[ আমরা সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে, মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহতী সংগ্রামে- আমাদের আদর্শিক সত্তা ও সমন্বয়ক দিশারী শ্রদ্ধেয় ‘বড়দা (আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ রাজু শিকদার)’র নির্দেশিত পথই- সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসেবে গৃহীত; সেই আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত। ]



মেনু

আহবান ও সংহতির ডাক

 

Procchod

 

Flag

 

 

আমাদের সম্মিলিত অনুশীলনের ভিত্তিতে মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আমাদের প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক ও পথ প্রদর্শক শ্রদ্ধেয় বড়দা (এ আর শিকদার-আব্দুর রাজ্জাক মুল্লাহ্‌ রাজু শিকদার)’র চিন্তাধারা ও নির্দেশিত পথই সংগঠন ও সংগঠন কাঠামোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দিশা হিসাবে গৃহীত। সেই  আলোকেই অত্র প্রকাশনা অনুমোদিত হল।

 

Mukhobondho

 

সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত এবং তা ‘তিনটি পর্যায়’-এ বিভক্তঃ ১. সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ২. রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ৩. সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন। প্রথম স্তর তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্তরের ডাক- ‘আহ্বান’ পাঠ সম্পন্ন না করলে দ্বিতীয় স্তর তথা উত্তরিত বর্তমান রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক স্তরের আহ্বান- ‘সংহতির ডাক’ এর যথাযথ অনুধাবন বা বোধগম্যতা স্পষ্ট হয় না বিধায় ‘আহ্বান’‘সংহতির ডাক’ যৌথভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাই ‘আহ্বান’ পড়া সম্পন্ন করার পরেই কেবল ‘সংহতির ডাক’ পাঠ বাঞ্ছনীয়।

 

 

ভূমিকা

 

 

পৃথিবীর সমস্ত দেশে পরিবর্তনের ঝাণ্ডা প্রথম যারা হাতে তুলে নেয়, তারা ছাত্র-যুব-তারুণ্য। বিশেষতঃ বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ এদেশের সংগ্রামের ইতিহাসে এমনভাবে জায়গা দখল করে আছে, যা দুনিয়ার অপরাপর দেশের সংগ্রামী ইতিহাসের ছাত্রদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশের পট পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ডাক ছাত্রদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে।

 

এদের থেকে উৎসারিত সংগ্রামের ধারা, খুব দ্রুত জনতার মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে গড়ে তোলে সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য জোয়ার। কারণ তথ্য বিযুক্ত, পরস্পর বিচ্ছিন্ন অসচেতন মানুষগুলোর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বিবেক হিসেবে ছাত্রসমাজকেই তারা অন্ধের যষ্ঠি মনে করেন। নিপীড়ন, নির্যাতন আর শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথিকৃৎ এই মহান ছাত্রসমাজ। সমস্ত পট পরিবর্তনের রক্তাক্ত বিনির্মাণের ভিত্তি রচিত হয়েছে যাদের অসীম সাহসে, তেজ-দীপ্ত দৃঢ়তায়, বুকের তাজা রক্তে, জাতির সেই বিবেক আজ যেন বিশ্বাসহীনতার অপরাধে অপরাধী। বিভ্রান্তির অন্ধকারে ক্রমশঃ ডুবে যাচ্ছে তারা ইতিহাসের চাহিদাকে ভ্রূকুটি কেটে। দুনিয়ার বুকে যারা একসময় বিস্ময় জাগিয়েছিল স্বাধীনতার এত বছর পর তারা বিশৃঙ্খল-বিপথগামী, নষ্ট-প্রজন্মরূপে ধরা দিচ্ছে। এদের চরিত্রে আজ কপটতা, স্বার্থপরতা, নির্লিপ্ততা থেকে শুরু করে নোংরা বৈশিষ্ট্যগুলো বাসা বাঁধছে।

 

বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ জাতির বিবেক। এক্ষেত্রে বিবেক বা ছাত্র বলতে কেবল শিক্ষায়তনভুক্ত নিয়মিত শিক্ষার্থীকেই নির্দেশ করে না, বরং তথ্য সংশিষ্ট প্রতিটি যুব-তারুণ্যকেও এদেশ- ‘ছাত্রসমাজ’ অভিধায় ভাবতে অভ্যস্ত- সেই অর্থেই এখানে ছাত্র বলতে সমস্ত যুব-তারুণ্যকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। আর তাই জাতির বিবেক ও বর্তমান বিকারগ্রস্ততার কারণ অনুসন্ধান না করতে পারলে জাতীয় জীবনের সমাধানকেও নির্দিষ্ট করা যাবে না। অর্থাৎ যুব-তারুণ্য যদি জাতির বিবেক ও ভবিষ্যৎ হয়, তবে তার উৎস খুঁজে বের করার মধ্যে এই ব্যাধি নিরাময়ের পথ, আমাদের বাঁচার পথ রয়েছে, আর আমরা না বাঁচলে জাতির বিবেক বিভ্রান্তির নরকে নিমজ্জিত হবে। এই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বর্জিত নারকীয়তার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের মহান ঐতিহ্যের প্রশ্নে, আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে অধঃপতিত শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নৈতিকতার সংকট প্রসঙ্গে আলোচনা প্রথম ও প্রধানতম জরুরী বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

 

অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দূষণ, নোংরামি ছড়িয়ে পড়েছে তার বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে গর্জে না উঠে বরং নির্লিপ্ত হয়ে গেছে বা এই নোংরামির বিপাকে নিজেরা ডুবে যাচ্ছে। নিজেদেরকে শিকারের প্রাণীতে পরিণত করছে।

 

 

কেন এমন হচ্ছে ?

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান সমকালীন দুরবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার বা বলি হচ্ছে যেখানে ছাত্র ও যুব সমাজ, সেখানে তারা এইসব সম্পর্কে, বেশিরভাগ অংশটা ভাবতে চাইছে না- শুনতে চাইছে না- কিছু করতে চাইছে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এদেশের চলমান শিক্ষা। সমাজজীবনের সর্বত্র এমন ধরনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যাতে আমরা এসব সমস্যা সম্পর্কে ভাবতে বা বুঝতে না শিখি। আপন স্বার্থ বোধকে রিয়েলিটি বা ইন্টেলিজেন্সি বলা হচ্ছে আর বাদ-বাকি পারস্পরিক সামাজিক বিষয়কে বোঝানো হচ্ছে ইমোশন, ফুলিশ ভোকাবুলারি! অর্থাৎ সমাজ ও সামাজিক মানুষের বিপরীতে সম্পূর্ণ অবাস্তব, মিথ্যা আর ভুল-ভ্রান্তিকর শিক্ষাই বিভিন্নভাবে গলাধঃকরণ করানো হচ্ছে। রিয়েলকে কথার কথা আর বাজে কথাকেই রিয়েলিটি হিসেবে দেখানোর এই অবক্ষয় ঘটাতে জাতীয় বা রাষ্ট্রিক শিক্ষাব্যবস্থাও কম যায় না, একই দেশ, এমন-কি তা স্বাধীন সার্বভৌম হওয়া সত্ত্বেও ১৪ পদের শিক্ষা ব্যবস্থায়- ১৪ কিসিমের নাগরিক বোধ গড়ে উঠতে দেওয়ায়-‘একই জাতীয় বোধ’ কিংবা ন্যূনতম নাগরিক সংহতি তথা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পূর্বশর্তটুকু গড়ে ওঠার ক্ষেত্রটিতেও বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে; অথচ গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চিৎকার চলছে চল্লিশ বছর! ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া, ডিম ছাড়া বাচ্চা, হাওয়ায় গাছ লাগানো- প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়া আমাদের নাগরিক বোধে কিছুই আশ্চর্য ঠেকে না, কোনো বিপরীত আর বৈপরীত্যই আমাদের বোধে বাঁধে না। জাতীয় নাগরিক তথা সামষ্টিক বোধ তো দূরের কথা বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষ হিসেবে ছাত্র-যুবদের মধ্যে মানবীয় নৈতিক বোধ বা নৈতিক মান গড়তেও ব্যর্থ হচ্ছে, ছাত্রসমাজকে ক্রমশঃ আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিক্ষিত করে তুলছে। একথা বোধ হয় অন্ধ-বধির লোকও অস্বীকার করতে পারবে না।

 

অথচ ঔপনিবেশিক যুগেও পরাধীনতার বেড়ি পায়ে আমাদের দেশে তৎসময়ে সমাজসংস্কারে ফকির লালন শাহ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, বেগম রোকেয়া, নওয়াব আবদুল লতিফ, স্যার সলিমুল্লাহ, হাজী মুহম্মদ মুহসিন, অশ্বিনী কুমার; রাজনৈতিক সংগ্রামে তিতুমীর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, ফজলুল হক, মাওলানা আজাদ, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র, কমরেড মোজাফফর আহমদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সূর্য্যসেন, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ইলা মিত্র; সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং বিজ্ঞানে জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র, সত্যেন বসু, কুদরত-ই-খুদা, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ মনীষী জন্মেছিলেন। শুধু তা-ই নয়- সেদিনের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী যে, যে ক্ষেত্রে থাকুক না কেন- নিজেদের চরিত্রকে এঁদের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলো। অবিভক্ত বাংলার গ্রামের ছেলেরা তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় পড়তে যেতো- তখন তারা কখনো রামমোহন, কখনো বিদ্যাসাগর, কখনো বিবেকানন্দ, কখনো বা নেতাজী সুভাষের বাণী কিংবা বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র নিয়ে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে, শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়তো। তারা যে শুধু চিন্তায় আদর্শ অনুকরণ করতো তাই নয়, পোশাক-পরিচ্ছদে বিদ্যাসাগরের চটি হতে শুরু করে, সুভাষ বসুর চাদর পড়ার স্টাইলটি পর্যন্ত অনুকরণ করতো। এমন-কি ’৪৭-এর পর পাক শাসকগোষ্ঠীর আমলেও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এই আদর্শিক চরিত্র গঠনের প্রবণতা ছিল। আর ছিল বলেই তাঁরা ’৫২, ’৬৯, ’৭১-এ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বারেবারেই নির্ভীক চরিত্রের প্রতিবাদী বিবেকের আদর্শিক ভূমিকায় নিজেদেরকে সক্রিয় করে তুলেছে। কিন্তু আজ কোথায় এই ধরনের চরিত্র গঠনের সাধনা? আজ আর কোনো ছাত্র-ছাত্রী কখনও কোনো দুঃস্বপ্নেও চিন্তা করে না যে, আমি শরৎচন্দ্রের মতো সাহিত্যিক হবো বা সুভাষচন্দ্রের মতো সংগ্রামী যোদ্ধা হবো কিংবা সূর্য্যসেনের মতো পাল্টা স্রোতধারার পথিকৃৎ হিসেবে জীবন বাজি রেখে দেশবাসীর কাছে সাহসী দৃষ্টান্ত তুলে ধরবো। এটি কেন হচ্ছে? এ কি সম্পূর্ণ আকস্মিক? শুধু কি তা-ই? আজ যখন এ-সকল মনীষীদের জন্ম বা মৃত্যু-দিবস উদ্‌যাপিত হয়, তখনও সেখানে কোনো প্রাণ থাকে না। কারণ এইসব জন্মদিন মামুলি বক্তৃতা, শহীদমিনারে, স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পাঞ্জলি এবং গান-বাজনাতেই শেষ হয়ে যায়। কেউ একবার এঁদের জীবনীকে বা জীবনের আদর্শকে নিজেদের জীবনে রূপায়িত করার কথা ভাবে না। দেশ নেতারা যা বলেন তা নিজেরাই বিশ্বাস করেন না এবং জীবনে প্রয়োগ করেন না। এরা যা-ও বা করেন, সেটুকু তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে। যা আজ মানুষের কাছে বিরক্তির কারণ। রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসকে এমন ভাবে তুলে ধরেন, যা শেষ পর্যন্ত বিকৃত বা অতিরঞ্জিত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক স্বার্থে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো নিয়ে পক্ষপাতিত্ব ও দলাদলির কারণে উক্ত চরিত্রগুলোর মহোত্তম দিক পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে। এভাবে মহৎ হয়ে ওঠার আদর্শিক দৃষ্টান্তের অভাব পরবর্তী প্রজন্মকে এক অবাস্তব বা সিনেমাটিক কল্পচরিত্রের সঙ বা জোকার বানিয়ে ফেলছে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেকে ‘কেয়ারফুলি কেয়ারলেস’ সহ চাল-চলন থেকে পোশাক-আশাক পর্যন্ত অপরিশীলিত বাচনভঙ্গির সাথে, কখনও কখনও অশ্লীলতাকেও আধুনিকতার নামাবলী ভেবে বহন করতে দ্বিধা করছে না।

 

ইতিহাসকে দলাদলির যূপকাষ্ঠে বলি দিলে, তা থেকে সৃষ্ট অনাকর্ষণ বা ইতিহাসহীনতা পরবর্তী প্রজন্ম তথা জাতিকেই ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিতে পারে- এই সত্যটা ক্ষমতাসর্বস্ব অপরাজনীতিকরা চিরকালই ভুলে যায়। যেন-তেন প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকাটাই যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে জাতীয় স্বার্থ বা ইতিহাসের মহান চরিত্রগুলো ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো অগণ্য মূল্যে কথিত বা ব্যবহৃত হতে থাকে। ইতিহাস বলতে কেউ ’৭১, আবার কেউ ’৭৭ পরবর্তীকেই বুঝাচ্ছে। অথচ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এ-দেশের মানুষ লড়াই করেছে, তা বর্তমান প্রজন্ম প্রায় ভুলে গেছে। ইতিহাস তার বৈচিত্র্য হারাচ্ছে। এভাবেই শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে। জাতীয় দিবস স্মরণে রাষ্ট্রিক পর্যায়ে এত ঘনঘটা থাকলেও ছাত্র-জনতার মাঝে আজ তার আকর্ষণ হারাচ্ছে। মিছিল থেকে শুরু করে প্রভাতফেরী পর্যন্ত আজ সব কিছুই যেন প্রাণহীন অনুষ্ঠানসর্বস্ব এক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব এখন শুধু নেতা-নেত্রীদের ভণ্ডামী আর বক্তৃতাবাজির আঁখড়ায় পরিণত হয়েছে।

 

কেন এমন হলো?

ব্রিটিশ-পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক দুঃশাসন পদে পদে প্রতিভা সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেও পরাধীনতার তৎযুগে কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি সর্বত্র এই ধরণের মনীষার সৃষ্টি হয়েছিল এবং শত সহস্র ছাত্র-যুব-তারুণ্য তাঁদেরকেই আদর্শ বলে গ্রহণ করেছিল, তাঁদের মতো নিঃস্বার্থ আদর্শবাদী হওয়ার প্রত্যয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতো। শত প্রতিকূলতা, নিপীড়ন, নির্যাতনের কথা জেনেও সে পথেই নিজেকে ধাবিত করার স্বপ্ন ও শিক্ষায় পথ চলতো। যে ‘রেনেসাঁ’র ধাক্কায় জেরবার হয়ে পড়েছিল ব্রিটিশদের মতো ভয়ঙ্কর ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ। এমন কি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তো রবীন্দ্রসাহিত্য নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব পর্যন্ত তুলেছিল। অর্থাৎ বোধের উন্মেষ যে মুক্তির সমার্থক তা বিদেশী শাসকরা জানতো, এমন কি চেতনার অভাব যে জাতীয় পঙ্গুত্বের পথ খুলে দেয়- সেটাও বিদেশীরা জানতো, তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে আমাদের বিজয় ও স্বাধীনতার প্রাক্কালে- দেশবরেণ্য বৌদ্ধিক উৎকর্ষে এগিয়ে থাকা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে নির্মমভাবে হত্যা করে। নারকীয় বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মধ্যে বিদেশী শাসকদের এই স্বার্থ ও লক্ষ্যটাই প্রতিফলিত।

 

বোধের উন্মেষ আর দেশাত্মবোধে শাণিত চেতনায় গড়া যে দুঃসাহস তা সব ভয়কে মাড়িয়ে যায়, সব শৃংখলকে ভেঙে ফেলে, তারই দৃষ্টান্ত রেখেছে তৎকালীন বাংলার দামাল ছেলেরা- অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকসেনাদের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ ও বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে।

 

আজ স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর অকুতোভয় সেই দামাল-তরুণের এদেশে এটাই তো আশা করা সঙ্গত ছিলো যে, সাম্রাজ্যবাদ তথা বিদেশী শাসক দ্বারা সৃষ্ট বাঁধা অপসারণের পর এ-ধরণের প্রতিভা সৃষ্টির ধারা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হবে এবং দেশবাসী নিজেদের চরিত্র গঠনের মাধ্যমে এঁদের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জানাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশের দিকে তাকালে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, '৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স যতো বেড়েছে এবং স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে যতোই জয়ঢাক বাজানো হচ্ছে, ততোই আমরা নোংরা মার্কিনি ইয়াংকি কিংবা হিন্দী সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, শোষণবিরোধী মুক্তির পথিকৃৎদের ভুলতে বসেছি। এটা কেন হচ্ছে? যে দেশ ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক অপশক্তির বাধা থাকা সত্ত্বেও এত মনীষীর জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে, সে দেশ স্বাধীনতা লাভের পর কেন এমন দুর্গতির মুখে দাঁড়িয়েছে? এটা কি সম্পূর্ণ আকস্মিক? এর কি কোনো সামাজিক কারণ নেই?

 

ব্যাপারটি কি এই যে, আমাদের কপালগুণে সৃষ্টিকর্তা সেদিন শুধু বাছাই করা জ্ঞানী-গুণীদের এদেশে পাঠিয়েছিলেন, আর আজ আমাদের কপালদোষে আমরা সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? ব্যাপারটাকে এভাবে বুঝতে পারলে আর কোনো সমস্যা ছিল না। তাহলে আলোচনারও দরকার ছিল না। কেবল কপাল ফেরাতেই স্রষ্টার সাধনায় সবাই বসে যেতাম। কিন্তু আমরা যারা কিছু কিছু ইতিহাস, কিছু কিছু সমাজবিজ্ঞান, কিছু কিছু দর্শন সম্পর্কে একটু হলেও বুঝার চেষ্টা করি- তারা ব্যাপারটাকে এভাবে গ্রহণ করতে পারি না। আর এইখানেই যতো গোলমাল। এমন-কি ধর্মশাস্ত্রও সাক্ষ্য দেয়- যে জাতি ‘তার নিজের ভাগ্য বদলায় না, বিধাতাও সে জাতির ভাগ্য বদলান না’ (১)। সমাজবিজ্ঞান আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, প্রত্যেক চিন্তা এবং চিন্তানায়কের জন্মের পেছনে সামাজিক কারণ নিহিত থাকে এবং সেই জন্যেই ব্রিটিশরা চাওয়া সত্ত্বেও এবং শত-সহস্র বাধা দেওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশবিরোধী মুক্তি-আন্দোলনের যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য সর্বত্রই এ ধরণের মণীষীদের জন্ম হয়েছিল। ‘শিক্ষা’ অথবা ‘ধর্ম’ যে নাম বা মোড়কেই থাক- তা কখনও কোনো বড় চরিত্রই গড়ে তুলতে পারে না, যদি তা শিক্ষার নামে নিছক আত্মস্বার্থসিদ্ধির কৌশল হয়ে থাকে- শুধু টাকা কামানোই লক্ষ্য হয়ে থাকে! বৃহদায়তন সমাজ সংশ্লিষ্ট বোধ তথা সামষ্টিক বোধ বিবর্জিত শিক্ষা সর্বদাই আত্মস্বার্থসিদ্ধির কৌশলই হয়ে থাকে৤ শিক্ষা হলেও তা অপশিক্ষা, ধর্মের নামে চললেও ব্যক্তিস্বার্থের এই ধান্ধাবাজিকে বরং অধর্ম বা অপসংস্কৃতি বলা চলে।

 

বড় চরিত্র হাওয়ায় গজিয়ে ওঠে না, সামাজিক দায় ও শিক্ষা-শুশ্রূষায় এটা গড়ে ওঠে। উল্লেখিত মনীষীদের প্রত্যেকের চরিত্রেই একটি বৈশিষ্ট্য ছিল “জ্ঞাতসারে অন্যায় করবো না এবং যে কোনো অন্যায়, তা সামাজিকই হোক বা পারিবারিক হোক তার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও তা প্রতিরোধের প্রচেষ্টা নিরন্তর চালিয়ে যাবো”। এরা যে যে-ই ক্ষেত্রে থাকুক না কেন- প্রত্যেকেই আত্মস্বার্থসিদ্ধিকে নীচুতা হিসেবে দেখতেন এবং প্রত্যেকের উদ্দেশ্য এক ছিল, তা হলো দেশ ও দেশের মানুষ। দেশকে ব্রিটিশ উপনিবেশ এবং তৎপরবর্তী পাকিস্তানী দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্ত করতে জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, সাহিত্যে, রাজনীতিতে, দর্শনে সর্বদিক দিয়ে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা। সেজন্য- সোহরাওয়ার্দী থেকে ভাসানী, বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত এবং ব্রিটিশ বাংলায় তিতুমীর, সূর্য্যসেন, শের-এ-বাংলা ফজলুল হক, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের ক্ষেত্রে যেমন দেশপ্রেম- সংগ্রামের এবং সর্বস্ব ত্যাগের রূপ নিয়ে এসেছিল; রবীন্দ্র-নজরুল-শরৎ-সুকান্তর কাছে তেমনি সাহিত্যসাধনায় এবং জগদীশ চন্দ্র, প্রফুল্ল চন্দ্র, কুদরত-ই-খুদা’র কাছেও বিজ্ঞানচর্চা একই সংগ্রাম ও সাধনার রূপ নিয়ে এসেছিল। যাঁরা সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চা করতেন তাঁরাও মনে করতেন, এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম। একজন বিজ্ঞানের ছাত্রকেও যদি জিজ্ঞাসা করা হতো ‘পড়ছো কেন?’ জবাবে সে বলতো, ‘সাম্রাজ্যবাদীদের মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে আমার দেশকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।’ এটাও ক্যারিয়ার- কিন্তু এ ক্যারিয়ার সমাজকে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আজ যদি কোনো ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হয়- ‘কেন পড়ছো?’ তার জবাবে মিলবে- ‘ডিগ্রী চাই, তা না হলে চাকরি বা টাকা মিলবে না।’ বেশি পড়া মানে বেশি ডিগ্রী, বেশি ডিগ্রী মানে বেশি টাকা। বাঁচতে হলে টাকা দরকার, এ কথা কেউ অস্বীকার করবে না, কিন্তু টাকা রোজগার করার জন্যই কি বেঁচে থাকা? আর তার জন্য লেখাপড়া করাই জ্ঞানার্জন? যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি ও প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে মানুষ যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সৃষ্টি করেছে; মানুষকে ভালোবেসে যীশু, গ্যালিলিও, সক্রেটিস, নিউটন, আইনস্টাইন, বুদ্ধ, চৈতন্য, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ- এঁরা যে সত্যের সাধনা করে গেছেন; তাকে আমরা জানব নিছক টাকা রোজগারের জন্য? আমরা কি ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করি যে, বিজ্ঞান বইয়ের পঞ্চাশ পৃষ্ঠা পড়ে যে সত্য আমরা জানছি, সে সত্য আবিষ্কারের জন্য মানুষকে অন্তত পঞ্চাশ হাজার বছর লড়াই করতে হয়েছে? কিছু কিছু ছাত্র আজকাল নির্বিকারে বলে বসে, “ওসব নীতি আদর্শের কথা ছাড়ুন, পেট তো দেখতে হবে। ওসব নীতির বুলি আওড়ালে পেট চলবে না।” পেট দেখতে হবে মানে যেভাবে হোক- নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে হোক- নীতি বিসর্জন দিয়ে হোক- টাকা রোজগার করতে হবে। তারা কি ভেবে দেখেছে- এইভাবে ভাবলে, এইসব কথা বললে, যে নারী আজ পেটের দায়ে আত্মবিক্রয় করছে, তার সমালোচনা করা চলে না? কারণ সে-ও তো বলতে পারে যে, তার তো পেট দেখতে হবে। বাঁচতে হলে খাদ্য সংগ্রহ করতে হবে এ-কথা ঠিক। কিন্তু যে কোনোভাবে খাদ্য সংগ্রহ করার জন্যই কি বেঁচে থাকা ? নিছক বেঁচে থাকার জন্যই কি বেঁচে থাকা ? মানুষের সঙ্গে জন্তুর জীবনের পার্থক্য কী? মানুষের সঙ্গে জন্তুর জীবনের পার্থক্য তখনই শুরু হয়েছে, যখন মানবজীবনে এসেছে সভ্যতা, সংস্কৃতি- এসেছে রুচিসম্মতভাবে বাঁচার পথ। শিশুপাঠ্যের কবিতায়- বিড়াল বাঘের মাসীও হয়, বনে গিয়ে বাঘও হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে ঘরের কোনায় মিঁউ মিঁউ করে। তেমনি সংগ্রাম ছাড়া বড় চরিত্র- মহৎ চরিত্র অসম্ভব। তাই আমরা দেখি মানব সভ্যতার যাঁরা শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাঁরা নীতি ও আদর্শের ঝাণ্ডা বহন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু যে কোনোভাবে বেঁচে থাকার জন্য অসম্মানের জীবন গ্রহণ করেননি। তাই আজ তাঁরা মৃত্যুবরণ করেও বেঁচে আছেন, তাঁরা মৃত্যুকে পরাস্ত করেছেন, আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ও জীবন্ত হয়ে আছেন।

 

জীবনের মূল্যবোধ কী? কী দিয়ে তা নির্ধারিত হবে? ধনসম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হবে? ডিগ্রী দিয়ে, সামাজিক মর্যাদা দিয়ে নির্ধারিত হবে? এই মাপকাঠিতেই কি আমরা ইতিহাসের বড় মানুষদের মূল্য নির্ধারণ করেছি? নিশ্চয়ই তা নয়, এসব অনেক কিছুই হয়তো তাঁদের ছিল না অথবা কারও কারও ক্ষেত্রে যা-ও বা ছিল, তা কখনও আসক্তি বা জীবনের লক্ষ হয়ে গেড়ে বসতে পারেনি। কিন্তু তাঁরা সকলেই অতুল সম্পদের অধিকারী ছিলেন- সেই সম্পদ মনুষ্যত্বের সম্পদ- মহান আদর্শের সম্পদ। সেই সম্পদের অধিকারী ছিলেন অতীত যুগের সমস্ত বড় বড় মানুষেরা, আমাদের দেশের মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক নায়কেরা। সেই সম্পদের অধিকারী ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ), যীশু, বুদ্ধ, শ্রী চৈতন্য, লালন, বিবেকানন্দ, মার্কস, এঙ্গেলস্‌, লেনিন, মাও সেতুং। এসব সম্পদের মূল্য দেবো না, এসব সত্যের কথা ভাববো না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো না, অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকবো- এই কি যথার্থ জীবন সাধনা? আবার অনেকে চিৎকার করছে ‘Standard of Education’ fall (শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে) করছে কেন? Fall করছে এটা বের করার জন্য সরকার তথা জনগণের লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে শিক্ষাবিদদের বিদেশ ভ্রমণসহ কমিশন বসছে। কিন্তু যতো তাদের মিটিং এর সংখ্যা বাড়ছে, রিপোর্টের পাতা ভারী হচ্ছে- ততো তার সাথে তাল রেখে ‘Standard of Education’ fall (শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে) করছে। আসল কারণটা এরা কেউ ধরতে চাইছে না বা পারছে না। সেই জন্যই জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রচার করছে- ছাত্ররা রাজনীতি করছে বলেই ‘Standard of Education’ fall (শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে) করছে! কিন্তু আমরা জানি প্রতি হাজার ছাত্রের মধ্যে একজনও রাজনীতি করছে না, কিন্তু যেদিন সত্যই সাম্রাজ্যবাদী যুগের ছাত্ররা রাজনীতির চর্চা করতো, পাকিস্তানী শাসন আমলে রাজনীতি করতো, দরকার হলে কারাবরণ করতো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র-ছাত্রীরা দেশের প্রয়োজনে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তো, বই বিক্রি করে আন্দোলনের ফান্ড জোগাতো, সেদিন কিন্তু Standard (মান) ছিল এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকপালরা জন্মেছিলেন। সেদিন পরীক্ষা দেওয়া না দেওয়ার একই উদ্দেশ্য ছিল-টাকা রোজগার নয়; দেশের স্বার্থ।

 

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “শিক্ষা গ্রহণ বা জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ছাত্রদের সামনে যদি কোনো সামাজিক উদ্দেশ্য না থাকে এবং তার জন্য সংগ্রাম ও ত্যাগের প্রেরণা না থাকে, তা হলে নিছক নিজের ব্যক্তিগত লালসাকে চরিতার্থ করার প্রয়োজন নিয়ে কখনও সত্যিকারের শিক্ষার্জন হতে পারে না।” কিন্তু আজ তা-ই ঘটছে। “লেখাপড়া করে যে, গাড়ী ঘোড়ায় চড়ে সে”-এটা এখনকার বাল্যশিক্ষার প্রথম পাঠ। যদি এটা দেখা যেতো যে, না পড়লেও টাকা মেলে- তাহলে অনেকেই পড়তো না এবং কেউ কেউ পড়ছে না। শুধু তা-ই নয়, স্কুল শেষ করে ভালো রেজাল্ট করা ছাত্ররা যখন কী পড়বো ঠিক করতে বসে, তখন তাদের বিচারের সামনে একটাই মাপকাঠি থাকে- কোন লাইনে গেলে বেশি রোজগার করা যাবে। শিক্ষকতার কাজ একদিন এদেশে পবিত্র কাজ বলে গণ্য করা হতো, কেননা সেটা ছিল দেশের মানুষ তৈরির কাজ। আজ কিন্তু আর কোনো ভালো ছাত্র ওদিকে যেতে চায় না, এক যাদের কোনো গতি নেই- তারা ছাড়া। সবাই বলে, “ধুর! ঐ লাইনে আবার টাকা আছে নাকি?” এই হচ্ছে শিক্ষকতা সম্বন্ধে এদেশের ভালো রেজাল্ট করা ছাত্রদের উত্তর, এইসব কারণেই একদিন যে দেশে হারিকেনের আলোয় বসে অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা হয়েছে এবং অনেক জ্ঞানী-বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে, আজ হাজার বিদ্যুতের ছটাতেও তা সম্ভব হচ্ছে না। “আপনি বাঁচলে বাপের নাম”- এটাই এখনকার চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বর্তমানে শাসক শ্রেণীর আনুকূল্যেই এটা ঘটছে। যেন-তেন প্রকারেই হোক, নিজেরটা গোছাতে হবে। এই মনোভাব নিয়ে কখনো বড় চরিত্র গঠিত হতে পারে না। চরিত্র দুই ধরণের হবে- হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম চালাবে অথবা অন্যায়ের সাথে আপোষ রক্ষা করে নিজেরটা গোছাতে চাইবে- অন্যায় করারই নামান্তর। প্রথমটা ভুলে গিয়ে আমরা এখন দ্বিতীয়টারই চর্চা করছি। আনন্দও দুই ধরণের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে আনন্দ অথবা অন্যায় করে ও নোংরা ঘেঁটে ঘেঁটে আনন্দ। প্রত্যেক যুগের মনীষীদের আনন্দের উৎস একটাই- অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য নিরঙ্কুশ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, এটা না করতে পারলে মানুষ অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে নোংরা ঘেঁটে ঘেঁটে আনন্দ খুঁজতে চেষ্টা করে। আজ তা-ই হচ্ছে।

 

বর্তমান প্রজন্মের সামনে অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী মানেই হাতে গাঁজার স্টিক, তাদের সামনে আজ আর কোনো আদর্শিক চরিত্র উপস্থিত নেই, যাঁকে তারা অনুসরণ করতে পারে। কবি-সাহিত্যিকেরা কলম ধরে দেশের ক্ষমতাসীন নেতা-নেত্রীদের মনস্তুষ্টি করতে। অধিকাংশ বিজ্ঞানী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ সকলের একই অবস্থা। নামে হোক বেনামে হোক, ভাবনা একটাই কীভাবে নিজেরটা গোছানো যায়- দু’পয়সা কামানো যায়।

 

এই শুধু আমাদের দেশেই নয়, সমস্ত ধনতান্ত্রিক [ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা : যে সমাজ ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণগুলো (জমি, যন্ত্রপাতি, কলকব্জা ইত্যাদি) ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকে এবং উৎপাদন কেবলমাত্র ব্যক্তিগত মুনাফাকে সামনে রেখে করা হয়, তাকে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বলে।] দুনিয়াতেই এক অবস্থা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিগ্রোদের দাসত্ব মুক্তির জন্য যিনি আমরণ লড়াই চালিয়েছিলেন, সেই আব্রাহাম লিংকনের প্রতিমূর্তি আজ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কেননা আজ তার তলায় বসেই চলছে কী করে নিগ্রোদের লিন্‌চিং করে হত্যা করা যায়, কী করে নিগ্রো মেয়েদের শরীরে জ্বলন্ত সিগারেট ছুঁড়ে মজা লোটা যায়। এখন চরিত্র গঠনের সাধনা চলছে Rock-n-Roll, Yankee Culture- এর মাধ্যমে, “খাও দাও, ফুর্তি করো”। এই ফুর্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম করে নয়, কতোভাবে নোংরা চটকে ফুর্তি করা যায়। সেজন্য অফিস ফেরতা মার্কিন যুবতী ও যুবকদের কাছে আর কোনো কাজ নেই, সারা রাত Night Club (নাইট ক্লাব)-এ Dual Dance (দ্বৈত নাচ), মদ গেলার পরও ঘুম আসে না- Sleeping Pill (ঘুমের ওষুধ) চাই। ওদেরই কথা- Nation is in sleeping pills and sex diseases (জাতি এখন ঘুমের ওষুধ ও যৌন ব্যাধিতে ভুগছে)। এইভাবে জাতিকে Mechanical (যান্ত্রিক) করে না গড়তে পারলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা [যখন কোনো ধনতান্ত্রিক দেশ তার উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির জন্য, উদ্বৃত্ত পুঁজি খাটাবার জন্য, সস্তায় কাঁচামাল ও খাদ্যদ্রব্য কেনার জন্য কোনো পেছনে পড়ে থাকা গরীব দেশ দখল করে নেয় (বর্তমানে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাজার দখল করছে); তখন সেই দেশকে বলা হয় সাম্রাজ্যবাদী দেশ এবং এই অপকৌশলের নীতিই সাম্রাজ্যবাদ।] ভিয়েতনামে মানবতার বিরুদ্ধে এ-রকম বীভৎস আক্রমণে মার্কিন যুবকদের ব্যবহার করতে পারতো না।

 

ইউরোপেও একই অবস্থা চলছে। শেক্সপিয়র, মিলটন-এর ইংল্যান্ড আর নেই। সেখানেও বিট্‌লিক্স, মকার্স এবং রকার্স সংস্কৃতির প্রতিযোগিতা হচ্ছে। নোংরামির ক্ষেত্রে কে কতো এগিয়ে, এটাই যেন আধুনিকতার নিক্তি। ইংল্যান্ডেশ্বরীকেও দেখা যায়, বিট্‌নিক কালচারের উদ্বোধন করেছেন। তাই ভিয়েতনামে বর্বর মার্কিন আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে যুবক-যুবতীদের বড় একটা দেখা যায়নি। তারা যখন sea beach -এ Life enjoy (জীবনকে উপভোগ) করতে ব্যস্ত, তখন ৯০ বছরের বৃদ্ধ বার্ট্রান্ড রাসেল প্রগতি ও মানবতার বাণীকে বয়ে নিয়ে চলেছিলেন বিশ্বব্যাপী। এই সংস্কৃতি ক্রমশঃ আমাদের দেশকেও গ্রাস করছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বিভিন্ন ফাংশনে, রেস্টুরেন্ট-এ কিংবা বইমেলা পর্যন্ত সর্বত্র নোংরামির ছড়াছড়ি।

