যক্তিমতের চর্চায় ছিল, সেটা খোঁজ নিলেই তার সত্যতা বোঝা যাবে এবং মতাদর্শগত ভিত্তি থেকে নয় বরং ব্যক্তিগত ক্ষত উসকে ব্যক্তি সম্পর্ককে আশ্রয় করে, ব্যক্তি বিদ্বেষে শেষ পর্যন্ত মূল অথোরিটির বিপরীতেই অবস্থান নেয় । আর যদি সংগঠন প্রধান (এক্ষেত্রে ঐক্যতা বা সমষ্টির মূর্ত রূপ) বা মূল অথোরিটির সাংগঠনিক মীমাংসাতেই দৃঢ়ভাবে আস্থা স্থাপন করে, তবে নিশ্চিত যে- দ্বন্দ্ব ব্যক্তি থেকে নয় বরং সংগঠনগত প্রায়োগিক বিষয়কেই ঘিরে । যা তাঁদের পরবর্তীতে শিক্ষার মধ্য দিয়ে আরো এগিয়ে দেবে এবং ঐক্যতাকে (সংগঠন) আরো দৃঢ় করবে, অর্থাৎ মতাদর্শিক শিক্ষা সম্পর্কে এরা আস্থা ও শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং প্রয়োগিক ক্ষেত্রে উদ্ভূত দ্বন্দ্ব ছিল তাঁদের সংগ্রামী সচলতা ও চেতনাগত অগ্রগামী যোগ্যতারই প্রামাণিক নির্ণায়ক ।

কিন্তু জাতীয় স্তরে সর্বোচ্চ অগ্রজ অথোরিটিগণের মধ্যে যদি এই দ্বন্দ্ব (সংগঠন প্রধানের সাথে) চলে এবং তা যদি সংগঠনগত প্রায়োগিক ক্ষেত্রে হয়, সেটা তো মতাদর্শিক শিক্ষা অর্জনের প্রধান শর্ত, এই দ্বন্দ্ব দিয়েই বুঝতে হবে জাতীয় স্তর জীবন্ত, সজীব ও স্বাস্থ্যসম্মত, কর্মক্ষম, গতিশীল রয়েছে । বরং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক না চললে বুঝতে হবে সর্বোচ্চ স্তর মৃত অথবা প্যারালাইজ্ড । অর্থাৎ অন্ধ অনুকরণে সংগঠন প্রধান নির্ভর (ব্যক্তি নির্ভরতা ও ঘৃণ্য ব্যক্তিবাদ) হয়ে সংগঠনটা চলছে, যার অর্থ সংগঠন প্রধান মূল অথোরিটির আসনে বসে ব্যক্তিচাটুকারিতার নিকৃষ্ট ব্যক্তিবাদের জন্ম দিচ্ছেন । মতাদর্শ বা নীতির প্রশ্নে (দ্বিতীয় ফিল্ড) যেমন দ্বন্দ্ব হতে পারে না, হলে তা ব্যক্তিবাদের নিকৃষ্টতার প্রকাশ, তেমনি প্রায়োগিকের প্রশ্নে (প্রথম ফিল্ডভুক্ত) দ্বন্দ্ব না হলেই বরং তা অন্ধত্ব বা নিকৃষ্ট ব্যক্তিবাদ । উল্লেখ্য, সংগঠনগত প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অথোরিটি ও অনুগামী মতামতের ক্ষেত্রে সমস্তর ও সমমূল্যায়ন বহন করে কিন্তু যখন দ্বন্দ্বের উৎস ব্যক্তি চেতনা বা আত্মকেন্দ্রিকতা তখন সংগঠন (প্রথম ফিল্ড) নয় বরং তা নীতি বা মতাদর্শগত (দ্বিতীয় ফিল্ড) মূর্ত রূপ মূল অথোরিটিকেই জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আঘাত করে । অর্থাৎ নীতি বিরোধিতার পথে তার ব্যক্তি অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে ]

 

এ সময় সংগঠন প্রধান (জাতীয় স্তরে উপদলীয় কোন্দলের সংকেত স্বরূপ) অরক্ষিত হয়ে পড়েন এবং এই কোন্দল প্রথম প্রকাশ পায় সংগঠন প্রধানের প্রকাশিত বা উপস্থাপিত রূপ হিসেবে থাকা বোর্ড প্রধানগণের মধ্য দিয়ে । দুই ফিল্ড চ্যুতির পথ ধরে যখন এই অরক্ষিত বা কোন্দল অবস্থা (সাংগঠনিক সি.সি.) চলতে থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে দুই ফিল্ড অনুশীলন থেকে উঠে আসা সাংগঠনিক চরিত্র সম্পন্ন আপোসহীন, অমিততেজী মানবিকতা সম্পন্ন অগ্রগামীরা মতাদর্শগত উপলব্ধি বা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তা অনুধাবনপূর্বক বিক্ষুব্ধতায় ফেটে পড়ে অর্থাৎ দুই চেতনার দ্বন্দ্ব মুখোমুখি হতেই সংঘর্ষের আবহ সৃষ্টি হতে থাকে, একই সাথে ঐ মুহূর্তে সংগঠন প্রধান অরক্ষিত থাকেন বলে দুই ফিল্ড থেকে উঠে আসা অগ্রজরা প্রত্যক্ষভাবে তাঁর সীমানায় ঢুকে পড়ে । অর্থাৎ চেইনটা পুরোপুরি ভেঙে যেতে থাকে । যা সংগঠনের জন্য সর্বোচ্চ ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের সংকেত তুল্য হয়ে ধরা পড়তে থাকে ।

 

অভ্যন্তরীণ এই বিপর্যস্তকর প্রতিকূলতায় (সংগঠনের ধ্বংস ও জয় দুটোই নির্ভর করে ইন্টারনাল ম্যাটার-এর উপর) সংগঠন প্রধান বা মূল অথোরিটি সংগঠনকে রক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে থাকা সাংগঠনিক সর্বোচ্চ শক্তির উৎস আন্তঃগাঠনিক রূপের কাঠামোকে ব্যবহার করে সমস্ত প্রতিকূলতাকে দূর করে সংগঠনকে রক্ষা করেন । যে জন্য বলা হয়, সাংগঠনিক পথেই মতাদর্শিক দিশায় সংগঠন তার আপন সংকটের (এক্সটারনাল ও ইন্টারনাল) সকল মীমাংসা দেয়ার ক্ষমতাধর (ব্যক্তি নয়) । ব্যক্তি চেতনা বা চলমান সামাজিক চেতনা এখানে টিকতে পারে না । বাইরে থেকে নয় (চাপিয়ে দেয়া, উচ্ছেদের মতো বহিষ্কার নয়) বরং সংগ্রামের পথে ভিতর থেকেই সংগঠনগত ধারাতেই তা উচ্ছেদ বা মীমাংসা হয় ।

 

[উল্লেখ্য সংগঠনের গঠনকাঠামো হরিজন্টাল ও ভার্টিক্যাল উভয় পদ্ধতিকে রেখেই ইতিহাস বিশ্লিষ্ট পথে গড়ে তোলা হয়েছে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তার রূপ অনেকটা করাতের দাঁতের ধারালো সারির মতো ।]

 

সুতরাং আমরা বলতে পারি- সংকট যেমন আসে মতাদর্শিক দিশা অনুসারে, সংগঠনগতভাবে না চলা থেকে অর্থাৎ এক্ষেত্রে যেমন দুই ফিল্ড চ্যুতি থেকে, তেমনি তার মীমাংসাও হয় শুধু মতাদর্শিক দিশা হিসেবে সংগঠনগতভাবেই । সর্বক্ষেত্রেই মতাদর্শ ও সংগঠন, কোনো ক্ষেত্রেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিমত দ্বারা নয় ।

 

পরিশেষে এই বিচ্যুতি থেকে মুক্ত হওয়ার প্রশ্নে বলা যায়, সর্বক্ষেত্রেই মূল অথোরিটিই মানদণ্ড বিধায় তাঁর অবস্থানটা যখন নিজের মধ্যে টলে উঠবে তখনই সমস্ত সাংগঠনিক পের্পাস-পত্রিকা (দ্বিতীয় ফিল্ড) স্বল্প সময়ের মধ্যে গভীরভাবে পড়ে ফেলতে হবে এবং পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফিল্ড ওয়ার্ক (প্রথম ফিল্ড)-এ ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং এই ওয়ার্ক-এর মাধ্যমে উঠে আসা ফিল্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা ও দায়িত্ব নিয়ে অপরাপর (প্রসঙ্গ সম্পৃক্ত) সংগঠকদের সাথে চর্চা ও সিটিং-এ ডুবে যেতে হবে । একটা সময় সে নিজেই শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে সবাইকে পথ দেখাবে । এভাবে যোগ্যরাই শুধু সংগঠনে টিকে থাকে, অযোগ্যদের বিচ্ছিন্নতার অনিবার্যতাও এক সময় বেজে ওঠে ।

 

সেই সাথে যে অগ্রজ অথোরিটিদের (জাতীয় স্তর) কর্মধারায় আজকের সমস্ত সংগঠক তথা সংগঠনের জন্ম, তাঁদের যেন স্খলন না হয়; তার জন্য তাঁদের অবদানকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও সাংগঠনিক জন্মগত ঋণগ্রস্ততা পূরণে আমৃত্যু অখণ্ড থাকার শপথকে রক্ষার শর্তে, সর্বস্তর থেকে প্রতিটি সংগঠককে নিয়মিত ও যথাযথভাবে রিপোর্ট-রেকর্ড পাঠাতে হবে । পুনশ্চঃ যে রিপোর্ট-রেকর্ড করে না, সে মুক্তিজোট করে না- যার মধ্যে প্রশ্ন নেই (নিজের মধ্যে নিজ সম্পর্কে, যা ব্যক্তিক রিপোর্ট; নিজের সাথে অন্যদের সম্পর্ক, যা পারস্পরিকতা সংঘবদ্ধতা বা সাংগঠনিক রিপোর্ট এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কিত প্রশ্ন যা জাতীয়, আন্তর্জাতিক তথা সংগ্রামে প্রেক্ষিত ও প্রভাব), তার মধ্যে মুক্তিজোটের শপথ নেই ।

 

অথোরিটির আসনে বসে থেকে আত্ম বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার চর্চা করলে, নিজেই নিজের আসন ও শপথের সাথে বেঈমানী করার সমতুল্য এবং অনুগামীর দ্রুত গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে আনন্দিত না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবলে সেটা যে কতো বড় ধরণের নিকৃষ্টতা এবং দীর্ঘদিন অথোরিটির আসনে বসে সে সংগঠনের সাথে চরম বেঈমানী করেছে, সেটাই প্রমাণিত হয় এবং তখন সে হয়ে পড়ে পুরো সংগঠনের কাছে ঘৃণ্য, সেই সাথে সংগঠনের পথ ধরে সমগ্র দেশে । ভণ্ডামি কখনও নিখুঁত হয়না, অনুগামীকে সন্তান ভাবলে তার মধ্যে লীন হওয়ার, তাদের মধ্যেই নিজেকে দেখা, নিজের অস্তিত্ব খোঁজার সংগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আসতে পারে না । সন্তান না হলে যেমন কেউ মা হয় না, বন্ধ্যা হয়ে থাকে, তেমনি সন্তান গড়ে ওঠার মধ্যেই মায়ের সার্থকতা, সর্বক্ষেত্রেই মানদণ্ড মতাদর্শ ও সাংগঠনিক সংঘবদ্ধতা ।

 

অথোরিটি এবং অনুগামীদের মাঝে সাংগঠনিক সংঘবদ্ধতায় মতাদর্শিক, পারস্পরিকতায় জীবন্ত উপলব্ধিগত অখণ্ডতার ক্ষেত্রে, যে যান্ত্রিকতা এবং বিশেষতঃ অথোরিটির আসনে বসে অনুগামীদের গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের মাথার উপরে ছড়ি ঘুরানোর প্রবণতার বিরুদ্ধেই এবং সর্বক্ষেত্রে আত্মকে চর্চা ও সাংগঠনিক ঔদার্য্যরে ও সম্মানের সুযোগ লোটার ঘৃণ্য প্রবণতার বিরুদ্ধেই যতোটুকু সংগঠন ততোটুকুই বিকাশ এবং যতোটুকু বিকাশ ততোটুকুই প্রকাশ-এর নীতি অনুসারে বাস্তবতার কারণেই এত দিনের নিষ্ক্রিয় থাকা চেইন ইন লীড বা নির্বাহী প্রধান-কে কার্যকর করে তোলা হলো ।

