[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

মার্চ ফর বাংলাদেশ

 


MARCH FOR BANGLADESH

 

সমাজ সংশ্লিষ্ট যা, তা যদি সংস্কৃতি হয় এবং রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট যা, তা যদি রাজনীতি হয়; তবে স্পষ্টতঃই রাজনীতি সংস্কৃতির অংশ বা সংস্কৃতির সাথেই যুক্ত- তাই আর্থ-সামাজিক বা মানচিত্রিক সীমানা বলতে অনিবার্যভাবেই ভূমিজ স্বকীয়তায় ‘প্রকৃতিগত সংস্কৃতি’ তথা Based on Ecology-কেই নির্দেশ করে। আর তার পরিণতিতেই বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ-এর সংগঠন-কাঠামো, যা সুনির্দিষ্টভাবেই মানবসমাজ বা সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট।

 

অর্থাৎ মানচিত্র বলতে কর্তৃত্ব কেন্দ্রিক ভাগাভাগি কিংবা শাসক গোষ্ঠীর রক্তাক্ত জৈবিক হাতে চিহ্নিত কোনো রেখা নয় বরং প্রকৃতি নির্দিষ্ট ভূ-প্রকৃতিভিত্তিক কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আপন সংস্কৃতি দ্বারা নির্দিষ্ট হতে হয়।

 

এক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মৌলিকত্বকে আবিষ্কারের জন্যে অনিবার্যভাবেই ব্রিটিশপূর্ব সামন্ততান্ত্রিক বিকাশ অবস্থার মধ্যে খুঁজতে হবে। সেক্ষেত্রে, সামন্ততান্ত্রিক ভাবাদর্শগুলো যেহেতু ধর্ম হিসেবে খ্যাত- সেহেতু ধর্মের বিকাশের মধ্যেই তা খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ, সংস্কৃতির নাড় অনুসন্ধানে দু’চারশো বছর খুবই নগণ্য অর্থাৎ সময় সংশ্লিষ্ট হয়েই সমাজ-রাষ্ট্র তথা মানবীয় জীবন ও যাপন ‘সংস্কৃতি’ অর্থে নির্দিষ্ট।

 

প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে চৈনিক ও ভারতীয় সভ্যতা ভাববাদকে ঘিরে আবর্তিত ও বিকাশ লাভ করেছে। এদিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ মরমী চিন্তার পথ ধরে এগিয়ে গেলেও ধর্ম বলতে যা বোঝায়, এখানে তা ছিল না। আজ হিন্দু বলতে যা বোঝায়, সেটাও কোনো ধর্ম নয় বরং উপমহাদেশীয় পরিচয় বিদেশীদের মুখে অস্পষ্ট উচ্চারণে- সিন্ধ্ থেকে ইন্দ্, ইন্দ্ থেকে ইন্ডিয়া এবং সিন্ধু থেকে ইন্দু অতঃপর হিন্দু নাম ধারণ করেছে; যা পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসক শ্রেণীর হাত ধরে মূলতঃ মুসলিম বিরোধিতায় এদেশীয় শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব ইত্যাদি তথা সনাতনী শুদ্ধ বিশ্বাসগুলোকেই মিলিয়ে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরিত করেছে। কিন্তু ভাববাদকেন্দ্রিক এই উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি মূলতঃ চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে- ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। এই চতুর্বর্গের মধ্যে ‘মোক্ষ’ হলো- ‘আধ্যাত্মতা’। জীবাত্মার উপর আত্মা সম্পর্কিত চিন্তা করা, পরমাত্মার সাথে সংযোগ রক্ষা করা ছাড়া আর সবই এখানে গৌণ।

 

সংস্কৃতির এই ধারা ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাতে যতো স্বকীয়তা নিয়ে আছে- তা অন্যত্র নেই। এখানে বরং ধর্ম বলতে অনুশাসন বা Code-এর বাড়াবাড়িকে ঘৃণার চোখেই দেখা হয়েছে। যে কারণে সমস্ত বিদ্রোহ এবং পুরাতনের বিরুদ্ধে নতুনকে গ্রহণের পর্ব বাংলাতেই প্রথম ও বেশি মাত্রায় সংঘটিত হয়েছে। বিশেষতঃ পূর্ব বঙ্গীয় (অধুনা বাংলাদেশ) সাংস্কৃতিক বিকাশে তা স্পষ্ট।

 

‘আর্য ধর্ম’ যখন ব্রাহ্মণ্য স্বার্থে আচারসর্বস্বতায় তার আধ্যাত্মকে দীর্ণ করে তুলেছিল, তখন এখানেই প্রথম বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল এবং নতুন ধর্ম হিসেবে ‘বৌদ্ধ ধর্মে’র বিস্তারও এখানেই লাভ করেছিল।

 

পরবর্তীতে ‘ইসলাম ধর্ম’ও এখানেই স্থায়িত্ব পেয়েছে। পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে মূলতঃ ‘ইসলাম ধর্ম’ই একমাত্র ধর্ম, যা সমাজ ব্যাপকতায় এখনও টিকে আছে।

 

অথচ ব্রাহ্মণদের মতো বৌদ্ধরা এখানে অনার্য ভাষা বা সংস্কৃতিকে ঘৃণার চোখে না দেখে বরং পালি ভাষার জন্ম দিয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণদের মতো আচারনিষ্ঠতার প্রাবল্য না থাকলেও তা স্থায়িত্ব পায়নি। এর কারণ অনুসন্ধানের মধ্যেই রয়ে গেছে বাংলার মৌলিকত্ব।

 

প্রথমতঃ এদেশে ইসলামের যে প্রসার, তা অনুশাসন বা শরিয়া তথা রাষ্ট্রিক পৃষ্ঠপোষকতায় সাধারণের মধ্যে তেমন প্রসার লাভ করেনি। বরং তা সার্বজনীন রূপে প্রসার লাভ করেছিল- সুফি মতবাদের মাধ্যমে। স্থানীয় জনসাধারণ তাদের প্রচলিত আচার-বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্য নিয়েই ইসলামের অঙ্গনে প্রবেশ করতে পেরেছিল।

 

দ্বিতীয়তঃ ইসলাম ধর্মে, মরমিয়াবাদের সাথেও ছিল- জীবনমুখী পারিবারিক সূত্রবদ্ধতায় সমাজ সংশ্লিষ্টতা। মানবতাবাদী বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ মরমীবাদ সহ সব বৈশিষ্ট্যের আশ্রয় থাকলেও, দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য (পারিবারিক সূত্রে সমাজ সংশ্লিষ্টতা) ছিল অনুপস্থিত। বৌদ্ধরা মূলতঃ মঠকেন্দ্রিক ছিল। ফলে তা ব্রাহ্মণদের আঘাতে খুব সহজেই ভেঙে পড়ে। কেন্দ্রমুখিনতা এখানে ভাবাদর্শিক স্থায়িত্বের নির্দেশ করে না। বরং সেখানে ‘পরিবারকেই’ (বিকেন্দ্রীভূত সমাজ সংগঠন) নির্দেশ করে।

 

সমাজ সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় অনুশাসন (Code) তথা আচারনিষ্ঠতা এই সংস্কৃতিতে মুখ্য নয় বরং তা মুখ্য হয়ে উঠলে, এ সংস্কৃতি তথা দেশের শত্রুতাকেই চিহ্নিত করে এবং তা প্রথম ভাষার উপরই আঘাত নিয়ে আসে। সেটা আর্য-ব্রাহ্মণ নির্ভর ধর্মও করেছিল সেন আমলে, তারা অনার্য বাংলা ভাষাকে শুধু নিষিদ্ধ নয়, মহাপাতকের ভাষা, নরক ভাষা আখ্যা দিয়ে ‘সংস্কৃত ভাষা’ চাপিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানের সময় ‘উর্দু ভাষা’কে চাপানো হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল- এটা না হলে এদেশে ইসলাম ধর্ম থাকবে না। পার্থক্য- আর্য ধর্মকে বিলীন হতে হয়েছিল, কিন্তু ইসলামকে হতে হয়নি। অর্থাৎ ধর্ম নয়- সংস্কৃতিই নির্ধারণী ভূমিকা এবং সংস্কৃতির ধারক এখানে- ‘পরিবার’। [ফিরে দেখা- ১২ বছর; পৃষ্ঠা নং- ১২০ (সাংগঠনিক রিপোর্ট ২০০৪; প্রথম ধাপ-এর চতুর্থ রিপোর্ট) দ্রষ্টব্য]

 

ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতির প্রাচীন ভাষা ছিল অনেকটা রূপকাশ্রয়ী বা যথার্থভাবে ইংরেজী প্রতিশব্দ Mythological- পৌরাণিক। যেমন, মিশরের ভাষা ছিল Hieroglyphical- চিত্রাক্ষরিক অর্থাৎ চিত্র দিয়ে বক্তব্য বোঝানো, প্রাচীন পারস্য-মেসোপটেমিয়া প্রভৃতি দেশের ভাষা ছিল Cuniformic- কীলকাকার, অপরপক্ষে প্রাচীন গ্রীসের ভাষা হলো Geometrical- নিতান্তই বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি, এরই উত্তরাধিকার হল পাশ্চাত্য লজিক। Geometrical চিন্তা এগিয়ে গিয়েছে বস্তুবাদের পথে। এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে পাশ্চাত্যকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে কিন্তু আপন সংস্কৃতি ঐতিহ্যের মধ্যেই থাকে প্রাণের বিকাশের কথা; বেঁচে থাকার অস্তিত্ব ওটাই- পাহাড়-মরুভূমি, সমুদ্র-সমভূমি, মেরু ও নদ-নদী তথা প্রকৃতি নির্দিষ্ট সব ভূমি ও তার জনগোষ্ঠীর জন্যেই তা সত্য। যা রয়ে গেছে অনেকটা নারকেলের মতো, খোসা না ছাড়ালে বাইরে থেকে ভেতরটা বোঝা যায় না। সব ভূমির অধিবাসীকেই নিজ নিজ দেশকে আজ ভেতর থেকে বুঝতে হবে তাদের বাঁচার স্বার্থে।

 

আর এদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী বাহ্যিকতায়- বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই দেখেছে চিরকাল, যাঁরা পৃথিবীকে বসুমাতা বলে জানে। শক্তিও এখানে মাতৃরূপে অর্চিত, মাতৃবোধের স্মারকেই তাঁরা রক্ষা করেছে ভাষাসহদেশরূপী মাতা- মাতৃভূমিকে। নিজের মা-কে না জানলে জগতের সকল মা অজানাই থাকে; নিজের মাতৃভূমিকে না চিনলে, ধরিত্রীকে চেনা হয় না কোনো কালে। আবহমান কাল ধরে এ ভূমির মানুষ প্রকৃতি ও তার নিয়মকে ‘বিধির নিয়ম’ হিসেবে নির্দিষ্ট করেছে- সকল ধর্মের মানুষই স্রষ্টাকে ‘বিধি বা বিধাতা’ হিসেবে এক নামে এক বোধে স্মরণ করেছে; বহুকাল আগেই পৃথিবীকে যাঁরা বসুমাতা হিসেবে জেনে এসেছে- স্বকীয় সত্তায় তাঁরা মহান এক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারে বৈশ্বিক বোধের বাহক।

 

আপন ভাষাতেই আমরা শিখি বিদেশী ভাষা- সে ভাষাও হয়ে ওঠে একসময় নিজেরই ভাষা; কোনো দেশের মুক্তি আজ আর শুধু সেই দেশের মানচিত্রিক সীমানার সাথে যুক্ত নয় বরং বিশ্ব মানব সমাজের সংহতি ও অখ-তাতেই সে সংহত- মুক্ত।

 

অস্তহীন সূর্যের ছায়ে সমগ্র ভূ-পৃষ্ঠ আজ সামগ্রিক মানুষের- অথচ অখ- বিশ্ববোধের সেই কাঠামোগত দিকটা এখনও অনুপস্থিত।

 

যুদ্ধের ক্ষেত্রে কারবালা, কুরুক্ষেত্র, ট্রয়ের মতো কিংবদন্তী পৃথিবীর মানুষের জানা থাকলেও প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পৃথিবীকে ব্যাপৃত করা এমন যুদ্ধের হদিস ইতোপূর্বের দুনিয়াতে পাওয়া যায়নি। েএমন-কি আজ যে-কোনো দেশের যুদ্ধ, নিত্যি-নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মহড়া বিশ্বযুদ্ধের শংকা নিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় যেভাবে হাজির হয়, প্রাত্যহিক ত্রস্ততার মতো অতি সাধারণ বিষয় ও শংকা হয়ে ওঠে-তা ইতোপূর্বে ঘটেনি। অর্থাৎ কোনো ভূখণ্ডই আর তার সীমানায় নেই, সেটা বহু আগেই দু দুটো বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত। তাই ‘সুশাসন’ সহ আজকের যা কিছু কাঠামো সংশ্লিষ্ট তথাকথিত বুদ্ধিবাগীশ তাত্ত্বিকতা, তা কেবল বাজে কথার ফুলের চাষই নয় বরং সেই তাত্ত্বিক গালগপ্পোবাজদের মুখের সামনে জুতার পট্টি হয়ে ঝুলে আছে জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতার অস্তিত্ব- যা মূলতঃ ভারসাম্যহীন পৃথিবীর সেই অখণ্ড বৈশ্বিক কাঠামোহীনতারই স্মারক। সুশাসন অথবা দুঃশাসন, রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট যা কিছু-তা আজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অখণ্ড বৈশ্বিক সংগঠন-কাঠামোর সেই মূল সংকটকে ঘিরেই আবর্তিত। অতএব, একে বাদ দিয়ে যে-কোনো রাষ্ট্রতাত্ত্বিক সমাধানই ব্যক্তি-তত্ত্বের আঁতলেমী বা বাক্যবিলাস হতে বাধ্য এবং তা নৈর্ব্যক্তিক সত্যচার বা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক সংকট সমাধানে নিশ্চিতভাবেই অসম্পূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য।

 

কারণ, বিগত পৃথিবী আর তার খণ্ডিত ভূপৃষ্টের কাঠামোগত রুপ এখনও লানতের মতো চেপে আছে পৃথিবীর ললাটে। কেনো একদিন মানুষ, মানুষ হয়েও মানুষকে দড়ি বেঁধে বাজারে তুলেছে বিক্রির জন্যে, আজ মানচিত্রের রেখাগুলোই পুরনো দড়ি হয়ে ফিরে এসেছে-খাদ্যহীন মানুষের ঝাঁক আর শরণার্থীর সংজ্ঞায়; এখনও নারী-পুরুষ-শিশু মানুষের সংজ্ঞা হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পথে পথে ঘুরছে এবং তা ক্রমশঃ প্রাত্যহিক ঘটনা হয়ে দেখা দিচ্ছে। তামাম দুনিয়া সুদ্ধ মানুষের চোখের সামনে (টিভি, নেট, মিড়িয়া বা প্রযুক্তিগত উত্তরণ সাযুজ্যে) সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দীর মৃতদেহ ভেসে উঠেছে; যাঁরা নিজেদেরকে সুসভ্য, আধুনিক মানুষ বলে জানেন; তাঁরাই আজ যুদ্ধ আর ইতরামির সেই দড়ি রক্ষায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেন। তাড়া খাওয়া কুকুর, বেড়াল আর শ্মশানের কাক হয়ে উঠছে মানুষ, অথচ ইবলিসীয় সেই লানত কাঠামোর চেহারায় একনও মানুষ ও মানুষের পৃথিবীকে আষ্টেপৃষ্টে বেধেঁ রেখেছে-ভাগাভাগিতে জীবনমানকে নরকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

সংগ্রাম তাই আজ ‘মর্যাদা’র; মনুষ আর মনুষ্যত্বের এবং তা নিশ্চিত ও চিহ্নিত- এই ইবলিস ও ইবলিসীয়তার বিরুদ্ধে; কারণ, মতাদর্শিক দিশায় নির্দিষ্ট হয়েছে-তা আজ প্রকাশ্য শত্রু।

 

সুতরাং যা কহতব্যঃ

 

একাধিকের অস্তিত্ব থেকেই অনিবার্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনভিত্তিকতা থেকেই ক্রমান্বয়ে বিধি-বণ্টন যা কিছু, আর এই দুই মূলতঃ এক অর্থে সামষ্টিক তথা সংহতির শর্তেই পরিবর্তমান রূপ ও রূপান্তরের ‘প্রত্যয়’ (Idiom)-এ নির্দিষ্ট থাকে ‘কাঠামো’ তথা রাষ্ট্র সহ যৎযাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা।

 

আজকের মতো পৃথিবী ইতোপূর্বে কখনও ভূপৃষ্ঠ সমেত তার অধিবাসীদের নিয়ে এমন অখণ্ড মানবসমাজের রূপ লাভ করেনি। পনেরোশো শতকে আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সমগ্র ভূপৃষ্ঠ সুষ্পষ্টতায় চিহ্নিত হয় তথা পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ সামগ্রিকতায় নির্দিষ্ট হয়; কিন্তু সেদিনই বৈশ্বিক মানব সমাজ গড়ে ওঠেনি বরং ক্রমশঃ প্রযুক্তিগত (Communication) উত্তরণ ও তার পরিণতিতে সমগ্র ভূপৃষ্ঠের অধিবাসীদের পারস্পরিকতার শর্তেই আজকের অখণ্ড মানব সমাজ সুনির্দিষ্ট হয়েছে; কারণ- সমাজ প্রসঙ্গে পারস্পরিকতার দিক এবং সংহতির শর্তে কাঠামোগত দিকটি স্মর্তব্য।

 

তাই পরস্পরবিচ্ছিন্ন বিগত পৃথিবীর ইতিহাসে বর্তমানের অখণ্ড কাঠামো প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর কিভাবে মিলবে?

 

একটি রাষ্ট্র যেমন তার নির্দিষ্ট মানচিত্রিক সীমানাভুক্ত অপরাপর সব প্রতিষ্ঠান সমূহের সমন্বিত বা ব্যবস্থাপনার অর্থে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান; তেমনি অখণ্ড বিশ্ব বোধের প্রাতিষ্ঠানিক, নিদেনপক্ষে বিদ্যমান সব রাষ্ট্রসমূহের সমন্বিত অর্থে কোনো একক রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোগত দিকটি নেই। যদিও আই.এম.এফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহ বহু আগে বৈশ্বিক রূপ পেয়েছে। কিন্তু তাকে সংহতকরণের শর্তে কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আজও গড়ে ওঠে নি। এমনকি ইদানীংকালের বাই-প্রডাক্ট জঙ্গিপনার মতো ছোট-খাটো বদমায়েশী কিংবা কয়েকজন ছিঁচকে চোর মিলে এক দেশের অর্থ অন্য দেশে চালান করলেও তাকে রোখার ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রের আজ আর নেই।

 

কারণ- কাঠামো যদি সংহতকরণের শর্তে উদ্ভূত হয় তথা সমন্বয়হীনতা থেকে যদি অস্থিতিশীলতা আসে, তবে সমন্বিতকরণ বা সংহতরণের শর্তেই কাঠামো নির্দিষ্ট হয়- সেদিক থেকে সমগ্র ভূপৃষ্টসমেত তার অধিবাসী বা বৈশ্বিক মানব সমাজ অখণ্ড বিধায় তার স্থিতিশীলতা বা সংহতি প্রতিষ্ঠায় আজ বৈশ্বিক কাঠামো অনিবার্য। সেক্ষেত্রে কোনো জাতীয় সীমানা সামগ্রিকতার শর্তে আজ অংশ, আর অংশ কখনই সমগ্রের শর্ত পূরণ করতে পারে না। যুগপৎ সমগ্রের অস্থিতিশীলতায় অংশের শর্তগত কারণে নিজেকেও মুক্ত রাখতে পারে না। তাই, জাতীয় সীমানায় কোনো রাষ্ট্রই আজ আর স্থিতিশীল বা সংহতির শর্তে তার কাঠামোগত ভূমিকায় যথার্থ থাকতে পারে না। চাইলেই তাই আজ আর স্থিতিশীলতার অর্থে সংহতির সেই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য দেখাতে কোনো রাষ্ট্রই সক্ষম নয়। যতো শক্তিশালী আর যতো কেন্দ্রীভূত আধুনিক রাষ্ট্রই হোক প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত দিক থেকে ইতোমধ্যে তা ‘অকার্যকর’। বলা যায়- Expired and Institutionally Dead.