 

আগের যুবকরা নদীর ধারে, রেস্টুরেন্টে, মাঠে সর্বত্র গল্প করতো-আড্ডা দিতো। কিন্তু সেদিনের আলোচনার বিষয় ছিল আলাদা- গান্ধীজির পথ ঠিক, না সুভাষ চন্দ্রের পথ ঠিক; সাহিত্যের মাত্রা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সঠিক, না শরৎচন্দ্র সঠিক। সেদিনও কিছু কিছু ছেলে-মেয়ে পরস্পরকে ভালোবাসতো। কিন্তু Content of love (ভালোবাসার মূল কথা) ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। চরিত্রে-আচারে-ব্যবহারে যাঁদের মধ্যে দেশাত্মবোধ, সমাজবোধ ফুটে উঠতো- তাঁরাই ভালোবাসার যোগ্য পাত্র-পাত্রী ছিল। কিন্তু আজ নির্মলের আরাধনা আর নির্দোষ আমোদ-প্রমোদ-বিনোদন এর পরিবর্তে তাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে নোংরা আলোচনা। ফিল্ম বলতে প্রধানত ফিল্ম স্টারদেরকে নিয়ে নিচু ধরণের চলতি গসিপেই আকর্ষণ। মনোরঞ্জনের ক্ষেত্রে আলোচনার সূচী হয়ে দাঁড়িয়েছে- কে কতো পোশাকে, কথায়, ব্যবহারে প্রগতির নামে অশালীনতাকে প্রকাশ করছে, চলচ্চিত্রে এহেন চরিত্র চিত্রণের অশ্লীল রূপদানকে ‘প্রথাবিরোধী’,‘দুঃসাহসী’ ইত্যাদি প্রশংসা-স্তুতি দিতেও অনেকের বাঁধছে না। এখানে আর একটা কথা বলা অযৌক্তিক নয়- তা হলো, প্রায়ই ছাত্র-যুবকরা ভালোবাসা ও যৌন সম্পর্ককে এক করে দেখে। যৌন সম্পর্ক মানেই কি ভালোবাসা? যৌন সম্পর্ক তো জন্তু-জানোয়ারদের জীবনেও আছে, নিষিদ্ধ পল্লীতেও আছে। সেটা কি ভালোবাসার সম্পর্ক? কোথাও যৌন সম্পর্কে ভালোবাসা আসে, কোথাও আসে না। যেখানে ভালোবাসা আসে- সেখানে সৌন্দর্য আছে। যেখানে নেই- সেখানে কদর্যতা আছে। যেখানে সম্পর্কের মধ্যে আদর্শ আছে, মর্যাদা আছে, রুচি-সংস্কৃতি আছে, কর্তব্য আছে- সেখানেই যথার্থ ভালোবাসা আছে; সেখানেই ভালোবাসা যথার্থ সুন্দর। সেই ভালোবাসারই চিত্র আমরা পাই শেক্সপিয়রের কাব্যে; টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের অমর সাহিত্যে; যা আমরা বারবার পড়ি। আর একটা কথা মনে রাখতে হবে, ভালোবাসা আর দুর্বলতা এক নয়। অনেকে যেমন বলে, আমার ওর প্রতি একটু Weakness (দুর্বলতা) এসে গেছে। ভালোবাসা যদি এসেই থাকে এবং সেটা যদি যথার্থ ভালোবাসা হয়, তাহলে সেটা দুর্বল করবে কেন? বরঞ্চ সে সম্পর্ক তো তাকে শক্তিশালীই করার কথা। আর ভালোবাসা শক্তি দেয়নি বরং শক্তিহরণ করেছে, আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি- তার অর্থই হচ্ছে এই ভালোবাসার মধ্যে ভালো কিছু নেই। এর মধ্যে কোনো আদর্শ নেই, মূল্যবোধ নেই, মর্যাদাবোধ নেই- আছে শুধু বিকৃত দেহ-সর্বস্বতা, যা মানুষকে পশু করে তোলে।

 

জীবনে সুন্দর আছে, অসুন্দর আছে। আমরা সুন্দরকে নেবো, আমরা সুন্দরের পূজারী। যা কিছু অসুন্দর-অন্যায়-কুৎসিত-গ্লানিময়, তার বিরুদ্ধে যে আদর্শ লড়ছে- যে আন্দোলন হচ্ছে- সেই আদর্শ- সেই আন্দোলনই তো সুন্দর। আর যাঁদের মধ্যে সে আদর্শ জীবন্ত, প্রতিফলিত ও প্রস্ফুটিত- তাঁরাই তো যথার্থ সুন্দর। পিতা-মাতা হিসেবে হোক, পুত্র-কন্যা হিসেবে হোক, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে হোক, বন্ধু-বান্ধব হিসেবে হোক, তাঁরাই তো ভালোবাসার পাত্র-পাত্রী। যথার্থ ভালোবাসা মানুষকে পিছনে টানে না, সামনের দিকে এগুতে সাহায্য করে। তা বাঁধে না, জীবনের মহৎ ব্রত পালনে অনুপ্রাণিত করে, সত্যিকারের মুক্তির সন্ধান দেয়। এই ভালোবাসাই তো মানুষকে বড় করে, মহৎ করে। এই ভালোবাসাই তো মানুষকে মানবিক সম্পদের অধিকারী করে তোলে, এই ভালোবাসাই জীবনে কাম্য। আমরা সকলে বড় হতে চাই, এই ভালোবাসা পেতে চাই।

 

আজ ছাত্ররা যে উচ্ছৃংখল হচ্ছে, এটা নেতারাও বলছেন। কিন্তু কারণ দেখাচ্ছেন, সত্যকে সম্পূর্ণ গোপন করে। এরা উচ্ছৃংখলতার কারণ হিসেবে ছাত্ররাজনীতিকে দায়ী করছে, এমন কি বুদ্ধিজীবীর তকমা আঁটা এক শ্রেণীর এনজিও সুবিধাপ্রাপ্ত কলামিস্ট সেটা প্রতিষ্ঠা করতেই উঠে-পড়ে লেগেছে, অবশ্য এরা ছাত্ররাজনীতির সাথে সাথে মাঝে মাঝে পুরো রাজনীতিটাকেই মাইনাস করে প্রতিবাদ-প্রতিরোধহীন নিরঙ্কুশ ভিনদেশী অঙ্গুলি হেলনকেই জাতির ভাগ্য নির্দেশক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিশেষতঃ নাগরিক বোধ থেকেই যেখানে দেশের সুনীতি-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার কথা, সেখানে সে কথাটি বলতেও যারা পায় বিদেশী মাসোহারা, গণবিচ্ছিন্ন এসব মিডিয়াভিত্তিক ব্যক্তিদের জাজ্‌মেন্ট-এ দেশ ও দেশের স্বার্থ কিংবা জাতীয় ভাবমূর্তি কতোটা রক্ষিত হয়- তা সহজেই অনুমেয়। এমন-কি এসব পণ্ডিতপ্রবর দেশপ্রেমিকেরা সারা মাসে ২০ জন সাধারণ মানুষের সাথে চলাফেরা তো দূরের কথা, একসাথে এক কাপ চা খায় কি-না সন্দেহ। অথচ সাধারণ মানুষ প্রসঙ্গে তাঁরা রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিয়ে লেখালেখিতে ন্যূনতম নৈতিক মানটা পর্যন্ত অনেক সময় হারিয়ে ফেলেন- যা তাদেরই অপরিশীলিত কাণ্ডজ্ঞানহীন দায়-দায়িত্বের পরিচায়ক। রাজনীতির মানটা যতোই নেমে যাক- মন্ত্রী সহ দলীয় বড় বড় পদ-পদবীতে যতোই হাইব্রিড নেতাদের বাড়-বাড়ন্ত ঘটুক না কেন, এখনও সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়া কিংবা কাছের মানুষ বলতে রাজনীতিকরাই থাকেন, ফলে সাধারণ মানুষ প্রসঙ্গে অভিজ্ঞতা তাঁদেরই বেশি। রাজনীতিগত শর্তেই মানুষের কাছে রাজনীতিকদের ফিরতেই হয়- কম আর বেশি, এ না হলে রাজনীতি হয় না। সাধারণ মানুষ সম্পর্কে একটু হলেও বেশি বোঝেন, ফলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষিত না হলে এদেরই নিন্দিত-ধিক্কৃত হতে হয়। কিন্তু এদের চেয়ে বেশি বুঝে যারা রাজনীতিকে মাইনাস করতে চান, রাজনীতি-সাধারণ মানুষ-জাতীয় স্বার্থ -কোনোটার সাথেই এরা নেই।

 

জনগণও এইসব প্রচার-প্রচারণীকে অনেক সময় সত্য বলে ধরে নেয়। অথচ কম-বেশি সব ছাত্রই জানে, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করে এদের দিয়ে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা অস্ত্রবাজী করতে বাধ্য করা হয়। অনেকটা- যে ক্ষমতায় যায়, সে-ই হরতাল বিরোধী হয় এবং যে ভোটে হারে, সে-ই কারচুপির অভিযোগ তোলে। দেশস্বার্থ বর্জিত, শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক আখের গোছানোর ঘৃণ্য রাজনীতির বিষই যে ছাত্রদের বিষময়-বিশৃংখল-উচ্ছৃংখল করছে- সেটা জনগণকে বুঝতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ যে ছাত্র বেতন বৃদ্ধি করাকে অন্যায় মনে করে প্রতিবাদ জানায়, যে ছাত্র ক্ষুধার্ত মানুষের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে মিছিল করে, যে ছাত্র সকল সামাজিক সুখ-দুঃখকে নিজের বলে মনে করে, এদের চোখে তাঁরাই উচ্ছৃংখল। কারণ এদের আন্দোলন নতুন নয়; প্রত্যেক যুগেই ক্ষমতাসীন শোষক শ্রেণী, প্রগতির এই বাণী প্রচারকদের এই অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ), যীশু, বুদ্ধ, শ্রী চৈতন্য, স্বামী বিবেকানন্দ, নজরুল, মাওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে ক্ষুদিরাম, সুভাষ চন্দ্র, তিতুমীর পর্যন্ত কেউই এই অভিযোগ থেকে মুক্ত নন।

 

কিন্তু সত্যি কি এই লড়াই উচ্ছৃংখলতা? কোনো বিশেষ সামাজিক শৃংখলার বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, কোনো নতুন সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তনের লড়াই, উচ্ছৃংখলতা নয়। পুরাতন সামাজিক শৃংখলা, যখন সমাজ প্রগতির (যে গতি সামনের দিকে টানে, উন্নয়ন অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে তা-ই প্রগতি) পায়ে শৃংখল হয়ে দেখা দেয়, তখন সেটাই উচ্ছৃংখলতার জন্ম দেয় এবং তখন সেই সামাজিক-শৃংখলের বিরুদ্ধে, নতুন সামাজিক শৃংখলা আনয়নের লড়াই-ই প্রগতির লড়াই। আসলে যারা বর্তমান সমাজের ধারক ও বাহক, তারাই উচ্ছৃংখলতার জন্ম দিচ্ছে এবং বাঁচিয়ে রাখছে। যাঁরা- সকল অন্যায়-অত্যাচারের উৎস যে বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থা, তাকে পরিবর্তনের জন্য লড়ছে- তাঁরাই সত্যিকার অর্থে উচ্ছৃংখলতার বিরুদ্ধে লড়ছে।

 

ছাত্রদের রাজনীতি করা উচিত নয়, এই উপদেশও তারা দিচ্ছেন এবং দুঃখের বিষয় বুদ্ধিজীবী বলে গর্ব করেন, এই রকম অনেকেই এ প্রচারে বিভ্রান্ত হয়েছেন। অথচ ছাত্র-ছাত্রী নির্বিশেষে কেউ কি যথার্থই রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন?

 

রাজনীতি কী? যা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট, তা-ই রাজনীতি এবং যা সমাজসংশ্লিষ্ট, তা-ই সংস্কৃতি। সমাজবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ সমন্বয়ী প্রতিষ্ঠান- রাষ্ট্র, অপরাপর প্রতিষ্ঠান যার আওতাভুক্ত। রাষ্ট্রীয় সীমানায় বাস করে কি কেউ রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে? আর রাষ্ট্রে ‘বাস করছি’, তার অর্থই হচ্ছে- রাষ্ট্র যাঁরা চালাচ্ছেন- তাঁদের নিয়ম মেনে জমিতে, কারখানায় উৎপাদন করছি; অফিস-আদালতে কাজ করছি; নাগরিক হিসেবে তাঁদের দেওয়া অধিকার এবং আইন-শৃংখলা মেনে চলছি, তাঁদের কর দিচ্ছি; তাঁদের মনোনীত সিলেবাস পড়াচ্ছি অথবা পড়ছি; তাঁরা যেমনভাবে গড়তে চাইছেন, তেমনভাবে গড়ে উঠছি; জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক, তাঁদেরই সৃষ্ট নিয়মকে মেনে নিয়ে রাষ্ট্রকে চলতে সাহায্য করছি। সক্রিয়ভাবে দলভুক্ত না হলেও এটা কি রাজনীতি করা নয়? আবার সচেতনভাবে, এ সবের বিরুদ্ধতা না করে; অন্য ব্যবস্থা ও নিয়ম শৃংখলা প্রতিষ্ঠার লড়াইও রাজনীতি। অথচ দলবদ্ধ না থাকলেই বুঝি রাজনীতির বাইরে আছি এবং নির্দলীয় থাকা গেলেও রাজনীতির বাইরে থাকার দাবি করাটা যে নিরেট মূর্খতা- এটা অনেক শিক্ষিতজনই বুঝেন না বা বুঝতে চান না।

 

এইভাবে তারা “রাজনীতি করো না”- এই উপদেশ দিয়ে প্রতিবাদের রাজনীতিকে মারতে চায়। কিংবা রাজনীতি ভুল হলেও তা বিনা বাধায় কার্যকরী করতে চায়। অনেকে এমন কথা বলে থাকেন যে, ছাত্রদের রাজনীতি করা উচিত নয়। অথচ ছাত্ররা রাজনীতি করবে কি করবে না- এ প্রশ্নটাই ভ্রান্ত। কারণ, আঠারো বছর বয়স ঊর্ধ্ব প্রতিটা নাগরিকেরই ভোটাধিকার থাকলে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলা এক ধরণের স্ববিরোধ পাগলামী। এছাড়া জাতীয় নাগরিক বোধের সাথে প্রসঙ্গটা এতই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে তাকে বাদ দিলে ছাত্রদেরকে জংলী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কারণ স্বর্গে বা জঙ্গলেই একমাত্র রাজনীতিহীন থাকা সম্ভব-সমাজবদ্ধ জীবিত মানুষদের জন্য তা সম্ভব নয়। এরিস্টটল কপচাতেই যারা অভ্যস্ত তাদেরকেই নতুন করে এরিস্টটল স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে- এটাই আশ্চর্যের! কারণ স্বর্গ ও জঙ্গলেই একমাত্র রাজনীতিহীন থাকা সম্ভব, কথাটা বহু আগেই এরিস্টটল বলে গেছেন।

 

ফলে, চাইলেই কোনো ছাত্র রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না। কারণ- ‘করা’, ‘না করা’ তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। সমাজবদ্ধ কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানায় জন্ম নিয়ে এবং যেখানে একটা সমাজ বা রাষ্ট্র চলমান- সেখানে চাষ-বাস, কলকারখানা, অফিস, আদালত, হাট-বাজার- সব কিছুই কোনো না কোনো নিয়ম মেনে চলছে। এমন-কি শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্য, আইন-কানুন, পারিবারিক জীবন- সবকিছুই কোনো না কোনো নীতির দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। আর রাজনীতি এটাকে নির্ধারণ করছে। ফলে যে কেউ রাষ্ট্রীয় সীমানায় বাস করছে- মানুক বা না মানুক, বুঝুক বা না বুঝুক, সে রাজনীতির সাথে যুক্ত আছে- কাবিননামা থেকে কাফনের কাপড় পর্যন্ত ট্যাক্সের (আর্থিক সম্পর্ক বা লেনদেন আছে মানেই রাষ্ট্র তথা রাজনীতির সম্পর্ক আছে) পথ ধরে রাজনীতিতে আছে। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক- তা সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকা বা মেনে নেওয়াও যেমন রাজনীতি- তেমনি তার বিরোধিতা করাও রাজনীতি। সমাজবদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে- এর বাইরে কিছু থাকতে পারে না।

 

ছাত্রদের শিক্ষাজীবনও রাজনীতির বাইরে নয়, শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? সরকার। শিক্ষার নীতি কী হবে, কোন ধরণের পাঠ্যক্রম চালু হবে, কাদের জন্য কতোটুকু শিক্ষার সুযোগ থাকবে, কোথায় শিক্ষায়তন খোলা হবে, না কি আদৌ খোলা হবে না, তার সব কিছুই ঠিক করছে সরকার বা তার শিক্ষাদপ্তর। আর সরকার মানেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সরকারের শিক্ষানীতিকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়াও যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে মেনে নেওয়া, তেমনই তার বিরুদ্ধতা করাও একটা রাজনীতি করা।

 

এমন-কি জ্ঞানও রাজনীতি মুক্ত নয়। জ্ঞান কী? কোথা থেকে জ্ঞান আসছে? জ্ঞান হচ্ছে সামাজিক সংগ্রামের অর্জিত সম্পদ। মানব জাতি সেই সুদূর অতীত থেকে, এক দিকে প্রকৃতিকে জয় করার জন্য, অন্যদিকে ক্রমাগত সমাজ পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করেছে, ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। জ্ঞান হচ্ছে এই সংগ্রামেরই সংগৃহীত, সুশৃংখলিত, সুবিন্যস্ত অভিজ্ঞতার ফল। এক যুগ সংগ্রাম করে, যে জ্ঞানভাণ্ডার রেখে যায় সে যুগের গর্ভে- নবাগত যারা আসে, তারা সেই জ্ঞানকে হাতিয়ার করে এগিয়ে চলে। আবার পরবর্তীতে তারা, তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা জ্ঞানের ভাণ্ডারে রেখে যায়। এক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে যা সত্য, অন্য যুগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন হয় নতুন বাস্তবতা- নতুন সত্যের। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সাথে সমাজ সংহতির স্বার্থে পূর্বোক্ত জ্ঞান বা সত্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তা না হলে সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে উত্তরিত নতুন যুগের নতুন সত্যের প্রয়োজন এসে পড়ে। ফলে জ্ঞান আসছে সংগ্রাম থেকে; আর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য সংগ্রাম। সমাজ সাযুজ্যতার এই অর্থেও জ্ঞান অর্জনকে, সামাজিক সংগ্রাম থেকে অর্থাৎ রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কেউ ভাবতে পারে, আমি নিরপেক্ষ কিন্তু তাহলেই কি নিরপেক্ষ হওয়া যায়? এ হচ্ছে নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা। আমি কোনো কিছুর মধ্যে নেই, অর্থাৎ আমি ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, প্রগতি-প্রতিক্রিয়া- কোনো কিছুর মধ্যেই নেই। তাহলে আমি আছি কোথায়? ভালো বা ন্যায়ের পক্ষে যদি আমি না থাকি- ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, মন্দ ও অন্যায়ের সাথে নিশ্চয়ই যুক্ত আছি। কেউ ভাবেন রাজনীতি মানুষের চরিত্র নষ্ট করে, এ কথাও কি সব সময় ঠিক? তাহলে এটা কী করে ঘটল যে- সভ্যতার সমস্ত মহান সন্তান হযরত মুহাম্মদ (সঃ), বুদ্ধ, যীশু, শ্রী চৈতন্য, বিবেকানন্দ, মার্কস, এঙ্গেলস্‌, লেনিন প্রমুখ নিজেদেরকে সামাজিক সংগ্রামে বা রাজনৈতিক সংগ্রামে সম্পৃক্ত করলেন? হ্যাঁ, রাজনীতি মানুষকে নষ্ট করে- যে রাজনীতি দুষ্ট রাজনীতি, নোংরা রাজনীতি; বরং সেটা নীতিহীন লিপ্সার দলবৃত্তি- যার অবস্থান ঠিক রাজনীতির বিপরীত- যে রাজনীতি নীতিহীন, সংস্কৃতিবর্জিত; যে রাজনীতি স্বার্থান্বেষী ক্ষমতালিপ্সু দলবদ্ধ ধাপ্পাবাজি; যা মানুষের মনুষ্যত্বকে হত্যা করে। কিন্তু যে রাজনীতি অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ছে; শোষণমুক্তির জন্য লড়ছে সেই রাজনীতি মানুষকে মনুষ্যত্ব দেয়; মানুষকে সাহস ও তেজ যোগায়। ফলে রাজনীতিবিমুখতা নয়, আমাদের ঠিক করে নিতে হবে, আজকের সমাজ অগ্রগতির স্বার্থে- অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি সমস্ত কিছুর প্রগতির স্বার্থে কোন রাজনীতি গ্রহণ করবো এবং তা কোন অর্থে গ্রহণ করবো। এই অর্থে দলবৃত্তির বাইরে থাকাও যেমন রাজনীতি এবং রাজনীতির নামে দলবদ্ধ স্বার্থ হাসিলের দুষ্টচক্র থেকে নিজেকে দূরে রাখা- তা এক অর্থে মন্দের ভালো। কিন্তু অবশ্যই শ্রেষ্ঠ পথ, সেই দুষ্ট রাজনীতি নির্মূল করতে পাল্টা সঙ্ঘবদ্ধতায় দৃঢ়বদ্ধ হওয়া।

 

যে বাংলাকে ঘিরে ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নির্ভর করতো, আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রশ্নে ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাঙালী জাতি ছিল দুর্দমনীয় দুর্জেয় পথিকৃৎ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অর্ধেকেরও বেশি শহীদ হয়েছিল বাঙালী। যে কারণে ব্রিটিশরাজ রাজধানী কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত করেছিল দিল্লীতে। যে বাঙালীকে উদ্দেশ্য করে বলা হতো “বাঙালীরা আজ যা ভাবে, সারা ভারতবর্ষ আগামীকাল তা ভাবে”। একদিন এগিয়ে থাকতো যে জাতি, সেই জাতিই ভাষার প্রশ্নে ’৫২ তে দিয়েছে রক্ত, ’৬৯ এ ঘটিয়েছিল পাক শাসকের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭১ এ দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশকে করেছিল পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত- জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, জীবনের সর্বক্ষেত্রে যে জাতি নবপ্রভাতের সূচনা করতো- সে জাতি আমরা, সেই দিকপালদের উত্তরসূরি আমরা আজ কেন ক্রমশঃ এতোটা অধঃপতিত হয়ে ডুবে যাচ্ছি গাঢ় অন্ধকারে? জাতি আজ তার অতীত দিনের মহান গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় প্রায় সম্পূর্ণ ভুলতে বসেছে। আমাদের এই প্রজন্মকে ভুলিয়ে দেয়া হচ্ছে সুকৌশলে। আমরা যাতে শেকড়বিচ্ছিন্ন, প্রতিবাদহীন, নির্লিপ্ত হয়ে যাই এবং হচ্ছিও তাই। আর তার বাহন বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থা।

 

আজকের দিনে ছাত্র-যুবকেরা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, নেতাজী, মাস্টারদা, শেরেবাংলা, মাওলানা ভাসানী এঁদেরকে জানে না। আজ আর কেউ তাঁদের কর্মকাণ্ডের যথাযথ মূল্যায়ন করে না। তাঁদের সংগ্রামী লক্ষ্য পূরণ নিয়ে কোনো সঠিক বিশ্লেষণ, যা সত্যিকার অর্থে তাঁদের স্মরণ করা বা শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যম, তার ধারে-কাছেও যায় না। শুধু '৭১-ই যেন আমাদের সব ইতিহাস, যা বর্তমান প্রজন্মকে শেকড়বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। কারণ ইতিহাস হাজার বছরের কর্মকাণ্ড, তাকে সংক্ষিপ্ত করা বা আড়াল করা দেশেরই শুধু সর্বনাশ করা নয়, ছাত্রদের শুধু বিভ্রান্ত করা নয়; বরং চলমান রাজনীতির নোংরা, কদর্যপূর্ণ ক্ষমতা সর্বস্বতার বহিঃপ্রকাশ। যা আমাদেরকে বিপথগামিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

সেদিনের যুবক-যুবতীদের কাছে চিন্তা ছিল, কী করে পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করবে, কীভাবে মনুষ্যত্বের অধিকারী হবে। কোন পথে গেলে, কার আদর্শ অনুসরণ করলে সত্যিকারের বড় হতে পারবে। আর আজ দেশে এত দুঃখ, দুর্দশা, লক্ষ লক্ষ শোষিত নর-নারীর আর্তনাদ, ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না, কিন্তু কে এদের নিয়ে ভাবছে? কোথায় সে যৌবনের মানসিকতা? আজকের ছাত্র-যুবকেরা, নোংরা সিনেমার কাহিনী, মদ, ড্রাগ, জুয়ার আসরে মদমত্ত। এমন-কি মা-বোনরা রাস্তায় সম্ভ্রম নিয়ে চলাফেরা করতে পারে না, তথাকথিত শিক্ষিত ছেলেদের অশালীন আচরণে। ইদানীং, মেয়েদের মধ্যেও শিক্ষার পথ ধরে আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হওয়ার পরিবর্তে কৃত্রিম নাটুকেপনা সহ ক্রমশঃ মিথ্যাচারগুলো ভয়ানক রূপ নিচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ মানেই খুব সহজে একজনের নৈতিক চরিত্র হননের পথ বেছে নিচ্ছে। শিক্ষিত মেয়ে হওয়ায় এদের কথা বাছবিচার ছাড়া অনেকে বিশ্বাস করে বিভ্রান্তও হয়। দেশের আজ কি করুণ পরিণতি! এসব কথা কি এটা প্রমাণ করে না যে, বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আত্মসর্বস্ব এবং উচ্ছৃংখল করতে চাইছে- আর আমরা সবাই তা-ই হয়ে যাবো। এইভাবে ভাবলে কোনো যুগেই সমাজপ্রগতির প্রশ্ন থাকে না।

 

কোনো বিশেষ সমাজ অমানুষ করতে চাইলেও কি আমরা অমানুষ হয়ে যাবো? আমরা নিজেরা বিচার, বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে, যে ষড়যন্ত্র আমাদেরকে তিলে তিলে ধ্বংস ও অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে কি রুখে দাঁড়াবো না? আজকাল এক দল যেমন কিছু ভাবতে চাইছে না, কিছু করতেও চাইছে না, আর একদল তেমনি সব বুঝে বলে, “আপনারা করুন আমরা আছি”। এভাবে তারা দুপাশে সরে দাঁড়ায়। তারা একবারও কি ভেবে দেখে, সবাই যদি এভাবে উত্তর দেয়, ‘আপনারা করুন আমরা আছি’, তাহলে করবে কারা? এভাবে যারা ভাবছে, তাদের কাছে প্রশ্ন। তারা কোন মধুর জীবনের আকর্ষণে এইভাবে সংগ্রাম থেকে দূরে সরে থাকতে চাইছে? আর সে জীবনে কি সত্যিই কোনো আনন্দ আছে? সংগ্রামের কথা শুনলে আমরা ভয় পেয়ে যাই। অথচ সত্যিই কি কেউ সংগ্রাম থেকে মুক্ত ? নিজের জীবন ও জীবিকার জন্য যারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে বা করতে চাইছে, তারা কি সংগ্রাম করছে না? যখন ভাবি সংগ্রাম করবো না- তখন আসলে সমাজপ্রগতির সংগ্রামকে এড়িয়ে যেতে চাইছি। নিজের বিবেকী নৈতিক বোধকেই খাটো করে ফেলছি।

 

কিন্তু সেই আমাকে আবার সংগ্রাম করতে হচ্ছে জীবনরক্ষার তাগিদে। তাতে কী ফল ফলছে? যাঁরা আজ বৃদ্ধ, তাঁদের যদি জিজ্ঞাসা করা যায় আজীবন তো উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু তাতে কি কোনো আনন্দ কিংবা সুখ পেয়েছেন? দীর্ঘশ্বাসের সাথে একটাই উত্তর দিবেন- ‘না’। তেমনি যে সকল যুবক-যুবতী তাদের নিশ্চিত জীবন গড়ে তোলার জন্য, সমাজ প্রগতির সংগ্রাম থেকে দূরেথাকতে চাইছে, বিশ-পঁচিশ বছর পর তাদেরও গালভাঙা, চক্ষু কোটরাগত মুখচ্ছবির মধ্যে বৃদ্ধদের এই হতাশাই ফুটে উঠবে।

 

পারিবারিক দায়িত্বের কথা ভেবেই আজ যারা পিছু হটতে চাইছে, তাদেরও দেখা দরকার, বর্তমান সমাজব্যবস্থা পারিবারিক জীবনকেও আজ কোথায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আজকে সমাজ জীবনে যার টাকা আছে, সেই সমাজের মালিক। পাড়াতে যে সবচেয়ে বড়লোক, সেই পাড়ার অধিপতি। যতো অন্যায়ই করুন না কেন পাড়ার ছেলেরা মোটা চাঁদার লোভে, কলেজে ভর্তি ও চাকরি জোটাবার ক্ষেত্রে সুপারিশের লোভে তাকে ক্লাব, মসজিদ ইত্যাদি সামাজিক প্রতিষ্ঠানে কমিটির সভাপতি এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসনে বসায়। সামাজিক জীবনে যেমন Capital is the master of society (পুঁজিই সমাজের প্রভু), তেমনি পারিবারিক জীবনেও Money is becoming guardian of every family (অর্থই প্রত্যেক পরিবারের অভিভাবক হয়ে উঠছে), বাবা ততোক্ষণই Head of the family (পরিবারের প্রধান) যতোক্ষণ তিনি রোজগার করেন।

 

পরিবারগত সীমানায় যখন বাবা-মাকে ছেলের রোজগার খেতে হয়, তখন ছেলে এবং ছেলের বউই নিজ নিজ ক্ষেত্রে Virtually head of the family (যথার্থই/প্রকাশ্যেই পরিবারের প্রধান) হয়ে দাঁড়ায়। শত অন্যায় করলেও বাবা-মা তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো প্রতিবাদ জানাতে ভরসা পান না। বাবা-মার হিসাবের বাইরে কোনো ছেলে-মেয়ে সামাজিক আন্দোলনে এলে, তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, ‘তোদের খাইয়েছি, পড়িয়েছি এই জন্য’? এ যেন Investment, Return (বিনিয়োগ, প্রতিদান) চাই। প্রেম-দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রেও এই একই অবস্থা। ‘প্রেম করবো হিসেব করে- ডিগ্রী, চাকরী, ব্যাংক ব্যালান্স দেখে। দুর, ওর চাল-চুলো নেই, টাকা পয়সা নেই, ওকে আবার কি ভালবাসবো ?’ চরিত্রের গুণ নয়, ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এটাই আকছার বিচারের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে- দাম্পত্য জীবনেও তেমনি রেজাল্ট ফলছে, হু হু করে বাড়ছে ডিভোর্স। কে কতো ভালোবাসে তা শাড়িতে, গহনায়, সিনেমায়, গাড়িতে, বাড়িতেই নির্ণীত হয়। এসব কথা বলবার উদ্দেশ্য এই নয় যে- সব পরিবারে, সব জীবনেই এই জিনিস হয়ে গেছে। শুধু সমাজে কী ঘটেছে, কী ঘটতে যাচ্ছে- সেটাই দেখাবার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবার আপনারাই বলুন, সব বুঝেই এই আনন্দের জন্যই কি আমরা সমাজ প্রগতির আন্দোলন থেকে পালিয়ে আসবো? নাকি, যে সমাজ তিলে তিলে আমাদেরকে ধ্বংস করছে, যেখানে মাতৃত্ব-পিতৃত্ব আজ ধুলোয় লুণ্ঠিত, যেখানে জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই, যেখানে এনজিও’র ঋণশোধ না করতে পারায় অহরহ গলায় দড়ি দিয়ে কিংবা বিষপানে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। অপরের প্রশ্নে নয়, নিজের প্রশ্নেই এই সমাজকে মেনে নেবো? নাকি মানবীয় মর্যাদার নিক্তিতে একে নতুন করে গড়ে নেবো?

