[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

মুক্তিজোট এর আহবান

 

“ডান-বাম নয়- হাঁটতে হবে বাংলাদেশ বরাবর”

মুক্তিজোট এর আহবান

সুহৃদ,

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের পক্ষ থেকে সমগ্র দেশবাসীকে জানাই মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের হৃদ্‌স্পন্দিত শুভেচ্ছা এবং সংহতির ডাকে সামিল হতে সবাইকে জানাই শুভ্র অভিনন্দন।

 

বায়ান্নো ও একাত্তর সহ এদেশের জন্য, সমগ্র দুনিয়ার জন্য, সারা বিশ্বে যতো মানুষ মানবীয় মর্যাদা ও কল্যাণে, মনুষ্যত্বের মুক্তি ও ন্যায্যতার শর্তে, শান্তি ও সততায় প্রাণোৎসর্গ করেছেন, সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় যাঁরা পথিকৃৎ আছেন, সেই সব আত্মোৎসর্গকারী শহীদ ও সত্যচারীদের প্রতি মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে বর্ষিত হোক শান্তি, প্রশান্তি বর্ষিত হতে থাকুক বর্তমান সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে যতো আগুয়ান মানুষেরা পৃথিবীতে আসবেন, তাঁদের প্রতি। মানবীয় মর্যাদা ও মুক্তি, কল্যাণ ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় শামিল- মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আগত-অনাগত সকল বন্ধুদের প্রতি, সহস্রাব্দের সূচনাবোধনে- পুনশ্চঃ এ দ্বাদশে- সালাম-সালাম সহস্র সালাম!

 

মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে- মানবীয় মর্যাদার নিক্তিতে, অবিরত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের আদর্শিক দিশায়- দৃঢ়বদ্ধ, অহিংস'র দীক্ষামন্ত্রে- দীক্ষিত, সামাজিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেবার শাণিত শপথে- উচ্চারিত, "জাতীয় জীবনে সংহতি" গড়ে তোলার মহান ঘোষণায়, আমরা জানাচ্ছি আমাদের অস্তিত্ব, অবস্থান ও লক্ষ্য। অতঃপর কর্মহীন বাক্যকে যেহেতু বিজ্ঞান কাজ বলে না, তাই সর্বাগ্রে বৈজ্ঞানিক শর্তবদ্ধতাতেই জানাবো ভবিষ্যত কর্মদিশার আশুকর্তব্য এবং তা আমাদের আদর্শিক বিশ্বাসের ব্যাপকতায় এ লেখা 'সংক্ষেপ' মাত্র।

 

এবং অবশ্যই তাঁদের কাছে- যাঁরা মাতৃরূপ স্বদেশের একই উদরে জন্ম নেয়ার শর্তে আমাদের সহোদর ও সচেতন যন্ত্রণায় সমদগ্ধ, অশ্রু-ক্রোধে সংঘবদ্ধ, প্রতিরোধের একই মন্ত্রে দীক্ষিত এবং এই সমকালীন দুঃসময়কে রুখে দিতে- এই আদর্শিক যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা, সেইসব দেশবাসীকে, যাঁরা বিশ্বাস করেন ইতিহাসকে- সবার মুক্তির সাথেই নিজের মুক্তির শর্তবদ্ধতাকে, নিজেদের সক্ষমতাকে ও শ্রদ্ধা করতে জানেন মানবীয় মর্যাদাবোধের সংগ্রামকে। সর্বোপরি, রক্ষা করতে জানেন সামষ্টিক চেতনাকে।।

 

প্রিয় বন্ধুরা,

দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে, ইতিহাসের অন্ধকারময় দুঃসময়ের বিরুদ্ধে, বারে বারে প্রতিবাদে-প্রতিরোধে গর্জে ওঠা বাংলার কাঁধে আজ চেপে বসেছে- রাজনীতিহীন নৈরাজ্যের বিশৃঙ্খলা। দল আছে- রাজনীতি নেই, সরকার আছে- ব্যবস্থাপনা নেই। রাজনীতির নামে চলছে দস্যুপনা, দলবদ্ধ বেনোবৃত্তির বেহায়া উন্মাদনা, তাই সর্বক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী হিংসা ও লুণ্ঠনের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা।

