[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

কমিটি গঠন-এ ‘নেতৃত্ব’ নির্বাচনের মানদণ্ড

 

[অত্র সংগঠন পরিকাঠামো বা গঠনতন্ত্র স্বতন্ত্র এবং পরিভাষাগতভাবে সুনির্দিষ্ট বিধায় স্পষ্টীকরণে ব্যবহৃত শব্দ, ভাষা ও ব্যাখ্যারীতি বা বাক্যে ভিন্নতর; অর্থাৎ মূলগত অর্থে ব্যবহৃত শব্দগুলো প্রত্যয় অর্থে বিধৃত।]

 

সংগঠন-এর মানদণ্ড ‘মতাদর্শ’ এবং সংগঠক বা সাংগঠনিক চরিত্র বিশ্লেষণের মানদণ্ড ‘পারিবারিক’ ও ‘আর্থিক দিক’ [ফিরে দেখা-১২ বছরঃ পৃষ্ঠা নং-১৩৩ (সাংগঠনিক রিপোর্ট ২০০৪; প্রথম ধাপের চতুর্থ রিপোর্ট)]। পূর্বঘোষিত অন্তর্বীজ সভ্যদের মধ্য থেকে বর্তমান খসড়া কমিটি গঠন বা নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পূর্বের ন্যায় মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে (i) অনুশীলনগত সময় (সাংগঠনিক ফিল্ড বা কনস্ট্যান্ট প্রাকটিস)-এর সাথে সাথে (ii) পরিবার সংশ্লিষ্টতা (নীতিগত দিক) এবং (ii) আর্থিক সম্পৃক্ততা (অনুশীলনগত দিক)-কে গ্রহণ করে ‘খসড়া’ কেন্দ্রীয় কমিটি তথা সংগঠন-কাঠামোর সকল দায়িত্বে পদাধিকারীগণকে নির্দিষ্ট করা হচ্ছে-

 

১. সময়ঃ

বহুদলীয় গণতন্ত্র বা সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় সাধারণত দলগুলো নির্বাচিত হলে- সংসদে বা সরকার চালনায় নিজ নিজ দলীয় নীতি আদর্শের প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু যেসব নেতৃত্ব সংগঠন সম্পৃক্ততায় সাংগঠনিক নীতি আদর্শের অনুশীলনে ন্যুনতম সময় অতিক্রান্ত করেননি তাঁরা দলীয় ম্যান্ডেটে রাতারাতি এমপি-মন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারলেও সংসদে বা সরকারে কি করে নিজ দলীয় আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে পারেন?

 

আন্দোলন-সংগ্রাম বা দলীয় কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে কেবল দলীয় নীতি আদর্শই নয় বরং জনসম্পৃক্তকরণের শর্তও পূরিত হয়। সেক্ষেত্রে রাতারাতি এমপি-মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দলের মধ্যে দলীয় নীতি আদর্শের সাথে অসম্পর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটে; যা চলতি কথায় হাইব্রিড নেতা ও নেতৃত্ব হিসেবে পরিচিত। যদিও প্রত্যেক দলেরই নীতি প্রতিষ্ঠায় কিছু কৌশলগত দিক থাকে যা অনেক সময়ই বোধগম্য হয় না। তাই হঠাৎ করে যেমন কেউ নেতা হয় না, তেমনি দায়িত্বগত ক্ষেত্রে যেই আসুক তা দলীয় স্বার্থ ও শর্তেই আসে। কিন্তু নীতির চেয়ে কৌশল যখন বড় হয়ে ওঠে এবং তা বেশি বেশি ঘটে তখনই রাজনীতি প্রসঙ্গে এমন অনাহুত বাজারী শব্দ উঠে আসার সুযোগ পায়।

 

বলা বাহুল্য, প্রচলিত এই বাস্তবতার প্রসঙ্গেই কেবল নয়, মুক্তিজোট প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকেই ‘সময়’-কে নেতৃত্ব নির্বাচনের মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেছে প্রকৃতি অনুবর্তী নীতি বা বিজ্ঞান নিষ্ঠতার কারণে।