 

নির্বাহী প্রধানের কার্যক্রম

অথোরিটি এবং অনুগামীর পারস্পরিক সংগঠনগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতাদর্শগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে ফিল্ড পর্যায়ে কতোটা প্রায়োগিক রূপ পাচ্ছে কিংবা কোনো ভুল বোঝাবুঝির অথবা কে সংগঠনের মধ্যে থেকেই সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত আছে, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের প্রশ্নে সংগঠনের সামগ্রিকতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়গুলি গোপন রিপোর্ট আকারে ইতোপূর্বে সংগঠন প্রধান (অস্থায়ী)-এর কাছে আসতো । কারণ ইতোপূর্বে সংগঠন ততোটা প্রসার লাভ না করায় এবং সংগঠকদের গড়ে তোলার প্রশ্নে আন্তরিকতার সাথে তাদের ভুল শুধরে তথা সতর্কতার প্রয়োজনে এ-দায়িত্ব সংগঠন প্রধান (অস্থায়ী) পালন করেছেন, কিন্তু সংগঠনের অগ্রগতি ও প্রসারের সাথে সাথে সমস্যাগুলো অনেকটাই এমন স্তরে এসে গেছে, যেখানে সংগঠন প্রধান (অস্থায়ী)-এর সমস্যা সমাধানে মুখোমুখি উপস্থিতি হওয়াটা অনিবার্য হয়ে পড়েছে, যেটা নীতিগতভাবে সংগঠনবিরোধী । কারণ সম্বাদ (Synthesis), বা মতাদর্শগতভাবে জাতীয় স্তরের মূল অথোরিটি যখন স্থানিক পর্যায়ে (জরুরি বা বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতিরেকে) সমস্যা সমাধানে বাদ-প্রতিবাদ বা (Thesis-Antithesis) এর মধ্যে নিজেকে নামিয়ে নিয়ে যান, তখন ঐ সমস্যা সমাধান হলেও মতাদর্শ এবং সংগঠনের সর্বোচ্চ রূপ (ঐক্যতার হাতিয়ার)-টা সাংগঠনিক সাথীদের মধ্যে ম্লান ও বিতর্কে জড়িয়ে যেতে পারে, যা সংগঠনের ভাবমূর্তিকে হুমকির সম্মুখীন করতে পারে । কারণ- তিনি মানে সমস্ত সংগঠন ও তাঁর অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত ভাবমূর্তি । সেক্ষেত্রে Thesis-Antithesis-এ নামাটা সাংগঠনিক সাথীদের গড়ে ওঠার পরিবর্তে পিছিয়ে দেয় ।

 

অন্যদিকে- কোনো সাথী সম্পর্কে তিনি যখন বলতে থাকেন, তখন তার কাছে এটা অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক মনে হতে থাকে । যে সংগঠন বৈজ্ঞানিক ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে এই মনে হওয়াটা তার সচেতনতার জন্ম না দিয়ে অন্ধত্বের জন্ম দেয়, যা সংগঠনবিরোধী ।

 

ফলে, বাস্তবতার কারণেই ফিল্ডগত কর্মকাণ্ডের নির্বাহক বা কাঠামোগত রূপকে সক্রিয়তা দিতে সাংগঠনিক সংঘবদ্ধতার রক্ষক হিসেবে জাতীয় স্তরে নির্বাহী প্রধান-এর পদ বিকাশ লাভ করে ।

 

জাতীয় সমন্বয়কারী

জাতীয় সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালনে কোনো বোনকে এখনও পর্যন্ত যোগ্যতম স্তরে গড়ে তোলা সম্ভবপর হয়নি । এর পিছনে মূল কারণ সেই আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিপ্রীতি এবং সংগঠনমুখিনতার পরিবর্তে ব্যক্তিমুখিনতা ও ব্যক্তিনির্ভরশীলতা ।

 

আঞ্চলিক সমন্বয়কারী

সাংগঠনিক পরিকাঠামোতে যেহেতু সহযোগী বা যুগ্মের অস্তিত্ব নেই, সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে মতাদর্শগত সাযুজ্যপূর্ণতায় স্বকীয়, স্বাধীন ও পরিপূর্ণ । তাই কৌশলগত কারণে যুগ্ম অঞ্চল প্রধান পরিস্থিতি সাপেক্ষে উঠে এলেও সংগঠনের ভিত অপেক্ষাকৃত মজবুত হওয়ার ফলশ্রুতিতে যুগ্ম অঞ্চল প্রধান-এর দায়িত্ব ও সৃষ্ট পদকে বিলুপ্ত করা হলো । এর পাশাপাশি আঞ্চলিক সমন্বয়কারী পদ সৃষ্টি করা হলো; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই-যুগ্ম অঞ্চল প্রধান, যিনি ছিলেন মূলতঃ সহযোগী, তা কখনো জাতীয় সমন্বয়কারীর সদৃশ নয় বরং জাতীয় সমন্বয়কারী পরিপূর্ণ একটি পদ এবং স্বকীয় কর্মক্ষেত্রে সম্পূর্ণ । 

 

আঞ্চলিক সমন্বয়কারীর অনুবর্তী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন- শিক্ষাঙ্গন সমন্বয়কারী, অর্থের দায়িত্ব পালনকারী প্রতিনিধি, আঞ্চলিক সার্বক্ষণিক প্রতিনিধি সহ ফিল্ডের কৌশলগত কারণে গড়ে তোলা যে কোনো পদাধিকারী । সেই সাথে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অঞ্চলে নির্বাহী প্রধানের প্রতিনিধিত্ব করবেন । কিন্তু উল্লেখ থাকে যে, জাতীয় স্তরে সংগঠন প্রধান যেমন সর্বোচ্চ, তেমনি অঞ্চলের ক্ষেত্রে অঞ্চল প্রধানই সর্বোচ্চ

 

কেন্দ্রীয় কমিটি (সি.সি.)

কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে উঠলেও সব অঞ্চলে তা একইভাবে সক্রিয় থাকেনি বিধায় সি.সি.ও সক্রিয় হতে পারেনি এবং সংগঠন থেকে অনেকে পিছিয়ে পড়ার ফলশ্রুতিতে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সমস্ত অঞ্চল কমিটির রিপোর্ট- রেকর্ড তথা সাংগঠনিক নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা হবে । যতোক্ষণ তা ঘোষিত না হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত পূর্বের অঞ্চল কমিটিগুলো বহাল থাকবে । আঞ্চলিক কমিটির উপর ভিত্তি করে যতোক্ষণ পর্যন্ত সি.সি. গঠিত না হচ্ছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সংগঠনের সমস্যা ও সংকটগুলোকে সম্পূর্ণরূপে দূর করা সম্ভব হবে না । অতএব সংগঠনকে বেগবান করার স্বার্থে অঞ্চলগুলো যেন তাদের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডে রিপোর্ট ও রেকর্ডকে সাংগঠনিক সততা ও সতর্কতার সাথে সংগ্রহ করে রাখেন । সি.সি. যে কোনো মূহূর্তে তা চাইতে পারে । উল্লেখ থাকে, যে সংগঠন অন্যান্য সংগঠনের মতো ভোটভিত্তিক কমিটি গঠন করে না । কারণ- অনেকে কমিটিতে ঢোকার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সাংগঠনিক সক্রিয়তা দেখাতে পারে, যাতে প্রমাণ হয় না- সে আদর্শগত ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে বরং সংগঠনে আসার দিন থেকে তার রিপোর্ট-রেকর্ড যাচাই বাছাই এবং তার বর্তমান অবস্থানের চুলচেরা বিশ্লেষণ পূর্বক নেতৃত্বে আনা হয় । কারণ, আমরা বিশ্বাস করি- অতীত থেকেই উঠে আসে বর্তমান এবং বর্তমানের উপরেই নির্ভরশীল আগামীর সম্ভাবনা, আর তাই আগামীর অগ্রগামিতার স্বার্থে অতীত, বর্তমানের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে নেয়া সিদ্ধান্তই শুধু আগামীর সেই নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে । তাই শুধু বর্তমানের অবদানে অন্ধ হয়ে ভেসে যাওয়া নয় বরং সংগঠন শুরুর দিন (সে দু’মাসও হতে পারে) থেকে বর্তমান পর্যন্ত রিপোর্ট-রেকর্ড, অপেক্ষাকৃত সঠিকতা দিতে পারে ।

 

আর্থিক

যদিও গঠনতন্ত্রে ঘোষিত যতোটুকু সংগঠন ততোটুকু অর্থায়ন- যাতে প্রমাণ করে সংগঠন সেই পরিমাণ প্রসার হয়নি, হলে অর্থনৈতিক এই দৈন্যতা থাকতো না । কিংবা সংগঠন যতোটুকু প্রসার লাভ করেছে, সেই পরিমাণ সক্রিয় ও গুণগতভাবে অগ্রগামী সংগঠক তৈরি হয়নি । কারণ আমরা সক্রিয় বলতে বুঝি রিপোর্ট, রেকর্ড ও সভ্যচাঁদা প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়মিত হওয়া । সাংগঠনিক সংকটের সমাধান সাংগঠনিক পথেই দিতে হবে, সেই নির্দিষ্ট প্রত্যয় অনুসারে আমরা দেখেছি বিশেষতঃ অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততার মধ্যে খোদ সংগঠন প্রধান থেকে শুরু করে অঞ্চল প্রধানরা পর্যন্ত যতোটুকু সংগঠনততোটুকু অর্থায়ন কিংবা সাংগঠনিক সংকটের সমাধান সাংগঠনিক পথেই দিতে হবে- এই প্রত্যয় অনুযায়ী সাংগঠনিক প্রসার ও সক্রিয়তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকটের মীমাংসা করার পরিবর্তে তাঁরা ব্যক্তি নির্ভরশীলতায় নিজের মতো করে সমস্যার সমাধান দিতে চেয়েছেন, অর্থাৎ সংগঠন নির্ভরতার পরিবর্তে ব্যক্তি নির্ভরতা এবং মতাদর্শিক মানদণ্ড দ্বারা নির্দিষ্ট পথে না হেঁটে নিজের মতো করে ব্যক্তি-ইচ্ছা দ্বারা চালিত হয়েছেন । যা থেকে বোঝা যায়, সংগঠন প্রধান বা মূল অথোরিটি (বড়দা) থেকে শুরু করে অঞ্চল প্রধানরা পর্যন্ত মতাদর্শিক প্রতিনিধিত্বের আসনে থেকেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কখনো কখনো মতাদর্শিক মানদণ্ডের পরিবর্তে নিজের ব্যক্তি-ইচ্ছার মতো করে এবং সাংগঠনিক নির্ভরতার পরিবর্তে ব্যক্তি নির্ভরতায় সংগঠনগত ঘোষিত প্রত্যয় ও পথ থেকে বিস্মৃত হয়ে সংগঠন সংকটের মীমাংসা দিতে চান, যা সংগঠনকে এগিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পিছিয়ে দিয়েছে । অনেক সময় অঞ্চল প্রধানরা সভ্যদের সাংগঠনিকভাবে সম্মিলিত চাঁদার উপর নির্ভর না করে, নিজেদের পকেট থেকে অর্থ দিয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালনা করেন, যা আপাতদৃষ্টে সংগঠনকে এগিয়ে দিচ্ছে মনে হলেও, তা আসলে সংগঠনকে ব্যক্তি নির্ভরতার পথ ধরে পিছিয়েই দেয়, সেই সাথে বলা আছে একশত টাকা (দশজনের সম্মিলিত চাঁদা ১০×১০ = ১০০) তোলার ক্ষেত্রে আপনার কাছে যদি দেয়ার মতো দুইশত টাকা থাকে, তবে ঐ একশত টাকা তুলতে প্রয়োজনে আপনার কাছে থাকা দুইশত টাকাই খরচ করুন, কিন্তু পকেট থেকে একশ টাকা দিয়ে দায়মুক্ত হবেন না । কারণ-সংগঠন মানে সম্মিলিত এবং সংঘবদ্ধতা গড়ে তোলা, আর্থিক শেয়ারে সংগঠনটা সবার হযে পড়ে । কিন্তু আপনার নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে দিতে একসময় সংগঠনকে নিজের পকেটের ভাবতে পারেন ।

 