 

যদিও আমরা জানি এই নতুন সমাজ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে গেলে অনেকেই বলবেন, ‘এসব রাজনীতি হচ্ছে, এসব রাজনীতির মধ্যে তোমরা যাবে কেন?’ বলবে ধুরন্ধর রাজনীতিবিদরা। যারা চায় না সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের মধ্যে ছাত্ররা আসুক, তারা এইসব কথা বোঝাবে আপনাদের, বলবেন কিছু বিভ্রান্ত শিক্ষক ও বলবেন সংকট জর্জরিত কিছু অভিভাবকও। বাড়ীতেও বাবা-মা বলবে, “তোদের এত কষ্ট করে শেখাচ্ছি, পড়াচ্ছি, তোরা শেষ পর্যন্ত রাজনীতির মধ্যে নামলি। তাহলে আমাদেরকে দেখবে কে? আমাদের কী হবে?” ভাবাবে আপনাদেরও এই কথা, বাবা-মার চোখের জল পেছন থেকে টানবে। ভালো ছেলে-মেয়েদেরই টানবে। আমরা জানি, আপনাদের পিছনেও অনেক বাবা-মা আছেন যারা কষ্ট করে আপনাদের স্কুলে পাঠিয়েছেন, অভাবগ্রস্ত পরিবারে হয়তো এই মুহূর্তে কতো মা দুঃখ করছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে ছেলে পাশটা করুক, একটা চাকরি-বাকরি জুটুক, যদি ভবিষ্যতে দু’মুঠো অন্ন মেলে। স্বামী শয্যাশায়ী, ছোট ছেলে-মেয়েরা কাঁদছে- এমন মায়ের চোখের জল আপনাদের পিছনে আছে। এগুলো ভাবাবে। ফলে- একদিকে দেশের আহ্বান- কর্তব্যের আহ্বান- সমাজের আহ্বান, আর একদিকে বাবা-মায়ের চোখের জল। এই সমস্ত প্রশ্ন আপনাদের সামনে আসবে। কিন্তু তবু ভেবে দেখতে বলবো। আজকে দেশ, সমাজ, গোটা জাতি, সভ্যতা আপনাদের সামনে নতুন যে কর্তব্য উপস্থিত করেছে; তাকে কি আপনারা বাবা-মায়ের চোখের জল, ব্যক্তিগত নানান সমস্যা, এসব ভেবে উপেক্ষা করতে পারেন? চোখের জল তো ক্ষুদিরামের পিছনেও ছিল, চোখের জল ছিল ’৫২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত মুক্তি লড়াইয়ের বীর লড়াকুদের পিছনেও, চোখের জল ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ বাঙালী নেতাজী সুভাষ বসুর পিছনেও। সুভাষ বসুর বাবা-মা কাঁদেননি? প্রশ্ন তোলেননি? বিলেত পাঠিয়েছিলেন, চেয়েছিলেন ছেলে আই.সি.এস. হবে। সেই সুভাষ বসুও আই.সি.এস. ডিগ্রীর সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। বাবা-মা সেদিন দুঃখ করে বলেছিলেন যে, "এত কষ্ট করে পাঠালাম, ও পাশও করল, আর এখন কি পাগলামী করছে!" বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিঞ্জির ভাঙা প্রতিজ্ঞায় কলম চালিয়ে, কারাগারে রুদ্ধ অবস্থায় অনশন শুরু করলে; তাঁর মা কাঁদেননি? তিনিও কি ছেলের জন্য মৃত্যুমুখে পতিত হননি? দুনিয়ার বুকে যাঁরা মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করে গেছেন, তাঁদের বাবা-মায়েরা কি কাঁদেননি? এই জন্য সুভাষ বোস, নজরুল ইসলাম ও ইতিহাসের নায়কেরা কি অপরাধী? বরং পৃথিবী আজ তাঁদের কাছে চিরঋণী।

 

অনেক বড় মানুষের জীবনে এসব এসেছিল। তাঁরা বড় এইজন্যই যে- সমস্ত চোখের জলকে অতিক্রম করে তাঁরা বড় আদর্শের ডাকে, সভ্যতার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। পিতৃত্বের-মাতৃত্বের ভালোবাসার মূল্য নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু কোন ভালোবাসার মূল্য দেব? যে ভালোবাসা মানুষকে বড় হতে শেখায়, সমাজ ও সভ্যতাকে ভালোবাসতে শেখায়, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সর্বস্ব পণ করে লড়তে শেখায়- সেই ভালোবাসাই তো যথার্থ কল্যাণকর। কিন্তু যে ভালোবাসা মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পারিবারিক জীবনের প্রয়োজনে শৃংখলে বাঁধে; আদর্শহীন, রুচি বিগর্হিত আত্মসর্বস্বতার পঙ্কে নিমজ্জিত করে- সে ভালোবাসা অকল্যাণকর, সে ভালোবাসা ভালো নয়, সে ভালোবাসা মানুষকে গোলামী করতে শেখায়, অমানুষ করে।

 

আমরা নিশ্চয়ই চোখের জলের মূল্য দেবো। কিন্তু কোন চোখের জলের মূল্য দেবো? যে চোখের জল শুধু বাঁধার জন্য কাঁদে, যে চোখের জল আদর্শচ্যুত করে, কর্তব্যভ্রষ্ট করে, গ্লানিময় জীবনের দিকে ঠেলে- আমরা নিশ্চয়ই সেই চোখের জলের মূল্য দেবো না। আমরা মূল্য দেবো সেই চোখের জলের- যে চোখের জল সভ্যতার জন্য কাঁদে, নিপীড়িত মানুষের জন্য কাঁদে, সে চোখের জল হযরত মুহাম্মদ (সঃ), বুদ্ধ, যীশু, বিদ্যাসাগর, নজরুল, সুভাষ, ভাসানী, শরৎচন্দ্রের চোখের জল। মার্কস্‌, এঙ্গেলস্‌, লেনিন, মাও সেতুং এর চোখের জল।

 

সব শেষে আর একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। প্রত্যেক যুগেই যেমন সমাজব্যবস্থা, তেমন তার উপযোগী মানুষ তৈরি করার জন্য সামাজিক শিক্ষা পরিচালিত হয়। এই শিক্ষার মাধ্যমে প্রচলিত সমাজ প্রত্যেককে জীবনের কতোগুলো মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শাসক শ্রেণী, তার শাসনের প্রয়োজনে এই Valus of life (জীবনের মূল্যবোধ) ও দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়, তা না হলে শুধু লাঠির জোরে বেশি দিন শাসন করা যায় না। সেই জন্য সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে এইসব Valus of life & Outlook (জীবনের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি) পাল্টে যায়। দাসপ্রথার যুগে, দাসপ্রভুদের স্বার্থে জনসাধারণের মধ্যে দাস মনোবৃত্তি সৃষ্টি করা হতো এবং এই প্রভু-দাসের মনোভাব, দাসপ্রভু ও দাসের সম্পর্ক ছাড়াও নর-নারীর সম্পর্কের মধ্যে, পিতা ও সন্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ছিল। সে যুগে যাঁরা দাসপ্রথা বিরোধী মুক্তির আন্দোলন করেছেন, তাঁরাও ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে দাস মনোভাব বিরোধী পাল্টা শিক্ষা প্রচার করে গেছেন। আর এটা করতে গিয়েই দাসপ্রভুদের হাতে যীশু ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন, ধর্মের শাসনের ভিত্তিতে গড়া রাজতন্ত্র যে Absolute (প্রশ্নহীন/নিঃশর্ত) শাসনের প্রবর্তন করেছিল, তার প্রয়োজনেই চিন্তা ও সকল সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই দিন একই Absolute (প্রশ্নহীন/নিঃশর্ত) মনোভাবের শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। ধর্মপ্রচারক ও ভক্তদের সম্পর্ক; রাজা ও প্রজার সম্পর্ক হতে শুরু করে নর-নারীর সম্পর্ক; পিতা ও সন্তানের থেকে শুরু করে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক; সর্বত্রই এই Absolute (প্রশ্নহীন/নিঃশর্ত) সম্পর্কের মনোভাব ছিল। এই রাজতন্ত্রের Absolute (প্রশ্নহীন/নিঃশর্ত) শাসনের বিরুদ্ধে, যাঁরা ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মানবতাবাদের ভিত্তিতে মানুষকে সংঘবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, সেই রেনেসাঁর উদ্‌গাতাদের পাল্টা শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে, সামন্ততন্ত্রের হাতে নানাভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল। তেমনি আজ ব্যক্তি মুনাফার স্বার্থে পরিচালিত ধনতান্ত্রিক সমাজ, তার স্বার্থেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও আত্মসর্বস্বতার মনোভাব গড়ে তুলতে চাইছে, সেই উদ্দেশ্যেই সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করছে। যখন ধনতন্ত্র সামন্ততন্ত্রকে (রাজতন্ত্র, জমিদার প্রথা) উচ্ছেদ করতে চাইছিল, তখন Absolutism (স্বৈরশাসন) কে ভাঙবার জন্য শ্লোগান তুলেছিলো, What is reasonable truth (ন্যায়সঙ্গত সত্য কী)? ধনতন্ত্রের প্রথম যুগে অসংখ্য ক্ষুদ্র ধনপতি ছিল, তাদের বিকাশের প্রয়োজনেই গণতান্ত্রিক অধিকারও অনেক ব্যাপক ছিল। ধনতান্ত্রিক শোষণও তখন এত নির্মম রূপ ধারণ করেনি। ফলে ধনতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনও আজকের মতো এত মারাত্মকভাবে আসেনি, তাকে দমনের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার ক্রমাগত খর্ব করার প্রয়োজনও এতটা দেখা দেয়নি। কিন্তু আজ দেশে ধনতন্ত্রের বিকাশের পথেই একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থা এসেছে। ফলে গণতান্ত্রিক অধিকার মুষ্টিমেয় একচেটিয়া কারবারীদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত, যার ফলে গণতন্ত্র সংকুচিত হচ্ছে। সেই জন্যেই এদেশে ‘ইনডেমনিটি এ্যাক্ট’ বা ‘বিশেষ আইনে’র মতো বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক আইনের প্রচলন রাখতে হয় এবং সরকারী অযোগ্যতা বা দুর্নীতি রুখবার ব্যর্থতা, নির্লজ্জের মতো অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কৌশলে ব্যক্তি মালিকানাধীন করে দেয়া হচ্ছে। মূলতঃ তা হস্তগত করছে, রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনদের উঁচু মাত্রার উপরি বা ঘুষ দেয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন একচেটিয়া কারবারীরা। এমন-কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এরা ব্যক্তি মালিকানাধীন এক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছে। যার ফলশ্রুতিতে শিক্ষার ব্যয়ভার প্রচণ্ড বৃদ্ধি পাওয়াতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত দরিদ্র শ্রেণীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না এবং যথারীতি শিক্ষা কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে উচ্চবিত্তদের হাতে। আর এভাবেই রাষ্ট্রের পুরো সম্পদ এবং সুযোগ জিম্মি হয়ে পড়ছে মুষ্টিমেয় বিত্তবানদের হাতে।

 

ফলে ৮০ শতাংশ ছাত্ররা, দৈনন্দিন জীবন ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষা তথা কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অভাবে বেকারত্বের হতাশায় ডুবে গিয়ে নেশা, সন্ত্রাস বা সামাজিক বিশৃংখল ও অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। মুষ্টিমেয় বা স্বল্পসংখ্যক বিত্তবান শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী, রাষ্ট্রযন্ত্রের এই কদর্য রূপই সমাজ দেহে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফুটে উঠেছে। এখানে ‘গণতন্ত্র’ ‘গণতন্ত্র’ বলে গলাবাজী করেও ক্ষমতায় গিয়েই তারা অনেক অগণতান্ত্রিক আইন তৈরি করছে, নিজের হীন স্বার্থ ও মতেই। ফলে এরা যতোই সন্ত্রাস নির্মূলের কথা বলুক, দলীয় কোন্দল কিংবা অন্য দলগুলোর সাথে সংঘর্ষে তারা অস্ত্রবাজির ভেলকি আর ভণ্ডামি, শঠতাকে ঢাকতে পারছে না। আর এগুলো বেশির ভাগ ছাত্ররা বুঝতে পারছে এবং এর বিরুদ্ধেকোনো পথ কিংবা পাল্টা কোনো গ্রহণযোগ্য সংগঠন তারা খুঁজে পাচ্ছে না, যাদের বিশ্বাস করা যায়। পাল্টা সংগঠন হিসেবে যাঁরা সামনে আসতে পারতো, সেই বামপন্থী দলগুলোর নেতা বা নেতৃত্বদের লেজুড়বৃত্তি আজ নির্লজ্জতার পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

বাংলাদেশের সমকালীন এই রাজনীতির চরিত্র দেখে, জাতির বিবেক হিসেবে ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবেই হতাশ। রাজনীতিকে চরমভাবে ঘৃণা করে এবং এই ঘৃণিত রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যুক্তিযুক্ত পথ না পেয়ে নির্লিপ্ত হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় সত্য, তাদের সামনে রাজনীতি থেকে শিল্প-সাহিত্য পর্যন্ত আজ আর কোনো আদর্শিক ব্যক্তিত্ব নেই, যাঁকে অনুসরণ করে জেগে উঠবে কিংবা “আদর্শিক” ক্ষেত্রে এই যে শূন্যতা, তা ঢাকতে এই মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্রব্যবস্থার রক্ষক, শোষক এদেশীয় বৃহৎ দলগুলো, মানুষের মনকে ক্রমাগত ধর্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধর্মের বাণীগুলোকে বিভিন্ন কায়দায় তুলে ধরছে- যাতে, শোষণের বিরুদ্ধে তারা জ্বলে উঠতে না পারে। বিশেষতঃ ক্রমশঃ দারিদ্র্য নেমে আসা যেন তার অদৃষ্ট বা ভাগ্য কিংবা দারিদ্র্য যেন তার জন্মগত বা অদৃষ্টগত বিধাতা কর্তৃক প্রেরিত। এভাবেই বিজ্ঞানমনস্কতাকে ভেঙে দিয়ে যুক্তিহীন, প্রতিবাদহীন করে গড়ে তুলছে। ফলে অসংখ্য তরুণকে দেখি, বিভিন্ন মৌলবাদী ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের আঁখড়ায় পা বাড়াতে। এরাও ‘গণতন্ত্র’ বলে চেঁচায়, যা হাস্যকর। অথচ গণতন্ত্র সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র সচেতনতাও আছে, সে-ই জানে বৈজ্ঞানিক কারণ যদি না থাকে, তবে ‘গণতন্ত্র’ থাকলেও তা পরিচালিত হতে পারে না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, যেভাবে গণতন্ত্রের বদলে ব্যুরোক্রেসি (আমলাতান্ত্রিকতা) এবং ফ্যাসিজম্‌ [প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির শ্রমিকদের দ্বারা কলকারখানা অধিকার হওয়ার পর ‘মুসোলিনী’ নামক এক শ্রমিকনেতা (পরবর্তীতে ইতালির শাসনকর্তা) সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইংরেজ ও ফরাসীদের সাথে হাত মেলান এবং শ্রমিকদের জব্দ করার ও সাম্রাজ্যবাদীদের রক্ষা, সেই সাথে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ‘ফ্যাসিস্ট’ নামে একটি দল গঠন করেন। সুতরাং ফ্যাসিজম্‌ এমন একটি মতবাদ, যা বিপ্লবের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্য করে। এক কথায়, সাম্রাজ্যবাদের নগ্নরূপই হচ্ছে ফ্যাসিজম্‌।] মাথাচাড়া দিচ্ছে; তেমনি সামাজিক সম্পর্কের সর্বত্র, গণতন্ত্রের বদলে আমলাতান্ত্রিক মনোভাব কীভাবে দেখা দিচ্ছে, সেটা উপরোক্ত আলোচনায় কিছু কিছু দেখানো হয়েছে; এই অবস্থায় অনেক মেধাবী ছাত্র বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা সামাজিক মানদণ্ডে উন্নত সাবজেক্টে পড়াশোনা করছেন, তারা হয়তো ভাবতে পারেন, ‘আমাদের ফিউচার যথেষ্ট ভালো, আমাদের এ নিয়ে ভাবতে হবে না’। কিন্তু তারা একবারও কি ভেবেছেন- জাতির বিবেক যদি হয় ছাত্র সমাজ, তবে তারাই সেই ‘বিবেকে’র উন্নত ‘কোষ’; ফলে দায়বদ্ধতাই শুধু নয়, এটা তাদের কাছে মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও বটে। কারণ তারা যতোই মেধাসম্পন্ন হোন না কেন, পাশ করার পর তিনি তার তিল তিল করে অর্জিত শিক্ষা বা মেধার স্ফুরণ বা পরিপূর্ণ কাজে লাগাতে গেলে কিংবা তার যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে গেলে, যে মাধ্যম বা ‘পথ’ দিয়ে তাঁকে যেতেই হবে; সে মাধ্যমটি কিন্তু ওদের হাতে ধরা, যারা একদিন শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে পিছনের সারিতে বসেছে। টাকার জোরে কিংবা শিক্ষার নামে, নোংরা কুশিক্ষার পশুশক্তির বলে আজ সে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, মেধাসম্পন্ন, সুশিক্ষিত কিংবা প্রথম সারির ছাত্রটির ‘বস’ এবং শুধু হুকুম মানা ছাড়া ঐ মেধাবী ছাত্রটির কোনো মৌলিক কিছু দেবার নেই- সে পথ বা সুযোগ নেই। তাহলে কী মূল্য রইলো সেই প্রথম সারির মেধা বা শিক্ষার, কিংবা কতোটুকু মূল্যায়িত হবে তার যোগ্যতার এবং ঐ পিছনের সারির ভোঁতা ছাত্রটি নেতা হয়েই বা দেশকে কতোটা সামনের সারিতে এগিয়ে আনতে পারে? যে মেধা- যে শিক্ষা দেশকে কিছু দিতে পারে না- জাতিকে কিছু দিতে পারে না- ভবিষ্যত প্রজন্মকে কিছু দিতে পারে না; সে শিক্ষা বা মেধা কি আদৌ সাম্মানিক? অথবা যে শিক্ষা দিয়ে শুধু নিজের ভাবনা ভেবে গেলো, ক্যারিয়ার হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠায় স্বীয় আত্মবোধ নিজ হাতে বিকিয়ে দিলো, তার সাথে কি একটি কুকুর, বিড়াল বা জানোয়ারের কোনো পার্থক্য আছে? কারণ- কুকুর, বিড়াল কিন্তু শুধু নিজের খাদ্য নিয়েই, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, অন্যের কথা ভাবতে পারে না, এজন্যই সে পশু এবং শুধু বিবেকবোধের কারণেই- অন্যান্য প্রাণী বা পশু থেকে মানুষ ভিন্ন। যে প্রকৃত শিক্ষায় সত্যিকারের মানুষ, তাকে তো অন্যের কথা ভাবতেই হবে এবং তা সামাজিক ও মানসিক দায়বদ্ধতা থেকেই। আজকের এই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠাকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলার শিক্ষা, ছাত্রদের আত্মসর্বস্ব পশু বানিয়ে ফেলার এক অশুভ শিক্ষায় পরিণত হতে বাধ্য হচ্ছে। আর তা ধনতন্ত্রের স্বার্থে।

 

তাহলে ধনতন্ত্রই কি মূল সমস্যা?

 

সমাজ বিকাশের ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে- আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা, দাস সমাজব্যবস্থা ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পেরিয়ে পৃথিবী ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পর্যবসিত হয় এবং ধনতন্ত্র বিকশিত হতে হতে তার সর্বোচ্চ রূপ সাম্রাজ্যবাদে উত্তরিত হয়ে বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুঘণ্টা বাজাচ্ছে। এমতাবস্থায়ও ধনতন্ত্র টিকে আছে, কারণ- সারা দুনিয়া জুড়েই আজ চলছে মতাদর্শগত তীব্র সংকট। মূলতঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর পর থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে মতাদর্শগত উত্তরণ ঘটেনি। ফলে ধনতন্ত্র তার স্বীয় স্বার্থে নতুন নতুন ভাবাদর্শ তৈরি করে আমাদের প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কারণ- ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাজারভিত্তিক এবং তা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শুধু ‘মুনাফা’কে সামনে রেখেই চালিত। আইন, আদালত, পুলিশ বা রাষ্ট্রিক নিয়ন্ত্রণশক্তি এই ব্যবস্থায় শুধু ব্যক্তি মুনাফাকেই তথা সম্পত্তি রক্ষাকে সামনে রেখেই চালিত হয়। মানবীয় গুণগুলি সে কখনই দেখে না বা দেখতে পায় না। ফলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সুষম বণ্টন প্রক্রিয়া এই ব্যবস্থায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানবীয় প্রয়োজন বা গণতান্ত্রিক অধিকার তো দূরের কথা, মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে দেশের সিংহভাগ অর্থ কেন্দ্রীভূত হওয়াতে সাধারণ মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, বেকারত্বের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান দ্রুত হ্রাস পায়, রাষ্ট্র কর্তৃক কর্মের নিশ্চয়তার প্রশ্নই ওঠে না। অপর দিকে, রাষ্ট্রিক সুযোগ-সুবিধা মুষ্টিমেয় লোকদের হাতে থাকাতে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আইন-শৃংখলা এমন-কি দেশের উন্নয়ন পর্যন্ত মুনাফার ফাঁসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় দেশের মানুষের উপর ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। মানবীয় প্রয়োজন, গণতান্ত্রিক অধিকার, যোগ্যতার বৈধ প্রাপ্তি প্রভৃতি এক্ষেত্রে ভূ-লুণ্ঠিত, অসম্ভব এবং অবাস্তব। ফলে এখানে একদিকে যেমন ডাক্তারী পাশ করা অনেক তরুণ বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলছে, তেমনি অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। আর্থ-সামাজিক প্রতিটি স্তরে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, অসম বণ্টন; সব ক্ষেত্রই আজ স্থবির কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় ঘেরা।

 

সমস্ত পৃথিবী জুড়ে আজ এই সংকট। মানুষ আর মানবিকতার প্রশ্নে নয়- বাজারের প্রশ্নে বিশ্ব হয়ে উঠেছে অখণ্ড। বিশ্বকে আজ বলা হয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’‌‌। বিশ্বায়নের এই জগদ্দল পাথরের চাপায় পিষ্ট মানবসভ্যতা। যার প্রথম শিকারে পরিণত হয় তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো। ঠিক চৈত্রের খড়দাহে শুষ্কতা পায় যেমন অগভীর ছোট খাল-ডোবা। তেমনি বিশ্বসংকটের প্রথম ঘাগুলো আছড়ে পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সেক্ষেত্রে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে ওঠে এখানেই। আর এটা বিশ্ব ধনবাদীরা জানে বলেই এখানকার শিক্ষা, সাহিত্য, মনন, শিল্প, সংস্কৃতি তথা সমাজের উপরিকাঠামো তারা এমনভাবে গড়ে তোলে (মিডিয়ার সাহায্যে এবং অর্থনৈতিক বা কাঠামোগত ক্ষেত্রে মূলতঃ এই উদ্দেশ্যে তৃতীয় বিশ্বে ছেড়ে দেয়া এন.জি.ও. সংস্থাগুলোর মাধ্যমে), যাতে করে শিক্ষিত যুবসমাজ ও তাদের নৈতিকতা; যা চেতনাগত বিকাশের উপর নির্ভরশীল, যা না থাকলে মানুষের মধ্যে এই বোধটুকু জন্ম নেয় না- ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ কিংবা ‘একে অপরের প্রতি আমরা’; অথবা তাদের মধ্যে সেই মনুষ্যত্ববোধের জন্ম দেয় না- যার মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে- মানুষ মানুষের দ্বারা শোষিত হলে তাকে মনুষ্যত্ব বা সভ্যতা বলা যায় না- এই অমানবিক মনোবৃত্তি তাদের মধ্যে গড়ে তোলে। ফলে আমরা আমাদের চারপাশে অসংখ্য সমস্যা থাকলেও তা ধরতে পারি না বলে সমস্যার সমাধানও করতে পারি না। এ-তো গেল বিশ্ব ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে আমাদের দুরবস্থার চিত্র। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সাম্রাজ্যবাদী রূপ ধারণ করার পূর্ব পর্যন্ত যখন তা প্রগতিশীল এবং সামন্ততন্ত্রের বিপরীতে আশীর্বাদ স্বরূপ ছিল, তখন ধনতন্ত্রের হাত ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গেলেও আমাদের দেশ তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, এরই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত এদেশে শিল্প কারখানার বিকাশ তো হয়ই-নি বরং তা আজ ধ্বংসের পথে। ফলে সাম্রাজ্যবাদী রূপ তো দূরের কথা এদেশীয় ধনতন্ত্রের যা বিকাশ, তা বিদেশী প্রভুদের অঙ্গুলি হেলনেই চালিত, এককথায় দালাল প্রকৃতির। অর্থাৎ যা আশীর্বাদস্বরূপও এদেশে আসেনি বা বিকশিতও হয়নি। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ‌‘গ্লোবাল ভিলেজে’র একজন নগণ্য সদস্য বলে বিশ্ব ধনতন্ত্রের বৈরি হাওয়া তাকেও ছুঁয়ে যায় কিন্তু এদেশীয় সমস্যা শুধুমাত্র ধনতন্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তা শুরু হয়েছে ধনতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ ধরেই। অর্থাৎ ধনতন্ত্র বৈশ্বিক সমস্যা হলেও, এদেশে ধনতন্ত্র নয়, মূল সমস্যা আরো গভীরে- তার জন্মকালীন সময়ের মধ্যেই রয়ে গেছে।

 

তাহলে কী সেই সমস্যা?

 

আমরা দেখেছি যে, পৃথিবী থেকে ইতোপূর্বে যে তিনটি বিশ্ব ব্যবস্থা চলে গেছে তার সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিলো। আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার সময় পৃথিবীর অপরাপর মহাদেশের আদিম ট্রাইবদের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের আদিম ট্রাইবরাও গুহায়, বনে-জঙ্গলে, গাছের ডালে বসবাস করতো এবং শিকারই ছিলো তাদের জীবিকার প্রধান উপায়। তৎপরবর্তী দাস সমাজব্যবস্থায় ভারতবর্ষে, গ্রীস ও রোমের ক্রীতদাস প্রথার সাথে তুলনীয় দাসত্ব প্রথা না থাকলেও একথা সত্য যে, দাস সমাজ ব্যবস্থা এখানেও ছিল অর্থাৎ সেই সময় ভারতবর্ষে প্রকৃত অর্থেই দাস-দাসী ক্রয়-বিক্রয়ের প্রথা ছিলো। শুধু ক্রয়-বিক্রয় নয়, দাসী দান করাও ছিলো আভিজাত্যের পরিচায়ক। যেমন ধর্মীয় গ্রন্থ ঋগ্বেদে [ঋগ্বেদঃ সনাতন ধর্মের প্রথম ধর্মীয় গ্রন্থ, যা সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা বোঝার জন্য ইতিহাসবিদদের নিকট আকড় গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।] আছে- “কুরুকৎসের পুত্র এসদস্যু আমাকে পঞ্চাশ জন দাসী দান করেছিলেন”(২)। আবার অন্যত্র দেখি- “অঙ্গদেশের রাজা, দশ হাজার দাসী- যাদের তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে এনেছিলেন, তাঁর ব্রাহ্মণ পুরোহিত আত্রেয়কে দান করেছিলেন”(৩)। আবার সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তথা রাজা ও জমিদারী প্রথা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার মতো এখানেও বিদ্যমান ছিলো, যা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বিশ্ব যখন ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন থেকে আমরা এই বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। কারণ ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিশ্ব যখন ধনতন্ত্রে প্রবেশ করে, তার পূর্বেই ১৭৫৭ সালে আমরা ব্রিটিশ কর্তৃক পরাধীনতার শৃংখলে বিদ্ধ হয়ে পড়ি। মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশদের পূর্বে যে সমস্ত শাসক দীর্ঘসময় এদেশ শাসন করেছেন, তাঁরা অনেকেই বাইরে থেকে এলেও এদেশেই তারা মিশে স্বদেশী হয়ে উঠেছিলেন। অর্থাৎ এদেশের জনসমাজকে সামনে নিয়ে শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন এবং পরিচালনা করেছিলেন, যা সামন্ততন্ত্র পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা চালিত হয়েছিলো এদেশ নয় ‘বিদেশ’ তথা ব্রিটিশকে সামনে রেখে।

 

সুতরাং ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থকেই সুসংহত করার প্রশ্নে এদেশের তৎকালীন শাসকশ্রেণী ও অভিজাতবর্গকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কারণ তারা জানতো যে, এদেশের শাসকশ্রেণী ও অভিজাতবর্গকে (যারা মূলতঃ রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ও রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল) নিশ্চিহ্ন করতে না পারলে তাদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হতে বাধ্য। ফলে শাসক শ্রেণী ও অভিজাতবর্গকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্য দিয়ে এখানে রাজনৈতিক স্তরে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই শূন্যতা পূরণ করার প্রয়োজনে ইংরেজরা এদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে নিজেদের স্বার্থরক্ষায় নিজেদের ভাবধারা শিক্ষা দিয়ে অর্থনৈতিক নেতৃত্বে ব্রিটিশ পদলেহীদের নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারী অর্পণ করে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে সচেষ্ট হয়। অন্য দিকে, ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ বা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ -এর ঘৃণ্য নীতিকে গ্রহণ করে, অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিমকে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি বা বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে তারা যাতে নিজেদের মধ্যে কলহতে ব্যস্ত থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হয়, এর জন্য সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ব্রিটিশ শাসনের সে নীতির পথ ধরে প্রথম আর্থিক ক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠিত ও বনেদি জমিদার শ্রেণীর (মূলতঃ মুসলিম জমিদার) স্থলাভিষিক্ত হয় সমাজের মধ্যবিত্ত থেকে উঠে আসা উঠতি পুঁজিপতি ও হিন্দু মহাজনেরা এবং হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে মুসলিমদেরকে জমিদারী অর্পণ করা হয়। যাতে শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে নিজেরাই নিজেদের শত্রু হয়। (উল্লেখ্য, এই উপমহাদেশে আজকের যে হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িকতার বিষ সমাজ-মননে কম-বেশি রয়ে গেছে, তা এই নীতি থেকে জন্ম নিয়েছে; অর্থাৎ ব্রিটিশমুক্ত হলেও ব্রিটিশদের জন্ম দেয়া বিষবৃক্ষের ফল এখনো ফলছে)। এরা তারাই, যারা কিনা ব্রিটিশ বেনিয়াদের তল্পিবাহক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং ব্রিটিশ বেনিয়া কর্তৃক নানা খেতাবে ভূষিত হয়ে (খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর, তালুকদার, পত্তনদার, মুন্সি, চৌধুরী, নবাব ইত্যাদি) এদেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাদী স্বাভাবিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ইতিবৃত্ত ঘটায় এবং ব্রিটিশ সহযোগী হিসেবে একটি বিকারগ্রস্ত রাজনৈতিক ধারার জন্ম দেয়।

 

অপর দিকে, রবার্ট ক্লাইভ কর্তৃক প্রবর্তিত দ্বৈতশাসন [দ্বৈত শাসনব্যবস্থাঃ এই শাসন ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে ইংরেজদের হাতে আর শাসনকার্যের ভার থাকে নবাবের হাতে। রাজ্যের সম্পূর্ণ শাসন এভাবে ভাগ হয়ে যাওয়া ইতিহাসে 'দ্বৈত শাসন' নামে পরিচিত। রাষ্ট্র পরিচালনার সব দায়িত্ব নবাবের হাতে থাকলেও অর্থনৈতিক কোনো অধিকার তাঁর থাকলো না। অপর দিকে, রাষ্ট্রীয় কোনো দায়-দায়িত্ব কোম্পানীর রইলো না; কিন্তু রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতা অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে গেলো কোম্পানীর হাতে।] ব্যবস্থা এদেশের অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে থাকে। এ-ব্যবস্থার ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের সকল ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ বেনিয়া ও তাদের অনুগত এদেশীয় কিছু বণিকদের হাতে। এমতাবস্থায় সাধারণ প্রজা ও কৃষকদের উপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের অত্যাচার বেড়ে যায়। উপরন্তু ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত [চিরস্থায়ী বন্দোবস্তঃ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে তৎকালীন বাংলার গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস জমিদারদের সাথে ১০ বছরের জন্য দশসনা বন্দোবস্ত করেন (১৭৯০ সাল)। এটিই পরবর্তীকালে (১৭৯৩ সাল) চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রূপ লাভ করে। ] ঘোষণা করায় জমির উপর প্রজাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে রহিত হয়। এবার তারা হয়ে পড়ে জমিদারের শোষণের শিকার। এ-সময় ঘন ঘন দুর্ভিক্ষ হতে থাকে, বাংলার সম্পদ পাচার হতে থাকে ইউরোপে; রাজস্ব ক্ষেত্রে দেখা দেয় অনিয়ম ও অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্য। ক্ষুদ্র শিল্প ও কারখানাগুলো (তাঁতীদের হাত কেটে দেয়ার মতো ঘৃণ্য অত্যাচার এ-সময়েই চলে) ক্রমে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। উপরন্তু এদেশীয় পণ্যসামগ্রীর রপ্তানীর উপর বিভিন্ন বিধি-নিষেধ ও অত্যধিক শুল্ককর আরোপ করে ইউরোপের তৈরি পণ্যসামগ্রী কম শুল্কে এদেশে আমদানী করায় অনিবার্যভাবেই এদেশীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যায়, পক্ষান্তরে ইউরোপের দ্রব্যসামগ্রীর দাম কমে যাওয়ায় ক্রেতারা ইউরোপীয় পণ্য কেনার দিকে ঝুঁকতে থাকে। এভাবে এদেশীয় বস্ত্র, রেশম, চিনি ইত্যাদি শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়; অপর পক্ষে- ইউরোপীয় পণ্যসম্ভার এদেশের বাজার দখল করে নেয়। এতকাল বাংলার মসলিন, সুতি বস্ত্র, রেশমী বস্ত্র বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্যের সুনাম ছিল পৃথিবী জোড়া; মুঘল, পাঠান, গুজরাটী, আরমানি এবং ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে যা ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা বিশ্বে অথচ তা ব্রিটিশ কর্তৃক একচেটিয়া বাণিজ্যের কুট-কৌশলের কারণে ভেঙে পড়ে। এমনি করে এদেশের ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে এই সকল পেশার সঙ্গে জড়িত অসংখ্য কারিগর বেকার ও সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে। প্রথমতঃ অত্যধিক রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে, দ্বিতীয়তঃ একচেটিয়া বাণিজ্যের মাধ্যমে শিল্প-কারখানা বন্ধ করে এদেশীয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক চরম দুর্দশা ডেকে আনে। ফলে বারবার দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে সাধারণ প্রজারা [উদাহরণ ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত (১১৭৬ বঙ্গাব্দ)। এতে এদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়, ১৮২৫ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে দুর্ভিক্ষ হয় দুইবার- মৃতের সংখ্যা ৪ লক্ষ, ১৮৫০ থেকে ১৮৭৫ সালের মধ্যে ছয়বার ও ১৮৭৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে ১৮ বার- মৃতের সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লক্ষ]।

 

অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থার (Base) স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ বা থেতলে দিয়ে ব্রিটিশরা কেবল নিজেদের শোষণ ও শাসনগত স্বার্থের দিকটাতেই গুরুত্ব ও পরিবর্তন তথা যন্ত্র বা আধুনিকায়নের আওতায় আনা বা আসতে দেয়া এমনকি এই পরিবর্তনটুকুও প্রধানত প্রশাসন (রেলপথ স্থাপনের মত আধুনিকায়নও এদেশে শিল্প বিকাশের স্বার্থে হয়নি বরং প্রশাসনিক যোগাযোগসহ ঔপনিবেশিক শাসনগত সুবিধার শর্তেই স্থাপিত।) বা আইন কানুন তথা উপরিকাঠামোকে বা Superstructure কে ঘিরেই ঘটেছে। ফলে সেটাও অসামঞ্জস্যতায় আধাকাঁচড়া বা অসম্পূর্ণ। কারণ ব্যাপক জনসমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল শাসনগত পরিবর্তন কোন অবস্থাতেই কোন রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুসারেই স্বাভাবিক হতে পারে না।

 

[উল্লেখ্য যে কোন সমাজব্যবস্থায় বিদ্যমান উৎপাদন ব্যবস্থাকে Base বলে আর উৎপাদন সম্পর্ককে ঘিরে যে বিধি-বিধান, আইন-কানুন, শিক্ষা-মনন ইত্যাদি যা উক্ত সমাজের Superstructure এবং যেহেতু Base তথা উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঘিরেই রাষ্ট্র, বিধি-বিধান, মনন ইত্যাদি তাই সমাজ-ইতিহাসে উৎপাদন ব্যবস্থা বা Base দ্বারাই উক্ত সমাজকে নির্দিষ্ট বা চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সমাজ ব্যবস্থা বলতে উৎপাদন ব্যবস্থা =উৎপাদনের উপকরণ+উৎপাদিকা শক্তি। যেমন দাস সমাজে উৎপাদন শক্তি ও উপকরণ বলতে দাসকেই বোঝায় অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় দাস-ই Base বা ভিত্তি বিধায় উক্ত সমাজকে দাস সমাজ বলা হয় এবং উক্ত সমাজে দাস-মালিককে ঘিরে আইন-কানুন তথা উপরিকাঠামো যা Superstructure হিসাবে নির্দিষ্ট। তদ্রুপ সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ভূমি ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা অর্থাৎ উৎপাদন উপকরণ বলতে মূলতঃ ভূমি এবং উৎপাদিকা শক্তি বলতে ভূমিদাস বা কৃষক যাকে Base বলে এবং ভূমি-মালিক বা সামন্তপ্রভূর সাথে ভূমিদাস বা কৃষকের সম্পর্ককে ঘিরে আইন-কানুন তথা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে Superstructure বা উপরিকাঠামো, এমনিভাবেই উৎপাদন ব্যবস্থা দ্বারাই ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নির্দিষ্ট, যেখানে উৎপাদন উপকরণ তথা যন্ত্রপাতি, শিল্প, কলকারখানা ইত্যাদি এবং উৎপাদন শক্তি বলতে শ্রমিক- এই দুটো মিলে Base এবং শিল্পমালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ককে ঘিরে যে আইন-কানুন তা-ই উপরিকাঠামো বা Superstructure । অর্থাৎ সমাজ বিবর্তনের ধারায় এভাবেই আদিম সমাজ, দাস সমাজ, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ইতিমধ্যে বিগত ও নির্দিষ্ট হয়ে বর্তমানের ধনতান্ত্রিক সমাজে মানুষ পৌঁছেছে।]

 

এদিকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা এদেশের প্রচলিত ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করলেও (কারণ- সংস্কৃত ও ফার্সি জানা পণ্ডিত ও মৌলভীদের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা জজ কোর্টে নিয়োগ দিতে হতো) শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিশেষতঃ কেরানী শ্রেণীকে গড়ে তোলার প্রয়োজনে পরবর্তীতে ইংরেজী শিক্ষার প্রসার তাদের পক্ষে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ফলে তারা ইংরেজী শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করে। এ ব্যাপারে খ্রিস্টান মিশনারীরাও সাহায্য করে। তারা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে, ফলে ইংরেজি শিক্ষার গতিও বেড়ে যায়। যে সকল ইংরেজ কর্তা-ব্যক্তি এ-ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন- তাঁদের মধ্যে লর্ড হেস্টিংস, অ্যালফিন স্টোন, ম্যালকোম, মনরো ও ম্যাটকাফের নাম উল্লেখযোগ্য। ১৮১৭ সালে বিচারপতি এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট ও ঘড়ি ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ার কলকাতার কিছু শিক্ষিত হিন্দু ব্যক্তিত্বদের নিয়ে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংক এর তত্ত্বাবধানে সরকারী উদ্যোগে বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজী বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, আইন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। শুধু কলকাতা নয়, কলকাতার বাইরেও এর জোয়ার ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই ১৮৩৬ সালে হুগলী কলেজ, ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজ, ১৮৪৫ সালে কৃষ্ণনগর কলেজ, ১৮৫৩ সালে বহরমপুর কলেজ এবং ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা বেশি ছিল না। কারণ- রাজ্য হারিয়ে (তখন শাসক ছিল মূলতঃ মুসলিমরাই) মুসলমানরা ইংরেজদের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছিল এবং আর্থিকভাবেও তারা দরিদ্র হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে মুসলমানরা যখন দেখলো যে, ইংরেজী শিক্ষার কারণে হিন্দুরা সরকারি চাকুরি লাভ করছে- তখন তারা ইংরেজী শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে থাকে। এরই ফলে তৎকালীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম সামন্ত স্যার সৈয়দ আহমদ কর্তৃক আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, মোহামেডান এ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ, অনুবাদ সমিতি ও মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন প্রতিষ্ঠা পায় এবং সমসাময়িক সময়ে আরো অনেকেই তাঁর এই পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। অর্থাৎ সামাজিক আর্থব্যবস্থা বা কাঠামো (Base)-কেই শুধু নয়, উপরিকাঠামো বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক মনন (Superstructure)-কেও ব্রিটিশ বা বিদেশমুখী করে তোলে।

 

[এইভাবে ধীরে ধীরে এদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা শেকড়বিচ্ছিন্ন হয়ে ইংরেজদের কেরানী তৈরির কারখানায় পরিণত হয়। কেরানী তৈরির প্রয়োজনেই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা তারা করলেও আমরা দেখলাম যে, পাশ্চাত্য এই শিক্ষাব্যবস্থা এদেশীয় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটায়, যা ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু পাশ্চাত্য এই শিক্ষাব্যবস্থাসমাজের উপরিকাঠামোতে যে পরিবর্তন সূচিত করে, তার প্রভাব এত সুদূরপ্রসারী যে- আজও আমরা তার ক্ষতিকর শিকারে পরিণত হচ্ছি। কারণ এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পাশ্চাত্য ধারায় প্রণীত হয়। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চস্তর পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে পাশ্চাত্য দার্শনিক, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবেত্তাদের উদ্ধৃতি টানা হয়, শুধু তা-ই নয় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশী গ্রন্থগুলো পড়ানো হয়। ফলে আমরা যা কিছু শিখছি তার প্রায়োগিক ক্ষেত্র হয়ে উঠে বিদেশ; স্বদেশ নয়। আর তাই স্বদেশে থেকেও আমরা হয়ে উঠি বিজাতীয়, বিদেশপ্রীতি হয়ে উঠে আমাদের মজ্জাগত, চতুষ্পদ জানোয়ারের মতো বিদেশীপ্রভুদের পদলেহন আমাদের কাছে হয়ে উঠে সাম্মানিক ও বাহবার বিষয়। আমাদের স্বীয় অগ্রগতির প্রশ্নে আমরা অবশ্যই সারা বিশ্ব জানবো, তন্ন তন্ন করে জানবো, কিন্তু তা স্বদেশকে বাদ দিয়ে কেন? প্রশ্ন কি ওঠে না- এদেশে কি কোনো দার্শনিক, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী বা ইতিহাসবেত্তাদের জন্ম হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। তাহলে তাঁরা কেন আমাদের স্বদেশ শিক্ষার মানদণ্ড হন না? কেন স্বাধীনতার এতকাল পরেও আমরা বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্বদেশে থেকেও বিজাতীয় হবো? এ-ধরণের হাজারো প্রশ্ন আজকের শিক্ষিত তরুণদের আর ক্ষত-বিক্ষত করে না! কারণ ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তথা সমাজের উপরিকাঠামোকেও তাদের মুখী করে গড়ে তুলতে পেরেছিলো, যার প্রভাব এখনো আমাদের মধ্যে সক্রিয়ভাবেই বিদ্যমান। তাই শিক্ষিত অংশের রুচি, পোশাক, চিন্তা, চেতনা বা মনন বিদেশ অনুসরণে এত লালায়িত, নিজেদের জীবনে তা প্রতিফলিত করে এত ন্যাংটো অহংবোধ বা বাহবা পেতে অভ্যস্ত। ]

 

অন্যদিকে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর সারা ভারতবর্ষে যখন খণ্ড খণ্ড আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিলো তখন ঐ সকল আন্দোলনকে স্তিমিত করার প্রশ্নেই ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে ও অনুমোদনে ভারতীয়দের অধিকার সংরক্ষণের অজুহাতে ১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠিত হয় (এদেশের নেতৃবর্গও তখন নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তা করছিলো), যার প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন একজন ইংরেজ কর্তাব্যক্তি, নাম- এ্যালান অক্টেভিয়ান হিউম। সুতরাং বোঝাই যায়, তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কতোটা ভারতপ্রেমিক ছিল! এসবের মধ্যেও বাংলার মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীরা ক্রমশঃ জাতীয়তাবাদ ও রাজনীতিসচেতন হয়ে উঠছিলেন, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছিল। শুধু তা-ই নয়, বাংলার হিন্দু-মুসলমানদের মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে মোটেও নিরাপদ ছিল না। সুতরাং কলকাতা থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র সরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন তারা অনুভব করে। আর তাই প্রশাসনিক সুবিধা ও পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বক্তব্যকে সামনে এনে তৎকালীন ভারতবর্ষের বড়লাট কার্জন তাঁর "বিভেদ ও শাসন" নীতি প্রয়োগ করে বাংলাকে বিভক্ত করলেন, যা ইতিহাসে 'বঙ্গভঙ্গ' নামে পরিচিত। কংগ্রেস এই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেও, কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃত্বের সংখ্যাধিক্য থাকায় মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষ অবলম্বন করলো এবং তথাকথিত জাতীয় চেতনার উন্মেষের ফলে তারা পৃথক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো। ১৯০৬ সালে ইংরেজদের সহায়তায় মুসলিম সামন্তর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক সংগঠন 'মুসলিম লীগের' জন্ম হলো। মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রের তিনটি উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল- "ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্যবোধ বৃদ্ধি করা" (৪) এবং সরকারী বিধি-ব্যবস্থা সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে কোনো ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে না দেওয়া। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরেই কট্টরপন্থী হিন্দুদের দ্বারা একটি হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন "শ্রী ভারত ধর্মমণ্ডল" ইংরেজদের সহায়তায় গড়ে ওঠে, ফলে হিন্দু-মুসলিম বিরোধিতা চরম আকার লাভ করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে নির্বিঘ্ন ও টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গৃহীত "বিভেদ ও শাসন" নীতির ঘৃণ্যতা এত সার্থকভাবে ফলপ্রসূ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল শুধু এই উপমহাদেশীয় নেতৃত্বের জন্য, যারা ব্রিটিশ ভাবধারায় পুষ্ট অংশ থেকে জন্ম নেয়া (শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আর্থিক অবস্থানগত ক্ষেত্র থেকে) বলে। দেখা যাচ্ছে যে, ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমে 'কংগ্রেস' এরপর 'মুসলিম লীগ' ও পরে 'শ্রী ভারত ধর্মমণ্ডল' গঠিত হয় (গুপ্ত সংগঠনগুলো ব্যতিরেকে), যা পরোক্ষভাবে ইংরেজদের স্বার্থকে পুষ্ট করতে থাকে। এভাবে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ধারায় একমাত্র বিপ্লবী ধারা (গুপ্ত সংগঠন সমূহ ও পরবর্তীতে কমিউনিস্ট ধারা) ছাড়া অন্য সব দলগুলোই প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ ঔরসজাত (কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ যে ধারার নেতৃত্বে ছিল), যা শেষ পর্যন্তও ব্রিটিশবিদ্বেষী রূপ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারেনি এবং এদের সংগ্রাম মূলতঃ পূর্বোল্লিখিত "ভাগ করো, শাসন করো" (Divide and rule) তথা সাম্রাজ্যবাদী ঘৃণ্য নীতিকেই তাদের সংগ্রামের মধ্যে বিভিন্নভাবে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রতিফলিত করেছে।

 

অবশেষে এরা সংগ্রামের পথে স্বাধীনতা অর্জন নয় বরং '৪৭-এর ১৪ই আগস্ট 'ব্রিটিশমুক্ত ভারতবর্ষ'র তথা স্বাধীনতার যে ইতিহাস তা মূলতঃ ব্রিটিশ প্রদত্ত। কারণ ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার ব্যয়ভার ও ঝুঁকিপূর্ণতা (বিশেষতঃ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপট অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদীদের এই বিপ্লব-ভীতি বা ঝুঁকি থেকে) এবং মার্কিন কর্তৃক আবিষ্কৃত সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নয়া পদ্ধতি (আগে প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে শোষণ চলতো, এখন পরোক্ষভাবে আর্থিক নীতি ও কৌশল অবলম্বনে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ) করায়ত্ত করায় ব্রিটিশরাজ সেই নীতি অবলম্বনে দ্রুত ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অতঃপর সেই অনুযায়ী লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ৩রা জুলাই ভারতভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। সেই মোতাবেক ১৪ই আগস্ট তা অনুমোদিত হয়ে ভারতবর্ষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়। একটি হলো পাকিস্তান- যার দায়িত্ব ব্রিটিশরা প্রদান করে মুসলিম লীগকে (নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) এবং অন্যটি ভারত- ১৫ই আগস্টে যার দায়িত্বভার প্রদান করা হয় কংগ্রেসকে (নেতৃত্বে ছিলেন জওহর লাল নেহরু)। উল্লেখ্য ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী ও তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেওয়া দল দুটির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে তড়িঘড়ি করে ভারত ত্যাগ করে। ১৯৪৭ সালে এই ভাগের নীতিতে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান ও ভারতের সাথে বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। তৎকালীন ব্রিটিশ বেনিয়া বাংলাকে দু' টুকরো করে এক ভাগ অর্থাৎ পশ্চিমাংশ বা পশ্চিম বাংলাকে ভারতের ভাগে জুড়ে দেয় এবং পূর্বাংশ বা পূর্ব বাংলাকে (অধুনা বাংলাদেশ) পাকিস্তানের ভাগে জুড়ে দেয়। 'বঙ্গ' বা 'বাংলা', যা আপন নামেই সবচেয়ে প্রাচীনত্বের ঐতিহ্যে, স্বতন্ত্র ও পুরোনো হলেও 'ভারত' ও 'পাকিস্তান' নামক সদ্য গজিয়ে ওঠা দেশ তথা নব্য জাতীয়তাবাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে। অথচ সমগ্র উপমহাদেশের অন্যান্য ভূখণ্ডের যখন নামের পরিচয়টিও স্পষ্ট ছিল না বিধায় এই উপমহাদেশকে অঙ্গ, বঙ্গ, কৌলিঙ্গ ভাগে বা নামে বুঝতে হতো। অর্থাৎ তখনও 'বঙ্গ' আপন নামেই পরিচিত ছিল এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন প্রথম বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদের ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল, (বিশেষতঃ বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে তা বেগবান হয়ে ব্রিটিশকে আঘাত করে, ফলে রাজধানী নিরাপদ দূরত্বে তথা দিল্লীতে স্থানান্তর করে)। এমন-কি ভারতের বর্তমান জাতীয়তাবাদে যুক্ত যে ডাক 'বন্দে মাতরম', তা এই বঙ্গ থেকেই বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক উদ্ধৃত, যার কাহিনী-প্রেক্ষিত 'আনন্দ মঠ' রচিত এই বাংলা থেকে, সেই সাথে 'জয় হিন্দ' এর ধ্বনিও নেতাজী সুভাষ বসুর দ্বারা উদ্ধৃত- যিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সংস্পর্শে বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মধ্যে গড়ে উঠেছেন। [ভাষার দিক থেকেও বাংলা বা বঙ্গীয় অস্তিত্ব-প্রভাবের প্রাসঙ্গিকতা পুরনো। এদিক থেকে কোনো ভাষার আভিজাত্য নির্ভর করে তার স্থায়িত্বের প্রাচীনত্বের উপর, সে অর্থে আভিজাত্যের দিক থেকে হিন্দী ও উর্দু- উভয় ভাষাই বাংলা ভাষার হাঁটুর বয়সী। ]

 

অথচ, কথায় কথায় অনেক বুদ্ধিজীবী এমন-কি কোনো কোনো নেতা ও দলের কাছে রাজনৈতিক প্রকৃষ্টতায় ভারত-পাকিস্তানের উদাহরণ দিতে দেখা যায়। বিশেষতঃ গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝাতে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার রাজনীতির দৃষ্টান্তে 'ভারত'কে উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন, কিন্তু আমাদের দেশের সাংবিধানিক মূলনীতিতে যখন 'সেক্যুলার' শব্দটা অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল, তা ভারতের সংবিধানে অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল প্রায় ৪ বছর পর এবং আমাদের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার মাত্র ১ বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৭২ সালে প্রথম সংবিধানেই তা অর্ন্তভুক্ত হয়। আর ভারতের ক্ষেত্রে তা অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল, স্বাধীনতার ২৯ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে। আর পাকিস্তানের সংবিধান অর্থাৎ দেশ কোন নীতিতে চলবে, তা প্রণয়ন করতেই লেগেছিল ৯ বছর অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে। স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি বাংলাদেশ সরকারে কোনো ধর্মভিত্তিক দলের একক ক্ষমতাসীন হওয়া তো দূরের কথা, এমন-কি জোট রাজনীতিতেও জোটপ্রধান হতে দেখা যায়নি। রাজনীতির কলাকৌশলে যতোটুকু অস্তিত্ব বোঝা যায় ব্যাপক গণমানুষের মধ্যে অর্থাৎ ভোটের অনুপাতে ধর্তব্যের মধ্যেই আসে না। ধর্মভিত্তিক সব দল মিলেও এ পর্যন্ত বড়জোর শতকরা ৩ থেকে ৫ ভাগ ভোটপ্রাপ্তির রেকর্ড দেখা যায়। অথচ ভারতের ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক দল সরকারে ক্ষমতাসীন হওয়া থেকে এখন পর্যন্ত জোট রাজনীতিতে প্রধান ভূমিকায় আসীন। অর্থাৎ 'সেক্যুলার' অর্থে যদি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ধরা হয় তবে ভারতের ব্যাপক গণমানুষের মধ্যে তার প্রতিফলন নেই, এদিক থেকে 'কিতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই'। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আলোচনায় আমাদের ক্ষেত্রে ভারত দৃষ্টান্ত হিসেবে একেবারেই আসে না। আর পাকিস্তান গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দৃষ্টান্তে আসা তো দূরের কথা, দেশটি অদ্যাবধি রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় নিজেকে দাঁড় করাতেই পারেনি। পাকিস্তান তো বটেই এমন-কি ভারতও অদ্যাবধি নিজস্ব জাতীয়তাবাদে তথা জাতি-রাষ্ট্রের যে পূর্ণাঙ্গ চেহারায় স্থিত হওয়া, তা হয়ে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে বাংলার জাতীয়তাবাদের প্রগাঢ় বোধ ভারত-পাকিস্তান জন্মের অর্থাৎ ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ ভাগাভাগির পূর্বেই তার আপন চেহারা তথা সংগ্রামের বা ঐক্যের রূপ নিয়ে হাজির হয়েছিল। সেদিক থেকে এ-উপমহাদেশে বাংলাই জাতীয়তাবাদ তথা জাতি-রাষ্ট্র গঠনে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অগ্রগণ্য এবং সেক্ষেত্রে বাংলার তুলনা বাংলার সাথে, যেখানে দেশজ রাজনীতিহীনতার কারণে সে তার আপন দৃষ্টান্ত থেকেই পিছিয়ে পড়েছে। ফলে, রাজনৈতিক সেই দৃষ্টান্ত অনুসারে আমাদের দেশের শ্লোগান হওয়া উচিত 'বাংলা হবে বাংলার' এবং এটা তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীনত্বের উত্তরাধিকার শর্তেই।

 

প্রাচীনত্বের সাথে রাজনৈতিক এই গুরুত্ব থাকলেও বলা বাহুল্য, তৎসময়ে ব্রিটিশ প্রদত্ত এই ভাগাভাগির রাজনীতির বড় সর্বনাশটা বাংলারই হয়। এটার কারণ মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস নেতৃত্বেও প্রধান অংশ জুড়ে তদানীন্তন বাংলার নেতৃত্ব (বিশেষতঃ নেতাজি সুভাষ বসুর অন্তর্ধান সহ ব্রিটিশ সৃষ্ট ভাগাভাগি তথা সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব দোষে দুষ্ট নেতাদের চাপে সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বসু প্রমুখ বাঙালী নেতাদের কোণঠাসা হয়ে পড়া) দানকারী ভূমিকা (কংগ্রেসের দিক থেকে) ছিল অনুপস্থিত। অথচ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে যতো মানুষ সমগ্র ভারতবর্ষে শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি বাংলার এবং যতো বিদ্রোহ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে, তার সিংহভাগ হয়েছে বাংলায়। যার ফলশ্রুতিতে শেষের দিকে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজধানী বাংলা তথা কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সাথে বাংলা গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিহাসগতভাবে অগ্রগামী ছিল এই অর্থে যে- ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য এই বাংলা থেকেই অস্তমিত হয়েছিল (নবাব সিরাজদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে) এবং কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রথম ব্রিটিশমুক্ত স্বাধীনতার সূর্য বা পতাকা এই বাংলাতেই উদিত হয়েছিল (মাস্টারদা সূর্য্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে যেহেতু বিপ্লবী স্বাধীন সরকার গঠিত হয়েছিল), যা সমস্ত ভারতবর্ষকে মুক্তি অর্জন তথা উদয়ের পথ দেখিয়েছিল অথচ সেই বাংলাই শেষ দিকে ভাগের ষড়যন্ত্রে সবচেয়ে বড় বলি হয়েছিল- পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা দুই মেরুতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে (আমরা পরবর্তীতে পাকিস্তানের অধীনতা থেকে স্বাধীনতা অর্জন করলেও পশ্চিমবঙ্গ আজও ভারতীয় হয়ে আছে)। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশমুক্ত হলেও পূর্ব বাংলা পুনরায় পাকিস্তানীদের করতলগত হয়ে পরাধীনতার শৃংখলে বন্দী হয়েই থাকে। পূর্বে ব্রিটিশ ছিল, তদস্থলে পাকিস্তানীরা অধিষ্ঠিত হয়। তখন ব্রিটিশ প্রতিনিধিত্বকারী হিন্দু জমিদার-মহাজন তথা আর্থিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক স্থানের পরিবর্তে এখন সেখানে শোষকের অবস্থানে অবাঙালী পাকিস্তানী ও তার দোসররা (যারা ভারত থেকে এসেছিল) দখল নেয়। এতদিন হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা দ্বন্দ্ব ছিল যা মূলতঃ অর্থনৈতিক দিক থেকে শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্বের প্রকাশ- এখন সেটাই এলো বাঙালী-অবাঙালীর দ্বন্দ্বের রূপ নিয়ে। রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা থেকে বাঙালী (চাকুরী সূত্রে) কে পর্যুদস্ত করার লক্ষ্যে বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়। পরাধীনতার শৃংখল যে এই ঘোষণা, বাংলার জনমনে তা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। তখন ছাত্র-যুবক, তরুণরা দল-মত নির্বিশেষে বাংলা ভাষা তথা বাংলার স্বার্থে '৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারীতে এক রক্তাক্ত আন্দোলনের মাধ্যমে ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করে। '৫২-এর এই ভাষা আন্দোলন তথা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রোথিত হওয়া ভ্রূণই ক্রমশঃ সংগ্রামের পথে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে '৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পন্ন করে অর্থাৎ রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করে আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেয়। '৪৭-এর ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশমুক্ত হওয়া থেকে '৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা অর্জনের পথে দুটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য মনে রাখতে হবেঃ

 

প্রথমতঃ ব্রিটিশমুক্ত হওয়ার পরও অর্থনেতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ব্রিটিশ নির্মিত রাষ্ট্রিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু একই ছিল এবং অদ্যাবধি তা রয়ে গেছে।

 

দ্বিতীয়তঃ এর কারণ বাংলার রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা এই প্রথম (অর্থাৎ '৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরের পর) সেই অর্থে ক্ষমতাসীন (রাজনৈতিকভাবে) হয় মূলতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণী। ইতোপূর্বে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা তথা রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিল, তারা বিদেশী- ফলে ক্ষমতাসীন নতুন এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী ('৭১ পরবর্তী) থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব আন্দোলন-সংগ্রামে অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও যেমন পূর্বতনদের মতোই দেশজ চেতনা বর্জিত ছিল, তেমনি এরা একই সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও দেশকে গভীরভাবে বুঝে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে যথেষ্ট স্থিতধী দক্ষতা দেখাতে পারেনি, এমন-কি অদ্যাবধি সেই শূন্যতা পূরণ করার পরিবর্তে উল্টো ক্ষমতা সর্বস্বতায়- দেশজ বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন ক্রমশঃ ভাসমান হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ দু'দিক থেকেই চেতনাগত পঙ্গুত্বের কারণে ব্রিটিশের হাতে গড়া বিদেশী স্বার্থ রক্ষাকারী (স্বদেশবিমুখ) সেই রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাই টিকে রইলো। বিদেশী পণ্ডিত বা পাণ্ডিত্যের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের পরিবর্তে এখনও ব্রিটিশ কেরাণী সৃষ্টির সেই 'কোটেশান' ভিত্তিক জ্ঞান-গর্ভ ফলানোর রেওয়াজ বা পদ্ধতিগত ভাবধারা বা সংস্কৃতি আমাদের চিন্তা চেতনা, সাজ-পোশাক এমনকি আমাদের ধর্ম বিশ্বাসেও প্রকট। ফলে, ব্রিটিশ নেই কিন্তু বিদেশ অর্চনার অদৃশ্য 'গড়গড়ে' ভূতটা চেপে থাকায় বিদেশ মানেই ভাল কিছু- বিরাট পণ্ডিত, বড় ধার্মিক, উৎকৃষ্ট বস্তু এমনকি- বিদেশী অর্থ-সাহায্য, বিদেশ ভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প-বাজেটে যে সরকার সফল তাকে ভাল সরকার বলে আখ্যা দিতেও বাধছে না, যে কারণে বিদেশের সাথে কোনো 'লটর-পটর' মার্কা চুক্তি গোপনে সম্পাদন করেও অনেক সরকার তা বছরের পর বছর গোপন রাখার সাহস দেখায়। অথচ প্রযুক্তিগত উত্তরণের বর্তমান যুগে- সব চুক্তি সব মানুষকে দেখানোর বা জানানোর সুযোগ আছে। সামষ্টিক শর্তজাত কোনো তথ্য আজকের দুনিয়ায় গোপন বা আড়াল-আবডাল করা নিকৃষ্ট দুর্নীতি- সর্বোচ্চ মিথ্যাচার বা আমানতের খিয়ানত।

 

অবশ্য প্রযুক্তিগত পথ ধরে যেমন সবাইকে জানানো যায়, তেমনি কেউ না চাইলেও সমাজবদ্ধ বর্তমানের মানুষ তা জেনে যায়, যা ফাঁস হওয়ার তা ফাঁস হয়েই পড়ে। আজকের বাস্তবতায় যা মিথ্যা তা প্রকাশ পাবে, আর সেকারণেই যা সত্য ও ন্যায় তার প্রতিষ্ঠা হবে। তবুও ব্রিটিশ যুগের চতুরতা আজকে কাক মূর্খের পাণ্ডিত্য নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে টিকে আছে। কেবল স্বামী বিবেকানন্দের সেই সত্যবাণী 'চতুরতা দিয়ে মহৎ কাজ হয় না'- এটাই অনেক মহৎকর্মীরা বুঝছেন না।

 

সুতরাং একথা দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায় যে, দেশজ চেতনার অভাব এবং ব্রিটিশ কর্তৃক নির্মিত বিকারগ্রস্ত এই রাষ্ট্রযন্ত্র, যা বিদেশমুখিনতায় চালিত- তা আজও স্বদেশমুখিনতায় স্বদেশের হয়ে ওঠেনি। এদেশের ব্যাপক জনসমাজের স্বার্থে চালিত হয়ে এখনও হয়ে ওঠেনি বাংলার।

 

অর্থাৎ ব্রিটিশ নির্মিত এই বিদেশমুখী রাষ্ট্রিক বিকৃত ধারাই চুম্বক দণ্ডের ন্যায় তা আজ আত্ম-স্বার্থে চালিত দেশপ্রেম বর্জিতদের সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্যে তুলে এনেছে। দল-মত নির্বিশেষে স্বার্থান্বেষীরা স্বীয় স্বার্থেই ক্রমশঃ স্বদেশবিমুখ রাষ্ট্র সম্পৃক্ততার (রাজনৈতিক দলবৃত্তি) দ্বারা সংহত ও সংঘবদ্ধ; যাদের পরিচয় আজ রাজনৈতিক (যা রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততাকে প্রতিফলিত করে, তা-ই এখানে রাজনীতি হিসেবে ধরা হয়েছে), যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি স্বাধীনতার এত বছর অতিক্রমণের পথে আজ প্রত্যেকটা দল থেকে দেশপ্রেমী সৎ নেতৃত্বকে পিছনে ফেলে (দলীয় লবিং-এ পরাস্ত হচ্ছে) সম্মুখে উঠে আসছে দেশপ্রেমবর্জিত সমাজবিরোধীরা।

 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, ইংরেজরা এদেশে আসার পর থেকেই একদিকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তথা সমাজের ভিত্তিকে (Base) (পরবর্তীতে রেলপথ, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, সুতাকল প্রতিষ্ঠা করে তাদের স্বীয় স্বার্থেই) যেমন ব্রিটিশ স্বার্থবাহী করে তোলে, তেমনি অন্যদিকে শিক্ষা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে যা সম্মিলিতভাবে সমাজের উপরিকাঠামো (Supurstructure), তাকেও ব্রিটিশ স্বার্থবাহী করে ফেলে। ফলশ্রুতিতে আমরা আমাদের হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি। এই শেকড়বিচ্ছিন্নতাই আমাদের আজ ব্রিটিশমুখী থেকে বিদেশমুখিনতায় পর্যবসিত করেছে। আর তাই আজ আমরা দেশজ চেতনাবর্জিত, দেশপ্রেমহীন অথচ বিজাতীয় চেতনাসমৃদ্ধ বিদেশপ্রেমী দুর্নীতিগ্রস্ত জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই দেখা যায় বারবার সরকার পরিবর্তন করেও এদেশের সমস্যার কোনো সমাধান হয় না বরং সমস্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পায়। কারণ আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো এখনো ব্রিটিশদের তৈরি রাষ্ট্রকাঠামোর বিকারগ্রস্ততা কাটিয়ে স্বদেশী হয়ে উঠতে পারেনি। আর যে রাষ্ট্রকাঠামো বিদেশমুখী, তা আর যা-ই হোক, দেশজ স্বার্থকে কখনোই সংহত করতে পারে না। বিধায় সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন এখানে সফলতা পেলেও মূলগত অর্থে যে পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাম্য- তা এখানে কখনোই সফলতা পায়নি। সুতরাং সমস্যার সমাধান এদেশের সরকার পরিবর্তন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় কিংবা এর জন্য কোনো রাজনৈতিক দল ও সরকার দায়ী নয় অথবা শুধুমাত্র ধনতন্ত্রের মধ্যেও নয় বরং ব্রিটিশ শাসনের ফলে এখানে বিগত আড়াইশ বছর ধরে জ্ঞানজগতের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক স্তরে যে দেশজ চেতনার শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে গণমুক্তির শর্ত।

 

এই শূন্যতা পূরণ ও সংকট থেকে উত্তরণের দায়ভার বর্তায় যে ছাত্র, যুব ও তারুণ্যের উপর, তারাই প্রধানত বিশ্ব ধনবাদের 'যেন-তেন প্রকারে টাকা কামাই' সংস্কৃতির খপ্পরে পড়ে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মসর্বস্ব ভাবনার দ্বারা তাড়িত হয়ে ভাবছে "আপন ভালো তো দুনিয়া ভালো"। তারা একবারও ভাবছে না- আমার বোনটা তো ভালো অথচ দিনে রাস্তা য় বের হলেই তাকে কটূক্তি শুনতে হয় কেন; আর রাতে বের হলে ধর্ষিতা হতে হয় কেন? আমার বোনের ভালো থাকার উপর তার ধর্ষিতা না হওয়া তো নির্ভর করছে না! তাহলে কেন এই মিথ্যা আত্মপ্রবঞ্চনা? শুধু কি তা-ই! এরাই নির্বিকারচিত্তে বলে বেড়ায় "আগে প্রতিষ্ঠা, তারপর দেশভাবনা- আগে একটা ফার্স্ট ক্লাস তারপর ওসব ভাবা যাবে"। অথচ চারপাশে তাকালেই তারা বুঝতে পারবে কি ভয়ানক ভুল ভাবনা তারা ভাবছে। তার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাকে দেশ নিয়ে এক্ষুণি ভাবতে হবে, তার ফার্স্ট ক্লাসের যথাযথ মূল্যায়ন পাওয়ার প্রশ্নেই তাকে আজ ভাবতে হবে। সে সমাজবর্জিত, রাষ্ট্রবর্জিত কোনো বনের তাপস নয়, তাই তার সমস্ত জীবন যাপনের প্রক্রিয়া, উন্নয়ন, বিকাশ সবই আর্থ-সামাজিক ভিত্তির উপর নির্ভরশীল। আর এ-সবই রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার দ্বারা চালিত। রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা সংকট জর্জরিত বলেই সে সংকট জর্জরিত। এই সহজ কথাটা তার মস্তিষ্কে ঢোকে না। অথচ ফার্স্ট ক্লাসটা ঠিকই ঢুকেছে! এই 'ফার্স্ট-ক্লাস-বোঝা ভালো ছাত্র'টিও জানে, দেশটা দিনকে দিন রসাতলে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এদেশে কি প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক দল আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলছে "নেই"। এরা ভালোই বুঝতে পারছে- এদেশের ক্ষমতা বদলের সাথে দেশ পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই বরং এগুলোর বেলেল্লাপনা, ভোটাভুটির নামে মারামারি, খাওয়া-খাওয়ি ছাড়া মূলতঃ কিছুই দেয়ার নেই। আর সে কারণেই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে মনে ঘৃণা করে রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকছে, যা প্রমাণ করছে, সে রাজনীতি-সচেতন অথচ ঘৃণিত রাজনীতিকে ঘৃণা করে চুপচাপ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা মানে এইঘৃণিত অবস্থাটা জেনে-শুনে চলতে দেয়া,যা ঘৃণিত রাজনীতিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন করারই সমার্থক হয়ে ওঠে এবং সেই সাথে এই অবস্থা পাল্টানোর জন্যেও যে চাই পাল্টা সংঘবদ্ধতা, তা যখন একজন ছাত্র বুঝেও বোঝে না, শুধুই 'ফার্স্ট ক্লাস' 'প্রতিষ্ঠা'র দোহাই দিয়ে ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার ভয়ে, তখন 'ফার্স্ট ক্লাস'ধারী ছাত্রছাত্রীগুলিকে কি শিক্ষিত বলা যায়? যে শিক্ষা মানবিক বোধ গড়তে ব্যর্থ হয় এবং মানবিক বোধ থাকলে আর যা-ই হোক দেশের প্রশ্নে, মানুষ ও মনুষ্যত্বের প্রশ্নে ও নিজের ভবিষ্যত উত্তরসূরিদের প্রশ্নে জেনে-শুনে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। ভণ্ডরাও মানুষ, তাই এদের ভণ্ড বলে স্বীকৃতি দিতেও একজন সচেতন মানুষের ঘৃণা জাগা উচিত। সর্বোচ্চ এদেরকে 'জানোয়ার', নির্বোধ-মাথামোটা, ঘাসে মুখ দিয়ে চলা উন্নত প্রজাতির প্রাণী বলে করুণা করা যায়।

 

চলমান এই সমাজব্যবস্থা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর করে গড়ে তুলছে। শুধু তাই নয় অনৈতিক, মানবতাবোধ বর্জিত ব্যক্তিস্বার্থ বোধের ভুল ও মিথ্যা শিক্ষায় সমস্ত সমাজটাকে স্বার্থপর, বিষময় করে তুলছে দিনকে দিন। ফলে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা বাড়ছে; ধর্মশিক্ষা বাড়ছে কিন্তু চারিত্রিক অবক্ষয় থামছে না- দুর্নীতি কমছে না বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সত্যটা বলা মানে নাস্তিকতা নয়, স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসহীনতা নয়, বরং স্রষ্টাবিশ্বাসের সুকোমল বৃত্তি নিয়ে যারা স্রষ্টাকে কলংকিত করছে, সেই শ্রেণীর বিরুদ্ধে। যারা আল্লাহর কথা বলছে রেডিও, টিভিতে আযানের ব্যবস্থা করছে, ধর্মের কচকচানিতে মুখর হচ্ছে- আপন স্বার্থগত ব্যাখ্যায় ধর্মীয় পবিত্রতার বদলে বিকৃতি তথা একই ধর্মের মধ্যে বহু বিভাজনে ধর্মীয় নৈতিকতাকে পর্যন্ত বিষিয়ে তুলছে।

 

অর্থাৎ বর্তমানে বাজারভিত্তিক এই বিশ্বব্যবস্থায় সব কিছুই বিক্রয়যোগ্য; চরিত্র থেকে শুরু করে মগজ এবং পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত। কে, কীভাবে এবং কতোভাবে (বাজার ব্যবস্থাই নারীর দেহসৌন্দর্য বিকানোর ব্যবস্থা করে, বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা যার উদাহরণ) নিজেকে বিকিয়ে দেবে- সেটাই মুখ্য। সেই অনুযায়ী শিক্ষা-সংস্কৃতি দ্বারা গড়ে ওঠা আমরা নিজেদেরকে বাজারে বিকিয়ে দেবার জন্য শশব্যস্ত। এই বিকিয়ে দেয়ার বিক্রিত মগজ থেকেই আসছে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠাকেন্দ্রিকতা বা ফার্স্ট ক্লাসের প্রবণতা, সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও নেশার মতো অমানবীয় প্রবৃত্তিগুলি। কারণ এদেশে ফার্স্ট ক্লাসপ্রাপ্ত সেই আমলারাই সবচাইতে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, এদেশের খেটে খাওয়া কৃষক বা ব্যাপক জনমানুষ নয়, তথাকথিত শিক্ষিতরাই সন্ত্রাসের লালন সহ নেশার পৃষ্ঠপোষকতা করে। অবক্ষয়ের চিত্রটা এদের চুইয়েই ব্যাপক সমাজে বিস্তার ঘটছে।