 

‘জন্ম নেয়ার সময়’-এর উপর কারও হাত নেই। যে কারণে বচনে বলা হয় ‘কাল স্রষ্টার হাতিয়ার’ এবং আমরাও বলি কে অগ্রগামী অথোরিটি বা নেতৃত্ব তা কারও ইচ্ছা সাপেক্ষ নয়। কারণ ওটা সময় দ্বারা নির্দিষ্ট। অর্থাৎ একই স্থান, কাল, পাত্র সাপেক্ষে একটাই সত্য। আকৃতি বা ফেনোমেননগত পার্থক্য তথা একজনের চেহারার সাথে আরেকজনের চেহারা কিংবা একটা বস্তু আরেকটা বস্তুর মতো হুবহু হতে পারে না। আকৃতি বা প্রকাশগত এই স্বতন্ত্রতা প্রকৃতিগত বলেই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই ইউনিক বা একক, কারণ তার মতো কেউ পৃথিবীতে আসেনি আর কেউ আসবেও না। প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুরই পারস্পারিকতায় তাই ‘ক্রম’ অনিবার্য। প্রকৃতি তথা বিজ্ঞাননিষ্ঠ মতাদর্শিক দিশা অনুসারে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধতা বা সংগঠন বলেই মুক্তিজোট-অথোরিটি বা চেইনভিত্তিক। সেক্ষেত্রে অথোরিটি নির্ণয়ে সময় প্রাথমিক ও নৈর্ব্যক্তিক মানদণ্ড ।

 

অথোরিটি-অনুগামী বা নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত এই নৈর্ব্যক্তিক শর্ত- যা সংগঠকদের ন্যূনতম আদর্শগত মান তথা সদস্যপদ লাভের প্রাথমিক ও মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে গৃহীত। প্রচলিত সিনিয়র-জুনিয়র, অর্থ-বিত্ত কিংবা পেশাগত মানদণ্ড এক্ষেত্রে কোনভাবেই বিবেচ্য নয়। অর্থাৎ সময়ের মানদণ্ডে ‘পূর্বতন সংগঠক পরবর্তী সংগঠকের জন্য অথোরিটি হিসেবে নির্দিষ্ট’ এবং সময় বা নৈর্ব্যক্তিক মানদণ্ড দ্বারা নির্দিষ্ট বলেই চাপিয়ে দেয়া চেইন বা শৃংখলা বোধ নয় বরং স্বতঃস্ফূর্ততায় তা প্রতিষ্ঠা পায়।

 

এক্ষেত্রে সময় পাশাপাশি অবস্থানকে নয় বরং ক্রমাবস্থানকে নির্দেশ করে বিধায় অথোরিটি সময়ের প্রতিভূ আর্থে ‘পূর্বতন’ শর্তে ‘নির্দেশদাতা’র ভূমিকায় নির্দিষ্ট থাকেন। অর্থাৎ অথোরিটি ‘কেন’ নির্দেশ দিচ্ছেন সে প্রশ্নটা এখানে অবান্তর বরং ‘কি’ নির্দেশ দিচ্ছেন দায়িত্বগত শর্তে সেটাই প্রাসঙ্গিক। সুইপার অথবা মন্ত্রীত্ব অথোরিটির নির্দেশ অর্থে অনুগামীর জন্য উভয়ই সমার্থক, কেবল ‘দায়িত্ব’ অর্থেই তা নির্দিষ্ট এবং সেটা পালনের মধ্যেই অনুগামীর স্বকীয় দক্ষতা। সেক্ষেত্রে নির্দেশদাতার অর্থে আদর্শিক স্তর বা নীতিগত দিক থেকে যিনি অথোরিটি, কাঠামোগত দায়িত্ব পালনে তিনিই অনুগামী। এভাবে সংগঠন-কাঠামোর সকল পদ-পদবী  দায়িত্বগত অর্থে নির্দিষ্ট বিধায় কাঠামোগত বা Rank and File- এ নির্দিষ্ট প্রত্যেক অথোরিটি অনুশীলনগত শর্তে অনুগামীর শর্তকে বহন করেন। অর্থাৎ অনুশীলন বা প্রায়োগিকতায় অথোরিটি অনুগামী সমার্থক।