এক্ষেত্রে, নতুন বা বিশেষ পরিস্থিতির কথা আলাদা, কিন্তু সাধারণ অর্থে সর্বদা সম্মিলিত মানসিকতাকেই গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে ।

 

নতুন ইউনিট সভ্যদের কাছে সভ্যচাঁদা চাওয়া নিষেধ, যতোক্ষণ সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ থেকে আর্থিক শেয়ারে না আসে ততোক্ষণ পর্যন্ত প্রতীক্ষা করতে হবে; কারণ অর্থ সম্পর্ক নষ্ট করে না, সম্পর্ক যাচাই করে । এক্ষেত্রেও সে কতোটা সংগঠনকে নিজের করতে পেরেছে, তার মানদণ্ড তার আর্থিক শেয়ার ।

 

ইউনিট ফরম পূরণ করুন

সভ্যচাঁদা নিয়মিত করুন

 

এই কথার অর্থ- যতোটুকু সংগঠন ততোটুকু অর্থায়ন, অর্থাৎ সংগঠন প্রসার করেই (ইউনিট ফরম পূরণ) অর্থনৈতিক এ প্রতিকূলতাকে রুখতে হবে । সংগঠনটা যেহেতু সবার, তাই সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা ও সক্রিয়তার দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁরা তাদের সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে শুধু অর্থনৈতিক দৈন্যতাই নয়, যে কোনো বিভ্রান্তি বা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এবং সংগঠনটা যাঁদের (প্রকৃত সংগঠকদের), তাঁরাই প্রয়োজনে জীবন দিয়েও তা রক্ষা করবে ।

 

সর্বক্ষেত্রেই ব্যক্তি নয় বরং সাংগঠনিক পথকেই আঁকড়ে ধরুন এবং নিজের মতো করে নয় বরং মতাদর্শিক দিশায় পথ হাঁটুন ।

 

সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড

কারো সংস্পর্শে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে সংগঠনকে গভীরভাবে ভালোবাসা, সংগঠন করার প্রাথমিক শর্ত হলেও সংগঠনে আমৃত্যু থাকা অর্থাৎ সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার স্থায়িত্বের প্রশ্নে- চেতনাই মূলভিত্তি ও শর্ত । সুতরাং সংগঠন ও সংগ্রাম যখন আমৃত্যু জীবনের জন্যই, সামগ্রিক জীবনের সমগ্রতাই যখন তার বৈশিষ্ট্য, তখন চেতনা বিনির্মাণের সাংস্কৃতিক পথই তার লক্ষ্যে পৌছানোর নির্ধারণী শক্তি । ফলে জাতীয় কর্মশালা, অবিরত পাঠচক্র, কালায়নের নিয়মিত প্রকাশ তার অনিবার্য শর্ত ।

 

জাতীয় কর্মশালা

উল্লিখিত শর্তপূরণেই জাতীয় কর্মশালা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া হয়েছে । যার ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় জাতীয় কর্মশালা-২০০৩ সহ আঞ্চলিক কর্মশালাগুলোও সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও আঞ্চলিক এবং জাতীয় ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলেই কর্মশালা চালানো হবে । যে কোনো দায়িত্বপূর্ণ অঞ্চলই এই একটা ক্ষেত্রে অস্তিত্বের প্রশ্নে কোনো রকম গড়িমসি করার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছে । যার ধারাবাহিকতায় প্রত্যেকটা অঞ্চলেই কর্মশালার আয়োজন করা হবে । জাতীয় সমাবেশ না হওয়ার যাবতীয় দুর্বলতার বিরুদ্ধে কর্মশালাই ছিল প্রাণ সঞ্চারের একমাত্র পথ । গত জাতীয় কর্মশালার সেই প্রামাণিক দৃষ্টান্তই প্রত্যেকটা অঞ্চলে অনুসরণ পূর্বক নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করার নির্দেশ দেয়া হলো ।

 

অবিরত পাঠচক্র

সংখ্যাগত দিক থেকে মুক্তিজোট অত্যন্ত দ্রুত প্রসারমান এক সংগঠনের রূপ নিলেও, প্রত্যেকটি ইউনিট পর্যায়ে অবিরত কনভিন্সের সাথে, অবিরত পাঠচক্র না চালানোর ফলশ্রুতিতে আমরা সেই সংখ্যাগত দিকটাকে গুণগত পরিবর্তনে পরিবর্তিত করতে পারিনি । যার ফলশ্রুতিতে ঐ সংখ্যাটিকে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি । কারণ- স্থায়িত্বের মূল শর্ত যে চেতনা, তা প্রথম শুরু হয় অবিরত পাঠচক্রের মধ্য দিয়ে । সংখ্যাগত দিকটা সামনে রেখে যেমন নিয়মিত কনভিন্স করার নির্দেশ ছিল, একই সাথে পাঠচক্র (ইউনিট অর্থাৎ এক থেকে এগারো হওয়া পর্যন্ত আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু) অবিরত না চালানোর ফলশ্রুতিতে এক পর্যায়ে কনভিন্সও স্থবির হয়ে পড়ে, ফলে এবার থেকে অবিরত কনভিন্স-এর সাথে ইউনিট পর্যায়ে অবিরত পাঠচক্র চালানোর নির্দেশ দেওয়া থাকলো ।

 

কালায়ন

সাংগঠনিক মুখপত্র হলো শ্রেষ্ঠ সংগঠক, কারণ সে একই সাথে অনেক সংগঠকের চেতনাকে ধারণ ও সমন্বয় করে সাথীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে- একটা সংগঠন কতোটা গতিসম্পন্ন, কতোটা ভালো আছে, সেটা তার মুখপত্রের প্রকাশ রীতি ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যেই প্রমাণ করে । চেতনা বিনির্মাণের সংগ্রামে মুখপত্রের কোনো বিকল্প নেই । কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্যতার রুদ্ধদ্বার উন্মোচন করে আমরা তার অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারিনি । এ থেকেই বোঝা যায়, সংগঠন কতোটা নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে ছিল । তারপরও সংগঠনের নব গতি সঞ্চারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ত্রৈমাসিক কালায়ন প্রকাশে সমস্ত লেখাগুলোকে সংগৃহীত করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই জাতীয় স্তরে প্রথম কালায়ন প্রকাশিত (শুধু সভ্যদের জন্য) হতে যাচ্ছে । কালায়ন ত্রৈমাসিক হলেও, তা গুরুত্ব অনুযায়ী মাসিক আকারে প্রকাশ করার কথা ভাবা হচ্ছে । যদিও তা সম্ভব হবে কি না সেটা এই মুহূর্তে বোঝা না গেলেও কালায়ন নিয়মিত প্রকাশ হবে, এই সিদ্ধান্তে সংগঠন অটল রয়েছে ।

 

কনভিন্স প্রসঙ্গে দিকনির্দেশনা

আমরা জানি, সাংগঠনিক গুণগত উৎকর্ষতা বা সাংগঠনিক সক্রিয়তা একটা জায়গায় স্থির থাকতে পারে না । অতএব তা যখন কনভিন্সের মাধ্যমে সাংগঠনিক প্রসারের ব্যস্ততার পরিবর্তে থেমে যায়, তখন সেই গুণটা পারস্পরিক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ক্ষত খোঁজার কাজে (মস্তিষ্ক) ব্যস্ত থাকবেই, অর্থাৎ আলস্যে তা হয়ে যায় বদগুণ বা শয়তানী । এজন্য সর্বদা কনভিন্সের মধ্যে সেই সাংগঠনিক গুণকে গুণের স্তরেই রাখতে হয় । সুতরাং তাকে বদগুণ বা শয়তানের স্তরে নামিয়ে দেয়ার অলসতা সৃষ্টি করা যাবে না । সেক্ষেত্রে সর্বদা তাকে প্রসার বা সম্মুখের পথই খুলে দিতে হবে ।

 

এ পর্যায়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, এক একটা শিক্ষাঙ্গনে কনভিন্স বা টার্গেট করার মতো সংখ্যা (ইউনিট র্ফমের নির্দেশ অনুযায়ী) খুব বেশি থাকে না । আর তাই গুণকে গুণের স্তরে রাখতে সংগঠনের দ্রুত প্রসারের লক্ষ্যে নির্দেশ থাকছে- যার যার পারিবারিক বা ব্যক্তি সম্পর্কের মাধ্যমে অপরাপর শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অবশ্যই ছড়িয়ে পড়তে হবে । ব্যক্তি পরিচয়ের পথ ধরে সেই সমস্ত শিক্ষাঙ্গনে বন্ধুদের সাথে চিঠি এবং অবশ্যই সময় করে সশরীরে হাজির হয়ে এমন তিন জনকে গড়ে তুলতে হবে, যাঁরা নিজেরাই স্বকীয় নেতৃত্বে তার শিক্ষাঙ্গনে সংগঠন গড়ে তুলতে পারবে এবং নিজ থেকে সি.সি.-র সাথে যোগাযোগ করবে । বিশেষতঃ সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ঐ তিন জনকে এগারো জনের টার্গেট অর্থাৎ একটা ইউনিট পরিপূর্ণ করার নির্দেশ (নির্দিষ্ট সময় বা ঐ এগার জনের সম্মিলিত সিটিং-এর তারিখ দিয়ে) রেখে তিনি ফিরে আসবেন এবং সি.সি. অথবা তার শিক্ষাঙ্গনের কোনো অগ্রগামী নেতৃত্বকে নিয়ে উক্ত তারিখে অবশ্যই হাজির হবেন । যাঁরা প্রকৃত সংগঠক, সাংগঠনিক প্রসারের স্বার্থে নিজ শহর বা কাছাকাছি শিক্ষাঙ্গনগুলোতে তো বটেই এবং সমগ্র বাংলাদেশের দূরবর্তী শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও এই তিন থেকে এগারোর অর্থাৎ একটা সক্রিয় ইউনিট গড়ে তোলার প্রক্রিয়াতে সম্পৃক্ত হবেন । কঠোরভাবে প্রতিটা শিক্ষাঙ্গনের অথোরিটিদের প্রতি এই প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তোলার নির্দেশ থাকছে ।

 

সতর্কতা

ব্যক্তি সম্পর্কের বদলে সাংগঠনিক সস্পর্কে দৃঢ় হন । আঞ্চলিকতার বদলে জাতীয় সম্পর্কে একাত্ম হোন । যাবতীয় বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে অথোরিটির প্রতি আস্থাকে স্বচ্ছ রাখুন এবং সর্বক্ষেত্রেই শত জটিলতা ও বিভ্রান্তির মাঝেও স্বচ্ছ থাকতে মূল অথোরিটিকে (বড়দা) প্রাণসত্তার মতো আঁকড়ে থাকুন । উল্লেখ থাকে যে, সমস্ত অথোরিটির প্রতি আস্থা হারালেও মূল অথোরিটির প্রতি যদি আস্থা থাকে, তবে সে সংগঠনচ্যুত হবে না এবং অন্যান্য অথোরিটির প্রতি আস্থাও পুনরায় স্থাপিত হবে । কিন্তু অন্যদিকে, সব অথোরিটির প্রতি আস্থা থেকেও যদি মূল অথোরিটির প্রতি আস্থা হারায়, তবে সে শিকড়বিচ্ছিন্ন বা সংগঠনচ্যুত হয়ে পড়বে এবং অন্যান্য অথোরিটির প্রতি আস্থা বা সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য । তাই অথোরিটিদের নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করার প্রশ্নে, নিজের মধ্যে এবং অন্যান্য সাথীদের মাঝে অথোরিটির অবস্থানকে স্বচ্ছ ও শক্ত রাখতে হবে । অন্যের চোখ দিয়ে দেখা আর অন্যের কান দিয়ে শোনার বিভ্রান্তিগ্রস্ত ঘৃণ্যতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন এবং মূল সত্তাকে রক্ষা করতে কঠোরভাবে সাংগঠনিক চেইন অনুসরণ করুন । নতুন সাথীদের সংগঠন প্রধান-এর সঙ্গে দেখা হওয়ার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক চেইন অনুসরণ পূর্বক সর্তক হোন, সেই কারণে সাংগঠনিক হাউজ সহ তাঁর উপস্থিতির অবস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে অঞ্চল প্রধানআঞ্চলিক সমন্বয়কারীর অথবা কেন্দ্রীয় বোর্ড প্রধানদের অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো সাথীদের সাংগঠনিক হাউজ বা মূল অথোরিটির অবস্থান স্থানে আসার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিষেধ থাকছে ।

 