 

এর অর্থ এই নয় যে- শিক্ষাটাই খারাপ। আমরা বলছি এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পদ্ধতি ও বৃহৎ আর্থ-সামাজিক প্রবণতা কোন দিকে এবং এটা বুঝাচ্ছি না যে, ফার্স্ট ক্লাস পাওয়াটাই সমস্যা। বরং উল্টোটাই সত্যি, অবশ্যই ফার্স্ট ক্লাস পেতে হবে- তা না হলে ফার্স্ট ক্লাসের ভূতুড়ে লক্ষ্য তাড়াবে কে? 'ফার্স্ট ক্লাস' মানে 'ফার্স্ট ক্লাস মানুষ' হওয়া এটা বুঝাবে কে? ঘুষ খাওয়া, চুরির চেয়ে নিকৃষ্ট কর্ম,কারণ পাপীর চেয়ে জ্ঞানপাপী সর্বদাই নিকৃষ্ট। একজন শিক্ষিত লোক কী করে ঘুষের মতো এত নিকৃষ্ট প্রকৃতির চৌর্যবৃত্তিতে জড়াতে পারে, এতটা বেহায়া নির্লজ্জ হতে পারে! ফার্স্ট ক্লাসের নিক্তিতে একজন ফার্স্ট ক্লাস চোর হওয়ার প্রক্রিয়া এবং তার বিপরীতে ফার্স্ট ক্লাস মানুষ হওয়ার লক্ষ্য প্রসঙ্গে কথা বলছি। দায়িত্ববোধই মানুষকে দেবত্ব দেয়, এ দেবতা স্বর্গের অলীক দেবতা নয়, মানুষের মাঝে মনুষ্যত্বের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছানোকেই দেবত্ব বুঝাচ্ছি। ইতোপূর্বে বলা ঐতিহাসিক পথিকৃৎদের অনেকেরই ফার্স্ট ক্লাস ছিল এবং মনুষ্যত্বের মূল লক্ষ্যের সাথে আনুসঙ্গিক শর্ত হিসেবেই তা ব্যবহৃত হতো অর্থাৎ আত্মস্বার্থে নয় বরং সামাজিক সংগ্রামেই ব্যবহারের দৃষ্টান্ত রয়েছে। আলোচ্য প্রসঙ্গ এটাই।

 

ধনবাদ যার প্রভাব মূলতঃ আমাদের অর্থনীতির বহিরাঙ্গে- তার পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে আমাদের আজকের এই বেহাল অবস্থা। অথচ সমস্যা যে কতো গভীরে, কতো কঠিন এবং তা যে তার জন্মকালীন সময়ের মধ্যে, যা ব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্ট, তা আমরা ঠাহর করতে পারছি না। আমরা এও বুঝতে পারছি না যে, ব্রিটিশরা আমাদের অবকাঠামো (Base) ও উপরিকাঠামো (Superstructure) ব্রিটিশমুখী করার ফলে যে বিকারগ্রস্ত রাষ্ট্রকাঠামোর জন্ম হয়েছে, তা কখনো স্বদেশের স্বার্থ রক্ষাকারী হতে পারে না। ফলে শুধুমাত্র ধনবাদের বিপক্ষে গিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধুয়া তুলে যেমন এখানে কিছুই করা যায়নি তেমনি শুধু ধর্মের জিগির তুলেও এখানে সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব নয়। কিংবা তার জন্য সরকার বদল বা রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে নেচে কুঁদে হল্লা করেও সমস্যার সমাধান হবে না। অথবা সে রাজনীতির মিথ্যা বেলেল্লাপনা মিছিলে কিংবা রাজপথে লাশ হওয়ার মধ্যে দিয়েও নয় বরং ফিরতে হবে দেশজ চেতনাকে সন্নিহিত করতে বইয়ের টেবিলে (জ্ঞানতত্ত্ব) ও পারস্পরিকতায় দৃঢ়বদ্ধতা (সংগঠন) গড়তে ছড়িয়ে পড়তে হবে চারপাশে। গণমুক্তির মহান এই লক্ষ্য পূরণে কাঙ্ক্ষিত এই দুই প্রাপ্তি দেশজ চেতনা বা জ্ঞানতত্ত্ব ও সুদৃঢ় সংগঠন গড়ে উঠতে পারে শুধু কোনো বৈজ্ঞানিক ধারায় বিশ্লেষিত, ইতিহাসনিষ্ঠ এবং সুনির্দিষ্ট আদর্শকে ভিত্তি করেই, কখনোই কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে (ব্যক্তিচেতনা) ভিত্তি করে নয় কিংবা কোনো দলনির্ভর নাচের পুতুল হয়েও নয়। অর্থাৎ মতাদর্শিক দিশাই গণমুক্তির লক্ষ্য পূরণে মূল নির্ধারণী শর্ত- সংকটমুক্তির বস্তুনিষ্ঠ পথ।

 

সমাধানের পথ

এতক্ষণে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছি, মূল সমস্যাটা কোথায়? কেন এই স্থবিরতা, কেন বিক্ষোভ হচ্ছে, নির্লিপ্ততা আসছে এবং অস্থিরতায় নিমজ্জিত আমরা? চলমান এই অন্ধকারের বুক চিরে আলোর সন্ধানে আমাদের ফিরে যেতে হবে ফেলে আসা ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে। সন্ধানী নাবিকের মতো চষে ফেলতে হবে তার প্রতিটি আনাচ-কানাচ 'মুক্তি' নামক সেই মুক্তোর সন্ধানে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে শক্ত হাতে বৈঠা ধরতে পারবেন সেই সমস্ত দুঃসাহসিক জ্ঞানপিপাসু নাবিক, যারা জ্ঞানজগতের প্রতিটি শাখা থেকে জ্ঞান আহরণ করে হতে পারবেন 'জ্ঞানতত্ত্বে' সজ্জিত, দেশজ চেতনায় সংহত। যে 'জ্ঞানতত্ত্ব' গড়ে উঠবে চলমান নেশা, ঘৃণ্যরাজনৈতিক ও সন্ত্রাসের মতো আসুরিক আড্ডার বিপক্ষে পাল্টা একটি সুস্থ আড্ডার মধ্য দিয়ে এবং অবধারিতভাবেই জাতীয় পর্যায়ে যা সূচনা করবে নেশা ও হিংসামুক্ত তারুণ্যের আদর্শিক সংঘবদ্ধতা। যে সংঘবদ্ধতা জন্ম দেবে আমূল পরিবর্তনকারী একটি পাল্টা সংগঠন। যা গড়ার জন্য ইতিহাসগত ভাবে আমরা ছাত্র-যুব-তরুণরাই দায়বদ্ধ।

 

কারণ- বাংলার ইতিহাস তথা বাংলাদেশের ইতিহাস, বিশ্বের ইতিহাস থেকে স্বতন্ত্র প্রধানত ছাত্রদের সংগ্রামী ঐতিহ্যগত কারণেই। আমরা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই আর সেই শিক্ষার আলোকেই আমরা দেখেছি, এই বাংলার পট পরিবর্তনে অগ্রণী সেনার ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্র-যুব-তারুণ্য। তারাই প্রথম পরিবর্তনের পথে ডাক দিয়েছে জাতির বিবেক হিসেবে, সমস্ত জনগোষ্ঠীকে ডাক দিয়েছে পরিবর্তনের লড়াইয়ে। অর্ধশিক্ষিত, অসচেতন, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষিতদের, সচেতনদের দেশের প্রতি যে দায়বদ্ধতা, সে দায়বদ্ধতা পালনে আমরা ছাত্র-যুবরাই প্রথম ভূমিকা পালন করেছি এবং আজও দেশে বিদ্যমান চরম অব্যবস্থার হাত থেকে, আমাদের ভবিষ্যত, শত-সহস্র শোষিত জনতাকে 'মুক্তি' শুধু আমরাই দিতে পারি। বারবার আমরাই শুধু শুরু করেছি, সূচনার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা আমরাই পালন করেছি, এবারও আমরাই করবো এবং নিশ্চয়ই সম্পন্ন করবো।

 

দেশমাতৃকার এই দুর্দিনে, এই ক্রান্তিলগ্নে, ইতিহাসের বুক চিরে উঠে আসা সেই যোগ্য উত্তরসূরী, নৈতিক দৃঢ়তা সম্পন্ন সচেতন ছাত্র-তরুণদের আজ দেশমাতার ভীষণ প্রয়োজন, যারা সমাপ্ত করবেন স্বাধীন বাংলাদেশের অসমাপ্ত মুক্তির আশুকর্তব্য কিংবা সম্পন্ন করবেন বাংলাকে প্রকৃত অর্থেই বাংলা করার মহান সংগ্রাম। মহান সেই সংগ্রামী লক্ষ্য পূরণের জন্য ইতিহাসনির্দিষ্ট, বিজ্ঞাননিষ্ঠ, সুনির্দিষ্ট আদর্শকে ভিত্তি করেই চালিত হতে হবে। ব্যক্তিইচ্ছা বা দলনির্ভরতা নয় বরং মতাদর্শ নির্ভর সেই মহান মুক্তি সংগ্রাম যার পথ দল-মত নির্বিশেষ সচেতন সামাজিক শক্তির উত্থানে- সুদৃঢ় সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। আর তা অহিংস'র সুদৃঢ় শপথেই শুধু হিংসা উন্মত্ত দুনিয়াকে দেখাতে পারে মুক্তির পাল্টা পথ। এভাবে মুক্তির লক্ষ্য পূরণে মতাদর্শিক বিশ্বাস এবং ভিত্তি ও দিশা-ই চলমান সংকট উত্তরণে আজ অনিবার্য শর্ত।

 

বিশ্ব দ্রুত অগ্রসরমান, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ঘটছে উল্লম্ফন। নব্বই দশকের পর রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ভারসাম্য হারিয়ে (সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির কারণে) পৃথিবীতে ঘটেছে একক মেরুকরণ। ফলতঃ বিশ্বপরিস্থিতিও আজ বড় অস্থির, দোদুল্যমান। যার অন্ধকার হাতছানি পড়ছে আমাদের দেশেও।

 

একবিংশ শতাব্দীর শাব্দিক পদচারণা সর্বত্র, নতুন নতুন রোলে কোরাসের ধ্বনি উঠছে দিকে দিকে কিন্তু এখনো বিশ্বসভ্যতার কণ্ঠদেশ জুড়ে লা'নতের চিহ্ন, যন্ত্রপিষ্ট মনুষ্যত্বের আদর্শবর্জিত সমকালীন দুনিয়ার গাঢ় অন্ধকারে এখনো চলছে লুটেরাদের উন্মত্ত প্রেতনৃত্য, এখনো সেই দুঃসময়, আরো অন্ধকার নিয়ে শুধু সময়কে ভাগ করার হিসেবী আঁচড়ে ইবলিসীয় খেড়োখাতায় এসেছে "নতুন"। আর সে নতুনত্বের জঠরে বন্দী তৃতীয় দুনিয়ার আমরা ক্রমশঃ বেহাল-যুযুথান। এখন ভোগবাদী সভ্যতার ধারায় বিজাতীয় সাংস্কৃতিক বেনিয়াবৃত্তির আগ্রাসী থাবায় মধ্যরাতে জেগে ওঠে তরুণদের দল বিনোদনের বেলেল্লাপনায়। দেশী সংস্কৃতি হয়ে ওঠে পানসে 'ব্যাকডেটেড', আশৈশব শুনে আসা 'জননী জন্মভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপী গরিয়সী'- চিরন্তন সেই বাণীভার এখন বিস্মৃত-বয়সী দীর্ঘশ্বাস! অতিশয় আত্মবিকৃত শেকড়বিচ্ছিন্ন আমরা, হয়ে উঠি বিভ্রান্ত- বিশৃংখল, তথাকথিত নতুনের জঘন্যতায় নতুন শতাব্দীর ভ্রষ্ট প্রজন্ম। চোখ জুড়ে উঠে আসে বিদেশীয় রংচড়া স্বপ্ন, মগজে আবাদ হয় বিদেশের মাটি কিংবা দেশের মাটিতেই বিদেশ অনুকরণের চেতনায় আমৃত্যু এ্যালসেশিয়ানের মোড়কে ব্যর্থ নেড়ীকুত্তার দীর্ঘশ্বাস।

 

স্বদেশবিমুখ তথা বিদেশমুখী চেতনার পথ ধরেই কখনও শ্লোগান আসে প্রগতির কণ্ঠে "বাংলা হবে ভিয়েতনাম", কখনও উচ্চারিত হচ্ছে তালেবানি মধ্যযুগীয় মরুহ্রেষায় "বাংলা হবে আফগান"। শুধু স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও জন-জোয়ার ফুঁসে উঠে যথার্থ বৈশ্বিকতায় দাবি করেনি "বাংলা হবে বাংলার"। এখনো এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আকাশছোঁয়া ইমারত নির্মাণের মতো দেশজ বাস্তবতাবর্জিত বহুবিধ শিক্ষা দিয়ে গড়া হয় অনেক মগজ, যার বাস্তবায়নের সুযোগ এদেশে নেই। সর্বোচ্চ ব্যয়সাপেক্ষ শিক্ষাঙ্গনগুলো কাকের বাসার ভূমিকা পালনে অবতীর্ণ হয়ে ফুটিয়ে চলেছে কোকিলের ন্যায় চরিত্রসম্পন্ন কুলীন জারজদের, যাদের শিক্ষা-দীক্ষা-সেবা সমৃদ্ধ করে বিদেশকে। একবিংশে আজ কোথায় সেই দেশজ চেতনার অভাব মোচনে বৌদ্ধিক উৎকর্ষ অর্জনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগময় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ও তার সমাজকে ঘিরে সু-সভ্যত নাগরিক চেতনা? কিংবা দেশজ চেতনাসম্পন্ন সচেতন দৃঢ়তায় সামাজিক শক্তির উপস্থিতি?

 

এই ভাবেই আজও যার অনুপস্থিতিতে বিজ্ঞান-দর্শন, রাজনীতি-অর্থনীতি-আইন সহ রাষ্ট্রিক-সামাজিক সর্বস্তরে, পরাধীন মননের ফাঁসে আটকে পড়া জাতি, আর তার ভাগ্যবিধাতারূপী দেশজ চেতনাবর্জিত সারবত্তাহীন ফসিলদের বিকলাঙ্গতার গতানুগতিক ক্রম-অবনয়নের প্রদর্শিত এ ধারায়, ছাত্র-তরুণরা বড়জোর এখন কালো হাতের ইশারায় দেশপ্রেম বর্জিত নীতিহীন চলমান রাজনৈতিক বেনোবৃত্তির শর্তে 'নৈতিকতা' বিকিয়ে পঙ্গু চেতনায় শ্লোগান তুলছে। সে প্রশ্রয়ে দ্রুত অর্থ আয়ের খায়েশে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজীর অসাধু পথে বাড়িয়ে তুলছে নিজেদের অনর্থক মৃত্যু। এবং সে লাশ নিয়ে জমে ওঠে তথাকথিত ঘৃণ্য রাজনীতি। মুছে যায় বৈধ-অবৈধ এর পার্থক্য, শাহাদৎ বরণের মহত্ত্ব। এগুলো এখন সমকালীন দুঃসময়ের লাইসেন্স।

 

"এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়"... বাংলার এই শ্রেষ্ঠ উচ্চারণের রূপ এখন বে-দখল। মিছিলগুলো এখন ভাড়াটেদের কাছে লিজ দেয়া। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের কলম, কবির কবিত্ব, প্রতিবাদী মিছিল, অনুকরণীয় আদর্শ চরিত্র; সব ক্ষেত্রে অনাদর্শিক চরিত্রই এই সামাজিক প্রতিষ্ঠায় আমাদের সামনে আদর্শ হিসেবে অনুকরণীয় এবং ইতিহাস বিকৃতিতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি আমরা, বিকৃত আমাদের নৈতিকতা, অতঃপর আদর্শবর্জিত গাঢ় অন্ধকারে ক্রমশঃ এগিয়ে চলছে আমাদের দেশ- আমরা কিংবা আত্মবিক্রয়ের সীমান্তে পরবর্তী উত্তরসূরিরা।

 

দেশের প্রতি ইতিহাসনিষ্ঠ দায়বদ্ধতা পালনে বিস্মৃত বাংলার তারুণ্য, নেশা ও হিংসার মতো বহুবিধ বৈশিষ্ট্য জেঁকে বসেছে, অবক্ষত মূল্যবোধের দৈন্যতায় দীর্ণ যখন আমাদের অন্ধকারময় আগামী, আর উত্তর প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিতব্য, ঠিক তখনই ২৪শে নভেম্বর, ২০০০- উচ্চারিত হলো সমগ্র দেশকে সামনে রেখে, বিশ্ববীক্ষার আলোকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের অগ্নিস্পর্শিত ডাক- ঘোষিত হলো "সচেতন সামাজিক শক্তি" উত্থানের পাল্টা ইশতেহার আর সে লক্ষ্য পূরণে উঠে এলো "সচেতন তারুণ্যের ঐক্যতা"-র শ্লোগান কিংবা চাই "চেতনার সংহতকরণের দ্বারা তারুণ্যের দৃঢ় সঙ্ঘবদ্ধতা"। কারণ ছাত্র-যুব সমাজকেই বহন করতে হচ্ছে সকল সামাজিক অসুস্থতার দায়ভার-নিকৃষ্ট অপবাদ, অথচ এর বলি ছাত্র-যুবক হলেও এর জন্য কোনোমতেই এরাঁ দায়ী নয়।

 

জঙ্গলে জন্ম নিয়ে বেড়ে-বলে ওঠা মানুষের চিন্তা, চেতনা ও আচরণ জংলীর মতোই হয়। আর এর জন্য তাকে দায়ী করে যারা; হয় তারা মূর্খ, নয় হীনস্বার্থে মানুষবেশী সাক্ষাত শয়তান, জ্ঞানপাপীর দল। স্বাধীনতাত্তোর আমাদের প্রজন্মকে বিশৃংখল, চাঁদাবাজ- সন্ত্রাস সহ নারকীয়তার বহু দোষে দুষ্ট প্রজন্ম হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর জন্য দায়ী কারা? স্বাধীনতাত্তোর যে পারিপার্শ্বিকতায় আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা- তা গড়ে তুলেছে কারা? কাদের লালসা চরিতার্থে আজও আমাদের বুকের তাজা রক্তে ভরিয়ে নিচ্ছে তাদের রক্তের পেয়ালা? ছাত্র হয়ে অন্য ছাত্রের বুকে গুলি চালানোর দানবীয় শিক্ষার উৎস কোথায়? আমার শিক্ষাঙ্গন নামক পবিত্র ইবাদতভূমি কেন আজ ভ্রাতৃঘাতী জঘন্য যুদ্ধের রণক্ষেত্র? কারা কাদের স্বার্থে কাদের সৃষ্ট এই অভিশপ্ত অজুহাতে বছরের পর বছর ছাত্রসংসদ নির্বাচন স্থগিত রেখে জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে ওঠার রাস্তাকে বন্ধ করে রেখেছে? আজকের গণবিচ্ছিন্ন নেতা ও রাজনীতি তথা মানি-মাস্‌ল, হাইব্রিড 'আমলা-নেতা' থেকে আমলা নির্ভর অপরাজনীতির কিংবা এনজিও পসরার ভেলকিবাজীকে গ্রামীণ উন্নয়ন হিসেবে কারা বিজ্ঞাপিত করেছে? জাতীয় নেতৃত্ব আর রাজনীতি-হীনতায় যাদের কপাল ফিরছে, তারা কি কখনও ছাত্র-সংসদ নির্বাচন হতে দিতে পারে?

 

রাষ্ট্রিক ষড়যন্ত্রের আবর্তে আমাদের জন্ম, বুলেট-বারুদের ময়দানে বেড়ে-বলে উঠেছি আমরা। এখনো শকুনের পাখায় ঢাকা আছে নীল আকাশ- মুক্তির উপমা আমি দেখলাম কবে? ষড়যন্ত্রে ভরে থাকা আমার ইতিহাস- স্বাধীনতায় বিশ্বাস থাকবে কী করে? বারুদের গন্ধে ঠাসা আমার বাতাস- নির্মল নিঃশ্বাসে সুস্থতার স্বাদ পেলাম কবে?

 

জঙ্গলে নয়, স্বাধীনতাত্তোর বাংলার আবর্তেই আমাদের জন্ম, তাহলে এই জংলীত্বের পাশবিক নীচুতায় নামিয়ে আনলো কারা? এই আবর্ত গড়ে তোলার দায়িত্বে এতদিন কারা ছিল?

 

আমরা ক্লান্ত-শ্রান্ত, কিন্তু নির্লিপ্ত নই- কারণ আগামী আমাদের, আমরাই আগামীর। সে আগামীর প্রশ্নে- জীবনের প্রশ্নে- আমাদের সুস্থতার দ্বার আমাদেরই খুলতে হবে। আমাদের পিছনে আমাদেরকেই দাঁড়াতে হবে দল-মত নির্বিশেষে। রাজনীতির নামে ক্ষমতালিপ্সুদের মুখোশ ও মঞ্চ বদলের তথাকথিত ভিন্নতার আড়ালে অভিন্ন ঘৃণ্য খেলায়, দেশ-মানুষ ও তারুণ্যের পরস্পর বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদ নয় বরং দেশকে সামনে রেখে আমরা হবো দেশজ চেতনা লাভে, বৌদ্ধিক উৎকর্ষ অর্জনের মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামে, সচেতন সামাজিক শক্তি উত্থানের মহতী লক্ষ্যে আদর্শনিষ্ঠ- সংহত।

 

যৌবন চায় আড্ডা। সহজাত সে আড্ডা যখন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিভেদ, বিদ্বেষ তথা স্বার্থান্বেষীদের খোঁয়াড়ে, রাজনীতির নামে হিংসান্মোত্ত ঘাতকদের মিছিলে; তখন জাতীয় স্তরে সংহতি গড়ে না তোলাটাই আত্মঘাতী। হিংসা যখন ঘাতকের প্রামাণ্য হাতিয়ার, তখন অহিংস'র ডাক না দেওয়াটাই ভ্রষ্টাচার। তাই সর্বস্তরে গড়ে উঠুক অহিংস'র শপথবদ্ধদের আড্ডা। সে আড্ডা হবে সচেতন, সৃষ্টিশীলতার আড্ডা, যেখানে মিলেমিশে থাকবে বাবা-মা, ভাই-বোনের নির্মল হাসির উচ্ছলতা, দেশমাতৃকার বুকে ভর করা গাঢ় অন্ধকার দূর করার দীপ্ত শপথ এবং তা হোক জাতীয় স্তরে দেশের প্রতিটি পরিবারে, শিক্ষাঙ্গন সহ সকল জনপদে।

 

দ্রুত পরিবর্তিত এই বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও দেশীয় শত সহস্র বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিকাশের ধারা থেকে দেশজ চেতনার অন্বয় ও সংহতকরণে যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, তার জন্য চাই সংগঠন কাঠামো তথা মতাদর্শিক দিশা। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় তার বিশেষীকৃত ও প্রায়োগিক শিক্ষা আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয়তম আদর্শিক শিক্ষক ও পথ-প্রদর্শক শ্রদ্ধেয় বড়দা (এ আর শিকদার)-র মতাদর্শিক চিন্তধারা ও বিশ্লেষণে। সুতরাং এদেশের প্রতিটি জনপদে- সবচেয়ে সচেতন, প্রখর ও নৈতিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন দৃঢ়চেতা, ছাত্র-যুব-তরুণদের আহ্বান করা হচ্ছে দেশ-মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তির সংগ্রামে, মুক্তিজোট -এর মতাদর্শকে ধারণ করে অহিংস-র দীক্ষামন্ত্রে উজ্জীবিত ও দেশজ চেতনায় শাণিত হয়ে গড়ে তুলুন সুদৃঢ়, সুশৃংখল, সুশিক্ষিত আদর্শিক এক লৌহদৃঢ় পাল্টা সংগঠন, যা বিদ্যমান ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের উপর উড়াবে সংহত মুক্তির বিজয়-নিশান। যার দ্বারা নাগরিক বোধে সংবদ্ধ জাতীয় জীবনে বিনির্মিত হবে- মানবীয় মর্যাদার সমন্বিত সংস্কৃতি।

 

সে লক্ষ্যেই শাণিত হোক শপথ, যা আলোর মতো- সে আলো হাতে দৃঢ়বদ্ধরা ছড়িয়ে পড়ুক চারপাশে। অনিবার্য হয়ে উঠুক সচেতন সামাজিক শক্তি-(Social Power with Knowledge)-এর উত্থান।

 

সুতরাং জেগে ওঠো- যাবতীয় অবক্ষয় আর অব্যবস্থার বিরুদ্ধে গড়ে তোলো দুর্নিবার পাল্টা স্রোত। মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তির প্রশ্নে, সংস্কৃতির নব জোয়ারে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটুক- ফিরে আসুক ইতিহাস-ঐতিহ্যিক ধারার পথ ধরে চিরায়ত বঙ্গ-তরুণ- তারুণ্যের ঘায় বেঁচে উঠুক সমগ্র দেশ। একই লক্ষ্য পূরণে, একই আদর্শে উদ্বোধন ঘটুক অখণ্ড মানুষের। অগ্রগামী আর আগুয়ানদের পথচলা ছড়িয়ে পড়ুক অস্তহীন সূর্যতলের প্রতি কর্মযজ্ঞে- সর্বত্র প্রতিষ্ঠা পাক শান্তি-স্বস্তি-জয়ের বিজয়কেতন- সেই প্রত্যাশায়।

 

তথ্যসূত্র :

১. আল কোরআন, সূরা রা'দ, আয়াত-১১

২. ঋগ্বেদ সংহিতা -৮/১৯/৩৬

৩. ঐতেরয় ব্রাহ্মণ -৮/২২

৪. পৃষ্ঠা- ১৬, বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ও রাজনীতি- আবুল ফজল হক, টাউন স্টোর্স- রংপুর কর্তৃক, জুন ২০০০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত।

৫. 'শিক্ষা ও সংস্কৃতি' বিষয়ক শিবদাস ঘোষ- এর মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেওয়া বক্তব্যের আলোকে- ১ থেকে ১২ পৃষ্ঠার কিছু অংশ আলোচিত।

 

[বিশেষ দ্রষ্টব্য : 'আহ্বান' পাঠান্তে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস, প্রথম পত্র (ঐচ্ছিক-১, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, প্রাচীনকাল থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত এবং ঐচ্ছিক-২, ১৫২৬ থেকে ১৯৭১ খ্রিঃ পর্যন্ত, লেখক : জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার। হাসান বুক হাউস, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।) ও দ্বিতীয় পত্র (ঐচ্ছিক-১, মধ্যযুগ ও আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, লেখক : ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী। হাসান বুক হাউস, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।) পাঠ সম্পন্ন করে নিলে ভালো হয় ]

 

 

ধন্যবাদান্তে

আবু লায়েস মুন্না

আহ্বায়ক

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট।

 

 

[সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্তর থেকে বর্তমান উত্তরিত রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক স্তরে উত্তরিত হওয়ার প্রেক্ষিত ও বাস্তবতার প্রসঙ্গে- তৎসময়ে প্রাসঙ্গিক নির্দেশনাসমূহ প্রকাশ করা হলো।]

 

 

সূত্রঃ তারিখঃ ২৩/১১/২০১২ খ্রিঃ

 

সুহৃদ,

 

সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শুভ্র শুভেচ্ছা।

 

মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন প্রস্তুতি সায়াহ্নে আমন্ত্রিত সম্ভাব্য সভ্যসংখ্যা নিরূপণে আমরা নতুন বাস্তবতায় উপনীত হয়েছি।

 

সম্ভাব্য সংখ্যার স্থান সংকুলানের উপযোগী কোনো মিলনায়তন (হল বা অডিটোরিয়াম) পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে ময়দান বা খোলা আকাশের নিচেই উক্ত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে। আর সেক্ষেত্রে অনুষ্ঠান নিজেদের সীমানা ছাপিয়ে- গণসম্পৃক্ততার পথ ধরে আইন-শৃঙ্খলা তথা একাধিক দায়িত্বগত বিষয় উঠে আসে। যা নিষ্পন্ন করার লক্ষ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষ তথা প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিষয়টি জরুরী হয়ে পড়ে।

 

এ-যাবৎ কাল যেখানেই সম্মিলন বা উৎসব করা হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই বিধিবদ্ধভাবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন তথা অনুমোদন সাপেক্ষে সম্মিলন বা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে মিলনায়তন (হল বা অডিটোরিয়াম) বলেই হল কর্তৃপক্ষ এবং নিজেদের আবর্ত বলেই নিজেদের দায়িত্বে তা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা সম্ভব হতো। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু ময়দানে বা উন্মুক্ত তথা গণসম্পৃক্ত, তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি তথা হল কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে রাষ্ট্রিক (যথাযথ) কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা প্রয়োজন।

 

উল্লিখিত দায়িত্বগত বাস্তবতা আমাদের দায়িত্বগত সীমানাকে ছাপিয়ে গেলেও তা আমাদের দায়িত্বহীন করে না। বরং আমাদের নতুন দায়িত্বগত অবস্থানকে নির্দিষ্ট করে। বাস্তবতার নতুন অর্থবোধন তথা দায়িত্বগত অবস্থান নির্দিষ্টকরণে সংগঠন ব্যক্তিমুখীন নয়, সর্বদাই মতাদর্শ ও সমষ্টিমুখিনতাকে নির্দেশ করে। স্বাভাবিকভাবেই সাংস্কৃতিক সংগ্রামে মতাদর্শিক দিশা বা নির্দেশই এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

 

সাংস্কৃতিক দিশায়- জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনের সব কিছু নিয়েই সংস্কৃতি- অর্থাৎ যা কিছু মানবীয় জীবনকে ছুঁয়ে যায়, তা-ই সংস্কৃতি। এদিক থেকে অর্থনীতি, রাজনীতি তথা পারিবারিক-জাতীয়- আন্তর্জাতিক ইত্যাদি সংস্কৃতির অঙ্গীভূত। অর্থাৎ মানবীয় বোধগত সীমানাই সাংস্কৃতিক সীমানা হিসেবে নির্দিষ্ট।

 

[“জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনকে নিয়েই জীবনবোধ আর বোধের উন্মেষণের সংগ্রামকেই (‘... ব্যাপক অর্থে গৃহীত সমাজজীবনে ব্যাপৃত অর্থনীতি-রাজনীতি, ধর্ম-দর্শন, শিল্প-সাহিত্য বিষয়গুলোকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শের ভিত্তিতে যে সব ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা, তাকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলা হচ্ছে’- জাতীয় সাংগঠনিক রিপোর্ট- ২০০৪ খ্রি. পৃষ্ঠা-৪) আমরা সাংস্কৃতিক সংগ্রাম বলে বুঝি এবং তা সমাজদর্শন ও সমাজবিজ্ঞানের পারিভাষিক রূপ অনুসারেই সমাজ সংশ্লিষ্ট বা সামাজিক আন্দোলন হিসেবেই গণ্য ও পূর্ণতা পেতে বাধ্য। কারণ- যে সংগ্রাম সমাজসংশ্লিষ্ট, তা-ই সাংস্কৃতিক এবং যা রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট, তাকেই রাজনীতিক বলে। মূলগত অর্থেই আমরা সামাজিক এবং আমাদের সংগ্রামও তা-ই সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক নয়। সমাজের সাথে রাষ্ট্রের এবং সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির যতোটুকু সম্পর্ক আছে, ততোটুকুই আমরা সম্পর্কিত।”- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, পৃষ্ঠা-৬]

 

যেহেতু দ্বাদশ বর্ষ উদযাপনের শর্ত আমাদেরকে গণসম্পৃক্ততায় নতুন দায়িত্বগত অবস্থানকে নির্দেশ করছে এবং আইন-শৃঙ্খলা সহ একাধিক দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা তথা উলিস্নখিত ‘লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য’- এ “যা রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট, তা-ই রাজনীতিক” অর্থবোধনে নতুন স্তরকে নির্দেশ করায়- “সমাজের সাথে রাষ্ট্রের এবং সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির যতোটুকু সম্পর্ক আছে, ততোটুকুই আমরা সম্পর্কিত।”

 

এক্ষেত্রে নতুন এই স্তর বা পর্যায় চিহ্নিত হওয়ায় তার গাঠনিক রূপ নিরূপণ বা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে স্বাভাবিক নীতি অনুসারে সাংগঠনিক দিশা তথা গঠনতন্ত্র-ই প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে আন্দোলন ‘তিনটি পর্যায়’-এ বিভক্তঃ

 

১. সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন,

২. রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও

৩. সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

 

উপরোক্ত নতুন বাস্তবতা তথা নতুন স্তর বা নতুন পর্যায়কে সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করলে আমরা সুনির্দিষ্টভাবেই সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দ্বিতীয় স্তর তথা রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন’- এর স্তরে উন্নীত। নৈর্ব্যক্তিক এই মতাদর্শিক সিদ্ধান্ত তথা দায়িত্বগত নতুন বাস্তবতাকে সামষ্টিক নিক্তিতে যাচাই-বাছাই করতে সকল অঞ্চলের প্রতিনিধি তথা অঞ্চল কমিটিগুলোর সাথে ১১.১১.২০১২ খ্রিঃ থেকে ২১.১১.২০১২ খ্রিঃ পর্যন্ত আলোচনা করা হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রিক সহায়তা তথা আইনগত সহযোগিতা পেতে রাষ্ট্রিক নিবন্ধনের বিষয়টি উঠে আসে।

 

বিশেষতঃ দুটি দিক এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য-

 

প্রথমত, প্রথাগত প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই অনুকূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। সেক্ষেত্রে ‘সংস্কৃতি’ বলতে আমরা যা বলছি, তার সাথে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও- সাধারণের কাছে প্রচলিত সাংস্কৃতিক অর্থেই আমাদের দেখতে পারে এবং প্রথাগত কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িয়ে বা অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ভাবতে পারে। অর্থাৎ প্রথাগত রাজনীতির সাথে মিলিয়ে আমাদের বিগত ১২ বছরের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের স্বতন্ত্রতা ও স্বকীয় অর্জনকে প্রথাগত দলবৃত্তির বিতর্কে ঠেলে দিতে পারে। যার বিপরীতে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য প্রমাণের সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রত্যয়নই হতে পারে আমাদের অর্জন ও স্বতন্ত্রতার রক্ষাকবচ। সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে যেভাবেই বুঝাতে চাই না কেন, যেহেতু প্রথাগত অর্থে সংস্কৃতি হয়ে আছে রাজনীতির অংশ, তাই সাংস্কৃতিক সংগঠন মানেই রাজনীতির অঙ্গ সংগঠন। তাই আমরা কী- তা আমরা প্রমাণ করার দীর্ঘ সময় পাবো। কিন্তু যা আমরা না, তা একবার ভেবে ফেললে অর্থাৎ পরিচয়গত বিতর্ক বা সংকট থাকলে পূর্বাপর সব অর্জন রুদ্ধ বা লোপাট হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ প্রথাগত রাজনীতি থেকে নিজেদের ভিন্নতার শর্তেই নিবন্ধন জরুরী হয়ে পড়েছে।

 

দ্বিতীয়ত, দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপনে আগত অসংখ্য সংগঠকের আনন্দঘন সম্মিলনের উৎসবকে নির্বিঘ্ন করার শর্তে যথাযথ আইনগত দিকটাকে গুরুত্ব দেওয়াই যথার্থ দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক। সংগঠনের অবস্থান সর্বদাই দায়িত্বহীনতার বিপরীতে। সাংস্কৃতিক সংগ্রামই দায়বদ্ধতা পালনে তার অগ্রগামিতার পরিচায়ক।