 

২. পারিবারিক দিকঃ

‘... পরিবার সমাজিক কোষ।’ [সাংগঠনিক রিপোর্ট ২০০৪ঃ প্রথম ধাপের চতুর্থ রিপোর্ট; ফিরে দেখা ১২ বছর; পৃষ্ঠা- ১১৯]

 

যে অর্থে একা নয় অর্থাৎ ‘সংবদ্ধ’, সেই অর্থেই সংগঠন; যে অর্থে ব্যবস্থাপনা বা সমন্বিত- সেই অর্থেই কাঠামো এবং যে অর্থে পরিবার, সেই অর্থেই সমাজ এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত সামগ্রিক জীবনের শর্তেই সংস্কৃতি; আর তা জীবিত মানুষকে ঘিরে বলেই জীবনাচারে সে আদর্শ প্রতিফলিত।

 

তাই সংগঠনের প্রতিটি সভ্যই সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শুরুতেই মহান স্রষ্টায় সমর্পিত হয়ে- মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে আদর্শে লীন হওয়ার শপথে সাংগঠনিক জীবনে পথচলা শুরু করেন। অর্থাৎ সমগ্র জীবনই সাংস্কৃতিক সংগ্রামের আওতাভুক্ত করে নিজেকেই আদর্শিক দৃষ্টান্ত করার শপথে পথ হাঁটেন। একারণেই মুক্তিজোট কাঠামোগত প্রতিটি দায়িত্বে ঘোষিত সাংগঠনিক অবস্থানে নির্দিষ্ট প্রত্যেক সংগঠক প্রসঙ্গে উচ্চারণ করে ‘তিনি ব্যক্তি নন- সংগঠন’।

 

পরিবার বিচ্ছিন্নতায় একটি দল গঠন করা সম্ভব হলেও, কোনো সংগঠন যখন ‘সচেতন সামাজিক শক্তি’ (Social power with knowledge)-এর উত্থানে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরে সংগঠন গড়ে তোলার ঘোষণা দেয় তখন পরিবার সম্পৃক্তাতা হয়ে ওঠে তার নীতিগত দিক এবং বিগত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ ধরে যখন আজ সংগঠন গড়ে উঠেছে আর তার রাজনৈতিক সংগ্রামে লক্ষ্য নির্দিষ্ট হয়েছে ‘সচেতন সমাজিক শক্তি’ (Social power with knowledge)- এর শাসন প্রতিষ্ঠা তখন বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ-এর সংগঠন-কাঠামোর দায়িত্বে তথা নেতৃত্ব নির্দিষ্টকরণে সেই পরিবার সম্পৃক্ততার মানদণ্ডে পূর্বের ন্যায় এখনও সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তা সংস্কৃতির শর্তজাত বা নীতিগত- যা সর্বদাই অনিবার্য শর্তে বিদ্যমান।

 

৩. আর্থিক দিকঃ

অর্থের উৎস বা অর্থায়ন কোথা থেকে হচ্ছে, কিভাবে চলছে, তা দিয়ে যেমন বুঝা যায় কোন সংগঠন/প্রতিষ্ঠান কোন স্বার্থে, কার স্বার্থে স্বক্রিয় আছে; তেমনি জাতীয় ক্ষেত্রে কোন সংগঠন কতখানি দেশের আর কতখানি পরের, তা বুঝতেও আজ এটা জানা জরুরী হয়ে পড়েছে।

 