সেই সাথে বিশেষভাবে সর্তক করে দেয়া হচ্ছে যে, সাংগঠনিক পরিচয়ের সূত্রে কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর সাপেক্ষে সাংগঠনিক হাউজে অবস্থান করতে পারবে না । যদি কেউ তা করে, তবে সেই দায়ভার সেই অঞ্চলের অঞ্চল প্রধান-এর উপরই বর্তাবে ।

 

পূর্বঘোষিত সতর্কতা, সাল-২০০০ঃ 

[অনেক সভ্যই এ সংগঠনকে অন্যান্য রাজনৈতিক বা সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে মেলাতে চান, যা তারা শুধু ভুলই করেন না, এটা সংগঠনবিরোধীও বটে । যদিও আমরা স্পষ্ট বলেছি, এটা প্রথাগত অর্থে অ-রাজনৈতিক, সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠন । কিন্তু তথাপিও এ সংগঠন সম্পূর্ণই আলাদা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন । পরিকাঠামোগত সংহতকরণ ও মতাদর্শিক বিকাশের উপর নির্ভর এ সংগঠনের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নির্ভরশীল, যা উপমহাদেশে প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি ।

মুক্তিজোট ভিন্ন, স্বতন্ত্র এবং ব্যাপক । সে-ই শুধু তার শেষ কথা বলার ক্ষমতাধর । সব অপশক্তির বিরুদ্ধে অহিংস’র হৃদ্স্পন্দিত সুনির্দিষ্ট আদর্শ সম্পৃক্ত পরিকাঠামোই সংগঠনের হাতিয়ার, মানবিক মমত্বই তার ভিত এবং বিকাশের ধারায়- আন্তঃগাঠনিক তত্ত্বই এর নিরাপত্তার ও শক্তির উৎস এবং আগামী সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানে, তা ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনে শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ।]

 

সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে, সংগঠনের ভিতরে এবং বাহিরে সব বিভ্রান্তকারী সর্বদা ব্যক্তিকেই আক্রমণ করবে । কিন্তু সংগঠন ও সংগ্রাম ব্যক্তি নয়, মতাদর্শের উপর নির্ভরশীল, তাই প্রয়োজনে যে অন্যায় (সংগঠন প্রধানও যদি করেন) করেছে তাকে বের হয়ে যেতে হবে । কিন্তু মতাদর্শ যেহেতু ঠিক, তাই আমি সংগঠনচ্যুত হতে পারি না কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিভ্রান্তিতে আমিও ব্যক্তিবাদের খপ্পরে পড়ে আদর্শচ্যুত হতে পারি না [কিন্তু সর্বদা নীতিগতভাবেই সর্বক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, যতোক্ষণ পর্যন্ত একজন সংগঠন প্রধান-এর দায়িত্বে রয়েছেন (এখন যেমন অস্থায়ীভাবে বড়দা) ততোক্ষণ পর্যন্ত আমি যাবতীয় বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে তাঁর সপক্ষে দৃঢ়বদ্ধ এবং আদর্শিক বিশ্বাসে অবিচল আস্থায় তাঁর সাথে একাত্ম ও শপথবদ্ধ] সর্বক্ষেত্রেই নিজের মধ্যে এই মতাদর্শগত নির্ভরশীলতাকে আত্মস্থ ও চালিত হওয়ার পথকেই দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরুন ।

 

প্রিয় সহযোদ্ধা ও সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দঃ

পরিশেষে আজকের এই সমাবেশ আত্মিক বন্ধনের পারস্পরিকতায় উষ্ণিল মহান উৎসবে পরিণত হোক, সচেতন সুশৃংখলতায় তা সর্বাত্মক সফল হোক; এই প্রত্যাশার সাথে পুনশ্চঃ ধ্বনিত হোক, ব্যক্তি কেন্দ্রিকতার বদলে সাংগঠনিক নির্ভরতা গড়ে তুলুন, আত্মকে ধ্বংস করতে মতাদর্শে লীন হোন ।

 

ইউনিট র্ফম পূরণ করুন

সভ্যচাঁদা নিয়মিত করুন ।

“নিজের শিক্ষাঙ্গন পেরিয়ে অপরাপর শিক্ষাঙ্গন সহ

সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুন ।”

“নিজের মধ্যে অবিরত প্রশ্নে নিজেকে গড়ে তুলুন

সাংগঠনিক ফিল্ডে ঝাঁপিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করুন ।”

“অস্ত্র নয় কলমকেই হাতিয়ার করুন

রাজপথ নয় টেবিলকেই আশ্রয় করুন ।”

“কনভিন্সের পথে জীবনকে দখল করুন

এবং বিলিয়ে দিন ।”

“অবিরত পাঠচক্রের আড্ডায়

নিজেদের চেতনাকে শাণিত করুন ।”

সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতার স্লোগানে-

সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থানকে অনিবার্য করে তুলুন ।

“ধরিত্রীর বুক জুড়ে সর্বত্র শান্তি নামুক

অহিংস’র দীপ্ত বাণী বিশ্বমাঝে ছড়িয়ে পড়ুক

মানুষ ও মনুষ্যত্ব মুক্তি পাক, মুক্তি পাক ।”

সবাইকে আবারও অভিনন্দন ও অন্তরস্পর্শিত সাম্মানিক শুভেচ্ছা দিয়ে শেষ করছি ।

সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অমর হোক

সামাজিক আন্দোলন সফল হোক

মুক্তিজোট অমর হোক

বাংলাদেশ অমর হোক, অমর হোক ।

 

                শুভেচ্ছান্তে

            আবু লায়েস মুন্না

         পরিচালনা বোর্ড প্রধান

    বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট

 

 

[উল্লেখ্য, বর্তমান রিপোর্টটি, প্রথম ধাপের- প্রথম, দ্বিতীয়, ও তৃতীয় রিপোর্ট সহ পূর্বতন সকল রিপোর্ট সম্পৃক্ত বিধায় বিশেষতঃ দ্বিতীয়, তৃতীয় রিপোর্ট না পড়ে অত্র চতুর্থ রিপোর্ট সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বোধ আসবে না । তাই যথাযথ অর্থবহতার প্রশ্নে দ্বিতীয়, তৃতীয় রিপোর্ট সম্পৃক্ত করে চতুর্থ রিপোর্ট পড়ার নির্দেশ থাকলো ।]

 

উপস্থিত সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দ,

মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে অবিরত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের আদর্শিক দিশায় দৃঢ়বদ্ধ, অহিংস’র দীক্ষামন্ত্রে দীক্ষিত, সামাজিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেবার শপথে ঘোষিত, সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানের মহতী লক্ষ্যে, সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতার স্লোগানে সঙ্ঘবদ্ধ বন্ধুরা, আজ যাঁরা উপস্থিত হয়েছেন এই সম্মেলন কক্ষে, গ্রহণ করুন তারুণ্যের হৃদ্স্পর্শিত শুভ্র শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।

 

অন্তরতম সাথীরা,

দেশ ও জাতির ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারময় দুঃসময়ের বিরুদ্ধে, বারে বারে প্রতিবাদে-প্রতিরোধে গর্জে ওঠা দেশমুক্তির, ত্রাতার বিবেকী সেনার মহতী আসনে আসীন- চিরকালীন তারুণ্যের কাঁধে আজ চেপে বসেছে, চলমান দেউলিয়া রাজনীতির জঠরজাত দুই ঘৃণ্যতা- ‘হিংসা’ ও ‘নেশা’ । তারুণ্য ভুলেছে তার ঐতিহ্য, বিস্মৃত হয়েছে তার ইতিহাসের পাতায় থাকা অগ্রগামিতার সব চিহ্ন, আগুয়ানের আলোকময়তার সমগ্র অর্জন, দিশা হওয়ার বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হওয়ার সব অহংকার ও দম্ভকে । তারা চরম নির্লিপ্ততায় মেনে নিচ্ছে, নেশা ও হিংসার দুই মিথ্যা দায়কে এবং পিষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক দলবৃত্তির দেউলিয়াত্বে জন্ম নেয়া নেশা ও হিংসার সর্বগ্রাসী থাবায় । দেশ ও জাতি ভুলেছে নেশা ও হিংসার আসুরিক মূল উৎসকে, উল্টো অবিশ্বাসময় অভিযোগের ভ্রুকুটি কাটছে ছাত্র-যুব-তারুণ্যকে ঘিরেই, আর তারুণ্যও ভুলেছে তার অগ্রগামিতার চিহ্নকে । তাই আমরা আজ সর্বোতঃভাবেই বিস্মৃতির বেনোজলে ভাসমান- শিকড়হীন সমকালীন প্রজন্ম । আর আড্ডা হলো এই বিস্মৃতিময় কালো অধ্যায়ের আঁতুড় ঘর, যেখান থেকে শুরু হয়- জন্ম নেয় আমাদের ভাসমান প্রজন্ম হওয়ার ঘৃণ্য শিকড়হীনতা, বোহেমিয়ানায় ভেসে যাওয়া ।

 

সমকালীন দুঃসময়ের শিকার হতে হতেও আমরা থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলাম নিজেদেরকে “আমরা কারা? কোথায় আমাদের অনাগত গন্তব্য?” অতঃপর বিস্মৃতির ধূলিধূসরতাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে জেনেছিলাম আমরা কারা, খুঁড়ে এনেছিলাম আমাদের পরিচয় এবং তারুণ্যের সদম্ভ অস্তিত্বে ইতিহাসনিষ্ঠতায় জেনেছিলাম আমাদের বিজয়ী গন্তব্য । আর এভাবেই অনাগত বিজয়ের লক্ষ্যাভিমুখিনতায় হয়েছিলাম দৃঢ়বদ্ধ এবং বৈজ্ঞানিক দিশায় আমরা সংঘবদ্ধতার পথে, গত ২৪শে নভেম্বর-২০০০ খ্রিঃ সহস্রাব্দের যুগসন্ধিতে ঘোষণা করেছিলাম-‘সচেতন সামাজিক শক্তি’ উত্থানের পাল্টা ইশতেহার । সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শাণিত পথে, মুক্তির সওগাতবাহী চেতনার স্ফুরিত উচ্চারণে, সামাজিক আন্দোলনের প্রত্যয়ে ডাক দিয়েছিলাম ‘নেশামুক্ত তারুণ্য পেতে দেশজ চেতনায় সুস্থ আড্ডা গড়ে তুলুন’ ।

 

সেই মহতী যুগসন্ধিক্ষণে সমকণ্ঠে ধ্বনিত নেশা ও হিংসার বিরুদ্ধে উচ্চকিত স্লোগান-‘সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা চাই’- কে ছড়িয়ে দিতে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সমগ্র দেশব্যাপী । শিক্ষাঙ্গন থেকে পড়ার টেবিল, টেবিল থেকে লাইব্রেরি অতঃপর স্বদেশব্রাত্যে প্রতি জনপদে, মানবমুক্তির মহামন্ত্রে- বৈশ্বিকতায় দিকে দিকে । সেই মহতী লক্ষ্য পূরণের অবিরত পথচলায় চার বছর পেরিয়ে এসেছি । এই বন্ধুর পথচলায় আমরা যা কিছু পেয়েছি, বাধা থেকে বাধা অতিক্রমণের বোধগম্যতা, কষ্ট থেকে কষ্ট মুক্তির দুর্বিনীত প্রতিজ্ঞা এবং সীমাভাঙা বাস্তব ভিতে গড়া অনাগত বিজয়ের অনিবার্যতায় প্রাপ্ত- প্রত্যয়ী স্বপ্নের অগ্নিভ প্রেরণা । সেই সব সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা এবং অগ্রগামিতার শর্তে প্রোজ্জ্বল অভিজ্ঞতাকে দিশা হিসেবে প্রকাশ করছি তাদের কাছেই, যাঁরা মাতৃরূপ স্বদেশের একই উদরে জন্ম নেয়ার শর্তে আমাদের সহোদর ও সচেতন যন্ত্রণায় সমদগ্ধ, অশ্রু-ক্রোধে সঙ্ঘবদ্ধ, প্রতিরোধের একই মন্ত্রে দীক্ষিত এবং এই সমকালীন দুঃসময়কে রুখে দিতে- এই আদর্শিক যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা, যাঁরা সাংগঠনিক অখণ্ডে একাত্ম ও দৃঢ়বদ্ধ; যা সাংগঠনিক পরিভাষায় সামষ্টিক চেতনার সংহতকরণে ‘যৌথচেতনা’ হিসেবে গৃহীত ।

 