জাতি ভুলেছে তার ঐতিহ্য, বিস্মৃত হয়েছে তার ইতিহাসের পাতায় থাকা অগ্রগামিতার সব চিহ্ন, আগুয়ানের আলোকময়তার সমগ্র অর্জন, দিশা হওয়ার বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হওয়ার সব অহংকার ও দম্ভকে। চরম নির্লিপ্ততায় দেশবাসী মেনে নিচ্ছে, রাজনীতিহীন মিথ্যা আর শঠতাকে। তাই ভবিষ্যত বলতে প্রজন্মের সংজ্ঞায় বর্তমান দেশ-জাতি আজ সর্বোতঃভাবেই বিস্মৃতির বেনোজলে ভাসমান- শেকড়হীন সমকালীন প্রজন্ম, বিস্মৃতির কালো অধ্যায়ের আঁতুড়ঘর, যেখান থেকে শুরু হয়, জন্ম নেয়- নেশা ও হিংসার মতো আসুরিক বিশৃঙ্খলার শেকড়হীনতা, বোহেমিয়ানায় ভেসে যাওয়া।

 

সমকালীন দুঃসময়ের শিকার হতে হতেও আমরা থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলাম নিজেদেরকে "আমরা কারা? কোথায় আমাদের অনাগত গন্তব্য?" অতঃপর বিস্মৃতির ধূলিধূসরতাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে জেনেছিলাম আমরা কারা, খুঁড়ে এনেছিলাম আমাদের পরিচয় এবং তারুণ্যের সদম্ভ অস্তিত্বে ইতিহাসনিষ্ঠতায় জেনেছিলাম আমাদের বিজয়ী গন্তব্য। ইতিহাসনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক দিশা নির্মাণের দায়বদ্ধতার আলো ফেলতেই উঠে এলো বিশ্ববাজারে পণ্য করে ফেলা 'দেশ' নামক আমাদের জননী জন্মভূমি বাংলাদেশ। তাঁর মাতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠাত্রী হওয়া মাত্রই জন্মগত বোধের মূলে জ্বলে উঠলো প্রতিরোধের দুর্দমনীয় যৌবন, অস্তিত্বের প্রখরতায় মৃত্যুকে পরাভূত করার স্বপ্নে উচ্চারিত হলো অহিংস'র দীক্ষামন্ত্র। বিপরীত অর্থে গড়া লক্ষ্য বিমুখতা ভেঙে জীবনকে গড়ে তুললো যাপনের প্রজ্জ্বলনে, সংঘবদ্ধতার দীপ্তময় দিশা, সুগভীর বিশ্বাসের ভিতে জন্ম নিলো আত্মিক বন্ধনের সুদৃঢ় প্রত্যয়- মনুষ্যত্ব। অর্জনের পারস্পরিকতায় সে প্রত্যয় আরো শাণিত হলো সচেতন অনুষঙ্গ আর মানবিক আড্ডায়। আর এভাবেই "সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত"-এর ঘোষণায় অনাগত বিজয়ের লক্ষ্যাভিমুখিনতায় হয়েছিলাম দৃঢ়বদ্ধ এবং বৈজ্ঞানিক দিশায় আমরা সংঘবদ্ধতার পথে-

 

গত ২৪শে নভেম্বর-২০০০ খ্রিঃ-এ সহস্রাব্দের যুগসন্ধিতে ঘোষণা করেছিলাম- 'সচেতন সামাজিক শক্তি' উত্থানের পাল্টা ইশতেহার। সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শাণিত পথে, মুক্তির সওগাতবাহী চেতনার স্ফুরিত উচ্চারণে, সামাজিক আন্দোলনের প্রত্যয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সমগ্র দেশব্যাপী। স্বদেশব্রতে প্রতি জনপদে, মানবমুক্তির মহামন্ত্রে- বৈশ্বিকতায় দিকে দিকে। এই বন্ধুর পথচলায় আমরা যা কিছু পেয়েছি, বাধা থেকে বাধা অতিক্রমণের বোধগম্যতা, কষ্ট থেকে কষ্ট মুক্তির দুর্বিনীত প্রতিজ্ঞা এবং সীমাভাঙা বাস্তব ভিতে গড়া অনাগত বিজয়ের অনিবার্যতায় প্রাপ্ত- প্রত্যয়ী স্বপ্নের অগ্নিভ প্রেরণা। সেই সব সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা এবং অগ্রগামিতার শর্তে প্রোজ্জ্বল অভিজ্ঞতাকে দিশা হিসেবে প্রকাশ করতেই বিগত বারো বছর পেরিয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পরিণতিতে-