গঠনতন্ত্র- ১০/(২) এ ঘোষিত আর্থিক নীতি অনুসারে বলা আছে (ক) পরনির্ভরশীলতাই জাতীয় জীবনে বড় পঙ্গুত্ব, অন্যের পকেট ও অন্যের মগজ উভয় পথই নিজের দেশ ও সংগঠনের জন্য অভিশাপ। দেশজ বোধে স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন সংগঠন গড়ে তুলতে হবে নিজেদের পায়ে ভর দিয়েই। তাই চেতনা বা সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শর্তে সর্বাগ্রেই জরুরি হয়ে উঠেছে স্বনির্ভরতা এবং নিজের দেশ ও সংগঠনকে অপরের পকেটস্থ হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে গৃহীত আর্থিক নীতি- ‘আপন দেশ, আপন অর্থ, আপন সংগঠন’। (খ) সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে সংগঠন যেহেতু শ্রমসংস্কৃতি গড়ার শর্তে ঘোষণা করেছে- “শ্রমবর্জিত চেতনা আর চেতনাবর্জিত শ্রম পঙ্গু ও অসম্পূর্ণ”, সেহেতু স্বনির্ভরতার নীতিগত শর্ত ও প্রতিটি সভ্যের শ্রমসম্পৃক্ততায় নিজেদের উপার্জন/অর্থ দিয়েই সাংগঠনিক কর্মকান্ড চালাবে।

 

সংগঠকদের অর্থায়ন কেবল সংগঠনের ব্যয় ভার মেটানোর অর্থকেই প্রকাশ করে না বরং তাঁদের মতাদর্শিক বিশ্বাসের প্রামাণিক সক্ষমতা এবং ধার-দেনা তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রকাশ করে, কারণ অজ্ঞাতকুলশীলকে কেউ ধার দেয় না। তাই ‘সচেতন সামাজিক শক্তি(Social Power with Knowledge)- এর উত্থান ও তার নেতৃত্ব গড়ে তোলার ঘোষণায়- যে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, সেখানে সংগঠকরা আর্থিক শেয়ারে না আসলে কোনো সংগঠকের সাংগঠনিক চরিত্র  বা দায়বদ্ধতার দিকটি অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তাছাড়া সংগঠনের বিস্তার ঘটলেও ‘আপন দেশ, আপন অর্থ, আপন সংগঠন’এর নীতিগত দিকটা যথাযথ প্রতিফলিত হয় না- ফলে স্বকীয় নেতৃত্বের গুণ সম্পন্ন সংগঠন গড়ে ওঠার পরিবর্তে পরনির্ভরশীল পঙ্গুত্বের দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

 

একটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের ‘নেতা হওয়া’ আর একটি ‘সংগঠন প্রতিষ্ঠা’ করা এক কথা নয়

 

আদর্শিক নেতৃত্বের গুণ সম্পন্ন একটি সুদৃঢ় সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষিত হওয়ার শর্তেই তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্তরে সর্বাগ্রে সর্ব প্রকার ডোনেশন গ্রহণ অস্বীকৃত বা রক্ষণশীলতাকে গ্রহণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ সম্পূর্ণ রূপে সংগঠকদের অর্থায়নে সংগঠন প্রতিষ্ঠার নীতি ঘোষিত ছিল বা সংগঠকদের ভূমিকা ও সংগঠনিক চরিত্র নির্দিষ্টকরণে এটা মানদণ্ড হিসেবে গৃহীত ছিল এবং সে আন্দোলন-এর পরিণতি অর্থেই- ‘বর্তমান সংগঠন ও তাঁর নেতৃত্ব’ তথা বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি বিধায় উক্ত মানদণ্ড এক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল থেকেছে- যা আগামীতে থাকবে না।

 

কারণ ‘সংগঠন’ তার প্রতিষ্ঠাকালীন বা গড়ে উঠার পর্যায় পেরিয়ে এসে বর্তমানে রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক স্তর ঘোষণা করেছে; অর্থাৎ আজকের সংগঠন কোটি কোটি মানুষের বা সবার সংশ্লিষ্টতাকে ঘোষণা করেছে ।

 

উপরোক্ত তিনটি মানদণ্ডে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত পদাধিকারীগণকে নির্দিষ্ট করা হল।

 

                                        প্রাসঙ্গিক কিছু কথাঃ

 

কেউ নিজের বিষয়-সম্পত্তি সর্বস্ব দিয়েই রাজনীতি করছেন, আর কেউ রাজনীতি করে বিত্ত-বৈভব, গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছেন- কোনটা রাজনীতি আর কোনটা বেনিয়াবৃত্তি?