 

বহুবিধ জাতীয় অথবা বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মূল বিন্দু এখন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একটিই। সভ্যতা বলি কিংবা মানবীয় ও মনুষ্যত্বের মূল সংকট বলি, এর বাইরে ভাবাটা ভুল। যে অর্থে ভাবাদর্শ ছাড়া মানবসমাজ অচল, সেই অর্থেই বর্তমান বিশ্ব-মানবসমাজ এর অভাবে- ন্যুব্জমান।

 

অখণ্ড বৈশ্বিক কাঠামোগত শর্তে এই গ্রহের প্রতিটা ঘটনাই সমান গুরুত্ববহ- সবটাই একসূত্রে গাঁথা। পৃথিবী নামক গ্রহকে মানুষের বাসযোগ্য করার জন্যে আজ প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বোধ সহ মানচিত্রিক রেখায় চিহ্নিত দেশগুলো ও তার ঘটনাসমূহ কেবল সেই সীমানায় স্থবির আর স্থাণু ভাবা কিংবা কোন দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাসকে কেবল তাদের ইতিহাস করে রাখার সেই বিগত ভেদ আজকের দুনিয়াতে অসুস্থতা। সঠিকতা নির্ণয়ে তথা অখণ্ডতার শর্তে সবটুকুই নিজেদের- বাঁচার জন্যে প্রতিটি মানুষের এই একটিই পৃথিবী, বিশ্লেষণে সর্বগ্রে সেটাই স্মর্তব্য। কারণ, সিদ্ধান্ত সর্বদা সামগ্রিকতার সাথে যুক্ত; বলাবাহুল্য এই ধরিত্রি সেই সামগ্রিকতারই স্মারক।

 

সেক্ষেত্রে, জীবনের উদ্বোধন (শিশু) ঘটে বৃহদায়তন সমাজ কোষ পরিবারে- ওটা মূল কিন্তু তার পরিণতি (কাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিকতা) তথা যাপন ক্ষেত্রে প্রধান নিক্তি হয়ে পড়ে অর্থনীতি। অর্থাৎ অর্থনীতি ছাড়া ইতিহাস- কিংবা ইতিহাস ছাড়া অর্থনীতির বোধ অসম্পূর্ণ এবং বর্তমানকে স্পষ্ট করে ভবিষ্যৎ নির্দিষ্টকরণেই ইতিহাস। নিশ্চয়ই ইতিহাসে ফিরে যাওয়ার জন্যে কিংবা পুরোনো ইতিহাস ফিরিয়ে আনার জন্যে কেউ ইতিহাস চর্চা করে না।

 

রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনীতিক প্রসঙ্গে আলোচনা যদি করতেই হয়, তবে সংগত কারণেই বর্তমান রাজনৈতিক পৃথিবীতে এটাই হতে পারে সংগত আলোচ্য বিষয়- ইতিহাস বিশ্লেষণও কেবল হতে পারে সে প্রেক্ষিতেই।

 

বর্তমান দুনিয়ায় কেবল এই উপমহাদেশে একই সময়ে একসাথে একই সমাজ অভ্যন্তরস্থ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাস আছে এবং তা হাজার বছরের সামাজিক অস্তিত্ব নিয়ে বহমান থেকেছে । রাষ্ট্র দ্বারা নয় বরং সে সমাজ আপন ব্যাপকতাকে স্থানিক বা আর্থিক স্বয়ম্ভর ব্যবস্থা দ্বারাই নিজেকে রক্ষা করেছে, সংহতির শর্ত পূরণ করে নিজেকে বয়ে নিয়ে গেছে; যেখানে একই সময়ে একই সমাজ অভ্যন্তরে একাধিক রাষ্ট্র ও তার উত্থান-পতন নিয়েও অস্তিত্বশীল থাকতে পেরেছে।

 

প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনে আধুনিক পৃথিবীর যাত্রা যখন শুরু হয়েছে, এ মাটিতে তার সূত্রপাত ঘটেছে বৃটিশদের হাত ধরে। বিশেষতঃ শাসন সুবিধার্থে রেল পথ স্থাপনসহ সব ক্ষেত্রেই ভেতরকে না বুঝে আপন সুবিধায় বহিঃস্থ থেকে চাপিয়ে দেয়ার যে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রতাত্ত্বিক বোহেমিয়ানতা তা এখানে প্রবেশ করে- দেশজ বোধ, বাস্তবতা ও ব্যাপক জনসমাজ মুখিনতা নয় বরং ব্রিটিশ বা বিদেশ স্বার্থ মুখিনতায়। তাই রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে তা প্রাসঙ্গিক হলেও দেশজ বা ব্যাপক জনসমাজের শাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তেমন প্রাসঙ্গিক নয় কারণ ব্যাপক সমাজায়তনে এর প্রভাব খুব বেশি পড়েনি; যা প্রযুক্তিগত উত্তরণ বাস্তবতায় আজকে হচ্ছে। রাষ্ট্র এখানে সমাজ অভ্যন্তরস্থ হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে স্থিতিশীল, যেখানে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রতত্ত্ব স্থানিক শর্তে সংহত সমাজকে দেখেছে যা আজ বৈশ্বিক ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, প্রচলিত সেই বৈশ্বিক রাষ্ট্রতত্ত্বে আজ সমগ্র রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বে সমন্বিতকরণের শর্তে অখণ্ড বিশ্বের সংগঠন-কাঠামো তথা সংহতি স্থাপনের ধারণায় (রূপকল্প) পৌঁছতে পারছে না- যা পাণ্ডিত্যের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ধারণার ক্ষেত্রে ইতিহাসগত অপ্রতুলতা। এক্ষেত্রেও জাতীয় সংহতি ও মুক্তির শর্ত যেমন আজ বৈশ্বিক সংহতি ও মুক্তির সাথে শর্তযুক্ত- তেমনি সেই সমগ্র বা বৈশ্বিক শর্তেই সকল ভূখণ্ড ও তার অধিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপাদান সামগ্রিকতার বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে বা সবার হয়ে উঠেছে। বিশেষতঃ এই উপমহাদেশের সমাজ পাশ্চাত্য বোধে আঁটা পৃথিবীর চোখে যে কারণে অচলায়তন আখ্যা পেয়েছে বা ব্যাকডেটেড হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতায় ইতিহাসের খেরো খাতার প্রসঙ্গ হয়ে আছে, সে কারণেই তা আজ সমাগত বিশ্ব মানবসমাজের সংহতির দিশা ও দৃষ্টান্তে প্রাসঙ্গিক।

 

বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত রাজনীতি ও অর্থনীতির পারস্পরিক সীমানা ও কর্তৃত্ব প্রাসঙ্গিকতায় এদেশের একটি কৌতুকপূর্ণ গল্প খুব মিলে যায়। একটি পাতা নদীতে পড়লে কুমির হয় আর ডাঙ্গায় পড়লে বাঘ কিন্তু তা যদি অর্ধেক নদীতে আর অর্ধেক ডাঙ্গায় পড়ে তাহলে কি হয়? রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একজনের হাতে আর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে অপরের হাতে- নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্বগত এই ভাগাভাগি বাস্তব সম্মত কি না এবং সেটা হলে শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি ডেকে আনে তা বাংলার ইতিহাসে আছে- যা শুনলে এখনও মানুষ আঁৎকে ওঠে, তা হলো ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’।

 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রবর্তিত দ্বৈত শাসনের কুফল হিসেবে ইতিহাসে থাকা কুখ্যাত ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ তৎসময়ের শাসন ব্যবস্থা ‘না-থাকা’র (রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত আর্থিক ক্ষমতা) ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এবং রাষ্ট্রতাত্ত্বিক এই দৃষ্টান্তই অনেক প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিয়েছে- ২০০৮ থেকে চলা বর্তমান আর্থিক মন্দা প্রসঙ্গে; যা চলমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘অদৃশ্য হাত’ বা ‘রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত’ আধুনিক বাজার ব্যবস্থার অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসেবে সৃষ্ট। বিশেষত, নিয়ন্ত্রণহীন বলগা ঘোড়ায় চেপে বসার খায়েশ বা বেনো দাবি মিটলেও যে শেষ পর্যন্ত সে নিজেই উল্টো খাদে পড়ে, আর্থিক ক্ষেত্রে সেটাও প্রমাণ হয়েছে ২০০৮-এ বিশ্ব মন্দায়।

 

রাষ্ট্র- যার অবস্থান প্রত্যক্ষ জন-সম্পৃক্ততায় এবং যদি এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়, তবে এর সীমানায় থাকা আর্থ-সামাজিক সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান। সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রনাধীন- বিচার ব্যবস্থা থেকে অর্থ ব্যবস্থা, এর বাইরে কোন কিছুই যাওয়া মানে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে শুধু পদদলিত করা নয় বরং সেই জনসমাজেও নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলাকেই অনিবার্য করে তোলা। ১১৭৬ বঙ্গাব্দ-এর দ্বৈত শাসনে বাংলার প্রতি তিন জনে এক জনের মৃত্যু তথা এক-তৃতীয়াংশ বা ১ কোটিরও অধিক মানুষের প্রাণনাশী ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ এর প্রমাণ। তেমনি, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠান গেলে সে নিজেকেই নিরাপত্তাহীন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়- ২০০৮ থেকে শুরু হওয়া বিশ্ব-মন্দা তার প্রমাণ। আর তা থেকে পরিত্রাণে যখন তাবৎ দেশের সরকার প্রধানরা মিলেই জি-৮, জি-২০, জি-৭৭ ইত্যাদি সম্মিলিত উদ্যোগ বা সংগঠন মারফত সেটাকে খাদ থেকে পাড়ে তোলে, তা দিয়েই প্রমাণ হয় রাষ্ট্রিক তথা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে ম্লেচ্ছ ভাবা হলেও অবশেষে তার পৌরোহিত্য বা অভিভাকত্ব ছাড়া তার উদ্ধার মেলে না; এমনকি চলতেও পারে না- তাই শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালে বৃটিশ রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষতা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ ‘অদৃশ্য হাত’ বা ‘রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত’ স্বাধীন বাজার ব্যবস্থা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে কেবল বর্তমানে নয়, বহু পূর্বেই দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা মারফত এ বাংলা বা উপমহাদেশে ভয়াল দুর্ভিক্ষ দ্বারা ‘ভুল’ হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে আছে। এক্ষেত্রে মনে হতে পারে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী থেকে শাসন ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া বুঝি আশীর্বাদ ছিল। মোটেই তা আশীর্বাদ ছিল না বরং ঘন ঘন দুর্ভিক্ষতাড়িত অসংখ্য মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ উপমহাদেশে তা ছিল ফেউয়ের পর বাঘের আগমন ধ্বনি। ব্রিটিশপূর্ব শাসন ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মারী-মহামারী থাকলেও এ উপমহাদেশের ব্যাপক জনসমাজ দুর্ভিক্ষকে চিনত না। ব্রিটিশ বেনিয়াদের পা রাখার পর এখানে তা বারবার ঘটেছে!

 

পূর্বোল্লিখিত ‘রাষ্ট্র- যার অবস্থান প্রত্যক্ষ জন-সম্পৃক্ততায় এবং যদি এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়, তবে এর সীমানায় থাকা আর্থ-সামাজিক সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান। সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রনাধীন- বিচার ব্যবস্থা থেকে অর্থ ব্যবস্থা, এর বাইরে কোন কিছুই যাওয়া মানে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে শুধু পদদলিত করা নয় বরং সেই জনসমাজেও নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলাকেই অনিবার্য করে তোলা।’ কেউ কেউ এই কথায় সর্বনিয়ন্ত্রণবাদের ভূত দেখতে পারেন। বিশেষতঃ বিগত আর প্রচলিতের বাইরে যা কিছু তা নতুন হলেও এবং প্রগতিশীলতার শর্তে এর ‘নতুন’-এর জয়গান গাইলেও নতুনকে এঁরা দেখতে পান না- কারণ, নিজের চশমাটা খুলতে ভুলে যান আর চশমার কাঁচ কালো হলে চাঁদ-সূর্য সবই কালো দেখায়। তাই যথার্থই কোনো কিছু দেখতে হলে, বলতে গেলে, প্রথমে তাঁদের চশমাটাই খুলতে হবে।

 

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বলতে এখানে সর্বনিয়ন্ত্রণবাদকে বোঝানো হচ্ছে না, কারণ- নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনা বৈশিষ্ট্য বলতে এক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ককে নির্দেশ না করে বরং নিয়ন্ত্রণ বলতে শুধু ‘প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান’সমূহের পারস্পরিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ফলে সর্বনিয়ন্ত্রণবাদ প্রসঙ্গটাই এখানে অবান্তর।

 

সেই সাথে মনে হতে পারে, রাষ্ট্র কর্তৃক আর্থ-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে মার্কসীয় ভাবধারাকেই বুঝি প্রতিফলিত করা হচ্ছে। বিশেষতঃ বর্তমানের বিশ্ব-মন্দা প্রসঙ্গে মার্কসীয় ভাবধারা যেভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে, হঠাৎ ডাস ক্যাপিটাল-এর বিক্রি-বাট্টা যে হারে বেড়েছিল- সে প্রেক্ষিতে এটা মনে হতেই পারে। তাই এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

 

‘রাষ্ট্রতত্ত্ব’ ও ‘সমাজতত্ত্ব’- দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক থাকলেও দুটির বিষয় ও সীমানা ভিন্ন, অর্থাৎ রাষ্ট্র সমাজের অভ্যন্তরস্থ বিধায় বড়জোর রাষ্ট্রতত্ত্বকে সমাজতত্ত্বের আওতাভুক্ত বলা গেলেও বিচি ও তরমুজকে এক করে দেখা যায় না। পাশ্চাত্যের চিন্তাধারায় ‘রাষ্ট্রতত্ত্ব’ ও ‘সমাজতত্ত্ব’; এমন-কি এ প্রাসঙ্গিক দার্শনিক ধারাও যেখান থেকে উদ্ভূত, তা মূলত ‘নগররাষ্ট্র’ হিসেবে খ্যাত এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে প্রথম আবিষ্কৃত হয় রাষ্ট্রের অধিভুক্ত সমাজ নয় বরং সমাজের অধিভুক্ত রাষ্ট্র তথা বিচির আওতাভুক্ত তরমুজ নয় বরং তরমুজের আওতাভুক্ত বিচি। অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সীমানা আবিস্কৃত হয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীতে, তৎপূর্বে রাষ্ট্রের আওতাভুক্ত করেই সমাজ আলোচিত হয়েছে । সেই অর্থে পাশ্চাত্য দার্শনিক ধারায় সমাজ আবিষ্কৃত হয়েছে এই সেদিন।

 

রাষ্ট্র সমাজের আওতাভুক্ত হওয়ার বিষয়টা আবিষ্কৃত হওয়ার পরও অর্থবাদিতার ঝোঁক কখনোই পশ্চিমা চিন্তাধারায় যথার্থ সমাজতাত্ত্বিকতা এবং সেই অর্থে রাষ্ট্রের যথার্থতাকেও পরিস্ফুট করাতে পারেনি, সে অর্থেই অর্থনীতিটাও শেষ পর্যন্ত তাঁদের চিন্তায় সামগ্রিক বা পূর্ণাঙ্গ হয়ে ধরা দেয়নি। পশ্চিমা চিন্তা-ধারায় এ এক স্বাভাবিক প্রবণতা- মার্কসের ক্ষেত্রেও যার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

 

কার্যকারণ-এর ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল একটি কারণে কোনো ঘটনা ঘটে না এবং উৎসগত কারণকে পারিভাষিকভাবে ‘মূলতঃ’ বা মূল কারণ হিসেবে বিধৃত করা গেলেও তা থেকে উৎসারিত কারণসমূহের মধ্যে কেবল ‘প্রধান’ কারণ ধরেই প্রতিটি বিষয় আলোচিত হয়। দর্শন বা মতাদর্শিক চর্চার ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও স্পষ্ট।

 

সেদিক থেকে যদিও মার্কসবাদ মানে অর্থবাদীতা নয়, তবুও সম্পদকে ঘিরে সমাজবদ্ধ মানুষের শ্রেণীকরণ; এমন-কি রাষ্ট্রকে শ্রেণী-শাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা অথবা ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ বলে যে পেশাভিত্তিক সংগ্রামের ডাক- পুরোটা জুড়েই অর্থনৈতিক বিষয়টাই মূল ও প্রধান করে এগিয়েছে। অথচ মানুষ জন্মেই শ্রমিক হয় না কিংবা শ্রমিক ঘরে জন্ম নিলেই শেষ পর্যন্ত শ্রমিক হওয়ার ভবিতব্য নেই, সেদিক থেকে সমগ্র জীবন বলতে একজন মানুষের শুধু অর্থনৈতিক দিকটাই বিবেচিত হয়েছে- নিঃসন্দেহে যাপনের শর্তে আর্থিক দিকটা গুরুত্বপূর্ণ, এমন-কি তার সন্তান-সন্ততি বেড়ে-বলে ওঠা বা আগামী পরিণতির উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারকারী হলেও সেটাই কি সমগ্র জীবন? জীবন বহনে অর্থ চাই কিন্তু সেটাই বড় হলে ঘোড়া বাহন না হয়ে, মানুষই ঘোড়ার বাহন হয়ে পড়ে। জীবন প্রাসঙ্গিকতায় আর্থিক দিকটাকে প্রধান হিসেবে মেনে নিয়েও যদি সমাজের দিকে তাকাই তবুও ‘উৎপাদন-সম্পর্ক’র সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্কিত শ্রেণীটা ছাড়াও সমাজের আয়তন ব্যাপক ও বিস্তৃত। অর্থাৎ মার্কসীয় দৃষ্টিতে রাষ্ট্র বৈশিষ্ট্যপ্রাপ্ত হয়েছে কেবল উৎপাদন সম্পর্ক বা আর্থিক সম্পর্কের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্কিত অংশকে নিয়ে, এই ব্যাপক বিস্তৃত সমাজের সম্পর্ক নির্দিষ্টকরণে অপরপর পেশা ও শ্রেণী সহ সবই তার অনুবর্তী মাত্র।

 

অপর দিকে, সমাজ ও সামাজিক সম্পর্ক বিচারে- সমাজের কোষ বা প্রতিষ্ঠান বলতে পরিবারকেই নির্দিষ্ট করা হয়। সমাজ সংশ্লিষ্টতায় আদিম সমাজে মাতৃতান্ত্রিক সমাজকেই প্রথম ও প্রাথমিক সংহত রূপের মানব সমাজ হিসেবে ধরা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় মা নির্দিষ্ট থাকলেও পিতা অনির্দিষ্ট ছিল। সমাজ বিবর্তনের ধারায় একসময়ে পিতা নির্দিষ্ট হয়ে বর্তমানের একগামী দাম্পত্য বিকাশ লাভ করেছে তথা স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন সম্পর্কে মানব সমাজ বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। সমাজ ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলোই মৌলিক ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ যা রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট, তা-ই রাজনীতি এবং যা সমাজ সংশ্লিষ্ট, তা-ই সংস্কৃতি। সমাজ অভ্যন্তরস্থ অপরাপর প্রতিষ্ঠানের মতোই রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র। সেক্ষেত্রে, রাষ্ট্র অপরাপর প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত করার দায়িত্বে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান তথা সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা অথেনটিকতায় প্রধান ও চূড়ান্ত। আর এটাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রকে অপরপর প্রতিষ্ঠান থেকে ভিন্নতা বা আলাদা বৈশিষ্ট্যে দিয়েছে। সমাজবদ্ধ একজন ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক তার ‘নাগরিক’ পরিচয় তথা সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, সেই মানুষই যখন পেশাগত দিক থেকে কোন স্কুলের পাঠদানের কর্ম গ্রহণ করেন তখন তিনি ‘শিক্ষক’ হন। আধুনিক শ্রমিক-মালিক ইত্যাদি আর্থ-সম্পর্কগুলো অপরাপর সংঘ বা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট হয়েই প্রধানত বিবেচিত হয়। সেক্ষেত্রে এ প্রসঙ্গগুলো সমাজভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রত্যক্ষতাকে নির্দেশ করে। এভাবে সমাজবদ্ধ একজন মানুষের একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ভিত্তিক পরিচয় থাকে আর তা পরিবর্তনযোগ্য। কিন্তু তার বাবা, মা, ভাই, বোনের সম্পর্ক ভিত্তিক পরিচয়টা অপরিবর্তনযোগ্য। এভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতা তার যাপন সংশ্লিষ্ট ও সামাজিক সম্পর্ক তার জীবন সংশ্লিষ্ট। জীবন ও যাপন বা জৈবিক ও বৌদ্ধিক কিংবা Habituation ও Indoctrination তথা সমাজবদ্ধ মানুষের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের  পারষ্পরিক সম্পর্ক সমূহকে ঘিরে ‘সময়’-এর পথ ধরে তার সংস্কৃতি জন্ম নেয়।