আদর্শিক সহযোদ্ধাবৃন্দ,

উক্ত লক্ষ্যনিষ্ঠ বিকশিত আদর্শিক এই বৈজ্ঞানিক ধারাকে আরো বেগবান এবং পরিপূর্ণ করার লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য গৃহীত সাংগঠনিক ‘যৌথচেতনা’র শর্ত পূরণে, গুরুত্বপূর্ণ পথ নির্দেশনা ঘোষণার পূর্বে প্রথমেই সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাই আমাদের প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক “বড়দা” কে, যিনি এই মহতী সংগ্রামের পথে মতাদর্শিক সত্তায় অস্তিত্বপূর্ণ দিশা হয়ে জাগরুক- আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে । লক্ষ্যের প্রতি অবিচল আস্থা গড়তে, যাবতীয় বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের প্রতিকূলতাকে পরাভূত করে, আদর্শিক বিশ্বাসে দৃঢ় ও একাত্ম হওয়ার এই সাংগঠনিক ধারাকে অপ্রতিরোধ্য গতিসম্পন্ন করতে যাঁরা ছিলেন ‘পাঞ্জেরী’সম অতন্দ্র দিশারী, অভিনন্দন জানাচ্ছি সেই কন্ট্রোল বোর্ড প্রধান, এডিটোরিয়াল বোর্ড প্রধান এবং জাতীয় সার্বক্ষণিক প্রতিনিধিবৃন্দকে ।

 

শুভেচ্ছা জানাচ্ছি জাতীয় সমন্বয়কারীর আসনে উপবিষ্ট প্রতিনিধিকে । অভিনন্দন জানাচ্ছি সেইসব অগ্রণী সহযোদ্ধা, যাঁরা আদর্শিক আলোকবর্তিকা হাতে, লৌহদৃঢ় সংগঠন গড়ে তুলতে, অঞ্চল প্রধান এর দায়িত্ব পালন করেছেন সংগঠনের মাইলফলক বা আদর্শিক দৃষ্টান্ত ও দিশা হিসেবে ।

 

সর্বোপরি অবশ্যই সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি সমাবেশে উপস্থিত অঞ্চলসহ থানা, জেলা ও শিক্ষাঙ্গনসমূহের সর্বোচ্চ অগ্রণী নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনকারী অথোরিটিবৃন্দকে, যাঁরা মতাদর্শিক দিশায় সাংগঠনিক ভিত্তি স্থাপনে সদা সচেষ্ট থেকেছেন এবং তাঁদের অবিরত পথচলার সংগ্রামী ধারায় উৎসারিত, আজকের সমাবেশে উপস্থিত সম্মানিত সতীর্থ সকল কাউন্সিলরবৃন্দকে ।

 

প্রেক্ষাপট

মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিই আমাদের আদর্শিক লক্ষ্য । সে আদর্শিক লক্ষ্য পূরণের সংগ্রামী হাতিয়ারই আমাদের সংগঠন ।

 

আদর্শিক দিশা অনুসারে আমাদের সংগ্রামী পথচলায় গড়ে ওঠা সঙ্ঘবদ্ধতা তথা সংগঠন জন্ম নিয়েছে ইতিহাসনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ধারা মেনে । স্পষ্টতই আমরা মানুষ ও মনুষ্যত্বের সুনির্দিষ্ট আদর্শের এবং আমাদের সংগ্রামী সংঘবদ্ধতা দৃঢ়বদ্ধ সাংগঠনিক রূপে, সর্বোপরি আমরা বিজ্ঞান ও তার অগ্রগায়নের ।

 

মানুষ বলতে আমরা মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষকেই বোঝাতে চাইছি । স্পষ্টতই আমাদের কাছে মানুষের সংজ্ঞা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক জীব হিসেবে তথা চিরকালীন বাহ্যিকতাসম্পন্ন মানুষের সংজ্ঞাকে প্রতিফলিত করে না । আমরা মানুষ বলতে বোঝাচ্ছি সমাজবদ্ধ সেই মানুষকে, যে সমাজগত পরম্পরায় বেড়ে উঠেছে এবং অর্জন করেছে পারস্পরিকতা তথা সংস্কৃতিকে । আর সংস্কৃতি পরম্পরাগতভাবেই শুধু আসে না, বরং পারম্পর্যতায় প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক পারস্পরিকতার লক্ষ্যে নিয়ত সংগ্রামের মাধ্যমে করে নিতে হয়, এটাই মনুষ্যত্ব । সুতরাং মনুষ্যত্ব অর্জনে নিয়ত অন্বিতকরণের মাধ্যমেতাকে এগিয়ে নিতে হয় । মনুষ্যত্বই সাংস্কৃতিক শর্ত পূরণে দায়বদ্ধ । মানুষ তাই তার মনুষ্যত্বের পূর্ণতা পায় সাংস্কৃতিক শর্ত পূরণে । যার সংস্কৃতি নেই, তার মনুষ্যত্ব নেই এবং সংস্কৃতি একান্তই সমাজগত । সুতরাং সমাজমুক্তির সাথেই মনুষ্যত্বের মুক্তির শর্ত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে সংজ্ঞায়িত ও শর্তবদ্ধ ।

 

[যে কারণে ‘বড়দা’ বলেছিলেন, একটি শিশু কখনোই মানুষ নয়; কারণ তার সমাজ নেই, সংস্কৃতি নেই, পারস্পরিকতাও নেই, সে শুধু জৈবিক প্রয়োজনে তার মাকেই চেনে (সরল অভিযোজন/ দেহগত অভিযোজন) । যেখানে একটি পশুশাবকের সাথে তার কোনো পার্থক্য থাকে না এবং এই প্রয়োজনের পথ ধরেই সে মানবশিশু হিসেবে সহজাত বুদ্ধিবৃত্তিকতায় পরম্পরাকে চিনতে থাকে এবং ক্রমশঃ পরম্পরাগত ধারার সাথে সমাজগত পারস্পরিকতাকে অর্জন ও অন্বিত করে এগিয়ে যায় ।]

 

সংস্কৃতি, যার উৎসে সমাজবদ্ধ মানুষ এবং যার উৎসরণে মনুষ্যত্ব । আর এভাবে পারম্পর্যতা ও পারস্পরিকতার সাংস্কৃতিক অগ্রগায়নে গড়ে ওঠে সভ্যতা । তাই চলমান ব্যক্তিস্বার্থভিত্তিক যুথবদ্ধ এই পাশবিক সমাজের বিরুদ্ধে সুসভ্যত সামাজিক মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে অগ্রজ সভ্যতা বির্নিমাণেই আজ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত ও অনিবার্য ।

 

উল্লিখিত মানবমুক্তির ভিত হিসেবে গৃহীত সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে আমরা ব্যাপক অর্থে বলেছিলাম, সংস্কৃতি অর্থ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যাপিত জীবন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও তদানুসারে পারিপার্শিক পরিম-লে আবর্তিত তার জীবন সম্পর্কীয় ভাবধারা । জীবন সংশ্লিষ্ট চেতনাগত এই পরিম-লই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল । আর সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে তার জীবন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে যা কিছু এবং সমাজজীবনের অগ্রগতি বা মুক্তির লক্ষ্যে সমাজে বিদ্যমান এইসব বিষয়গুলির সাথে দ্বন্দ্বে সে যা কিছু বিকাশ সাধন করে, গড়ে তোলে বা গড়ে তুলতে চায়, প্রগতির ধারা বিনির্মাণে- তার সবটাই সংস্কৃতির অঙ্গীভূত । এই ব্যাপক অর্থে গৃহীত সমাজজীবনে ব্যাপৃত অর্থনীতি-রাজনীতি, ধর্ম-দর্শন, শিল্প-সাহিত্য বিষয়গুলোকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ও আদর্শের ভিত্তিতে যে সব ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা, তাকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলা হচ্ছে ।

 

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখা বা বলা যেমন ভুল ও সংগঠনবিরোধী, তেমনি একে নিছক শিল্প-সাহিত্যের রসালো আড্ডা কিংবা সংগ্রাম বিযুক্ত, লক্ষ্যবিহীন ধর্ম-দর্শন-অর্থনীতির গুরুগম্ভীর চর্চা কেন্দ্র ভাবা বা পরিণত করাটাও এই সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে সীমাবদ্ধ ও সাংগঠনিক লক্ষ্যকে বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়ার শামিল । জ্ঞানতত্ত্বের এই শাখাগুলো মিলেই গড়ে তুলবে এই আন্দোলনের লক্ষ্যনিষ্ঠ ধারা । তাই এসব এর অংশ, কিন্তু অংশ কখনোই সম্পূর্ণ নয়, নতুন না হলেও ইতিহাসের পটভূমি থেকে বিশ্ববীক্ষার দ্বারা নির্ধারিত ও নির্দিষ্টকৃত এ পথ স্বতন্ত্র এবং সমকালীন বাস্তবতায় তার রূপ নতুন- প্রায়োগিকতায় ভিন্ন ।

 

বিজ্ঞাননিষ্ঠ এই মতাদর্শিক দিশা অনুসারে চালিত সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ব্যক্তিক জীবন থেকে শুরু করে সামগ্রিক জীবনকে ঘিরে একজনের রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জীবনেও তা ব্যপ্ত হয় । অতঃপর ক্রম উত্তরিত এই ধারা সামাজিক বদলের শর্তকে পূরণ করেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তির লক্ষ্য সাধনে পূর্ণতা পায় ।

 

যেখানে মানুষ, সেখানেই মনুষ্যত্বের মুক্তিসংগ্রামে আমাদের কর্মকাণ্ড । বিজ্ঞানের যেমন জাতীয় সীমারেখা থাকে না তেমন তা থেকে উৎসারিত মতাদর্শিক দিশাও কোনো সীমা মানে না । এভাবেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে আমাদের মতাদর্শিক দিশার আলো ফেলে আমরা বিশ্লেষণ করি চলমান সমাজগত মানুষের ব্যক্তিক থেকে সামগ্রিক জীবন এবং রাষ্ট্রিক তথা জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক জীবনকে ।

 

জীবনের জন্য, জীবন থেকে উৎসারিত, সামগ্রিক জীবনের মাধ্যমেই যা মুক্তির সংগ্রামে পূর্ণ । মতাদর্শিক সে দিশা অনুসারে তাই তা সামাজিক জীবন প্রাসঙ্গিকতায় মানুষের ব্যক্তিক, সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক, আন্তর্জাতিক জীবনকে ব্যপ্ত করে এগিয়ে চলে যা মানুষের জন্য, মানুষের স্বার্থে মনুষ্যত্বের মুক্তিতে সামাজিক বদলে আজ যার আলোচনা অনিবার্য ও অপরিহার্য । এই অনিবার্য অপরিহার্যতাকে মূল্যায়ন করে ইতোপূর্বে (সাংগঠনিক রিপোর্ট-২০০৩ বা তৃতীয় রিপোর্ট) ‘প্রেক্ষাপটঃ আন্তর্জাতিক ও জাতীয়’ বিশ্লেষণপূর্বক তার সংকট আবিষ্কারে উত্তরণের ভিত হিসেবে আমরা ঘোষণা করেছিলাম, ‘আজ কেন্দ্রীভূত দানবীয় রাষ্ট্রকাঠামোর বিপরীতে চাই মানবীয় বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র (সংগঠন) কাঠামো । সংঘবদ্ধ হিংস্রতার বিপরীতে চাই অহিংস’র দীক্ষামন্ত্র, দেউলিয়া ও বিকৃতিগ্রস্ত রাজনৈতিক পথের বিপরীতে চাই সর্বব্যাপী সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ এবং আত্মস্বার্থের পাশবিক দলবৃত্ততার বিপরীতে চাই সামষ্টিক স্বার্থে আদর্শনিষ্ঠ লৌহদৃঢ় সংগঠন’ । রাষ্ট্রশক্তিকে রুখতে চাই সামাজিক শক্তি এবং তার বিকৃতিগ্রস্থ অবস্থানের বিপরীতে চাই দেশজ চেতনায় সমন্বিত জ্ঞানতত্ত্ব ।

 

