[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

৭ দিনের সংবাদ দুনিয়া

 
প্রাণভয়ে মিয়ান্মারের রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে হাজির হচ্ছেনঃ প্রধানমন্ত্রীর শরণার্থী শিবির পরিদর্শন
১২-০৯-২০১৭

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি। ঘরবাড়ি হারিয়ে যেসব রোহিঙ্গা এখানে (বাংলাদেশে) এসেছেন, তাঁরা সাময়িক আশ্রয় পাবেন। তাঁদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে।’

 

প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে আরও  বলেন, ‘আপনারা যাতে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে চেষ্টা চলছে।’ ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রিঃ তারিখে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সংক্ষিপ্ত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

 

রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা আপনাদের আশ্রয় দিয়েছি। আমরা আপনাদের পাশে থাকব।’ রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিকভাবে জনমত গড়ে তোলার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।

 

অন্যদিকে প্রতিদিনই প্রাণভয়ে মিয়ানমার এর রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে হাজির হচ্ছেন । বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা কেমন আছেন, কি করছেন, তাদের ভবিষ্যতই কি? তা সরেজমিনে দেখতে চান ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকরা। তাই তাদেরকে আগামী ১৩ই সেপ্টেম্বর  কক্সবাজার নিয়ে যাওয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী দক্ষিণ এশিয়া, দূর প্রাচ্য ও আসিয়ানের কূটনীতিকদের সঙ্গে ব্রিফিং শেষে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে রয়েছেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ভারত ও চীন আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। তারা এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের সাথে থাকবে এটা তার বিশ্বাস। যদিও তিনি বলেছেন, দুটি দেশের পক্ষ থেকেই বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত সপ্তাহে মিয়ানমার সফরকালে বলেছেন, সে দেশের সরকার যা করছে ঠিক করছে। এ নিয়ে ভারতসহ মুক্ত দুনিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। পররাষ্ট্র সচিবকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ভারতীয় অবস্থান কি তাহলে পরিবর্তন হয়েছে? জবাবে তিনি বলেন, সেটা জানা নেই। তবে আজকের বৈঠকে ভারতের তরফে বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব জানান, কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হবে। পররাষ্ট্র সচিব জানান- ব্রিফিংকালে কূটনীতিকরা বলেছেন, এক মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশের পাশে থাকা।

 

গত ১১ই সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে মানবাধিকার প্রধান ভাষণ দেওয়ার সময়, Zeid Ra'ad al-Hussein বলেছেন তার দফতর এ সম্পর্কে অনেক রিপোর্ট পেয়েছে। তারা এমন ছবি পেয়েছে যে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনী পুরো রোহিঙ্গা গ্রাম পুরিয়ে দিচ্ছে এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চালাচ্ছে। তিনি বলেছেন সেখানে জাতিগোষ্টিগত নির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে।

 

পুনশ্চঃ রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম  মায়ানমারের  রাখাইন রাজ্যের একটি উলেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে  দীক্ষিত। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। মায়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং,  বুথিডাং, মংডু, কিয়কতাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা, কাইউকপাইউ, পুন্যাগুন ও পাউকতাউ এলাকায় এদের নিরঙ্কুশ বাস। এছাড়া মিনবিয়া, মাইবন ও আন এলাকায় মিশ্রভাবে বসবাস করে থাকে। বর্তমান ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৮,০০,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করে। মায়ানমার ছাড়াও বিভিন্ন সময় বার্মা সরকারের নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া ৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এবং প্রায় ৫ লাখ সৌদি আরবে বাস করে বলে ধারনা করা হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী।

 

ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশে পূর্ব ভারত হতে প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতির একটি শাখা "কুরুখ" (Kurukh) নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করে, ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু (পরব্রতীকালে ধরমান্তরিত মুসলিম), পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এ সকল নৃগোষ্ঠীর শংকরজাত জনগোষ্ঠী হলো এই রোহিঙ্গা। বস্তুত রোহিঙ্গারা কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। পক্ষান্তরে ১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান রাজ্য দখলদার কট্টর বৌদ্ধ বর্মী রাজা "আনাওহতা" (Anawahta) মগদের বারমা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে রোহিংগাদের বিতাড়িত করে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করান। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস দক্ষিণে বামার বংশোদ্ভুত ‘মগ’ ও উত্তরে ভারতীয় বংশোদ্ভুত ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগদের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।

 

রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।

 

তবে, মধ্যযুগে ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন। রোসাঙ্গ রাজ্যের রাজভাষা ফার্সী ভাষার সাথে বাংলা ভাষাও সমাদৃত ছিল। ইতিহাস থেকে এটা জানায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর চরম বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।

 

এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তখন বড় ধরনের ভুল করে তারা এবং এটা ইচ্ছাকৃত কিনা, সে প্রশ্ন জ্বলন্ত। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ধরনের বহু ভূলই করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরা।

 

৪ঠা জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। এমনকি মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী 'কালা' নামে পরিচিত। ভারতীয়দেরও একই পরিচিতি। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।

 

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির সময় তারা বিরাট এক ভুল করে বসে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিন্নাহের সাথে একাধিক বৈঠক করে পাকিস্তানের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। আর শুরু হয় রোহিঙ্গাদের কপাল পোড়া। তাদের এই কাজটা আরাকানের অন্য জাতিগোষ্ঠিরা মেনে নিতে পারে নি। তাদের কপালে “বেঈমান” তকমা লেগে যায়। এদিকে জিন্নাহ শেষমেশ অস্বীকৃতি জানায়। তখন তারা নিজেরাই রোহিঙ্গা মুসলিম পার্টি গঠন করে আরাকান স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। আর তারা একদম ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যায় বার্মার সরকারের কাছে। ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার বার্মায় ক্ষমতা পেলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ১৯৭৮ আর ১৯৯২ সালে দুইবার তাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

 

প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে বার্মা শাসন করছে মায়ানমারের সামরিক জান্তা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা বার্মিজ জাতীয়তাবাদ এবং থেরাভেদা বৌদ্ধ ধর্মীয় মতবাদ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকে। আর এর ফলেই তারা রোহিঙ্গা, চীনা জনগোষ্ঠী যেমন - কোকাং, পানথাইদের(চীনা হুই মুসলিম) মত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাকে ব্যপকভাবে নির্যাতন করে থাকে। কিছু নব্য গণতন্ত্রপন্থী নেতা যারা বার্মার প্রধান জনগোষ্ঠী থেকে এসেছেন তারাও রোহিঙ্গাদের বার্মার জনগণ হিসেবে স্বীকার করেন না।

 

বার্মার সরকার রোহিঙ্গা ও চীনা জনগোষ্ঠীর মত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার উসকানি দিয়ে থাকে এবং এ কাজ তারা অতি সফলতার সাথেই করে যাচ্ছে। রাখাইনে ২০১২ সালের দাঙ্গা হচ্ছে মায়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম ও বোদ্ধ রাখাইনদের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের ঘটনাপ্রবাহ। দাঙ্গা শুরু হয় জাতিগত কোন্দলকে কেন্দ্র করে এবং উভয় পক্ষই এতে জড়িত হয়ে পরে।

 

তথ্য সূত্রঃ

https://www.voabangla.com/a/un-myanmar-11sep17/4024298.html

http://www.bbc.com/bengali/news-41236395

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1320761/

https://bn.wikipedia.org/wiki/