 

প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলো দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক বদলের প্রত্যক্ষতাকে প্রকাশ করা গেলেও সমাজবদল প্রসঙ্গে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীকে বা তাকে ভিত্তি করে কোন প্রাতিষ্ঠানিকতাকে সমাজ বদলের কারণ বা নিয়ামক হিসেবে নির্দেশ করা যায় কি? তাই প্রাতিষ্ঠানিক বদল আর সমাজ বদলকে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আর সমাজ সম্পর্ককে সমার্থক করে দেখার প্রবণতা পাশ্চাত্য চিন্তায় অহরহই ঘটে। এ যাবৎকাল পৃথিবীতে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান বদলেছে কিন্তু সমাজ কখনও মূলগতভাবে বদলে যায়নি, বরং বিকাশলাভ করেছে; একে বিবর্তন বলা গেলেও বদল বা বিপ্লব বলা যায় না। বর্তমানে মানবসমাজ প্রযুক্তিগত উত্তরণের ধারায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ মানবসমাজ রূপে তথা অখণ্ড বিশ্ব মানবসমাজ রূপে দেখা দিয়েছে। তাই তার প্রাসঙ্গিকতায় স্থিতিশীল বা সংহতির প্রশ্নে নতুন প্রতিষ্ঠানগত প্রাসিঙ্গকতা আজ জরুরী। সমাজবদল বলতে তারা যা বোঝাতে চান, মূলতঃ তা সমাজবদল নয়- তা সংহতি, স্থিতিশীলতা তথা ব্যবস্থাপনাগত শর্তে কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক দিক। সেদিক থেকে পাশ্চাত্য চিন্তার প্রভাবজাত- বর্তমান বিশ্বের সমাজবিজ্ঞান যেন নিজ সীমানা ও সীমানাভুক্ত ব্যক্তি, রাষ্ট্রসহ অপরপর সংঘ বা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানসমূহের পারস্পারিক সম্পর্ক বিচারে মৌলিক সীমা নির্ধারণে  তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। কারণ- তাঁদের দেখা বিগত পৃথিবীতে একই সমাজভুক্ত অবস্থায় একাধিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্ক, সংহতি ও স্থিতির দৃষ্টান্ত না থাকলেও বিশেষত নোয়াম চমস্কির আর্জেন্টিনা বা দক্ষিণ আফ্রিকার আদিবাসীদের জীবনালেখ্য থেকে গ্রহণযোগ্য পথ অনুসন্ধানের প্রত্যুত্তরে বলা যায়- এই উপমহাদেশের সমাজই প্রায় চার-পাঁচ হাজার বছর যাবৎ স্থিতিশীল এবং এক্ষেত্রে একই সময়ে একাধিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বহন করার দীর্ঘ ইতিহাসও তার রয়েছে। আর পৃথিবীর এই প্রাচীনতম স্থিতিশীল বয়সী মানব সমাজ এখনও পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় ‘অচলায়তন’ সমাজ হিসেবে নেতিবাচক অর্থে রয়ে গেছে। যদিও তার স্বয়ম্ভর আর্থব্যবস্থা বা প্রত্যক্ষ সামাজিক সূত্রে যুক্ত থাকা কাঠামোগত দিক- যাকে পরিভাষাগত ভাবে বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized) বলা যায়, সেই বিষয়টা তাঁদের অজানা নয়। যেখানে দুর্ভিক্ষ কিংবা প্রচলিত পতিতাবৃত্তি, স্ট্রিট বেগার্স বা ভিক্ষুক অকল্পনীয় ছিল- যদিও দেবদাসী, বৈষ্ণব, সন্যাসী-ফকিরী ইত্যাদি বিদ্যমান থাকলেও সামাজিক বিন্যাসে তার অবস্থান আর যাই হোক বর্তমানের স্ট্রিট বেগার্স বা ভিক্ষাবৃত্তি ও পতিতাবৃত্তির মতো ছিল না। স্বয়ম্ভর আর্থসামাজিক বিন্যাসে ও তার স্থিতিশীলতায় রাষ্ট্রীয় সীমানা স্বতন্ত্রই থেকেছে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পূর্বে এই উপমহাদেশে আর্থিক মন্দা বা দুর্ভিক্ষের মতো ভারসাম্যহীনতার সাথে ব্যাপক জনসমাজের পরিচয় ঘটেনি। যদিও ব্যাংকিং ছিল, যেহেতু বন্ধকী সহ গহনা-গাঁটি গচ্ছিত সম্পদ বা সিন্দুকী মহাজনী কারবার ছিল।

 

সর্বপোরি, তৎসময়ে মন্বন্তর বাংলাকে ভয়াল বিপর্যস্থতায় ঠেলে দিলেও, আজকের মন্দা বাংলাদেশকে তেমন স্পর্শ করেনি কেন? এর উত্তর প্রচলিত অর্থনীতিতে নেই বরং আধুনিক বাজারব্যবস্থার বাইরেই যে প্রধানত বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিটা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে, এটা তারই প্রমাণ। প্রচলিত অর্থনীতিতে যাকে পিছিয়ে থাকা বলা হয় অর্থাৎ কৃষি ও কৃষি পরিবার সংশ্লিষ্টতায় বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিটা সচল থাকার কারণেই প্রচলিত আর্থ বা বাজারব্যবস্থার অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসেবে সৃষ্ট ‘মন্দা’, এখানে তা দাঁত বসাতে পারেনি। বাজারব্যবস্থা ও শ্রম এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি বলতে যাঁরা কেবল পশ্চিমা ধাঁচার কলকারখানা ও কলোনীভিত্তিক ছবিকেই বোঝেন- ‘মন্দা বাংলাদেশকে স্পর্শ করেনি কেন’- এটা বোঝার চেয়েও, ‘কোথায় স্পর্শ করেছে’, তা খোঁজাতে এঁরা ‘বাজেট’ করেন- কানের চেয়েও চিল খোঁজাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হয়তো তাঁদের তাতেই মোক্ষ!

 

আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রচলিত ব্যাংকিং যে আর চলছে না, সমাধানও জানা নেই- আর্থিক মন্দায় বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান তা তারস্বরে বলেছেন। ‘বিশ্বব্যবস্থা’ বলতে তিনি যা বুঝিয়েছেন, তার কোন কাঠামোগত রূপ পৃথিবীতে নেই এবং ‘ব্যাংকিং’ বলতে তিনি যা বোঝাতে চেয়েছেন, সেটাও মূলতঃ এই কাঠামো বা ব্যবস্থাপনাগত প্রাতিষ্ঠানিকতার সাথে যুক্ত হওয়াকেই নির্দেশ করে- যেহেতু ‘সংহতকরণ’ বা ব্যবস্থাপনাগত মাধ্যমকেই কাঠামো বা প্রতিষ্ঠান বলে। সেক্ষেত্রে- বর্তমান বিশ্ব মানবসমাজের জন্যে সংহতি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে প্রাতিষ্ঠানিক, রাষ্ট্রিক বা কাঠামোগত দিক থেকে অখন্ড বিশ্বব্যবস্থার দিশায়- পৃথিবীর হাতে এই ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশ তথা অচলায়তন সমাজটাই আছে। কারণ- পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় সমাজতত্ত্ব ও রাষ্ট্রতত্ত্বের সীমানায় যে গ্যাঁট পেকে আছে, অর্থ সহ প্রাতিষ্ঠানিক সব ক্ষেত্রেই তাকে আরও সংকটাবর্তিত করবে। এ কারণে- ছিয়াত্তরের মন্বন্তরকে আমরা যেভাবে বর্তমানের মধ্যে দেখতে পাই, তারা সেটা দেখতে পারেন না বলেই খুব সহজেই আর্থিক ক্ষেত্রে ‘অদৃশ্য হাত’-এর ফাঁদে পড়ে এঁরা হাত-পা ছুঁড়তে থাকেন। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণগত ভূমিকায় দ্বৈত শাসনের কবলে পড়লে জনগণের কি দশা হয়, এদেশের ইতিহাস তার সাক্ষী। আর সেই সাক্ষ্যেই বলা যায়- নিয়ন্ত্রণমুক্ত বৃটিশ বেনিয়ার পথ ধরে বাংলায় যেমন বারবার দুর্ভিক্ষ ঘটেছে, বিশ্বে তেমনি আর্থিক মন্দাও বারবার হানা দেবে। কারণ- তাদের পুরাণকাহিনীর গ্রীক দেব-দেবতারা মৃত, কিন্তু আমাদের উপমহাদেশের সেই পুরাণকীর্তির দেব-দেবতারা এখনও গৃহে গৃহে পূজিত। তাই ইতিহাসের পাতায় তারা মৃতকে দেখে আর আমরা প্রাত্যহিক জীবনকে। পাশ্চাত্য চিন্তায় ‘ইতিহাসের বড় শিক্ষা- ইতিহাসকে কেউ মনে রাখে না’, কারণ- মৃতকে বিস্মৃত হওয়া Code-Conduct-এ শাস্তিযোগ্য গর্হিত অপরাধ নয়। কিন্তু আমরা অর্চনায় ধরি ধরিত্রীকে- মানবীয় মর্যাদার সীমানা ঘেঁষেই যে সমাজের সংস্কৃতি নিত্য বহে।

 

বসুমাতা আর ধরিত্রী হিসেবে বহু আগেই অখণ্ড বিশ্ব আমাদের ইতিহাস বোধে চেনা। ফলে সমগ্র আর অংশের পার্থক্য তালগোল পাকিয়ে যাওয়ার বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজ বা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ককে আমরা সহজে চিহ্নিত করতে পারি- যেটা তাঁরা হামেশাই গুলিয়ে ফেলেন।

 

যে কারণে পাশ্চাত্য চিন্তায় সমাজের শর্তে সামগ্রিকতাকে বা সমগ্র জীবন সংশ্লিষ্টতায় সংস্কৃতিকে প্রাধান্যে না রেখে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে ঘিরেই প্রধানত রাজনীতির শুরু হয় এবং তা অর্থনীতির ঘনীভূত রূপ হিসেবেই বিবেচিত হয়। অর্থাৎ রাজনীতি প্রসঙ্গে Base ও Superstructure-গত মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি মূলতঃ পাশ্চাত্যের অতি সাধারণ প্রবণতা। মোট কথা, রাষ্ট্র ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সীমানা- জীবন ও যাপনের পারষ্পরিকতায়- ‘সামগ্রিকতা’ এখানে যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয় না, এমন-কি সে কারণে অর্থনীতিটাও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি, বিশেষত বর্তমানের বৈশ্বিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক রূপ পরিগ্রহ হওয়ার সাথে সাথে সেই অপূর্ণাঙ্গতা  খাবি খাচ্ছে- আর্থিক মন্দা বা অস্থিতিশীলতা কিংবা মন্বন্তরের মতো মানবিক বিপর্যয় যা-ই বলা হোক।

 

যেটা এই উপমহাদেশে শুরু হয়েছিল ১৭৫৭ সালে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো সহ অর্থনীতি, শাসননীতি সহ প্রাতিষ্ঠানিক অপরাপর ক্ষেত্রে এবং তা শাসনগত কারণে নয় বলেই তৎসময়ে ব্যাপক সামাজিক স্থিতিশীলতায় তেমন আঁচড় কাটতে পারেনি বরং বৃটিশ শাসন বিকৃতি সমাজের বহিরাঙ্গেই থেকে গেছে। কিন্তু সমাজ অভ্যন্তরে ছড়াতে পেরেছে মূলতঃ ১৯৯০ থেকে প্রযুক্তিগত উত্তরণ মারফত অর্থাৎ বৃটিশ শাসন বিকৃতি বৃটিশদের হাত ধরে নয়, বরং ব্যাপকভাবে এদেশীয় শাসকদের হাত ধরে। অর্থাৎ ইতোপূর্বে রাষ্ট্র বা রাজনীতির সাথে আমাদের ব্যাপক সমাজের সামাজিক স্থিতিশীলতার সম্পর্ক না থাকার কারণে রাজনীতি বা রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনা ভুল হোক-ঠিক হোক তেমন জরুরী ছিল না, কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় সামাজিক স্থিতিশীলতার শর্তে রাষ্ট্রীয় বা কাঠামোগত তথা রাজনৈতিক যথার্থতা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। বিশেষতঃ বৈশ্বিক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উত্তরণ সাজুয্য বা সংযোগে যখন প্রতিটা দেশের সম্পর্ক হয়েছে অচ্ছেদ্য ও অখণ্ড, তখন ইতিপূর্বের যে-কোনো অবস্থা ও বাস্তবতার সাথে বর্তমানের অনেক ফারাক- রাজনীতি যে কারণে এতটা প্রাসঙ্গিক। আর হাজারো মানুষের জীবন-মরণের প্রসঙ্গ হয়ে উঠা এই রাজনীতির অনিবার্যতাকে সঠিক-বেঠিক তথা যথার্থতায় নির্দিষ্ট করার শর্তে ইতিহাস- বিশেষতঃ রাজনীতির ইতিহাস ও ইতিহাসের রাজনীতি প্রাত্যহিক জীবনমান তথা সাংস্কৃতিক তুলাদণ্ডে স্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের পথপরিক্রমায় যে-কোনো সময়ের চেয়ে জরুরী হয়ে পড়েছে- এদেশের জাতীয় রাজনীতির উৎস অনুসন্ধানে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখা এবং সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত টানা, ইতিহাস সাক্ষ্যেই নৈর্ব্যক্তিক সত্য তুলে আনা।

 

আর এই প্রযুক্তি ও সমাজব্যবস্থার পারষ্পরিক সম্পর্ক দ্বারা ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মার্কস বর্ণিত শোষিত শ্রেণী- সে শ্রমিক অথবা দাস যাই হোক, তা মূখ্য ভূমিকা পালন করে না এবং তৎসংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বা যে-কোনো প্রতিষ্ঠানিকতার সাথে সমাজ বিবর্তনের সম্পর্ক শুধু ‘সংহতি’র। এই উপমহাদেশে বিগত চার-পাঁচ হাজার বছরে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার গতিপ্রকৃতিতে রদ-বদল ঘটলেও পুরনো এই সমাজের ‘অচলায়তন’ থেকে যাওয়া ও তদুপরি প্রযুক্তিগত উত্তরণের অভিঘাতে শত শত বছর পর হঠাৎ আজ এমনভাবে তার নড়ন-চড়ন, ভাঙ্গন-জাগরণেই বুঝা যায় ‘জীয়ন কাঠি’ কোনটি? অর্থাৎ সমাজ বিবর্তন বা সভ্যতার পরিবর্তনের মূল নিয়ামক হিসেবে মার্কসের শ্রেণীতত্ত্ব এক্ষেত্রে টেকে না বরং মার্কস যাকে ‘নিয়ত বিকাশমান উৎপাদনের হাতিয়ার বা যন্ত্র’ বলেছেন চলতি কথায় সেই প্রযুক্তিই মানবসমাজ বিবর্তন বা সভ্যতার অগ্রগায়নের মূল নিয়ামক হিসেবে নির্দিষ্ট হয়। ফলে পরিবর্তন বা বদল প্রসঙ্গে সভ্যতাকে নির্দিষ্ট করা গেলেও সমাজ প্রসঙ্গে তা বলা যায় না বরং তা বিবর্তিত এবং সম্পর্কগুলো বিকশিত হয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। আর এই বিবর্তনকে অখণ্ড বিশ্বসমাজের বর্তমান রূপপ্রাপ্তির সাপেক্ষে- বিগত ইতিহাসকে দেখলে সমাজকে দাস সমাজ, সামন্ত সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ ইত্যাদি বিভক্তিতে না দেখে কেবল ব্যবস্থাপনাগত বিভক্তি হিসেবে দেখাটাই যথাযথ এবং আর্থিক বিন্যাসে অনিবার্যভাবেই যা কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিকতার সাথে সম্পর্কিত এবং তা সংহতির প্রয়োজন বা শর্তে যুক্ত।

 

এই উপমহাদেশ তথা ভারতবর্ষের ভৌগোলিক মানচিত্রে অনেক বদল ঘটেছে, বহু জনপদ বহু ‘নামে’ জেগেছে আবার হারিয়েও গেছে; কিন্তু ‘বঙ্গ’-বঙ্গলা-বাঙলা জেগেছে এবং সেই ‘বঙ্গ’ নামেই এখনও জাগরুক হয়ে আছে। আর্যাবর্তের বাইরে থেকেও ‘বঙ্গ’ ও তার অধিপতিদের রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনীসম্ভারে স্থান করে নেয়াতে বোঝা যায়, দেশ হিসেবে তার জেগে ওঠা এরও পূর্ব বলেই যুদ্ধকাহিনীতে তা প্রাসঙ্গিক হয়েছে। এমন-কি সূর্য বংশীয় রাজা রঘুপতি রামচন্দ্রের সাথে ‘চন্দ্র’ যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন- তৎসময়ে বঙ্গের ‘চন্দ্র বংশীয়’ অধিপতিদের সাথে সন্ধি বা সংযোগের স্মারক হিসেবেই এটা এসেছে। মেগাস্থিনিস উল্লেখিত ‘ইন্ডিকা’ অথবা আজকের ‘ইন্ডিয়া’ নামক শব্দটি সৃষ্টিরও বহু পূর্বে দেশ বা জনপদের নাম হিসেবে ‘বঙ্গ’-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

 

সেদিক থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন হলেও ‘বঙ্গদেশ’ বা বাংলার অস্তিত্ব- লিখিত ইতিহাস বা ঐতিহাসিক যুগেরও পূর্ব থেকেই স্বনামে বহাল ছিল। ’৪৭ এর পর বঙ্গদেশ; পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গে বিভক্ত হয়ে পূর্ব বঙ্গ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম গ্রহণ করলেও তৎসময়ে ‘ইস্ট বেঙ্গল’ রেজিমেন্ট নাম থেকেই বুঝা যায় বঙ্গদেশটি ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামক ‘নয়া রাজনৈতিক নাম’-এর আড়ালেও বঙ্গ-মানসে আপন ভূমির পরিচয়েই টিকে ছিল।

 

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে বৃটিশ বেনিয়ার চাতুর্যতা আর দেশীয় বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকারে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ্-দৌল্লার পতন ঘটে। শাসন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে যায় বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে। বাংলার সাথে সাথে সমগ্র উপমহাদেশ তথা ভারতবর্ষের শাসন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্রমশঃ লুণ্ঠিত হতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ-বিগ্রহ চলতে থাকলেও ১৮৫৭ সালে দিল্লীর মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ্-এর নেতৃত্বে প্রথম সমগ্র ভারত থেকেই বৃটিশ তাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ যুদ্ধে বাহাদুর শাহ্-এর পরাজয় ঘটলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাত থেকে ভারতের শাসন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বৃটিশ সরকারের হাতে চলে যায়।

 

১৮৫৭ সালে বাহাদুর শাহ্-এর নেতৃত্বে বৃটিশ বিতাড়নের এই যুদ্ধকে বৃটিশরা তাদের শাসনগত দিক থেকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলে উল্লেখ করলেও তা ভারতবর্ষের ইতিহাসবেত্তার কলমেই এমন বলা বা উল্লেখ করা কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয় বরং বৃটিশ তথা বিদেশমুখী চেতনার দ্বারা ঘটানো নিকৃষ্ট পর্যায়ের ইতিহাস বিকার। এমনকি একে স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা যায় না, বড়জোর নিরঙ্কুশ ভারত শাসন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুদ্ধ বলা যায়। কারণ, তখনও দিল্লীর মসনদে আসীন সম্রাট বাহাদুর শাহ্ এবং তাঁর নেতৃত্বে দেশীয় রাজা ও সৈনিকদের এই যুদ্ধ ছিল বিদেশী একটি কোম্পানীর বিরুদ্ধে- যার ব্যবসার অনুমোদন থাকলেও সে ব্যবসার নামে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শামিল। সর্বৈব তা ছিল জাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