 

গত ২৪শে নভেম্বর, ২০১২ খ্রিঃ-এ প্রতিষ্ঠার দ্বাদশবর্ষে এসে আমরা মহান সাংস্কৃতিক তথা মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দল-মত নির্বিশেষ প্রতিটি মানুষকে শামিল করার প্রত্যয় নিয়ে "জাতীয় জীবনে সংহতি" গড়ে তোলার সিদ্ধান্তে ঘোষণা করি রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক স্তরের যাত্রা।

 

সুহৃদ বন্ধুগণ,

ক্রোধের সময় যেমন সুর বা সৃজন হয় না, তেমনি স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পরাধীন শাসনে- নির্যাতন থাকায় রাজনীতিতে বিদ্রোহ বা আইন ভাঙা কিংবা হরতাল, ভাংচুর ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী দেশগড়া বা সৃজনের বৈশিষ্ট্য আসাটাই ছিল কাম্য। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও রাজনীতিটা পড়ে আছে সেই পরাধীন ঔপনিবেশিক যুগেই। স্বাধীন দেশটা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি বা রাজনীতিতে এখনও ধর্তব্যেই আসেনি।

 

এখনও রাজনীতি মানেই ভাংচুর, আইন ভাঙার মহোৎসব, রাজনীতিতে আইন গড়া ও রক্ষার চেয়ে আইন ভাঙা ও বিশৃঙ্খলাতেই সিদ্ধ ও দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচার-আচরণে পরাধীন বা ঔপনিবেশিক রাজনীতির সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিগত কোনো পার্থক্য এখনো সূচিত হয়নি।

 

মোবাইলে চিৎকার করে কথা বললে তা দেখে অস্বাভাবিক মনে হলেও-মাইকে ঘন্টার পর ঘন্টা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করাকে ঝগড়া বা অসভ্যতা না বলে 'রাজনৈতিক বক্তব্য' বলা হচ্ছে। বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে দ্রোহের ভাষ্য স্বাভাবিকভাবেই উচ্চকিত হয়- মানুষের কাছেও তা স্বাভাবিক ঠেকে, কারণ তাঁরাও বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে দ্রোহের কমন মানসিকতা পোষণ করে। অর্থাৎ সম্পর্কটা দুই পক্ষের ঝগড়ার সম্পর্ক থাকে বলে ঝগড়াটে বক্তব্যটাও স্বাভাবিক ঠেকে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন রাজনীতিটা হয়ে পড়ে দেশ বিনির্মাণের শর্তগত বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট, তখন রাজনীতিতে এমন বিকট চিৎকার-চেঁচামেচিকে অসভ্যতা না বলাটা অস্বাভাবিক। অথচ কারও কাছে এটা অস্বাভাবিক ঠেকছে না। অর্থাৎ স্বাধীন দেশের নাগরিক মননটাই আমাদের গড়ে উঠেনি। মাইক থাকা স্বত্ত্বেও গলা ফাটানো মূলত স্বাধীনতা পূর্ববর্তী রাজনীতির অনুকরণ। তাই এ-অসভ্যতাটা হয়ত পার পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিকেলে কোনো ঘটনা ঘটলে মাত্র কয়জন মানুষ চা খেতে খেতে মুখ বাড়িয়ে মিডিয়াতে হরতাল বললেই হরতাল হয়ে যাচ্ছে, আগের দিন কয়েকটা গাড়ী পুড়িয়ে মিডিয়ায় সংবাদ হচ্ছে। অতঃপর- দেশের সমস্ত মানুষকে মুহূর্তেই শঙ্কাত্রস্ততায় জিম্মি করে ফেলতে পারছে- সবচেয়ে বিস্ময়কর যেদিন হরতাল ডাকছে বা মানুষকে প্রস্তুতির কথা বলছে, ঠিক তার পূর্ব দিন মানুষের কোন রূপ প্রস্তুতি নেয়া বা সতর্ক হওয়ার আগেই গাড়ি ভাংচুর- যা অতর্কিতে হামলা করারই নামান্তর- একদিনের কথা বলে অন্যদিন তা ঘটানো, মানুষের সাথে এমন খোলামেলা মুনাফিকীও ইদানিং রাজনীতিতে উঠে এসেছে, মানুষের জানমাল- কিছুই যেন আর ধর্তব্যের বিষয় নয়! দেশটা যেন মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। এটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? সে প্রশ্ন জাগছে না। অথচ বিশ বছর আগেও হরতাল ডাকলে মাসব্যাপী প্রচার-প্রচারণীতেও তা অনেক সময় হয়ে উঠতো না। এর কারণ যে প্রযুক্তিগত উত্তরণ, সেটা আইন-কানুন-নীতি-নৈতিকতা তথা রাজনৈতিক মননে প্রতিফলিত হচ্ছে না এবং স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনসমাজের নাগরিক মননকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে থাকে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি- তা যদি পিছিয়ে থাকে, তবে নাগরিক মননও পিছিয়ে পড়তে বাধ্য।