 

শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থা মারফত একটি জাতি ও জাতীয় জীবন গড়ে ওঠে, এগিয়ে যায়। কিন্তু ‘এক দেশ- এক ভাষা’ হওয়া সত্ত্বেও এদেশটি আজও একই নাগরিক বোধে- স্থিত হতে পারেনি। কারণ বিগত সরকারগুলো বারো পদের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক মননকে বিভক্ত করে ফেলেছে; ইতোমধ্যে জঙ্গিবাদসহ বহুবিধ নৈরাজ্যের পথ ধরে এর প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে। আর এটা বিগত সরকারগুলোর রাজনীতিহীনতারই কুফল। উল্লেখ্য, আর্থিক মন্দা বিশ্বের অন্যত্র হানা দিলেও এ দেশকে যেমন স্পর্শ করেনি, তেমনি জঙ্গিবাদ বিশ্বের অন্যত্র ঘটলেও সমতল ভূমির ‘এক ভাষার- এক দেশ’ হিসেবে বাংলাদেশে হওয়া সম্ভব নয়।

 

রাজনীতি করতে ও বুঝতে কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে যাদের ইতিহাস জানা দরকার নেই- তারা লাভ-লোকসান বা ইনভেস্টমেন্ট-রিটার্নের বাইরে এসে রাজনীতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য করতেই যেন ভুলে যান। অথচ যখন কোনো দল সদস্যদের অর্থায়নে চলে না, তখন দলটি চলছে কার অর্থায়নে, কার স্বার্থে? দলের নামে তারা কার ভাড়াটে? এ প্রশ্ন তাঁদের মাথায় আসে না কিংবা এড়িয়ে যান।

 

কিন্তু আজকের বাস্তবতায় কেবল রাজনৈতিক সংগঠন নয় বরং জরুরী হয়ে পড়েছে যেসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যাঁরা দেশ-মানুষ ও রাজনীতি সংশ্লিষ্টতায় কাজ করেন তাঁদের অর্থায়ন প্রসঙ্গে দেশবাসীকে স্বচ্ছ করা। কারণ মিডিয়ার বর্তমান যুগে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান গুরুত্ববহ আর রাজনৈতিক ভাবে দূর্বল ও অপরিণামদর্শী সরকার আমলে দেশ ও দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি প্রসঙ্গে সহজেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিকতার তকমা ফেঁদে উপদেশ আমদানি-রপ্তানী ও চাউর করা যায়- পক্ষান্তরে যা এদেশকে ‘অকার্যকর রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখানোর পুথিঁ-পাঁজি মাল-মসলা বানানোরই নামান্তর। অথচ আমাদের মতাদর্শিক দিশা  অনুসারে, চরম সত্য হলো বর্তমান বিশ্বে যতবড় পরাশক্তিই হোক- যুগ বাস্তবতায় রাষ্ট্র হিসেবে তা ইতিমধ্যে অকার্যকর Institutionally dead and expired । সুতরাং কোনো রাষ্ট্র অপর কোনো রাষ্ট্রকে আজ আর ‘অকার্যকর রাষ্ট্র- ‘Failed state’ হিসেবে চিহ্নিত করার সক্ষমতা রাখে না।

 