প্রেক্ষাপটঃ আন্তর্জাতিক

আমরা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ও তার সংকট (তৃতীয় রিপোর্ট) বিশ্লেষণে সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণে থাকা হাতিয়ার যে রাষ্ট্রযন্ত্র, বিবর্তনের ধারায় বর্তমান স্তরে ক্রমশঃ তার দেউলিয়া হয়ে পড়া রূপকেই আবিষ্কার করেছিলাম। সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোকে সমাজবিমুখ মানবিকতাবিরোধী, ব্যাপক নাগরিক-ইচ্ছা বিরোধী এক দানবীয় স্বেচ্ছাচারী মদমত্ততাকে দেখেছিলাম, যা তার মৃত্যুপূর্ব মুমূর্ষুতার প্রমাণ সম্বলিত অস্বাভাবিকতারই প্রকাশ । অনেকটা ঠিক যেমন একটা কুকুর যখন প্রকৃতিগতভাবে তার নিজস্ব স্বাভাবিকতা হারিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হয়, তখন সে হিংস্র বা উন্মত্ত হয়ে উঠে । এক্ষেত্রেও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো ঠিক সেই স্তরে এসে পড়েছে । সমকালীন প্রেক্ষাপটে তা আরো বেশি স্পষ্ট হচ্ছে । বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রকটিত হওয়া প্রবণতাসমূহ দেখে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো সম্পর্কিত গত রিপোর্টে গৃহীত মতাদর্শিক সিদ্ধান্তসমূহের সঠিকতা ক্রমশঃ আরো ভয়ঙ্কর বাস্তব সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে ।

 

এক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর উন্নত, স্বাভাবিক ও সংহত এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকাঠামোর গঠনপ্রকৃতি যথার্থ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন । দৃষ্টান্ত হিসেবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে [বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণ কাঠামোর (Horizontal-Vertical) প্রায়োগিক দিশা অনুসারেই সংকটের কেন্দ্র আবিষ্কার চিহ্নিতকরণ (স্পষ্টত) শুরু হয় ঊর্ধ্ববিন্দু থেকে] গত রিপোর্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা বেছে নিয়েছিলাম । গত রিপোর্টে উল্লিখিত প্রবণতাকে স্পষ্টীকরণে স্বাভাবিকভাবেই এবারও সেদিকেই আমরা অনুসন্ধানে প্রামাণিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখবো ।

 

আমরা জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রচারণা প্রসঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বক্তব্য দিতে গিয়ে সমকালীন এক চরম সত্য প্রকাশ করে ফেলেছিলেন, ‘স্বেচ্ছাচারী না হলে ক্ষমতায় বসে কি লাভ’ । আর এক জায়গায় বুশ বলে বসেন, ‘আমি সমস্যার ভাগীদার না, আমি রিপাবলিকান’ । উপরোক্ত বক্তব্যের জন্য রিপাবলিকানরা যারপরনাই লজ্জাজনক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিলেন । এমন-কি এ নির্বাচন প্রসঙ্গে জোরেসোরে প্রতিপক্ষের প্রচারণীতে যে কথাটা উঠে এসেছিল তা হলো, মার্কিনীরা এমন প্রেসিডেন্ট আগে কখনো দেখেনি । এখানে বুশ কিংবা মার্কিন নির্বাচন আমাদের আলোচনার বিষয় নয় । বুশ এ-অংশে সবচেয়ে আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর অধিপতিত্বে থাকা এক প্রতিনিধি হিসেবে সেই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্নতার বর্তমান চরিত্রকে প্রকাশ করেছেন এবং প্রতিপক্ষরা রাষ্ট্রকাঠামোর চরম দেউলিয়া স্তর যা ইতোপূর্বে ঘটেনি, সেই স্তরের বৈশিষ্ট্যকেই প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন । এখানে পক্ষ-বিপক্ষ বা জর্জ বুশ তথা ব্যক্তি কোনো বিষয় নয় । অপরদিকে আমরা জানি, যা রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তাই রাজনীতি বিধায় সেই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোগত সম্পৃক্ততায় জন্ম নেয়া যে রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলবৃত্তির রায় অর্থাৎ সরকার নির্বাচন তার সংস্কৃতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ এই নির্বাচনকালীন সময়ে প্রকাশ হতে থাকে । 

 

এক্ষেত্রে তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনার বিষয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয় বরং নির্বাচন থেকে আমরা কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো ও কাঠামোগত সম্পৃক্ততায় জন্ম নেয়া আজকের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপ, তার বর্তমানের বাস্তব চিত্রই পাই, যা তৃতীয় রিপোর্টের সিদ্ধান্ত সমূহের বাস্তব প্রতিফলন ।

 

প্রথমতঃ আমরা জানি, রাষ্ট্র সমাজ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রবিশেষ যা উৎপাদন বা অর্থনৈতিক সম্পর্কের সাথে জনসমাজকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে শাসকের হাতিয়াররূপে কাজ করে । এই অর্থে রাষ্ট্র সমাজ বিবর্তনের ধারায় দাস সমাজ বদলে গিয়ে যখন সামন্ততান্ত্রিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এই বদলের সাথে সাথে রাষ্ট্রকাঠামোর গঠনপ্রকৃতিও বদলে গিয়ে পরিবর্তিত সামন্ততান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতার নিরিখে রূপান্তরিত হয় । আবার যখন সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে আধুনিক ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রাষ্ট্রকাঠামো বদলে গিয়ে পূর্বের চেয়ে সংহত বা আজকের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোয় রূপান্তরিত বা পরিবর্তিত হয় ।

 

এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয়, তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলা সামন্ততান্ত্রিক সমাজের শাসকের রাজতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতার রাষ্ট্রিক সংস্কৃতির (রাজার ছেলে রাজা হবে অতএব তার ক্ষমতা হারানোর ভয় না থাকা থেকে যথেচ্ছাচরণ তথা জনসমাজকে পাত্তা না দেয়ার স্বেচ্ছাচারিতা) বিরুদ্ধে তৎকালীন পাল্টা মানবীয় সংস্কৃতির দাবি হিসেবে আসা- ‘সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ব্যক্তি স্বাধীনতা’ বাস্তবায়নে আজকের গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে রাষ্ট্রীয় গঠনকাঠামো, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে । সরকার নির্বাচন সেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক ।

 

এখানে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের মানবীয় যে দাবি, সে দাবি পূরণে জনসমাজ তথা নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতির পথ ধরেই নিজেদের শাসক বা শাসন প্রতিনিধিবর্গ তথা সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতিফলনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই হলো এই নির্বাচন । কিন্তু আজকের বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতিতে বিশ্বে Communication Revolution ঘটে যাওয়ার ফলশ্রুতিতে মুহূর্তের মধ্যে যে কোনো বার্তা-চিন্তন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে গড়ে তুলছে অখণ্ড বিশ্বমনন অর্থাৎ বিশ্ব জনসমাজ আজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিকতায় আরো বেশি কাছাকাছি । সেই অর্থে সৌভ্রাতৃত্ববোধের সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজকে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধে উন্নততর বা আরো উন্নত মানবিক মূল্যবোধের চেতনায় এগিয়ে গেছে, যখন কোনো এক দেশের অনাচার বা দুযোর্গে সমস্ত বিশ্বই মানবিক সঙ্ঘবদ্ধতা গড়তে পারছে । ঠিক সেই অগ্রগামিতার সাথে একই সময়ে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রতিভূ বা সরকারের মুখে সামন্ততান্ত্রিক সদৃশ তথা স্বেচ্ছাচারিতার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পিছিয়ে পড়া চেতনা উঠে আসাটা একেবারে বৈপরীত্যসম্পন্ন বিস্ময় । অথচ এই অগ্রগামী বৈশ্বিক চেতনায় যেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অগ্রগামী ধারার সাযুজ্যে আরো বেশি জনসমাজমুখী হওয়ার কথা, আরো বেশি বাধ্যবাধকতায় স্বেচ্ছাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক বা মানবিক সুসভ্যত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ধারণ করার কথা, সেখানে ঠিক তার বিপরীতে এবং অগ্রগামিতা নয় বরং পশ্চাৎগামিতার সদৃশ সামন্ততান্ত্রিক স্বেচ্ছাচার রাজনীতির সংস্কৃতিকে ক্রমশঃ প্রতিফলন ঘটাচ্ছে ।

 

যা সমাজদর্শন ও রাষ্ট্রতত্ত্বের সাথে মেলে না বিধায় এটা স্পষ্টতই বর্তমানে রাষ্ট্রদর্শনের সংকট প্রাসঙ্গিক স্তর বা প্রশ্নকেই চিহ্নিত করে । আর এ-কারণেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলমান এগিয়ে যাওয়া নাগরিক চেতনা তথা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিগত অবস্থান থেকেই উল্লিখিত স্বেচ্ছাচারী উক্তি চরম বাস্তব রাজনৈতিক বিশিষ্টতা পেলেও, রিপাবলিকানদের কাছে তা লজ্জাকর এক বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়ে দেখা দেয় । কিন্তু বর্তমান বিশ্বে ওটা মোটেই আর লজ্জা বা বিব্রতকর কোনো পরিস্থিতি নয় বরং চরম বাস্তবময় এক সংকটকালীন স্তর, যা জর্জ ডব্লিউ বুশের উক্তি নয় বরং চলমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেউলিয়াত্বের এক বাস্তব প্রামাণিক বৈশিষ্ট্য ।

 

এখানে যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয়, তা হলো আজকে চলমান গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার অগ্রগামী মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতি অনুসারে- রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক তথা রাজনীতি যেখানে আরো বেশি জনসমাজমুখিন হওয়ার কথা, সেখানে ঠিক তার বিপরীত রাজনৈতিক সংস্কৃতি তথা রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা উঠে এসেছে । কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোয় যা এখন সংহতের পথে আরো ব্যাপক কেন্দ্রীভূত রূপে এখন দানবীয়তায় জনবিমুখ হওয়ার মতো শক্তি অর্জন করেছে ।

 

এক্ষেত্রে আমরা জানি, বিজ্ঞান সর্বদাই অগ্রগামিতার শর্তে নিয়ত এগিয়ে যেতে বাধ্য । এক্ষেত্রে মূল স্থানে রয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি । অর্থাৎ যে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ধারায় একদিকে যেমন চেতনা আরো উন্নতির দিকে এগিয়ে গেছে, তেমনি সেই একই বিজ্ঞানের অগ্রগামিতার বলে বলিয়ান হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র আধুনিকায়নের নামে আরো বেশি সংহত ও কেন্দ্রীভূত হয়ে ব্যাপক জনসমাজ বিমুখ হওয়ার আসুরিক ক্ষমতা লাভে শক্তি অর্জন করতে পেরেছে ।

 

সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন, জর্জ বুশের উক্তি, প্রতিপক্ষের উপলব্ধি চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো দ্বারা আবর্তিত এবং তার সম্পৃক্ততায় জন্ম নেয়া চলমান রাজনৈতিক ধারার দেউলিয়া বা ঘৃণ্য হয়ে পড়া তথা এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মতাদর্শিক সংকটকেই আরো স্পষ্ট করেছে ।

 

এভাবে মানবজীবনের স্বাভাবিক গতি ও বিকাশকে দ্বিচারিতার নাগপাশে সভ্যতাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, কীভাবে একদিকে রাজনীতিতে উঠে এসেছে আত্মস্বার্থের পাশবিক পালবদ্ধতা বা যুথবদ্ধতা এবং তা কীভাবে পারস্পরিক মানবিক ঐক্যতাকে বিষিয়ে দিয়ে কায়েম করছে তাদের আত্মসর্বস্বতার ঘৃণ্য পাশবিক চেতনা । আমরা সেই মানবজীবনের বিষময় দ্বিচারিতাপূর্ণ সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি দেবো, যা তৃতীয় রিপোর্টের মতাদর্শিক সিদ্ধান্তের স্পষ্টতা বা সঠিকতাকেই প্রমাণ করে । অন্যদিকে এই পরস্পরবিরোধী অর্থাৎ অগ্রগামী মানবীয় সংস্কৃতির অনুবর্তীতে রাষ্ট্রিক সংস্কৃতি না হয়ে বরং তার বিপরীতে অগ্রগামী আসুরিক রাজনৈতিক শক্তির দ্বিচারিতাপূর্ণ বিদ্বেষী এই অবস্থান বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে ভয়ানকভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে । বিশেষতঃ তা গত এক বছরে আরো তীব্রতা নিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে ।

 

কারণ আমরা দেখেছি, তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলো উন্নত বিশ্বের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর বলে বলিয়ান কোনো স্বেচ্চাচারী সরকারের নীতিকে ঘৃণা করলেও ক্ষমতা (আত্মস্বার্থের রাজনৈতিক পরিভাষা- ক্ষমতা সর্বস্বতা) হারানোর ভয় থেকে সেও সেই ঘৃণিত স্বেচ্ছাচারী নীতির পক্ষ সমর্থন অথবা কোথাও কোথাও সহযোগী ভূমিকা পালনে বাধ্য হচ্ছে ।