 

অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উত্তরণের সাযুজ্যতায় রাজনীতি এগিয়ে যায়নি- বরং তা মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে জিম্মি করে ফেলতে পারছে- এটা ভয়ানক বাস্তবতা! রাজনীতি ও তার সংস্কৃতিহীনতার নির্লজ্জ পশ্চাতগামিতা।

 

তাই চাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে অগ্রগামী রাজনীতি এবং অবশ্যই রাজনীতিকেই এগিয়ে যেতে হবে। অনেক কিছু না থাকলে দেশ চলে কিন্তু রাজনীতি না থাকলে দেশ চলে না- জাতীয় জীবন অচল হয়ে পড়ে।

 

কারণ- "এখনও মানচিত্রিক সীমানায় কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠির জীবন-মান নিয়ন্ত্রণে- সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্তৃত্বে প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতি-ই থাকে, তাই সারা দেশ যদি সাধু-সন্ততে ভরেও যায় আর রাষ্ট্রিক কর্তৃত্ব পচে ওঠে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা নিম্নমান প্রতিফলিত করে- তবে দেশ অচিরেই রসাতলে যাবে। বিপরীতক্রমে সারা দেশ যদি নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলায় ভরে ওঠে আর রাষ্ট্রিক কর্তৃত্বে সততা-নৈতিকতায় উন্নত রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মান প্রতিফলিত করে, তবে অচিরেই সে দেশ-জাতি বেঁচে উঠবে। এজন্যই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুরা দেশ-ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে প্রথম রাজনীতির ভাবমূর্তিকেই কামড়ে ধরে। দু-দশটা ব্যক্তি-দৃষ্টান্ত চর্চায় পুরো রাজনীতিটাকেই অনাস্থায় বিষিয়ে তোলে অথবা আদর্শের দৃষ্টান্তে থাকা ব্যক্তির দু-চারটে ভুলকেই প্রাধান্যে এনে অতিচর্চায় বিতর্কিত করে তোলে। এতে দেশে রাজনীতিহীন অনিশ্চয়তার ভ্রান্তি আর আদর্শিক দৃষ্টান্তের দৈন্যতায় স্বপ্নহীন প্রজন্মের বোঝা বাড়ে। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল প্রয়োগ হলেই যেমন তার পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি না, তেমনি দু'চারটে ভুলেই একজন মানুষের আদর্শিক অর্জনকে- তাঁর সামগ্রিকতাকে বাতিল করতে পারি না। নিজের আঙিনায় থাকা ময়লা এড়িয়ে যাওয়া যেমন সুস্থতা নয়, তেমনি সব ক্ষেত্রের মতো দু-চার জন মন্দ দৃষ্টান্তে রাজনীতিটাকে মন্দ বলা নাগরিক বোধগত মূর্খতার নামান্তর। তবুও রাজনীতির মন্দটা যেহেতু সবকিছুকে ঢেকে দিতে পারে, তাই এ ক্ষেত্রটার পচন রোধই সামষ্টিক জীবনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জরুরি। বিশেষতঃ যাঁরা জানেন, রাজনীতিটা অসংখ্য মানুষের জীবনমান- বাঁচা-মরার সাথে প্রত্যক্ষ জড়িত- যাঁরা বোঝেন রাজনীতি মানে দলাদলি, খুনোখুনি কিংবা ছেলেমীপনা নয় বরং মানুষ আর মনুষ্যত্বের প্রতি, নিজের সততার প্রতি, মানবিক মমত্বের প্রতি শ্রেষ্ঠ পথ ও নিদর্শন হলো দায়িত্ববোধের রাজনীতি, তাঁদের ক্ষেত্রে মানবিক আমানতদারী আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ উপায় রাজনীতি এবং জাতীয় জীবন প্রসঙ্গে যে-কোনো কিছুর চেয়ে, যে-কোনো সময়ের চেয়ে জরুরি হলো রাজনীতি। আর এ কারণেই দেশ-কালে সামাজিক দায়িত্ব পালনে সৎ রাজনীতিকই শ্রেষ্ঠ সন্ত মানুষ ও মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সাধনা যদি করতেই হয়, মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা করাই উত্তম। যেহেতু আজ রাজনীতির মানে হয়ে গেছে আদর্শহীনতা, তাই সাধনা-সংগ্রামে তার বিপরীতে আদর্শিক দৃষ্টান্ত হওয়ার মধ্যেই রাজনীতির উদ্বোধন। রাজনীতি মানেই যেহেতু আজ দলাদলি আর অসংহতির নেতিবাচক সংস্কৃতি, তাই তার বিপরীতে চাই সংহতির সঙ্গত দৃষ্টান্তে- দৃঢ় প্রত্যয়। আর তা হতে পারে সুনির্দিষ্ট দিশায় প্রাত্যহিক পথচলায়...।"