 

নতুন বাস্তবতা তাই সমস্যা না হয়ে দায়িত্বের নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে।

 

উল্লিখিত প্রস্তাব ও বাস্তবতা বিবেচনায় দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন নির্বিঘ্ন করতে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এই পথচলায়- সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির যতোটুকু সম্পর্ক, সংশ্লিষ্টতার সেই শর্তবদ্ধতার দিক থেকেই কেবল নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। সে মোতাবেক অঞ্চল, জেলা, উপজেলা তথা সংগঠনের সর্বস্তরে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে।

 

পুনশ্চঃ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত। উত্তরণের দীপ্ত অধ্যায়ে- নতুন দায়িত্বের নতুন বার্তায়, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শুভ্র শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

 

                                                                   

 

সূত্রঃ তারিখঃ ০৯/১২/২০১২ খ্রিঃ

 

সুহৃদ,

 

সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শুভ্র শুভেচ্ছা। মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন প্রস্তুতি উপলক্ষে ২৪শে নভেম্বর, ২০১২ খ্রিঃ তারিখে সংগঠন প্রধান-এর পৌরোহিত্যে, পরিচালনা বোর্ড প্রধান-এর আহ্বানে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

ইতোপূর্বে সাংগঠনিক প্রতিটি পেপার্‌স্‌-এর যথার্থ অর্থবোধনে শুরুতেই যে নির্দেশনা জারি থাকতো, তা হলো “উল্লেখ্য, বর্তমান রিপোর্টটি ------ পূর্ববর্তী রিপোর্ট সম্পৃক্ত বিধায় পূর্ববর্তী রিপোর্টটি না পড়ে বর্তমান রিপোর্টটি পড়লে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বোধ আসবে না। তাই যথার্থ অর্থবহতার প্রশ্নে পূর্ববর্তী রিপোর্ট সম্পৃক্ত করে বর্তমান রিপোর্ট পড়ার নির্দেশ থাকলো”----- উক্ত পাঠরীতির দৃষ্টান্তে বলা যায়, এক বছরের একটি শিশু যখন বারো বছরে পদার্পণ করে, তখন তা বিকাশ বা স্তরগত পার্থক্যকে নির্দেশ করলেও মূলতঃ অভিন্ন একজন-এর ক্রমবিকাশকেই প্রকাশ করে। সংগ্রামের বারো বছর কিংবা বর্তমানে সম্পৃক্ত নতুন স্তর, বিকাশের ক্রমোত্তরণকে প্রকাশ করলেও মূলগত অর্থে কোনো ভিন্নতাকে নির্দেশ করে না। বরং বিগতের পরিণতি অর্থেই থাকে বর্তমান, বিধায় বিকাশের নতুন স্তর সম্পর্কে যথার্থ অর্থবোধন বা আশুকর্তব্য সম্পাদনে পূর্ববর্তীর অভিজ্ঞান বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী অভিজ্ঞান পরবর্তী পথচলাকে সর্বদা স্পষ্ট করে।

 

এক্ষেত্রেও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পৃক্ত হওয়ায় উদ্ভূত নতুন বাস্তবতা নিরূপণে- ক্রমোত্তরণ বা বিকাশগত বৈশিষ্ট্যের যথার্থতা অনুধাবনে বিগত এক যুগের সংগ্রামী দিশা সমূহ আলোচিত হয়। যার সংক্ষিপ্তসার উল্লেখ করা হলো।

 

দেশকে সামনে রেখে সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে জাতীয়, আন্তর্জাতিক, আর্থিক-পারিবারিক তথা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনের যা কিছু তাকে প্রভাবিত করে- সেই সমস্ত দিক ব্যপ্ত করে, নির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে চেতনাকে গড়ে তোলা ও পরিকাঠামোর দ্বারা সে চেতনা একত্রীভূত, বিশেষীকৃত বা সংহতকরণ, যা এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম হিসেবে মূলনীতিতে গৃহীত। নীতিগত দিক থেকে গৃহীত উক্ত সাংস্কৃতিক সংগ্রাম তাই ‘অবিরত’। অর্থাৎ সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্নে নিজেদেরকে পরিবর্তনের মৌলিক ও প্রথম শর্ত পূরণে তথা বৌদ্ধিক ও মনন জগৎকে ঘিরে গুণগত মান অর্জন দিয়ে যে সংগ্রামের শুরু, পরিণতিতে তাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূল বদলের সংগ্রামকে নিশ্চিত করে। সূচনা থেকে পরিণতি পর্যন্ত পথচলার এই দিশাকেই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম হিসেবে নির্দিষ্ট বা উল্লেখ করা হচ্ছে। বিশেষতঃ সামগ্রিক সংগ্রামের সব স্তর ও সবক্ষেত্রেই যেহেতু বৌদ্ধিকতাকে প্রধান ও ভিত্তি হিসেবে নির্দেশ করে- সেহেতু তা সাংস্কৃতিক; এবং জাতীয়, আন্তর্জাতিক, আর্থিক-পারিবারিক তথা জীবন সম্পৃক্ত সবকিছুকেই এই সংগ্রামের আওতাভুক্ত করায়, তা ব্যাপক অর্থে গৃহীত। ফলে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটা প্রথাগতভাবে ব্যবহৃত অপরাপর ক্ষেত্রের অর্থবোধকতা থেকে ভিন্নতার নির্দেশক। পরিভাষাগতভাবে স্বতন্ত্র ও ব্যাপক অর্থে গৃহীত এই সাংস্কৃতিক সংগ্রামের তত্ত্ব তাই সুনির্দিষ্ট সংগ্রামের দিশা হিসেবে প্রতিফলিত বা প্রকাশিত।

 

যা ‘তিনটি পর্যায়’-এ বিভক্তঃ

 

১. সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন

২. রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন

৩. সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন

 

১)       সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনঃ

 

বিদ্যমান সামাজিক অবক্ষয়-অনাচার-হিংসা-বিদ্বেষ-বৈষম্য সহ সর্বস্তরে ব্যাপক বিশৃংখলা, নৈরাজ্য, অব্যবস্থা ও দূষণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী সামাজিক চেতনা গড়ে তোলার পথে, দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশাত্মবোধে দীপ্ত নাগরিক চেতনা সম্পন্নদের সাংগঠনিক পরিকাঠামোভুক্তকরণ।

 

          ২)       রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনঃ                            

 

১ম পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলনের পথে (খ্রিস্টীয় ২০০০ সালের ২৪শে নভেম্বর থেকে) সাংগঠনিক প্রসার এবং ব্যাপক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম তথা গুণগত উৎকর্ষ অর্জনের ক্রমোত্তরিত ধারায় বর্তমান (খ্রিস্টীয় ২০১২ সালের ২৪শে নভেম্বর থেকে) দ্বিতীয় পর্যায় তথা রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্তর গৃহীত বা যুক্ত। আর এই পথ ধরে দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামাজিক সংঘবদ্ধতা তথা ‘জাতীয় জীবনে সংহতি’ গড়ে তোলার দিশা নির্দিষ্ট- রাজনীতি যার অনিবার্য অংশ।

                                    

অর্থাৎ সাংস্কৃতিক সংগ্রামের মতাদর্শিক দিশায় উক্ত তিনটি পর্যায়ের মধ্যে ১ম পর্যায় তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে এবং বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়-এর উন্মেষ তথা রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-এ উত্তরণ ঘটছে।

 

৩)       সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনঃ

 

এক্ষেত্রে ক্রমোত্তরণের দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-এর পথ ধরে জাতীয় জীবনে সংহতি গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তৃতীয় পর্যায়ে উত্তরণ তথা সামাজিক-রাষ্ট্রিক- সাংস্কৃতিক আন্দোলন-এ সংযুক্ত হবে, যা মূলনীতি [রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণ (Decentralised Centralisation)-এর সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠা মারফত স্থানিক শাসন (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান, চতুর্থ ভাগ, তৃতীয় পরিচ্ছদ, অনুচ্ছেদ-৬০ -এর যথার্থ বাস্তবায়নকল্পে) ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতঃ আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক অবস্থার বদল] বাস্তবায়নের তৃতীয় পর্যায় হিসেবে নির্দিষ্ট বা ঘোষিত।

 

মূল্যায়নে বলা যায়, “সচেতন সামাজিক শক্তি” (Social Power with Knowledge) বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্যনিষ্ঠ, সাংগঠনিক পরিকাঠামোর দ্বারা সংহত এবং আদর্শগতভাবে দৃঢ়বদ্ধ তথা গুণগত উৎকর্ষ অর্জনই মূলতঃ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট এই মতাদর্শিক দিশা অনুসারে, সমাজবদ্ধ মানুষ ও মানবীয় সংঘবদ্ধতায় সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অনিবার্য বিধায় তাকে ‘অবিরাম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে’। এরই ধারাবাহিকতায় নির্দিষ্ট প্রথম বা প্রাথমিক পর্যায়ের ‘সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন’-এর পথে সংগঠন বা সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলা- যা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে তথা রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্তরে উত্তরিত। আর এই দ্বিতীয় স্তর তথা বর্তমানে গৃহীত- ‘রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন’-এর পথ ধরেই বিকশিত হবে জাতীয় সংহতি তথা “সচেতন সামাজিক শক্তি” (Social Power with Knowledge) -এর পূর্ণতা।

 

উপরোল্লিখিত আলোকপাত এবং তদপক্ষে- উত্তরিত নতুন স্তর তথা রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে জাতীয় জীবনে সংহতি (‘সংহতি’ অর্থবোধনে সর্বদাই ‘সংস্কৃতি’কে নির্দেশ করে- রাজনীতি যার অংশ মাত্র) গড়ে তোলার আশুকর্তব্য ঘোষণায় প্রয়োজনীয় পরিবর্ধন, পরিমার্জন তথা সাংগঠনিক দিশায় গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সহ আনুষঙ্গিক (পতাকা, লোগো, প্যাড ইত্যাদি) বিষয়াদি সম্পাদনা’র সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো এবং পূর্ববর্তী সাংগঠনিক সকল পেপার্‌স্‌ পড়ার নির্দেশ থাকছে।

 

পুনশ্চঃ ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত’। মহান বিজয়ের মাসে, মহতী সংগ্রামের অগ্রগামী পথচলায়- স্বাগত এই উন্মেষকে, সম্পৃক্ত আর উন্মোচিত প্রত্যয়ী এই ধারাকে এবং অবশ্যই এর বাহক দৃঢ়বদ্ধ বন্ধুদেরকে।

 

জাতীয় জীবনে সংহতির নববার্তায়- নতুন ঘোষণায়, সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে অর্থগতভাবেই আপন স্বতন্ত্রতায় নির্দিষ্ট করবেন; আশু কর্তব্য সম্পাদনে আগুয়ান থাকবেন সেই প্রত্যাশায়।

                                                                                      

 

দুই প্রশ্ন ও প্রত্যুত্তর-প্রস্তুতি

 

সংস্কৃতি তথা সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ-পরিক্রমায় সচরাচর যে দুটো প্রশ্ন আমাদের কাছে এসেছে এবং ইতোপূর্বে বহুভাবে বলাও হয়েছে, তবুও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায় তা আরও একবার বলা দরকার।

 

প্রচলিত অর্থে অনেক উচ্চ শিক্ষিত মানুষও সংস্কৃতি বলতে শুধু গান-বাজনা, নাটকই বুঝে থাকেন; অথচ চতুর্থ শ্রেণীর একজন ছাত্রও জানে “..সাধারণভাবে আমরা যা কিছু করি এবং যেভাবে করি তাই আমাদের সংস্কৃতি। আমরা যা, তাই আমাদের সংস্কৃতি। সে অর্থে, জীবনের সকল কিছুই সংস্কৃতির অংশ। আমাদের জীবন যাপনের ধরণ, পোশাক, খাদ্য, উৎসব, অনুষ্ঠান, ভাষা, গান-বাজনা, বাড়িঘর, শিল্প-সাহিত্য, অলংকার, যানবাহন, তৈজসপত্র, বিশ্বাস সব নিয়েই আমাদের সংস্কৃতি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এসবের পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে সংস্কৃতির ধরণও বদলায়। কাজেই সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। তবে এর সবটাই বদলে যায় তা নয়। সংস্কৃতির কিছু কিছু প্রধান দিক দীর্ঘ সময় অপরিবর্তনশীল থেকে যায়।” (উৎসঃ বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, চতুর্থ শ্রেণী, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা। শিক্ষাবর্ষ-২০১৩, পরীক্ষামূলক সংস্করণ, প্রথম প্রকাশ : ২০১২; পঞ্চদশ অধ্যায় : আমাদের সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা - ৯২।)

 

আরও একটু বিস্তৃত অর্থে- “সাধারণত সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি, মার্জিত রুচি বা অভ্যাসগত উৎকর্ষ। কিন্তু আসলে সংস্কৃতি বলতে আরো কিছু বোঝায়। মানুষের জীবনের সব দিকগুলোই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সংস্কৃতি হলো মানুষের আচরণের সমষ্টি। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ সমাজ থেকে যা কিছু অর্জন করে, তাই সংস্কৃতি। মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, আচার-ব্যবহার, ভাষা, খাওয়া-দাওয়া, নৈতিকতা, মূল্যবোধ সব কিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। ” (উৎসঃ  মাধ্যমিক সামাজিক বিজ্ঞান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা। প্রথম মুদ্রণঃ মার্চ, ১৯৯৬। পুনর্মুদ্রণঃ আগস্ট, ২০১০। প্রথম অধ্যায়, প্রথম পরিচ্ছেদ : সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা। পৃষ্ঠা - ২।)

 

উল্লিখিত তথ্যসূত্রেই প্রমাণিত হয়,‘সংস্কৃতি’র বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার জন্য নতুন করে উচ্চস্তরের সামাজিক জ্ঞান-গরিমা সংক্রান্ত গ্রন্থসূত্র ব্যবহার না করলেও চলে, কেবল প্রচলিত প্রাথমিক জ্ঞান অর্থাৎ প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সামাজিক বিজ্ঞান-এর পাঠ্যবই-এর তথ্যসূত্রই যথেষ্ট।

 

ব্রিটিশরা কাঁটাচামচ দিয়ে কিংবা চীনারা কাঠি দিয়ে খাবার খায় আর আমরা হাত দিয়ে। এক্ষেত্রে আমরা কাঠি বা চামচ দিয়ে খেতে গেলে যেমন জেরবার হই, বিপরীতক্রমে হাত দিয়ে খেতে গেলে ওদের অবস্থাও তেমনি হবে। বিয়েতে ওরা সাদা পোশাক পরে, যা এখানে বৈধব্যের পোশাক; আর বারো হাত শাড়ি পরার কথা তো ওরা কল্পনাই করতে পারে না। অভ্যস্ততার এই বিষয়টাও যে পরম্পরা বা সংস্কৃতির অংশ, সেটা অনেকে জানলেও ‘সংস্কৃতি’ অর্থে কেবল গান-বাজনা বোঝার কারণেই- ‘নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন প্রার্থী একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন’- এটা শুনেই বুদ্ধিবাগীশ কানা-কানীর দল মস্করার ভ্রূ নাচিয়ে (গণ্ডমূর্খতা) প্রশ্ন তুলেছে- ‘আজকাল নির্বাচন কমিশনে সাংস্কৃতিক সংগঠনও নিবন্ধিত হচ্ছে!!’

 

যদিও শুরু থেকে আমরা বারবার বলে এসেছি- ‘জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবনের সব কিছু নিয়েই সংস্কৃতি এবং সব কিছুই সংস্কৃতির অঙ্গীভূত। অর্থাৎ ব্যক্তিক, পারিবারিক, আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক তথা মানবীয় বোধ ও সীমানায় যা-কিছু মানুষ ও তার যাপনকে প্রভাবিত করে, বোধগম্যতার সেই সকল বিষয়কে একক বোধে প্রকাশ অর্থে আমরা ‘সংস্কৃতি’ অভিধায় নির্দিষ্ট করি এবং সবকিছু নিয়েই যে সামগ্রিক সংগ্রাম, ব্যাপকভাবে তাকেই আমরা ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম’ হিসেবে ঘোষণা করি। এ-অর্থেই ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত’। প্রতিটি জীবিত মানুষই এর প্রসঙ্গ, জীবনের মধ্য থেকেই যা উৎসারিত- জীবন ও যাপনের সব দিক ব্যপ্ত করেই যা নিয়ত এগিয়ে চলে এবং নবতর অন্বয়ের পথেই যাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে ‘এগিয়ে নেওয়া’টাই সংগ্রাম। আর তাই, ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম’কে শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতি বা ধর্ম-দর্শন-কলা ইত্যাদি কোনো বিশেষ সীমানায় ঠেলে দেওয়া, আমাদের ঘোষিত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ব্যাপকতাকেই বিনষ্ট করার নামান্তর।

 

অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উত্তরণ সাযুজ্যতায় সংস্কৃতি আমাদের মতাদর্শিক দিশায় আরো ব্যাপক আয়তনে বিধৃত। চলতি কথায়, ‘রাজনীতি’ সংস্কৃতির অংশ হলেও আমরা যেটা সোজা-সাপ্টা বলতে চাই, তা হলো- ‘ধর্ম-কর্ম, গান-বাজনার মতো রাজনীতিও সংস্কৃতির অংশ, তবে রাজনীতি ঠিক না থাকলে জীবন ও যাপন সংক্রান্ত তথা সংস্কৃতির অপর সব ক্ষেত্রেই ত্রাহি ত্রাহি শুরু হয়- নৈতিকতা, ধর্ম-কর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য সব রসাতলে যায়’।

 

দ্বিতীয় প্রশ্ন প্রসঙ্গে আসা যাক-

 

গত ২৪শে মে ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত একটা জাতীয় দৈনিকে নিবন্ধন প্রার্থী দল প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট সম্পর্কে রাজনৈতিক মহলে খোঁজ-খবর নিয়ে কিছু জানা যায়নি।’ উক্ত দৈনিকের এই রিপোর্টটা খুবই যৌক্তিক এবং যথার্থ। কারণ, ইতোপূর্বের রাজনৈতিক দলগুলো গড়ে উঠেছে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ভেঙে কিংবা ক্ষমতার অলিন্দ থেকে- অর্থাৎ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সে ক্ষমতায়নকে বৈধতা প্রদান বা জনসম্পৃক্তকরণের পৈতা বা লাইসেন্স সংগ্রহের শর্তেই রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহল বা ক্ষমতার অলিন্দ- যেখান থেকেই জন্ম হোক না কেন- সবক্ষেত্রেই তাঁরা বলে থাকেন, তাঁদের দল জগগণের স্বার্থেই গঠন করা হয়েছে। অথচ জনগণের দল তো জনগণের মধ্য থেকেই জন্ম নেবে। আপন শক্তির প্রত্যয়নে জনগণই সাথে থাকবে। বন্দুক কাঁধে-অস্ত্রের সঙ্গিন মুছতে মুছতে ‘জনগণই আমাদের শক্তি’ কথাটা বললেই তা জনগণের রাজনৈতিক শক্তি বা দল কি-না- সেটা যেমন মানুষ বোঝে; তেমনি নীতি ও আদর্শগত ভিন্নতা থেকে দলভাঙা বা দলগড়া না হয়ে যদি কেবল ভাগ-বাটোয়ারা থেকে দলভাঙা, দলগড়া হয়- সেটাও মানুষ বোঝে। ফলে ২৩শে অক্টোবর, ২০১২ খ্রিঃ তারিখের নির্বাচন কমিশনের গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত নিবন্ধন শর্তের ২/ঞ-তেঃ

 

অ) বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর হতে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে যে কোনো একটিতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসন লাভের সমর্থনে প্রামাণিক দলিল; অথবা

 

আ) বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর হতে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে যে কোনো একটিতে দরখাস্তকারী দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত মোট ভোট সংখ্যার শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট লাভের সমর্থনে কমিশন বা তদকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়নপত্র; অথবা

 

ই) দলের কেন্দ্রীয় কমিটি সহ উহা যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় দপ্তর; অন্যূন এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা দপ্তর এবং অন্যূন একশতটি উপজেলা বা, ক্ষেত্রমতে, মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দপ্তর এবং প্রতি উপজেলায় বা, ক্ষেত্রমতে, থানায় অন্যূন দুইশত ভোটার সদস্য হিসেবে দলের তালিকাভুক্ত থাকার সমর্থনে প্রামাণিক দলিল।

 

বর্ণিত (অ) এবং (আ) উভয়ই রাজনৈতিক মহলগত বিষয় আর সর্বশেষ (ই) সম্পূর্ণই জনসম্পৃক্ত বা জনগণের মধ্য থেকে জন্মলাভের শর্ত।

 

এক্ষেত্রে, আমাদের জানামতে ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’ই কেবল উলিস্নখিত (ই)-এর শর্ত পূরণ করেছে। যা প্রমাণ করে, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র মুক্তিজোট-ই পুরনো রাজনৈতিক সংস্রবমুক্ত বা উপরোক্ত মহলগত বিষয়াদি থেকে মুক্ত। অর্থাৎ এম পি কোঠা কিংবা অতীত ভোট প্রাপ্তির খেরো খাতার হিসেব দেখিয়ে নয় বরং জনগণকে সাথে নিয়ে- জনগণের মধ্য থেকেই ‘মুক্তিজোট’ জাতীয় সংগঠন হিসেবে নিজের নিবন্ধন নিতে গেছে।

 

ফলে, রাজনৈতিক মহল তথা রাজধানীভিত্তিক রাজনৈতিক কড়চায় আমাদের খোঁজ না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। বারো বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা জনগণের মধ্যেই ছিলাম, সেখানে খোঁজ নিলে বহু আগেই আমাদের খোঁজ পাওয়া যেতো। দীর্ঘদিন যাবত আমাদের দেশে জনগণের মধ্য থেকে কোনো দল গড়ে না ওঠাতে, এমন-কি রাজনীতির জন্মকাহিনী আমরা যেভাবে দেখে অভ্যস্ত, সেখানে রাজনৈতিক রিপোর্টিং সহ সবক্ষেত্রে অনেকে প্রায় ভুলেই গেছেন জনগণের মধ্য থেকেই মূলতঃ নতুন রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলের জন্ম হতে হয়- ওটাই রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাভাবিক আঁতুরঘর। তাঁদের দেখা ইনকিউবেটর বা হাইব্রিড কোনোটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয় (অ্যাবনর্মাল), অথচ এখন রাজনীতিতে সেটাই স্বাভাবিক’ (নর্মাল) হিসেবে গণ্য। সত্যি সবই এখন প্রেতাত্মার মতো উল্টো পায়ে হাঁটছে!

 

ফলে ‘মুক্তিজোট’ই আজ একমাত্র ব্যতিক্রম। ভুল রাজনীতি আর ভ্রান্তিকর প্রবণতার প্রতিবাদ হিসেবেই তার জন্ম। দর্শনগত প্রত্যয়ে যা বাদ-প্রতিবাদকে ছাপিয়ে সম্বাদে নিজের পথিকৃৎ অবস্থান ঘোষণা করে। আর তাই তার জন্ম-প্রেক্ষিতে এ-দেশ ও উপমহাদেশের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও দার্শনিক দিশায় তার কর্ম-আয়তনে থাকে সমগ্র দুনিয়া (Global Knowledge)।

 

নিবন্ধন প্রসঙ্গে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। ‘রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য বা রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই, শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গেলেই নিবন্ধনের প্রয়োজন।’ এই কথাটা যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নির্বাচনকে আলাদা করে ফেলা শুধু বিভ্রান্তিই নয়, এক ধরণের কাণ্ডজ্ঞানহীন গোলকধাঁধারও সৃষ্টি করেছে।

 

কারণ (অ), (আ)-এর মতো শর্ত, যা মূলতঃ পুরনো দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে গৃহীত। অথচ নতুন দল গঠনের ক্ষেত্রেও তা প্রযুক্ত হচ্ছে বা অনেকেই প্রশ্ন করতে পারছেন, “আপনারা কী কী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন?” অর্থাৎ নবগঠিত সংগঠনের সাংগঠনিক তৎপরতা বলতে নেতৃত্ব তথা তার আভ্যন্তরীণ গড়া-পেটা, কর্মশালা, নিজস্ব নীতি-আদর্শ উপযোগী পাঠক্রম, নেতৃত্ব রদ-বদল তথা কাঠামোগত প্রক্রিয়ার সচলতা ইত্যাদি বিষয়গুলোই তার তৎপরতার দিক হিসেবে আসা দরকার ছিল; কিন্তু এসেছে রাজনৈতিক তৎপরতা, যা পুরনো দলের দলীয় তৎপরতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

 

বিষয়টা বোঝাতে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

 

আমরা জানি- ট্রেনে চাপার আগে অবশ্যই টিকেট কাটতে হয়। সেক্ষেত্রে টিকেট কাটতে গেলে যদি প্রশ্ন তোলা হয়, ‘আপনি কি ট্রেনে চেপে আছেন? ট্রেনে চেপে না-থাকা অবস্থায় ট্রেনে ওঠার টিকেট দেওয়া হবে না।’ অর্থাৎ ট্রেনে না ওঠা পর্যন্ত আপনি টিকেট পাবেন না- ‘কারণ আপনার ট্রেনে চড়ার তৎপরতা নেই’! এখানে ট্রেনে ওঠার পূর্ব তৎপরতা এবং ট্রেনে ওঠার পরবর্তী অবস্থার তৎপরতাকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ দুটো বিষয়ের রাত-দিন পার্থক্য আছে।

 

যা-ই হোক, এক্ষেত্রে আমাদের উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করাটাই উত্তম প্রত্যুত্তর। কারণ, বিষয়টা তাদের প্রচলিত রাষ্ট্রতত্ত্বের সীমানা থেকেই আলোচিত।

 

প্রশ্নটা হলো, একটি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার জন্যও নিঃসন্দেহে একটি প্রক্রিয়া বা রাষ্ট্রতাত্ত্বিক গ্রামার আছে- সেটা কী? এবং সেক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক সংগঠন, এমন-কি যার কাঠামোটাও স্বতন্ত্র, তা কী করে কোনো প্রক্রিয়া না মেনে রাতারাতি গড়ে উঠতে পারে?

 

ফলে, চাই আর না-চাই, ক্ষমতার অলিন্দ থেকে কিংবা দল ভাঙা-গড়ার বাইরে থেকে যদি সম্পূর্ণ নতুন একটি সংগঠন গড়ে তুলতে হয়, তবে তাকে রাষ্ট্রতাত্ত্বিক গ্রামার মেনেই গড়ে উঠতে হবে।

 

সেক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার এবং কাঠামো পরিচালনায় দক্ষ ও অভ্যস্ত করার যে প্রক্রিয়া অর্থাৎ নির্দিষ্ট মতাদর্শিক শিক্ষা-দীক্ষার (Indoctrination, Habituation) মাধ্যমে চেতনাকে গড়ে তোলার এই যে (সুপারস্ট্রাকচারগত দিক) পর্ব, তাকে কী বলে? খোঁজ নিয়ে দেখবেন, রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার এই পর্যায়টি সংস্কৃতিগত বা সুপারস্ট্রাকচারগত দিক হিসেবে পরিচিত আর আমাদের ক্ষেত্রে এই পর্বই চলেছে বিগত বারো বছরের অধিক সময় ধরে। এবং যখন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূল বা Base তথা আর্থ-রাজনৈতিক দাবি পূরণের বর্তমান পর্যায়টি উঠে এসেছে, তখনই রাষ্ট্রীয় আইন বা সংবিধানের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাশীলতা থেকেই (যেহেতু নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা আইন দ্বারা নির্দিষ্ট), সর্বাগ্রে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

 

এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, ‘আপনারা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন, সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন কি-না এবং এটা যদি আমরা না করে থাকি, তবে কেউ কেউ যখন বলবেন, ‘এদের কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই’, তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না, যাঁরা নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক তৎপরতা খোঁজেন, তাঁরা উপরোক্ত গোলকধাঁধায় আটকে আছেন। কারণ রাজনৈতিক তৎপরতা না থাকলেই ‘সাংগঠনিক তৎপরতা নেই’ বলেন যাঁরা, তাঁদের সম্পর্কে আমাদের কেবলই মনে আসে, “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,/ যারা অন্ধ সব চেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;/ ...পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/”

 

এবার আসা যাক- ‘শুধু নির্বাচনে অংশ নিতেই নিবন্ধন’ কথাটি বাস্তবতার সাথে কতোটা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ, সে দিক প্রসঙ্গে।

 

ব্যাঙের ছাতার মতো দল গজিয়ে ওঠার সংস্কৃতিকে রুখতেই দলীয় নিবন্ধনের শর্তটা উদ্ভূত। নিঃসন্দেহে রাজনীতির নীতিহীনতা থেকেই চারশ জন নাগরিকের দেশে চারশ বিশটি দলের উদ্ভব, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বলতে বহুদলের উদ্ভব নয় বরং পরমতসহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করে। আর পরমত বা বহুমতসহিষ্ণুতায় একমতে আসার সংস্কৃতি তথা দায়িত্বশীলতার বিষয়টা চরম রূপ ধারণ করলেই কেবল বহুদলের উদ্ভব ঘটে অর্থাৎ জিনিসটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি-বিরোধী। অতএব, নিবন্ধনের বিষয়টা রাজনীতির সাথে না গেলেও বাস্তবতা হেতু মেনে নিতেই হচ্ছে। কিন্তু যে বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত এই নতুন শর্ত, তার পূর্বাপর প্রেক্ষিত তথা আরোপিত এই রাজনৈতিক নয়া সংস্কৃতিতে এখনও অনেকেই অভ্যস্ত নয়।

 

অবশ্য এর কারণও আছে। আর সেই কারণটাই এক্ষেত্রে আলোচিত।

 

নিবন্ধন যদি কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ই হতো, তবে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সংগঠন বা দলগুলোর অস্তিত্বশীলতা ও শক্তি যাচাই-বাছাইয়ের এতটা প্রয়োজন হচ্ছে কেন? অর্থাৎ চাই আর না চাই, হয় ১. ‘ব্যাঙের ছাতার মতো দল গজিয়ে ওঠা’ প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে নিবন্ধনের ভাবনাটা উঠে এসেছে। নতুবা ২. প্রতীক বরাদ্দ, আর্থিক সাশ্রয় সহ মূলতঃ আমলাতান্ত্রিক নির্বাচনী দায়-দায়িত্ব অপেক্ষাকৃত কমিয়ে আনার কৌশল হিসেবে এ-বিষয়টা উঠে এসেছে।

 

উপরোক্ত দুটো বিষয়ের মধ্যে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে আমরা প্রথমটাই গ্রহণ করেছি অর্থাৎ ব্যাঙের ছাতার মতো রাজনৈতিক দল গজিয়ে ওঠার বিষয়টাই এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তাছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিগত দিক থেকেও ‘কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্তে নিবন্ধন প্রয়োজন’- কথাটা বললে সেটা চলমান ক্ষমতায় যাওয়া-আসার বিষয়টাকেই প্রাধান্যে তুলে আনে, যা মূলতঃ রাজনীতিকে সংকীর্ণ বা গণ্ডিবদ্ধ করে তোলে এবং ক্ষমতাসর্বস্ব অপরাজনীতির চর্চাকেই বাড়িয়ে তোলে।

 

এদিক থেকে, নির্বাচনকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের থেকে আলাদা করে না দেখে বরং নিবন্ধনকে যে-কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্বশর্ত তথা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বাধীন পূর্বপ্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাটাই নিবন্ধনের বিষয়টাকে যথার্থতা দিতে পারে। নির্বাচনে কোনো দল অংশগ্রহণ করবে কি করবে না- সে সিদ্ধান্ত উক্ত দলগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক এখতিয়ারভুক্ত বিষয়- এটা কী করে নিবন্ধনের বিষয় হতে পারে? অর্থাৎ নিবন্ধন কোনো অবস্থাতেই নির্বাচন প্রাসঙ্গিক বিষয় হতে পারে না, বরং নির্বাচন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্বপ্রক্রিয়া হিসেবেই এই পদ্ধতিটি প্রতিষ্ঠিত বা গৃহীত হওয়া উচিত এবং ইতোমধ্যে তার প্রয়োজনও অনুভূত হচ্ছে।

 

কারণ- প্রযুক্তিগত উত্তরণ বাস্তবতায় সারাদেশে কোনো দলের কর্মী থাক আর না থাক কিংবা কর্মীদের প্রস্তুত করা তো দূরের কথা, কয়েকজন বিকেলে চা খেতে খেতে মুখ বাড়িয়ে মিডিয়ার সামনে হরতাল ডেকে দিলেই- পরদিন হরতাল হয়ে যাচ্ছে। এমন-কি মহল্লার একটি ক্লাবও যদি হরতাল ডাকে, তাতে বাধা দেওয়ার কোনো সাংবিধানিক উপায় বা প্রতিষ্ঠান নেই! মানুষ যে যেখানে ছিল, সেখানেই আটকা পড়ছে এবং তা যখন লাগাতার চলতে থাকে, মানুষের জন্যে তা ভয়াবহ হয়ে ওঠে অথচ বিশ বছর আগেও এটা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তিগত উত্তরণে পুরনো রাজনীতি আর ‘গণতান্ত্রিক’ অভিধা পাওয়া জিনিস বর্তমানে জনগণকে মুক্তি না দিয়ে জিম্মি করছে।

 

বিপরীতক্রমে, প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক দল মিডিয়া মারফত নবগঠিত কোনো দল বা সংগঠন কিংবা তার আন্দোলনকে নিজের বলে চালিয়ে দিলেও উক্ত নবগঠিত দলটির আত্মরক্ষার কোনো উপায় থাকে না। সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো, ক্ষমতাসীন সরকার তার রাজনৈতিক হীন স্বার্থে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা, এমন-কি বিরোধী দল পর্যন্ত মিডিয়া মারফত অপ্রতিষ্ঠিত সংগঠন বা দলের আন্দোলনকে বিভিন্ন ‘তকমা’য় জাতির সামনে অগ্রহণযোগ্য নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়, সেক্ষেত্রে অনেক সময় অপ্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলোর আত্মপক্ষ সমর্থনেরও উপায় থাকে না। পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দলীয় নেতা-কর্মীদের দিয়ে রাতারাতি অরাজনৈতিক কোনো ব্যানার বা তথাকথিত সিভিল সোসাইটির নামে (মূলতঃ দলীয় বেনামে) নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়িত করে, যেখানে চরম ধ্বংসযজ্ঞ চললেও কাউকে কিছু বলার থাকে না। অর্থাৎ রাজনৈতিক দায়-দায়িত্বহীন দেউলিয়াত্বের পথ ধরে এইসব অপকর্ম ইদানীং রাজনৈতিক অভিধা পাচ্ছে।

 

এদিক থেকে বাস্তবসম্মত কারণেই- যে-কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর পূর্বেই জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান-অনুচ্ছেদ ৩৮) নিবন্ধন বা অনুমোদনের বিষয়টা খুবই সহজবোধ্য বা বিধিসম্মত হয়ে উঠতো।

 

অর্থাৎ সব দিক থেকেই নিবন্ধন যে-কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্বশর্ত হলেই কেবল বাস্তবসম্মত হয়- নির্বাচনের ক্ষেত্রে নয়। ঠিক যেমন নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত ভোট প্রদান উপলক্ষ্যে ‘ভোটার আইডি কার্ড’ কেবল ভোটদানের সীমানাতে না থেকে- জাতীয় পরিচয় পত্র বা ন্যাশনাল আইডি কার্ড হিসেবে বর্তমানে পরিগণিত এবং ভোটপ্রদানের চেয়েও জীবন প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়গুলোই এক্ষেত্রে ক্রমশঃ অধিকতর প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নাগরিক জীবনের বাস্তবতার সাথে জাতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার সাযুজ্য ও সাদৃশ্য স্থাপনের অযোগ্যতায় শুধু নির্বাচন কমিশনই নয়, বরং স্বাধীনতার এত বছর পরও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে থাকা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই তার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও কর্মসীমানাগত অস্পষ্টতায় ভুগছে।