 

রাজার সাথে রাজার যুদ্ধে থাকে রাজসিক রীতি, আর সে রীতিতে ‘সম্মুখ সমর’-এর দুঃসাহসই ছিল যুদ্ধজয়ের বীরত্বপূর্ণ পথ এবং ‘পশ্চাৎ আঘাত’ ছিল ঘৃণিত কাপুরুষতা। তেমনি যুদ্ধ কৌশলের বিপরীত অর্থে ছিল ধূর্ততা বা ষড়যন্ত্র। বীরত্বের চেয়ে ধূর্ততা আর সম্মুখের চেয়ে পশ্চাৎ ও ষড়যন্ত্র অর্থাৎ জয়ের প্রশ্নে রাজসিক রীতি ভেঙ্গে যে ঘৃণিত বা ম্লেচ্ছ রীতি তারা গ্রহণ করেছিল, তা তাদের বিজয়ী করলেও বীরত্ব দেয়নি- দিয়েছিল নিন্দা আর তাতে শাসনপ্রতিষ্ঠা হলেও বিজিত দেশসমূহের শাসক হিসেবে তাদের প্রতি জুটেছিল শাসিতের পরম্পরাগত ভাবে রয়ে যাওয়া ঠকের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও বিদ্রোহ। সেই সাথে শাসক হয়েও বৃটিশদের মধ্যে থেকে যায় হীনমন্যতা, শাসনকার্যে নৈতিক দুর্বলতা; সর্বোপরি, বৃটিশ সাম্রাজ্যের গায়ে সেঁটে যায় অপরাপর রাজশক্তির নিন্দা।

 

পরিবর্তিত বৈশ্বিক আর্থরাজনৈতিক প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্য বিস্তার ছিল অনিবার্য আর সেক্ষেত্রে পদ্ধতিটা যতোই নিকৃষ্ট হোক। ফলে, জয়ের প্রশ্নে এই ঠকবাজীর নিন্দা কাটাতেই বৃটিশদের নয়া কৌশল- ব্যবসায়িক স্বার্থে ছড়িয়ে পড়া তৎসময়ে বৃটিশ কোম্পানীগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ট করে ফেলা। স্থানীয় রাজসিক শক্তির সাথে বৃটিশ কোম্পানী তথা বাঘের সাথে শিয়ালের যুদ্ধ এবং সেক্ষেত্রে বাঘের ব্যাঘ্রত্ব থাকলেও শিয়ালের জন্যে কোন রীতি নেই- বাঘের ব্যাঘ্রত্বই তার পতনের কারণ অর্থাৎ রাজ শক্তির দুঃসাহস, বীরত্ব তথা রাজসিক রীতিই হয় তার পরাজয়ের কারণ। বিপরীতক্রমে ধূর্ততা, ষড়যন্ত্র, পশ্চাৎ আঘাত বা নিয়ম ভাঙ্গাই হয় জয়ের নিয়ামক। রাজার সাথে শিয়ালের যুদ্ধে রাজার পরাজয়ই প্রাসঙ্গিক, শিয়ালের ধূর্ততা ধর্তব্যের মধ্যেই আসে না। তাই নবাব সিরাজ-উদ্-দৌল্লাকে তাঁর পরাজয়ের জন্যে যাঁরা বয়সে তরুণ এবং তারুণ্যজনিত অনভিজ্ঞতাকে দায়ী করেন- সেই সব ইতিহাসবেত্তারা খালিদ বিন ওয়ালিদ থেকে মোঘল, পৃত্থিরাজ চৌহান থেকে মোহাম্মদ ঘুরি, এমন-কি মারাঠি দস্যুকেও ছত্রপতি নামে নিজেদের বীর হিসাবে যেভাবে জাহির করেন কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নকে এঁরা যতো জানেন- আমেরিকার প্রাত্যহিক দিনপঞ্জি যেভাবে ঘাঁটেন- তাঁরা নিজের সন্তানদের নিজের দেশের ইতিহাসকে ওভাবে জানাতে পারেন না।

 

[উত্তর প্রজন্ম বা জাতিকে আগামীর দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত করার শর্তেই ইতিহাস জরুরী। কিন্তু ইতিহাসের নামে যারা মানুষকে বানোয়াট গল্প অথবা কাব্য-কলার ছদ্দবেশে অতীত মুখীনতায় ঠেলে দেয়, তারা ইতিহাসগত মূল শিক্ষার ঠিক বিপরীত কাজটিই করে। বৃটিশ আমলে বঙ্কিম, মীর মোশাররফ এমনকি রাবীন্দ্র সাহিত্যেও সেই আলামত খুঁজে পাওয়া যায়। ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির আঁতুড় ঘরে ভারত-পাকিস্তানের জন্ম, তাই তার আধুনিক রাজনীতিতে সেই পঙ্গুত্বের স্মারক হিসেবে তাদের পরমাণু বোমাবাহী মিসাইলের নাম যথাক্রমে পৃত্থি, ঘুরি হলেও বাংলাদেশে কোন রণতরীর নাম খালিদ বিন ওয়ালিদ হওয়া মূর্খতারই নামান্তর। আলেকজান্ডারের বিজয়রথ যে দেশের সীমানায় এসে ত্রস্ত হয়ে ফিরে গেছে, মোঘল এদেশকে করদ রাজ্যে পরিণত করে রাখতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, কেবল বাংলাদেশের বীর সেনাদের হাতে ভারত ও পাকিস্তানী সেনারা মার খেয়েছে- ’৬৫-তে ভারত, ’৭১-এ পাকিস্তান! পৃথিবীর একমাত্র ওপেন ফিল্ড সারেন্ডার ’৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর, পাকিস্তানের আত্মসমর্পণে- যৌথ বাহিনীর ভারতীয় সেনানায়ক পরাজিত পাকিস্তানী সেনানায়কের সাথে করমর্দন করলেও বাংলার পক্ষ থেকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন- ‘... নারী ধর্ষণকারী ও শিশু হত্যাকারীদের সাথে আমরা করমর্দন করি না’। ’৭১ পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকায় যাঁরা যা-ই করুক, সেই দিনগুলোতে একজন সাধারণ মানুষ হয়েও হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া, বীর সেনানায়কের ভূমিকায় উঠে আসা বা আপামর জনতার যোদ্ধা হওয়ার পেছনে এটাই ছিল যন্ত্রণার এক সাধারণ ইতিহাস। এভাবে হাজারো সাধারণ মানুষের বীরত্ব আর অমিত তেজ ’৭১-এর নয় মাসে বাংলার অনেক জনপদে তো বটেই ঈশা খাঁ-তিতুমীর-সূর্যসেন সহ বাংলার অস্তিত্বের সাথে এমন অসংখ্য বীর ও বীরত্বগাঁথা জানা থাকলেও আমরা তাকে স্মর্তব্যে টেনে আনি না। বিশেষতঃ ৭১-এর মতো এতো বড় যুদ্ধজয়ের পরও বীরের সন্ধানে আরব, ভারত হয়ে বঙ্গোপসাগরের দ্রোহী ঢেউ আমাদের চোখেই পড়লো না। ৬৭৬ জন বীর প্রতীক, বীর উত্তম, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বীর যোদ্ধার বাইরেও আছে অসীম দুঃসাহসীদের বীরত্বগাঁথা- যাঁদের সন্ধান এখনও নেয়া হয়নি। তথাপিও এদেশে পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ কাব্যের কাল্পনিক বীর ‘রুস্তম’-এর নাম ধার করে এদেশে উদ্ধার জাহাজের নাম রাখা হয় ‘রুস্তম’! বখতিয়ার খিলজি আসার পূর্বে যেন বাংলার অস্তিত্বই ছিল না! হিমালয় নামক দানব আর সাগর মিলে যে দেশের সীমানা পাহারা দেয়, সেই দেশের বয়স মাত্র এক-দেড় হাজার বছর! স্বাধীনতার পরও দাসত্ব মনোবৃত্তির কারণে স্বদেশের মাটিতে আজও পা-ই রাখতে পারিনি। ইতিহাস চর্চার কি চেহারা দাঁড়িয়েছে! ‘কি বিচিত্র এদেশ, সেলুকাস!’ ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,/ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়’।]

 

বাঘের আগে যেমন ফেউ আসে, তেমনি এখানে শাসক আসার আগে ফেউ হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এসেছিল এবং রাজশক্তির ধ্বজা উড়িয়ে নয়- বেনো পরিচয় দিয়ে; সম্মুখ নয়, পশ্চাৎ হয়ে; রাজসিক বীরত্ব নয়, ধূর্ততা আর ষড়যন্ত্রকে পাথেয় করে।

 

১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত একশত বছর এখানে রাজশক্তির পরাজয়ই প্রাসঙ্গিক, ফেউ-এর কোন নীতি নেই; তাই ইতিহাস ও রাজনীতি প্রসঙ্গে তা প্রাসঙ্গিক নয় বরং রাজশক্তি প্রাসঙ্গিক হয়েই কেবল ফেউবৃত্তি উঠে আসতে পারে। সুতরাং রাজশক্তির পরাজয় আর তা দিয়ে যদি অধীনতা বা স্বাধীনতা নির্ধারিত হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় রাজশক্তি বহাল থাকার পরও ‘নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা’ হাতছাড়া হয়েছিল- সেক্ষেত্রে কি বলা যাবে? অতঃপর পূর্বোক্ত গল্পের একটি পাতা অর্ধেক নদীতে আর অর্ধেক ডাঙ্গায় পড়লে কি হয়? বিষয়টা নিছক বানোয়াট গল্প- তা সহজেই ধরা পড়ে যায়।

 

আর তাই ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত শতবছর ব্যাপী শাসক ও শাসনশূন্য হওয়া মূলতঃ অধীনতা বা স্বাধীনতা নয় বরং শাসন নিয়ন্ত্রণহীনতা বা হারানোটাই প্রসঙ্গ। অর্থাৎ শত বছরের মগের মুল্লুক হওয়ার বিরুদ্ধে বা প্রতিরোধে নিজেদের শাসন নিয়ন্ত্রণ রক্ষার অর্থে স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম বলা গেলেও স্বাধীন হওয়ার অর্থে- ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলা যায় না। কারণ, স্বাধীন দেশ স্বাধীনতা রক্ষা করে; স্বাধীন হওয়ার জন্যে লড়াই করে না। ফেউ যেমন শাসক নয়, ফেউবৃত্তির লুন্ঠনও শাসনব্যবস্থা নয়। তাই ‘বিদ্রোহ’ বা ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কথাটা স্বীকার করা প্রকারান্তরে ফেউকে শাসক বলারই নামান্তর।

 

এক্ষেত্রে তাই ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ মূলতঃ রাষ্ট্রিক তথা রাজনৈতিক ‘শাসন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ’কে ঘিরে শাসক ও শাসনব্যবস্থাহীন হওয়ার ইতিহাস, যাকে ভারতবর্ষের ইতিহাসে ‘রাজনৈতিক অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এবং এই শতবছরে এদেশের মানুষ ও রাজশক্তির সমস্ত লড়াই ও যুদ্ধ ছিল ‘বিদেশী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’, তথা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে ‘বিদেশী আধিপত্য বিস্তার রোধ যুদ্ধ’।

 

অর্থাৎ ১৮৫৭ সালের যুদ্ধের মধ্য দিয়েই প্রথম সমগ্র ভারতবর্ষ বৃটিশ শাসকের শাসনাধীন হয় তথা বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়। সেই অর্থে, রাজনৈতিক দিক থেকে ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসন ছিল ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত- মোট ৯০ বছর।

 

ফলে, ইতিহাসে বহুল চর্চিত দু’শো বছরের বৃটিশ শাসন কথাটি বৃটিশদের দ্বারা শাসিত অর্থে ঠিক হলেও রাষ্ট্রতাত্ত্বিক দিশায় তা ভ্রান্তি। অর্থাৎ ‘যাহা প্রচলিত, তাহাই সত্য’ কিংবা ‘যা প্রচলিত নয়, তাহাই মিথ্যা’ মতাদর্শিক সংগ্রামে এমন শর্ত নেই, আবার সাধারণভাবে যা ঠিক রাষ্ট্রতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তা ভ্রান্ত।

 

বৃটিশ ভারত থেকে অদ্যাবধি এই উপমহাদেশের ইতিহাসে- আধুনিক রাজনীতির যথার্থ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যে কেবল বঙ্গীয় রাজনৈতিক ধারারই সন্ধান মেলে। কারণ, পাকিস্তান ও ভারত মূলতঃ রাজনৈতিক বিকাশের পরিণতিগত অর্থে নয় বরং বৈশ্বিক পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা উদ্ভূত পরিস্থিতির ফসল হিসেবে প্রাপ্ত- যাকে চুক্তি বলা গেলেও যথার্থ রাজনীতির ‘পরিণতি’ বলা যায় না। কিন্তু ’৪৭ পরবর্তী বিশেষতঃ ’৫২-এর পথ ধরে ক্রমশঃ ’৬৫, ’৬৯, ’৭০ অর্থাৎ দলীয় রাজনীতির পথ ধরে ধাপে ধাপে ক্রমান্বয়ে দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টের রূপ পরিগ্রহ করে- আপামর জনতার সাথে সেনা ও প্রশাসন তথা জাতীয় সরকার গঠন করতঃ তার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল কূটনীতি ও ভূখণ্ডগত সীমানায় সর্বাত্মক গণযুদ্ধের পরিণতিতে ’৭১-এ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয় এবং স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৩২৫ দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন ছিল এ উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

 

সেক্ষেত্রে, পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ দীর্ঘ ৭ বছরেও সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি। বাংলাদেশ গণপরিষদে যা মাত্র ২৪ দিনে হয়েছিল, ভারতের সংবিধানের ক্ষেত্রে সেটা করতে লেগেছিল মোট ১১৪ দিন এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৩২৫ দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, ভারতের তা করতে ৮৩১ দিন লেগেছিল- যদিও বহু জাতি-গোষ্ঠী, ভাষাভাষী, বৃহদাকার দেশ হিসেবে ভারতের জন্য এটা খুব বেশি সময় নয়। ‘সেক্যুলারিজম’ বা ধর্ম নিরপেক্ষতা মূলনীতির মধ্যে রেখেই বাংলাদেশ সংবিধান প্রণীত হয়েছিল, অথচ ভারতের সংবিধানে তা যুক্ত হয়েছে আমাদের সংবিধান প্রণয়নেরও প্রায় ২ বছর পর অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার প্রায় ২৭ বছর পর।

 

এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয়- যে সব উপাদান দ্বারা আধুনিক রাজনীতির যথার্থতা নিরূপিত হয়, সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হিসেবে পরিগণিত এবং এটা কেবল ভাবাদর্শিক বা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক সংস্কৃতিগত দিক নয় বরং এটা আধুনিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত।

 

এ উপমহাদেশে ব্রিটিশ ভারতের হাত ধরে ধর্মভিত্তিক যে বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তা থেকে কেবল বঙ্গীয় রাজনৈতিক ধারাই বেরিয়ে এসেছিল এবং আধুনিক রাজনীতির যথার্থতায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশই এগিয়ে ছিল, তার বড় প্রমাণ- স্বাধীনতার পর অদ্যাবধি এদেশের ব্যাপক মানুষ ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় সীমানায় গ্রহণ করেনি। এমন-কি ভোটের হিসাবে ধর্মভিত্তিক সব দল মিলে এযাবৎকাল সর্বোচ্চ প্রায় শতকরা ১০ ভাগ সমর্থন জোটাতে পারলেও ক্রমান্বয়ে তা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে। অথচ ভারত ও পাকিস্তানে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোটের অনুপাত ক্রমান্বয়ে বেড়েছে এবং একাধিকবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় শাসক দল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে বা এখনও হয়ে যাচ্ছে।

 

যদিও স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের সেই যথার্থ রাজনৈতিক ধারা বহু ভাবে বিভ্রান্ত, বিচ্যুত হয়েছে। কারণ- জাতীয় রাজনীতির প্রামাণিক প্রকাশ অর্থেই যে জাতীয় সরকার গঠন ও তার নেতৃত্বে জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন, সেই সরকারের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার অর্থাৎ স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন তথা জাতীয় স্থিতিশীলতা বা সংহতি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সম্পন্ন করার পূর্বেই ভেঙে দেয়া হয়েছিল আর এই একটি মাত্র ভুলেই বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি তার আপন ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

 

সাধারণতঃ জাতীয় বিজয় অর্জনের পর প্রয়োজন হয় বস্তুগত ও মননগত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ যে লক্ষ্য বা ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিত হয়, তা সফল হওয়ার পর প্রয়োজন হয় সে অনুযায়ী জনসমষ্টিকে সংহত করা। প্রচলিত রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ধারণা দিয়ে বললে, বস্তুগত স্থিতিশীলতা বলতে বোঝায়- যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠন, যা প্রধানতঃ আর্থিক দিককে নির্দিষ্ট করে এবং মননগত স্থিতিশীলতা বলতে বোঝায়- নতুন পরিস্থিতির সাথে জাতিকে খাপ খাওয়ানো বা জাতীয় মননকে সঙ্গতিপূর্ণ করা, যা সংস্কৃতিগত দিক; কারণ- বিজয় লাভের পরও পরাজিত ‘শত্রুশক্তি’র রেশ নির্মূল হয়ে যায় না বরং ‘প্রতিক্রিয়া’ অর্থে কিছু সময় থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে যে ফ্রন্ট বা সরকার মারফত এই সংগ্রাম চলে ও সাফল্য বা বিজয় অর্জন করে, সাধারণত উক্ত ফ্রন্ট বা সরকারেরই দায়িত্ব থাকে অর্জিত সে সাফল্যকে অর্থপূর্ণ ও দৃঢ়বদ্ধতায় বস্তুগত ও মননগত উভয়দিক থেকে সুসংহত করা এবং এই সুসংহত করা মূলতঃ পূর্ব ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ বা সংগ্রাম সম্পন্ন করার অর্থেই নির্দিষ্ট থাকে। অর্থাৎ যে ফ্রন্ট বা সরকার মারফত উক্ত বিজয় অর্জিত হয়, সেই ফ্রন্ট বা সরকার মারফতই তা সংহত হয়; মুখ্যতঃ তা একই সংগ্রামের অংশ। আলোচ্য ক্ষেত্রে ‘জাতীয় স্বাধীনতা ও সংহতি’ একই সংগ্রাম বিধায় উক্ত ফ্রন্ট তথা এক্ষেত্রে জাতীয় সরকারের নেতৃত্বেই সেটা সম্পন্ন করা ছিল যথার্থ। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা এসেছিল বলে তাকে সংহত করার ঐতিহাসিক দায়িত্বও তার কাঁধেই বর্তায়।

 

সাধারণতঃ জাতীয় সংহতি বা জাতীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পরই কেবল গণতান্ত্রিক তথা বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রসঙ্গ আসে। সেক্ষেত্রে কোনো দেশে কোনো রাজনৈতিক দল যদি জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে তথা যথার্থ রাজনীতির পথ ধরে জাতীয় ফ্রন্ট হিসেবে উত্তরিত হয়, তখন সেই দল সরকার গঠন করলেও তা আর দলীয় সরকার না হয়ে জাতীয় সরকার হিসেবে নির্দিষ্ট হয়। আর তা যদি জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম বা জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শভিত্তিক হয়, তবে জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার পূর্বেই তাড়াহুড়ো করে গণতন্ত্রপ্রিয়তা বা যে-কোনো কারণেই বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে, তা দ্বারা দেশে গণতন্ত্র বা বহুদলীয় শাসন আসে না- উল্টো তা দেশ ও জাতিকে নৈরাজ্য বা বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ গণতন্ত্র বা বহুদলীয় ব্যবস্থাই হয়ে ওঠে তখন পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীলদের জন্য মোক্ষম সুযোগ- গণতান্ত্রিক অধিকার সেখানে জাতীয় শত্রু বা দেশবিরোধী চক্রের বিভ্রান্তি সৃষ্টির অধিকার দেয়ারই নামান্তর হয়ে পড়ে।

 

বিপরীতক্রমে, জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার পরও উক্ত জাতীয় ফ্রন্ট হয়ে ওঠা দলটিকে লুপ্ত ঘোষণা করে যদি বহুদলীয় বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন না করা হয়, তবে সেটা হয় আমানতের খেয়ানত- কথা দিয়ে কথা না রাখা বা বিশ্বাস ভঙ্গ করা; রাজনৈতিক পরিভাষায় যা স্বৈরাচারী শাসন হিসেবে পরিগণিত।

 

অর্থাৎ কোনো দেশে জাতীয় রাজনৈতিক সংগ্রামের সফল পরিণতি অর্থে স্বাধীনতা অর্জিত হলে সাধারণতঃ জাতীয় স্থিতিশীলতা বা সংহতি প্রতিষ্ঠার পরই কেবল সে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন তথা পরমত অর্থে ক্রমোত্তরিত ‘বহুমত’ বা বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারার গণতান্ত্রিক পথপদ্ধতিকে নিশ্চিত করতে হয়।

 

কারণ, বহুদলীয় বা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা আরও অগ্রগামী বা উত্তরিত শাসন ব্যবস্থা, যার অনিবার্য শর্ত বা ভিত্তি হলো- ‘পারস্পরিক আস্থা, ধৈর্য ও পরমতসহিষ্ণুতা’। আর জাতীয় সংহতি বা জাতীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা না হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি তথা ‘পরমতসহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও আস্থা’ আসতেই পারে না। গাছ যেমন হাওয়ায় গজিয়ে ওঠে না, তেমনি জাতীয় সংহতি বা জাতীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পূর্বে গণতন্ত্র বা বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা- ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার মতো অবস্থা। এক্ষেত্রে গাড়ির যে দশা হয়, গণতন্ত্রেরও তেমন দশা হয়ে পড়ে অর্থাৎ পারস্পরিক আস্থা, ধৈর্য ও পরমতসহিষ্ণুতার পরিবর্তে পরস্পরকে দায়ী-অবিশ্বাস, বিভক্তি-বিভাজনে চরম নৈরাজ্য উঠে আসে আর প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এই বিভাজনগত ক্ষতকে আরও উস্কে দেয়- মাছি হয়ে ওড়াওড়ি করে; পরিস্থিতিগত কারণে সেটাই ফ্যাক্টর হয়। যতোই ক্ষুদ্র হোক, জনসমক্ষে দুর্গন্ধ শক্তিশালীই হয়- প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সর্বদাই- ‘লিটল বাট ডার্টি পাওয়ার’!