 

ফলে আজকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চাই নতুন রাজনীতি, চাই বাংলাদেশের নতুন উদ্বোধন।কারণ জাতীয় মর্যাদার আসনে রাজনীতিই থাকে, রাজনীতির মর্যাদায় জাতি বেঁচে ওঠে- দেশ এগিয়ে যায়।

 

প্রিয় দেশবাসী,

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে উল্লিখিত শুধু একটি ধারা, যা স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও যথার্থ বাস্তবায়ন না হওয়ার দৃষ্টান্তেই যেমন প্রমাণ করা যায়- স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনীতি তথা স্বাধীন বাংলাদেশের 'রাজনীতিহীন' দলবৃত্তির ধারাকে, তেমনি রাজনীতিহীন সরকার দ্বারা চালিত রাষ্ট্রীয় অবস্থাদৃষ্টে আখ্যা দেয়া যায়- 'বাংলাদেশ', সরকারবিহীন দীর্ঘ পথচলা 'এক সার্বভৌম জনপদ'!

 

ফলে- সংকট ও সমাধান, তদুপরি বিশ্লেষণ ও মানদন্ডে তথা আমাদের রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক লক্ষ্য ও দাবি পূরণে একটি মাত্র অনুচ্ছেদ অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ৪র্থ ভাগ, ৩য় পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ ৬০-এর যথার্থ বাস্তবায়ন, অর্থাৎ ব্যাপক বিস্তারে আমাদের কাছে প্রযুক্তিগত উত্তরণ সাযুজ্যতায় সমকালীন বাস্তবানুগতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় অখন্ডতায় স্থানিক ব্যবস্থার আমূল বিন্যাস বা কার্যকর করার দাবিই- আমাদের বর্তমানের রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আশুকর্তব্য হিসেবে ঘোষিত। যদিও তা সাংবিধানিক মানে মাত্র একটি ধারা হিসেবে শোনালেও জাতীয় আর্থ-জীবন মানে তা এতই ব্যাপক বিস্তৃত যে উক্ত ধারা বাস্তবায়ন- পক্ষান্তরে সংবিধানবদ্ধ বেশির ভাগ ধারা ও প্রসঙ্গকে ছুঁয়ে যায়।

 

ইতিহাসগত সমর্থনে থাকা যে 'স্বনির্ভর গ্রামব্যবস্থা', যা প্রায় সর্বজনবিদিত ও দল-মত নির্বিশেষে সমর্থিত, উল্লিখিত ধারার সাথেই তা সম্পর্কিত। এদেশের ব্যাপক জনসমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়ন উক্ত ধারার বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত এবং দল-মত নির্বিশেষে তা সমর্থিত বিধায় ক্ষমতাসীন হওয়ার পূর্বে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উক্ত ধারা তথা 'স্থানীয় সরকার' ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করলেও ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কোনো সরকার আমলেই তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়ে ওঠেনি।

 