 

[স্মর্তব্য যে, উন্নত দেশের সরকার যেমন কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর বলে বলীয়ান হয়ে সে দেশের ব্যাপক নাগরিক সমাজের বিপক্ষে গিয়ে বেনোবৃত্তির লুণ্ঠণী স্বার্থ হাসিলে স্বেচ্ছাচারী গণবিরোধী নীতি গ্রহণ করতে পেরেছে, তেমনি তৃতীয় বিশ্বের সরকার ব্যাপক নাগরিকের বিপক্ষে গিয়েও আত্মস্বার্থ তথা ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো বলে সেই ঘৃণিত স্বেচ্ছাচারী নীতির পক্ষ সমর্থন বা সহযোগিতা করার বাধ্যবাধকতা দেখাতে পারবে । আত্মস্বার্থ হাসিলে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর জোরে উভয়ই ব্যাপক জনসমাজের বিপক্ষে গিয়ে আত্মস্বার্থ হাসিলে একাট্টা হতে পারছে । অর্থাৎ কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোই ব্যাপক জনসমাজের বিরোধী যে কোন স্বেচ্ছাচারী ঘৃণিত নীতি গ্রহণে ও বাস্তবায়নের সুযোগ ও শক্তি এনে দিয়েছে ।]

 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সরকার যেমন আত্মস্বার্থে তথা ক্ষমতা স্বার্থে যা সে ঘৃণা করে, তাকে সে সমর্থন বা সহযোগিতা করার বাধ্যবাধকতায় দ্বিচারিতাপূর্ণ রাষ্ট্রিক সংস্কৃতিকেই প্রতিফলিত করছে, তেমনি উন্নত সেই দেশসমূহের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের মধ্যেও এই আত্মস্বার্থে যুথবদ্ধতা ও দ্বিচারিতা করার বাধ্যবাধকতার রাষ্ট্রিক সংস্কৃতি ক্রিয়াশীল ।

 

যাদের সরকার কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর বলে বলিয়ান হয়ে, তাদের ব্যাপক নাগরিক সমাজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী স্বার্থ তথা বেনোবৃত্তির স্বার্থে লুণ্ঠনের স্বেচ্ছাচারী নীতি গ্রহণ করেছিল, রাষ্ট্রিক সংস্কৃতিগত বর্তমান ধারায় সরকার নির্বাচনের সময়, তাকে নিরাপত্তাহীন করে তোলা সেই স্বেচ্ছাচারী ঘৃণিত নীতি গ্রহণকারীদেরকেই নিরাপত্তার প্রয়োজনে বাধ্যবাধকতা থেকে বেছে নিতে চাইছে । অর্থাৎ এক্ষেত্রে একই সাথে সে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের মানবিক সঙ্ঘবদ্ধতায় বৈশ্বিক মূল্যবোধের অগ্রগামিতায় প্রতিবাদী হচ্ছে, আবার যখন প্রতিবাদের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ভূমিকা পালনের (সরকার নির্বাচনে ভোট প্রদানের নাগরিক ক্ষমতা) সুযোগ আসছে তখন তাঁরা আত্মস্বার্থে, বিশেষতঃ আর্থিক নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তাজনিত থেকে উদ্ভূত জাতীয়তাবোধগত কারণে বিশ্ব জনসমাজের বিবেকী একতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘৃণিত অবস্থানের সপক্ষেই যুথবদ্ধ বা সেই ঘৃণার সপক্ষেই দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে । অর্থাৎ আন্তর্র্জাতিক প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলো [বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আনুভূমিক (Horizontal) স্তর] এবং উন্নত রাষ্ট্রসমূহের অভ্যন্তরীণ তথা জাতীয় প্রেক্ষাপটে নাগরিক সমাজ [উক্ত রাষ্ট্রের জাতীয় আনুভূমিক (Horizontal) স্তর] এর ক্ষেত্রে একই নিয়ম ক্রিয়াশীল । অর্থাৎ চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উঠে আসা কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোগত সম্পৃক্ততায় জন্ম নেয়া বর্তমান রাষ্ট্রিক সংস্কৃতি তথা রাজনৈতিক ধারায় স্পষ্টতই দ্বিচারিতা ও আত্মস্বার্থের যুথবদ্ধতায় ঘৃণ্য দেউলিয়াত্বের বিষ, নাগরিক জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাবলে বিষময় করে তুলেছে । বর্তমানে সর্বক্ষেত্রে তারই দ্বিচারিতাপূর্ণ আত্মস্বার্থের যুথবদ্ধতার সংস্কৃতি মানবিকতাকে থেতলে বৈশ্বিক জনজীবনকে করে তুলেছে সংকটপূর্ণ, বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে বর্তমান মানবসভ্যতা । যা সমকালীন এই ঘৃণ্য দ্বিচারিতাপূর্ণ অভিশাপময় সাংস্কৃতিক গর্ভজাত । অর্থাৎ গত তৃতীয় রিপোর্টের উল্লিখিত মতাদর্শিক দিশা অনুসারে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষিত সিদ্ধান্তসমূহ ক্রমশঃ বাস্তব ক্ষেত্রে আরো অনেক সঠিকতা নিয়ে ফুটে উঠেছে ।

 

আমরা আরো বেশি নিশ্চিত হয়েছি বর্তমান পৃথিবীর মতাদর্শিক সংকট এবং আগামীর অন্ধকারময় দুনিয়ার বিপন্নতা সম্পর্কে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উঠে আসা এই দ্বিচারিতাপূর্ণ সাংস্কৃতিক আবর্তগত প্রভাব, যা বিশ্ব সমাজগত ধারায় দেশে দেশে প্রতিটি নাগরিক জীবন থেকে প্রত্যেক পরিবার, দাম্পত্য তথা পারস্পরিক জীবনে পরিস্ফুট । দ্বিচারিতার সাংস্কৃতিক পথে আজ আত্মস্বার্থের হিসেবী নিগড়ে বন্দী জীবনে সবাই পরস্পরবিচ্ছিন্ন এবং সংঘাত-বিদ্বেষ-হানাহানির করাল থাবা ক্রমশঃ বিস্তৃত প্রতিটি মানবিক জীবনে, যাপনের প্রতিটি শর্তে । এর প্রথম ও প্রধান শিকার ছাত্র, যুব ও তারুণ্য ।

 

[প্রিয় সাথীরা,

এখানে উল্লেখ থাকে যে, সমষ্টিমূলক সমাজ বা গিল্ড সোস্যালিজম এবং বিশেষ করে নৈরাষ্ট্রবাদ-এর সাথে আমাদেরকে অনেকেই গুলিয়ে ফেলতে পারেন । কারণ- বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলমান মতাদর্শিক সংকটে উপরোক্ত মতবাদগুলো গুরুত্ব সহকারে উঠে এসেছে এবং সেই সাথে মতবাদগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিভিন্নমুখী পার্থক্য থাকলেও তা বর্তমান সংকটে প্রাসঙ্গিক বিধায় এই মতবাদগুলো মূলতঃ একটা জায়গায় একই কন্সেপ্টে এসে মিলে যাচ্ছে তা হলো রাষ্ট্রীয় (“কর্তৃত্ব হস্তান্তর” প্রসঙ্গ) কর্তৃত্ব বিরোধী অবস্থান । সুতরাং কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বিরোধিতাকে উল্লিখিত মতবাদগুলোর সমার্থক মনে হতে পারে । কিন্তু আমরা বলতে চাই, সংকট প্রাসঙ্গিক বলেই অন্যান্য মতবাদের প্রত্যাশা ও প্রতিফলন আমাদের মতাদর্শে উঠে আসতে পারে কিন্তু আমরা পূর্বেই বলেছি, আমরা স্বতন্ত্র এবং সংকট মুক্তিতে সদিচ্ছাতাড়িত কোনো প্রত্যাশা বা মতবাদে আমরা বিশ্বাসী নই, আমরা বিশ্বাস করি বিজ্ঞানকে । এখানেই আমরা স্বতন্ত্র, বৈশিষ্ট্যে ভিন্ন । সুতরাং কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সমকালীন সংকটে যে কোনো মানবিক সদিচ্ছাই গর্জে ওঠাটা স্বাভাবিক কিন্তু তাকে শুধু সমালোচনা করে এবং তার অসম্পূর্ণতা এবং ভয়ানক দিকটাকে সবিস্তারে প্রকাশ এবং তার বিপরীতে কোনো ‘প্রত্যাশা’ বা ‘আকাঙক্ষা’ বাস্তবায়িত করতে চাইলে তা মতবাদ হতে পারে কিন্তু তা বাস্তবায়নে বৈজ্ঞানিক দিশা বা ‘প্রামাণিক Base’ তৈরি করতে না পারলে তা আদৌ কোন সামাজিক বাস্তব বদল সংগঠিত করতে পারে না । বড়জোর, চিন্তা বা বৌদ্ধিক চর্চায় আলোড়িত হতে পারে; যাকে ‘ইউটোপিয়া’ বলা হয় । ঠিক যেমন পুঁজি তথা ধনতান্ত্রিক সংকট জর্জরিত তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় ‘ইউটোপিয়া সোস্যালিজম’-এর জন্ম হলেও তা সামাজিক বাস্তবতা বদলে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, যতোক্ষণ না পর্যন্ত কার্ল মার্কস-এর হাতে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পেয়েছে এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য ছিল- একটা সদিচ্ছাতাড়িত মতবাদ বা প্রত্যাশা কিন্তু তা ইউটোপিয়া এবং মার্কসের সদিচ্ছা বৌদ্ধিক ও সমাজ বাস্তবতায় বৈজ্ঞানিক দিশা সম্বলিত ছিল, বিধায় তা ইউটোপিয়া নয় বরং সমাজ বদলের স্বার্থে বাস্তব সত্য, তথা বিজ্ঞাননিষ্ঠ যা পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ স্থান জুড়ে বদলের কর্মযজ্ঞ প্রতিষ্ঠা করেছিল । আমাদের ক্ষেত্রে আমরা শুধু কর্তৃত্ববিরোধী নই বরং তার উৎস কেন্দ্রীভূত যে রাষ্ট্রকাঠামো- সেটা যে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে হাতিয়ার করেই আজকের সমাজ বাস্তবতায় প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রকে অর্জনে জনসমাজ বিরোধী দানবীয়তাকে চালিয়ে যেতে পারছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিন্ন এক রূপ আবিষ্কার এবং তার বিপরীতে ব্যাপক জনসমাজের স্বার্থ রক্ষাকারী বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো, যা অন্যান্য মতবাদিকরা সদিচ্ছাতাড়িত হয়ে প্রত্যাশা করলেও তা ইউটোপিয়া, যেখানে আমরা সেই বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর রূপরেখা বৈজ্ঞানিকভাবেই আঁকতে পেরেছি । সেই সাথে উক্ত মতবাদগুলো কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের বিরোধিতা থেকে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছে । বিশেষতঃ নৈরাষ্ট্রবাদীরা, এমন-কি কার্ল মার্কস্ও শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব তথা শোষণতন্ত্রের ব্যাখ্যায় বলেছেন,‘শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব সমাজ থেকে লুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে ।’ কারণ রাষ্ট্র শোষকের হাতিয়ার কিন্তু আমরা বর্তমান সমাজ সভ্যতার অগ্রগতির স্তর নির্দিষ্টকরণে বৈজ্ঞানিকভাবে বলছি, রাষ্ট্র- সমাজ বিবর্তনের ধারায় যেমন উৎপত্তি হয়ে বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আজকের রূপে সংহত হয়েছে, তেমনি তা সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতিতে বিবর্তনের ধারায় বিপরীত অর্থটাই ধারণ করবে অর্থাৎ জনসমাজ স্বার্থ রক্ষাকারী তারই অনুষঙ্গ হিসেবে থাকবে, যেখানে রাষ্ট্র শোষকের স্বার্থ রক্ষাকারী জনসমাজ বিরোধী যন্ত্রের ভূমিকায় না থেকে ব্যাপক জনসমাজ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, তারই স্বার্থবাহী যন্ত্র হিসেবে রূপান্তরিত বা উৎকর্ষিত হবে, যা সমন্বয়ের ভূমিকা প্রতিফলিত করবে । কারণ আমরা জানি, যা কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছে সমাজ-বাস্তবতার প্রয়োজনে, তা ধ্বংস না করে বিকাশমান ধারায় রূপান্তরের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যায় । যেহেতু মানবসমাজের ক্ষেত্রে মনুষ্য বৈশিষ্ট্যে সাংস্কৃতিক অভিযোজনই শক্তিশালী বা প্রধান হিসেবে প্রমাণিত । যে কারণে আমরা বলছি, আজকের জনসমাজ বিরোধী কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র যা একটি রূপ মাত্র, তা দেখে তার বিরোধিতায় তাকেই অস্বীকার করা আজকের বাস্তবতায় অবৈজ্ঞানিক বরং বিজ্ঞাননিষ্ঠতার পথেই আমরা বলছি, জনসমাজের স্বার্থে রাষ্ট্রের যে রূপ, তা ইতোমধ্যে বিকেন্দ্রীভূত চরিত্রের দিকে ধাবমান এবং সমাজ বাস্তবতার প্রয়োজনেই তা এক অনিবার্য পরিণতি বা সত্য এবং বিকেন্দ্রীভূত যার অর্থ বলতে আমরা বোঝাচ্ছি ব্যাপক জনসমাজ ও তার স্বতঃস্ফূর্ততাই এর শক্তির ভরকেন্দ্র হিসেবে স্থাপিত হবে; সেই সাথে বিচ্ছিন্ন কোনো কিছুই সমাজ সংঘবদ্ধতার সংজ্ঞার সাথে অবৈজ্ঞানিক বিধায় তা কেন্দ্রীকরণ (সমন্বয়) মুক্ত হতে পারে না । লক্ষ্যণীয় যে, এখানে ‘কেন্দ্রীকরণ’ কিন্তু ‘কেন্দ্রীভূত’ নয় । অর্থাৎ সমাজ বাস্তবতায় বর্তমানের রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের ন্যায় নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির ভরকেন্দ্র এখানে ‘কেন্দ্র’-এর মধ্যে নয় বরং তা ‘বিকেন্দ্র’-এর মধ্যে অর্থাৎ ‘বিকেন্দ্রীভূত’ (কাঠামো), যার ভরকেন্দ্র জনসমাজের মধ্যে এবং তাকে সমন্বয়ের রূপ ও বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সমষ্টির (জনসমাজ) অর্থপূর্ণতায় বিচ্ছিন্নতাবিরোধী (বহুকেন্দ্র বা স্তরের মধ্যে ঐক্যতা বা পারম্পর্য ও পারস্পরিকতার সমন্বয়ী) ভূমিকায় সে ‘কেন্দ্রীকরণ’-এর চরিত্র ধারণ করে বা রূপান্তরিত হয় । সংক্ষেপে এভাবেই ‘বিকেন্দ্রীভূত’ ও ‘কেন্দ্রীকরণ’ মিলিয়েই আমরা “বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ” । সুতরাং আমাদের “বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ” (কাঠামো)-এর Concept-এর সাথে অপরাপর মতবাদগুলোর সদিচ্ছাতাড়িত প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হতে পারে, সংকট সমাধানে সেটা থাকাটাই স্বাভাবিক । কারণ- তা এক একটা বাস্তব সংকটের জঠর থেকে জন্ম নেয়ার সূত্রে সমস্যা ও সমাধানের এক একটা দিকের ইঙ্গিতমূলক প্রত্যাশার প্রকাশ বা সংকটের অংশ প্রাসঙ্গিকতায় তারা বহুদিকের বিচ্ছিন্ন (সদিচ্ছাতাড়িত কল্পনা বা ধারণা ঐক্যের ভিত নয় বরং বিজ্ঞানই ঐক্যের ভিত) অথবা আংশিক সত্যের প্রতিফলন মাত্র । কিন্তু সংকট সমাধানে আমরা কল্পনা বা সদিচ্ছা থেকে অংশ নয় বরং সংকট সমাধানে বাস্তব সত্য হিসেবেই বৈজ্ঞানিক দিশায় ‘সমগ্র’ এবং এখানেই আমরা স্বতন্ত্র ।