 

স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন সহ জাতীয় স্থিতিশীলতাকে শক্ত ভিত- এর উপর দাঁড় করানো তথা জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার পূর্বেই ৭২-এর ১১ই জানুয়ারী প্রথম জাতীয় সরকার ভেঙে দেয়া যে ঐতিহাসিক ভুল ছিল, তারই প্রমাণ মেলে ১৯৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারী পুনরায় জাতীয় সরকারের ঘোষণায়। কিন্তু প্রথম জাতীয় সরকার ভেঙে দেয়ার সে ভুল শোধরানোর চেষ্টা সফল না হয়ে বরং তা এদেশে জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতির উদ্বোধন ঘটায়।

 

রাজনীতি যদি জনগণ ও নীতি এবং নৈর্ব্যক্তিক কাঠামোগত পথে যথার্থই রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনার পথে না হেঁটে ব্যক্তিইচ্ছা বা ‘যেমন যেমন বোঝা’, ‘তেমন তেমন করা’ হয়, তবে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিটা দেশ-মানুষ ও জাতীয় স্বার্থ অনুবর্তী না হয়ে বিপরীত অর্থে এগিয়ে যায়। ক্রমান্বয়ে, রাজনীতি দেশ ও মানুষের মুক্তির পথ না হয়ে স্বার্থসর্বস্বতায় দেশ ও মানুষকে জিম্মি করার অপরাজনীতি হয়ে ওঠে।

 

প্রথম ‘জাতীয় সরকার’ কর্তৃক সদ্য স্বাধীন দেশে ‘জাতীয় সংহতি’ স্থাপনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার পূর্বেই তা ভেঙে দিয়ে নির্বাচন মারফত বহুদল বহুমতের প্রর্বতন করে, সেই দলীয় সরকার দিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গড়ে তোলা বা বিচি দিয়ে তরমুজ বহনের হাস্যকর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতার অলিন্দে বসেই পুনরায় কেবল ‘ঘোষণা’ দিয়েই একটি জাতীয় সরকার তথা জাতীয় দল গঠন করার যে লেজে গোবরে হওয়ার ইতিহাস- সেটাই শুরু হয়েছিল ’৭২-এর ১১ই জানুয়ারী।

 

অথচ বাংলার প্রথম অস্থায়ী জাতীয় সরকার বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি দক্ষ ও সফল জাতীয় সরকারের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল।

 

উল্লেখ থাকে যে, বিদেশের বিরুদ্ধে দুই প্রকার যুদ্ধ হয়- সশস্ত্র যুদ্ধ ও কূটনৈতিক যুদ্ধ। নিজ ভূখণ্ড বা জাতীয় সীমানায় চলে বিদেশী শাসন বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ আর সেই যুদ্ধকে জয়ের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন হয় কূটনৈতিক যুদ্ধে বিজয়। তৎসময়ে বহু দেশই তার স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত থাকলেও কূটনৈতিক যুদ্ধে হেরে যাওয়ার কারণে বিজয় লাভে ব্যর্থ হয়। যেমন, প্যালেস্টাইন দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে গেলেও এখনও দেশটির সরকার কূটনৈতিক যুদ্ধে পেরে না ওঠার কারণে নিজ ভূখণ্ডকে শত্রুমুক্ত করতে পারেনি।

 

এক্ষেত্রে বিশ্বের ইতিহাসে দু’টি দেশ প্রায় প্রবাদপ্রতীম হয়ে আছে। একটি ভিয়েতনাম- আপন ভূখণ্ড বা জাতীয় সীমানায় যে দেশটি সশস্ত্র যুদ্ধে মার্কিন পরাশক্তিকে পরাস্ত করেছিল। আর ১৯৭১-এ বাংলাদেশ, কূটনৈতিক যুদ্ধে চীন-মার্কিন পরাশক্তিকে পরাভূত করেছিল। আমরা ভিয়েতনামের কথা জানলেও নিজ দেশটির সেই প্রবাদপ্রতীম বিজয়কে জানি না। যদিও বর্তমান পৃথিবীতে সশস্ত্র যুদ্ধ বা সামরিক লড়াইয়ের চেয়ে ক্রমেই কূটনৈতিক (বৌদ্ধিক) যুদ্ধ বা পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অথচ বিশ্বের কূটনৈতিক ইতিহাসে আজও বিরল উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশই প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। স্বাধীনতার পূর্বে ভিয়েতনামকে প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করলেও, স্বাধীনতার পর কেউ যদি বলে ‘বাংলা হবে ভিয়েতনাম’, তবে বুঝতে হবে সে নিজের সাফল্যকে মূল্যায়ন করতে পারেনি; কারণ অগ্রসরমান কূটনৈতিক বিশ্বে বাংলাই বিস্ময়। অর্জিত সাফল্যের অবমূল্যায়ন সর্বদা অযোগ্যতাকে চিহ্নিত করে, সাফল্যকে রক্ষা করার পরিবর্তে তাকে অর্থহীন করে তোলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে ভিয়েতনামের স্বপ্ন বিলাসীদের ভূমিকা এ সত্যকে মনে করিয়ে দেয়।

 

জাতীয় সরকারের প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে তাজউদ্দিন আহমেদ নিপুণ দক্ষতা ও ক্ষীপ্রতায় এই সরকারকে যেভাবে সমন্বিত ও একাট্টা করে জাতীয় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ, বিশেষতঃ বৈশ্বিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কমরেড মনি সিং সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থানকে যেভাবে দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছিলেন- তা ছিল যুগান্তকারী। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো দেয়াতে পাকিস্তান-মার্কিন-চীন বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মার্কিনের যুদ্ধ যাত্রার প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ ঘোষণা ছিল তৎসময়ে বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণার সমার্থক।

 

স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী জাতীয় সরকার ‘আন্তর্জাতিক’ তথা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ককে বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে যথাযথ ব্যবহার করে বা যেভাবে খেলিয়ে নিতে পেরেছিল- চীন-মার্কিন তথা বিদেশী চাতুর্য, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী আর দেশীয় ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছিল- তা দিয়েই মূলতঃ সফল ও দক্ষ জাতীয় সরকার হিসেবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

 

তাছাড়া, আওয়ামী লীগ নিজেই জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টে উত্তরিত ছিল। বিশেষতঃ, ’৭০-এর নির্বাচন ও ৭ই মার্চের ভাষণে সেটা যতোটুকু অস্পষ্ট ছিল, ২৫শে মার্চের পর তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। তদানীন্তন পাকিস্তানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক বৈধতাকে নস্যাৎ করতে তৎসময়ের পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী- রাজনৈতিক ভূমিকা ও পথপদ্ধতির বদলে সামরিক বলপ্রয়োগের বর্বর পদ্ধতি বেছে নেয়। তাতে শুধু আওয়ামী লীগ নয়- দেশের সব দলের নেতা-কর্মীদের একযোগে আত্মগোপন-দেশত্যাগ-সর্বোপরি দল-মত নির্বিশেষে প্রতিরোধ যুদ্ধকে আর যা-ই হোক, এক দেশের দুটি দলের ক্ষমতা হস্তান্তর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তথা আওয়ামী লীগ বনাম অপর কোনো দলের প্রসঙ্গ বলা যায় না। আক্ষরিক অর্থেই আওয়ামী লীগের দলগত বৈশিষ্ট্য লুপ্ত হয়ে জাতীয় রাজনৈতিক পরিচয় বা ফ্রন্টে পরিণত হয় অর্থাৎ বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে।

 

আওয়ামী লীগ যেমন জাতীয় ফ্রন্টে পরিণত হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু তেমনি জাতীয় অথেনটিকতায় নির্দিষ্ট ছিলেন।

 

প্রামাণিকতায় বলা যায়, তিনি অনুপস্থিত থাকলেও স্বাধীনতা সংক্রান্ত যাবতীয় চুক্তি ও ঘোষণা তাঁর নামেই সম্পন্ন করতে হয়েছে। এমন-কি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহুবিধ অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি সত্ত্বেও ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার কেবল তাঁর প্রত্যক্ষতা দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছে। তাই বাকশাল গঠনকে যাঁরা ভুল বলেন, তাঁরা জানেন না কী কারণে ভুল বলছেন! এটা ছিল মূলত ‘ভুল শোধরানো’র প্রচেষ্টা মাত্র এবং জাতীয় অথেনটিকতার নিক্তিতে তাঁর ভুল কেবল তিনিই শোধরাতে পারেন।

 

জাতীয় রাজনৈতিক অথেনটিকতা যেমন দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতি, তাই খোদ যিনি ‘অথোরিটি’, তাঁর জন্মেরও বহু পূর্বে বহু ঘটনা ও বহু সংগ্রামের পরিণতি অর্থেই তিনি সামষ্টিক বা অথোরিটি হয়ে ওঠেন; তেমনি তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর প্রভাব ক্রিয়াশীল থাকে। এভাবে একজন জাতীয় অথোরিটি কালাতিক্রম্য। ফলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড যতোটা না হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রাসঙ্গিক, তার চেয়েও জাতীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক ধারার গতিপ্রকৃতি বদলের প্রাসঙ্গিকতায় নির্ণায়ক মানদণ্ড। আর সেই মানদণ্ডেই তাঁর হঠাৎ অনুপস্থিতি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক ধারার স্বাভাবিক গতিকে ন্যূনতম মানে পৌঁছানোর পূর্বেই এলোমেলো করে দেয়।

 

প্রথম জাতীয় সরকার ভেঙে দেয়ার সে ভুল শোধরানোর চেষ্টায় সফল হওয়ার শর্তে কেবল বঙ্গবন্ধুই ছিলেন এবং সে উদ্যোগে ’৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারী জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টের ঘোষণায় জাতীয় ঐক্য বা সংহতি প্রতিষ্ঠার ডাকও তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা প্রতিষ্ঠা বা ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানের পূর্বেই ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই শর্ত অপূরিতই থেকে যায়। কিন্তু তা পূরণের সক্ষমতায় আর কেউ না থাকলেও ঘোষণা দিয়ে জাতীয় দল বা সরকার গঠনের রাজনৈতিক নকলনবিশতা জাতীয় রাজনীতিতে ঠিকই উঠে আসে।

 

বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই মূলতঃ রাজনৈতিক মহানায়ক-এ রূপান্তরিত হয়েছিলেন, তাই নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের বেড়াজাল থেকে ইতি কর্তব্য সম্পাদনে এতো দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারেন নি। জাতীয় রাজনীতির অভিভাবকত্বে মহানায়কোচিত ভূমিকা তো দূরের কথা রাজনৈতিক একনায়কের কাঠিন্যকেও আমলে নিতে পারেননি; তাঁর রাজনৈতিক মনস্কতায় নিজের অথেনটিকতা সহ জাতীয় বাস্তবতাও অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির অনিবার্য শর্ত যে দলীয় রাজনীতি, তিনি তার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তিনি ব্যক্তি অথবা কোনো দলের রাজনৈতিক নেতা আর ছিলেন না তার প্রমাণ মেলে প্রতিপক্ষরা যখন তাঁর শিশুসন্তানকেও হত্যা করে। অথচ রাসেল কোনো দলের ছিল না। তৎসময়ে তিনি ও তাঁর সীমানা তথা ব্যক্তিক, পারিবারিক বা দলীয় সীমা দ্বারা আবদ্ধ ছিলেন না। ঠিক যেমন- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান মোটেই কোনো দলীয় নেতা ছিলেন না। তাই, দলীয় পদ-পদবী বা মন্ত্রীত্বে না থাকলেও জাতীয় রাজনীতির প্রতিভূ বলেই জাতীয় শত্রুরা তাঁদের ঠিকই বেছে নিয়েছিল। সরকার প্রধান হয়েও নিজের বাসভবন ছেড়ে গণভবন, বঙ্গভবন বা রাষ্ট্রীয় বাসভবনে না উঠাকে অনেকে ঔদার্য হিসেবে দেখাতে চান- কিন্তু ইনস্টিটিউশনাল অথেনটিকতায় সেটা গুণ নয় বরং দুর্বলতা। ব্যক্তি পর্যায়ে যা উদারতা, অনেক সময় সেটাই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়। এজন্যেই রাষ্ট্রতত্ত্ব ও ব্যক্তিতত্ত্বের তফাত আছে- কাঠামোগত বা ইনস্টিটিউশনাল অথেনটিকতায় যা খুশি তা-ই করাকে স্বেচ্ছাচার বলে, নৈর্ব্যক্তিকতাই সেখানে কাম্য থাকে।

 

জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের মূর্তরূপ বা অথোরিটি হিসেবে রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের ঐতিহাসিক দায়িত্বে ‘জাতীয় সরকার’-ই বঙ্গবন্ধুর জন্যে ছিল একমাত্র যথোচিত রাজনীতি। কারণ- ‘এক দেশ, এক জাতি , এক নেতা’ হয়ে ওঠার শর্তেই অপরাপর রাজনৈতিক দলকে তাঁর সাথে না নিয়ে উল্টো নির্বাচনী প্রতিযোগিতার আহ্বান তথা নিজে রাজনীতিতে বহাল থেকেই বহুদলীয় গণতন্ত্র বা সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন এক ধরণের হাস্যকর বিষয় হয়ে ওঠে। যাঁর বিরল জনপ্রিয়তার সামনে পাকিস্তানী জান্তা মুখ থুবড়ে পড়েছে, সাড়ে সাত কোটি মানুষ একটি মানুষে একীভূত হয়েছে, দেশের স্বাধীনতা এসেছে আর স্বাধীন হওয়ার পর পরই অপরাপর দল ও দলীয় নেতাদের সাপেক্ষে সেই দেশের মানুষই তাঁকে একজন দলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে আর তিনিও যথারীতি বহুদলীয় বা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে কোনো একটি দলের দলীয় প্রধান হিসেবে সরকার গঠন করেছেন! ভাইয়ের সাথে ভগ্নিপতির মর্যাদা ও অভিভাবকত্ব এক কাতারে বিচার্য হলেও- পিতা ও ভগ্নিপতিকে এদেশের মানুষ যে এতো দ্রুত এক কাতারে ফেলেনি, তা পরবর্তী নির্বাচনে মাত্র ৯ জন বিরোধী দলীয় সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতাতেই স্পষ্ট হয়েছে।

 

অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যেমন নিজেকে ও নিজের পরিবারকে জাতীয় রাজনৈতিক চোখে চিনতে পারেননি, তেমনি জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের জাতীয় ফ্রন্ট হয়ে ওঠাকেও চিহ্নিত করতে পারেননি; এমন-কি জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক গুরুত্বকে অনুধাবন করতে পারেননি বলেই তাঁদের দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও অরক্ষিত করে ফেলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু না চিনলেও জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গ আর সে প্রাসঙ্গিকতায় জাতীয় শত্রুরা সেটা ভালোই চিনতো। তাই তাঁর সাথে সাথে রাসেলকে যেমন ছাড়েনি, তেমনি ঠান্ডা মাথায় ক্রমান্বয়ে অপরাপর নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছিল- কারণ প্রসঙ্গটা কেবল নিছক হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং তা ছিল জাতীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে।

 

’৭২-এর ১১ই জানুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিসমিল্লায় গলদ ঘটেছিল, তা ’৭৫-এর ২৫শে জানুয়ারীতে শোধরানো যায়নি বরং ভুলের মাশুল অর্থে প্রতিক্রিয়াশীলদের পুঁজি হিসেবে বাকশাল-এর মতো বাড়তি রাজনৈতিক গ্যাটিসের প্রয়োজন হয়েছে এবং সেই গ্যাটিসের উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি তথা ক্ষমতার অলিন্দ থেকে রাজনীতির নামে তথাকথিত রাজনীতি বা অপরাজনীতির উদ্ভব হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন থেকেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে কেবল ঘোষণা দিয়েই পুরো শাসন ব্যবস্থাকেই বদলে ফেলার যে সংস্কৃতি কিংবা দেশ সম্পর্কে নিজেরা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বঘোষিত জাতির কর্ণধার হয়ে বসার যে নির্লজ্জ ঘোষণাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রবর্তন, তা এখান থেকেই শুরু। মেজর ডালিমের সেই খুনে ঘোষণার পথ ধরে প্রেসিডেন্ট মোশতাক, এর কাউন্টারে মেজর খালেদ মোশাররফ, তৎপরবর্তী কর্নেল তাহের অতঃপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং উক্ত পদাঙ্ক অনুসরণে ক্রমান্বয়ে, দেশ-মানুষ-আদর্শ তথা রাজনীতি হারিয়ে ‘জাতীয় রাজনীতি’র নামে নিরেট ক্ষমতা সর্বস্ব রাজনীতি প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট লেঃ জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতায়ন।

 

একটি রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে দেশের প্রশ্নে ক্রমান্বয়ে জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টে পরিণত হওয়ার বদলে ক্ষমতার অলিন্দে বসে আগে দল হয়েছে; তারপর বিভিন্ন লোভ-লালসা-ভয় তথা লিপ্সার পথ ধরে তাকে রাজনীতিকরণ বা জনগণ সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ দল গঠনে জনগণ নয়- ক্ষমতা, আর জনসম্পৃক্ততায় সংগ্রাম নয়- লোভ-লালসা! জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে জনগণের দল ও নেতা বা নেতৃত্ব তথা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা অথোরিটি হওয়ার সেই ‘যথার্থ রাজনীতি’র মূল শর্তটাই লুপ্ত হয়ে কেবল সিদ্ধান্ত নিয়ে জানালেই হলো- জনগণ সেখানে শ্রোতা এবং শ্রোতা থেকে দর্শক, অতঃপর ক্রমান্বয়ে জিম্মি। অর্থাৎ রাজনীতি জনগণকে মুক্তি না দিয়ে বরং মানুষকে আজ জিম্মি করে ফেলেছে। আর রাজনীতির এই বিপরীত বিষয়কেই রাজনীতি বলা হচ্ছে- অপরাজনীতিই এখন রাজনীতি হয়ে পড়েছে। একবার ক্ষমতায় গেলে জনগণ নয়, উল্টো জনগণ ও জনগণকে ঘিরে নিজেদের কর্মকাণ্ডের প্রতি আস্থা হারানো থেকে ক্ষমতায় টিকে থাকার যতো রকম হীন কারসাজী আছে- তার সব অপচেষ্টা চালায়। জনগণের জন্য রাজনীতি না হয়ে বরং ক্ষমতার জন্যেই রাজনীতি। ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা- সবক্ষেত্রে যেন ‘ক্ষমতা’ই শেষ কথা, ‘দেশ ও জনগণ’ কেবল কথার কথা।