ব্যাপক জনসমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়ন-স্বার্থ সংশিষ্ট, দেশজ বাস্তবনিষ্ঠ ও ইতিহাস সমর্থিত, ঐকমত্যের কোনো বিধি-নীতি বাস্তবায়নই যদি রাজনীতি হয়- তবে এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরে এতগুলো সরকারকে কেন রাজনীতিহীন বলা যাবে না? আর ক্ষমতাসীন বা সরকারে থাকা কোনো দলের যদি রাজনীতি না থাকে তবে সেখানে দেশও থাকে না, তা হয়ে পড়ে দলবদ্ধ স্বার্থান্বেষণগত কোনো গোষ্ঠী বা চক্রের শাসন, যাকে বলা হয় দলবাজি এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির নামে দলবদ্ধ ধাপ্পাবাজি। বিগত চল্লিশ বছরে সরকারে থাকা দলগুলির মধ্যে রাজনীতি পেয়েছি কম, দলবদ্ধ ধাপ্পাবাজি পেয়েছি বেশি, উক্ত দফা বাস্তবায়িত না হওয়া- সেই নির্জলা সত্যটাকেই প্রকটিত করে।

 

ফলে-

আবহমান বাংলার ইতিহাস ও তার স্বাভাবিক রাজনীতি, অর্থনীতি তথা সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই নির্দিষ্ট যে রাজনীতি, আমাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে সেই জাতীয় অস্তিত্ব, অবস্থান ও সংগ্রামের প্রকাশ অর্থেই আমাদের মূলনীতি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যাংশের সাথে যুক্ত হয়ে প্রথম, প্রধান ও একমাত্র দফা হিসেবে ঘোষিত হচ্ছেঃ

 

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণ (Decentralised Centralisation)- এর সমাজ-কাঠামো প্রতিষ্ঠা মারফত স্থানিক শাসন (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান, চতুর্থ ভাগ, তৃতীয় পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ-৬০) ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতঃ আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক অবস্থার বদল।

 

উল্লিখিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের মূলনীতি বা দাবি হিসেবে উঠে এসেছে-

সব ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত উত্তরণ ও চেতনার সাথে জাতীয় বাস্তবতার সাযুজ্যপূর্ণতায় সকল নীতি গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ "জ্ঞানে- বৈশ্বিক, প্রয়োগে- স্থানিক" তথা “Global Knowledge Local Act” শ্লোগানই মূলনীতি অর্থে গৃহীত।

 

বিজ্ঞাননিষ্ঠভাবে মানুষের মানবীয় মৌলিক অধিকারের ভিত্তি মূলতঃ দুটি 'খাদ্য' ও 'তথ্য' এবং তদভিত্তিক বর্তমান মানবীয় মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষিত- খাদ্য এবং তথ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা।

 

স্পষ্টতঃই আমরা মনে করি, 'শিক্ষা' মোটেই মানুষের মৌলিক অধিকার নয়- বরং তা কেবল 'তথ্যে'র অংশমাত্র এবং মানুষের ক্ষেত্রে তার মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রথম ও প্রধান উদ্বোধন ঘটে যে অধিকার পূরণ দিয়ে, তা হলো তথ্য। কারণ, জীবমাত্রেই বেঁচে থাকার শর্তে খাদ্য অনিবার্য এবং বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা মূলতঃ সমাজবদ্ধ মানুষের জন্য বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত আর 'তথ্য'হীনতায় তা মানুষের কাছে আজ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে সমাজবদ্ধ মানুষের বেঁচে থাকার শর্তগত দ্বার উদ্ঘাটনে প্রথমেই আসে 'তথ্য' যা কেবল মানবীয় বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত বা অপরাপর জীব থেকে পার্থক্য নির্দেশক। সুতরাং সমাজবদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকারকে নির্দিষ্ট করলে- জৈবিক শর্তে 'খাদ্য' এবং এর পরেই সমাজবদ্ধতার শর্তে আসে 'তথ্য'। এক্ষেত্রে মানবীয় বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত মৌলিক অধিকার হিসেবে নির্দিষ্ট হয় 'তথ্য' আর তথ্য ভিত্তিকতায় অপরাপর অধিকার নিশ্চিত বা নির্দিষ্ট হয়- যেমন এখানে আলোচ্য বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা। সেদিক থেকে মানবীয় মৌলিক অধিকারের ভিত্তি মূলত দুটি 'খাদ্য'-যা জৈবিক বা সব জীবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং 'তথ্য'- যা মানবিক বা কেবল সমাজবদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে অনিবার্য। অর্থাৎ প্রচলিত পাঁচটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার বদলে আমাদের দৃষ্টিতে উক্ত পাঁচটি মৌলিক অধিকার ও তার ভিত্তিগত বিজ্ঞাননিষ্ঠতায় ক্রম বিন্যাস করলে হবে- খাদ্যের পর ' তথ্য', এবং তথ্যভিত্তিকতায়- বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা। সেই সাথে পাঁচটি 'মৌলিক অধিকার'কে তথ্য ভিত্তিকতার কারণে আমরা 'মানবীয়' মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করছি এবং উক্ত পাঁচটি অধিকার 'মানবীয় মৌলিক অধিকার' অনুসারে যথার্থতায় ঘোষিত হচ্ছে- 'খাদ্য এবং তথ্য ও তদভিত্তিকতায় বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা'।