 

বলাবাহুল্য, স্থান-কালের নিরিখে তথা একই প্রেক্ষিতে একই সময়ে একটাই সত্য প্রতিফলিত হয়- যার মধ্যে সমগ্র সত্য অস্তিত্ববান । বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মতাদর্শিক সংকট সমাধানে একটাই মতাদর্শ সঠিক হতে পারে, সেটা কোনটা- তার মীমাংসা দেবে আগামীর পৃথিবী ।]

 

জাতীয় ক্ষেত্রে

 

প্রেক্ষিত জাতীয় বিশ্লেষণে, গত তৃতীয় রিপোর্টে আন্তর্জাতিক (কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর দেউলিয়াত্ব তথা জাতীয় ক্ষেত্রে) সংকটের সাথে সাথে, দেশজ ক্ষেত্রে আমরা মূল তিনটি সিদ্ধান্তে এসেছিলাম  ।

 

প্রথমতঃ বিদেশমুখিন (ব্রিটিশ তথা বিদেশস্বার্থ চেতনায়) শাসন ব্যবস্থায় গড়ে তোলা বিকৃত রাষ্ট্রকাঠামো  ।

 

দ্বিতীয়তঃ এই সংকট উত্তরণে একমাত্র উপায় দেশজ চেতনা অর্জন এবং এর দায়ভার কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; ফলে বিদ্বেষ, বিপক্ষ বা বিরোধিতার জায়গা নেই । আবার এর মীমাংসাও কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়, ফলে তাতে সম্পৃক্ত হওয়া না হওয়াতে দেশজ সংকটের কোনো মীমাংসা হতে পারে না । অর্থাৎ রাজনৈতিক দলবৃত্তির পক্ষ-বিপক্ষতার সাথে দেশজ স্বার্থ ও সংকট মীমাংসার কোনো সম্পর্ক নেই ।

 

তৃতীয়তঃ সংকট মীমাংসায় দেশজ চেতনা অর্জনের যে পথ, সে পথের মীমাংসায় প্রধান ভূমিকায় প্রথমত ও প্রধানত ছাত্ররাই (যেহেতু তারা অধ্যয়নরত) এবং সেই সাথে তা ব্যক্তিক প্রচেষ্টা বা একজনের প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, বিভিন্ন বিষয়ের উপর অধ্যয়নরত ছাত্রদের দেশকে সামনে রেখে নিজ নিজ বিষয়গত (Subjective) ছাত্রত্বের অবস্থান থেকে দেশজ চেতনায় বিশ্লেষিত-বিশেষিত জ্ঞান অর্জন, তথা উক্ত জ্ঞানের সম্মিলিত ও সংহতকরণের (সংগঠনকাঠামো দ্বারা) মাধ্যমেই সেই দেশজ চেতনা অর্জন সম্ভব । সেই প্রয়োজনে পারস্পরিক সংঘবদ্ধতা আজ অনিবার্য ।

 

[প্রিয় সাথীরা, নিজেদের Subjective  গুলো থেকে দেশকে সামনে রেখে, কয়টা নতুন দেশজ তথ্য বা জ্ঞানগত দিক বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন- যা ‘কালায়ন’ মারফত সংহত হয়ে প্রকাশ পাবে? আপনাদের কাছ থেকে যে লেখাগুলো এসেছে, তার মান ও বিষয়গুলো দেখে মনে হয়েছে- এটা লক্ষ্যবিমুখ ‘স্যুভেনির’ বা সৌখিন পত্রিকা প্রকাশের অর্থেই, লেখার জন্যে লিখেছেন । এটা যে দেশজ চেতনা সংহতকরণের বাজ্ঞানতত্ত্বে সজ্জিত হওয়ার লক্ষ্যে কিংবা এটা যে সাংগঠনিক মুখপত্রের জন্য লিখেছেন, সেটা প্রতিফলিত হয়নি । অথচ ‘কালায়ন’ প্রকাশ পেলে অনেকের লেখা না থাকায়, নিজের লেখাকে গুণগতভাবে আরো উন্নত না করে, উল্টো তার সৌখিন মানসিকতায় চোট খেয়ে বিক্ষুব্ধ বা হতাশ হয়ে- লেখাই ছেড়ে দেবে! কারণ অধ্যবসায় না থাকলেও আত্মম্ভরিতা, আত্মকেন্দ্রিক তুষ্টতা-স্তুতি প্রবণতা আমাদের হাড়ে-মজ্জায় ।]

 

উক্ত তিনটি সিদ্ধান্ত অর্থাৎ জাতীয় ক্ষেত্রে সংকটের উৎস (বিদেশমুখী চেতনায় গড়া বিকৃত রাষ্ট্রীয় অবস্থান), সংকটের মীমাংসা (দেশজ চেতনা অর্জন) এবং সংকট সমাধানের উত্তরিত পথ (বিষয়ভিত্তিক ছাত্রত্বের অবস্থান থেকে দেশজ চেতনা অর্জনে, সম্মিলনে, সংহতকরণে প্রয়োজন পারস্পরিক সঙ্ঘবদ্ধতা তথা সচেতন সংগঠন) আর এই তিনটি কারণে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথে যে উপসংহার ব্যক্ত হয়েছে, ‘সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থান’ (Social Power With Knowledge) হিসেবে এবং সেই লক্ষ্যপূরণে নির্দিষ্ট হয়েছিল দুই ফিল্ড- পড়ার টেবিল (নীতিগত ফিল্ড) ও কনভিন্স (প্রায়োগিক), যার মাধ্যম ছিল অবিরত রিপোর্ট-রেকর্ড । যেহেতু সামাজিক, তাই ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ (সংগঠনকাঠামো) কাঠামো এবং সামাজিক আন্দোলন বলেই তা সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, যার পথ ‘অহিংস’ এবং যার এই মুহূর্তের ডাক ‘সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা চাই’ । আর উল্লিখিত উপসংহারের সারগর্ভের দাবি হিসেবে উঠে এসেছিল ‘নেশামুক্ত তারুণ্য পেতে দেশজ চেতনায় সুস্থ আড্ডা গড়ে তুলুন’ । উল্লেখ্য আড্ডা থেকেই যেহেতু ছাত্র-যুব-তারুণ্য নেশা ও সন্ত্রাসের মরণফাঁদে জড়িয়ে পড়ে, তাই দেশব্যাপী আমরা দেশকেই সামনে রেখে পাল্টা আড্ডা গড়ে তুলি । অর্থাৎ ‘নেশাগ্রস্ত আর সন্ত্রাসী হয়ে পড়া’দের এই সুস্থ আড্ডায় আনা নয় বরং নেশা আর সন্ত্রাসে ছাত্র-যুব-তারুণ্য যাতে জড়িয়ে না পড়ে আর পূর্বাবস্থা গ্রহণে এই আড্ডা গড়ে তোলা । সেখানে সন্ত্রাসী আর নেশাগ্রস্তদের কোনো জায়গা নেই ।

 

এবার আমরা দেশজ প্রেক্ষাপটে (কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোগত) মতাদর্শিক দিশা অনুসারে প্রাপ্ত উল্লিখিত আন্তর্জাতিক সংকটের অংশ হিসেবে আমাদের জাতীয় ক্ষেত্রে পরিণত রূপ ও তার বাস্তবতাকে দেখবো ।

 

গত তৃতীয় রিপোর্টে আমরা বলেছিলাম, ‘বৈশ্বিক সংকটের বিষক্রিয়া প্রথম অনুভূত হয় আর্থ-ব্যবস্থায় দুর্বল, প্রতিরোধ শক্তিহীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেই । তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হওয়ার সুবাদে, আমাদের স্বদেশভূমি বাংলাদেশেও সংকটের তীব্রতা প্রকটভাবে ফুটে ওঠাটাই স্বাভাবিক এবং ইতোমধ্যে তা ভয়ানকভাবে ফুটে উঠেছে’ ।

 

কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক মহল থেকে এদেশকে ‘একটি অকার্যকর রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয় ।

 

[যদিও জাতীয় দৈনিকগুলোতে সরকার কেন্দ্রিক পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনা তথা সরকারের ব্যর্থতাকেই কোথাও কোথাও ইঙ্গিত করার চেষ্টা করা হয়েছে অথচ বিষয়টা একেবারেই সরকার (ক্ষমতাসীন দল) কেন্দ্রিক নয়, বড়জোর সে আলোচনার অনুষঙ্গ হিসেবে খুব ক্ষুদ্র ভূমিকা নিয়ে আসতে পারে ।]