 

সর্বোপরি সেই সব স্বঘোষিত জাতীয় সরকার চলে গেলেও তৎসময়ে গঠিত জাতীয় ফ্রন্ট অর্থে জাতীয় দলসমূহ এখনও বহাল তবিয়তে ‘দলীয় রাজনীতি’তে রয়ে গেছে। এতেই বোঝা যায়, কী প্রকৃতির জাতীয় সরকার পরবর্তীতে এসেছে এবং তাদের হাত ধরে কোন ধরণের রাজনীতি ও রাজনৈতিক পথে দেশ স্থিতিশীল হয়েছে! এমন-কি এদেশের দলীয় রাজনীতিতে অনেকদিন পর্যন্ত বাকশালের দলগত অস্তিত্ব- অপরাপর দলের সাথে একটি দল হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার নজির এদেশে রয়েছে, যা রাজনীতিহীনতার এক চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত।

 

উল্লেখ্য, জাতীয় ফ্রন্ট তথা জাতীয় সরকার বা জাতীয় দল হিসেবে ঘোষিত কোনো দল গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়া মাত্রই লুপ্ত ঘোষিত হয়। যেমন, আজকের আওয়ামী লীগ ’৭১-এ স্বাধীনতাসংগ্রামে জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্ট-এ পরিণত হয়েছিল। জাতীয় রাজনৈতিক উত্তরণের পথ ধরে যে দলটি ‘জাতীয় ফ্রন্ট’ অর্থে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের অধিকারে থাকলেও- দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এর দলগত অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবেই লুপ্ত হয়ে গেছে- তা পুনরায় দলীয় অস্তিত্বে নামিয়ে আনা পুরো জাতি ও জাতীয় রাজনীতিকেই নামিয়ে দেয়ার সমার্থক হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে, বিশেষতঃ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন সেই দলের বিপরীতে গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী কোনো দল বিরোধিতায় যায় তখন তা জাতীয় বিরোধিতার অর্থে প্রতিফলিত হতে থাকে। অর্থাৎ জাতীয় শত্রুদের ‘কর্ম ও কণ্ঠে’র সাথে এই বিরোধিতার পথ ধরে ক্রমশঃ তাদের পার্থক্য ঘুচে যেতে থাকে- সমগ্র জাতি বিভ্রান্ত ও বিভক্ত হয়ে পড়ে; প্রতিক্রিয়াশীলরা বেঁচে যায়, অস্তিত্বের সংকট কেটে যায়। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতি অনুসারে যে দলটি বিরোধীতায় অবতীর্ণ হয়, প্রতিক্রিয়াকে বাঁচিয়ে তোলার জন্যে তাকে দায়ী করা যায় না বরং যে জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টে উত্তোরিত হয়েও দলীয় রাজনীতিতে থেকে যায়, দায়টি তার কাঁধেই বর্তায়। তুলাদণ্ডের দুই পাল্লায় যাই থাকুক তা সমান মানকেই প্রতিফলিত করে। জাতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্ট হয়ে ওঠা একটি দল পুনরায় দলীয় রাজনীতিতে ‘দল’ হিসেবে টিকে থাকলে- জাতীয় রাজনৈতিক নিক্তিতে তা প্রতিক্রিয়ারই সমার্থক হয়ে ওঠে।

 

‘জয় বাংলা’ স্লোগানসহ মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় অর্জনই তৎসময়ে দল-মত নির্বিশেষ আওয়ামী লীগের নামে আপামর জনতার জাতীয় রাজনৈতিক অর্জন ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি দল হিসেবে বা দলীয় রাজনীতিতে রয়ে গেছে, ক্রমান্বয়ে ‘জয় বাংলা’টাও আজ তাদের দলীয় স্লোগানে নেমে এসেছে। এমন-কি অনেক মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা এক সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে জীবন বাজী রাখলেও আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত নয় বিধায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আজ আর তাঁদের নিজের মনে হয় না। এভাবে জাতীয় অর্জন, জাতীয় বোধ ও তার ইতিহাস কুক্ষিগত হয়ে পড়ে- সত্য ইতিহাসই পক্ষান্তরে চরম ভ্রান্তি ও বিকৃতির নামান্তর হয়ে পড়ে- যেমন বঙ্গবন্ধু জাতির জনক হওয়া তো দূরের কথা জাতীয় অথেনটিক মর্যাদায় না থেকে- হয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগের একজন দলীয় নেতা! অর্থাৎ জাতীয় ফ্রন্টের দলীয় রাজনীতিতে বহাল থাকার পথ ধরে সমগ্র জাতিই আপন ইতিহাসের অধিকার হারায়- পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে ওঠে দেশ-জাতি তথা ইতিহাস ও রাজনীতিহীনতায় পঙ্গপালসম।

 

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপি গঠিত হলেও- ‘জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে’ যথার্থ রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ’৯০-এর সামরিক জান্তাবিরোধী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং তা বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলেও বিজয়োৎসবে বিরোধীদের বাড়ি-ঘর আগুনে পোড়েনি, কিন্তু জোটবদ্ধ রাজনীতির পথ ধরে ২০০১-এ সরকার নির্বাচিত হওয়া মাত্রই বিরোধীদের বাড়ি-ঘর থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে সাবেক সরকার প্রধান সহ মন্ত্রী-এমপিকে পর্যন্ত হত্যা-নির্যাতন সবই হয়েছে এবং ’৯০-এ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে এতোবড় আপোসহীন সংগ্রামে কখনও ঘুমন্ত মানুষকে আগুনে পুড়তে হয়নি; কিন্তু এখন আন্দোলন-সংগ্রাম মাত্রই এগুলো হচ্ছে। এগুলো এদেশের মানুষের অচেনা-অদেখা নয়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ব্যাপী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানুষ এই নারকীয়তাকেই চিনেছে। জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে কোনটা রাজনীতি আর কোনটা প্রতিক্রিয়া আজ ‘কর্ম আর কণ্ঠে’ সেই পার্থক্য বোঝাটাই মুশকিল হয়ে গেছে।

 

প্রথম জাতীয় সরকার ভেঙে দেয়ায় জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার অমীমাংসিত বা অপূরিত সেই শর্ত বা অজুহাত ধরে এদেশে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে কেবল ‘ঘোষণা মারফত’ বারবার জাতীয় সরকার ও জাতীয় দল গঠিত হয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংহতি বা দেশ ও মানুষের প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐক্য তো দূরের কথা, উল্টো রাজনীতিটাই আজ দেশ-মানুষহীন হয়ে পড়েছে।

 

জাতীয় সংহতি বা জাতীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা তথা গণতন্ত্রের ভিত্তি ‘পরমতসহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও আস্থা’র শর্ত পূরিত হওয়ার পূর্বেই প্রথম জাতীয় সরকার ভেঙে দিয়ে উল্টো দেশকে সরকার সংক্রান্ত দীর্ঘস্থায়ী জটিলতায় ঠেলে দেয়া হয়েছিল, যা অদ্যাবধি রয়ে গেছে এবং তড়িঘড়ি বহুদলীয় বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ ধরে মুখ্যতঃ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথকেই কন্টকিত করা হয়েছিল, যা আজও রয়ে গেছে। সংস্কৃতি যদি কোনো দেশের পরিচয় হয়, তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ দেশে যে সংস্কৃতি চালু আছে, তার দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট  হয়ে ওঠে। এখনও সরকার সহ গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ও তার সংকট সমাধান, এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা নৈর্ব্যক্তিক কাঠামোগত পথ ধরে না হয়ে কেবল সরকারে থাকা না থাকার মধ্যেই নির্দিষ্ট করা বা খোঁজা হয়, এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন সহ সরকার সংক্রান্ত যাবতীয় ভ্রান্তি ও নৈরাজ্য এরই প্রামাণিক প্রকাশ- যা মূলতঃ পারস্পরিক অনাস্থা ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব থেকেই সৃষ্ট।

 

নির্বাচন সম্পাদনের জন্যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নির্বাচন কমিশন থাকার পরও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পাদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয়েছে কেন?

 

ড্রাইভার ও গাড়ি যেমন এক নয়, তেমনি সরকার ও রাষ্ট্রকাঠামো এক নয়। নির্বাচন প্রসঙ্গে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা পায়, তবে যুগপৎ তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে থাকা নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বা অক্ষমতাকেই প্রকাশ করে। অথচ কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় তাকে দাঁড় না করিয়ে সরকারব্যবস্থার মধ্যেই নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা খোঁজা কোন সংস্কৃতিকে প্রকাশ করছে?

 

বহুদলীয় বা গণতান্ত্রিক শাসন কার্যকর হওয়ার অনিবার্য শর্ত দেশকে সামনে রেখে দলসমূহের পারস্পরিক আস্থা ও পরমতসহিষ্ণুতা- যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হিসেবে নির্দিষ্ট এবং এটা কেবল নৈর্ব্যক্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই হতে হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক অনাস্থা থেকে উদ্ভূত অর্থাৎ গণতন্ত্রের বিরোধী সংস্কৃতি তথা অনাস্থা ও অসহিষ্ণুতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। ’৯০-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের হাত ধরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নৈর্ব্যক্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতার পরিবর্তে ঠিক বিপরীত জিনিস প্রতিষ্ঠা তথা অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে, যা কেবল আমাদের সংবিধানের সাথেই নয় বরং রাষ্ট্রতত্ত্বের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ একটি অদ্ভূত কিসিমের জিনিস!

 

একটি জরুরী পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের শর্তে সব দল, সব পক্ষ মিলে ’৯০-এর ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’-এর আপোস-রফা মানা গেলেও সাংবিধানিক পথ ধরে নির্বাচিত সরকারসহ সব দল মিলে সংসদে বসে ঠাণ্ডা মাথায় কী করে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল, সেটাই এদেশের ইতিহাসে বিরল বিস্ময়কর রাজনৈতিক মূর্খতা! কারণ বৈশিষ্ট্যগতভাবে অনির্বাচিত বা আমলাতান্ত্রিক সরকার মূলতঃ জনবিচ্ছিন্ন পূর্বতন সেই সামরিক সরকারেরই নয়া সংস্করণ মাত্র- পার্থক্য কেবল পোশাকে তথা আর্মস এ্যান্ড ইউনিফরমে এবং ভাবাদর্শগতভাবে এটা সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা।

 

[সংসদে সব দল মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করার পর মুক্তিজোটের সাংগঠনিক রিপোর্টে এই সরকারব্যবস্থাকে বিকৃতি হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয় “... তত্ত্বাবধায়ক সরকার- যা বিশ্বের রাষ্ট্রিক বিকাশের সাথে সম্পর্কহীন। এটা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকশিত রূপ নয়, বরং রাষ্ট্রিক বিকৃতিরই প্রমাণ...” ফিরে দেখা- ১২ বছর, পৃষ্ঠা নং- ১১৩, ১১৪ (চতুর্থ জাতীয় সাংগঠনিক রিপোর্ট-২০০৪) দ্রষ্টব্য]

 

কিছু Muddle Headed বুদ্ধিজীবী একে গণতন্ত্রের বিকাশ বলেছেন! এঁদের রাষ্ট্রতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ভূগোল থেকে ঘুরে আসা সেই ভ্রমণকারীর গপ্পোকেও ভুলিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান- নির্বাচন কমিশনকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে দাঁড় না করিয়ে সেই সংকটের সমাধান সরকারব্যবস্থার মধ্যে খোঁজা অর্থাৎ রাজনীতি যেমন সরকারে যাওয়া এবং থাকা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ তেমনি সকল সংকট ও এর সমাধান কেবল সরকারসংশ্লিষ্ট ক্ষমতার মধ্যে খোঁজার প্রবণতা- যা ক্ষমতা লিপ্সা বা ক্ষমতাসর্বস্ব অপরাজনীতিরই প্রকাশ। অর্থাৎ ’৯০-এর পর গণতান্ত্রিক পথ ধরেই নির্বাচিত সরকার নিজেরাই এবার অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় এবং ক্ষমতায় গেলে বিভিন্ন কারসাজিতে স্বৈরাচার বা সামরিক জান্তার সংস্কৃতিকেই হার মানাচ্ছে!

 

যদিও আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে প্রাতিষ্ঠানিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করার পরিবর্তে আরও কাট-ছাঁট করেছে। অর্থাৎ মোটেই তা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতার শর্ত থেকে নয় বরং ক্ষমতাসর্বস্ব রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির প্রকাশ হিসেবেই এটা করেছে। ইতোপূর্বে যেমন সব দল মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তেমনি ক্ষমতালিপ্সা থেকেই আরও একটু অবনয়নের পথ ধরে তা বাতিল করেছে।

 

[১০ই অক্টোবর ২০১৩ খ্রিঃ-এ মুক্তিজোট নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন সনদ হাতে পাওয়া মাত্রই সংবাদ মাধ্যমে (প্রেস ব্রিফিং) সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় নির্বাচনকালীন সময়ে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করতে হবে। এমন-কি ২০১৪-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদ্য নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে উক্ত দাবী পূরণের শর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েও তা পূরিত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বয়কট করে।]

 

২০১৪-এর নির্বাচনকে ঘিরে নিরপেক্ষ সরকার গঠনে নিজের জোটবদ্ধ দলগুলোর মধ্যে মন্ত্রীদের দপ্তর-বদল করেই তাকে সর্বজন গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অভিধায় ভূষিত করা কিংবা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পরে গণতান্ত্রিক রীতি রক্ষায় নিজের শরীক দলকে বিরোধী দল ঘোষণা করে তাদের মন্ত্রিত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক উদারতার উৎকৃষ্ট ও ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত অর্থে চালানোর যে খুল্লে-খুল্লাম সংস্কৃতি, সেটা যা-খুশি বলা যা-খুশি করার রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারকে ছাড়িয়ে খোলামেলা ধাপ্পাবাজী হয়ে ওঠে, তাতে তা কেবল সরকার গঠন সংক্রান্ত বিষয় না থেকে বরং রাজনীতিটাই মানুষের কাছে মিথ্যাচারের সমার্থক করে তোলে- যার ফল ভোগ করে সব রাজনৈতিক দল।

 

বিশেষতঃ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংসদ বা আইনসভা মারফত না হয়ে- স্বাধীন বিচার বিভাগের দোহাই দিয়ে তা করা হয়েছে! নিজেদের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করার কারসাজিতে আদালতকে স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা বা আদালতের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে নষ্ট করা অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটাকে পর্যন্ত ছুঁয়ে ফেলাতে বোঝা যায় দেশটায় দলবৃত্তি থাকলেও রাজনীতি নেই, দলীয় সরকার থাকলেও রাজনৈতিক সরকার অনুপস্থিত।

 

অর্থাৎ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পরিবর্তে গণতন্ত্রের দেউলিয়াত্ব ও দলবৃত্তির স্বেচ্ছাচারিতাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যাচ্ছে।

 

’৯০-এর আন্দোলনের রাজনৈতিক মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র। কিন্তু পরবর্তীতে প্রতিটি সরকারই এই রাজনৈতিক লক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করা তথা নৈর্ব্যক্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতায় বা কাঠামোবদ্ধতায় রূপায়িত করার প্রসঙ্গটা যতোটা সম্ভব এড়িয়ে গেছেন। সব রাজনৈতিক আন্দোলনেরই মূল উদ্দেশ্য থাকে ক্ষমতায় গিয়ে তার নীতি-আদর্শ বা লক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠা করা। এই ‘প্রতিষ্ঠা’ বলতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো মারফত তা স্থাপন করাকে বুঝায়।

 

ঠিক যেমন দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত ’৭১-এ স্বাধীনতা পরবর্তী সংহতির শর্ত পূরণে কাঠামোগত দিকটা অচ্ছুত থেকে গেছে- ফল হিসেবে জাতীয় রাজনীতির সেই মূল ধারাটিই ভাবাদর্শিক দিক থেকে পথভ্রষ্ট হয়েছে। তেমনি ’৯০-এর দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত গণতান্ত্রিক সেই দাবীটি, পরবর্তী সরকারসমূহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হিসেবে অদ্যাবধি নৈর্ব্যক্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। উল্টো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় ভাবধারার বশংবদ বা দলাদলীতে বিকল ও বৈপরীত্যে আরও দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। এমন-কি সংবিধান ঘোষিত বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনিবার্য শর্ত, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক দিককে গড়ে তোলা তো দূরের কথা- যা আছে তাকেই দাঁড়াতে দেয়নি।

 

যেমনঃ জনগণের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী থেকে ক্রমান্বয়ে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা রাখার অনিবার্য শর্ত হিসেবে চেইন গড়ে ওঠার কথা। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক চেইন তথা মন্ত্রী পরিষদ সচিব > সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা মন্ত্রণালয় সচিব > বিভাগীয় কমিশনার > জেলা প্রশাসক > উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা > ইউনিয়ন পরিষদ সচিব আছে, কিন্তু জনসংশ্লিষ্ট কর্ম সম্পাদনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী থাকলেও নির্বাচিত জেলা পরিষদ নেই। ফলে- পরবর্তী স্তর উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ থাকলেও তা কার্যতঃ যথাযথ ভূমিকায় অকার্যকর, কারণ ধারাবাহিকতা ছিন্ন করার জন্যে একটা স্তর অনুপস্থিত থাকলেই চলে এবং এই পরবর্তী স্তর মূলতঃ প্রত্যক্ষতায় ব্যাপক জনগণ সংশ্লিষ্ট, যা স্থানিক সরকার হিসেবে নির্দিষ্ট। সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সর্বক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা দেশ চালনার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বা ঊর্ধ্ব স্তরের সাথে তৃণমূল বা ব্যাপক জনগণ সংশ্লিষ্ট স্থানিক  স্তরের সংযোগ স্থাপনে জনপ্রতিনিধি নয়, বরং প্রজাতন্ত্রের আমলা তথা জেলা প্রশাসক হয়ে তা নির্বাহ হয়। এর অর্থ- জনপ্রতিনিধিত্বের বা জনস্বার্থের অনুবর্তী আমলাতন্ত্র না হয়ে আমলাতন্ত্রের অনুবর্তী হয়ে ওঠে রাজনীতি তথা ব্যাপক জনগণ। অর্থাৎ কর্ম নির্বাহে প্রধানমন্ত্রী থেকে পরবর্তী জনপ্রতিনিধিরা মধ্যবর্তী স্তরগত শূন্যতা ও তদস্থলে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতায় কর্মসম্পাদনে আমলাতন্ত্রের অনুবর্তী হয়ে পড়ে। আর আমলারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নয়, জনগণের কাছে ফিরতেও হয় না, তাই জনগণের প্রতি দায় থাকে না অর্থাৎ যেখানে জনপ্রতিনিধিদের অনুবর্তিতায় আমলারা চালিত হয়ে জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা পালন করার কথা, সেখানে উল্টো আমলাদের অনুবর্তিতাতেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা চালিত হচ্ছে। এভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা জনসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে আমলাতান্ত্রিক ফাঁদে জনগণের কাছে দায়-দায়িত্বহীন ভাবমূর্তি তথা নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ সহ অনাস্থার যাবতীয় অভিধা জুটিয়ে ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

 

যাঁদের রাজনৈতিক দায় থাকে, তাঁরা দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত থাকেন আর যাদের জনসংশ্লিষ্টতায় রাজনৈতিক দায় নেই, তারাই রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে দায়হীন দায়িত্বের দ্বৈরথে একদিকে যেমন আমলাতন্ত্র তার রাষ্ট্রকাঠামোগত নৈর্ব্যক্তিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে, তেমনি অপরদিকে রাজনীতিও তার জনসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক চরিত্র হারায়। রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব আস্থার সংকট থেকে হীনম্মন্যতা সহ যাবতীয় রাজনৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে পড়েন। অর্থাৎ গণতন্ত্র বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যদি তাদের ভূমিকায় সক্রিয়ই হতে না পারেন, তবে নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কী করে সক্রিয় হয়? গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কী হাওয়ায় গজিয়ে উঠবে?