 

আমাদের রাজনৈতিক আশুকর্তব্য বা দাবিসমূহ এই আলোকেই বিবৃত। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আমূল বদল আনতে আমাদের ডাক-

"জাতীয় জীবনকে তথ্য ও প্রযুক্তির আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষ নাগরিক সংশ্লিষ্টতা গড়ে তোলো।

সব ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও বিচ্ছিন্নতার সব বাধা ভেঙে ফেলে- জনসমাজের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করো।"

 

 পুনশ্চঃ

সুহৃদ সহযোদ্ধা-প্রিয় দেশবাসী,

সবকিছুই ইতোমধ্যে বিপরীত অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। ভালো এখন মন্দের ফাঁস, সাদা শব্দটি কালোর অর্থে প্রতিফলিত আর আলো প্রকাশ করে ঘুটঘুটে কালোর অর্থকে। ঠিক যেমন যৌবন এখন সৃজন ও নির্মাণের পুরোধা না হয়ে ধ্বংসের হাতিয়ার হয়েছে। আশীর্বাদের বদলে তা এখন অভিশাপ। জীবনের অধিকারে ছাত্র-যুবদের বেঁচে থাকার কথা থাকলেও তাঁরাই লাশ হচ্ছে! তাই জীবন নয় মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত এ সময়, রূপান্তরিত দুঃসময়ে এবং দুঃসময় প্রেতাত্মার মতো উল্টো পায়ে সবকিছুর বিপরীত অর্থ করে। বিশেষতঃ রাজনৈতিক বেনোবৃত্তিতে 'দেশ' শব্দটা যখন পচে গেছে, তখন সমগ্র দেশ জুড়ে সংস্কৃতি ও সংহতির ডাক শুনলে কেউ কেউ দ্বিধায় ভ্রূ কুঁচকাবে। 'মুক্তি' ও সংহতি শব্দে যখন রাজনৈতিক দেউলিয়া বৃত্তির স্বার্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষের মানদন্ড হিসেবে বহুচর্চায়, বহুব্যবহারে বিভক্তির অসম্মানকর শব্দে পরিণত হয়েছে, তখন মুক্তিজোট উচ্চারণে আমাদের দল-মত নির্বিশেষে ঐক্য বা সংহতির ডাকের বিপরীতে দলবৃত্তির ঘৃণ্য ভাগের যূপকাষ্ঠে বলি দেয়ার অপচেষ্টা হতেই পারে।

 

তাই অপরের চোখ-কান আর বুলি দিয়ে নয়, নিজের স্বকীয়তা দিয়েই আমাদেরকে চিনুন। আমাদের আদর্শ আমাদের মতো। আমাদেরকে দেখেই আমাদেরকে বুঝুন এবং তা বাইরে থেকে নয় বরং ভেতর থেকেই- সাথে চলেই সত্যকে জানুন। স্বকীয়-সত্য বোধের দৃঢ় প্রত্যাশায় পুনশ্চঃ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

 

"বাংলাদেশ অমর হোক

ধরিত্রীর বুক জুড়ে সর্বত্র শান্তি নামুক

অহিংস'র দীপ্ত বাণী বিশ্বমাঝে ছড়িয়ে পড়ুক

মানবীয় মর্যাদায় বিশ্বশান্তি মুক্তি পাক

মানুষ ও মনুষ্যত্ব মুক্তি পাক, মুক্তি পাক।"