তথাপিও দেশকে বিরাজনীতিকরণের অংশ হিসেবে এরা দেশজ আর্থিক তথা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তো বটেই, ইতোমধ্যে বিগত সরকারগুলোকে দিয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে বন্ধ করাতে পেরেছে, এমনকি মূল সংগঠন থেকে অঙ্গ সংগঠনগুলোকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে অথচ রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসারে অঙ্গ সংগঠনগুলো মারফতই জাতীয় জীবনের দাবিগুলো উঠে আসে আর মূল সংগঠন মারফত তা বাস্তবায়িত হয়। আর সে শর্তেই জাতীয় নির্বাচনের সময় মূল সংগঠন ও অঙ্গ সংগঠনগুলো এক প্রতীকে এক ব্যানারে একটিই দল হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে অঙ্গ সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্ন হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটাই এলোমেলো হয়ে পড়ে তথা জাতীয় রাজনীতিটাই ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ে; অন্যদিকে ছাত্র সংসদ বন্ধ করে দেওয়া মানে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রকে রুদ্ধ করে ফেলা আর এই রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্বের পথ ধরে ক্রমশ জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে মেধা শুণ্য নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটে; ক্যাম্পাসগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অন্ধকারাচ্ছন্ন স্যাঁতস্যঁতে- যেখানে জীবাণুরা বাসা বাঁধে; আজকের জঙ্গিত্বকে এর বাইরে ভাবার কোন সুযোগ নেই।

 

অর্থাৎ এটা এযাবৎকাল ক্ষমতাসীন হওয়া সরকারগুলোর রাজনীতিহীনতা আর উপদেশ খয়রাতিরই বহিঃপ্রকাশ!

 

ক্ষমতার অলিন্দে বসে দল গড়া- দল করা অথবা দল ভেঙ্গে নতুন দল গঠনের তথাকথিত রাজনীতির বরপুত্র আর কপালওয়ালা কাপালিকদের কথা বাদ দিলে- বেশির ভাগ বর্ষীয়ান নেতৃত্ব যাঁরা রাজনৈতিক ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে এখনও আমাদের দেশে বর্তমান; যাঁরা জানেন সংগঠনের আর্থিক ফান্ড যোগাড় করতে গিয়ে নিজেদের পৈত্রিক সম্পদ তো বটেই এমনকি -ধার-দেনাসহ ছাত্র অবস্থায় পাঠ্য বই পর্যন্ত বিক্রি করেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের পথে নিয়মিত ছাত্রত্বও না থাকায় জেল খানায় বসেই পরীক্ষা দিয়েছেন- তাঁরা সহ দেশবাসী নিশ্চয়ই বুঝবেনঃ

 

“বর্তমান বাংলাদেশে যে কোনো সময় ও যে কোনো কিছুর চেয়ে জরুরী হল- রাজনীতি”।

 

দেশ যদি সাধু-সন্ততে ভরে যায় আর রাজনীতিটা পঁচে ওঠে- তবে দেশ ডুবে যাবে; আর দুর্বৃত্তচারিতায় দেশ ছেয়ে গেলেও রাজনীতিটা উন্নত হলে অচিরেই দেশ বেঁচে উঠবে। অনেক কিছু না থাকলেও একটি দেশ চলতে পারে, কিন্তু রাজনীতি না থাকলে সে দেশ অচল হয়ে পড়ে। তাই রাজনীতির বিকল্প কেবল রাজনীতিই, রাজনীতির বিকল্প কখনই রাজনীতিহীনতা নয়।

 

রাজনীতিকে বদলাতে কেউ যদি রাজনীতিহীনতার কথা বলে, তবে সে মিথ্যা বলে কিংবা নিজের অজ্ঞাতে দেশ বিরোধী ভ্রষ্টাচারকে আমদানী করে বসে। কারণ রাজনীতিকে বদলানোর জন্য থাকে কেবল রাজনীতিই। তাই আপনি চাইলেও রাজনীতির বাইরে ও বিপরীতে গিয়ে দেশকে বাঁচাতে পারবেন না কারণ দেশ রাজনীতি মারফত বাঁচে। শবাধারের মাছি হয়ে বসে থাকার চেয়ে নতুন দিগন্তের সওগাতবাহী হওয়া শ্রেয়। ঘুমন্ত মানুষ কাউকে জাগাতে পারে না, কিন্তু জাগতে পারে, মৃতরা জাগাতেও পারে না, জাগতেও পারে না। কেবল দায়ী করার মধ্যে রাজনীতি থাকে না, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব পালনের মধ্যেই থাকে দেবত্ব ॥

 

কেন্দ্রীয় কমিটি