 

[স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তার রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় প্রার্থীর পরিচয়ে বছরের পর বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা যে মানুষের কাছে নিজেকে মিথ্যাচারী সাব্যস্ত করা, একজন সৈনিকের ইউনিফর্ম কেড়ে নেয়ার মতোই অমর্যাদা বা অসম্মানের, স্বাধীনতার এতো বছর পর সেটা বোঝাতে মুক্তিজোটকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। ১৬ই এপ্রিল, ২০১৫ খ্রিঃ তারিখে মুক্তিজোট উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করে, যাতে ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি মাত্রই তার রাজনৈতিক পরিচয় বা তার নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে পারে’। আদালত তা আমলে নিয়ে ২০শে এপ্রিল, ২০১৫ খ্রিঃ-এ সিটি করপোরেশন সহ সব ধরণের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক ও পরিচয় ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের বিধি নিষেধ সম্বলিত চারটি বিধি কেন সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারী করেন এবং তার জবাব দিতে দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দেন আদালত। আর নির্বাচন কমিশন এর জবাব দেয় ২২শে নভেম্বর, ২০১৫ খ্রিঃ প্রায় সাত মাস পর। সংবিধান পরিপন্থী বিধায় এর জবাব দিতে মন্ত্রীসভা তো বটেই সাথে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারীর প্রয়োজন হয়েছে। যদিও মুক্তিজোটের এই রিট পিটিশনে উল্লিখিত বিষয় সম্পূর্ণ পূরিত না হওয়াতে মুক্তিজোট স্থানীয় নির্বাচন বয়কট করে এবং সে কেস নিয়ে এখনও মুক্তিজোট আইনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য, ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগ আলাপ-আলোচনায় দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের কথা বললেও অনেক কথার মতো তা যে একটি ‘কথার কথা’ ছিল সেটা ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় মুক্তিজোটের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ বোঝাতে চায়, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন- তাদের স্বেচ্ছায় নেয়া একটি মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু মোটেই তা নয়, সত্য হলো- তারা বাধ্য হয়েছে। মুক্তিজোটের ‘এক দফা এক দাবী’ হিসেবে গৃহীত সংবিধানের ৬০ ধারা বাস্তবায়নে এই রিট আবেদন ছিল প্রথম পদক্ষেপ।]

 

সংবিধান ঘোষিত প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক দিককে গড়ে না তোলায়, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ‘জনগণ ও রাজনীতি’ বা ‘জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক’গত দিকটি চরম অনাস্থা তথা অপরাজনীতি বা অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির শিকার হয়ে গেছে।

 

এদেশের সরকারগুলো সংবিধান ঘোষিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে যথার্থ প্রাতিষ্ঠানিক রূপে দাঁড় না করানোর কারণে যেমন রাজনৈতিকভাবে নিজেরাই পচে যাচ্ছে, তেমনি রাজনীতিটাও আর ব্যাপক মানুষের হয়ে ওঠেনি। সেই সাথে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তাকেও দাঁড়াতে না দেয়ায় তাদের অর্জিত রাজনৈতিক বিজয়ও অচিরে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ’৯০-এর সেই রাজনৈতিক বিজয় বা গণতন্ত্রও ইতিমধ্যে লক্ষ্যভ্রষ্ট বা ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে গেছে।

 

কর্তৃত্ব বা অথেনটিকতার শর্তে ব্যক্তির কর্তব্যকর্ম প্রাসঙ্গিক হলেও কাঠামো বা ব্যবস্থাপনা তথা রাষ্ট্রসহ সকল প্রাতিষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে ব্যক্তি কখনই কারণ নয় বরং বাহক। সেদিক থেকে উপরোক্ত প্রবণতা ও ভ্রান্তির উৎস ’৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ কিংবা ’৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানী শাসন আমলে নয় বরং তারও পূর্বে অর্থাৎ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেই প্রেথিত হয়ে আছে।

 

‘....চলমান এই বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেউলিয়াত্বের সাথে বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রকাঠামো, তার জন্মলগ্ন থেকে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াতেই ছিল বিকলতা; যে বিকলতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে করেছে আরো দুঃসহ। ব্রিটিশপূর্ব অনেক শাসক বাইরে থেকে এসে এই উপমহাদেশ শাসন করলেও তাদের সাথে ব্রিটিশদের পার্থক্য হলো অন্যান্য শাসকরা (দীর্ঘস্থায়ী শাসনের ক্ষেত্রে) শেষ অবধি এ দেশেই বংশপরম্পরায় থেকে গেছে অর্থাৎ তারা এ দেশের জনসমাজ সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরাই প্রথম (দীর্ঘস্থায়ী শাসনের ক্ষেত্রে) শাসক, যাদের লক্ষ্য ছিল এ-দেশ (জনসমাজ) নয় অর্থাৎ তাদের দেশ বা ব্রিটিশ। আক্ষরিক অর্থেই শাসক হিসেবে তারা বিদেশী, ফলে শোষণের স্বার্থেই বিদেশমুখিনতায় গড়ে তোলে চলমান এই শাসনব্যবস্থা।

 

        ব্রিটিশ উপনিবেশ অন্যত্রও ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রকে চালনার স্বার্থে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদেরকে এখানে বিকাশের যে স্তরে (সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক-রাষ্ট্রিক কাঠামো পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে চলমান আধুনিক ধনতান্ত্রিক সামাজিক-রাষ্ট্রিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠাকাল) যেভাবে নিশ্চিহ্ন (অভিজাত, অমাত্য ও রাজকর্মচারী, এমন-কি শেষ অবধি রয়ে যাওয়া সৈনিকদেরও ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে নিকেশ করা হয়) করা হয়েছিল, তা আর কোথাও হয়নি। সেক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা চালনার স্বার্থে ব্রিটিশরা পরবর্তীতে যে অংশকে নিজেদের মতো করে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে তুলে আনে, সেটাও তাদের (ব্রিটিশদের) চেতনাপ্রসূত অর্থাৎ বিদেশী চেতনা। মূলতঃ তারা ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী।

 

এরপর ব্রিটিশমুক্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও শাসনব্যবস্থা ছিল প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানিরা, অর্থাৎ বিদেশী শাসক গোষ্ঠী। সবশেষে, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে শাসনব্যবস্থায় (ক্ষমতায় আসীন হয় বা রাজনৈতিক অর্থে) বাংলা হয়ে ওঠে বাংলার এবং নেতৃত্বে থাকা মূলতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণী শাসনকার্য পরিচালনায় উঠে আসে।

 

কিন্তু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিদেশমুখী রাষ্ট্রকাঠামোর ধারায় শিক্ষিত অর্থাৎ দেশজ চেতনা বর্জিত বিদেশমুখী চেতনায় পুষ্ট ছিল। ফলে, রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলেও দেশজ চেতনার অভাবে তাকে ব্যাপক সামাজিক স্বার্থে স্বদেশমুখী করে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, সে ব্যর্থতা তাদের নয় বরং দেশজ চেতনার অভাব থাকার ফলশ্রুতিতেই দেশকে ভালোবাসলেও (আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক তথা সামগ্রিক অর্থে) বাংলাকে বাংলার করে তুলতে পারেনি এবং অদ্যাবধি ক্ষমতায় অনেকে এলেও এবং প্রচণ্ড প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও একই কারণে (দেশজ চেতনার সংকট) তাঁরা ব্যর্থ হন।

 

[উল্লেখ্য, এখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা কম-বেশি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হলেও সেটা এই বিদেশমুখী ব্যবস্থার কারণেই সম্ভব হয়নি। কারণ, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার সাথে তালকাটা এক বিকৃত সামাজিক অবস্থায় সমাজতন্ত্রই হোক আর যতো আধুনিক সমাজব্যবস্থাই হোক না কেন- তা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং বিদেশমুখী রাষ্ট্রকাঠামোয় যতো সৎ নেতৃত্বই আসুক আর যতোই চেষ্টা করুক; বিদেশমুখী রাষ্ট্রিক অবকাঠামোগত বিকারগ্রস্ততা দূর করার প্রশ্নে দেশজ চেতনায় উন্নীত না হয়ে কিছুই সম্ভব নয়...]

 

আর তাই অদ্যাবধি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষিত অংশের মননগত বা আচার-আচরণ ও চিন্তা-চেতনা তথা সাংস্কৃতিক জীবনে পাশ্চাত্য তথা বিদেশ-ই প্রতিফলিত হয়। যা দেশজ চেতনার অভাবকেই তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলে।

 

[যে কারণে লণ্ঠনের প্রচ্ছদ প্রবন্ধে (২০০১ খ্রিঃ-এ প্রকাশিত) উচ্চারিত হয়েছিল... “দেশী সংস্কৃতি হয়ে ওঠে পানসে ‘ব্যাকডেটেড’। অতিশয় আত্মবিকৃত শিকড়বিচ্ছিন্ন আমরা হয়ে উঠি বিভ্রান্ত, বিশৃঙ্খল, নতুনেরর জঘন্যতায় নতুন শতাব্দীর নতুন প্রজন্ম। চোখ জুড়ে উঠে আসে বিদেশীর রংচড়া স্বপ্ন, মগজে আবাদ হয় বিদেশের মাটি কিংবা দেশের মাটিতেই অনুকরণের চেতনায় আমৃত্যু এ্যালসেশিয়ান মোড়কে ব্যর্থ নেড়িকুত্তার দীর্ঘশ্বাস, কখনও এখানে উচ্চারিত হয়েছে তথাকথিত প্রগতির কণ্ঠে ‘বাংলা হবে ভিয়েতনাম’, এখন উচ্চারিত হচ্ছে তালেবানী জন্তুসম মরুহ্রেষায় ‘বাংলা হবে আফগান’ শুধু স্বাধীনতার সিকি শতাব্দী পরও জনজোয়ার ফুঁসে উঠে দাবি করেনি বাংলা হবে বাংলার। এদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় (বুয়েট, বিআইটি ইত্যাদি) আকাশছোঁয়া ইমারত নির্মাণের মতো দেশজ বাস্তবতা বর্জিত বহুবিধ শিক্ষা (এদেশে পঠিত প্রতিটি জ্ঞানশাখার পাঠ্যগ্রন্থসমূহে বিদেশী পাণ্ডিত্যের উদ্ধৃতি ছাড়া কোনো কিছুই পূর্ণতা বা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। বিগত তিনশ বছরে এদেশে কি কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি জন্মায়নি?) দিয়ে গড়া হয় অনেক মগজ, যার বাস্তবায়নের সুযোগ এদেশে নেই। সর্বোচ্চ ব্যয়সাপেক্ষ শিক্ষাঙ্গনগুলো কাকের বাসার ভূমিকা পালনে অবতীর্ণ হয়ে ফুটিয়ে চলেছে কোকিলের ন্যায় চরিত্র, সম্পূর্ণ কূলীন জারজদের। একবিংশে আজ কোথায় স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ ও তার সমাজকে ঘিরে নাগরিক চেতনা কিংবা নাগরিক চেতনা সম্পন্ন সচেতন দৃঢ়তায় সামাজিক শক্তির উপস্থিতি?]

 

        সেই সাথে বিদেশমুখী রাষ্ট্রিক বিকৃত ধারায় চুম্বক দণ্ডের ন্যায় তা আজ আত্মস্বার্থে চালিত দেশপ্রেম বর্জিতদের সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্যে তুলে এনেছে। দল-মত নির্বিশেষে স্বার্থান্বেষীরা স্বীয় স্বার্থেই ক্রমশঃ স্বদেশবিমুখ রাষ্ট্র সম্পৃক্ততার (রাজনৈতিক দলবৃত্তি) দ্বারা সংহত ও সংঘবদ্ধ, তাদের পরিচয় আজ রাজনৈতিক, যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি স্বাধীনতার বত্রিশ বছর অতিক্রমণের পথে আজ প্রত্যেকটা দল থেকে দেশপ্রেমী, সৎ নেতৃত্বকে পিছনে ফেলে (দলীয় লবিং-এ পরাস্ত হচ্ছে) সম্মুখে উঠে আসছে দেশপ্রেম বর্জিত সমাজবিরোধী। সর্বোপরি, বলা যায়- আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে দেউলিয়া হয়ে পড়া চলমান আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে দেশজ রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার বিকারগ্রস্ততা মিলেমিশে আজ যে রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিয়েছে, তার একদিকে রয়েছে সেই ভয়ানক রাজনৈতিক দলবৃত্তির দানবীয়তা এবং বিপরীতে রয়েছে ব্যাপক জনসমাজ।

 

সেই সাথে, এই মানদণ্ডে দেশের সমগ্র জনসমাজ আজ দুই ধারায় বিভক্ত। এক অংশ- দেশপ্রেমবর্জিত আত্মস্বার্থে রাষ্ট্র সম্পৃক্ততায় রাজনৈতিক দলবৃত্তিতে সংঘবদ্ধ, যে অংশটা ক্ষুদ্র আর তার বিপরীতে ব্যাপক জনগোষ্ঠী, যারা অনৈক্য এবং অসংগঠিত। ফলশ্রুতিতে এই ব্যাপক অংশ অসংগঠিত থাকার কারণে আজ স্পষ্টতঃ গণবিরোধী চরিত্র সম্পন্ন মুষ্টিমেয় রাজনৈতিক দলবৃত্তির নিকট বিপর্যস্ত, অসহায়। ...[ফিরে দেখা- ১২ বছর; পৃষ্ঠা নং- ৭৫-৭৬ (তৃতীয় জাতীয় সাংগঠনিক রিপোর্ট- ২০০৩ খ্রিঃ) দ্রষ্টব্য]

 

এদেশের চলমান রাজনীতি তথা রাজনৈতিক দল তার নেতৃত্ব মূলতঃ উপরিউক্ত পূর্বতন ধারারই ফসল- হয় দল ভেঙ্গে দল গড়া অথবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অলিন্দ থেকে রাজনৈতিক দল গড়া, যা লোভ-লালসা- ভয় দ্বারা গঠিত হয় অর্থাৎ রাজনৈতিক দল গঠনের যে সাধারণ বৈশিষ্ট্য তথা জনগণের মধ্য থেকে জনগণের হয়ে সংগ্রামের পথ ধরে গড়ে ওঠা নয়- যেখানে রাজনৈতিক দল গঠনের সাধারণ রীতিই প্রতিফলিত হয়নি, সেক্ষেত্রে বিদেশমুখী চেতনার বিরুদ্ধে ইতিহাসনিষ্টতায় দেশজ চেতনা তথা বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা বা সাংস্কৃতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দল গড়ে উঠা তো পরের কথা। শুধু সংবিধানের ৬০ ধারা বাস্তবায়ন প্রাসঙ্গিকতায় সরকারসমূহের প্রচেষ্টা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়- দেশজ বাস্তবতার সাথে দেশের রাজনীতির দূরত্ব কতোখানি!

 

রাজনীতিহীন দল আর দল সমর্থিত আমলাতান্ত্রিক সরকার গঠনের নজির রেখেও যে জনপদ সাংবিধানিক গণতন্ত্রের চর্চা করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ‘গণতান্ত্রিক বিকাশ’ হিসেবে যে দেশের পণ্ডিতরা রাজনৈতিক পাণ্ডিত্য জাহির করে, ভোট-ভ্যাট-ভাত সহ রাষ্ট্রীয় সকল সংকট সমাধান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোবদ্ধতায় না খুঁজে কেবল ‘সরকার-এ থাকা-না থাকা’ কিংবা ‘কারও ক্ষমতায় যাওয়া-না যাওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; সরকারসর্বস্ব তথা বর্তমানের ক্ষমতালিপ্সু এই জনবিচ্ছিন্ন অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির যাত্রাও শুরু হয়েছিল মূলতঃ সরকারব্যবস্থা তথা ’৭২-এর জাতীয় সরকার ভেঙে দেয়া বা জাতীয় সরকারহীনতা থেকে।

 

১৯৭২ এর ১১ই জানুয়ারীর সেই ভুল ও তার পরিণতিতে- স্বাধীনতার এতো বছর পরও বাংলাদেশ রয়ে গেছে রাজনীতিহীন এক জনপদ হয়ে! রাজনীতির বদলে দলবাজীর আঁধারে এদেশ ডুবে গেছে- সেই একটি মাত্র ভুল সিদ্ধান্তের কারণে।

 

প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল একটি কারণে কোনো ‘ঘটনা’ ঘটে না এবং উৎসগত কারণকে পারিভাষিকভাবে ‘মূলতঃ’ বা মূল কারণ হিসেবে বিধৃত করা গেলেও তা থেকে উৎসারিত কারণসমূহের মধ্যে কেবল ‘প্রধান’ কারণ ধরেই প্রতিটি বিষয় আলোচিত হয়- দর্শন বা মতাদর্শিক চর্চার ক্ষেত্রে বিষয়টা যেমন স্পষ্ট, তেমনি সব ক্ষেত্রেই মূল ভুল একটিই থাকে- তার প্রকাশ ঘটে বহুভাবে। এক্ষেত্রেও মূল ভুল একটাই আর তারই প্রকাশ ঘটেছে বহুভাবে- ‘৭৩, ’৭৫ বা ’৯০ পরবর্তীতে গণতন্ত্র রক্ষাসহ জাতীয় সকল ক্ষেত্রে।

 

’৭১ ও ’৯০ বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক বিজয়ের দুই মাইলফলক আর তা অর্জিত হয়েছিল দল-মত নির্বিশেষ তথা ‘সামাজিক শক্তি’র হাত ধরে। কিন্তু বিজয় অর্জনের পর স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ক্ষমতাসীন হয়েছে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল, যাদের হাত ধরে সংবিধান বর্ণিত ৬০ ধারা আজও বাস্তবায়িত হয়নি; অর্থাৎ অদ্যাবধি ব্যাপক জনসমাজের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়নের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়নি তথা রাষ্ট্র সংশ্লিষ্টতায় যে ‘সামাজিক শক্তি’ তার বিজয় স্থায়িত্ব পায়নি।

 

আর তাই ’৭১ বা ’৯০ সহ অদ্যাবধি এদেশের জাতীয় রাজনৈতিক সফলতা অর্জিত হওয়ার পরই জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক হতাশা আর নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়েছে। কারণ- ত্রিশ লক্ষ মানুষ সহ পরবর্তীতে রওফুন বসুনিয়া, দিপালী সাহা, নূর হোসেন, ডাঃ মিলন প্রমুখের শহীদান অত্মোৎসর্গের অর্জনকে এদেশের মানুষ দেখেছে- স্ফূলিঙ্গ হওয়ার পরিবর্তে তা নৈরাশ্যের দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফিরছে।

 

বিগতের পরিণতি অর্থেই  থাকে বর্তমান আর বর্তমানে দাঁড়িয়েই ঘোষিত হয় ভবিষ্যৎ ও তার দিকনির্দেশনা।

 

বলাবাহূল্য, বিগত যদি বর্তমানকে বোঝার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে ওঠে- তবে সে বিগত আলো না হয়ে জাতীয় জীবনে চোখের ঠুলি হয়ে পড়ে।

 

রিমোট কন্ট্রোলে এসি, টিভি চালাচ্ছে, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠান উদ্বোধন হচ্ছে অথচ কোনো একদিন রাষ্ট্রীয় সীমানা বিস্তারে প্রান্তিক সীমানার সাথে কেন্দ্র কিংবা শাসিতের সাথে শাসকের ‘দূরত্ব-হ্রাস’-এর শর্ত থেকে উদ্ভূত যে আমলাতন্ত্র, সেটা এখনও আঠারো মাসে বছর গুণছে।

 

মোবাইলে চিৎকার করে কথা বলতে দেখলে তা ব্যাকডেটেড, অস্বাভাবিক বা হাস্যকর মনে হয়- অথচ মাইকে ঘন্টার পর ঘন্টা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করাকে ঝগড়া বা অসভ্যতা না বলে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমন-কি ‘রাজনীতি’ বললেও মান্ধাতার আমলের রাজনীতি হিসেবে একে কেউ নির্দিষ্ট করতে পারছে না- আর তা পরিত্যাগ বা পরিবর্তন বা ‘সচেতন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নূতন রাজনৈতিক ধারার জন্ম দেয়া’ তো পরের কথা!