 

ফলে বহুবিধ বৈপরীত্য ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোধবুদ্ধির বাক্যবিলাস আমরা শুনছি এবং শুনতে হতে পারে। সব ক্ষেত্রেই আমরা কেন-কী করছি- সেটা একান্তই আমাদের নীতি ও আদর্শগত শর্তের সাথেই যুক্ত, কারও বলা-কওয়ার সাথে যুক্ত নয়। প্রশ্ন আর প্রয়োজনটা যেভাবেই উপস্থাপিত হোক, উত্তর আর করাটা আমাদের সুনির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শগত দিক থেকেই দিতে হবে। সে সংস্কৃতি অথবা সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, সংগঠন কিংবা নিবন্ধন- সব ক্ষেত্রেই তা সমান সত্যে প্রযোজ্য।

 

কারণ, প্রযুক্তিগত উত্তরণ বাস্তবতায় আজকের দুনিয়ায় যা কিছু মিথ্যা, গোপন আর অন্ধকার- তার পথ ক্রমশঃ সংকীর্ণ। গোপন স্বার্থে দু-চারটে দ্বার বন্ধ করলেও সহস্র দ্বার খুলে যায়। যে স্বার্থে তা বন্ধ করা হয়, সে কারণেই অসংখ্যটা খুলেও যায়। প্রযুক্তিগত পথ ধরে যেমন এখন সবাইকে জানানো যায়- তেমনি, কেউ না চাইলেও সমাজবদ্ধ বর্তমানের মানুষ যা জানার- তা জেনে যায়। যা ফাঁস হওয়ার তা ফাঁস হয়েই পড়ে- সে বানোয়াটি তকমা অথবা চুক্তি যা-ই হোক। আজকের বাস্তবতায় যা মিথ্যা, তা প্রকাশ পাবে আর সে কারণেই যা সত্য ও ন্যায়, তা প্রতিষ্ঠা পাবে।

 

 

আর্থিক নীতি বিষয়ক কিছু নির্দেশনা

 

গঠনতন্ত্র- ১০/(২) এ ঘোষিত আর্থিক নীতি অনুসারে বলা আছে (ক) পরনির্ভরশীলতাই জাতীয় জীবনে বড় পঙ্গুত্ব, অন্যের পকেট ও অন্যের মগজ উভয় পথই নিজের দেশ ও সংগঠনের জন্য অভিশাপ। দেশজ বোধে স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন সংগঠন গড়ে তুলতে হবে নিজেদের পায়ে ভর দিয়েই। তাই চেতনা বা সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শর্তে সর্বাগ্রেই জরুরি হয়ে উঠেছে স্বনির্ভরতা এবং নিজের দেশ ও সংগঠনকে অপরের পকেটস্থ হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে গৃহীত আর্থিক নীতি- ‘আপন দেশ, আপন অর্থ, আপন সংগঠন’। (খ) সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে সংগঠন যেহেতু শ্রমসংস্কৃতি গড়ার শর্তে ঘোষণা করেছে- “শ্রমবর্জিত চেতনা আর চেতনাবর্জিত শ্রম পঙ্গু ও অসম্পূর্ণ”, সেহেতু স্বনির্ভরতার নীতিগত শর্ত ও প্রতিটি সভ্যের শ্রমসম্পৃক্ততায় নিজেদের উপার্জন/অর্থ দিয়েই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালাবে।

 

ঘোষিত উপরোক্ত নীতিসহ সামগ্রিক জীবনকে ঘিরেই- যাঁরা আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে আদর্শিক দৃষ্টান্ত করে সংগঠন অনুশীলনে অগ্রগামী, তাঁদের প্রায় সবাই নিজ উপার্জিত অর্থসহ বাড়িঘর পরিবারে থাকা বিষয়-সম্পত্তি, জমি থেকে হালের গরু পর্যন্তও বিক্রি করে- সাংগঠনিক ব্যয়ভার বহন করেছেন। উপায়হীন বাধ্যবাধকতা থেকে এটা করলেও তা নিয়ে তেমন কোন অস্বস্তি আমাদের জাগেনি। কারণ ‘আপন দেশ, আপন অর্থ, আপন সংগঠন’ এর ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ কেউ নিজ বা নিজের মা অথবা বোনের গহনা বন্ধক রেখে কিংবা স্থানিক সমিতি থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে সাংগঠনিক ব্যয়ভার নির্বাহ করেছেন- যা উদ্ভূত আর্থিক সংকটের আপাত সমাধান করলেও বহুবিধ দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার জন্ম দেয়। ফলে আর্থিক সমস্যা সমাধানে এমন বিচ্ছিন্ন চড়া সুদভিত্তিক অর্থ সংগ্রহের পথে না যাওয়াই শ্রেয়। সর্বান্তকরণে এটা এড়িয়ে যেতে হবে।

         

এর অর্থ এই নয় যে, যাঁরা ইতোমধ্যে এটা করেছেন তাঁরা ভুল করেছেন- মোটেই তা নয়, বরং উপায়ান্তর না থাকায় শেষ পর্যন্ত এটা হয়েছে। এমনকি দেখা গেছে তাঁদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজ পরিবারে থাকা শেষ উপায়টুকু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই তাঁরা অগ্রজ দায়িত্ববোধের দায়বদ্ধতা থেকে এটা করেছেন। কিন্তু কেউ কেউ যখন অনুগামীদের আর্থিক চাপমুক্ত রাখার মানসিকতা থেকে পুরো আর্থিক দায়িত্ব একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে এমনটা করেছেন- সেটা পদ্ধতি হিসাবে যথার্থ ছিল না। কারণ অনুগামীদের প্রতি এই মমত্ব তাঁদেরকে এগিয়ে না দিয়ে বরং পিছিয়ে দেয়। ইতোপূর্বে বারবার বলা হয়েছে আর্থিক শেয়ার কেবল সংগঠনের আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর প্রশ্নেই জরুরি নয় বরং আর্থিক শেয়ারে না আসলে কোন সংগঠকের সাংগঠনিক চরিত্র গড়ে উঠতে পারে না। এতে আপাত সংগঠন বিস্তার ঘটলেও ‘আপন দেশ, আপন অর্থ, আপন সংগঠন’ এর নীতিগত দিকটা যথাযথ প্রতিফলিত হয় না- ফলে স্বকীয় নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন সংগঠন গড়ে ওঠার পরিবর্তে পরনির্ভরশীল পঙ্গুত্বের দ্বার উন্মোচিত হতে থাকে।

 

          সেই সাথে সংগঠন কাঠামোয় নেতৃত্ব নির্বাচনের শর্তে থাকা যে নীতি তথা ‘সময়’- এর নিক্তিতে সাংগঠনিক চরিত্র মাপার মানদণ্ড হিসাবে ঘোষিত পারিবারিক, আর্থিক ও সাংগঠনিক ফিল্ড (কনস্ট্যান্ট প্রাকটিস) এর ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। অর্থাৎ সময়ের মানদণ্ডে এগিয়ে থাকলেও আর্থিক শেয়ারের রির্পোট-রেকর্ডে তথা সাংগঠনিক চরিত্রের দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। আর সাংগঠনিক চরিত্র না গড়ে উঠলে নানাবিধ জটিলতাসহ সাংগঠনিক রুচি-সংস্কৃতিরও ঘাটতি প্রকটিত হয়ে ওঠে। তখন এই মমত্ব অনুগামীকে আপনত্বের বদলে বিচ্যুতির পথে ঠেলে দেয়, অথোরিটিও বিতর্কিত হয়ে পড়েন।

 

          কিন্তু তবুও উপরোক্ত নেতিবাচকতা প্রচলিত সমাজমননের বিপরীত সত্যকে প্রকাশ করে।

         

কারণ বিদ্যমান পারিপার্শ্বিকতায়- যখন শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও ঘুষ খেতে বা নিজের মর্যাদাবোধ, নীতি নৈতিকতা বিকিয়ে দিতে তথাকথিত শিক্ষিতদের বাধছে না, বিনাশ্রম অর্থ আয়ের খায়েস কিংবা পরার্থ হরণের কৌশলই যেখানে শিক্ষা-দীক্ষা, বুদ্ধিমত্তা হিসাবে চর্চিত ও স্বীকৃত হচ্ছে- সেখানে মানুষ ও মনুষ্যত্ববোধের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে এমন আত্মস্বার্থশুন্য সামষ্টিক বোধে উজ্জীবিত তারুণ্যের ঝাঁক পৃথিবীতে আর কোথায় আছে?

 

          বিশেষতঃ একবিংশ দুনিয়ার এই বেনো-সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে- জনান্তিক প্রান্তিক ছুঁতে, আসমান স্পর্শ করার স্পর্ধায়, এমন অটল পাহাড় হয়ে উঠতে- কারা একযুগ পেরিয়ে এসেছে? ধৈর্য-স্থৈর্যে তারুণ্যের নতুন সংজ্ঞায় এত দীর্ঘ সংবদ্ধতার সাধনায় এ মূহুর্তে কারা আছে?

 

সংবাদ ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গেঃ  নেতিবাচক আর গীবত-ঘেউয়ে যখন ক্ষত-বিক্ষত সমাজদেহ, রাজনীতি থেকে ধর্ম সবক্ষেত্রে একই চিত্র। এমনকি ব্যতিক্রমের সন্ধানই যেখানে সাংবাদিকতা, ইতি অথবা নেতি যে অর্থেই হোক 'ব্যতিক্রম' অর্থেই 'খবর'। 'নিউজসেন্স' বা সংবাদের নাক বলতেও মূলতঃ এই 'ব্যতিক্রম' কে বুঝার ধারণা ও দক্ষতাকেই বুঝায়। কেবল নেতিবাচকতাকেই শুধু সংবাদ অর্থে বুঝা অপসাংবাদিকতারই মূর্খতা! নিশ্চয়ই কেবল ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ খোঁজা ইতরের নাক আর সংবাদের নাককে কেউ এক করে ভাববে না এবং অবশ্যই কোনো বোধসম্পন্ন রুচিবান মানুষের কাছে ইতর বৈশিষ্ট্য আর মানবীয় বৌদ্ধিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য বোঝা কঠিন কিছু নয়। তেমনি গল্প-উপন্যাসে থাকা গ্রামীণ জীবনের অলস কূটনী বুড়িদের ছড়িয়ে দেওয়া 'গসিপের' সাথে সংবাদ ও সাংবাদিকতার পার্থক্যটা স্পষ্ট। সংবাদ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নিশ্চিত তথ্য যাচাই বা সত্যের শর্তগত বৈশিষ্ট্য থাকে কিন্তু গসিপে তা থাকে না। কিন্তু সব সংবাদ কর্মীই যেমন সাংবাদিক নয় তেমনি সব সংবাদও সংবাদ নয়। সাংবাদিকতার ছদ্মবেশ এখানে আছে বলেই কেবল নেতিবাচকতাই ব্যতিক্রম অর্থে সংবাদ হয়। এমনকি ধারণা বা গসিপও 'এদিক-ওদিক' তথ্যসূত্রের দোহাইয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ সংবাদ হিসাবে প্রকাশ পায়। এখানে সংবাদ ও সাংবাদিকতার মান তাদের কাছে বিষয় না, কারণ তারা সাংবাদিক নয়। ভুল না মানা, সমালোচনা না শোনার অভ্যাসে মনে মনে এরা জীবরাঈল হয়ে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু মানুষ জানে- 'ভুল হয় না শয়তানের'। এতে ফিল্ড/হোমওয়ার্কহীন এই সবজান্তাদের কিছু যায় আসে না। কারণ মানুষের ভাবাভাবি অথবা সাংবাদিকতার মান বাঁচলো কি মরলো সেটা এদের বিষয় নয়। কারণ ইথিকস মোরালিটির ধার এরা ধারে না। তাই একজনের তিল তিল করে গড়ে তোলা ভাবমূর্তি বা ইমেজ কামড়ে ধরতে- তথ্য যাচাই না করেই সংবাদের নামে যে কারও সমন্ধে যা ইচ্ছে তাই লিখতে ও বলতে এদের একটুও বাধছে না। যদিও কোন অবস্থাতেই আত্মহত্যা সমর্থন যোগ্য নয় তবুও 'সম্ভ্রম-মর্যাদা' রক্ষায় আমাদের সমাজ বাস্ত্মবতায় এখনও আত্মহত্যার ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু পাশ্চাত্যে আত্মহত্যার পরিমাণ বেশি হলেও 'সম্ভ্রম-মর্যাদা' রক্ষার প্রশ্নে 'আত্মহত্যার ঘটনা নেই' বললেই চলে। এর অর্থ পাশ্চাত্যের সাংবাদিকতায় যে ইথিকস মোরালিটি এবং সোস্যাল কমিটমেন্ট রয়েছে তা থেকে আমাদের সাংবাদিকতার ইথিকস মোরালিটি এবং সোস্যাল কমিটমেন্ট অবশ্যই ভিন্ন- এখানে জানের চেয়েও কোথাও কোথাও মানটাকে অনেক বড় করে দেখা হয়। অর্থাৎ সাংবাদিকতার পেশায় এখন অনেক ন্যাংটো জুটেছে যাদের ইজ্জত জ্ঞান বা সোস্যাল কমিটমেন্ট না থাকলেও চলে।

 

          অথচ সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, জাতীয় জীবনে গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে স্বাধীনতা, ন্যায় প্রতিষ্ঠাসহ জনগণের শেষ আশ্রয় ও উন্মেষও সাংবাদিকতায়। যে কারণে স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশকে পিছিয়ে দিতে এঁদেরকেই নিকেশ করা হয়েছিল। হত্যা না করেও এই পেশাটিকে বিষিয়ে তোলা সমান অপরাধ।

 

          এমনই এক বিষিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া হল 'ব্যতিক্রম' অর্থে- 'ইতিবাচকতা'র সংবাদমূল্য হারানো। ইতিবাচকতা মানেই 'সংবাদ না হওয়া', আর 'ব্যতিক্রম' হয়েও সংবাদপত্রে জায়গা না পাওয়া- জাতীয় জীবনে খারাপ বার্তা বয়ে আনে। যখন কেবল নেতিবাচকতাই সংবাদ হয় তখন 'কে ভাল বা গ্রহণযোগ্য'- সেটা বেছে নিতে মানুষ হিমসিম খায়। যেমন রাজনীতিতে যদি সরকার বা বিরোধী দলের কেবল নেতিবাচকতাগুলোই প্রকাশ পায় আর ইতিবাচকতা আড়াল হয়ে পড়ে, তবে সরকার পরিচালনায় মানুষ ‘কোন দলকে’  নির্বাচিত করবে সে সিদ্ধান্তে অনেক সময় ভ্রান্তি উঠে আসে। এভাবে ব্যাপক জনসমাজ তার অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণে কে আপন কেবল তা বেছে নিতেই ভুল করে না বরং পুরো রাজনীতি প্রসঙ্গেই অনাস্থা, অশ্রদ্ধা তৈরী হয়। এতে গণতান্ত্রিক সহিঞ্চুতা বা সংহতির পরিবর্তে পারস্পরিক বিরোধ ও দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে তোলাটাই কার্যকরী হয়- দেশ পিছিয়ে পড়ে, সোস্যাল কমিটমেন্টও ভেঙ্গে পড়ে। যদিও মাত্র ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশে মুখে মুখে সব সত্যই প্রকাশ পায় কিন্তু অনেক সময় দেরী হয়ে যায়।

 

          তবুও আস্থা সংবাদ ও সাংবাদিকতাতেই আজ রাখতে হবে। কারণ রাজনীতির নামে চলা এই জনপদে দল ও সরকারের পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যথেষ্ট অভাব আছে। ফলে গণতান্ত্রিক বিকাশ ও উন্মেষে এখনও সংবাদ ও সাংবাদিকতাই এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। সব পেশাতেই যেমন ভালোই বেশি থাকে- নইলে তা টেকে না, তেমনি মানবীয় আবেদনে আর সামাজিক স্থিতিশীলতায় আমাদের দেশের সংবাদ আর সাংবাদিকতা পৃথিবীর যে কোন দেশের চেয়ে সর্বোচ্চ নির্ভরশীলতায় এগিয়ে আছে বলেই জঙ্গীত্ব এখানে দাঁত বসাতে পারেনি। সংবাদ ও সাংবাদিকতায় পৃথিবীর আর কোথাও এমন অনন্য ভূমিকার নজির বা কৃতিত্ব নেই- ফলে এদেশ এগুতে বাধ্য। বিষময় হয়েও এঁরা যথা সময়ে বিষ হজম করে উঠে দাঁড়ায়- একাত্তর থেকে অদ্যাবধি ইতিহাস সেটাই বলে। ফলে- জাতীয় জীবনে এখনও কেবল সংবাদ ও সাংবাদিকতাই শুভবোধের বড় আশ্রয় ও ভরসাস্থল।

          শুরুর প্রসঙ্গে ফেরা যাক, দল ভাঙ্গা-গড়ার বাইরে স্বকীয় শক্তিতে কোন সংগঠন যদি গড়ে ওঠে এবং তা তরুণের নিজস্ব অর্থ আর শ্রমে- আপন নেতৃত্ব ও নির্দেশনায়, তবে কি তা ব্যতিক্রম নয়? আজ পৃথিবীর তরুণরা জেগে উঠছে, কিন্তু যে তরুণেরা আদর্শভিত্তিক সংঘবদ্ধতায় বারো বছরেরও বেশি সময় পথ হাঁটছে, পথের নিক্তিতে তাঁরা কি আলাদা নয়? তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের এ দায়বদ্ধতায় এখনও যে সাংবাদিকরা পথ হাঁটে, প্রত্যাশার নতুন বন্দরের খোঁজে- এখনও যাঁরা অতন্দ্র প্রহরী, জাতির প্রতিটা ভোর যাঁদের টোকায় ঘুম ভাঙ্গে, জাগরণের সেই কলম-ক্যামেরা ইস্রাফিলের ওঙ্কার হয়ে নিশ্চয় বাজবে। কারণ সেটার অর্থ কেবল ধ্বংস বা শেষ নয়, ইতিবাচকতার অর্থে তা পূণর্জাগরণ।

 

 

নির্বাচনি প্রতীক-'মুচলেকা'

২৩শে অক্টোবর, ২০১২ খ্রিঃ তারিখে প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুসারে নির্দিষ্ট নিবন্ধন ফরম-এ [তফসিল, ফরম-১, (বিধি ৪ দ্রষ্টব্য)] উল্লিখিত ৬ মোতাবেক ৩০.১২.২০১২ তারিখে 'কলম' প্রতীকটি সংরক্ষণের জন্য আবেদন করা হয়।

 

তদুপরি ০৪.০৭.২০১৩ তারিখে কলমের সাথে তারা সংযুক্ত করে 'কলম-তারা' প্রতীকটির জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়।

 

কিন্তু ০১.০৯.২০১৩ তারিখে আমাদের জানানো হয়, যে 'নির্বচন পরিচালনা বিধিমালা, ২০০৮ এর ৯(১) অনুচ্ছেদ' অনুসারে কমিশনে সংরক্ষিত প্রতীকসমূহ থেকেই কেবল সংগঠনের জন্য প্রতীক পছন্দ বা নির্দিষ্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসে তা হলো- আবেদন ফরমে কেন তা সুস্পষ্ট করে উলেস্নখ করা হয়নি। এমনিতেই বড়জোড় তিন মাসের একটি বিষয় ৯ মাসেও সম্পন্ন হয়নি অর্থাৎ প্রচলিত ১৮ মাসে বছর না হয়ে, গড়ে এখানে ৩৬ মাসেও বছর শেষ হচ্ছে না। সেখানেএই নয়াদিক-বিদিকঅবস্থা আমাদেরকে বিস্মিত করেছে। বিশেষত কোনো সংগঠনের 'প্রতীক' অনেক সময় প্রতীক না থেকে উক্ত সংগঠনের নীতি-আদর্শের 'প্রতিফলন'হয়ে থাকে। মুক্তিজোট একটি আদর্শ বা মতাদর্শভিত্তিক সংগঠন বিধায় প্রতীক নির্বাচন ছিল একটি গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া পূর্ব সংরক্ষিত বা নির্দিষ্ট প্রতীকসমূহ থেকেই প্রতীক বেছে নেওয়ার বিষয়টা একেবারেই রাজনৈতিক রীতি-নীতির সাথে যায় না- বরং এটা নিছক 'মুচলেকা' এবং এই প্রক্রিয়াটাও 'মাছি মারা কেরাণী' সুলভ নির্বুদ্ধিতার প্রকাশ। নির্বাচন কমিশন সহ প্রজাতন্ত্রের সকল প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণে থাকেন যে সরকার, সেই সরকার সুসভ্যত প্রক্রিয়ায় গঠিত হলে তা সাধারণত কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল দ্বারাইচালিত হয়। অথচ রাজনীতির অনুবর্তী আমলাতন্ত্র না হয়ে, যদি রাজনীতিই আমলাতান্ত্রিক খেরোখাতার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকে- তখন বুঝতে বাকী থাকে না, "উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ, হায়... বৃথা যায় বৃথা যায়"।

 

রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা যখন রাজনীতিহীন গণবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের হাতে উঠে আসে তখন রাজনীতির মানটা নেমে যায়।

 

স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের দেশে রাজনীতির গতি-প্রকৃতিতে নেতৃত্বের পুরোভাগে যাঁরা অবস্থান করছেন তাঁদের বেশির ভাগই গণসংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের মধ্য থেকে নেতৃত্বে উঠে আসেননি। রাষ্ট্রতত্ত্বে- দল ও নেতৃত্বের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে,‘ঐক্যের গ্রহণযোগ্য মানদ-’ তথা দলগত ঐক্যের শর্তে-'কমন অথোরিটি'র শূন্যতা পূরণের বাস্তবতা থেকেই মূলতঃপরিবার বা রাষ্ট্র যে কোনো পরিচয় বা পথ ধরেই- নেতৃত্ব এঁদের হাতে এসে গেছে। অর্থাৎ ব্যক্তির রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা বা 'অর্জন'-এর সংস্কৃতি এখানে অনুপস্থিত, ফলে যথাযথ দায়িত্ব ও নীতি নির্ধারণে অপরিণত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতির পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা উঠে আসছে। আর এভাবে রাজনীতির মানটা কেবল নেমে যায়নি, এক্ষেত্রে তাকে তাচ্ছিল্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটা শুধু নির্বচন কমিশনেই নয়, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় সবগুলি প্রতিষ্ঠানই যেখানে ব্যাপক জনসমাজমুখিনতায় জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকায় সক্ষম বা শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা তো হয়নি, বরং সেগুলোর সাথে প্রজাতন্ত্রের যে সব নতুনবিধি-বিধানসমূহ আসছে সেসব ক্ষেত্রে 'চেক এন্ড ব্যালান্স' এর দুর্বলতা ও বৈপরীত্য সহ নানাবিধ অপরিণতির দিকটি প্রকাশ পাচ্ছে।

 

নিবন্ধনগত শর্তে অহেতুক কাল হরণে এমনিতেই আমরা তিতিবিরক্ত ছিলাম, তদুপরি এই নির্বুদ্ধিতা দেখে মনে হলো যত দ্রুত সম্ভব এদের কাছ থেকে বেরুনোটাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অমর্যাদাকর হলেও এই নির্বুদ্ধিতার সাথে মুচলেকা মেনেই আমরা উক্ত সংরক্ষিত প্রতীকসমূহের মধ্য থেকে পূনরায় 'দোয়াত-কলম' প্রতীকটি নির্দিষ্ট করে সংরক্ষেণের জন্য আবেদন করি। কিন্তু এখানেও জানানো হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতীক হওয়াতে 'দোয়াত-কলম' প্রতীকটি দেওয়া যাবে না। এরপর প্রতীক নির্ধারণের বিষয়টা নিতান্তই ভাগ্যের সাথে জড়িয়ে গেল! বিশেষত সংরক্ষিত প্রতীকসমূহের মধ্যে ইতিপূর্বে বরাদ্দ প্রাপ্ত অপরাপর রাজনৈতিক দলের জন্য ও স্থানীয় সরকার নির্বচনের জন্য নির্দিষ্টকৃত প্রতীক বাদ দিলে যে কটা প্রতীক থাকে তাতে আমাদের কাছে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতার নিক্তিতে উতরে যাওয়া একটা প্রতীক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল।

 

[জবাদিহিতার এ পর্যায়ে সকল সংগঠকদের জ্ঞাতার্থে প্রতীক প্রাসঙ্গিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট দুটি পত্র হুবহু বা স্ক্যান করে যুক্ত করা হল।]

 

 

 

তারপরও বাধ্যবাধকতার কারণে আমরা চেষ্টা করলাম প্রতীক বাছায়ে বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে এবং সেক্ষেত্রে সিংহ, হাতি, চরকা, ঘন্টা, ছড়ি, কুমির ইত্যাদির মধ্যে স্থান-কাল-পাত্র তথা স্থায়িত্বের দিক থেকে- সার্বজনীন জীবনের প্রাত্যহিক ব্যবহারে চেনা- সর্বজন বিদিত প্রতীক হিসেবে 'ছড়ি' প্রতীকটি গৃহীত হয়।

 

কিন্তু ব্যাপক জনমানুষ 'ছড়ি'কে 'ছড়ি' হিসেবে না চিনে লাঠি হিসেবে চেনে। সেক্ষেত্রে আদর্শগত দিক থেকে এক ধরণের শঙ্কা-ত্রস্ততায় চরম সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম। অবশেষে বড়দা'র মত চাইলাম।

 

বড়দা আমাদের মতকে সমর্থন জানিয়ে বললেন- ‘লাঠি শুধু লেঠেলদের হাতে থাকে না, লেঠেলদের সংযত-সংহত আর শাসন করতে যুগে যুগে যে যুগপুরুষদের আগমন ঘটেছে, তাঁরাও লাঠি হাতেই আবির্ভূত হয়েছেন। নেতি নয়, ইতির চর্চাতেই সংস্কৃতি, সতর্ক হওয়ার প্রশ্নে নেতির ভাবনা বুদ্ধিমত্তা, কিন্তু সেটুকুও হওয়া চাই, কেবল স্থায়িত্বের প্রশ্নে। শোধনহীন নেতির চর্চা- গীবতদারী, সেটা লক্ষ্যবিমুখ ব্যক্তিমনের বৈকুল্য। বিধাতাকে ধন্যবাদ তিনি আমাদেরকে লক্ষ্যে স্থির রেখেছেন, প্রাত্যহিক পথ চলায় একটি আদর্শিক পথ দিয়েছেন, আরবিজ্ঞাননিষ্ঠতার নিক্তিতে গৃহীত অহিংস'র সে সত্য পথে-এখন দিলেন প্রজ্ঞা-প্রফেসির প্রতীক! স্রষ্টা প্রদত্ত মহান স্মারক হিসেবে এঁকে তুলে নাও- অতঃপর সম্মুখে এগিয়ে যাও। নিশ্চয় পৃথিবী সৎ কর্মশীলদের অধিভূক্ত হবে-ভবিষ্য দ্রষ্টা ‘গাফফার’-এঁর অমোঘ সে বাণীতে ইনশাল্লাহ আমাদের জয়ই ঘোষিত হয়েছে! রাব্বুল আলামিনই সত্য- হিংসা ধ্বংস হবে; আর তাঁর সাহায্যে নিশ্চিতভাবে কেবল সত্যই জয়ী থাকবে। ‘ছড়ি’কে অনাগত জয়ের সেই বোধনচিহ্ন হিসেবে গ্রহণ কর, বিধাতার এক মহান দান হিসেবে হাতে তুলে নাও।’

 

 

 

 

 

‘সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে

এবং মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’

 

সমাজ-সভ্যতা দুই ভাগে বিভক্ত- কায়িক শ্রম নির্ভর সমাজ-সভ্যতা ও বৌদ্ধিক শ্রম নির্ভর সমাজ-সভ্যতা। বৌদ্ধিক শ্রম নির্ভর সমাজ-সভ্যতা সমাগত, কায়িক শ্রম নির্ভর সমাজ-সভ্যতা বিগত!

হিংসা নয়- বদলের বিজ্ঞাননিষ্ঠ পথ আজ ‘অহিংস’। রক্ত নয়- বৌদ্ধিকতাই বদলের একমাত্র শর্ত।

এবং রক্তজ হিংসান্মোত্ততা, সাদা-কালো অতিক্রান্ত হয়ে- প্রবৃত্তি-প্রাধান্য বিলুপ্ত হবেই।

মানবীয় মর্যাদায় শামিল-

সত্য ও শুভবোধের বিজয় নিশ্চিত ঘোষিত হচ্ছে।

 

‘সংহতির ডাক’

[সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্তর থেকে বর্তমানের উত্তরিত রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক স্তরের আহ্বান]

 

 

 

 

 

সুহৃদ,

 

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শুভ্র শুভেচ্ছা ও অহিংস’র হৃদ্‌স্পন্দিত অভিনন্দন।

 

বায়ান্নো ও একাত্তর সহ এদেশের জন্য, সমগ্র দুনিয়ার জন্য, সারা বিশ্বে যতো মানুষ মানবীয় মর্যাদা ও কল্যাণে, মনুষ্যত্বের মুক্তি ও ন্যায্যতার শর্তে, শান্তি ও সততায় প্রাণোৎসর্গ করেছেন, সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় যাঁরা পথিকৃৎ আছেন, সেই সব আত্মোৎসর্গকারী শহীদ ও সত্যচারীদের প্রতি মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে বর্ষিত হোক শান্তি, প্রশান্তি বর্ষিত হতে থাকুক বর্তমান সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে যতো আগুয়ান মানুষেরা পৃথিবীতে আসবেন, তাঁদের প্রতি। মানবীয় মর্যাদা ও মুক্তি, কল্যাণ ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় শামিল- মহান সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আগত-অনাগত সকল বন্ধুদের প্রতি, সহস্রাব্দের সূচনাবোধনে- পুনশ্চঃ এ দ্বাদশে- সালাম-সালাম হাজার সালাম!