 

মোবাইল ফোন থাকাতে এখন রাজধানীতে বসে দিব্যি গ্রামের বাড়িতে নিজের সংসার চালাতে পারছে, অথচ কয়েক বছর অন্তর অন্তর জনগণের রায়ে একটি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর বাদ-বাকী সময় সরকার প্রসঙ্গে ব্যাপক জনগণ এখনও নীরব দর্শক হয়েই থাকছে, শাসনকার্যে অংশগ্রহণ বলতে এখনও কেবল ভোট প্রদান ছাড়া আগে-পিছে কোথাও নেই। জন্ম বা উত্তরাধিকার সূত্রে রাজা বা শাসক হওয়ার প্রতিবাদে ব্যাপক জনগণ বা সাধারণের সমর্থনের ভিত্তিতেই যে সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- যা মূলতঃ এই ব্যক্তি মানুষের স্বকীয় বোধের স্বীকৃতিতেই সৃষ্ট; সে সরকার (Government- of the people, by the people, for the people) এখনও দেশ বা সরকার প্রসঙ্গে কেবল ভোটাভুটির সেই মান্ধাতার আমলের সেই পুরনো পদ্ধতিতেই আটকে আছে এবং যথারীতি একে আজও জনগণের বা গণতান্ত্রিক সরকার অভিধায় চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ মূলগতভাবে সরকার কেবল গঠন নয়; যেভাবে মোবাইল বা প্রযুক্তির সহায়তায় সংসার চালায়, নির্দেশ দেয়; সেভাবেই সমকালীন বাস্তবতায় জনগণ সরকার চালানোর সক্ষমতায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা স্বকীয় বোধের স্বীকৃতিতে যে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ জনগণের সরকার অভিধা পেয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা আর গণতান্ত্রিক বা জনগণের সরকার অভিধা পেতে পারে না বরং ব্যাপক জনমতকে অস্বীকার ও এড়িয়ে যাওয়ার অপরাধে অপরাধী হয়ে ওঠে।

 

অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উত্তরণে আজকের পৃথিবীর মানুষ কেবল সরকার গঠন করার অধিকার নয়, বরং সরকার চালনার অধিকারে নির্দিষ্ট এবং যে-কোনো গুরুত্বপূর্ণ (জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সীমানাতেই) সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই ব্যাপক জনমতের রায় প্রদান তথা শাসনকার্যে অংশিদারিত্ব আজ প্রত্যক্ষ ও প্রাত্যহিক হওয়ার মতো বাস্তবতা উঠে এসেছে।

 

সরকার সেক্ষেত্রে কেবল উক্ত রায়ের ‘সমন্বয় অনুবর্তী ক্রিয়া’র ভূমিকায় থাকবে অর্থাৎ যথার্থই জনমতের অনুবর্তিতাতেই কেবল সরকার ও তার ক্রিয়াশীলতা নির্দিষ্ট হবে। ‘কর্তৃত্ব’গত অবস্থানে এবার যথার্থই জনগণ বা জনমত থাকবে আর উক্ত জনমত বাস্তবায়ন তথা অনুবর্তিতায় কেবল সরকার।

 

অর্থাৎ আজকের বাস্তবতায়- জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যাই-হোক, রাষ্ট্রিক রূপ অর্থে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ‘সমন্বিত কর্তৃত্ব’-এর রূপ লাভ করবে।

 

সেক্ষেত্রে উক্ত কাঠামোগত ভূমিকা বা কার্যসীমানা দিয়ে সরকার ও তার প্রশাসনকে সংজ্ঞায়িত করলে-‘সিদ্ধান্ত’ প্রসঙ্গে জনমতের সমন্বিত ক্রিয়ায় কর্তৃত্বের বাহক হিসেবে নির্বাচিত হবে সরকার এবং Constant বা Continue (অদ্যাবধি সাধারণভাবে- ‘সরকার আসে- যায়, আমলারা থেকে যায়’, তাই কেবল বোধগম্যতার শর্তে Constant বা Continue শব্দ দুটি ব্যবহৃত) ভূমিকায় নির্দিষ্ট থাকবে প্রশাসন।

 

বর্তমান পৃথিবীতে- শাসনতান্ত্রিক বিধি-বিধান বা সংবিধান তথা রাষ্ট্রকাঠামোও সেকেলে হয়ে পড়েছে; যেখানে খোদ সরকার এবং প্রশাসনের বৈশিষ্ট্যই মূলগতঃভাবে ব্যাপক জনস্বার্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে। আজ তাই কাঠামোগত রূপান্তর অনিবার্য, যেখানে ‘জনগণ কেবল সরকার গঠন করবে না, সরকার চালনাও করবে; সরকার প্রসঙ্গে ভোট শুধু একবার নয় বরং সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বারবার’। অর্থাৎ এই প্রথম পৃথিবীতে বহুল কাঙ্খিত সেই সরকার ‘Government- of the people, by the people, for the people’ প্রতিষ্ঠার শর্ত উঠে এসেছে। প্রযুক্তিগত উত্তরণ সাযুজ্যতায় প্রয়োজন তাকে কাঠামোগত পথে যথাস্থ করা বা কাঠামোগত রূপান্তরে তাকে সুনিশ্চিত ও বাস্তবনিষ্টতায় নির্দিষ্ট করা।

 

[সরকার প্রসঙ্গে আব্রাহাম লিংকনের উপরিউক্ত উক্তিই গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বিশ্বে সর্বাধিক চর্চিত মন্ত্র এবং তা বিশ্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করাতে এক্ষেত্রেও বৈশ্বিক কাঙ্খা হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

বুদ্ধ থেকে গান্ধি বা মার্টিন লুথার কিং অহিংসার কথা বললেও যেমন তা প্রতিষ্ঠা পায় নি কারণ পৃথিবী সে বাস্তবতায় ছিল না, ঠিক তেমনি আজকে কোনো নীতি প্রতিষ্ঠায় রক্তের অনিবার্যতা বা হিংসার পথে গেলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য অর্থাৎ তা অবাস্তব হবে। এভাবে আব্রাহাম লিংকনের গণতান্ত্রিক সরকার প্রসঙ্গে উপরিউক্ত উক্তিকে শুভ প্রত্যাশা বলা গেলেও ইতিপূর্বের পৃথিবীতে তা ছিল বাস্তবায়ন-অযোগ্য- ইতিপূর্বের কোনো সরকার প্রসঙ্গে কেউ সে দাবী করলে যেমন তা ইউটোপিয়া হবে. ঠিক তেমনি বর্তমান পৃথিবীতে সেটা বাস্তবায়ন না করাটাই চরম বাস্তবতা বিরোধী, ভূতুড়ে আস্ফালন!]

 

স্বাভাবিকভাবে প্রচলিত রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাছে আধুনিক দুনিয়ার সাথে (Global Knowledge) জাতীয় বাস্তবতাকে সমন্বিত করে (Local Act) কাঠামোগত সংহতিতে জাতীয় অগ্রগায়নকে নিশ্চিত বা নির্দিষ্ট করা কেবল কঠিনই নয় বরং ‘কাঁঠালের আমসত্ব’ হওয়ার মতো অসম্ভব ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে।

 

রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট যা, তা-ই যদি রাজনীতি হয়; তবে নিরেট জনসংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রিক সীমানায় থাকে কেবল সংসদ ও সংবিধান হয়ে আদালত। তাই সেকেলে রাজনীতির যৌক্তিক পরিণতি অর্থেই আজ রাজনৈতিক প্রত্যক্ষতায় আসে সংসদ এবং পরোক্ষতা বা ন্যায্যতার বিহিতে থাকে আদালত।

 

....কিন্তু বর্তমান রাজনীতি শুধু এখানে থাকলে তাকে আর রাজনীতি বলা যাবে না। কারণ- বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় সহ শিক্ষা, ব্যাংক ও বীমা, নিরাপত্তা (সিকিউরিটি ফার্ম), স্বাস্থ্য খাত বেসরকারী মালিকানায় অর্থাৎ ব্যক্তি এখন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠান। আর ব্যক্তি যে অর্থে যেভাবে প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি সমাহারে সংঘবদ্ধ রূপ বা সংগঠনকেও সেই অর্থে আরও বৃহৎ প্রতিষ্ঠান (গ্রেট ইন্সিটিটিউশন) হয়ে উঠতে হয়- তা না হলে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান হওয়ার পথ ধরে রাষ্ট্র আজ যেভাবে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে; তেমনি নতুন বাস্তবতায় তাকে সংগত ও সংহত করার জন্যে যে সংগঠন, সেটিও ব্যক্তিরই পকেটস্থ হয়ে পড়বে। এটা বিত্তকেন্দ্রিক শ্রেণী বিভাজন থেকে উদ্ভূত না, তাই পুরোনো শ্রেণীতাত্ত্বিক ছকে এর বিশ্লেষণ অবান্তর- বিষয়টা সমকালীন দুনিয়ার বাস্তবতা ও তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমানের রাজনৈতিক ‘সংগঠন-কাঠামো’ ও এর প্রাতিষ্ঠানিক চেহারাটাকেও হতে হবে ভিন্ন- প্রায় অনাগত রাষ্ট্রীয় চেহারার কাছাকাছি!

 

ফলে- রাজনীতি যদি প্রতিটা মানুষের নাগরিক সীমানাতেই শেষ হয়, তবে তাকে বিগত রাজনীতির যৌক্তিক পরিণতি বা বিধিসম্মত বলা গেলেও আধুনিক বাস্তবতায় তা খন্ডিত বা অংশ হয়ে পড়তে বাধ্য। সেদিক থেকে আজকের রাজনীতি কেবল নাগরিক সীমানাতেই নয় বরং মানুষের সামগ্রিক জীবনের সাথেই যুক্ত তথা সামাজিক জীবনের ব্যাপক আয়তনে বিস্তৃত- আর স্বাভাবিক ভাবেই সে রাজনীতিকে হতে হবে বৈশ্বিক।

 

তাছাড়া, ১৪০০ সালে আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সমগ্র বিশ্বের ভূপৃষ্ঠগত অস্তিত্ব বা আবিষ্কার সম্পন্ন হলেও সমগ্র মানবসমাজের পারস্পারিক সম্পর্কে অখন্ড বা বিশ্ব মানবসমাজের অস্তিত্ব ও চেহারাটা পেয়েছে প্রযুক্তিগত উত্তরণ মারফত বর্তমানে এবং তা বড়জোর ৫০ বছর পেরিয়েছে কিনা সন্দেহ। তাই বিগত সভ্যতায় যে রাজনীতি, তা সমাজসংশ্লিষ্ট আয়তনে যুক্ত হওয়ার প্রসঙ্গটা অবান্তর কিংবা সেটাকে সমাজসংশ্লিষ্টতায় যুক্ত করা হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ এবং তা কেবল রাষ্ট্রতাত্ত্বিকতায় মূলত কাঠামো সংশ্লিষ্ট হয়েই সংজ্ঞায়িত হতে পেরেছে।

 

অর্থাৎ ইতোপূর্বে বৈশ্বিক মানবসমাজের পূর্ণাঙ্গ চেহারাটা ছিল না বলেই- রাজনীতি বা রাষ্ট্রতাত্ত্বিকতাকে জাতীয় বা কোন নির্দিষ্ট ভূখন্ডভিত্তিক হতে হয়েছে। এ কারণে কমিউনিজম মতাদর্শগত ভাবে বৈশ্বিক হলেও চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, কোরিয়া বা পৃথির্বীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূখন্ডের দেশসমূহে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কারণ যতোটা না ভাবাদর্শিক- তারচেয়েও বস্তুগত বা মূলগত শর্তে ছিল ‘জাতীয় বা ভূখন্ডগত দিক’। এমন-কি এদেশে মার্কসীয় দলসমূহের এতো ভাঙ্গা-গড়ার ক্ষেত্রে ‘জনগণতান্ত্রিক’ বা ‘সমাজতান্ত্রিক’ রণনীতি প্রসঙ্গটা এতো প্রাসঙ্গিক হলেও তা মূলত এই দিকটার সাথে যতোটা যুক্ত, মতাদর্শের সাথে ততোটা নয়!

 

সেই সাথে সমগ্র মানবসমাজের বৈশ্বিক চেহারা অস্তিত্বপূর্ণ হওয়া মাত্র (যে অর্থে যতোখানি) রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট রাজনীতি তার অভ্যন্তরস্থ হতে বাধ্য এবং সমাজের আওতাভুক্ত বা সমাজের সীমানা যুক্ত হয়েই তাকে এগুতে হবে, না হলে তা অসম্পূর্ণ অথবা সমাজবিচ্ছিন্ন হয়েই থাকতে হবে। জ্যামিতিক চিত্রায়নে বলা যায়, এক বা একাধিক বিন্দুকে, বিন্দু বলা গেলেও সেই বিন্দু বা বিন্দুসমূহের চতুর্পাশ্বে বৃত্ত অঙ্কিত হওয়া মাত্র তাকে আর শুধু বিন্দু বলা যায় না বরং তাকে বলতে হয় বৃত্তস্থিত বিন্দু বা বিন্দুসমূহ এবং ঐ বিন্দু বা বিন্দুসমূহের অস্তিত্ব, অবস্থান ও ক্রিয়া ঐ বৃত্তের সাপেক্ষেই নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট হয়। কারণ- ‘মানুষ’ শব্দটার সাথে জীবগত বৈশিষ্ট্য থাকলেও ‘মনুষ্যত্ব’ শব্দটা যুক্ত হলেই সমাজ তথা সমাজবদ্ধতার শর্তটাই যুক্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সমাজবদ্ধ মানুষ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিধায়, এর বাইরে গেলে এরিস্টটলের ভাষায়- ‘হয় সে পশু, নয় সে দেবতা’।

 

সুতরাং সমাজ সংশ্লিষ্ট যা, তা যদি সংস্কৃতি হয় এবং রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট যা, তা যদি রাজনীতি হয়- তবে স্পষ্টতঃই রাজনীতি সংস্কৃতির অংশ তথা অনিবার্যভাবে সংস্কৃতির সাথেই যুক্ত। অর্থাৎ যথার্থ বা পূর্ণাঙ্গ রাজনীতি সমাজায়তনে যুক্ত থাকতে বাধ্য আর এই সংযুক্তির কারণেই তা কখনোই জাতীয় রাজনীতির সীমানায় হতে পারে না বা থাকতে পারে না। মানবসমাজ বা সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টতার কারণেই তা আজ বৈশ্বিক এবং সেক্ষেত্রে বিশ্বের চলমান সংকট- ‘একক বা অখণ্ড কাঠামো’গত দিকের সমাধান করেই তাকে এগুতে হবে। এটাই বর্তমান দুনিয়ার যে-কোন রাজনৈতিক ভাবাদর্শের জন্যে চ্যালেঞ্জ- যা পূর্বে পৃথিবীর কোনো ভাবাদর্শের জন্যে ছিল না; বিশেষতঃ রাজনৈতিক ভাবাদর্শের জন্য তা আজ বিজ্ঞাননিষ্ট প্রামাণিকতার সমার্থক হয়ে পড়েছে।

 

অতএব, ইতিহাসনিষ্ঠ আধুনিক রাজনৈতিক ধারার শ্রেষ্ঠ উচ্চারণ আজঃ

(i)     সচেতন সামাজিক শক্তি (Social Power With Knowledge)’র সংঘবদ্ধতা বা সাংগঠনিক শক্তিই যেমন ‘স্থানীয় সরকার ভিত্তিক জাতীয় সরকার’-এর ডাক, তেমনি জ্ঞানে বৈশ্বিক, প্রয়োগে স্থানিক (Global Knowledge Local Act)- নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক শর্তেই রূপান্তরিত হয়- March for Bangladesh-এ।

(ii)   ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের একটি মাত্র ধারা (৬০ ধারা)’ বাস্তবায়নই আজ মুক্তিজোটের ‘এক দফা, এক দাবী’ হিসেবে গৃহীত। কারণ- দেশজ বোধে (Local Act) সেটাই বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ-এর সংগঠন-কাঠামো বাস্তবায়নের পথে ‘অখণ্ড বৈশ্বিক কাঠামো’(Global)-র পরিণতিকেই নির্দেশ করে।

 

সেক্ষেত্রে, বৃটিশ ভারত হতে প্রাপ্ত উপমহাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ধারায় একমাত্র বঙ্গীয় রাজনৈতিক ধারাটিই ছিল যথাযথ- যার সফল পরিণতিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ; সে অর্থে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক ধারাটিই ছিল একমাত্র আধুনিক রাজনীতির বৈশিষ্ট্যে উন্নত ও অগ্রগামী রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পন্ন। যদিও স্বাধীনতার পরপরই যথার্থ সে রাজনৈতিক ধারা বহুভাগে বিভ্রান্ত, বিচ্যুত হলেও আগামীকে ভেতর থেকে দেখার সম্ভাবনায়- আজও এদেশটিই এগিয়ে।

 

কারণ- রাষ্ট্রতাত্ত্বিক দৃষ্টান্তে সামাজিক শক্তি ও তার সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দিশায় ’৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই এক প্রামাণিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে, আর তা হলো- দল-মত নির্বিশেষে সামাজিক সংঘবদ্ধতা ও তার সাংস্কৃতিক পরিণতিতেই এক দিকে যেমন যথার্থ রাজনীতির পথ ধরে ’৭১-এ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়, অপর দিকে ’৫২-এর সেই ভাষা আন্দোলনই বা স্থানিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামই আজ ন্যায্যতা বিধানে বৌদ্ধিক শর্তে সমগ্র বিশ্বের হয়ে উঠেছে।

 

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাকে যথার্থতায় স্থাপন করে বাংলাদেশ কেবল এই উপমহাদেশ নয় বরং চলমান বিশ্ব রাজনীতির সংকট সমাধানে মহান এক শুভ উদ্বোধক হয়ে উঠুক, আর মহতী সেই রাজনৈতিক দিশায় পৃথিবী জেগে উঠুক!

 

পুনশ্চঃ

দেশ যদি সাধু-সন্ততে ভরে যায় আর রাজনীতিটা পচে ওঠে- তবে দেশ ডুবে যাবে আর দুর্বৃত্তচারিতায় দেশ ছেয়ে গেলেও রাজনীতিটা উন্নত হলে অচিরেই দেশ বেঁচে উঠবে। অনেক কিছু না থাকলেও একটি দেশ চলতে পারে, কিন্তু রাজনীতি না থাকলে সে দেশ অচল হয়ে পড়ে। তাই রাজনীতির বিকল্প কেবল রাজনীতিই, রাজনীতির বিকল্প কখনই রাজনীতিহীনতা নয়।

 

রাজনীতিকে বদলাতে কেউ যদি রাজনীতিহীনতার কথা বলে, তবে সে মিথ্যা বলে কিংবা নিজের অজ্ঞাতে দেশবিরোধী ভ্রষ্টাচারকে আমদানী করে বসে। সত্য হলো, রাজনীতিকে বদলানোর জন্য থাকে কেবল রাজনীতিই। তাই আপনি চাইলেও রাজনীতির বাইরে ও বিপরীতে গিয়ে দেশকে বাঁচাতে পারবেন না, কারণ দেশ রাজনীতি মারফত বাঁচে।

 

মৃতরা জাগতেও পারে না, জাগাতেও পারে না কিন্তু ঘুমন্ত মানুষ কাউকে জাগাতে না পারলেও জেগে ওঠে, শেষ পর্যন্ত জীবনের প্রয়োজনে জীবিতদের জাগতেই হয়! এভাবে যা ‘অ-প্রয়োজনীয়’, মানুষ তা ঝেড়ে ফেলে আর যা ‘প্রয়োজনীয়’, তা প্রতিষ্ঠা করে; কারণ-জাগরণের মধ্যেই থাকে জীবনস্ফুরণ; বিগত ও নতুন রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য। তাই শবাধারের মাছি হয়ে বসে থাকার চেয়ে নতুন দিগন্তের সওগাতবাহী হওয়া শ্রেয়। কেবল দায়ী করার করার মধ্যে রাজনীতি থাকে না, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব পালনের মধ্যেই থাকে দেবত্ব; দেশ ও মানুষ বোধে যথার্থ রাজনীতি দেবত্বের সমার্থক ॥