 

মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে- মানবীয় মর্যাদার নিক্তিতে, অবিরত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের আদর্শিক দিশায়- দৃঢ়বদ্ধ, অহিংস’র দীক্ষামন্ত্রে- দীক্ষিত, সামাজিক ভিত্তিমূলকে বদলে দেবার শাণিত শপথে- উচ্চারিত, “জাতীয় জীবনে সংহতি” গড়ে তোলার মহান ঘোষণায়, আমরা জানাচ্ছি আমাদের অস্তিত্ব, অবস্থান ও লক্ষ্য। অতঃপর কর্মহীন বাক্যকে যেহেতু বিজ্ঞান কাজ বলে না, তাই সর্বাগ্রে বৈজ্ঞানিক শর্তবদ্ধতাতেই জানাবো ভবিষ্যত কর্মদিশার আশুকর্তব্য এবং তা আমাদের আদর্শিক বিশ্বাসের ব্যাপকতায় এ লেখা ‘সংক্ষেপ’ মাত্র।

 

 

প্রিয় বন্ধুরা,

 

দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে, ইতিহাসের অন্ধকারময় দুঃসময়ের বিরুদ্ধে, বারে বারে প্রতিবাদে-প্রতিরোধে গর্জে ওঠা বাংলার কাঁধে আজ চেপে বসেছে- রাজনীতিহীন নৈরাজ্যের বিশৃঙ্খলা। দল আছে- রাজনীতি নেই, সরকার আছে- ব্যবস্থাপনা নেই। রাজনীতির নামে চলছে দস্যুপনা, দলবদ্ধ বেনোবৃত্তির বেহায়া উন্মাদনা, তাই সর্বক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী হিংসা ও লুণ্ঠনের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা।

 

জাতি ভুলেছে তার ঐতিহ্য, বিস্মৃত হয়েছে তার ইতিহাসের পাতায় থাকা অগ্রগামিতার সব চিহ্ন, আগুয়ানের আলোকময়তার সমগ্র অর্জন, দিশা হওয়ার বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হওয়ার সব অহংকার ও দম্ভকে। চরম নির্লিপ্ততায় দেশবাসী মেনে নিচ্ছে, রাজনীতিহীন মিথ্যা আর শঠতাকে। তাই ভবিষ্যত বলতে প্রজন্মের সংজ্ঞায় বর্তমান দেশ-জাতি আজ সর্বোতঃভাবেই বিস্মৃতির বেনোজলে ভাসমান- শেকড়হীন সমকালীন প্রজন্ম, বিস্মৃতির কালো অধ্যায়ের আঁতুড়ঘর, যেখান থেকে শুরু হয়, জন্ম নেয়- নেশা ও হিংসার মতো আসুরিক বিশৃঙ্খলার শেকড়হীনতা, বোহেমিয়ানায় ভেসে যাওয়া।

 

সমকালীন দুঃসময়ের শিকার হতে হতেও আমরা থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলাম নিজেদেরকে “আমরা কারা? কোথায় আমাদের অনাগত গন্তব্য?” অতঃপর বিস্মৃতির ধূলিধূসরতাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে জেনেছিলাম আমরা কারা, খুঁড়ে এনেছিলাম আমাদের পরিচয় এবং তারুণ্যের সদম্ভ অস্তিত্বে ইতিহাসনিষ্ঠতায় জেনেছিলাম আমাদের বিজয়ী গন্তব্য। ইতিহাসনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক দিশা নির্মাণের দায়বদ্ধতার আলো ফেলতেই উঠে এলো বিশ্ববাজারে পণ্য করে ফেলা ‘দেশ’ নামক আমাদের জননী জন্মভূমি বাংলাদেশ। তাঁর মাতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠাত্রী হওয়া মাত্রই জন্মগত বোধের মূলে জ্বলে উঠলো প্রতিরোধের দুর্দমনীয় যৌবন, অস্তিত্বের প্রখরতায় মৃত্যুকে পরাভূত করার স্বপ্নে উচ্চারিত হলো অহিংস’র দীক্ষামন্ত্র। বিপরীত অর্থে গড়া লক্ষ্য বিমুখতা ভেঙে জীবনকে গড়ে তুললো যাপনের প্রজ্জ্বলনে, সংঘবদ্ধতার দীপ্তময় দিশা, সুগভীর বিশ্বাসের ভিতে জন্ম নিলো আত্মিক বন্ধনের সুদৃঢ় প্রত্যয়- মনুষ্যত্ব। অর্জনের পারস্পরিকতায় সে প্রত্যয় আরো শাণিত হলো সচেতন অনুষঙ্গ আর মানবিক আড্ডায়। আর এভাবেই “সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত”-এর ঘোষণায় অনাগত বিজয়ের লক্ষ্যাভিমুখিনতায় হয়েছিলাম দৃঢ়বদ্ধ এবং বৈজ্ঞানিক দিশায় আমরা সংঘবদ্ধতার পথে-

 

গত ২৪শে নভেম্বর-২০০০ খ্রিঃ-এ সহস্রাব্দের যুগসন্ধিতে ঘোষণা করেছিলাম- ‘সচেতন সামাজিক শক্তি’ উত্থানের পাল্টা ইশতেহার। সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শাণিত পথে, মুক্তির সওগাতবাহী চেতনার স্ফুরিত উচ্চারণে, সামাজিক আন্দোলনের প্রত্যয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সমগ্র দেশব্যাপী। স্বদেশব্রতে প্রতি জনপদে, মানবমুক্তির মহামন্ত্রে- বৈশ্বিকতায় দিকে দিকে। এই বন্ধুর পথচলায় আমরা যা কিছু পেয়েছি, বাধা থেকে বাধা অতিক্রমণের বোধগম্যতা, কষ্ট থেকে কষ্ট মুক্তির দুর্বিনীত প্রতিজ্ঞা এবং সীমাভাঙা বাস্তব ভিতে গড়া অনাগত বিজয়ের অনিবার্যতায় প্রাপ্ত- প্রত্যয়ী স্বপ্নের অগ্নিভ প্রেরণা। সেই সব সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা এবং অগ্রগামিতার শর্তে প্রোজ্জ্বল অভিজ্ঞতাকে দিশা হিসেবে প্রকাশ করতেই বিগত বারো বছর পেরিয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পরিণতিতে-

 

গত ২৪শে নভেম্বর, ২০১২ খ্রিঃ-এ আমরা “জাতীয় জীবনে সংহতি” গড়ে তোলার আহ্বানে ঘোষণা করি এই সংহতির ডাক- যা মহান সংস্কৃতি তথা মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দল-মত নির্বিশেষ প্রতিটি মানুষকে শামিল করার প্রত্যয় নিয়ে ঘোষিত হচ্ছে।

 

এবং অবশ্যই তাঁদের কাছে- যাঁরা মাতৃরূপ স্বদেশের একই উদরে জন্ম নেয়ার শর্তে আমাদের সহোদর ও সচেতন যন্ত্রণায় সমদগ্ধ, অশ্রু-ক্রোধে সংঘবদ্ধ, প্রতিরোধের একই মন্ত্রে দীক্ষিত এবং এই সমকালীন দুঃসময়কে রুখে দিতে- এই আদর্শিক যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা, সেইসব দেশবাসীকে, যাঁরা বিশ্বাস করেন ইতিহাসকে- সবার মুক্তির সাথেই নিজের মুক্তির শর্তবদ্ধতাকে, নিজেদের সক্ষমতাকে ও শ্রদ্ধা করতে জানেন মানবীয় মর্যাদাবোধের সংগ্রামকে। সর্বোপরি রক্ষা করতে জানেন সামষ্টিক চেতনাকে।।

 

 

প্রিয়সহযোদ্ধাগণ,

 

মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে মানবীয় মর্যাদার নিক্তিতেই নির্দিষ্ট ও গৃহীত আমাদের আদর্শ, যা “সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত” ঘোষণায় উদ্ভাসিত।

 

মহতী সে লক্ষ্য পূরণে- মহান সংগ্রামের হাতিয়ারই আমাদের সংগঠন- ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট’, সংক্ষেপে যা ‘মুক্তিজোট’

 

আদর্শিক দিশা অনুসারে আমাদের সংগ্রামী পথচলায়- গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধতা, তথা সংগঠন জন্ম নিয়েছে ইতিহাসনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ধারা মেনে। স্পষ্টতঃই আমরা মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে সুনির্দিষ্ট আদর্শের এবং আমাদের সংগ্রামী লক্ষ্য পূরণে সংঘবদ্ধ। আর এই দৃঢ়বদ্ধ সাংগঠনিক রূপ ও অগ্রগায়ন সর্বদা বিজ্ঞাননিষ্ঠতার শর্তযুক্ত। যা স্বতন্ত্র সংজ্ঞায় বিভূষিত তথা প্রত্যয় হিসেবে নির্দিষ্ট।

 

মানুষ বলতে আমরা মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষকেই বোঝাতে চাইছি। স্পষ্টতঃই আমাদের কাছে মানুষের সংজ্ঞা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক জীব হিসেবে- চিরকালীন বাহ্যিকতাসম্পন্ন মানুষের সংজ্ঞাকেই প্রতিফলিত করে না। আমরা ‘মানুষ’ বলতে বোঝাচ্ছি সমাজবদ্ধ সেই মানুষকে, যে সমাজগত পরম্পরায় বেড়ে উঠেছে এবং অর্জন করেছে পারস্পরিকতা তথা সংস্কৃতিকে। আর সংস্কৃতি পরম্পরাগতভাবেই শুধু আসে না, বরং পারম্পর্যতায় প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক পারস্পরিকতার লক্ষ্যে নিয়ত সংগ্রামের মাধ্যমে করে নিতে হয়, এটাই মনুষ্যত্ব। সুতরাং মনুষ্যত্ব অর্জনে নিয়ত অন্বিতকরণের মাধ্যমে তাকে এগিয়ে নিতে হয়। মনুষ্যত্বই সাংস্কৃতিক শর্ত পূরণে দায়বদ্ধ। মানুষ তাই তার মনুষ্যত্বের পূর্ণতা পায় সাংস্কৃতিক শর্ত পূরণে। যার সংস্কৃতি নেই, তার মনুষ্যত্ব নেই এবং সংস্কৃতি একান্তই সমাজগত। সুতরাং সমাজমুক্তির সাথেই মনুষ্যত্বের মুক্তির শর্ত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে সংজ্ঞায়িত ও শর্তবদ্ধ।

 

সংস্কৃতি- যার উৎসে সমাজবদ্ধ মানুষ এবং যার উৎসরণে মনুষ্যত্ব। আর এভাবে পারম্পর্যতা ও পারস্পরিকতার সাংস্কৃতিক অগ্রগায়নে গড়ে ওঠে সভ্যতা। তাই চলমান ব্যক্তিস্বার্থভিত্তিক যুথবদ্ধ এই পাশবিক সমাজের বিরুদ্ধে সুসভ্যত সামাজিক মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে অগ্রজ সভ্যতা বিনির্মাণেই- আজ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অবিরত ও অনিবার্য হিসেবে ঘোষিত।

 

উল্লিখিত মানবমুক্তির ভিত হিসেবে গৃহীত ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম’কে আমরা ব্যাপক অর্থে বলেছিলাম, ‘সংস্কৃতি’ অর্থ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যাপিত জীবন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও তদানুসারে পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলে আবর্তিত তার জীবন সম্পর্কীয় ভাবধারা। জীবন সংশ্লিষ্ট চেতনাগত এই পরিমণ্ডলই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। আর সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে তার জীবন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে যা কিছু এবং সমাজজীবনের অগ্রগতি বা মুক্তির লক্ষ্যে সমাজে বিদ্যমান এইসব বিষয়গুলির সাথে দ্বন্দ্বে সে যা কিছু বিকাশ সাধন করে, গড়ে তোলে বা গড়ে তুলতে চায়, প্রগতির ধারা বিনির্মাণে- তার সবটাই সংস্কৃতির অঙ্গীভূত। এই ব্যাপক অর্থে গৃহীত সমাজজীবনে ব্যাপৃত অর্থনীতি-রাজনীতি, ধর্ম-দর্শন, শিল্প-সাহিত্য বিষয়গুলোকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ও আদর্শের ভিত্তিতে যে সব ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা, তাকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলা হচ্ছে।

 

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখা বা বলা যেমন ভুল ও সংগঠনবিরোধী, তেমনি একে নিছক শিল্প-সাহিত্যের রসালো আড্ডা কিংবা সংগ্রাম বিযুক্ত, লক্ষ্যবিহীন ধর্ম-দর্শন-অর্থনীতির গুরুগম্ভীর চর্চা কেন্দ্র ভাবা বা পরিণত করাটাও এই সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে সীমাবদ্ধ ও সাংগঠনিক লক্ষ্যকে বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়ার শামিল। জ্ঞানতত্ত্বের এই শাখাগুলো মিলেই গড়ে তুলবে এই আন্দোলনের লক্ষ্যনিষ্ঠ ধারা। তাই এসব এর অংশ, কিন্তু অংশ কখনোই সম্পূর্ণ নয়, নতুন না হলেও ইতিহাসের পটভূমি থেকে বিশ্ববীক্ষার দ্বারা নির্ধারিত ও নির্দিষ্টকৃত এ-পথ স্বতন্ত্র এবং সমকালীন বাস্তবতায় তার রূপ নতুন, প্রায়োগিকতায় ভিন্ন।

 

বিজ্ঞাননিষ্ঠ এই মতাদর্শিক দিশা অনুসারে চালিত সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ব্যক্তিক জীবন থেকে শুরু করে সামগ্রিক জীবনকে ঘিরে একজনের রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক জীবনেও তা ব্যপ্ত হয়। অতঃপর ক্রমোত্তরিত এই ধারা সামাজিক বদলের শর্তকে পূরণ করেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তির লক্ষ্য সাধনে পূর্ণতা পায়।

 

যেখানে মানুষ, সেখানেই মনুষ্যত্বের মুক্তি সংগ্রামে আমাদের কর্মকাণ্ড বিজ্ঞানের যেমন জাতীয় সীমারেখা থাকে না, তেমনি তা থেকে উৎসারিত মতাদর্শিক দিশাও কোনো সীমা মানে না। এভাবেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের মুক্তিতে আমাদের মতাদর্শিক দিশার আলো ফেলে আমরা বিশ্লেষণ করি চলমান সমাজগত মানুষের ব্যক্তিক থেকে সামগ্রিক জীবন এবং রাষ্ট্রিক তথা জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক জীবনকে।

 

ব্যবসানীতি কিংবা যুদ্ধনীতি অথবা রাজনীতি থেকে আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা সবই ভাগাভাগির (খণ্ডিত বা ‘আংশিক বাস্তব’ প্রসূত) দৈহিক শ্রমনির্ভর বিগত সমাজ-সভ্যতার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন- যা এখনও বিদ্যমান, অথচ তা সমাজ-সভ্যতার গর্ভোন্মুখ জৈবিকতা মাত্র। তাকে সমাহিত করার মধ্যেই আজকের বৌদ্ধিক শ্রমনির্ভর মানবসভ্যতার (প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথ ধরে ‘সামগ্রিক বাস্তবতা’ সংশ্লিষ্ট) যথাস্থ হওয়া নির্ভরশীল।

 

তাই পথ ও মত- আজ দুই ভাগে বিভক্ত; যে পথ আর যা-কিছু রক্তজ হিংসার অনিবার্যতাকে প্রকাশ করে- তা-ই কুপথ, সে ধর্ম বা বিজ্ঞান যে বেশ ধরেই আসুক- তা অতীতের কায়িক শ্রম নির্ভর জৈবিক সমাজ-সভ্যতার বাস্তবনিঃসৃত। যা আজকের বাস্তবতায় কুমন্ত্রণা-কুপথ হতে বাধ্য। সুসভ্যত নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতায় বৌদ্ধিকতাই একমাত্র মত এবং অহিংস’ই একমাত্র বিজ্ঞাননিষ্ঠ পথ- প্রযুক্তিগত উত্তরণ, যে প্রামাণিকতাকে নিশ্চিত করেছে।

 

সমাগত অহিংস’র বাস্তবসমৃদ্ধ আজকের মানবীয় সমাজ-সভ্যতার গা থেকে জৈবিক সেই সব জঙ্গবাজির চিহ্ন, অংশবোধের স্থূলবুদ্ধি প্রসূত আইন-কানুন-নীতি-নৈতিকতা, নির্মোহ চিত্তে ঝেঁটিয়ে বিদায় দেওয়ার মধ্যেই বিশ্বশান্তি- মানবমুক্তির সদম্ভ ঘোষণা উচ্চারিত হচ্ছে।

 

 

প্রিয় বন্ধুগণ,

 

উল্লিখিত বৈশ্বিক বোধে, সামগ্রিক জীবনের প্রতিটি দিক নিয়েই যেহেতু সাংস্কৃতিক সংগ্রাম- তাই সংহতির ডাক প্রসঙ্গে আমরা সূচনাতেই বলেছি, আমাদের আদর্শিক বিশ্বাসের ব্যাপকতায়- তা সংক্ষেপ মাত্র, কারণ রাজনীতি আমাদের অংশ- কখনই সমগ্র নয়।

 

ফলে- জীবনের জন্য, জীবন থেকে উৎসারিত, সামগ্রিক জীবনের মাধ্যমেই যা মুক্তির সংগ্রামে পূর্ণ, মতাদর্শিক সে দিশা অনুসারে সামাজিক জীবন প্রাসঙ্গিকতায় তা মানুষের ব্যক্তিক, সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক, আন্তর্জাতিক জীবনকে ব্যপ্ত করে এগিয়ে চলে। যা আজ মানুষের জন্য, মানুষের স্বার্থে মনুষ্যত্বের মুক্তিতে- সামাজিক বদলের আলোচনায় অনিবার্য ও অপরিহার্য। এই অনিবার্য অপরিহার্যতাকে মূল্যায়ন করে ইতোপূর্বে (জাতীয় সাংগঠনিক রিপোর্ট -২০০৩) ‘প্রেক্ষাপটঃ আন্তর্জাতিক ও জাতীয়’ বিশ্লেষণপূর্বক তার সংকট আবিষ্কারে উত্তরণের ভিত হিসেবে আমরা ঘোষণা করেছিলাম, ‘আজ কেন্দ্রীভূত দানবীয় রাষ্ট্রকাঠামোর বিপরীতে চাই মানবীয় বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র (সংগঠন) কাঠামো। সংঘবদ্ধ হিংস্রতার বিপরীতে চাই অহিংস’র দীক্ষামন্ত্র, দেউলিয়া ও বিকৃতিগ্রস্ত রাজনৈতিক পথের বিপরীতে চাই সর্বব্যাপী সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথ এবং আত্মস্বার্থের পাশবিক দলবৃত্ততার বিপরীতে চাই সামষ্টিক স্বার্থে আদর্শনিষ্ঠ লৌহদৃঢ় সংগঠন’। বিকৃত রাষ্ট্রশক্তিকে রুখতে চাই সামাজিক শক্তি এবং তার বিকৃতিগ্রস্ত অবস্থানের বিপরীতে চাই দেশজ চেতনায় সমন্বিত জ্ঞানতত্ত্ব। আর এভাবেই যথার্থ ব্যবস্থাপনার শক্তি অর্জনে সক্ষমতাপূর্ণ রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থের অনুবর্তী সংহত রূপ পেতে পারে এবং ব্যাপক জনসমাজ জুড়ে যে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা, হিংসা-দ্বেষ ক্রমশঃ নাগরিক জীবনকে করে তুলেছে অস্থিতিশীল- তা রোধে সমস্থিত রাজনৈতিক শক্তিতে বলিয়ান ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

 

আর সেক্ষেত্রে,

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে উল্লিখিত শুধু একটি ধারা, যা স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও যথার্থ বাস্তবায়ন না হওয়ার দৃষ্টান্তেই যেমন প্রমাণ করা যায়- স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনীতি তথা স্বাধীন বাংলাদেশের ‘রাজনীতিহীন’ দলবৃত্তির ধারাকে, তেমনি রাজনীতিহীন সরকার দ্বারা চালিত রাষ্ট্রীয় অবস্থাদৃষ্টে আখ্যা দেয়া যায়- ‘বাংলাদেশ’, সরকারবিহীন দীর্ঘ পথচলা ‘এক সার্বভৌম জনপদ’!

 

ফলে- সংকট ও সমাধান, তদুপরি বিশ্লেষণ ও মানদণ্ডে তথা আমাদের রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক লক্ষ্য ও দাবি পূরণে একটি মাত্র অনুচ্ছেদ অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ৪র্থ ভাগ, ৩য় পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ ৬০-এর যথার্থ বাস্তবায়ন, অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উত্তরণ সাযুজ্যতায় সমকালীন বাস্তবানুগতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় অখণ্ডতায় স্থানিক ব্যবস্থার আমূল বিন্যাস বা কার্যকর করার দাবিই- আমাদের বর্তমানের রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামে আশুকর্তব্য হিসেবে ঘোষিত। যদিও তা সাংবিধানিক মানে মাত্র একটি ধারা হিসেবে শোনালেও জাতীয় আর্থ-জীবন মানে তা এতই ব্যাপক বিস্তৃত যে উক্ত ধারা বাস্তবায়ন- পক্ষান্তরে সংবিধানবদ্ধ বেশির ভাগ ধারা ও প্রসঙ্গকে ছুঁয়ে যায়।

 

ইতিহাসগত সমর্থনে থাকা যে ‘স্বনির্ভর গ্রামব্যবস্থা’, যা প্রায় সর্বজনবিদিত ও দল-মত নির্বিশেষে সমর্থিত, উল্লিখিত ধারার সাথেই তা সম্পর্কিত। এদেশের ব্যাপক জনসমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়ন উক্ত ধারার বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত এবং দল-মত নির্বিশেষে তা সমর্থিত বিধায় ক্ষমতাসীন হওয়ার পূর্বে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উক্ত ধারা তথা ‘স্থানীয় সরকার’ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করলেও ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কোনো সরকার আমলেই তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়ে ওঠেনি।

 

ব্যাপক জনসমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়ন-স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, দেশজ বাস্তবনিষ্ঠ ও ইতিহাস সমর্থিত, ঐকমত্যের কোনো বিধি-নীতি বাস্তবায়নই যদি রাজনীতি হয়- তবে এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরে এতগুলো সরকারকে কেন রাজনীতিহীন বলা যাবে না? আর ক্ষমতাসীন বা সরকারে থাকা কোনো দলের যদি রাজনীতি না থাকে তবে সেখানে দেশও থাকে না, তা হয়ে পড়ে দলবদ্ধ স্বার্থান্বেষণগত কোনো গোষ্ঠী বা চক্রের শাসন, যাকে বলা হয় দলবাজি এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির নামে দলবদ্ধ ধাপ্পাবাজি। বিগত চল্লিশ বছরে সরকারে থাকা দলগুলির মধ্যে রাজনীতি পেয়েছি কম, দলবদ্ধ ধাপ্পাবাজি পেয়েছি বেশি, উক্ত দফা সেই নির্জলা সত্যটাকেই প্রকটিত করে।

 

ফলে-

 

আবহমান বাংলার ইতিহাস ও তার স্বাভাবিক রাজনীতি, অর্থনীতি তথা সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই নির্দিষ্ট যে রাজনীতি, আমাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পথে সেই জাতীয় অস্তিত্ব, অবস্থান ও সংগ্রামের প্রকাশ অর্থেই আমাদের মূলনীতি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যাংশের সাথে যুক্ত হয়ে প্রথম, প্রধান ও একমাত্র দফা হিসেবে ঘোষিত হচ্ছেঃ

 

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্রীকরণ (Decentralised Centralisation)- এর সমাজ-কাঠামো প্রতিষ্ঠা মারফত স্থানিক শাসন (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান, চতুর্থ ভাগ, তৃতীয় পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ-৬০) ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতঃ আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক অবস্থার বদল।

 

উল্লিখিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের মূলনীতি বা দাবি হিসেবে উঠে এসেছে-

 

সবক্ষেত্রেই বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত উত্তরণ ও চেতনার সাথে জাতীয় বাস্তবতার সাযুজ্যপূর্ণতায় সকল নীতি গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ “জ্ঞানে- বৈশ্বিক, প্রয়োগে- স্থানিক” তথা “Global Knowledge Local Act” শ্লোগানই মূলনীতি অর্থে গৃহীত।

 

বিজ্ঞাননিষ্ঠভাবে মানুষের মানবীয় মৌলিক অধিকারের ভিত্তিমূলতঃ দুটিখাদ্যতথ্যএবং তদভিত্তিক বর্তমান মানবীয় মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষিত- খাদ্য এবং তথ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা।

 

স্পষ্টতঃই আমরা মনে করি, শিক্ষা মোটেই মানুষের মৌলিক অধিকার নয়- বরং তা কেবল তথ্যের অংশমাত্র এবং মানুষের ক্ষেত্রে তার মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রথম ও প্রধান উদ্বোধন ঘটে যে অধিকার পূরণ দিয়ে, তা হলো তথ্য। কারণ, জীবমাত্রেই বেঁচে থাকার শর্তে খাদ্য অনিবার্য এবং বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা মূলতঃ সমাজবদ্ধ মানুষের জন্য বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত আর ‘তথ্য’ হীনতায় তা মানুষের কাছে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে সমাজবদ্ধ মানুষের বেঁচে থাকার শর্তগত দ্বার উদ্ঘাটনে প্রথমেই আসে তথ্য যা কেবল মানবীয় বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত বা অপরাপর জীব থেকে পার্থক্য নির্দেশক। সুতরাং সমাজবদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকারকে নির্দিষ্টকরলে- জৈবিক শর্তে খাদ্য এবং এর পরেই সমাজবদ্ধতার শর্তে আসে তথ্য। এক্ষেত্রে মানবীয় বৈশিষ্ট্যসঞ্জাত মৌলিক অধিকার হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ‘তথ্য’ আর তথ্যভিত্তিকতায় অপরাপর অধিকার নিশ্চিত বা নির্দিষ্ট হয়- যেমন এখানে আলোচ্য বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা। সেদিক থেকে মানবীয় মৌলিক অধিকারের ভিত্তি মূলতঃ দুটি ‘খাদ্য’-যা জৈবিক বা সব জীবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং ‘তথ্য’- যা মানবিক বা কেবল সমাজবদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে অনিবার্য। অর্থাৎ প্রচলিত পাঁচটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা চিকিৎসার বদলে আমাদের দৃষ্টিতে উক্ত পাঁচটি মৌলিক অধিকার ও তার ভিত্তিগত বিজ্ঞাননিষ্ঠতায় ক্রম বিন্যাস করলে হবে- খাদ্যের পর ‘তথ্য’, এবং তথ্যভিত্তিকতায়- বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা সেই সাথে পাঁচটি ‘মৌলিক অধিকার’কে তথ্য ভিত্তিকতার কারণে আমরা ‘মানবীয়’ মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করছি এবং উক্ত পাঁচটি অধিকার ‘মানবীয় মৌলিক অধিকার’ অনুসারে যথার্থতায় ঘোষিত হচ্ছে- ‘খাদ্য এবং তথ্য ও তদভিত্তিকতায় বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা’

 

আমাদের রাজনৈতিক আশুকর্তব্য বা দাবিসমূহ এই আলোকেই বিবৃত। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আমূল বদল আনতে আমাদের ডাক-

 

“জাতীয় জীবনকে তথ্য ও প্রযুক্তির আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষ নাগরিক সংশ্লিষ্টতা গড়ে তোলো

সব ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও বিচ্ছিন্নতার সব বাধা ভেঙে ফেলে- জনসমাজের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করো

 

 

সুহৃদ বন্ধুগণ,

 

ক্রোধের সময় যেমন সুর বা সৃজন হয় না, তেমনি স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পরাধীন শাসনে- নির্যাতন থাকায় রাজনীতিতে বিদ্রোহ বা আইন ভাঙা কিংবা হরতাল, ভাংচুর ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী দেশগড়া বা সৃজনের বৈশিষ্ট্য আসাটাই ছিল কাম্য। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও রাজনীতিটা পড়ে আছে সেই পরাধীন ঔপনিবেশিক যুগেই। স্বাধীন দেশটা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি বা রাজনীতিতে এখনও ধর্তব্যেই আসেনি।

 

এখনও রাজনীতি মানেই হরতাল, ভাংচুর, আইন ভাঙার মহোৎসব, রাজনীতিতে আইন গড়া ও রক্ষার চেয়ে আইন ভাঙা ও বিশৃঙ্খলাতেই সিদ্ধ ও দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচার-আচরণে পরাধীন বা ঔপনিবেশিক রাজনীতির সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিগত কোনো পার্থক্য এখনো সূচিত হয়নি।

 

মোবাইলে চিৎকার করে কথা বললে তা দেখে অস্বাভাবিক মনে হলেও-মাইকে ঘন্টার পর ঘন্টা গলাফাটিয়ে চিৎকার করাকে ঝগড়া বা অসভ্যতা না বলে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ বলা হচ্ছে। বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে দ্রোহের ভাষ্য স্বাভাবিকভাবেই উচ্চকিত হয়- মানুষের কাছেও তা স্বাভাবিক ঠেকে কারণ তাঁরাও বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে দ্রোহের কমন মানসিকতা পোষণ করে। অর্থাৎ সম্পর্কটা দুই পক্ষের ঝগড়ার সম্পর্ক থাকে বলে ঝগড়াটে বক্তব্যটাও স্বাভাবিক ঠেকে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন রাজনীতিটা হয়ে পড়ে দেশ বিনির্মাণের শর্তগত বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট তখন রাজনীতিতে এমন বিকট চিৎকার-চেঁচামেচিকে অসভ্যতা না বলাটা অস্বাভাবিক। অথচ কারও কাছে এটা অস্বাভাবিক ঠেকছে না। আর্থৎ স্বাধীন দেশের নাগরিক মননটাই আমাদের গড়ে উঠেনি। মাইক থাকা স্বত্ত্বেও গলা ফাটানো মূলতঃ স্বাধীনতা পূর্ববর্তী রাজনীতির অনুকরণ। তাই এ অসভ্যতাটা হয়ত পার পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিকেলে কোনো ঘটনা ঘটলে মাত্র কয়জন মানুষ চা খেতে খেতে মুখ বাড়িয়ে মিডিয়াতে হরতাল বললেই হরতাল হয়ে যাচ্ছে, আগের দিন কয়েকটা গাড়ী পুড়িয়ে মিডিয়ায় সংবাদ হচ্ছে অতঃপর- দেশের সমস্ত মানুষকে মুহূর্তেই শঙ্কাত্রস্ততায় জিম্মি করে ফেলতে পারছে- এটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? সে প্রশ্ন জাগছে না। অথচ বিশ বছর আগেও হরতাল ডাকলে মাসব্যাপী প্রচার-প্রচারণীতেও তা অনেক সময় হয়ে উঠতো না। এর কারণ যে প্রযুক্তিগত উত্তরণ, সেটা আইন-কানুন-নীতি-নৈতিকতা তথা রাজনৈতিক মননে প্রতিফলিত হচ্ছে না এবং স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনসমাজের নাগরিক মননকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে থাকে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি- তা যদি পিছিয়ে থাকে, তবে নাগরিক মননও পিছিয়ে পড়তে বাধ্য।

 

অর্থাৎ প্রযুক্তিগত উত্তরণের সাযুজ্যতায় রাজনীতি এগিয়ে যায়নি- বরং তা মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে জিম্মি করে ফেলতে পারছে- এটা ভয়ানক বাস্তবতা! রাজনীতি ও তার সংস্কৃতিহীনতার নির্লজ্জ পশ্চাতগামিতা।

 

তাই চাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে অগ্রগামী রাজনীতি এবং অবশ্যই রাজনীতিকেই এগিয়ে যেতে হবে। অনেক কিছু না থাকলে দেশ চলে কিন্তু রাজনীতি না থাকলে দেশ চলে না- জাতীয় জীবন অচল হয়ে পড়ে।

 

কারণ- “এখনও মানচিত্রিক সীমানায় কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠির জীবন-মান নিয়ন্ত্রণে- সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্তৃত্বে প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতি-ই থাকে, তাই সারা দেশ যদি সাধু-সন্ততে ভরেও যায় আর রাষ্ট্রিক কর্তৃত্ব পচে ওঠে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা নিম্নমান প্রতিফলিত করে- তবে দেশ অচিরেই রসাতলে যাবে। বিপরীতক্রমে সারা দেশ যদি নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলায় ভরে ওঠে আর রাষ্ট্রিক কর্তৃত্বে সততা-নৈতিকতায় উন্নত রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মান প্রতিফলিত করে, তবে অচিরেই সে দেশ-জাতি বেঁচে উঠবে। এজন্যই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুরা দেশ-ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে প্রথম রাজনীতির ভাবমূর্তিকেই কামড়ে ধরে। রাজনৈতিক অঙ্গণের দু-দশটা নেতিবাচক ব্যক্তি-দৃষ্টান্ত চর্চায় পুরো রাজনীতিটাকেই অনাস্থায় বিষিয়ে তোলে অথবা আদর্শের দৃষ্টান্তে থাকা জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ত্বের দু-চারটে নেতিবাচ ভুলকেই প্রাধান্যে এনে অতিচর্চায় বিতর্কিত করে তোলে। এতে দেশে রাজনীতিহীন অনিশ্চয়তার ভ্রান্তি আর আদর্শিক দৃষ্টান্তের দৈন্যতায় স্বপ্নহীন প্রজন্মের বোঝা বাড়ে। বাইবেল-এর ভুল প্রয়োগ হলেই যেমন তার পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি না, তেমনি দু’চারটে ভুলেই একজন মানুষের আদর্শিক অর্জনকে- তাঁর সামগ্রিকতাকে বাতিল করতে পারি না। নিজের আঙিনায় থাকা ময়লা এড়িয়ে যাওয়া যেমন সুস্থতা নয়, তেমনি সব ক্ষেত্রের মতো দু-চার জন মন্দ দৃষ্টান্তে রাজনীতিটাকে মন্দ বলা নাগরিক বোধগত মূর্খতার নামান্তর। তবুও রাজনীতির মন্দটা যেহেতু সবকিছুকে ঢেকে দিতে পারে, তাই এ ক্ষেত্রটার পচন রোধই সামষ্টিক জীবনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে জরুরি। বিশেষতঃ যাঁরা জানেন, রাজনীতিটা অসংখ্য মানুষের জীবনমান- বাঁচা-মরার সাথে প্রত্যক্ষ জড়িত- যাঁরা বোঝেন রাজনীতি মানে দলাদলি, খুনোখুনি কিংবা ছেলেমীপনা নয় বরং মানুষ আর মনুষ্যত্বের প্রতি, নিজের সততার প্রতি, মানবিক মমত্বের প্রতি শ্রেষ্ঠ পথ ও নিদর্শনের নাম রাজনীতি, তাঁদের ক্ষেত্রে মানবিক আমানতদারী আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ উপায় রাজনীতি এবং জাতীয় জীবন প্রসঙ্গে যে-কোনো কিছুর চেয়ে, যে-কোনো সময়ের চেয়ে জরুরি হলো রাজনীতি। আর এ কারণেই দেশ-কালে সামাজিক দায়িত্ব পালনে সৎ রাজনীতিকই শ্রেষ্ঠ সন্ত মানুষ ও মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সাধনা যদি করতেই হয়, মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা করাই উত্তম। যেহেতু আজ রাজনীতির মানে হয়ে গেছে আদর্শহীনতা, তাই সাধনা-সংগ্রামে তার বিপরীতে আদর্শিক দৃষ্টান্ত হওয়ার মধ্যেই রাজনীতির উদ্বোধন। রাজনীতি মানেই যেহেতু আজ দলাদলি আর অসংহতির নেতিবাচক সংস্কৃতি, তাই তার বিপরীতে চাই সংহতির সঙ্গত দৃষ্টান্তে- দৃঢ় প্রত্যয়। আর তা হতে পারে সুনির্দিষ্ট দিশায় প্রাত্যহিক পথচলায়...।”

 

ফলে আজকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে পরিবর্তিত- উত্তরিত বাস্তবতায় চাই নতুন রাজনীতি, চাই বাংলাদেশের নতুন উদ্বোধন। কারণ জাতীয় মর্যাদার আসনে রাজনীতিই থাকে, রাজনীতির মর্যাদায় জাতি বেঁচে ওঠে- দেশ এগিয়ে যায়।

 

 

পুনশ্চঃ সুহৃদ, সহযোদ্ধা-বন্ধুগণ,

 

সবকিছুই ইতোমধ্যে বিপরীত অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। ভালো এখন মন্দের ফাঁস, সাদা শব্দটি কালোর অর্থে প্রতিফলিত আর আলো প্রকাশ করে ঘুটঘুটে কালোর অর্থকে। ঠিক যেমন যৌবন এখন সৃজন ও নির্মাণের পুরোধা না হয়ে ধ্বংসের হাতিয়ার হয়েছে। আশীর্বাদের বদলে তা এখন অভিশাপ। জীবনের অধিকারে ছাত্র-যুবদের বেঁচে থাকার কথা থাকলেও তাঁরাই লাশ হচ্ছে! তাই জীবন নয় মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত এ সময়, রূপান্তরিত দুঃসময়ে এবং দুঃসময় প্রেতাত্মার মতো উল্টো পায়ে সবকিছুর বিপরীত অর্থ করে। বিশেষতঃ রাজনৈতিক বেনোবৃত্তিতে ‘দেশ’ শব্দটা যখন পচে গেছে, তখন সমগ্র দেশ জুড়ে সংস্কৃতি ও সংহতির ডাক শুনলে কেউ কেউ দ্বিধায় ভ্রূ কুঁচকাবে। ‘মুক্তি’ শব্দটা যখন রাজনৈতিক দেউলিয়া বৃত্তির স্বার্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষের মানদণ্ড হিসেবে বহুচর্চায়, বহুব্যবহারে বিভক্তির অসম্মানকর শব্দে পরিণত হয়েছে, তখন মুক্তিজোট উচ্চারণে আমাদের দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যের ডাকের বিপরীতে দলবৃত্তির ঘৃণ্য ভাগের যূপকাষ্ঠে বলি দেয়ার অপচেষ্টা হতেই পারে।

 

তাই অপরের চোখ-কান আর বুলি দিয়ে নয়, নিজের স্বকীয়তা দিয়েই আমাদেরকে চিনুন। আমাদের আদর্শ আমাদের মতো। আমাদেরকে দেখেই আমাদেরকে বুঝুন এবং তা বাইরে থেকে নয় বরং ভেতর থেকেই- সাথে চলেই সত্যকে জানুন। স্বকীয়-সত্য বোধের দৃঢ় প্রত্যাশায় পুনশ্চঃ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

 

 

 

কাঠামোগত তত্ত্বীয় দিশাঃ “একজন ব্যক্তিকে বিগত ও অনাগত অসংখ্য ব্যক্তির মূর্তায়ন ধরে কাঠামোগত সূচনায় তা নৈর্ব্যক্তিক মধ্যম অবস্থান (মধ্যমা-সমন্বয়ক অর্থে) এর বিন্দুরূপ ‘একক’ হিসেবে গৃহীত এবং ‘বিকেন্দ্রীভূত-কেন্দ্রীকরণ’ সংগঠন-কাঠামোর প্রথম অংকুরোদ্গমন সমরূপে ৩ মিলে সংগঠন-কাঠামো তথা সংঘবদ্ধতার কোষ গঠিত; যাকে আমরা অন্তর্বীজ ফ্রন্টে বোধগম্যতার স্বার্থে ‘অঙ্কুর সভ্যত্রয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছি । এরপর ৩ কে কাঠামো ক্রিয়ার কোষ এবং ১০-এর ইউনিট কাঠামোকে সংগঠন-কাঠামোর একক ধরে ১০-এর ধাপে ধাপে ক্রমোত্তরিত (কাঠামোগত সাধারণ রূপ ১০+১০+১= ২১ হিসেবে) ধারায় সংগঠন-কাঠামো এগোতে থাকে । ৩ (তিন) কাঠামো ক্রিয়ার কোষ হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির রূপ প্রকাশ পায় ৫ ও ৭ এবং ১০-এ । ১০-এর ‘ইউনিট কাঠামো’ সংগঠন-কাঠামোর একক বিধায় কাঠামোগত মানে উক্ত একক ‘১’-এর অর্থে (অথোরিটি) মূর্তায়িত, যার মান ‘শূন্য’ অর্থাৎ কাঠামোগত একক হিসেবে ইউনিট বলতে বোঝায় (১০ জন+১)=১১ । এক্ষেত্রে ১০ বলতে দশ জন হলেও ১ মূলত উক্ত ১০ জনের সমন্বয়কের অর্থে- Whole বা সমগ্র ‘ইউনিট’-এর প্রকাশক । অর্থাৎ ১০ জনের মতামত উক্ত ‘১’ মারফত প্রকাশ পায়, বিধায় তিনিই সর্বোচ্চ অর্থাৎ ‘ব্যক্তি মত রহিত’ অর্থেই তিনি সমন্বিত (Whole) মতের প্রকাশক মাত্র ।